এদেশের আম পাঠক ইতিহাস সম্পর্কে এমন পর্যায়ের জ্ঞান রাখেন যে তাদের যা খাওয়ানো হবে, তারা তাই খাবেন।
এমন একটা নেগেটিভ কথা দিয়ে রিভিউটা শুরু করার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু দারুণ আগ্রহ নিয়ে শুরু করার পর যখন দেখলাম লেখক যতখানি গর্জেছেন তার প্রায় কিছুই বইয়ে বর্ষায়নি, তখন পাঠক হিসেবে আর কিছু করার থাকে না।
প্রথমেই বলি 'কাসিদ' হলেন বার্তাবাহক। নবাবী আমলে যারা বার্তাবহন করে নিয়ে যেতেন, তাদের কাসিদ বলা হয়। লেখক তার বইয়েও একথা বলেছেন কিন্তু কাসিদ নিয়ে এই বইয়ে আসলে কিছুই নেই। সে হিসেবে এহেন নামকরণ কেন করলেন সে লেখকই জানেন। অবশ্য কোম্পানির চিঠি চালাচালি, সিরাজের পারিষদদের দালালিকে কাসিদগিরি বললে কিছু বলার নেই।
পলাশীর যুদ্ধ-কেন্দ্রিক উপন্যাস 'কাসিদ'। লেখক একে উপন্যাসই বলেছেন কিন্তু পড়তে গিয়ে একে উপন্যাস বলে কিছুতেই মনে হওয়ার উপায় নেই। উপন্যাসে বর্ণনা থাকে, তবে সে বর্ণনা ঘটনার বর্ণনা নয়। অবস্থার বর্ণনা, চরিত্রের চিন্তার বর্ণনা। এর মাঝে মাঝে ইতিহাসের নানা ঘটনার বর্ণনা অবশ্যই থাকবে কিন্তু কাসিদের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জুড়ে লেখক যা করেছেন তা ধারা বর্ণনা ব্যতীত কিছু নয়। এবং সে বর্ণনাও 'মনোটনাস'।
নবাবী আমল বিষয়ে উপন্যাসে লেখকের বর্ণনায় ইংরেজি শব্দ থাকতে পারে, কিন্তু এই 'উপন্যাসে' ইংরেজি শব্দের ব্যবহার রীতিমত দৃষ্টিকটু। নানা জায়গায় লেখক এমন সব শব্দ ব্যবহার করেছেন যা খুব সহজেই বাংলা শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। সম্ভবত তাড়াহুড়োর কারনে লেখক সে সব শব্দ খুঁজতে যাননি।
এ ছাড়াও জয়দীপ দে 'লেখেন' না, তিনি 'লিখেন' এবং তার নবাবী আমলের চরিত্ররা কোন রকম ছাড় 'দেবে' না বরং কড়া জবাব 'দিবে'। লিখক সাহেব 'আমীর ওমরা' শব্দের 'ওমরা'-কে 'ওমরাও' লিখেন। 'পেশকাশ' শব্দটি তার লেখায় 'প্যাসকাস' (ফুটবলার পুসকাস তার প্রিয় কিনা জানি না)। এরকম নানা শব্দের 'ব্যতিক্রম' ('ভুল' বললাম না) ব্যবহার রীতিমত বিরক্তি উদ্রেক করে।
লেখক বলেছেন 'ফ্যাক্ট'গুলো ঐতিহাসিক, 'ফ্যাক্টর'গুলো তার এবং তিনি ইতিহাসের সত্যকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। ভালো কথা! কিন্তু সত্যর কথা বলে তিনি ফিরে গেছেন সে কানকথায় যেখানে সিরাজের মা এবং ঘষেটির সঙ্গে হোসেন কুলীর প্রণয়ের কথা আছে। কাসিদে তিনি এনেছেন সেই গর্ভ বিদারণ, অন্ধকূপ হত্যার কথা। এগুলো আদতে কতখানি সত্য সে বিষয়ে 'লিখক' কোন ধারণা দেননি। ঔপন্যাসিকের সেটা হয়ত কাজ না কিন্তু যিনি বলেন তিনি সত্য দেখাবেন, তার ক্ষেত্রে আমি প্রশ্ন তুলবো।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কাজ করার একটা জোয়ার শুরু হয়েছে। আগেও বলেছি কাজটা কঠিন, কাজটা দায়িত্বের। স্রোতে ভাসতে গিয়ে লেখকের সে দায়িত্ব ভুলে গেলে সমস্যা। জয়দীপ অনেক পড়েছেন, জানি কিন্তু তার প্রকাশ সেই মান রাখতে পারেনি। 'ঐতিহ্য' নির্বাচিত 'বর্ষসেরা পাণ্ডুলিপি' 'চেহেল সেতুন' এবং 'কাসিদ' প্রায় একই দোষে দুষ্ট। 'চেহেল সেতুন' লেখক প্রথম বাহাদুর শাহ্ জাফর নামে এক সম্রাটের উল্লেখ করেছেন, আদতে ইতিহাসে প্রথম বাহাদুর শাহ্ জাফর বলে কেউ নেই।
স্রোতে ভাসার আগে একটা ভালো নৌকার বন্দোবস্ত করা উচিৎ। শুধু জয়দীপ বা মাহমুদ না, আরও যারাই এ বিষয়ে হাত দিয়েছে, দেবে, আমাদের সবারই নিজের কাজের জায়গায় শতভাগ সততা প্রয়োজন।
বইয়ের নাম কাসিদ কেন এটা খুঁজতে খুঁজতেই বই শেষ। ঐতিহাসিক রেফারেন্সগুলো কিছুটা এলোমেলো ভাবে দেয়ায় টানা পড়ে উঠতে না পারলে মাঝপথে হারিয়ে যাবার সুযোগ আছে। শেষমেশ এসে সেই তাড়াহুড়ো করে কাহিনি শেষ করবার চেষ্টা। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব করুণ পরিণতির কারণটাই ঠিক মতো ফুটে উঠলো না লেখায়। তবু লেখকের চেষ্টাকে শ্রদ্ধা জানাই।
This entire review has been hidden because of spoilers.
এক কথায় বলতে গেলে, বাংলার পতন এবং ইংরেজ শাসনের শুরু - ইতিহাসের এক অকাট্য দলিল জয়দীপ দে'র "কাসিদ"। যাদের নবাব সিরাজউদ্দৌলা আর পলাশীর যুদ্ধ নিয়ে একটু হলেও আগ্রহ আছে, তারা বইটি পড়লে আরো অনেক অনেক কিছু জানতে পারবেন।
বই: কাসিদ লেখক: জয়দীপ দে প্রকাশনা: দেশ পাবলিকেশনস রেটিং: ৪.০/৫.০
মার্চ মাসে করোনার ছায়া বাংলাদেশ মাড়ানোর পর এটি আমার পড়া প্রথম বই। হয়তো কিছুটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা। বইটি ইতিহাস ভিত্তিক বই। আমি খুব একটা ইতিহাসের পাঠক নই। শুধুমাত্র বিশ্বাসযোগ্য পাঠকের সুপারিশ থাকলে পড়া হয়। গত বইমেলাতে প্রকাশিত হয় বইটি। ইতিহাস তারা পছন্দ করেন তাদের তো ভালো লাগবেই, আমার মতো ইতিহাস বিমুখ পাঠকদেরও বইটি ভালো লাগবে।
বইয়ের পটভূমি নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও পূর্ববর্তী নবাব আলিবর্দী খানের ইতিহাস। লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ এই ধরনের একটি সময়কাল পছন্দ করার জন্য। আমরা অনেকেই নবাব সিরাজউদ্দৌলা এর একটি গড়পড়তা কাহিনী জানি। আমার ইতিহাস জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে আমিও গড়পড়তা কাহিনীই জানি। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আমরা পরাজিত। বলা হতো শেষ স্বাধীন নবাব। আসলেই কি শুধু মীর জাফর জড়িত? নাকি মীর জাফর শুধু একটি চরিত্র। পিছনে বিশ্বাসঘাতকতার মূল চরিত্র কিন্তু ভিন্ন।
লেখকের এই বই লেখার জন্যে তথ্য এর উপস্থাপন খুবই মানানসই ছিল। যুদ্ধে নবাবের হেরে যাবার সিনিয়র লুমিংটন ও জুনিয়র লুমিংটন আলাপচারিতা আমাকে বর্তমান বাংলাদেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। নবাব হেরেছে শুধুমাত্র জ্ঞানের আলোর অভাবের কারণে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নবাব থাকবে কি থাকবে না তা নির্ধারণ করে পুঁজির মালিকরা। দুর্নীতি দমনে নবাবের ব্যর্থতা অথবা ইচ্ছের অভাব বা ঐ পরিমাণ চিন্তাশক্তি না থাকা নিশ্চিত পরাজয় ডেকে আনে।
তবে বইটি এক বসায় পড়তে পারলে ভালো। কারণ লেখক কাহিনীর গভীরতার কারণে প্রচুর চরিত্র এনেছে যা বিরতি দিয়ে পড়লে মনে রাখা কষ্টকর। আমি লেখককে অনুরোধ করবো ব্রিটিশ শাসনে বাংলাদেশে ঘটে ঘটনা পঞ্জি নিয়ে যদি আর একটি বই লিখেন।
বইয়ের একটা জায়গায় রেফারেন্স হিসেবে বাংলাদেশ এর অর্থনীতিবিদ ড: অনুপম সেন এর কথা বলা হয়েছে। যদি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় এর উপাচার্য এর কথা বলে থাকেন তাহলে আমার মন হয় উনার উপাধি সমাজবিজ্ঞানী হবে। হয়তো এটি প্রিন্টিং এর ভুল। আমি উনাকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি বলে বলছি।
বইয়ের আর একটি খুব ভালো দিক ছিল শেষের ছবিঘর। তৎকালীন কিছু ছবি আসলেই উপভোগ করার মতো ছিল এবং শেষের দিকে কিছু শব্দের ব্যাখ্যা যা বইটি বুঝতে অনেক সাহায্য করেছে। #ধূসরকল্পনা
পলাশী যুদ্ধের প্রায় ২০ বছর আগের থেকে পলাশী যুদ্ধ অবধি হওয়া ঘটনাবলী নিয়ে লেখা একটা ঐতিহাসিক উপন্যাস। এখানে ফুটে উঠেছে তখনকার সমাজব্যবস্থা, ইংরেজদের ক্রমাগত উত্থান , বাংলা ( ও মুঘল ভারতের) ক্ষমতাসীন লোকজনদের মধ্যকার দুর্নীতি ও ইউরোপীয় বণিকদের সাথে তাদের ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তনশীল সম্পর্ক। গল্পে কোনো মুখ্য চরিত্র নেই, বরং একাধিক চরিত্রকে ঘিরে গল্পটি বলা । তাদের মধ্যে নবাব আলীবর্দী , সিরাজউদ্দৌলা , রবার্ট ক্লাইভ সহ তখনকার অনেক ক্ষমতাশালী দরবারী লোকজন আছে।
বইটার গদ্দশৈলি , আখ্যান , কাহিনী বলার প্রক্রিয়া , চরিত্র ও সূক্ষ রসবোধ সবকিছুই অনেক ভালো। এই বছরের বইমেলায় আমার কিনা সবচেয়ে ভালো বই।