ঘুঁট ঘুঁটে অন্ধকার সাভানার দৃষ্টিসীমায় হঠাৎ চাঁদের বুড়ি হাসি দিয়ে উঠলো। আস্তে আস্তে সেই বনটা পরিণত হলো জোৎস্নার রাজ্যে। খালি চোখে এর থেকে ভালো তারা দেখার সুযোগ এর আগে আমি কেবল বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন্স আইল্যান্ডেই পেয়েছিলাম। ফিলিপ একে একে তারাদের জীবন রহস্য বর্ণনা শুরু করলো; আর আমি কিছুক্ষণ পর পর তাকে থামিয়ে করতে থাকলাম হাজারটা প্রশ্ন। একবার চিন্তা করে দেখুন। আপনি আফ্রিকার জঙ্গলে আর্ডভাক ধরার ফাঁদ পেতে একজন অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্টের সাথে মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সী নিয়ে গল্প করতে করতে জীবনে প্রথম বারের মত মুন রাইজ দেখছেন।
উড়াউড়ির মত বাচ্চাদের কথামালা কেউ কিনতে চাইবেনা তাই স্বাভাবিক। তবে শামীর মোন্তাজিদের লেখা ‘উড়ছে হাইজেনবার্গ’ বইটা তাও মানুষ কিনছে। রকমারিতে থেকে ভুরি ভুরি অর্ডার পরছে। কেন? এই প্রশ্ন আমারো।
উড়ছে হাইজেনবার্গ মুলত একটা ভ্রমন কাহিনীর বই। শামীর মোন্তাজিদ কোন সাহিত্যিক নন কিংবা কখনও নিজেকে সাহিত্যিক হিসেবে দাবী করেননি। কিন্তু অসচেতনভাবেই তিনি সাহিত্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ নিয়ে কাজ করে ফেললেন। ব্যাপারটা খুবই মজার কিন্তু। তাছাড়া তিনি পিএইচডি করছেন বিলেত গিয়ে। সে হিসেবে তিনি বিজ্ঞানের মানুষ। আর আগের বইটাও সে সম্পর্কিতই তিনি লিখেছেন। তবে পরের বইতে এভাবে মোড় পরিবর্তনটাও চোখে পরার মত। তো আমাদের দেশীয় হাইজেনবার্গ মশাই উড়াউড়ি নিয়ে কিসব কাহিনী বললেন তা জানার জন্য আমি অমর একুশে গ্রন্থমেলায় তাম্রিলিপির প্যাভিলিয়নে গিয়ে কিনে ফেললাম বইটি।
আমি একটা বিষয় অবাক হয়ে দেখলাম বইয়ের উৎসর্গ পাতাতেই ঠাসা ঠাসা মানুষের গল্প লেখা। মাত্র এক পেজে কত্ত গল্প! ভীনদেশী এক সিমোনা নামের মেয়ের গল্প যিনি কোন এক সময় শামীর ভাইয়ার স্যুপে মিশিয়ে দিয়ছিলেন বিদেশী অচেনা এক গন্ধের অভিজ্ঞতা। যাকে মনে রাখা যায়। এমন এক সুপারহিরো মানুষ ব্যারি যিনি কোবরা সাপ হাতে নিয়ে আখ্যান তৈরী করেছেন। আনিকার মত মেয়ে যিনি অন্যরকম এক সন্ধ্যা সাজিয়েছিলেন শামীর মোন্তাজিদের সময়। এক টুকরো এক টুকরো করে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের আবেগ জমে গেছে উৎসর্গ পত্রে। তারা কি কখনো জানবে ছোট্ট একটি দেশের ভাষার লেখা বইয়ের প্রথম পাতায় তাদের স্মরণ করার কথা? আমি জানিনা।
সত্যি বলতে বইয়ের টেক্সটে ঢোকার আগেই এই বই নিয়ে ভুরি ভুরি লেখা যায়। ধরা যাক সূচিপত্র। সেখানে দেখলাম বইয়ের অধ্যায় কর গুনে বিশটি। প্রত্যেকটি অধ্যায়ের নাম গুনে গুনে তিন শব্দে রাখা হয়েছে। প্রত্যেকটি অধ্যায়ের নামে এই তিন শব্দ সম্পূর্ন ভিন্ন, একে অপরকে যারা প্রতিনিধিত্ব করেনা। যেমন একটি অধ্যায়ের নাম ‘ঢাকা,হিজরত,অক্সফোর্ড’। একটি শব্দের সাথে অপরটির কোন মিল নেই। খুব সচেতন ভাবে একটি শৈল্পিকতার ছোঁয়া দেবার চেষ্টা করেছেন তিনি। ব্যাপারটা বেশ উপভোগ্যও বটে।
বইটা আসলে আমি পুরোটা পড়িনি। অমর একুশে মেলা থেকে কিনে মেলার মধ্যেই শেষ করে ফেলাটা আমার পছন্দের না। তাও মাঝেমধ্যে পড়তে হয়। তাই উড়ছে হাইজেনবার্গের বেশ কিছু অংশ পড়েছি এবং অবাক হয়েছি এই ভেবে যে পৃথিবী কত্ত সুন্দর!
এবার শামীর মোন্তাজিদের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে বলা যাক একটু। আমার সাথে শামীর ভাইয়ের মুখোমুখিভাবে প্রথম কথা হয় গতবছর ঢাকার শান্তিনগরে। সেখানে আমি গিয়েছিলাম তার অটোগ্রাফ নিতে। তিনি আমার অটোগ্রাফে লিখলেন- ‘Dear Zubaer, Thanks for being a nice person. Be the next Humayun Ahmed of our time. নিচে ইংরেজি অক্ষরে শামীর মোন্তাজিদ লিখে সাইন দেয়া। আমি বাসায় এসে ইউটিউবে সার্চ করলাম তাঁর ভিডিও। আম্মুকে বললাম, মা তুমি কি উনাকে চেনো? আম্মু বললেন হ্যাঁ চিনি তুমি ইন্টারে রাতে তার ভিডিও দেখে পড়তে। আমার মা আয়মান সাদিক, রাতুল খান ও এই শামীর মোন্তাজিদকে নিয়ে কত দুয়া করেছেন তার কোন ইয়েত্তা নেই। আমার মা আমাকে প্রাইভেট টিউশনে যাবার টাকা দিতে পারতেন না। আমি বলতাম মা সমস্যা নেই রাতে শামীর ভাইয়ার লাইভ ক্লাস আছে। মা নামাযের শেষে মুনাজাত করতেন আর কাঁদতেন। আমি তো জানতাম তিনি কী দুয়া করেন।
কদিন আগে দেখি বইমেলায় শামীর ভাইয়ার বইতে তার মা অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। আমি ক্যামেরা তাক করলেই তিনি হাসেন। উনি ক্যামেরার ওপারে আমার ছলছলে চোখটা আর দেখেন না। শামীর আর তার মা ভালো থাকুক।
পুনশ্চঃ শামীর ভাইয়া একটা ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন যেটার পুরস্কার বই। সেটার নিয়ম অনুযায়ী একজনকে ট্যাগ করে তার ঘুরতে যাবার ইচ্ছা পোষন করার বিস্তারিত লিখতে বলা হয়েছে। আমি এমন দুজনের ঘোরাঘুরির বিষয়ে লিখতে চাই যাদের কোন আইডি নেই। তারা হলেন আমার ক্লাস ফোরে পড়ুয়া ছোটবোন সাদিয়া ও আমার মা। সাদিয়া ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে বিভিন্ন অসম্ভব সুন্দর জায়গা দেখে। আর আম্মুর সাথে প্ল্যান করে। সাদিয়া বলে, আম্মু আম্মু জানো হ্যারি পটারের একটা শহর আছে। সেখানে তুমি আর আমি যেদিন যাবো সেদিন অনেক মজা হবে। ভাইয়া আপু তো পড়াশোনা পারে। বাংলা পারে ইংরেজিও পারে। ওখানে তো সবাই ইংরেজিতে কথা বলে। আমিও ইংরেজি বুঝিনা তুমিও বুঝোনা। কী মজা কী মজা!
সাদিয়ার এসব ঘোরার প্ল্যান শুনে আমার লেখাপড়া না জানা আম্মু খুব হাসে। আমার মূর্খ আম্মুর হাসি আর শামীর ভাইয়ার অটোগ্রাফ দেয়া মায়ের হাসি মাঝেমধ্যে মিলে যায়। কী অদ্ভুত!
Nobody wants to buy children's stories like Urauri so it is normal. However, people are also buying the book 'Flying Heisenberg' written by Shamir Montaji. Bhuri Bhuri is ordering from Rokomari.com. Why? This question is mine too.
Flying Heisenberg is basically a travel storybook. Shamir Montazid is not a writer and has never claimed to be a writer. But subconsciously he worked on an integral part of literature. It's very funny. Moreover, he is doing his Ph.D. in Britain. As such, he is a man of science. And he has written the previous book about him. However, in the next book, the change of turn is also noticeable. So I went to the pavilion of Tamrilipi at the Amar Ekushey Book Fair and bought the book to know what kind of story our native Heisenberg told about Urauri.
One thing I was surprised to see was the story of the crowded people writing on the dedication page of the book. What a story in just one page! The story of a foreign girl named Simona who once mixed the experience of a foreign unfamiliar smell in Shamir's brother's soup. Who can be remembered? Barry is a superhero man who has created a story with a cobra in his hand. A girl likes Anika who arranged a different evening during Shamir Montajid. One by one, the emotions of different parts of the world have accumulated in the dedication letter. Will they ever know to remember them on the first page of a book written in the language of a small country? I do not know.
In fact, before entering into the text of the book, you can write a lot about this book. Let's take the table of contents. There I saw twenty chapters of the book. The names of each chapter are numbered in three words. These three words in the name of each chapter are completely different, those that do not represent each other. The name of such a chapter is 'Dhaka, Hijrat, Oxford'. One word has no resemblance to another. He has consciously tried to give an artistic touch . It's quite enjoyable.
I didn't actually read the whole book. I don't like to buy from Amar Ekushey Mela and finish it in the fair. Tao is read occasionally. So I read several parts of Heisenberg flying and was surprised to think that the world is so beautiful!
Now let's talk a little about the personal affairs of Shamir Montajid. Shamir Bhai's first face-to-face meeting with me was in Shantinagar, Dhaka last year. There I went to get his autograph. He wrote in my autograph- "Dear Zubaer, Thanks for being a nice person. Be the next Humayun Ahmed of our time."
Shamir Montazid is signed in English letters below. I came home and searched his video on YouTube. I said to my mother, do you know him? Mom said, yes I know you read her video on the internet at night. I don't know how many prayers my mother Ayman Sadiq, Ratul Khan and this Shamir Montazid have made. My mother could not afford to pay me for private tuition. I used to say mother no problem, Shamir's brother has live class at night. Mother used to pray and cry at the end of prayers. I knew what he was praying for.
A few days ago, I saw his mother giving autographs in Shamir Vaiya's book at the book fair. He smiles as soon as I aim the camera. He no longer sees my squinting eyes on the other side of the camera. Good luck to Shamir and his mother.
PS: Shamir Bhaiya has started a campaign with prize books. According to the rules, one has been asked to tag and write down the details of his desire to go for a walk. I would like to write about two people who have no ID. They are my class four younger sister Sadia and my mother. Sadia sees various impossibly beautiful places in National Geography. And plans with mother. Sadia says, Mommy Mommy you know Harry Potter has a town. The day you and I go there will be a lot of fun. Brother Apu can study. Can speak Bengali or English. Everyone there speaks English. I don't understand English either, you don't either. What fun what fun!
My uneducated mother laughs a lot when she hears Sadia's plan to go around. My stupid mother's smile and Shamir's brother's autographed mother's smile sometimes match. How strange!
বইটা ভালো। শুধু ভালো নয় বেশ ভালো। লেখকের প্রথম বই "হাইজেনবার্গের গল্প" পড়ার পরে এই বইটা হাতে নিতে প্রথম দিকটায় তেমন একটা উৎসাহ পাইনি কেন যেন। কিন্তু একবার পড়া শুরু করার পরে এক নিঃশ্বাসে প্রায় অর্ধেক পড়ে ফেলি। যদিও মাঝে কিছুটা একঘেয়েমি চলে এসেছিল।
ভ্রমণ কাহিনি জনরার এইটা আমার পড়া মোটামুটিভাবে প্রথম বই। আগে ভাবতাম ভ্রমণ কাহিনি আবার কি করে সাহিত্যের অংশ হয়। কিন্তু এখ�� মনে হচ্ছে জিনিসটা সত্যিই একটা আর্ট। নিজের অভিজ্ঞতাগুলোকে ভাষার কারুকার্যে প্রকাশ করতে পারলেই না সেটা সাহিত্য হয়। এই বইটা অনেক খানিই সেই আর্টকে ছুঁয়েছে। লেখক প্রায় বিশটি শহরের অভিজ্ঞতা এই বইয়ে একসাথে তুলে ধরেছেন। ভালো লেগেছে বর্ণনা এবং ভাষার সরলতা। পড়তে পড়তে নিজের কাছে মনে হয়েছিল আমিও লেখকের সাথে সাথেই হারিয়ে গিয়েছি আফ্রিকার সাভানায়, কেপটাউনে কিংবা নেপালের কাঠমান্ডু বা থামেলে, অথবা আমস্টারডাম বা ব্রাইটনের পথে পথে। সবচে ভালো লেগেছে প্রতিটা লেখার শেষেই লেখক একটি করে QR কোড জুড়ে দিয়েছেন, যা স্ক্যান করে লেখকের প্রত্যেকটা জায়গায় তোলা ছবি বা ভিডিও দেখতে পারবেন পাঠক।
মনের মধ্যে জমে থাকা ঘুরতে যাওয়ার অনেক অপূর্ণ ইচ্ছা জমা আছে বলেই হয়তো ভ্রমণকাহিনীগুলি আমাকে অনেক প্রভাবিত করে।
অবশেষে দুই দিনের প্রচেষ্টায় শেষ করে ফেললাম এবারের বইমেলা থেকে কেনা তৃতীয় বই "উড়ছে হাইজেনবার্গ"।
বইটিতে লেখক শামীর মোন্তাজিদ তার প্রায় ১১ টি দেশের ২০ টি ভিন্ন ভিন্ন শহরে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন। বইয়ের শুরু হয়েছে হিমালয়ের পাদদেশ কাঠমুন্ডুতে আর শেষে লেখক নিয়ে গেছেন আটলান্টিক তীরের কেপটাউনে।
পুরো বইটা পড়ার সময়ই মোটামুটিভাবে বুদ হয়ে ছিলাম। লেখনীতে আতিশয্য তেমন ছিল না বলে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে এগুলো যেন আমারই গল্প, হয়তো কোনো এককালে আমিই এসব গল্প লিখে রেখেছি। খুব সাধারণভাবে লেখক তার জীবনের কিছু অসাধারণ ভ্রমণকাহিনী এতো চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন যে, পাঠকের মনে হবে তিনি নিজেও এসব ভ্রমণকাহিনীর অংশ। আর আমার মনে হয় এটাই এই বইয়ের সফলতা।
পারসোনালি আমার কাছে সৌদি আরবের মক্কাতে লেখকের তার মায়ের সাথে পবিত্র উমরাহ হজ্জ পালনের সময়কার অংশটুকু বেশ আবেগপ্রবণ মনে হয়েছে৷
তবে এটুকু হলফ করে বলতে পারি, বইটি পড়তে পড়তে যে কেউ একটু হলেও হয়তো লেখকের মত ঘুরে বেড়ানোময় একটা জীবনের জন্য হাহাকার করবেন।
যারা একটু লেটেস্ট ভ্রমণকাহিনী পড়তে চান, দেরি না করে পড়ে ফেলুন " উড়ছে হাইজেনবার্গ" এই বইটি....
প্রথমত বইটা পড়ার সবচেয়ে মজার ঘটনা হলো, বইটা আমাকে টাকা দিয়ে কেনার বদলে অথবা ধার করে নিয়ে পড়ার বদলে আরেকটি বই বিনিময় করে সেই সুবাদে পড়ার সুযোগ হয়েছে। যদিও আমি জানিনা এই বইটি কার। কিন্তু সেই অজানা ব্যক্তিটি অবশ্যই ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। কারণ বইটি তিনি বই বিনিময় উৎসবে না দিলে হয়তো আমার কখনোই এই বইয়ের সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব হতোনা। যাই হোক, বইটা পড়ার পর মনে হয়েছে এই পৃথিবীটা অনেক বড়। ভ্রমণ জিনিসটা সবসময়ই অনেক আনন্দের। কিন্তু ভ্রমণ কাহিনীগুলোকে লেখনির মাধ্যমে অন্যভাবে উপস্হাপন করতে পারাটা সার্থকতা। লেখক তাতে পুরোপুরিই সফল হয়েছেন। বইটা পড়ার সময় কখনো ইতালি, কখনো ইংল্যান্ড, কখনো বা আফ্রিকার জংগলে হারিয়ে যাচ্ছিলাম। ব্যাংকক, জার্মানি, ভূটান, আমস্টারডাম প্রত্যেকটা জায়গার বর্ণনা পড়ে মনে হচ্ছিলো পুরো পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছি। সবচাইতে ভালোলাগার বিষয় হচ্ছে বইটার শেষটা...সেটা নিয়ে আমি লিখতে চাইনা। কারণ বইটা পড়ার পর যে পরিতৃপ্তিটা আসে, সেটা নিজে না পড়ে বা অনুভব না করে বোঝা যাবেনা। পৃথিবীটা সত্যিই অনেক সুন্দর।
এই সুন্দর, বৈচিত্র্যময় পৃথিবীটা ঘুরে দেখতে আমাদের সবারই কম-বেশি ইচ্ছে করে। অনেকে সেই ইচ্ছে পূরণের পথ বের করে ফেলে, নিজেকে পুরো বিশ্বের নাগরিক করে তুলতে পারে। আবার অনেকেই জীবনের নানা জটিল সমীকরণ মিলিয়ে সেই ইচ্ছে পূরণ করার পথ তৈরি করতে না পেরে ভ্রমণ কাহিনী আর ট্র্যাভেল ভ্লগ দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে নিচ্ছে। আমি হলাম দ্বিতীয় ক্যাটাগরির মানুষ। আর প্রথম ক্যাটাগরিতে থাকা শামীর মোন্তাজিদ ভাইয়ের নতুন বই 'উড়ছে হাইজেনবার্গ' হলো আমার দুধের বদলে ঘোল। গত কয়েক বছরে বিশ্বের নানা শহরে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে এই বইয়ে তুলে ধরেছেন তিনি। বইটি উৎসর্গ করেছেন ভ্রমণকালে পরিচয় হওয়া পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের কিছু বন্ধুকে। সেই নামগুলোর নিচে থাকা দুই-একটা করে লাইন মনটাকে প্রথমেই ভালো করে দেয়। লাইনগুলোর পেছনের গল্প জানতে আগ্রহ তৈরি করে। এরপর উড়তে শুরু করে হাইজেনবার্গের বিমান। কখনো সেই বিমান গিয়ে অবতরণ করছে কাঠমন্ডু, কখনো আমস্টারডাম, আবার কখনো কেপ টাউনে। প্রতিটি দেশ বা শহরে যাত্রার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে পুরো ভ্রমণের গল্প খুব সাবলীল লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন শামীর মোন্তাজিদ। নতুন শহরগুলোর পরিবেশ, ইতিহাস, যাতায়াত ও থাকার ব্যাবস্থা সম্পর্কে তো লিখেছেনই, তার সাথে রয়েছে প্রত্যেক শহরের দুর্দান্ত সব খাবারের বর্ণনা। আমার মতো মানুষের জন্য এমন বিস্তারিত ভাবে লোভনীয় সব খাবারের বর্ণনা হজম করা একটু কষ্টই হয়ে যাচ্ছিলো। তবে সেই লেখাগুলো কোন ট্র্যাভেল ব্লগের মতো করে শুধু তথ্য দিয়ে ঠেসে দেয়া হয়নি। গল্পের ছলে তিনি বলে গিয়েছেন তার সাথে ঘুরতে যাওয়া বন্ধুদের সম্পর্কে। নতুন শহরগুলোতে পরিচয় হওয়া মানুষগুলোর সম্পর্কে, যাদের অনেকের সাথেই হয়তো আর দেখা হবে না (তবে সেই বন্ধুদের তিনি বলেছেন,"পৃথিবীটা গোল, আমাদের আবার দেখা হবে")। লিখেছেন নিজের ভয়কে সরাসরি মোকাবেলা করার মাধ্যমে চিরতরে জয় করার গল্প। বলেছেন অক্সফোর্ডে পাড়ি জমানো, সেই নতুন শহরের সাথে চিরচেনা ঢাকার পার্থক্য; এবং নতুন শহরে মানিয়ে নেয়ার গল্পগুলো। ছোটবেলায় ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে দেখা সাভানার জঙ্গলে একদল গবেষকের সাথে রাত কাটানোর অনুভুতি পড়তে পড়তে নিজের মনেও ইচ্ছে জাগে যে একদিন আমিও আফ্রিকার জঙ্গলে অগণিত তারার নিচে রাত কাটাবো। হয়তো তখন ছোটবেলায় পড়া 'চাঁদের পাহাড়' এর শঙ্করের কথা মনে পড়বে। বইটির অন্যতম প্রিয় দিক হলো, প্রতিটি শহরের গল্প শেষে দুই-একটা কথা বা গানের লাইন তিনি লিখেছেন, যা ওই ভ্রমণের সার্বিক অনুভূতিকে খুব সুন্দর করে তুলে ধরে। সেখান থেকে আমার প্রিয় কিছু লাইন হলোঃ
Gravity is overrated, You can fly.
A taxi driver in Cambridge probably knows better science than you.
Things always go wrong in life. That does not mean you have to stop living.
বই শেষ করে বুঝতে পারলাম এই বিচিত্রে ভরা পৃথিবীটাকে ঘুরে দেখার ইচ্ছে আরও অনেক বেশি তীব্র হয়েছে। তবে আমার মতো যারা এখুনি ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে যেতে পারছেন না, তারা শামীর ভাইয়ের দুর্দান্ত বর্ণনা এবং নিজের কল্পনা শক্তির সাহায্যে একটা ভ্রমণে বের হয়ে যেতেই পারেন।
ওহ! আরেকটা জিনিস। প্রতিটি চ্যাপ্টারের শেষে ওই ভ্রমণের কোন ছবি বা ভিডিও দেখার জন্য রয়েছে QR কোড। ব্যাপারটা বেশ ভালো লেগেছে।
এক কথায় "অসাধারণ ". করোনাময় এই অস্থির সময়ে কোন বই বা মুভি দেখে শান্তি পাইতেছিলাম না।অনেকগুলো বইয়ের কিছু পৃষ্ঠা পড়ে রেখে দিছিলাম।তারপর এই বইটা ধরলাম।অল্প অল্প করে পড়লাম।মনে অনেক শান্তি পাইলাম।মনে হইলো আমিও লেখকেত সাথে ঘুরছি।লেখক আমাদের মতো যারা বাজেট টুরে বিদেশ ভ্রমণ করতে চায় তাদের জন্য দারুন ভাবে বর্ণনা দিয়েছেন।প্রায় প্রত্যেক চ্যাপ্টাররের পরেই কিউয়ার কোড দিয়েছেন তা স্কেন করলেই বিভিন্ন ভিডিও এবং ছবি দেখা যায় লেখকের ট্যুরের। ধন্যবাদ লেখককে এই অস্থির সময়ে কিছুটা সস্থি দেয়ার জন্য।
পড়ার মতো একটা বই। মজার বিষয় হচ্ছে লেখক সাহিত্যিক না হয়েই সচেতনভাবেই তিনি সাহিত্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ নিয়ে কাজ করে ফেলেছেন। আর অবাক করা বিষয় হচ্ছে যে বইটার উৎসর্গ পাতাতে ঠাসা ঠাসা মানুষের গল্প লিখেছেন লেখক, যা সাধারণত কোন বইয়ের উৎসর্গ পাতায় দেখা যায় না। লকডাউনের এই সময়ে এই বইতা আমার নেক্সট ট্রাভেল ডেস্টিনেশনগুলোর একটি লিস্ট বানাতে সাহায্য করেছে। আমার মনে হয় অন্যদেরও ভ্রমণপিপাসু করে তুলতে সহায়তা করবে এই বই।