দশ বছর বয়সেই যাঁর ভেতর সমাজভাবনা ও দেশাত্মবােধের অঙ্কুরােদ্গম ঘটেছিল, চুয়াত্তর বছর বয়সে যার জীবনাবসান ঘটে এবং সারা জীবনভর সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত ও দেশকে বিদেশি শাসনমুক্ত করার জন্য অবিরাম সংগ্রাম করে গিয়েছিলেন যিনি, সেই বিপিনচন্দ্র পাল (১৮৫৮-১৯৩২)-এর কৃতির সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের খুব অল্পসংখ্যক তরুণ-তরুণীই পরিচিত। অথচ একাল ও ভাবীকালের মানুষের জন্যই এই সংগ্রামী মানুষটি হতে পারেন অফুরান প্রেরণার উৎস। তাঁর নীতি ও কৃতি সম্পর্কে সম্যক অবহিত হওয়ার আবশ্যকতাকে, তাই আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। রাজনীতিতে যেমন, সাহিত্যসাধনা তথা লেখকরূপেও বিপিনচন্দ্র তেমনই অসাধারণ কৃতি ও বৈচিত্র্যের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। এ-বইটি পাঠ করতে করতে যেকোনাে ধীমান পাঠকই বিপিনচন্দ্রের জীবনের অন্য অন্য দিক এবং সে সময়কার রাজনীতির আরাে অনেক অজানা বিষয় জানার জন্য কৌতূহলী হবেন এবং এঁদেরই কেউ কেউ হয়তাে ইতিহাস-বীক্ষায় নতুন মাত্রা সংযুক্ত করতে প্রয়াসী হবেন।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা স্বাধীনতা সংগ্রামী বাগ্মী নেতা বিপিন চন্দ্র পালের জন্ম ১৮৫৮ সালের ৭ নভেম্বর হবিগঞ্জের পইল গ্রামে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে 'লাল বাল পাল' বলে পরিচিত যে ত্রয়ীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে তিনি অনলবর্ষী বক্তৃতা দিতেন, তাঁর আহ্বানে হাজার হাজার যুবক স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বিপিন পালের পিতা রামচন্দ্র পাল ছিলেন একজন গ্রাম্য জমিদার এবং সিলেট বারের প্রভাবশালী সদস্য। বাবার হাতেই বিপিন চন্দ্র পালের লেখাপড়ার হাতেখড়ি। ১৮৬৬ সালে বিপিন চন্দ্র পালকে তার বাবা নয়া সড়ক স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। তারপর তিনি সিলেটের প্রাইজ স্কুল, হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি কলেজ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়ে লেখাপড়া করেন। রামচন্দ্র পাল কোর্টে কয়েক বছর চাকরি করলেও পরে নিজ জেলা সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ চলে আসেন। তারপর সিলেট বারে আইনজীবী হিসেবে যুক্ত হন। একসময় তিনি সিলেটের একজন খ্যাতনামা উকিল হিসেবেও সুনাম কুড়ান।
বিপিন চন্দ্র পাল বাল্য বিবাহ ও বহু বিবাহ রোধে এবং নারীশিক্ষার প্রচলনে তৎকালে ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি করে। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিপিন পাল আমৃত্যু লড়েছেন। বিপিন চন্দ্র পালের মাও ছিলেন উদার ও মানবিক গুণের অধিকারী। পারিবারিকভাবেই বিপিন চন্দ্র পালের মধ্যে সাম্য ও মানবতা বোধের দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৮৭৭ সালে কলকাতায় শ্রীহট্ট সম্মিলনি স্থাপিত হয়। তিনি ১৮৮০ সালে সিলেটের মুফতি স্কুলের ভগ্নাংশ নিয়ে সিলেট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয প্রতিষ্ঠা করে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৮০ সালে প্রকাশ করেন সিলেটের প্রথম বাংলা সংবাদপত্র পরিদর্শন।
তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন অখন্ড ভারত আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা। ভারত উপমহাদেশের কংগ্রেসীয় রাজনীতির প্রগতিশীল গ্রুপের তিন দিকপালের তিনি একজন ছিলেন। উপমহাদেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিপিন পালই একমাত্র বিরল প্রতিভার অধিকারী- যিনি একাধারে রাজনীতিবিদ, লেখক, সাংবাদিক ও সমাজ সংস্কারক । তাঁর বাগ্মীতা ছিল অসাধারণ। অনলবর্শী বক্তা হিসেবে তাকে ‘বাগ্মী বিপিন চন্দ্র পাল’ বলে অভিহিত করা হয়। মহাত্মা গান্ধীর কংগ্রেসে যোগদানের পূর্ব পর্যন্ত দেশের বামপন্থী নেতৃত্ব বিপিন পালের হাতেই ছিল।
যৌবনের প্রথমদিকে কথাসাহিত্যের ভেতর দিয়ে তাঁর সাহিত্য জীবনে সূচনা হয়েছিল। তার সৃষ্টির মধ্যে প্রবন্ধের সংখ্যা বেশি। তা ছাড়া তিনি উপন্যাস, জীবনী, আত্মজীবনী, ইতিহাস রচনা করেছেন। তাঁর ‘সত্তর বছর’ বইটি সেকালের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের দলিল হিসেবে স্বীকৃত। বিপিন চন্দ্র পালের প্রথম উপন্যাস 'শোভনা' প্রকাশিত হয় ১৮৮৪ সালে। 'শোভনা' নারীসমাজের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টির উদ্দেশ্য লিখিত একটি উপন্যাস। পূর্ববাংলার নাগরিকদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন প্রথম উপন্যাস লিখেছেন `রতœবতী`। সেই হিসেবে রতœবতী (১৮৬৯) আমাদের প্রথম উপন্যাস। বিপিন চন্দ্র পালের 'শোভনা' (১৮৮৪ বাংলা) উপন্যাসের দ্বিতীয় উপন্যাস। বিপিন চন্দ্র পালের বাংলায় ১৫ টি এবং ইংরেজিতে ১৭টির বেশী বই লিখেছেন। বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় লিখিত তাঁর ২৫ টিরও বেশি বই বিশ্বের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয়।
আমি এ বই হাতে নিসিলাম আগেকার সিলেট সম্পর্কে জানাশোনা বাড়ানোর জন্য।
বেশ অবাক করার মত ব্যাপার হইলো সিলেট শহরের জায়গাগুলার নাম এখনও বদলায় নাই৷ একদম একইরকম আছে৷ ১৫০ বছর বেশ দীর্ঘ সময়। এত বছর পর এসেও আমি জায়গাগুলা চিনতে এবং বিপিনচন্দ্র পালের লেখার সাথে মিলিয়ে কল্পনায় একটা চিত্রও দাঁড় করাইতে পারতেসিলাম। এই জিনিসটাই সবচে' ভাল্লাগসে।
এই বই অক্ষয় মালবেরি বা জিন্দাবাহারের মত দারুণ সাহিত্যকর্ম নয়। চলনসই জীবনী বলা চলে। কিন্তু সিলেটবাসীরা এই বই মাস্ট রিড হিসাবে নিতে পারেন। শহরের ইতিহাস জানতে খারাপ লাগবে না একটুও।
বিপিনচন্দ্র পাল সম্পর্কে আমি তেমন কিছুই জানতাম না। এই বইয়েও তার প্রথম যৌবন পর্যন্ত আত্মকথাই কেবল আছে। এককালে সর্বভারতীয় রাজনীতি ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন, সেসব আন্দোলন এর সময়ের বর্ণনা অবশ্য এই বইয়ে নেই। বইয়ের আসল মূল্য তার সময়কাল এবং যে স্থানের বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তাতে। বিপিনচন্দ্র এই আত্মজীবনী লিখেছেন ১৯২৮ সালে তবে যে সময়ের কথা লিখেছেন তা পুরোটাই উনিশ শতকের ষাট আর সত্তরের দশকের। সেই সময়ের নিজের লেখা স্মৃতিচারণা খুব বেশি আমার চোখে পড়ে নি। ঠাকুর পরিবারের তিনজনের আত্মস্মৃতি বিভিন্ন সময়ে পড়েছি তার পটভূমি মূলত কলকাতা, পশ্চিমবাংলা বা বর্হিবঙ্গ। শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা স্মৃতিচারণাতেও কলকাতার কথাই বেশি আছে আর আছে তার ধর্মজীবনের কথা। নবীন চন্দ্র সেনের একটি আত্মজীবনী বোধহয় আছে যাতে পূর্ববঙ্গের অনেক তথ্য আছে, সেটি এখনও পড়া হয় নি। বিপিনচন্দ্র পালের জন্ম হবিগঞ্জে। বড় হয়েছেন বরিশাল, ফেঞ্চুগঞ্জ ও মূলত সিলেট শহরে। এসব জায়গার এত আগের কারো নিজের চোখে দেখা স্মৃতিচারণা কখনো পড়িনি। সেকালের সিলেট শহরে প্রায় দেড়শ বছর আগে বিপিনচন্দ্রের শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল। প্ল্যান্টার্সরা তখন চাবাগানগুলো কেবল গড়ে তুলছিলেন। উত্তর দিক থেকে মাঝে মাঝে শহরে চলে আসতো বাঘ, শহরতলীর জঙ্গলে ধরা পড়তো বুনো শুয়োর। আর সাপখোপ ছিল প্রচুর। শহরে ছিল অসংখ্য টিলা, হায় তার অনেকগুলোই এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধু সিলেট কেন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জেও তখন ছিলনা রেল যোগাযোগ। গোয়ালন্দ পর্যন্ত পৌছতে হতো জলপথেই , তাতে লেগে যেত দিন পনের। হিন্দু সমাজ তখনও জাতপাত আর রক্ষণশীলতার গোঁড়ামীতে চরমভাবে আচ্ছন্ন। ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজ প্রবল প্রতাপে তার জয়পতাকা উড়িয়ে যাচ্ছে আর শিক্ষিত হিন্দু সমাজের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। বিপিনচন্দ্র পালের বাবা ছিলেন এককালে মুন্সেফ, তারপরে ওকালতীকে তিনি পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। এমনকি গ্রামের বাড়িতে তাদের একটি ছোটখাটো জমিদারিও ছিল। সেসময়ের হিসেবে যথেষ্ঠ আধুনিক এই মানুষটিও ব্রাহ্ম হবার কারণে তার একমাত্র পুত্র বিপিনচন্দ্র পালকে পরিত্যাগ করেছিলেন। পিন্ডদানের অধিকার দেবার আশায় আরেকটি পুত্রের প্রত্যাশায় পঁয়ষট্টি বছর বয়সে আবার বিয়ে করেছিলেন। সিলেট সেসময়েই বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যুক্ত হয়েছিল আসাম প্রদেশে। ধর্মীয় গোঁড়ামী থাকলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও ছিল বেশ। সেসময়ের হবিগঞ্জের পৈল গ্রামের, সিলেট শহরের সমাজ ব্যবস্থার একটি সুন্দর বর্ণনা আছে এই বইয়ে। আছে কলকাতার কথা, কটকের কথাও। তখনও বাঙালি ও উড়িষ্যাবাসী অনেকেই আশা করতেন বাঙালি আর উড়িয়া জাতিসত্ত্বা একসময় একসাথে মিলে যাবে, উড়িষ্যার পাঠ্যপুস্তকের, সাহিত্যের ভাষাও মূলত ছিল বাংলা। সেই আশা পূর্ণ হয় নি অবশ্য পরবর্তীতে। তৎকালীন ব্রাহ্ম সমাজের মধ্যেকার বিরোধ, সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের সৃষ্টি এসব বিষয়েও বেশকিছু তথ্য আছে বইয়ে। তবে এরপরেই বইটা যেন হঠাৎই শেষ হয়ে গেল। বিপিনচন্দ্র পাল তার জীবনের এরপরের ঘটনা আর লেখেন নি , অন্যত্র লিখেছেন তা জানি না। বইটিতে মুদ্রন ত্রুটি অসংখ্য এবং এর ফলে প্রায়ই একটি কথার অর্থ অন্য কথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যা নিশ্চয়ই বর্তমান প্রকাশকের অবহেলার ফল। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের বর্ণনা হিসেবে বইটি অত্যন্ত মূল্যবান বলেই আমার মনে হয়েছে, এবং বিপিনচন্দ্র পাল লিখেছেনও বেশ ভালো।