মন্ত্রবলে কুমির হয়ে যাওয়া নদের চাঁদের উপাখ্যান কিংবা কালো মাথা বেনে বউয়ের দুঃখগাথা আজ কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে। পরশুরামের ভিটা সম্বন্ধে কেউ কেউ জানেন, কিন্তু জানেন কি ঢাকার মধ্যে এখনো দুটি গ্রাম রয়েছে? বাস্তবে কোনো অস্তিস্ত্ব না থাকার পরেও লৌকিক পীরদের মধ্যে অন্যতম পীরের কিংবদন্তীটি জানেন তো? আদিনাথের মহেশখালীতে আবির্ভাবের কাহিনি কিংবদন্তী থেকে পৌরাণিক হয়ে ওঠার ঘটনা কিংবা বনবিবিকে ঘিরে গড়ে ওঠা কিংবদন্তী যে-কোনো কিংবদন্তীকে হার মানায়। অবাক করে দক্ষিণ রায়ের বাঘ্রদেবতা হয়ে ওঠার কাহিনি। গ্রিকদের পোসাইডনের মতো রয়েছে আমাদেরও কিংবদন্তী। মসজিদের অলৌকিক কাহিনিগুলো যেন ধর্মীয় ভক্তিকে দৃঢ় করে। পিছইল্যা খালের বুড়ি পেত্নী থেকে সাবধানে থাকতে তার কিংবদন্তী না জেনে উপায় নেই। ঢোল পিটিয়ে দিঘিতে জল আনার কাহিনিটি একইসাথে অদ্ভুত ও হৃদয়বিদারক। কিশোরগঞ্জে লুকিয়ে থাকা ছয়টি কিংবদন্তী আর জমিদারদের নিয়ে কিংবদন্তীগুলো দারুণ আগ্রহোদ্দীপক। লাঙ্গলবন্দের কিংবদন্তী ছড়িয়ে গেছে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি থেকে আমাদের ব্রহ্মপুত্র নদে। এই সবগুলো কিংবদন্তী এক মলাটে নিয়ে আসা হয়েছে বাংলা কিংবদন্তীর দ্বিতীয় কিস্তিতে। স্বাগতম আমাদের লৌকিক কিংবদন্তীর জগতে।
বহুকাল ধরে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত কথা,গাঁথা,কাহিনি, গল্প,জনশ্রুতি প্রভৃতিই হলো কিংবদন্তী। আরেকটু ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চাইলে বলতে হবে : কিংবদন্তী হলো সত্য, মিথ্যা ও সম্ভাবনা- এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা লোককাহিনি বা গল্প যার সাথে বিশ্বাসের বিষয়টি জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে এবং যে কাহিনিগুলো মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধারণ করে চলেছে নিজেদের ভেতর। অর্থাৎ, কেবল মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনি হলেই যে কিংবদন্তী হবে তা কিন্তু নয়, এর সাথে সত্য বলে বিশ্বাস করারও একটা সম্পর্ক থাকতে হবে।
ছোটবেলা থেকে অনেক কিংবদন্তি শুনেছি। আমাদের সিলেটেই তো আছে বিখ্যাত হজরত শাহজালাল (রঃ) আর গৌড় গোবিন্দ নিয়ে অনেক কিংবদন্তি যা যুগ যুগ ধরে সবার মুখে মুখে ঘুরছে। তখন এগুলো শুনে হা হয়ে যেতাম। দারুণ লাগতো শুনে। বইটা আস্তে ধীরে প্রতিটা গল্প উপভোগ করে শেষ করলাম।
এরকম একটা সংকলনের জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাদের। দারুণ লেগেছে আমার। মনে হচ্ছিলো কোনো ভ্রমণে বের হয়েছি কিংবদন্তীর গল্প শুনতে বাংলাদেশে। দেশের আনাচে কানাচে তে যে কত রকমের চমকপ্রদ গল্প আছে কিংবদন্তীর তা এই বই পড়ে বুঝতে পারলাম।
নদের চাঁদ উপাখ্যান পড়েই বইয়ে দারুণ আগ্রহ জন্মে যায় সামনে আগাবার জন্য। একে একে বেনে বউর করুণ পরিণতি, পরশুরামের ভিটা, ঢাকার মাঝের বিভিন্ন জায়গায়া কাহিনী, নিজের শহর সিলেটের কিংবদন্তি, সুন্দর বনের বনবিবি থেকে গাজী, কালু ও চম্পাবতীর কিচ্ছা সহ আরো অনেক গল্প পড়লাম।
কয়েকটা জানা ছিলো আগেই কিন্তু একই গল্পের মাঝে কত ভাবে যে বর্ণিত হয়েছে তা পড়ে নতুন করে জানলাম সেগুলো। বাংলার বিভিন্ন জায়গার কিংবদন্তি সম্পর্কে জানতে হলে তুলে নিতে পারেন বইটা। আশা করি ভালো লাগবে।
এক যে ছিল নাস্তিক পন্ডিত। সে কেমন করে তার বিশ্বাস পরিবর্তন করলেন এরপর আবার বৌদ্ধ শ্রমণের জীবন ধারন করলেন সে এক অদ্ভুত কাহিনি। সময় পেরিয়ে সেই নাকি অতীশ দীপঙ্কর নামে পরিচিত হলেন!
ঈশা খাঁ প্রেমে পড়েছিলেন স্বর্ণময়ীর। তাদের বিবাহের সময় এমন কোন স্বপ্ন দেখেছিলেন ঈশা খাঁ যার জন্য কোশাকান্দির কিংবদন্তীর সৃষ্টি?
ধীরাজ আর মাথিনের সেই করুণ প্রেমগাঁথা জানে না কে? ধীরাজের প্রেমে রাখাইন জমিদার কন্যা মাথিন যে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিল সে করুন কাহিনি আজও মানুষকে আবেগঘন করে দেয়। ধীরাজ আর মাথিনের প্রেম কথা বয়ে কালের সাক্ষী হয়ে আছে সেই কূপ।
চম্পক নগরীর শিব ভক্ত চাঁদ সওদাগরের কথা অজানা নেই কারো। মনসাকে পূজো দিবেনা বলে একে একে ছয় পুত্রকে হারানোর পরেও দমে যাননি। কালের ক্রমে আর দেবলোকের লীলায় সপ্তম পুত্র হয়ে জন্ম নিলো লখিন্দর আর আরেক বণিকের ঘরে বেহুলা। তারা যে স্বর্গের নর্তকী যুগল। মর্তে তাদের লক্ষ্য মনসাকে দেবীর সম্মান পাইয়ে দেয়া। এরপর বেহুলা লখিন্দরের বাসরে নাগের ছোবল, প্রাণহীন পতিকে নিয়ে সতীসাধ্বী বেহুলার দেবলোক গমনের কাহিনি এক অদ্ভুত কিংবদন্তী বটে!
আচ্ছা বলুন তো, ঢাকার নাম ঢাকা কেন? স্বপ্নে দেবীর আদেশ পেয়ে জঙ্গলের মধ্যে মন্দির স্থাপন করলেন বল্লাল সেন। নাম দিলেন ঢাকেশ্বরী। সেই থেকেই কি ঢাকার নাম ঢাকা হলো?
তবে বলুন তো, গেন্ডারিয়ার নাম কেন গেন্ডারিয়া হলো? ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার নামেই কি এদেশের ইন্দিরা রোডের নামকরণ? একটা সময় তাই জানতাম। তবে একসময় জানলাম দ্বিজদাস বাবুর বড়ো কন্যা ইন্দিরার নামেই ধীরে ধীরে এলাকাটির নামকরণ হয়ে যায়। জানেন তো, মি. ককরেল সাহেবের নাম থেকেই কাকরাইলের নামকর হয়েছে?
হজরত বদর আউলিয়ার কথা কে জানেন? তার অলৌকিক চাটি থেকেই নামকরণ হয়েছে চাটিগ্রাম তথা চট্টগ্রামের। পাহাড়ে মধ্যে চাটির আলো ছড়িয়ে জিন পরীদের তাড়ানোর সে কী এক অবাক করা ঘটনা! আজও চাটগাঁ বাসীর মুখে মুখে শোনা যায়।
বগালেকের ইতিহাস আর রহস্য যেন কেমন এক বিস্ময়। এত উঁচুতে কী করে এমন মিঠাপানির আর একেক সময় রং বদলে যাওয়া পানির উদ্ভব তাই নিয়ে আছে গল্প। বগা লেকের সেই ড্রাগনের কারণেই এসব নাকি কে বা বলতে পারে!
গভীর রাতে যদি কামান দাগর শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায় তো কেমনটা লাগে? হেনরি সাহেবেরও একই দশা। পর্তুগিজ সেনাদের আক্র মণ নাকি! বরিশালে ডিউটির আগের দিনই এমন হলে কার আরাম লাগে? দেখা গেলো রাতে কয়দিন পরপরই এমন কামান দাগার শব্দ। নতুন নতুন সবাই একটু কাঁচুমাচু হলেও ধীরে ধীরে মানিয়ে নিলো ❛গা নস অব বরিশাল❜ এর সাথে। এমন শব্দ নাকি শুধু বরিশাল নয় আরো অনেক জায়গাতেই শোনা গেছে। এ এক রহস্যই।
❛গরিবের বন্ধু ধনীদের জম, রবিনহুড❜
রবিনহুডের দেশী ভার্সন কি বলতে পারি মহর খাঁ কে? ডাকাত মহরও যে গরিবদের সেবা সাহায্য করতেন আর ধনীদের থেকে লুট করতেন।
বেহুলা-লখিন্দর, শিরি-ফরহাদ এদের প্রেমের ঘটনা তো লোকে জানে। তবে কবি চন্দ্রাবতীর প্রেমকথা কে জানে? যার কাব্যের রসে দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারাম, মলুয়া পদ্মপুরাণের মতো কাব্যোগীতি পেয়েছে মানুষ। তার আর জয়নন্দের পরিণয় আর জয়নন্দের দ্বিচারিতার গপ্পো তো কষ্ট দেয়ার মতো। রাজা থেকে সন্ন্যাসী হওয়া ভাওয়াল গড়ের রাজা রমেন্দ্র জীবনের অলৌকিক খেলা শেষ করে কি ফিরে এসেছিল আপন ভূমিতে? ইতিহাস আর প্রমাণ তো তাই বলে।
রাণী রাসমণির কাহিনি তো লোকমুখে প্রচারিত। তিনি আসলে কেমন ছিলেন? প্রতাপময়ী নাকি অত্যাচারী?
......
স্ত্রীর কথায় মায়ের একমাত্র সন্তান নদের চাঁদ কুমিরের রূপ ধারণ করেছিল। জানেন সে কথা? কিন্তু কীভাবে সে নিজেকে কুমিরে পরিণত করতে পারলো কিন্তু আগের বেশে আর ফিরতে পারলে না এই আখ্যান শুনলে নিশ্চয়ই বেদনা বিধুর হয়ে যাবেন আপনি।
শাশুড়ি কিংবা কথিত আছে স্বামীর অত্যা চারে থেকেও সব মুখবুজে সহ্য করছিল এক অপরুপা সুন্দরী বধূ। তাকে নাকি ভালোমতো খেতেই দিত না। সেই ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে বণিকের বউ জঙ্গলের ফল খেতে খেতে আর্জি জানালো তাকে যেন পাখি করে দেয়া হয়। সেই থেকেই নাকি কালো মাথা বেনে বউ পাখিটির প্রচলন। অপূর্ব সুন্দর কন্ঠের গান দিয়ে পাখিটি কিংবদন্তী হয়ে আছে। যাকে অনেকে ইষ্টিকুটুম, বউ কথা কও বলেও থাকেন।
পরশুরামের কাঠের কুঠারের কথা তো জানি নাকি? মাতৃ হ ত্যার পাপ নিয়ে যে কতো পরীক্ষা দিলো। তার ভিটের খোঁজ কি পাওয়া গেছে? আবার পাপমোচন করতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্রের দেখা পায় সে। এত অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন নদীকে লোকালয়ে পৌঁছে দিতে সে লাঙ্গল দিয়ে কর্ষণ শুরু করেছিল। এরপর সৃষ্টি হলো লাঙ্গলবন্ধের আর দুইটি নদীর অপরুপ গল্প।
এলাকার নামকরণের ইতিহাস গুলো বেশ মজার। এইতো মগেরা যেখানে থাকতো সেই থেকে মগবাজার, চার ফকিরের পুল থেকে ফকিরাপুল, ঢাকার দুটি গ্রাম হলো খিলগাঁও আর তেজগাঁও, নীলচাষ হতো যে ক্ষেতে সেখান থেকেই নীলক্ষেত, জিন্দবায়োর গালি থেকে জিন্দাবাহার, বেঙ্গলাবাজার থেকেই যে আসলো বাংলাবাজার, চাঁদ খাঁর পুল থেকেই চানখাঁরপুল। আবার আছে অপভ্রংশ। আ��কের জিগাতলা যে ঝিগাটোলার অপভ্রংশ জানতেন কি?
পীর নিয়ে তো গপ্পের শেষ নেই। পীর মাদার, মাদানী, পীর বলুন দেওয়ান সহ কত পীরের যে অদ্ভুত সব কিংবদন্তী আছে! আদিনাথের মন্দির আর তা মহেশখালীতে অবস্থান নিয়ে লোককথা খুবই দারুণ। শিবের আরেক নাম আদিনাথ, আবার শিবকে মহিষাসুর কিংবা মহেশ নামেও ডাকা হয়! কানেকশন সমঝে?
এলাকার নামের যেমন ইতিহাস আছে তেমনই ইতিহাস আছে জেলার নামেও। ঢাকা যে ঢাকেশ্বরী থেকে এসেছে বা ঢাকা কোনো কিছু থেকে এ নিয়ে অনেক তর্ক মতভেদ আছে। কালক্রমে এই ইতিহাস তো অজানাই রয়ে গেলো।
ব্রাহ্মবাড়িয়া নিয়েও আছে মজার কিংবদন্তী। ❛ব্রাহ্মণ বেরিয়ে যাও❜ থেকে নাকি এসেছে এই নাম। আছে অন্য মতও। ফিরোজপুর থেকে নাকি এসেছে পিরোজপুর, আবার চাঁদ রায় কিংবা চাঁদ ফকিরের নাম থেকে এসেছে চাঁদপুর। আসল ইতিহাস কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। রয়ে গেছে কিংবদন্তী।
গাজী, কালু আর চম্পাবতীর আখ্যান আর অদ্ভুত। গাজী, কালু ইতিহাসে কীভাবে এসেছে তার থেকেও অদ্ভুত হলো লোককোথায় তাদের অবস্থান। তাদের সাথে আরেকটি নাম জড়িত সে হলো দক্ষিণ রায়। কেউ বলে গাজীর সাথে দক্ষিণ রায়ের বিবাদে কথা, কেউ বলে গাজীর অনুসারী দক্ষিণ রায়, আবার দক্ষিণ যায় নিজেই একজন প্রথম সারির লৌকিক দেবতা। যে কিনা বাঘের বেশে থাকে। সুন্দরবনের অধিবাসীদের কাছে যিনি পূজিত।
দক্ষিণ রায়ের কথা আসলেই সামনে আছে দ্য ওমেন, দ্য মিথ বনবিবির কথা। লৌকিক কথায় বনবিবি একজন উঁচু মাপের দেবী। তার ঘটনাও বেশ চমকপ্রদ। হিন্দুরা তাকে দেবী বললেও বনের অধিবাসী অনেক মুসলিমের কাছে নাকি তিনি পীরানি নামে পরিচিত!
হিন্দুদের মাঝে দেব-দেবী নিয়ে হাজারো মিথ থাকলেও মুসলিমদের কাছে কিংবদন্তী অন্যভাবে ধরা দেয়। সেগুলো আসে পীর, ফকির, মাজার আর মসজিদ দিয়ে। এই জনপদে মুসলিম ধর্ম প্রচারের পথিকৃৎ হজরত শাহজালাল (রাঃ) এর কথা প্রসিদ্ধ। তিনি কীভাবে এলেন, এরপর কীভাবে ইতিহাস এবং কিংবদন্তীতে জায়গা করে নিলেন এসব ঘটনা বেশ দারুণ। সিলেটের বিস্তৃতিও তেমন মজাদার।
মসজিদ নিয়ে আছে নানা কিংবদন্তী। কেউ বলে কিছু কিছু মসজিদ নাকি আউট অফ নোহোয়ার এক রাতেই উঠে এসেছে। কেউ বলে কিছু মসজিদের আছে অলৌকিক শক্তি। তারা নাকি মানত পূরণ করে দেয়! আবার কেউ বলে কোনো মসজিদের ভেতর কেউ ভয়ে ঢুকে না কারণ সেখানে সাদা বসন পরিহিত অনেককে নামাজরত দেখা যায়। এমনকি কিছু মসজিদ হলো পাতরাইল মসজিদ, সাতরা মসজিদ, খাঁ মসজিদ, নিদাড়িয়া মসজিদ।
রবীন্দ্রনাথের ❛বৌ ঠাকুরাণীর হাট❜ তো পড়েছেন। এই নামেই আছে করুণ এক কিংবদন্তী। আচ্ছা কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ময়দানের নাম যে সোয়া লাখিয়ার অপভ্রংশ জানেন? তেমনি আছে এই অঞ্চলের অনেক কিংবদন্তী। কিংবদন্তীর আরেকটি আখড়া হলো জমিদার বাড়ি গুলো। তাদের আজকের ভগ্নমান দশা এই ধ্বংসস্তূপ কি এককালে তাদের অ ত্যাচার, অহমিকা আর স্বেচ্ছাচারিতার ফলকেই বহন করে? লকমা জমিদার বাড়ি, কাইতলা জমিদার বাড়ি, শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ি, বামনডাঙা জমিদার বাড়ি সহ অনেক জমিদার বাড়ির ইতিহাসই এমন করুণ। প্রজাদের অত্যা চারের শিরোমণি ছিল সিংহভাগ জমিদার। তাদের ঘিরে আছে অদ্ভুত সব কিংবদন্তী। আছে তাদের পাপের ঘড়া পূর্ণ হওয়ার গপ্পো।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝বাংলা কিংবদন্তী❞ বইটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা কিংবদন্তীগুলো সংকলন করেছেন আসাদুজ্জামান জুয়েল। ❝বাংলা কিংবদন্তী- দ্বিতীয় কিস্তি❞ সংকলন করেছেন আসাদুজ্জামান জুয়েল এবং রুদ্র কায়সার।
পুরাণ, উপকথা, লোককথা কিংবা কিংবদন্তী এগুলো একটি দেশের ইতিহাসের আরেকটি অংশ। ইতিহাস যেমন সত্য প্রকাশ করে কিংবদন্তীর কাজ একটু আলাদা। কিংবদন্তী সত্য আর কল্পনার এক মধুর মিশ্রণ। বলা যায় ইতিহাস যেখানে থেমে যায় সেখানে কিংবদন্তী ডানা মেলে। মানুষের মুখে প্রচলিত কথা, গুরুজনের বুলি আর অভিজ্ঞতা মিলে কিংবদন্তী তৈরি হয়। যা কেউ কাহিনিরূপেই শুনে কেউবা করে বিশ্বাস।
এই বইটিতে সংকলক ঢাকা সহ আশেপাশের অনেকগুলো অঞ্চলের লোকমুখে প্রচলিত কিসসা, কাহিনিকে সংগ্রহ করেছেন। কিছু একদম শোনা কাহিনিকে তুলে ধরেছেন, কিছু শোনা এবং আপন লেখার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
সংক্ষেপিত আকারে অনেকগুলো ঘটনা উঠে এসেছে। আমার বেশ লেগেছে পড়তে। কিছু ঘটনা পড়তে গিয়ে একটু অবাকই লেগেছে। জানা ঘটনার সাথে পড়া ঘটনার আকাশ পাতাল ফারাক দেখে। এরমধ্যে অন্যতম রাণী রাসমণির ঘটনা। এটা আমার জানা হয়েছে জীবন মানে জি বাংলায় দেখা নাটকের মাধ্যমে। সেখানে রাসমণি বেশ শক্ত এবং পজিটিভ একজন চরিত্র। মূল চরিত্র ছিলেন। সেখানে তাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সেটার সাথে এই বইতে পড়া ঘটনা একেবারেই ১৮০° উল্টো।
লেখার ধরন ভালো। কিন্তু কিছু বাক্যের ক্ষেত্রে শব্দের প্রয়োগ কেমন যেন গুলিয়ে গিয়েছিল। পড়তে ভালো লাগছিল না। বাক্যগঠনের ভুলের কারণে হবে হয়তো কিংবা সম্পাদনার মেশিনে ঠিকমতো কাটছাঁট না হওয়ার কারণও হতে পারে।
.....
দ্বিতীয় বইটি প্রথম বই থেকে বিস্তারিত তবে গল্পের সংখ্যায় একটু কম। এই কিস্তিতে সংকলকদ্বয় চেষ্টা করেছেন কিংবদন্তীগুলোর ইতিহাস বা লোকমুখে ছড়ানো কথাগুলোকে আরো বিস্তারিতভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে।
এই অংশে আগের অংশের কিছু গল্প পুনরায় এসেছে। ঢাকার কিংবদন্তী, শাঁখারীবাজারের কিংবদন্তী এগুলো রিপিট ছিল। তবে কিছুটা বিস্তারিত ছিল। এই খন্ডে আসা অনেক কিংবদন্তী নিয়ে জানা ছিল। তবে আমার কাছে বেশি ভালো লেগেছে বনবিবির ঘটনা। পীরের কাহিনিগুলো, আর দেবতাদের বিশ্বাস এগুলো এগিয়েছে ধর্মকে পুঁজি করেই। তবুও কিছু কিছু বেশ অবাক করা ছিল। বিশেষ করে মা ফাতিমা ও ইমাম হাসান, হুসাইনের সাথে জড়িত কিংবদন্তী অবিশ্বাস্য বটেই। তবে কিংবদন্তী তো কিংবদন্তীই!
দুটো বইতে প্রায় ৪৫-৪৬ টি কিংবদন্তী স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশের অনেকগুলো জেলা, অঞ্চলের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লোককথাগুলোকে এক মলাটে দেয়ার কঠিন কাজটি সংকলকদ্বয় সম্পন্ন করেছেন। কিছু কাহিনি বেশ অতিরঞ্জিত লাগছিল। যদিও নির্দিষ্ট বিশ্বাসের সীমায় থেকে রঞ্জনের মাত্রা কমবেশি মনে হয়েছে। তবে এই কাহিনিগুলো ইতিহাস ছাপিয়ে বা কখনো ইতিহাসকে ঢেকে দিয়েছে। আজ এত বছর বাদে এসে সেই আদ্দিকালের সত্য খুঁজে বের করা কঠিন। তাই লোকমুখে শুনে আসা বুলিই ভরসা। বাংলা পুরাণ সমৃদ্ধ। তবে রক্ষণাবেক্ষণের যথেষ্ঠ লোকবলের অভাবে হয়তো এই কথাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। মিছে যাচ্ছে কল্পনা। এরকম আরো বই আসা উচিত।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
প্রচ্ছদ প্রথম বইটির বেশি সুন্দর। আমার কাছে সম্পাদনার ঘাটতি মনে হয়েছে দুটো বইতেই। শব্দ পূর্ণ হয়নি। কোথাও যেন মনে হলো র ফাইলের লেখা এডিট না করেই মূল ফাইল ছেপে দিয়েছে। অন্য বাক্যের শব্দ আগের বাক্যে রয়ে গেছিল যেটা আগের বাক্যের সাথে মানানসই ছিল না। তেমনি করে যেখানে হবে সেখানে কর দেয়া, আবার যেখানে না দিয়ে বাক্যের শেষ সেখানে হ্যাঁ বোধক হয়ে গেছে। এর উল্টোটাও হয়েছে অনেকক্ষেত্রে। এগুলোতে নজর দেয়া জরুরি ছিল।
❛ঢাক বাজে টাগডুম টাগডুম ঢোলসমুদ্রের তলে; কিংবদন্তী লুকিয়ে আছে সবাই তো তা বলে।❜
সত্য, মিথ্যা এবং সম্ভাবনা- এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা লোককাহিনীই হলো কিংবদন্তী। এর সাথে বিশ্বাসের ব্যাপারটা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কিংবদন্তীর গল্পগুলো এক যুগ থেকে আরেক যুগ পর্যন্ত মুখে মুখে প্রচারিত হয়।
কিংবদন্তী কীভাবে সৃষ্টি হয়? ধর্মীয় কিছু বিশ্বাস, ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে কিছু মাল মসলার সংমিশ্রণ কিংবা নিছক কল্পনাকে কেন্দ্র করে কিংবদন্তী সৃষ্টি হয়৷ বাংলা কিংবদন্তীগুলোর অধিকাংশই ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গডে উঠেছে। এছাড়াও বেশ কিছু কিংবদন্তী আছে, যা ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু কল্পনার রং ছড়াতে ছড়াতে এখন আর হয়তো সেইসব কিংবদন্তীতে ইতিহাসের মূল কাহিনির ছিটেফোঁটাও বাকি নেই।
বাংলা কিংবদন্তী প্রথম কিস্তিতে এমনই বেশ কিছু কিংবদন্তী তুলে আনা হয়েছিল, যা মানুষের মুখে মুখেই প্রচলিত ছিলো। কোনো বইয়ে আলাদা করে লিপিবদ্ধ করা ছিলো না। দ্বিতীয় কিস্তিতেও সেই ধরনের গল্পগুলোই উঠে এসেছে।
বাংলা কিংবদন্তী দ্বিতীয় কিস্তি বইটি আপনাকে কখনো নিয়ে যাবে ফরিদপুরের নদের চাঁদের কাছে। যে কি না নিজেই মন্ত্র পড়ে কুমির হয়ে গিয়েছলো, আর কখনো মনুষ্যরূপে ফিরতে পারেনি। কখনো নিয়ে যাবে পয়মন্ত, লক্ষ্মীমন্ত কঙ্কা তথা বেনে বৌ কিংবা বৌ কথা কও পাখিটির মর্মান্তিক পূর্ব ইতিহাসে।
গল্পে গল্পে আপনি চলে যাবেন বগুড়ায়, রাজা পশুররামের ভিটায় ঘটে যাওয়া দরবেশ শাহ সুলতান বলখির সাথে পশুররামের যুদ্ধ ময়দানে। কিংবা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার নামকরণের কাহিনী এবং ঢাকার বিভিন্ন জায়গার নামের পিছনের কিংবদন্তীগুলো কী ছিল সেই গল্পে যাবেন ডুবে৷
পীর মাদালির পাঁচালি শুনতে শুনতে চলে যাবেন মহেশখালীতে। আদিনাথ তথা মহাদেব শিবের মন্দিরটি কীভাবে প্রতিষ্ঠা হলো, সেই গল্পটা জানা হয়ে যাবে।
এসব ছাড়াও গাজি, কালু ও চম্পাবতীর কিচ্ছা, জঙ্গলের রক্ষাকর্ত্রী পীরানি বনবিবি, খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক, রাজা দক্ষিণ রায়, বৌ ঠাকুরানীর ঘাট, বলু পীর, পিছাইল্যা খালের পেত্নী, জমিদার বাড়ি, লাঙ্গবন্দ ইত্যাদি কিংবদন্তীর গল্পগুলো আপনাকে পৌঁছে দেবে ইতিহাসের পরতে পরতে
পাঠ প্রতিক্রিয়া
ইতিহাসের সাথে সাথে যেকোনো কিংবদন্তীই আমার খুব আগ্রহ জাগায়৷ বিভিন্ন জেলায় বেড়াতে গেলে আমি সেই জেলার কিংবদন্তীগুলো জানার চেষ্টা করি। সেইসব মৌখিক লোককথা যখন দুই মলাটের মাঝে সাজানো গোছানো অবস্থায় পাওয়া যায়, তখন আমার মতো পাঠকের খুশির অন্ত থাকে না। অত্যন্ত খুশিমনেই প্রথম কিস্তির মতো বাংলা কিংবদন্তীর দ্বিতীয় কিস্তি হাতে তুলে নিই আমি।
প্রথম কিস্তিতে গল্পগুলো পড়ার সময় মনে হয়েছিল খুব তাড়াহুড়ো করে যেন শেষ করা হয়েছে। সেই তুলনায় দ্বিতীয় কিস্তিতে কাহিনিগুলো আরও অনেক পরিণত এবং গোছানো। সাধারণ গল্পের সাথে কিংবদন্তীর পার্থক্য হলো, একই গল্প নিয়ে ভিন্ন অনেক মতামত থাকে। এই বইয়ে প্রায় সবগুলো গল্পেই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য গল্পটা শোনানো হয়েছে বিস্তারিতভাবে, পরে অন্যান্য জনশ্রুতি কিংবা মতভেদগুলোও সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এই থেকে সংশ্লিষ্ট কিংবদন্তীগুলো সম্পর্কে মানুষের সব ধরনের ভাবনা পরিষ্কার ভাবে বোঝা যায়।
সবমিলিয়ে ইতিহাস, মিথ, লোককাহিনীর প্রতি আগ্রহী যেকোনো পাঠকের কাছে ভালো লাগবে বাংলা কিংবদন্তীর এই দ্বিতীয় কিস্তিটি।
লেখক পরিচিতি
রুদ্র কায়সার বেশ কয়েকটি গল্প ও কবিতা সংকলনে মৌলিক গল্প ও কবিতা প্রকাশ পাবার পর আগাথা ক্রিস্টির “মার্ডার ইন মেসোপটেমিয়া” উপন্যাসটির মাধ্যমে অনুবাদে সাহিত্যে যাত্রা শুরু করেন রুদ্র কায়সার। ভূমিপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত অনুবাদ গল্প সংকলন “থ্রিলার : স্টোরিজ টু কিপ আপ অল নাইট” বইটিতে “ডিসফিগার্ড” নামে তার অনূদিত একটি গল্প। তার অনূদিত অন্যান্য বইগুলো হলো “দ্য ম্যাক্সওয়েল ইক্যুয়েশনস”, “রাম : সায়ন অব ইক্ষাকু”, “সীতা : ওয়ারিয়র অব মিথিলা”, “রিচ ড্যাড’স ক্যাশফ্লো কোয়াড্র্যান্ট”। এছাড়া আরো অনুবাদ করেছেন মিশাইলম্যান হিসাবে খ্যাত বিজ্ঞানী ও ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত এপিজে আবদুল কালাম’র দু’টি জীবনীগ্রন্থ—“মাই লাইফ : অ্যান ইলাস্ট্রেটেড অটোবায়োগ্রাফি” ও “মাই জার্নি : ট্রান্সফর্মিং ড্রিমস ইনটু অ্যাকশন”।। এছাড়া প্রকাশের অপেক্ষা আছে তার অনূদিত আরো কিছু বই : “গসপেল অব লোকি”, “টেস্টামেন্ট অব লোকি”, “ক্লিওপেট্রা : ডটার অব নিল”, “অ্যা হাফ বেকড লাভ স্টোরি”, “রাবণ : এনিমি অব আর্যাবর্ত” এবং “ধর্মযোদ্ধা কল্কী : অবতার অব বিষ্ণু”।
আসাদুজ্জামান জুয়েল বেড়ে উঠেছেন শান্ত-নিরিবিলি দিনাজপুর শহরে। বর্তমানে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতক পড়ার পাশাপাশি যুক্ত আছেন ব্যবসায়।ছোটোবেলা থেকে বইয়ের সাথে সখ্য। স্বপ্ন দেখেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার বানিয়ে যাবার। মূলত, ছোটোদের জন্য লিখতে পছন্দ করেন। পাশাপাশি পছন্দ করেন ভৌতিক গল্প লিখতে। “বাংলা কিংবদন্তী” লেখকের প্রথম একক বই।
★বইটি যেভাবে সংগ্রহ করতে পারবেন :
Bibidh - বিবিধ, Book Street, rokomari.com, www.boibazar.comwww.rokomari.com, BoiBazar, Book Mark Universal Book Shop সহ দেশের সব অনলাইন শপে পাওয়া যাবে।
এছাড়াও, রাজশাহীতে "নিউজ হোম" লাইব্রেরি, দিনাজপুরে 'গ্রিন লাইব্রেরি", চট্টগ্রামে "চট্টগ্রাম বাতিঘর (Baatighar/ বাতিঘর চট্টগ্রাম)" থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন।
বাংলাবাজার ভূমিপ্রকাশের বাংলাবাজার শো-রুম থেকেও সংগ্রহ করা যাবে। ঠিকানা: ভূমিপ্রকাশ ৩৮ বাংলাবাজার ২য় তলা (সিঁড়ি দিয়ে উঠে হাতের বামে) ফেইথ প্রিন্টার্সের পাশে।
কিংবদন্তির অনেকগুলো গল্পকে এক বইয়ের আওতায় নিয়ে এসেছে। অনেক বিস্তারিত গল্প বলেছেন লেখকদ্বয়। একই গল্পের বৈচিত্র্যতাও তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি কিছু গল্পের সত্যতা যেমন খোঁজার চেষ্টা করেছেন, তেমনই কিছু গল্প পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছেন পাঠকদের কাছে।
দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব গল্প সংগ্রহ করে গ্রন্থ প্রকাশের বিষয়টা সত্যিই প্রশংসার দাবীদার। এছাড়াও, লেখকদ্বয়ের কষ্টগুলো যেন ফুটে উঠেছে প্রতিটা গল্পে। টুকিটাকি কিছু বানান ভুল ছাড়া তেমন কোন ভুলত্রুটিও চোখে পড়েনি। যদিও অনেক কিংবদন্তি পূর্ব থেকেই জানা তাও ভালো লেগেছে পড়তে।
তবে বইয়ের শেষে সম্ভবত টীকা দেওয়া যেতে পারতো, অথবা গল্প সংগ্রহের পেছনের ইতিহাসও জুড়ে দেওয়া যেতো। সবার কাছে ব্যাপারটা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে, তবে গল্প পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, এই গল্পটা আর কোন বইতে আছে? কিংবা লেখক এটা কার কাছ থেকে জেনেছে? এরকম আরো নানান প্রশ্ন উঁকি দিয়েছে।