স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে আবেল ভ্যান ডার বার্গ আমস্টারডাম থেকে কলকাতায় এসেছেন। তবে কলকাতায় আগমনের পেছনে তার একটি বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই সে তার ঠাকুমার কাছে ভারত, গঙ্গা নদী এবং ফুলমতী মাঈয়ের কথা শুনে এসেছে। এই ফুলমতী মাঈ-র সাথে তার পরিবারের অনেক গল্প ও স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। আবেলের কাছে তিনি হলেন এক ভার্চুয়াল ঈশ্বরী, যার কোনো ছবি বা সঠিক তথ্য নেই, তবুও তার প্রতি আবেলের অদৃশ্য আকর্ষণ আছে।
ফুলমতী মাঈ কি সত্যিই ছিলেন, নাকি তিনি কেবল একটি ছেলেভুলানো গল্পের অংশ? এই রহস্যের উত্তর জানতেই আবেল কলকাতায় আসার সিদ্ধান্ত নেয়। তার এই অভিযানের সঙ্গী হিসেবে তিনি পান শচীবাবু, মিতালী (যিনি রোজি নামেও পরিচিত), এবং দিলীপকে। একসাথে তারা কলকাতার বৈচিত্র্যময় শহুরে জীবনে প্রবাহিত হয়ে, বের করতে শুরু করেন দেড়শো বছরের পুরনো ভারতবর্ষের গল্প। তাদের অনুসন্ধান কেবলমাত্র ফুলমতী মাঈয়ের অস্তিত্বই নয়, বরং একটি দ্বন্দ্বময় ভারতীয় সমাজ, ইনডোর সিস্টেম, ওলন্দাজ গায়ানার চিনি চাষের ইতিহাস এবং মার্কাস ও এমিলির প্রেমের গল্পকেও সামনে নিয়ে আসে।
গল্পটি তিনটি ভিন্ন সময় এবং স্থানের মধ্যে আবর্তিত হয়: প্রথমটি বর্তমান কলকাতা, যেখানে আবেল বাস্তবতা ও ইতিহাসের সংযোগ খুঁজছে; দ্বিতীয়টি ডাচ গায়ানা, যেখানে দাসপ্রথা সম্প্রতি বাতিল হয়েছে; এবং শেষেরটি উনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজ শাসিত বিহার। এই তিনটি টাইমলাইন পরিচালনা করা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু লেখক তা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন। প্রতিটি সময়কাল ও স্থানকে চিত্রিত করার ক্ষেত্রে লেখক বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন, যা পাঠকদের সামনে একটি জীবন্ত চিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
গল্পের চরিত্রগুলো কিছুটা রূপকথার আদলে তৈরি হলেও, তাদেরকে কখনই কৃত্রিম মনে হয় না। ফলে, তাদের হাসি, কান্না, আনন্দ ও দুঃখ—সবকিছুই পাঠকদের কাছে জীবন্ত এবং অনুভবযোগ্য হয়ে ওঠে।
রূপকথা ও ইতিহাসের সমন্বয়ে গড়া এই কাহিনী আসলে একটি প্রেমের গল্প, যা প্রমাণ করে ভালোবাসার শক্তি মানুষের জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। হে পাঠক, এই বইটি যদি আগে না পড়ে থাকেন, তবে এখন পড়ুন। নাহলে কিছুদিন পরেও পড়তে পারেন। কিন্তু এই বইটি থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না।