'কলকাতার রাত্রি রহস্য' বইটা, প্রকাশক ও সম্পাদকের গবেষণা ও ব্যাখ্যামতে, হেমেন্দ্রকুমার রায়ের লেখা, 'মেঘনাদ গুপ্ত' ছদ্মনামে। 'যখের ধন' খ্যাত এই বহুপরিচিত সাহিত্যিক কেন ছদ্মনাম নিয়েছিলেন এই বইয়ের জন্য, সেটা কয়েক পাতা পড়লেই পরিস্কার হয়ে যায়। ১৯১০ বা ১৯১২ সালের দিকের কলকাতার নাগরিক সমাজের যে অন্ধকার অজানা অদেখা রূপ তিনি স্বচক্ষে দেখে তুলে ধরেছেন, স্বনামে প্রকাশ করলে শুধু নিজের পেশাজীবন নয়, ব্যক্তিজীবনও যে হুমকির মুখে পড়তে পারতো, তাতে কোন সন্দেহ নেই। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত ছোট আকারের বইটি প্রায় শ'খানেক বছর পরে সম্পাদনা করে টীকাসহ প্রকাশ করেছেন কৌশিক মজুমদার। এখানে একান্ত ব্যক্তিগত একটা মতামত দিয়ে রাখি, সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশদের পর কলকাতার ফিকশন জগতে তেমন জুতের কাউকে পাইনি, কিন্তু নন-ফিকশনের বিষয়বৈচিত্র্য ও লেখার ধরণে কলকাতা যে এপার বাংলার চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে আছে (অতীতেও ছিল), তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই। আর ননফিকশন লেখায় যারা অগ্রগণ্য, তাদের মাঝে কৌশিক মজুমদারকে আমি একেবারে প্রথমে রাখবো। তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় 'হোমসনামা'-র মাধ্যমে, এরপর পড়েছি খাবার নিয়ে বই 'নোলা'। আর এবারেরটা তার সম্পাদনা হলেও এমন দুর্দান্ত একটি বই সম্পাদনার জন্য বেছে নেয়ায় তাঁকে কৃতিত্ব দিতেই হয়।
এই বইটা নয়টি ছোট ছোট লেখার সঙ্কলন। বিংশ শতকের শুরুর দিকে কলকাতা মহানগরী হলেও ছিল না বিজলী বাতি, সন্ধ্যা হলেই অফিস পাড়া আর আবাসিক এলাকাগুলো ঝিমিয়ে পড়তো। তারমানে এই নয় যে, কলকাতা ঘুমিয়ে যেত। বরং রাত বাড়ার সাথে সাথে আপার চিৎপুর রোড, সোনাগাছি, সাহেবপাড়াসহ অনেক এলাকা জেগে উঠতো নিশাচর প্রাণীর মত। সে প্রানীদের দলে শিকারী, শিকার, দর্শক কিছুরই অভাব নেই। সেখানে ছিল ফুর্তির সন্ধানে থাকা বাবুসমাজ, গণিকা, চোর, পকেটমার, বাটপার, দালাল, হোটেল ব্যবসায়ী, পানওয়ালা, পাহারাদার, পুলিশ, ভিখিরি, শ্মশানযাত্রী, আরো কত কত লোক! সে জীবন নিজ চোখে দেখার জন্য ছোট একটি লাঠি সম্বল করে বেরিয়ে পড়তেন লেখক। যা দেখেছেন, তার কিয়দংশও নাকি লেখেননি, তবে ইঙ্গিত যা দিয়েছেন, সচেতন পাঠক মাত্রেই বুঝে নিতে পারবেন গল্পের ভেতরের গল্পগুলো।
প্রথম লেখাতেই আছে কলকাতার বর্ণনা, আর সে বর্ণনা মিলে যায় বিশ্বের প্রায় সব মেগাসিটি বা মহানগরীর সাথে। কলকাতা দেখিনি, তবে ঢাকায় থাকি, কর্মসূত্রে দিল্লী-লন্ডন-টোকিও'র মত মেগাসিটি দেখার সুযোগ হয়েছে, আর সময়ের পরিবর্তনে প্রযুক্তির আগমনটুকু বাদ দিলে সেই ১০০ বছর আগের কলকাতার সাথে এখনকার বৈশ্বিক মহানগরগুলোর চরিত্রগত কোন অমিল খুঁজে পেলাম না। লেখকের বর্ণনাতেই শুনুন--"দিবারাত্র তার পথে জনতার স্রোত বইছে, মান্ধাতার গোরুর গাড়ি আর মানুষ-গাড়ির পাশাপাশি আধুনিক বৈদ্যুতিক ট্রাম, বাস ও মোটরগাড়ি ছুটছে, তাদের গায়ে ছায়া ফেলে উড়ছে উড়োজাহাজ, চশমা-নাকে, টেরি-মাথায় কাপুড়ে-বাবু, কালো অঙ্গে বিলাতি পোশাক ইঙ্গ-বঙ্গ পুঙ্গব,......একদিকে বড়ো বড়ো রঙ-বেরঙের আকাশছোঁয়া অট্টালিকাশ্রেণী, তারই ছায়ায় হেলে পড়া মেটে দেয়াল.......রাজপথের একদিকে মূর্তিমান ঐশ্বর্য্যের মত শকটারোহী, সুসজ্জিত লক্ষ্মীর বরপুত্ররা, অন্যদিকে প্রকাশ্য রাস্তার ধুলায় ছেঁড়া কাঁথা পেতে চিরদারিদ্রের উপাসক, অস্থিচর্মসার দীন ভিখারীর দল।" ঢাকা শহরের গুলশান বা কাওরানবাজার এলাকায় যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন, অশালীন ঐশ্বর্য আর মুখব্যাদান করা দারিদ্রের সহাবস্থান যারা দিনেদুপুরেই দেখে থাকেন, লেখকের এ বর্ণনার সাথে মিলে যেতে তাদের এক মুহূর্তও লাগবে না।
এরপর লেখক চলে গেছেন কলকাতার নৈশজীবনের বর্ননায়। একটা কথা বারবার তিনি উল্লেখ করেছেন, সেকালের নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত, কুখ্যাত লম্পট থেকে শুরু করে সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা বা বুদ্ধিজীবি সমাজের প্রায় সবটাই গণিকাসক্ত, মদ্যাসক্ত, এবং যেহেতু দিবালোকে সযত্নে নিজেদের এই চেহারাটা লুকিয়ে রেখে সর্বজনতাকে নীতির সবক দিয়ে বেড়ান, সেহেতু চূড়ান্ত ভণ্ড। সম্ভবত এদের জন্যই তার এই ছদ্মনাম গ্রহণ। রাতের রাজপথে, গণিকাপাড়ায় তিনি হেন সমাজের লোক নেই যাকে মাতলামি বা গণিকাসঙ্গে দেখেননি। তবে এখনকার সাংবাদিক বা নাগরিক সমাজের মত তিনি সমাজের তথাকথিত 'ভদ্রলোক'-দের বাঁচিয়ে গণিকাদের উপর দোষ চাপাননি, বরং পেটের দায়ে যারা এপথে এসেছে তাদের দিকে পরম সহানুভূতি দেখিয়ে প্রবল ক্ষোভ ঝেড়েছেন সমাজের এই মুখোশধারীদের (এবং সংখ্যাটা বিপুল) দিকেই। রাতের ঢাকায় যারা ন���না সূত্রে চলাফেরা করেন, নামীদামী হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে কখনো পদার্পনের সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য হয়েছে, তারাই জানেন লেখকের এই পর্যবেক্ষণ কতটা সত্যি। নৈশনগরীর সকল নোংরা-আবর্জনার চেয়েও ক্লেদাক্ত আমাদের এই ভণ্ডামি, কিন্তু শত বছর আগে এক তরুণ লেখক ছদ্মনামে হলেও যে সাহসটা করেছিলেন, সেটা আমরা এত বিদ্যাশিক্ষা অর্জনের পরও করতে পারি না বলেই পাকেচক্রে কোন বিশাল গ্রুপের মালিকের প্ররোচনায় আত্মহত্যা করলেও সেই মেয়েটাকেই আমরা ধিক্কার দিই, আর অর্থক্ষমতার জোরে সেই 'বাবু'-টি নির্লজ্জের মত হাসিমুখে কোন খেলাধুলার উদ্বোধনী আসরে ছবির জন্য দাঁড়িয়ে যায়, আর তারচেয়েও নির্লজ্জের মত আমরা 'ভদ্রসমাজ' সেই দেখে দু'টো হালুয়া-রুটির জন্য তালি দিয়ে হাত ব্যথা করে ফেলি।
লেখাগুলোর আরেকটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো বর্ণনা। যারা 'যখের ধন' পড়েছেন, তারাই জানেন যে, গা শিউরে ওঠা পরিবেশ সৃষ্টি করতে হেমেন রায়ের জুড়ি নেই, কিন্তু সে ছিল ভৌতিক বা অ্যাডভেঞ্চার গল্প। বাস্তব জীবন্ত শহরের মানবসৃষ্ট অন্ধকারময় জগতের বর্ণনাতেও যে ভয় ধরিয়ে দেয়া যায়, মন্ত্রমুগ্ধ করা যায়, সেটা বোঝার জন্য এই বই পড়তে হবে। বাংলা ভাষায় 'একমেবাদ্বিতীয়ম' কিছু বই আছে, যেমন বিভূতিভূষণের 'আরণ্যক', বরেন বসু'র 'রংরুট', উপেন্দ্রনাথের 'নির্বাসিতের আত্মকথা', জরাসন্ধের 'লৌহকপাট', পরিতোষ সেনের 'জিন্দাবাহার', কিংবা মুজতবা আলী'র 'দেশে বিদেশে' ও 'চাচা কাহিনী', যেগুলো নিজেরাই 'আ ক্লাস ইন ইটসেলফ'। সেই তালিকায় কয়েকদিন আগে ঢুকিয়ে নিয়েছিলাম 'মিয়াজান দারোগার একরারনামা', আর আজকে ঢুকে গেল 'কলকাতার রাত্রি রহস্য'। অভূতপূর্ব এক পাঠ অভিজ্ঞতার জন্য বইটা যে পড়তেই হবে, এত লম্বা লেখার পর সেটা কি আর বলে দিতে হবে?