ফেলুদা আসলে কে? বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত চরিত্রগুলির অন্যতম ফেলু মিত্তিরকে গড়ে তোলার সময়ে লেখক কি রোল মডেল হিসেবে কাউকে সামনে রেখেছিলেন? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে, কোনও ধর্মবিশ্বাসে যেমন মনে করা হয়, ঈশ্বর মানুষ গড়েছেন তাঁর নিজের চেহারার আদলে, তেমন গোয়েন্দা প্রদোষচন্দ্র মিত্রকে তার স্রষ্টা গড়ে তুলেছিলেন অনেকটাই নিজের মতো করে। শুধু ফেলু একাই নয়, সত্যজিৎ তাঁর চরিত্রের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন তোপসের মধ্যেও দিয়েছিলেন, তেমন অনেক বৈপরীত্য আরোপ করেছিলেন জটায়ুর চরিত্রেও। ফেলু-তপেশের সঙ্গে সত্যজিতের সাদৃশ্য বা জটায়ুর সঙ্গে দীর্ঘকায় মানুষটির বৈসাদৃশ্য কতখানি, তার সন্ধান করা হয়েছে এই গ্রন্থে, সত্যজিৎ রায়ের বাস্তব জীবন এবং ফেলু-তপেশ-জটায়ুর কল্পনার জগৎকে তুলনামূলকভাবে বিচার করে।
বাঙালির কাছে আইকনিক এক স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টিকে নিয়ে লেখা হয়েছে এই বইটি। আপাতভাবে এর বিষয়বস্তুর মধ্যে নতুনত্ব নেই। ফেলুদা'র চরিত্রটি নির্মাণে, তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনায়, পার্শ্ব-চরিত্রদের বিবরণ ও কার্যকলাপে যে সত্যজিৎ রায়ের চরিত্র ও অভিজ্ঞতা প্রভাব ফেলবে, এটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই প্রভাব কীভাবে পড়েছে এবং তা কতটা বিস্তৃত, তাই নিয়ে প্রায় গবেষণামূলক বই এটি। যে অধ্যায়গুলোতে এই পর্যালোচনা বিন্যস্ত হয়েছে, তারা হল: ১. পুরীর পথে ঝড়বাদল ২. কড়ে আঙুলের নখ ৩. ও রসে বঞ্চিত ৪. দাবা তাস স্ক্রেবল ৫. জাদুবিদ্যা ৬. টার্জন দ্য এপ ম্যান ৭. ডাকটিকিট ৮. যখন ছোটো ছিলেন ৯. স্বপ্ন ১০. মোটর গাড়ির শব্দ ১১. অনেক ব্যাপারে ইন্টারেস্টেড ১২. মনের জানালা ১৩. ফেলু চরিত্রের এক্সটেনশন ১৪. দক্ষ এক বিদূষক ১৫. লোকেশন থেকে পটভূমি ১৬. লোডশেডিং ১৭. মকাইবাড়ি বা ম্যাককাচন ১৮. টিনটিন ইত্যাদি ১৯. পভার্টি ইজ মোর ফোটোজেনিক ২০. এবং অপূর্ব বইটা ভালো। প্রসেনজিৎ একইসঙ্গে সুলেখক এবং মেহনতি গবেষক। তাঁর অধ্যয়ন ও তদনের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে বইয়ের প্রতি পাতায়। কিন্তু... (১) এই বইটা ফেলুদাপ্রেমীদের অত্যন্ত হতাশ করবে। তথ্য ও তত্ত্বে বইটা সত্যজিতের জীবন, ভাবনা ও কাজের ওপরেই অনেক বেশি ফোকাস ফেলেছে। তাই ফেলুদা নয়, সত্যজিতের জীবনী নির্মাণের ক্ষেত্রে এই বই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠবে। (২) এই লাইফ-প্যারালালের বদলে লেখক যদি ফেলুদা কাহিনির জন্য কিছু সার্থক অ্যানোটেশন দিতেন, তাহলে দারুণ হত। বইটি ছোট্ট হলেও ছিমছাম এবং বহু স্কেচে সমৃদ্ধ। তবে এটা পড়লে তৃপ্তি নয়, বরং সত্যিকারের 'ফেলুদা উপাখান'-এর জন্য অভাববোধ তৈরি হয়।
এক বসায় পড়ে ফেলার মত বই। খানিকটা যেন ফেলুদার ছায়ায় সত্যজিৎ রায়ের বৈচিত্র্যময় জীবনকেই তুলে ধরা হয়েছে। তবে স্রষ্টা এবং তার সৃষ্টির মধ্যে দারুণ মিল, অনেক অজানা কিছুও জানা যাবে বইটি পড়ে।
এই বইটা যারা আমাদের মতো ফেলুদা-শঙ্কু পড়ে বড় হয়েছে আর সত্যজিৎ রায়ের কাজের বিশেষ অনুরাগী, তাদের মতো পাঠকদের কাছে বেশ উপভোগ্য হবার কথা।
লেখক নিজে একজন সত্যজিৎ ও ফেলুদা অনুরাগী হিসেবে সত্যজিৎ রায়ের নিজের জীবনের বিভিন্ন টুকরো ঘটনা পর্যালোচনা করে সেগুলো কীভাবে ফেলুদা, তোপশে সহ ফেলুদা সিরিজের নানান চরিত্র, আর ঘটনা, পরিবেশ, প্রকৃতি, স্থান আর কালে প্রভাব রেখেছে তা নিয়ে নিজের ভাবনা প্রকাশ করেছেন।
তার কতটুকু আসলেই সত্যি তা কিন্তু আমরা কেউই জানি না, এগুলো ধারণা মাত্র। আজ সত্যজিৎ রায় জীবিত থাকলেও হয়তো তার সেই সময় বা আগ্রহ থাকতো না নিজের অনুরাগী কারও লেখার ভুল শুধরে দেবার, তেমন ব্যক্তিত্ব সত্যজিৎ ছিলেন নাই বোধ করি। কিন্তু একজন অনুরাগী হিসেবে সেই অনুমানগুলো পড়তে কিন্তু আমার বেশ মজা লেগেছে।
লেখকের লেখার হাত ঝরঝরে আর ভাষাও প্রাণবন্ত, তা এর আগে আরেকটি বই পড়তে গিয়ে উপলব্ধি করা। এই বই পড়তে গিয়ে ফেলুদার নানান কাহিনির একটা হালকা পুনঃপাঠ হয়ে যাওয়ায় আমোদ বেশি ছিলো। যেমন লালমোহন গাঙুলির নানান চমকপ্রদ স্বপগুলোর কোট পড়ে অনেকক্ষণ হাসলাম। তবে এক্ষেত্রে মনে হয় বলে দেয়া ভালো, যাদের সবগুলো ফেলুদার গল্প, উপন্যাস পড়া নেই, তাদের জন্যে অনেক জায়গাতেই স্পয়লার আছে, তেমন পাঠক স্পয়লার না পেতে চাইলে এই বই পড়া ঠিক হবে না।
টুকরো তথ্যগুলোও আনন্দদায়ক ছিলো, যেমন "হত্যাপুরী" লেখার সমসাময়িক সময়েই সত্যজিৎ লিয়ারের লিমেরিক অনুবাদ করছিলেন, এবং নিজেই লিমেরিক লেখায় হাত দেন (যা পরে "তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম" -রূপে প্রকাশিত হয়)- এই তথ্য জানতাম না। স্বভাবতই "হত্যাপুরী"-তে ফেলুদা তাই লোডশেডিং-এ বোর হয়ে লিমেরিক রচনায় মন দিয়েছে, এই যোগসূত্র কিন্তু সত্যিই সম্ভব!
যাই হোক, ভালো লেগেছে পড়তে। যারা সত্যজিতের তীব্র অনুরাগী না তাদের কাছে এ বই আরোপিত মনে হলেও হতে পারে। আমার কাছে লেখকের নিজের ভাবনাগুলো উপভোগ্য ছিলো।
পাঠ প্রতিক্রিয়া : ফেলুদা বলতে যে মানুষটা সর্ব প্রথম আমাদের মাথা আসে তিনি হলেন সত্যজিৎ রায়।যার প্রতিটি ফেলুদার গল্প আমাদের মনের একটা জায়গায় দখল করে আছে।
তো ফেলুদার গল্পগুলো ভালোবেসে মন দিয়ে পড়লে এবং মানুষ সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলে যে কেউ বুঝতে পারবেন ফেলুর সঙ্গে সত্যজিৎ রায় সুদর্শন,ছয়ফুট সাড়ে চার ইঞ্চি মানুষটির মিল কতখানি।ফেলুদাকে রক্তমাংসের মানুষ মনে করে যদি তার কাজ কারবার এর উপর লক্ষ্য রাখা যায়,দেখা যাবে বারংবার বুঝি সেই মানুষটিই ফেলুদাকে সরিয়ে সামনে চলে আসছে। সত্যজিৎ রায় এর মধ্যে যে সকল অভ্যাস,তার চাল চলন,পোশাক-আশাক,খাওয়া,কাজ কর্ম,প্যাশন ইত্যাদি এরকম অজস্র মিল রয়েছে ফেলুর সঙ্গে।মূলত এ বইয়ে সত্যজিৎ ও তার সৃষ্টি চরিত্রের মধ্যে সাদৃশ্য খোঁজা হয়েছে। তাছাড়া ফেলুদার পাশাপাশি তোফসে আর জটায়ুর সঙ্গে যে সত্যজিৎ রায় লুকিয়ে আছে সেটি জানতে আপনাকে বইটি পড়তে হবে।স্বয়ং সত্যজিৎ তাদের সাথে একই সুতোয় বাঁধা।
ছোট্ট বই, ছিমছামভাবে তুলে ধরা হয়েছে ফেলুদার গল্পের বিভিন্ন খুঁটিনাটি এবং স্রষ্টা সত্যজিৎ রায়ের জীবনের সঙ্গে সেগুলোর মিল। ছোটবেলার প্রিয় গোয়েন্দা ফেলুদার গল্পগুলো রোমন্থন করার জন্য আদর্শ।