বিপিনচন্দ্র পাল সম্পর্কে আমি তেমন কিছুই জানতাম না। এই বইয়েও তার প্রথম যৌবন পর্যন্ত আত্মকথাই কেবল আছে। এককালে সর্বভারতীয় রাজনীতি ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন, সেসব আন্দোলন এর সময়ের বর্ণনা অবশ্য এই বইয়ে নেই। বইয়ের আসল মূল্য তার সময়কাল এবং যে স্থানের বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তাতে। বিপিনচন্দ্র এই আত্মজীবনী লিখেছেন ১৯২৮ সালে তবে যে সময়ের কথা লিখেছেন তা পুরোটাই উনিশ শতকের ষাট আর সত্তরের দশকের। সেই সময়ের নিজের লেখা স্মৃতিচারণা খুব বেশি আমার চোখে পড়ে নি। ঠাকুর পরিবারের তিনজনের আত্মস্মৃতি বিভিন্ন সময়ে পড়েছি তার পটভূমি মূলত কলকাতা, পশ্চিমবাংলা বা বর্হিবঙ্গ। শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা স্মৃতিচারণাতেও কলকাতার কথাই বেশি আছে আর আছে তার ধর্মজীবনের কথা। নবীন চন্দ্র সেনের একটি আত্মজীবনী বোধহয় আছে যাতে পূর্ববঙ্গের অনেক তথ্য আছে, সেটি এখনও পড়া হয় নি। বিপিনচন্দ্র পালের জন্ম হবিগঞ্জে। বড় হয়েছেন বরিশাল, ফেঞ্চুগঞ্জ ও মূলত সিলেট শহরে। এসব জায়গার এত আগের কারো নিজের চোখে দেখা স্মৃতিচারণা কখনো পড়িনি। সেকালের সিলেট শহরে প্রায় দেড়শ বছর আগে বিপিনচন্দ্রের শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল। প্ল্যান্টার্সরা তখন চাবাগানগুলো কেবল গড়ে তুলছিলেন। উত্তর দিক থেকে মাঝে মাঝে শহরে চলে আসতো বাঘ, শহরতলীর জঙ্গলে ধরা পড়তো বুনো শুয়োর। আর সাপখোপ ছিল প্রচুর। শহরে ছিল অসংখ্য টিলা, হায় তার অনেকগুলোই এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধু সিলেট কেন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জেও তখন ছিলনা রেল যোগাযোগ। গোয়ালন্দ পর্যন্ত পৌছতে হতো জলপথেই , তাতে লেগে যেত দিন পনের। হিন্দু সমাজ তখনও জাতপাত আর রক্ষণশীলতার গোঁড়ামীতে চরমভাবে আচ্ছন্ন। ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজ প্রবল প্রতাপে তার জয়পতাকা উড়িয়ে যাচ্ছে আর শিক্ষিত হিন্দু সমাজের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। বিপিনচন্দ্র পালের বাবা ছিলেন এককালে মুন্সেফ, তারপরে ওকালতীকে তিনি পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। এমনকি গ্রামের বাড়িতে তাদের একটি ছোটখাটো জমিদারিও ছিল। সেসময়ের হিসেবে যথেষ্ঠ আধুনিক এই মানুষটিও ব্রাহ্ম হবার কারণে তার একমাত্র পুত্র বিপিনচন্দ্র পালকে পরিত্যাগ করেছিলেন। পিন্ডদানের অধিকার দেবার আশায় আরেকটি পুত্রের প্রত্যাশায় পঁয়ষট্টি বছর বয়সে আবার বিয়ে করেছিলেন। সিলেট সেসময়েই বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যুক্ত হয়েছিল আসাম প্রদেশে। ধর্মীয় গোঁড়ামী থাকলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও ছিল বেশ। সেসময়ের হবিগঞ্জের পৈল গ্রামের, সিলেট শহরের সমাজ ব্যবস্থার একটি সুন্দর বর্ণনা আছে এই বইয়ে। আছে কলকাতার কথা, কটকের কথাও। তখনও বাঙালি ও উড়িষ্যাবাসী অনেকেই আশা করতেন বাঙালি আর উড়িয়া জাতিসত্ত্বা একসময় একসাথে মিলে যাবে, উড়িষ্যার পাঠ্যপুস্তকের, সাহিত্যের ভাষাও মূলত ছিল বাংলা। সেই আশা পূর্ণ হয় নি অবশ্য পরবর্তীতে। তৎকালীন ব্রাহ্ম সমাজের মধ্যেকার বিরোধ, সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের সৃষ্টি এসব বিষয়েও বেশকিছু তথ্য আছে বইয়ে। তবে এরপরেই বইটা যেন হঠাৎই শেষ হয়ে গেল। বিপিনচন্দ্র পাল তার জীবনের এরপরের ঘটনা আর লেখেন নি , অন্যত্র লিখেছেন তা জানি না। বইটিতে মুদ্রন ত্রুটি অসংখ্য এবং এর ফলে প্রায়ই একটি কথার অর্থ অন্য কথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যা নিশ্চয়ই বর্তমান প্রকাশকের অবহেলার ফল। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের বর্ণনা হিসেবে বইটি অত্যন্ত মূল্যবান বলেই আমার মনে হয়েছে, এবং বিপিনচন্দ্র পাল লিখেছেনও বেশ ভালো।