উনিশ বছর পর অদ্ভুত সব চিঠি আসতে শুরু করল। আইনজীবী আহমেদ মুনতাসির তপুর অতীত খুঁড়ে বের করছে কেউ। উনিশ বছর আগে গাজীপুরে এক রিজর্ট থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল তার কয়েকজন বন্ধু। এদের মধ্যে তার বোনও ছিল। তার লাশ পাওয়া যায়নি। লাশ পাওয়া যায়নি বন্ধু রাহাত শরিফেরও। উনিশ বছর পর পাওয়া গেল নিখোঁজ রাহাতের লাশ। নাম পাল্টে এত দিন বেঁচে ছিল সে! তাহলে কি তার বোন রাত্রিও বেঁচে আছে? উনিশ বছর আগে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল অদিতি। অনেক চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি, হঠাৎ তার জীবনে নতুন করে আবির্ভূত হলো সে। কেন? কারাই বা খুঁড়ে বের করছে তার পরিবারের গোপন এক ইতিহাস?
আমার বিবেচনায় থ্রিলার উপন্যাসে মাথা ঘোরানোর মতো টুইস্ট দুই একটা থাকাই যথেষ্ট। এদিকে টুইস্টমাস্টার হারলান কোবেন থামতে জানেন না। তার লেখায় টুইস্ট আসতেই থাকে, আসতেই থাকে। একটা সময় ক্লান্ত হয়ে যেতে হয়।অবাক হওয়ার ক্ষমতা কাজ করে না।আর "small town big secret" তো তার প্রতিটা বইয়ের ফর্মুলা! এই বইয়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তায় রূপান্তর বলে রক্ষা। আদ্যোপান্ত উপভোগ করেছি মারুফ হোসেনের লেখনী। শুধু টুইস্ট যদি আরেকটু কম থাকতো!
(যাদের বেশি টুইস্ট হজম করতে একেবারেই সমস্যা নেই তাদের কাছে বইটা বেশ ভালো লাগবে।)
উনিশ বছর আগে রিসর্টে বেড়াতে এসেছিল ক'টি ছেলেমেয়ে। এক চাঁদনি রাতে রিসর্টের পাশের জঙ্গলে গেছিল তারা— যৌবনের উচ্ছ্বাসে, আনন্দে, প্রেমে। কিন্তু তারপরেই ঘটেছিল এক ভয়ংকর ঘটনা। তার অভিঘাতে ধ্বংস হয়ে গেছিল অনেকগুলো পরিবার। এই উনিশ বছর বুকের পাথর দিয়ে অনেক প্রশ্নকে চেপে রেখেছে গল্পের কথক। কিন্তু এখন... এখন পরিস্থিতি এমনভাবে বদলেছে যে উঠে আসতে শুরু করেছে সবক'টা পুরোনো প্রশ্ন। ঠিক কী হয়েছিল সেই রাতে?
এ-কথা সবাই জানেন যে হার্লান কোবেনের জগদ্বিখ্যাত 'দ্য উডস্'-এর বঙ্গীকৃত রূপ হল এই উপন্যাস। আর্থ-সামাজিক নিরিখে এই উপমহাদেশের সঙ্গে আমেরিকার প্রভেদ এত বেশি যে কাজটা শুধু দুরূহ বললে কিছুই বলা হয় না। কিন্তু এই উপন্যাসটি যে সেই নিরিখে পুরোদস্তুর সফল— এ-কথা বলতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। কেন ও কীভাবে সফল হয়েছে এই উপন্যাস? প্রথমত, গল্পের কথককে সহানুভূতির সঙ্গে তুলে ধরেও তার উপর 'আনরিলায়েবল ন্যারেটর'-এর বৈশিষ্ট্যগুলো সযত্নে আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে ক্রিস্টির লেখায় প্রভাবিত পাঠক গল্পের শুরুতে যেমনটা ভেবে নেবে, পদে-পদে সেগুলো ভুল বলে প্রমাণিত হবে। এইভাবে ভুল প্রমাণিত হয়ে পাঠক যে আদতে খুশিই হন, সে-কথা কে না জানে? দ্বিতীয়ত, গল্পের প্রতিটি চরিত্রচিত্রণ একেবারে নিখুঁত হয়েছে। পড়তে-পড়তে মনে হয়েছে, আমি যেন চরিত্রদের দেখতে পাচ্ছি। তাদের হাহাকার, কান্না, হাসি, এমনকি হিংস্রতাও যেন বইয়ের পাতা থেকে একেবারে চোখের সামনে ফুটে উঠেছে। তৃতীয়ত, আবেগতাড়িত হওয়ার বহু সুযোগ থাকা সত্বেও এই লেখা নির্মমভাবে এগিয়ে গেছে সত্যের সন্ধানে। সেই পথে কে পিষ্ট হল আর কত রক্ত বা অশ্রু ঝরল— তার পরোয়া করেনি সে। অথচ, এত কিছুর পরে যে সত্যকে সে পেল, তা সাদা-কালো না হয়ে একেবারে ধূসর। ক্রাইম থ্রিলারের সহজ বাইনারি ছেড়ে নোয়া-র ঘোলাটে বাস্তবতাকে এভাবে আপন করে নেওয়া সহজ না হলেও এই উপন্যাস ঠিক সেটাই করতে চেয়েছে ও পেরেছে।
বইটির ছাপা ও বানান শুদ্ধ। প্রচ্ছদটিও রুচিশীল। রহস্যপ্রেমী পাঠক এই চমৎকার লেখাটিকে স্বাগত জানাবেন বলেই আশা রাখি। সেই সঙ্গে আশা রাখি, আগামী দিনে মারুফ হোসেন আমাদের এমন চমৎকার আরও বহু লেখা উপহার দেবেন।
সেই সেবার ভিন্টেজ অ্যাডাপ্টেশনের স্বাদ। মারুফ হোসেন শুরুর পর থেকে যে অনেকটা দূর এসেছে তার বড়সড় প্রমাণ 'খুনে অরণ্য'। অ্যাডাপ্টেশনের ক্ষেত্রে কাহিনী যদি পরিপ্রেক্ষিতের সাথে ঠিক মেলানো না যায়, তাহলে লেজে-গোবড়ে অবস্থা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে মারুফ সফল। হারলান কোবেনের কাহিনী বরাবরই উপভোগ্য। এটার ক্ষেত্রেও টুইস্টের কোন কমতি ছিল না। একদম শুরু থেকে শেষ অবধি রোলার-কোস্টার রাইড।
বইয়ের প্রশংসনীয় ব্যাপারখানা হচ্ছে দুর্দান্ত অ্যাডাপশন। বেশ ভাল কাজ করছেন মারুফ হোসেন সাহেব। শেষের টুইস্ট অপ্রয়োজনীয় ছিল। বেশি টুইস্ট দিতে গিয়ে কাহিনীর অনেক কিছুর খেই হারায়ে গেল। কিন্তু, বইটা পড়ে বেশ আরাম। এক নিমিষে পড়ার মতন।
টুইস্ট মাস্টার হারলান কোবেনের দ্য উডস অবলম্বনে দারুণ একটা বই। মারুফ হোসেন অনেক সুন্দরভাবে এডাপটেশন করেছেন দেশীয় প্রেক্ষাপটে। যদিও প্র প্রকাশনীর কাগজের মান নিয়ে সন্তুষ্ট না(বইয়ের দামের তুলনায়)। কিন্তু সব মিলিয়ে থ্রিলার পাঠকদের জন্য ভালো একটা বই। আশা করি মারুফ হোসেনের কাছ থেকে দেশীয় প্রেক্ষাপটে আরো কিছু ভালো এডাপটেশন পাব, পড়ার সময় মনে হচ্ছিল সেবা প্রকাশনীর আগেকার বইগুলো পড়ছি।❤️
'খুনে অরণ্য' লেখকঃ মারুফ হোসেন প্র প্রকাশনী
'হারলান কোবেনের দ্য উডস অবলম্বনে।
উনিশ বছর পর অদ্ভুত সব চিঠি আসতে শুরু করল। আইনজীবী আহমেদ মুনতাসির তপুর অতীত খুঁড়ে বের করছে কেউ। উনিশ বছর আগে গাজীপুরে এক রিজর্ট থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল তার কয়েকজন বন্ধু। এদের মধ্যে তার বোনও ছিল। তার লাশ পাওয়া যায়নি। লাশ পাওয়া যায়নি বন্ধু রাহাত শরিফেরও। উনিশ বছর পর পাওয়া গেল নিখোঁজ রাহাতের লাশ। নাম পাল্টে এত দিন বেঁচে ছিল সে! তাহলে কি তার বোন রাত্রিও বেঁচে আছে? উনিশ বছর আগে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল অদিতি। অনেক চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি, হঠাৎ তার জীবনে নতুন করে আবির্ভূত হলো সে। কেন? কারাই বা খুঁড়ে বের করছে তার পরিবারের গোপন এক ইতিহাস?'
লেখক মারুফ হোসেন এক অসাধ্য সাধন করেছেন 'খুনে অরণ্য' বইটা দিয়ে। মূল গল্প হারলান কোবেনের 'দ্য উডস' অবলম্বনে দেশি ধাঁচে, দেশি চরিত্রের সমন্বয়ে বইটি লিখেছেন তিনি। তাতে দেশি পাঠকদের বইয়ের স্বাদটা আরও দারুণভাবে নেয়া সম্ভব হবে।
উনিশ বছর আগে গাজীপুরের এক রিসোর্টে খুন হয়ে যায় চার কিশোর কিশোরী। দুজনের লাশ পাওয়া যায়, দুইজনের হদিস মেলেনা। তাদের একজন বর্তমানের নাম করা আইনজীবী আহমেদ মুনতাসির তপুর বন্ধু রাহাত, একজন তার বোন রাত্রি। তপুর জীবনে আবার ফিরে আসে সেই বিভৎস সময়। ১৯ বছর পর নিঁখোজ রাহাতের লাশ পাওয়া যায়। যে এতবছর জীবিত ছিল পরিচয় পরিবর্তন করে। ওই রাতে রাহাত যদি বেঁচে গিয়ে থাকে তাহলে তার বোন রাত্রিও কি বেঁচে আছে? কি হয়েছিল সে রাতে? এইসকল উত্তর খুঁজতে মরিয়া হয়ে আবার মাঠে নামে তপু।
দারুণ না প্লটটা? দুর্দান্ত এই গল্পটা এমন আবহ তৈরি করেছিলো পুরো সময়টা, রহস্য পুরো জমে ক্ষীর!
'জীবন বড় অদ্ভুত। কাউকে কাউকে দুহাত ভরিয়ে দেয়। আবার কাউকে একেবারে নিঃস্ব করে ফেলে।'
একটানা শেষ করতে চাইলেও সময় হাতে না থাকায় অল্প অল্প করেই পড়ে শেষ করেছি। প্রতিটি পাতাই উপভোগ করেছি। সাধারণত বিদেশি বই অবলম্বনে লেখা বইগুলোতে অনুবাদের একটা ঘ্রাণ থেকেই যায়। সেটা থেকে একদম বের হয়ে নতুন ছাঁচে, নতুন ভাবে লেখাটা খুব সহজে চোখে পড়েনা৷ দেশি প্লটে লেখবার জন্য লেখককে ব্যাকগ্রাউন্ড বানাতে হয়েছে চরিত্রগুলোর, চরিত্র ডেভেলপ করতে হয়েছে দেশি ছাঁচে। আগে সেবার কিছু বই, হুমায়ুন আহমেদের 'তিন বিচিত্র' এই বইগুলোতে এরকম সাবলীল লেখা পড়েছিলাম। মাঝে মুক্তিযুদ্ধ, একটা রেইপ কেইসের বিচার-প্রক্রিয়া একটা নতুন ফ্লেভার অ্যাড করেছে। চমৎকার লেখনী আর দুর্দান্ত প্লট হুকড করে রেখেছিল কতদিন।
দুটো ব্যাপারে সামান্য অপূর্ণতা আছে। এক, কিছু চরিত্রের চারিত্রিক গাঁথুনি একদমই সময় পায়নি। দুই, যাদের নিয়ে গল্প, তাদের শুধু রহস্যই সমাধান হয়েছে। অতি সংক্ষেপে তাদের অতিত কিংবা কিভাবে কি হলো ব্যাখা করা হয়েছে। আরও একটু জানার আকাঙ্ক্ষা থেকেই যায়।
দুর্দান্ত কাহিনী, একটানে পড়ে ফেলার মত। হারলান কোবেনের নাম অনেকদিন থেকেই শুনে আসছি, কিন্তু এই প্রথম পড়লাম। ইংরেজি বই আজকাল কম পড়া হয়। অনুবাদ পেয়ে তাই সুযোগ ছাড়লাম না। একদম পয়সা উসুল কাহিনী।
অনুবাদ, রূপান্তর এসবের ব্যাপারে আমি বেশ খুঁতখুঁতে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনুবাদ থেকে মূল বই পড়তেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। দেশীয় প্রেক্ষাপটে লেখা বলে উপভোগ্য মনে হয়েছে বেশি। আর সাবলীল ছিল গল্প বলার ভঙ্গি। বই পড়ার পুরো সময়টা আরামদায়ক আর উপভোগ্য ছিল।
বহুদিন পর পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখতে বসলাম। কেননা পরিচিত মানুষজনের বইয়ের ব্যাপারে দুই-চার খানা কথা বলা সহজ। ভালো বললেও তারাসহ কেউ গা করে না, মন্দ বললেও না...সকলি গরল ভেল। জনাব মারুফ হোসেন নিরীক্ষাধর্মী কাজ, তথা অ্যাডাপ্টেশন করার জন্য খাসা একখানা বই বেছে নিয়েছেন। খাসা বলছি এই কারণে যে বইটির সঙ্গে সম্ভবত বাংলাদেশের অনেককিছুই সহজে মিলে যায়। তাই তার কাজও সহজ হয়েছে। কাজ সহজ করতে এই বই বেছে নেয়া, না বই বেছে নিয়ে কঠিন কাজকে সহজ করা হয়েছে-সেই বিতর্ক কালের পাতে তোলা থাক। প্রথমেই আসি গল্পের প্রেমিসের ব্যাপারে। বইয়ের শুরুটাকে অনেকটা ঢিমে-তেতালা বলা চলে। প্রথম দিকে অবশ্য মনে হওয়া বিচিত্র নয় যে কোনো একখানা কোর্টরুম থ্রিলার হাতে তুলে নেয়া হয়েছে। কিন্তু পুঁটি মৎস শিকারের নিমিত্তে জেলে নদীতে গমন করিয়া যে শোল মাছ মারিচ্ছেন, তাহা প্রতীয়মান হয় কিয়দংশকাল পরে লাশের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই! অতঃপর দৌড়, ছাপ। অতঃপর ইঁদুরের পেছনে বেড়াল আর বেড়ালের পেছনে মানুষ। কে যে কোন চরিত্রে আছেন তা বোঝা মুশকিল...এমনকী শেষ পাতা পর্যন্ত গিয়েও! চরিত্রসমূহ বেশ ফ্ল্যাশড আউট। মূল চরিত্রগুলোর মনোভাব, আদর্শ, ভাবনা-চিন্তা এবং নানা পদক্ষেপের মাঝে রয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ বিস্তৃতি। তাই পড়তে গিয়ে মনে হয় না যে শ্রদ্ধেয় মারুফ সাহেব পুরো লাইন বাই লাইন অনুবাদ করেছেন, বরঞ্চ বইটিকে সহজপাচ্য করার পেছনে তার পরিশ্রম আঁচ করা যায়। ইতিহাস সাক্ষী, 'অবলম্বনে' লেখা বইগুলোতে ছোটখাটো অনেক অসামঞ্জস্য থাকে। যেমন বাংলাদেশে এসে চরিত্র ব্যবহার করেন এটিঅ্যান্ডটি মোবাইল, চরিত্রের পরিচয় জানার জন্য ব্যবহার করা হয় 'ডেন্টার রেকর্ড', আদালতে গিয়ে মাননীয় জুরির সামনে কেস উপস্থাপন করেন মাননীয় আইনজ্ঞরা। তবে খুনে অরণ্যতে আমার চোখে তেমন কিছু পড়েনি। থাকতে পারে, তবে আমি পাইনি আরকী। বইয়ের গল্প নিয়ে আপত্তি শুধু এক জায়গায়- শেষের পরের শেষ। কোবেনে বইতে এমন হয়। এন্ড ক্রেডিটে ১ মিনিটের একটা সিন দিয়ে দেন তিনি। কারও কারও খুব ভালো লাগে, কারও হজম হয় না। আমার হয় না, এখানেও হয়নি। আমি বইটি উত্তরাধিকার সূত্রে ছাপার খানিক আগে পড়েছি, তবে কোয়ালিটি দেখার ইচ্ছে ছিল বেশ। পেপারব্যাক কোম্পানির বাংলাদেশে একটাই, বাকিটার চেষ্টা করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফল হয় না, তবে প্র প্রকাশনের সফল হবার সম্ভাবনা বেশি বলেই মনে হয়। পাতার মান নিউজপ্রিন্ট পেপারব্যাক হিসেবে ভালো। বাঁধাই, ছাপা ও মলাটও গ্রহণযোগ্য। দাম খানিকটা বেশি বলা চলে, তবে ২৩২ পাতার বই ১২০ টাকা খুব বেশিও না। আপত্তি আছে একটূ, ছাপাটা আরেকটু বড় হলে সম্ভবত খারাপ হতো না। বুড়ো হচ্ছি, চশমাও ভাঙছে; কয়েক পা পাতা পড়ার পর একটু চাপ লাগল চোখে।
বাংঙালি হিসাবে আমাদের নিজেস্ব সত্তা আছে। আবার আছে নিজেস্ব কালচার - নিজেস্ব সংস্কৃতি। সম্ভবত সব কিছু মিলিয়েই একে বলে বাঙালীয়ানা। একটা এডপ্টেশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সম্পূর্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন জীবনধারা কে কনভার্ট করতে হবে স্টোরিকে ঠিক রেখে। আমরা যারা সেবা'র বই গুলো পড়ি সেখান থেকে এই ব্যাপারে যথেস্ট ধারনা আছে৷ তবে এই প্রথম মনে হলো মারুফ ভাই এমন একটা বই কে রূপান্তর করতে গেছেন, যার থেকে হয়তো একটা মৌলিক গল্প লেখা সোজা! কোবেন মহাশয় এর সাথে তালে তাল মিলিয়ে গল্প কে কনভার্ট করে দিয়েছেন চির পরিচিত সেটিং এ। মাঝে মাঝে কিছু যায়গা বে মানান লাগলেও বাঙালী আজ আধুনিক হয়েছে ভেবে সেটাও মিলে যায়! ( ৫ বছর পরের জেনারেশন এই খাপছাড়াটাও হয়তো ধরতে পারবে না!) একচুয়াল গল্প নিয়ে তেমন আলোচনা করতে ইচ্ছা করছে না৷ তবে বলতে বাধ্য হব এত টুইস্ট না দিয়েও পারে কোবেন মহাশয়। প্রথম পেজ থেকে টুইস্ট খাইতে খাইতে এমন অবস্থা হয় শেষের বড় টুইস্ট আর হজম হয় না। অনুভূতি শূন্য হয়ে যায়! ( ভালো হইলেও আমার পাঠক কমপ্লেইন করে, না হইলে তো আরো করে)
১৯ আগে গাজীপুরের গজারি বনে খুন হয় কয়েকজন ছেলে মেয়ে। দুজন বাদে সবার লাশ পাওয়া যায়। ঐ দুজন কি কোনোভাবে বেঁচে আছে আজও?
শহরের নামকরা উকিল তপু। ধর্ষণ কেস সামলাতে ব্যস্ত। একটা যোগসূত্র পেয়েই হঠাৎ করে মাঠে নামলো উনিশ বছর আগের রহস্য সমাধানে। কী হয়েছিল সেই রাতে? তার বোন রাত্রির লাশ পাওয়া যায়নি। বেঁচে রয়েছে সে? এসব করতে গিয়ে টের পেল কে যেন তার অতীত টেনে বের করতে চাচ্ছে? কে করছে এসব? কি-ই বা ঘটেছিল সেই রাতে? এসবের উত্তর রয়েছে খুনে অরণ্য তে।
মার্কিন লেখক, টুইস্ট মাস্টার খ্যাত হারলান কোবেনের বই দ্য উডসের এডাপ্টাশন হচ্ছে খুনে অরণ্য। অনুবাদক লেখক মারুফ হোসেন বইটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রচনা করেছেন। কাহিনী অনেক সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এদেশের প্রেক্ষাপটে। কখনো মনে হয়নি বিদেশী কোনো বই পড়ছি বা অনুবাদ করে স্থান,কাল,পাত্র বসিয়ে দেয়া কোনো বই। কাহিনী নিয়ে কোনো কথায় হবে না। আগাগোড়া রহস্যে মোড়ানো কাহিনী। সাবপ্লট হিসেবে ধর্ষণের কেসটাও ভালো লেগেছে। লিগ্যাল থ্রিলারের স্বাদ পাবেন সামান্য। শেষে কোবেন স্টাইলে বেশ কয়েকটা টুইস্ট। তবে একটা বাদে এই বইয়ের ক্ষেত্রে টুইস্টগুলো চমক জাগানিয়া ছিল না অতটা। মারুফ হোসেন মুক্তিযুদ্ধের কিছু ঘটনার সাথে সাথে ভালো মিলিয়েছেন ও গাজীপুরের নির্জন বনের বর্ণনা ব্যাপারটা লক্ষণীয়। সব মিলিয়ে বইটা পেজ টার্নার। তবে কিছু বানান ভুল ছিল। কার্ডবাইন্ডিং পেপারব্যাক বইটা। কিন্তু কাগজের মান সত্যি বলতে আরও ভালো হওয়া উচিত। থ্রিলার ও টুইস্টপ্রেমীরা পড়ে ফেলুন খুনে অরণ্য।
❝কখনো কখনো ঠিক আর বেঠিকের মাঝখানের দাগটা বড় ঝাপসা হয়ে যায়। বাস্তবজীবনে ন্যায়-অন্যায়ের ধারণাটা অনেক ধূসর। ভুল-ঠিক সব সময় স্রেফ সাদা-কালোর সীমারেখা মেনে চলে না।❞
"তপু," সহসা উত্তেজিত হয়ে উঠল বাবা। আবার বলল,"ওকে খুঁজে বের করতে হবে।" কয়েক মাস আগে বাবার বলা শেষ ���থাগুলো বারবার মনে খোঁচা দিচ্ছে তপুর। ১৯ বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ রাতের ঘটনার কারণে আজ সে দেশের একজন নামকরা উকিল। স্ত্রীর মৃত্যুর পর একমাত্র মেয়েকে নিয়েই তার সংসার। কিন্তু জীবন থেকে স্ত্রী, মা ও বোনের হঠাৎ প্রস্থান আজও কেন যেনো মেনে নিতে পারে না। তবে ১৯ বছর আগে আরও একজন প্রিয় মানুষ জীবন থেকে হারিয়ে গেছিল... ফেলে আসা অতীতে ফিরে যেতে চায় না তপু কিন্তু অবচেতনভাবে সেই রাতের রহস্য আজও ভাবায় তাকে।
জটিল এক ধর্ষণ কেস নিয়ে লড়ছে বর্তমানে তপু। এমন সময়ে লাশ সনাক্ত করতে ডাকা হয় তাকে। লাশের সাথে পাওয়া একটা রিং ও হাতের কাটা দাগ তার সমস্ত চিন্তাভাবনা ওলট-পালট করে দেয়। মর্গে স্ট্রেচারের ওপরে পড়ে থাকা শরীরটা তার একসময়কার অতিপরিচিত এক বন্ধুর! ১৯ বছর আগে সেই নির্জন গজারি বনে ঘটে যাওয়া ঘটনার একজন ভুক্তভোগী। সেই রাতে তার দুই বন্ধু-বান্ধবীর বিভৎস জবাই করা লাশ পাওয়া গেলেও দু'জনের পাওয়া যায়নি। রাহাত যদি এতোদিন বেঁচে থাকে তাহলে কি তার বোন বেঁচে থাকতে পারে না? নতুন আশা নিয়ে রহস্যের কিনারা করতে নেমে পড়ে তপু। কিন্তু অতীতের রহস্য যে বর্তমানের বিভীষিকা হয়ে যাবে যদি জানতো...
কিছু রহস্য রহস্যই থাকা উচিত বইয়ে বারবার বলা হলেও শেষে যেয়ে পাঠকই বলবে উচিত নাকি অনুচিত। টুইস্ট সম্রাট হারলান কোবেনের "দ্য উডস" অবলম্বনে খাসা দেশীয় স্বাদে মারুফ হোসেন বাংলাদেশের পটভূমিতে লিখেছেন "খুনে অরণ্য"। বইয়ে আদতে দু'টো জনরা আছে। ধর্ষণের কেসটা কোর্টরুম ড্রামা আর খুনের কেসগুলো মার্ডার মিস্ট্রি। দু'টো মিলিয়ে আবার থ্রিলার জনরার মধ্যে ফেলা যায়। যাইহোক এইবার বলি কেমন লাগলো এই এডাপটেশন।
বোন রাত্রি মারা গেছে বহু মানুষ বললেও তপু বিশ্বাস করতে পারেনি। লাশ না দেখা পর্যন্ত মনও মানবে না। দীর্ঘ সময় সুনশান গজারি বলে বাবা খোঁড়াখুঁড়ি করেছেন রাত্রির লাশের জন্য। কিন্তু রাহাতের লাশ পাওয়ার পর বোনকে জীবিত পাওয়ার আশা জেগে ওঠে কিন্তু পাবে কি? এইভাবেই কাহিনী শুরু। বইয়ে টুইস্ট আছে প্রচুর। এই ধরে ফেলছি ভাবতেই দেখি নতুন টুইস্ট। একটানা পড়ে গেছি বইটা শুধু জানতে যে আসলে খুনি "কে"। কয়েকবার মনে হয়েছিল শেষটা পড়ে দেখি কে কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করেছি। মুক্তিযুদ্ধ, বীরাঙ্গনা, রাজাকার, অতীতের ঢাকা, বর্তমান ঢাকা সব মিলিয়ে যেভাবে কাহিনী সাজানো জাস্ট... অস্থির!!! তবে অতিরিক্ত টুইস্ট অনেকের বিরক্তিকর লাগতে পারে। চরিত্রগুলোর সাইকোলজি যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কাউকেই আসলে খাঁটি সৎ বা অসৎয়ের সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না। এইটা ভালো লেগেছে। বইয়ে আমার একমাত্র পছন্দের চরিত্র "নীলা"।
খুনি হিসেবে কয়েকজনকে সন্দেহ করলেও যাকে আশা করেছিলাম তাকে পাইনি। বই পড়া শেষে এইজন্য একটু রাগ লাগছিল। যে চরিত্রের জন্য এতো প্যাঁচে পড়লো সে আপনজনদেরই এইভাবে কানা করে রেখে পার পেয়ে গেলো! এইটুকু ব্যক্তিগত অভিযোগ বাদ দিলে বইটা দুর্দান্ত।
অল্পকিছু বানান ভুল আছে। বিশেষ করে স্বরবর্ণের ব্যবহারে। বাইন্ডিং একটু শক্ত মনে হয়েছে। এছাড়া ওভারঅল প্রোডাকশন ভালোই। বইয়ের প্রচ্ছদের কালার কম্বিনেশনটা বেশ সুন্দর।
দ্য উডস-এর অ্যাডাপ্টেশন। মারুফ ইসলাম দারুণ কাজ দেখিয়েছেন। গল্পটা পড়ে বোঝাই যায় না, ইংরেজি গল্প। যারা আগে কোবেন পড়েছেন, শেষে এসে কোবেনের সেই টাচটা পাবেন। মারুফ চাইলেই সেই টাচটা একটুখানি বদলে দিতে পারতেন। তাহলে বোধ হয় গল্পটা আরো বেশি করে তার হয়ে উঠত।
বইয়ের কিছু জায়গায় সম্পাদনার অভাব আর হুড়োহুড়ির ছাপ স্পষ্ট। বেশ কিছু জায়গায় আগের প্যারা শেষ না হতেই পরের প্যারা শুরু হয়ে গেছে। কোনো চিহ্ন নেই, নতুন প্যারা দেওয়া নেই-এরকম অবস্থা। একটা দারুণ বইতে এরকম জিনিস আক্ষেপ জাগায়।
প্রচ্ছদ আর পৃষ্ঠা নিয়ে সামান্য আফসোস আছে। প্রকাশনী চাইলেই এই দামে আরেকটু ভালো জিনিস দিতে পারত বলে মনে হয়। তবে বাঁধাই দারুণ। সব মিলে প্র থ্রিলার পাঠকদের আবার পেপারব্যাকের স্বর্ণযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, এই আশা বোধ হয় করাই যায়।
অনেক দিন এতো ভালো থ্রিলার পড়ি নাই! কৃতিত্ব অবশ্য হারলান কোবেনের। এ বইটা 'দি উডস'-এর অ্যাডাপ্টেশন। মূল বইটা পড়া হয় নাই। পড়া থাকলে, হয়তো অপছন্দের কিছু খুঁজে পাওয়া যেতো। যাইহোক, বাংলাদেশী থ্রিলারের স্ট্যান্ডার্ডে মারুফ হোসেন যে খেলাটা দেখিয়েছেন, আমি তাতেই মোটামুটি সন্তুষ্ট। মারুফ হোসেনের বই আগেও দু'একটা পড়া হয়েছিল। উনি বেশ ভালো লেখেন। উনার লেখা পড়তে যেয়ে আটকাতে হয় না। বাক্যগঠন ও শব্দচয়নেও উনি খুবই সাবলীল। পুরোদস্তুর মৌলিক কিছু লেখক লেখেন বা লেখেন, উনার অ্যাডাপ্টেশনের জন্য আমি মোটামুটি মুখিয়ে থাকবো- এটা এখন অকপটেই বলা যায়।
পরিশেষে, প্রথম আলোর এই পেপারব্যাক এডিশনের আইডিয়াটা আমার খুবই পছন্দ হইছে।
১৯ বছর আগে গাজীপুরের এক রিসর্টে পার্টটাইমার হিসেবে কাজ করতো আমাদের গল্পের নায়ক তপু। রিসর্ট সংলগ্ন গজারি বনে বুনো জন্তুদের সাথে সাথে চোর ডাকাতরাও নিজেদের আস্তানা গড়ে তোলায়, অনুমতি ছাড়া ওখানে ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও রিসর্টে আগত অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা মাঝেমধ্যেই রাতের বেলা অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় সেই বনে চলে যেত। মূলত তাদের আটকানোর কাজটাই ছিল তপুর ওপর। কিন্তু ১৯৯৮ সালের সেই গ্রীষ্মের ছুটিতে চারজন ছেলেমেয়ে পরিকল্পনা করে তপুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে বনের ভিতর ঢুকে পড়ে। তারপর.... আর কখনও জীবিত দেখা যায়নি ওদের। তবে পাওয়া গেছিল দুটো গলা কাটা লাশ। কিন্তু বাকি দু'জন... রাহাত ও তপুর বোন রাত্রি কে আর কখনই খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেক অনুসন্ধানের পর রক্তে মাখা তাদের জামাকাপড়ের টুকরো উদ্ধার করা গেছিল। এরপর সবাই ধরে নেয় তারাও বোধহয় আর বেঁচে নেই। এই ঘটনা তপু ও তপুর পরিজনদের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। সেটা কী, তাই তো? ওটা আপনারাই এক্সপ্লোর করবেন.. আমি তার মধ্যে না গিয়ে বরং গল্পের দ্বিতীয় ভাগে যাই.... ১৯ বছর কেটে গেছে... সেইদিনের তপু আজ নামকরা এক আইনজীবী হয়ে উঠেছে। বর্তমানে সে একটি সেনসিটিভ কেস নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। সেই সূত্রেই তার সামনে চলে আসে অতীতের এমন কিছু অধ্যায় যা তাকে নিয়ে চলে যায় ১৯ বছর আগের সেই খুনে অরণ্যতে। কী এমন জানতে পারলো সে? অতীতের ঘটনাটির সাথে এই কেসের কী আদৌ কোনো সামঞ্জস্য আছে? এরকম আরো প্রচুর প্রশ্ন এসে জড়ো হবে গল্পটি পড়তে পড়তে... যাই হোক, গল্পটি আমার কেমন লাগলো বলি...
• গল্পটি মূলত হারলান কোবেনের "দ্য উডস" এর ছায়া অবলম্বনে লেখক গড়ে তুলেছেন। আর আমার মতে অত্যন্ত দক্ষতার সাথেই সেই কাজটি করেছেন তিনি। • হারলান কোবেন কে বলা হয় টুইস্ট মাস্টার। এই গল্পেও তাই চমকের শেষ নেই। তবে শেষ টুইস্টটি বিশ্বাস করুন... না আসলেই হয়তো ভালো হতো। • গল্পে গতি থাকায় পড়তে কোনোরকম চাপ হয় না তবে কিছু জায়গায় তাড়াহুড়োর ছাপ থেকেই যাচ্ছে। সম্পাদনার দরকার ছিল। • সরলীকরণের জলও মাঝেমধ্যে ঢুকে পড়েছে। • পেজের গুণগতমান ভালো নয়। প্রচ্ছদটিও জঘণ্য। তবে শেষমেশ বলব, এসমস্ত ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও গল্পটি আমার বেশ ভালো লেগেছে। বইটি জোগাড় করতে পারলে অবশ্যই পড়ুন। নমস্কার।
তপু একজন ডাকসাইটে আইনজীবী, যে এই মুহুর্তে বেশ ক্ষমতাসীন এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে শক্ত আইনী লড়াইয়ে নেমেছে। এমতাবস্থায় একটা লাশ শনাক্ত করার জন্য ডাক পড়লো তার। গিয়ে হতভম্ব হয়ে আবিষ্কার করলো লাশটা তারই এক বন্ধুর, যাকে কি না ১৯ বছর ধরে মৃত ভেবে এসেছে সে; এবং যার সাথে একই সময় থেকে নিখোঁজ তার আপন বোনও। তাহলে কি তার বোনও কোথাও বেঁচে রয়েছে। বোনকে খুঁজে বের করতে গিয়ে ১৯ বছর আগের ভয়ানক সব সত্য বেরিয়ে আসতে লাগলো তপুর সামনে। যেগুলা জানতে পেরে তপুর পাশাপাশি "পাঠক" আপনি নিজেও চমকে যেতে বাধ্য।
#প্রতিক্রিয়াঃ প্রথমেই বলে নেই বইটি জনপ্রিয় লেখক হারলান কোবেনের "দ্য উডস" বইয়ের অবলম্বনে। আমি যেহেতু মূল বইটি পড়িনি, তাই এই বইটিকে আমি একটি মৌলিক বই হিসেবেই ধরে নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাবো। তবে এতোটুকু বলতেই হয় আ্যডাপটেশনটা দূর্দান্ত হয়েছে।
এই বইটাও তেমন সব বইয়ের একটি যেখানে পাঠক বই হাতে নিলে নাওয়া, খাওয়া, কাজ সব ভুলে গিয়ে একটানা পড়ে যেতে চাইবেন। আমি সম্ভবত রাত ২টায় পুরো বই একেবারে শেষ করে এরপর ক্ষান্ত দিয়েছিলাম। এক কথায় দূর্দান্ত। একদম শুরুতেই যে রহস্যের অবতারণা করা হয় সেটার শেষটা অমন হবে তা কল্পনাতীত ছিল। শুরুর রহস্যটাকে পাশে রেখে আরো ভিন্ন ভিন্ন অনেকগুলো রহস্য সামনে নিয়ে এসেছেন লেখক, এর সাথে নিজের পরিচালিত আইনজীবীর কেইসটা তো ছিলোই। প্রত্যেকটা রহস্য একটা আরেকটার সাথে কানেক্টেড, প্রতিটা সূত্র এমন কোনো এক সত্যকে সামনে নিয়ে আসছিলো যা পাঠকের মাথা ঘুরিয়ে দিতে বাধ্য। একটা রহস্যের সমাধাণ হলে, সেটা থেকে আরো একটা রহস্য সামনে এসে দাঁড়াচ্ছিলো। সারাক্ষণ চিন্তা করতে হয়েছে তাহলে এটা কেনো হলো, এটা কিভাবে হলো কিংবা এটা কে করলো? শুরু থেকেই যে রূদ্ধশ্বাস উত্তেজনার জন্ম নেয় পাঠকের মনে তা একদম বইয়ের শেষ পাতায় গিয়ে ক্ষান্ত হয়েছে।
বইয়ের মূল চরিত্র তপু হলেও তার আশপাশ ঘিরে গড়ে উঠা প্রতিটা চরিত্রই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়েছেন লেখক। সবাই যার যার জায়গায় বেশ ভালো ভূমিকা রেখেছে বইটিকে আকর্ষনীয় করে রাখার। পুরো বইজুড়েই না থেকেও ছিলো রাত্রী এবং রাহাত। তপুর মানসিক দৃঢ়তা আর দ্বন্দগুলো উপভোগ করেছি৷ তবে সবচেয়ে বেশী মায়া লেগেছে কেনো যেনো আদিতির জন্য।
মূল বইটা ৪০০ পেইজের হলেও, আ্যডাপটেশনে সেটাকে ২০০ পেইজের আশেপাশে নামিয়ে এনেছেন লেখক। এটার একটা বড় প্লাস পয়েন্ট হলো, এক মুহুর্তের জন্যও বইটা কোথাও স্লো হয়ে যায়নি। সাইজ কমলেও বর্ণনায়নের ক্ষেত্রে কোনো কিছুর কমতি মনে হয়নি। শেষে যথারীতি এক একটা বিশালাকার টুইস্টের মাধ্যমে চমকপ্রদ সব সত্যকে সামনে এনেছেন লেখক। যার মধ্যে এক/দুইটা ব্যাপার খানিকটা অতি নাটকীয় মনে হলেও, ব্যক্তিগতভাবে আমার খারাপ লাগেনি। দেশীয় প্রেক্ষাপটে খুবই যৌক্তিকভাবে অত্যন্ত সুন্দর আ্যডাপ্টেশন করেছেন মারুফ হাসান। লিখনশৈলী দূর্দান্ত এবং অনেক নামকরা লেখকের চেয়েও বেটার লেগেছে আমার কাছে। মোটকথা এটা #মাস্টরিড ক্যাটাগরির বই আমার অভিমতে।
#ব্যক্তিগত_রেটিংঃ ৯.৫/১০ (কারো কারো কাছে রেটিং একটু বেশী মনে হতে পারে। তবে আমার জানা নেই থ্রিলার বইয়ে অমন টান টান উত্তেজনা আর সকল সুতো এতো গুছালোভাবে উপস্থাপনা করার পরে আর কি বাকী থাকে!)
#প্রোডাকশনঃ চিরকুটের প্রোডাকশন নিয়ে কখনোই আক্ষেপ করেছি বলে মনে পড়ে না। তবে এই বইটার বাঁধাই কিছুটা দূর্বল মনে হয়েছে। হয়তো আমার কপিটা কুরিয়ারে ড্যামেজ হওয়ায় হয়ে থাকতে পারে। এছাড়া সম্পাদনা, বানান, পেইজ কোয়ালিটি সবই ছিলো টপ নচ। প্রচ্ছদটাও গল্পের সাথে মানানসই এবং সুন্দর লেগেছে৷ আর এমন দূর্দান্ত একটা বই নিতান্তই পানির দামে দেয়া একমাত্র চিরকুটের পক্ষেই সম্ভব। চিরকুটের প্রতি ভালোবাসা রইলো।
#পরিশিষ্টঃ মারুফ হোসেনের লেখার হাত ভালো লেগেছে। তিনি ভালো অনুবাদ করেন শুনেছি। উনার বেশকিছু অনুবাদ সংগ্রহে থাকলেও পড়া হয়নি। তবে আ্যডাপ্টেশন পড়ে মনে হচ্ছে তিনি মৌলিক ট্রাই করলে ভালোই করবেন। উনার জন্য শুভকামনা রইলো।
❛জীবন বড় অদ্ভুত। কাউকে কাউকে দুহাত ভরিয়ে দেয়।আবার কাউকে একেবারে নিঃস্ব করে ফেলে।❜
আহমেদ ইশতিয়াক তপু, বর্তমান সময়ের বেশ নামকরা এক আইনজীবী। বর্তমানে কাজ করছেন এক চাঞ্চল্যকর কেস নিয়ে। এ সময় হঠাৎ তার কাছে আসে পিবিআই এর দুই লোক, আর নিয়ে যায় অতীতের এক দুঃসহ স্মৃতি রোমন্থনে। - অদিতি নাসরিন খন্দকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন বর্তমানে।বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জার্নালের জন্য পরিচয় গোপন করা ছাত্রছাত্রীদের নিজের জীবনের অপ্রকাশিত কিছু কেস পড়তে গিয়ে তার কাছেও ফিরে আসলো অতীতের এক স্মৃতি। অবাক হয়ে গেলেন তিনি কে এই কাজ করতে পারে এই ভেবে। - ১৯৯৮ সালে গাজীপুরের এক রিসোর্টে বেড়াতে গিয়েছিলেন সাত বন্ধু। তার পাশের গজারি বনে ঘুরে বেড়াতে গেলে লাশ হয়ে ফেরত আসেন দুইজন, আরো দুইজন হয়ে যান নিখোঁজ।
সে দুইজনের খোঁজ পরবর্তীতে আর পাওয়া যায় নি। কিংবদন্তি অনুসারে তাদের অতৃপ্ত আত্মা নাকি এখনো সেখানে ঘুরে বেড়ায়। - এখন আহমেদ ইশতিয়াক তপু - এর দুঃসহ সেই স্মৃতি কি? তার পরিবারের অতীত ইতিহাস কেন রহস্যে ঘেরা? তার সাথে কি বর্তমানে চলা কেসের কোন সম্পর্ক আছে? কে জার্নালের মাধ্যমে অদিতির অতীত ইতিহাস লিখছে? বর্তমান ঘটনার উনিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া গজারি বনে সেই রাতে আসলে কি ঘটেছিল ?
এ সকল প্রশ্নের জানতে হলে পড়তে হবে হারলান কোবেনের ❛দ্য উডস❜ এর ছায়া অবলম্বনে লেখা লেখক মারুফ হোসেনের রহস্যপোন্যাস ❛খুনে অরণ্য❜। - ❛খুনে অরণ্য❜ বইটি মূলত বিখ্যাত থ্রিলার লেখক হারলান কোবেনের ❛দ্য উডস❜ এর ছায়া অবলম্বনে লেখা। বইটি শেষ করার পরে প্রথম যে খেয়াল আসে সেটি হলো টুইস্টেড এক উপন্যাসের চমৎকার এডাপ্টেশন। এ ধরণের গল্পে প্রধান যে চ্যালেঞ্জিং পার্ট থাকে সেটি হলো বিদেশী এক প্রেক্ষাপটকে দেশের প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা, যা লেখক মারুফ হোসেন বেশ ভালোভাবেই রূপান্তর করেছেন। - ❛খুনে অরণ্য❜ বইটির গল্প বলার ধরণ একদম প্রথম থেকেই বেশ সাবলীল, ফাস্ট পেসড এবং কয়েক অধ্যায় পর পরেই ঘটনার কালপ্রবাহ বদলানোর মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত পাঠককে ধরে রাখে। বইয়ের চরিত্রের পরিমা��� বেশ ভালোই, একেক চরিত্র আসার পরে রহস্য আরো বিস্তৃত হয়। তবে তপু বাদে বাকি চরিত্রগুলো তেমন একটা ইম্প্যাক্ট ফেলেনি। বইয়ের আরেকটি প্লাস পয়েন্ট এর অভাবনীয় ক্লাইম্যাক্স, যা পুরো গল্পের মোড় অনেকটাই ঘুরিয়ে দেয়। - প্রথমা প্রকাশনের সিস্টার কনসার্ন ❛প্ৰ প্রকাশন❜ কে বলা যায় প্রকাশনা শিল্পে প্রায় নতুন। রহস্য, রোমাঞ্চ, বিজ্ঞান কল্পগল্প, গোয়েন্দা কাহিনী, ওয়েস্টার্ন নিয়ে তাদের যে আগ্রহ তাকে সাধুবাদ জানাই। মূল্য অনুসারে বইয়ের কভার, বাধাই বেশ ভালোই, বানান ভুলও খুব একটা চোখে পড়েনি। তবে দামের তুলনায় কাগজটি একেবারেই সস্তামানের নিউজপ্রিন্ট হয়ে গেছে। বাজারে বেশ কয়েক ধরণের কাগজ আছে, পরবর্তীতে দামের তুলনায় আরেকটু ভালো মানের কাগজ আশা করছি তাদের কাছ থেকে। - এক কথায়, বিখ্যাত থ্রিলার লেখক হারলান কোবেনের ❛দ্য উডস❜ এর চমৎকার বাংলা এডাপ্টেশন হচ্ছে ❛খুনে অরণ্য❜। যারা রহস্য রোমাঞ্চ বিশেষ করে সেবার ক্লাসিক মার্ডার মিস্ট্রি পড়তে পছন্দ করেন তাদের ভালো লাগবে আশা করছি।
চমৎকার এডাপটেশন। সেবা'র স্বর্ণযুগের লেখকদের মত টেনে রাখে। পেপারব্যাক হিসেবে দামটা সেবা'র তুলনায় প্রথমা বেশি রেখেছে, কিন্তু কট্টর ব্যবসায়ী একটা গ্রুপের কাছে পাঠকসেবা আশা না করাই ভাল। এর আগে সেবা থেকে মারুফ হোসেনের আরেকটা দারুণ অনুবাদ পড়েছিলাম --"ঠগীর জবানবন্দি"। এই দু'টো থেকে বলতে পারি, এদেশে ভাল অনুবাদকের খরার মাঝে তাঁর আগমন পাঠকের জন্য রীতিমত সুসংবাদ। আনন্দময় সময়টুকুর জন্য তাই তাকে ধন্যবাদ জানাই।
দুর্দান্ত এডাপ্টেশন। একদিনেই পড়ে শেষ করে ফেলেছি টানটান কাহিনীর গুণে। বিদেশি গল্প খাঁটি দেশের মোড়কে উপস্থাপন করতে গিয়ে গল্প কোথাও এতটুকু অবিশ্বাস্য করে ফেলেনি।
পুরোটা সময় বুঁদ হয়ে ছিলাম। ঘন্টার কাটা কখন একের পর এক বদলে গেলো,কখন সন্ধ্যে থেকে গভীর রাত হলো টের পাইনি সেভাবে। একের পর পাতা উলটে গেছি ঘোরগ্রস্তের মতো। গল্প বলায় হারলান কোবেন বরাবরই ওস্তাদ লোক, সাথে মারুফ হোসেন রুপান্তরের ক্ষেত্রে যে দক্ষতা দেখিয়েছেন তাকে বলা যায় ‘অবিশ্বাস্য’।
One of the best thrillers i've read so far. “খুনে অরণ্য” বইটাকে সম্ভবত মিস্ট্রি থৃলার সাব-জনরা এর আওতায় ফেলা যায়। উনিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক রহস্যের হঠাৎ উত্থান আর সেখান থেকে ক্রমাগত আরো ডালপালার বিস্তার পাঠককে বইয়ের পাতা থেকে এক মূহুর্তের জন্যও চোখ সরাতে দিবেনা। আহমেদ মুনতাসির তপু- একজন আইনজীবী। উনিশ বছর আগে এক রিসোর্ট সংলগ্ন গজারি বনে গিয়ে খুন হয় তার যমজ বোন রাত্রি এবং আরো তিন বন্ধু। রিসোর্টটার মালিক ছিল তাদের ই বন্ধু অদিতির বাবা। দুইজনের লাশ বনে পাওয়া গেলেও রাত্রি এবং আরেক বন্ধু রাহাতের লাশ পুলিশ উদ্ধার করতে পারেনি কখনোই। মেয়ের মৃতদেহটা পর্যন্ত জানাযা দিয়ে কবর না দিতে পারার শোকে তপুর বাবা হয়ে যান পাগলপারা- গজারি বনে একাই মাটি খুঁড়ে মেয়ের লাশ খোঁজার চেষ্টা করে গেছেন তিনি বহুদিন। আর তপুর মা ও একদিন কিছুই না জানিয়ে ছেড়ে চলে যান স্বামী ও ছেলেকে। এই খুনের জন্য তপু নিজেকেও কিছুটা দায়ী করে- কারণ হয়তো তার দায়িত্বে অবহেলার জন্যই সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সেদিন গজারি বনে গিয়েছিল রাত্রিরা। পরবর্তীতে তাদের ই আরেক বন্ধু মোশাররফকে এই চার খুন এবং আরেকটি রিসোর্টে খুনের ঘটনার জন্য গ্রেফতার করা হয় এবং মোশাররফ সাজাও ভোগ করছে। কিন্তু অন্য রিসোর্টের খুনের ঘটনায় নিজের দায় স্বীকার করে নিলেও গজারি বনের খুনের কথা কোনোভাবেই স্বীকার করেনা মোশাররফ।এসব ঘটনা অনেকদিন চাপা পড়ে থাকলেও উনিশ বছর পর হঠাৎ ই ঘুরেফিরে সেই ঘটনা সামনে আসতে থাকে তপু এবং অদিতির। মোশাররফ কী আসলেই সেদিন গজারি বনে ছিল? ওখানে সেদিন আসলে কী ঘটেছিল? আর কেন ই বা এতদিন পর মাটিচাপা পড়া অতীত উঠে আসছে তপু আর অদিতির সামনে- বইয়ের প্রতি পাতা উল্টাতেই এমন অনেক প্রশ্ন আসবে পাঠকের মনে। আর প্রতি পৃষ্ঠায় রহস্যের জাল ও খুলতে থাকবে একটু করে- একদম শেষ পৃষ্ঠা অব্দি। লেখক মারুফ হোসেন বইটি লিখেছেন হারলান কোবেনের ‘দ্য উডস’ অবলম্বনে- তবে দেশিয় প্রেক্ষাপটে লেখা বইটি পড়লে একদমই মনে হবেনা যে এটা বিদেশি কোনো বই থেকে ইন্সপায়ারড।
সম্প্রতি পড়ে শেষ করলাম মারুফ হোসেনের খুনে অরণ্য। মারুফ হোসেনের লেখালেখির সাথে আমার পরিচয় বেশ আগে থেকে; রহসপত্রিকার তথা সেবা প্রকাশনীর মাধ্যমে। যারা মারুফ হোসেনের লেখার সাথে পরিচিত, তাদের নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে হাল আমেলের শীর্ষস্থানীয় অনুবাদকদের মাঝে একদম ওপরের সারিতেই থাকবে তার নাম। এই বইটা রূপান্তর করতে গিয়েও নিজের সুনামের প্রতি একটুও অবিচার করেননি লেখক। এক বসায় পড়ার মতো একটা বই। যারা টান টান উত্তেজনা পূর্ণ কাহিনি পছন্দ করেন তাদের কাছে নিঃসন্দেহে ভালো লাগার মতো একটা বই হওয়া উচিত খুনে অরণ্য। ব্লার্ব:উনিশ বছর পর অদ্ভুত সব চিঠি আসতে শুরু করল। আইনজীবী আহমেদ মুনতাসির তপুর অতীত খুঁড়ে বের করছে কেউ। উনিশ বছর আগে গাজীপুরে এক রিজর্ট থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল তার কয়েকজন বন্ধু। এদের মধ্যে তার বোনও ছিল। তার লাশ পাওয়া যায়নি। লাশ পাওয়া যায়নি বন্ধু রাহাত শরিফেরও। উনিশ বছর পর পাওয়া গেল নিখোঁজ রাহাতের লাশ। নাম পাল্টে এত দিন বেঁচে ছিল সে! তাহলে কি তার বোন রাত্রিও বেঁচে আছে? উনিশ বছর আগে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল অদিতি। অনেক চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি, হঠাৎ তার জীবনে নতুন করে আবির্ভূত হলো সে। কেন? কারাই বা খুঁড়ে বের করছে তার পরিবারের গোপন এক ইতিহাস? ধন্যবাদ, মারুফ হোসেনকে এমন চমৎকার একটা বই উপহার দেওয়ার জন্য।
কর্মজীবনে দারুণ সাফল্য পাওয়া আইনজীবী আহমেদ মুনতাসির তপু। বয়স আটত্রিশ। পরিবার বলতে একমাত্র মেয়ে আর তিনি। পাঁচ বছর আগে স্ত্রী মারা গেছেন। একসময় বাবা, মা, বোন সবাই ছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একে একে সাবাই পৃথিবী ছেড়েছে। মেয়েকে নিয়ে ভালোই কেটে যাচ্ছিল তার। হঠাত একদিন ফারুক মৃধা নামের এক ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেল। লাশের পকেটে তপুর ঠিকানা লেখা। পুলিশ তপুকে নিয়ে যায় লাশের কাছে। লাশ দেখে সে থমকে যায়। ১৯ বছর আগে মারা যাওয়া তার বন্ধু রাহাদ শরীফের লাশ এটি। সে রাতে রাহাত শরীফ একা মারা যায় নি। তপুর জমজ বোন রাত্রি সহ আরো দুই বন্ধু মারা যায় সে রাতে। রাহাত যেহেতু বেঁ��ে ছিল, তাহলে কি বেঁচে আছে তার বোন রাত্রিও?
১৯ বছর আগে তপু গাজীপুরের এক রিজর্টে কাজ করতেন। রাতে পাহাড়া দেওয়াই তার কাজ। রিজর্টের মালিকের মেয়ে অদিতির সাথে ভাব ছিল তপুর। এক সাথে পড়ালেখা করতো। এক রাতে তপু কাজের ফাঁকি দিয়ে অদিতিকে নিয়ে ঘুরতে যায় গজারি বনের গহীনে। সে রাতেই খুন হয় চারজন মানুষ। দুজনের লাশ পাওয়া গেলেও বাকি দুজনের লাশ পাওয়া যায়না। লাশ না পাওয়াদের মধ্যে কজন রাত্রি। অন্যজন রাহাত শরীফ। এ ঘটানার পর তপুর অন্য বন্ধু মোশারফকে গ্রেফতার করা হয়। সে একটু সাইকো টাইপের। রিজর্টের লোকদের ধরে ধরে খুন করে। গাজীপুরে তাঁর খুনের প্রমাণ পাওয়া নে গেলেও অন্য দুটি যায়গায় খুনের প্রমাণ হিসেবে তাকে গ্রেফতার করা হয়। অদিতি আর তার বাবা রিজর্ট বিক্রি করে বিদেশ চলে যায়। তপুর মা সবাইক ছেড়ে ভারতে চলে যায়। রাত্রিকে খুঁজতে খুঁজতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে তপুর বাবাও।
তপু বর্তমানে একটি ধর্ষণ মামলা নিয়ে ব্যস্ত। একটি সাধারণ ঘরের মেয়েকে দুজনে মিলে ধর্ষণ করেছে। কিন্তু কোন প্রমাণ রাখেনি। ছেলের বাপ ধনবান। সে চায় ছেলেকে যেভাবে হোক মুক্ত করতে। বেকে বসে তপু। জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়বে দুই ছোকরাকে। এরকম পরিস্থিতে রাহাত শরীফের লাশ পাওয়া যায়। যদিও রাহাতের বাবা মা লাশকে তার ছেলে হিসেবে মানতে রাজি না। এরকম অবস্থায় তপুর অতীত নিয়ে ঘাটছে কেউ। যেভাবেই হোক ফাঁসাতে চায় তপুকে। অতীতের সম্পর্কে পুরপুরি অন্ধাকারে তপু। হঠাত ১৯ বছর পর অদিতির ফোন পায় তপু। এতদিন পরে অদিতির ফোন পাওয়াটাও কম আশ্চর্যজনক নয়। অতীত নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে তপু। গজারি বন খুঁজে পাওয়া যায় একটি লাশের কঙ্কাল। পরীক্ষা করে জানা গেল কঙ্কালটি বেঁচে থাকাকালীন সন্তান প্রসব করেছিল। এটিই কি তবে রাত্রি? কিন্তু রাত্রিরতো বিয়ে হয়নি। কারো সাথে গভীর সম্পর্ক ছিল বলেও জানা নেই তপুর। তাহলে.....?
আসলেই কি রাত্রি বেচে আছে? রাহাত শরীফ এতদিন গা ঢাকা দিয়ে ছিল কেন? রাহাতের লাশ জেনেও তার পরিবার অস্বীকার করছে কেন? অদিতিই কেন এত দিন পর তপুকে খুঁজে বের করলো? সত্যিই কি তপুর মা ভারতে চলে গিয়েছিলেন? মোশারফই কি খুন করেছিল সবাইকে? তাহলে রাহাত বাঁচল কিভাবে? মোশারফ যেহেতু জেলে, এতদিন পর তাহলে রাহাতকে কে মারল? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে পড়তে হবে বইটি।
এই রহস্য উপন্যাসটি হারলান কোবেনের 'দ্য উডস' উপন্যাসের অবলম্বনে লেখা। বইয়ের ভাষায় দারুণ খেল দেখিয়েছেন মারুফ হোসেন। এড্যাপশনের কাজটাও খুব ভালোভাবে করেছেন। বাংলাদেশের সাথে খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। খুনে অরণ্য প্র পাকশনীর প্রথম বা দ্বিতীয় বই। বাধাই দারুণ হয়েছে। তবে প্রচ্ছদটা নিয়ে আমার একটু আফসোস। মূল্যও মোটামুটি ঠিক আছে।
• হারলান কোবেনের 'দ্য উডস' অবলম্বনে লেখা উপন্যাস 'খুনে অরণ্য'। ভিনদেশী উপন্যাসের অ্যাডাপ্টেশন হলেও লেখক মারুফ হাসান এর গল্প সাজিয়েছেন সম্পূর্ণ দেশীয় প্রেক্ষাপটে। দ্য উডস এখনো পড়া হয়নি আমার, তাই মূল বই থেকে কতোটা অ্যাডাপ্ট করেছেন, সে তুলনা আমি করতে পারছি না। তবে এটুকু বলা যায় আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বেশ ভালভাবেই গল্পটা সাজাতে পেরেছেন তিনি। অনুবাদ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে লেখা থেকে কৃত্রিমতা দূর করা। আর অনুপ্রাণিত লেখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জটা থাকে কাহিনী থেকে বিদেশী ভাবমূর্তি ছাটাই করে, দেশীয় ভাবমূর্তি যুক্ত করা। এই কাজটায় লেখক পাশ।
• মূল প্লট বিবেচনা করলে খুব একটা রহস্যময় হয়তো মনে হবে না, তবে পড়া শুরু করলেই দেখা যাবে গল্পের ভাঁজে ভাঁজে পাঠকের আগ্রহ বাড়ছে। এখানে গল্পটা যেভাবে শুরু হয়েছে, তাতে করে রহস্য উন্মোচনের ধাপগুলো পাঠককে ধরে রাখতে সক্ষম। উপন্যাসের এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এমন যে, তপুর সামনে অতীতের ঘটনা নিয়ে বেশ কিছু নতুন পুরাতন প্রশ্ন। আইনজীবী তপুকে তখন একদিকে সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দেখা গেছে, অপরদিকে পরিস্থিতি সামলে একটা মামলার সুরাহা করতেও দেখা গেছে। এই দুই ক্ষেত্রের ভারসাম্যও ঠিকঠাকভাবেই রাখা হয়েছে উপন্যাসে, যা পাঠককে আর যাই হোক বিরক্ত করবে না।
• উপন্যাসে চরিত্রগুলোর কাউকেই একদম ঠিক কিংবা একদম ভুল দেখানো হয়নি। গল্প অনুযায়ী এখানে কেউই পারফেক্ট নয়। সবাই যার যার পরিস্থিতি আর নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সঠিক, বিষয়টা এমনভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে এখানে। একজন বাবা তার সন্তানকে বাঁচাতে যদি সামান্য আপোষ করে তাহলে ক্ষতি কী? একজন স্ত্রী তার স্বামীর সম্মান বাঁচাতে নাহয় একটা মিথ্যেই বললো? একজন মা তার সন্তানকে আগলে রাখতে নাহয় গোপন করলো সত্য? মূল চরিত্র তপুকেই ধয়ে নেয়া যাক। সে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে কৌশল খাটাতে চায়, কিন্তু নিরপরাধ একজনকে বাঁচাতে গিয়ে কৌশল খাটাতে দ্বিধায় জড়ায়। চরিত্রগুলোর এমন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এদেরকে কিছুটা হলেও বাস্তবিক করেছে।
এর জন্যে অবশ্য লেখকের লিখনশৈলীও অবদান রাখে। শব্দচয়ন ও সংলাপের ব্যবহার যথার্থ ছিলো। শুধুমাত্র তপু ও অদিতির প্রথম কথোপকথনে অনুভূতির আদান প্রদানে কেমন উত্থান-পতন আছে বলে মনে হলো। তাছাড়া, জামিলা চাচীর শুদ্ধ সংলাপও শুরুতে কেমন একটা লেগেছিলো, পরে বুঝতে পারলাম চরিত্রের বুদ্ধিমত্তা ও অনড় স্বভাব বুঝাতে এমন করা হয়েছে।
মারুফ হোসেনের লেখা এর আগে পড়া হয়নি। লেখকের অনুবাদের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশী উপন্যাসের দেশীয় রুপান্তরের এই চ্যালেঞ্জিং বিষয়টাকে সাধুবাদ জানাই। তাছাড়া, চমৎকার বাইন্ডিং ও প্রচ্ছদের জন্য প্রকাশনীও প্রশংসার যোগ্য। যদিও আমি কয়েকদিন সময় নিয়ে শেষ করেছি, তবে বইটা এক বসাতেই পড়া শেষ করা যাবে।
মারুফ হোসেনের অনুবাদ আগে পড়া হয়েছে। বেশ সুন্দর ঝরঝরে অনুবাদ করেন। উনার লেখনীশৈলী পরিচিত বলেই লেখকের মৌলিক উপন্যাস 'খুনে অরণ্য' কিনেছিলাম। অবশ্য এই উপন্যাসকে পুরোপুরি মৌলিকও বলা যাবে না। হারলান কোবেনের দ্য উডস উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে দেশীয় ধাঁচে 'খুনে অরণ্য' উপন্যাসটি লিখেছেন লেখক মারুফ। টানটান উত্তেজনায় চমৎকার সব টুইস্টে ভরপুর এই রহস্য উপন্যাসখানি। দারুন এক সময় কাটলো এই বইখানার সাথে।