কক্সবাজারের রহস্যঘেরা এক রিসোর্টের হ্যানিমুন স্যুইটে পাওয়া গেল একটা লাশ। বড় অদ্ভুত সেই হত্যাকান্ড, ছুটি কাটাতে কক্সবাজার এসে কীভাবে কীভাবে যেন তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল রাফসান ইবনে সেলিম। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়েছে লোকটির। কিন্তু তার চাইতে অদ্ভুত ব্যাপার- লাশে পাশে পড়ে আছে একটি কাটা পা! কেন খুন হতে হলো তাকে? প্রখ্যাত এক এন.জি.ও.এর কর্মকর্তা ছিল ভিক্টিম, সেই সংস্থা সংক্রান্ত কিছু কি? নাকি ব্যাপারটা মাদক সম্পর্কিত? রহস্যের জাল ছিঁড়তে উঠে-বসে লাগল রাফসান।
নিঠুর খেলা:
বসের চাপে পড়ে রাজি হয়ে গেল সাব্বির। পরামর্শক হিসেবে যাবে ও গাজিপুর; বাজ মাল্টিমিডিয়ার নতুন ছবি 'নিঠুর খেলা'-এর, পুলিসি কর্মকাণ্ডগুলোর ব্যাপারে দেবে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ। তবে এই রাজি হবার পেছনে রয়েছে আরও কারণ। জীবন থেমে থাকে না। তাই ডন ওয়াসার পর শিকদার হয়ে এখন অপরাধ জগতের হর্তা-কর্তা হয়েছে 'কান কাটা ফারুক', ধারণা করা হয় যে অহিংশের সরাসরি লোক সে। সেই কান কাটা ফারুকের সংশ্লিষ্টতা আছে এতে। সেটে গিয়ে জানতে পারল সাব্বির-খুন হয়ে গিয়েছে ওর আগে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এক পুলিস অফিসার। খুনি সম্ভবত এই প্রোডাকশনের কেউ। একদিকে কান কাটা ফারুককে পাকড়াও করা, অন্য দিকে আইনের আওতায় আনা খুনিকে... দুটোই পারতে হবে... খুনি কিংবা অহিংশ, কাউকেই ছাড় দেবে না সাব্বির।
জন্ম সিরাজগঞ্জে, ১৯৮৮ সালে। এসএসসি. পাশ করেন আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে, এইচএসসি-রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজ থেকে। এরপর শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সমাপ্ত করে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ থেকে। বর্তমানে কর্মরত আছেন কক্সবাজার জেলায়।
লেখালেখি শখের বসে, অনুবাদ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রথম প্রকাশিত বই আদী প্রকাশন থেকে-ট্রল মাউন্টেন। সেই সাথে রহস্য পত্রিকায় টুকটাক লেখালেখি।
একটা পুলিশ কেস যদি আপনার সামনে বর্ণনা করা হয় ধাপে ধাপে, আপনি তার সমাধান করতে পারবেন?
পারবেন? রাফসানের ক্লাসে আপনাকে তাহলে স্বাগতম! রাফসান নামটা নিশ্চয়ই চেনা চেনা লাগছে! হ্যাঁ, রাফসান ইবনে সেলিম - ডাক্তারি ছেড়ে যে পুলিশে যোগ দিয়েছিল, অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনার জন্য পুলিশের চাকরিটা বাদ দিয়ে আবারও ফিরে যায় বাপের পেশায়।
ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। রাফসানের ওপর তাই দায়িত্ব পড়েছে - ক্রিমিনাল সাইকোলজির একটা ক্লাস নিতে হবে, শোনাতে হবে নিজের অভিজ্ঞতা। ছাত্রদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে নিজের গল্পটা শুরু করলো রাফসান।
কক্সবাজারের এক দুই নম্বুরী হোটেলে ঘটেছিল ঘটনাটা। মধ্যবয়সী এক লোক মারা গিয়েছে হানিমুন স্যুইটে, রাত্রিকালীন সঙ্গিনী তার উধাও। মৃত্যু হয়েছে রক্তক্ষরণে, ডান পা'টা কেটে নিয়েছে কেউ। বিছানায় পরিপাটি ভাঁজ করে রাখা আছে শার্ট-প্যান্ট ও একটি বোরখা। মাটিতে পড়ে আছে একটি কলম। মেঝেতে ঘষটানো রক্তের দাগ। বাথরুমের মেঝেতে পাওয়া গেল একটা হ্যাকস আর কিছু ওষুধ। কী ভাবছেন, কাটা পা'টা কই? তাও আছে, বাথরুমের বাথটাবে ভরা ড্রাই আইসের মধ্যে শুয়ে!
এবার তাহলে মগজটাকে খাটান, বলুন এ হত্যা না আত্মহত্যা? বলতে পারলে রাফসান সবাইকে চাইনিজ খাওয়াবে বলেছে!
আমি তাদের ক্লাসে থাকলে বেশ হতো। একটা প্রশ্ন ছিল করার, চাইনিজটাও আমার প্রাপ্য করে নিয়েছিলাম।
যা হোক, আপনারা উত্তরটা ভাবতে থাকুন, এরমধ্যে চলুন ঘুরে আসি এক সিনেমার শুটিংয়ের সেট থেকে। বাজ মাল্টিমিডিয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্রটি বানাতে যাচ্ছে, জানেন তো? গাজীপুরে শুটিং চলছে সিনেমার, পরামর্শক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন চিকিৎসক ও আইনরক্ষকরা। কোনো ফাঁক ফোঁকর থাকা চলবে না, সুন্দরবনে সিংহ থাকার মতো ভুল করা তো যাবেই না!
পরামর্শকের দায়িত্ব নিয়ে গাজীপুর এলো গোয়েন্দা সাব্বির। আগের পরামর্শক পুলিশ অফিসারের কাজ পছন্দ হচ্ছিল না বাজের। আড়ালে আরো একটি কাজ আছে সাব্বিরের, কান - কাটা ফারুকের সাথে বাজ মাল্টিমিডিয়ার সংশ্লিষ্টতা খুঁজে বের করতে হবে। ফারুক মৃধা ঢাকার বর্তমান ডন, ধারণা করা হয় গোপন সংস্থা 'অহিংশ'র সাথে যুক্তও সে। শুটিংসেটে পা রেখেই জানতে পারলো সাব্বির, প্রাক্তন পরামর্শক খুন হয়েছে! আরেকবার শুরু হয়েছে অহিংশের খেল!
দু'টি বর্ধিত গল্প, বা উপন্যাসিকা একত্রে 'অহিংশের খেল'। লিসা গার্ডনারের থ্রিলার অনুপ্রাণিত দুটি গল্পকেই লেখক তার আর.এন.এ সিরিজের আলোকে এনে ফেলেছেন। রাফসান, সৈয়দ মারুফ, অহিংশের নামগুলো যারা নীল নক্সা ও চন্দ্রাহত পড়েছেন তাদের জন্য এমনিতেই পরিচিত, না পড়লেও খুব একটা অসুবিধা হবে না।
প্রথম গল্প 'অঙ্গভ্রম' নিঃসন্দেহে দুর্দান্ত। পাঠককে চিন্তার সুযোগ করে দেওয়া গল্পগুলো এমনিতেই চিত্তাকর্ষক লাগে। তারওপর রাফসানের ক্লাস নেওয়ার ঢঙে বলার কারণে নিজেই মনে হচ্ছিলো ছাত্রের সারিতে বসে পড়েছি। মাদক, রোহিঙ্গা, আর কিছু মেডিকেলীয় ও শরীরবিদ্যার বিষয় মিলেমিশে গল্পটি দারুণ বৈচিত্র্যময়। সাথে দেশীয় আমেজ ছিল। কক্সবাজার শহরের সাথে লেখকের যে জানাশোনা তা কাজে লাগিয়েছেন পুরোদমে।
'নিঠুর খেলা' গল্পটিকে বলা যায় 'চোখ ধাঁধানো'। সিনেমার শুটিং, কবরস্থানের সেট, অভিনেতা অভিনেত্রী মিলে নানারকম চরিত্র, জমজমাট এই ব্যাপারগুলো পড়তে ভালো লাগে। কিন্তু কাহিনীটা মোটামুটি আগে থেকেই আন্দাজ করে নেওয়া যায়। এডাপটেশনের গন্ধটাও বেশ পাওয়া যাচ্ছিলো। বাজ মাল্টিমিডিয়া, শাহরুখ খান, জিশা বণিক নামগুলো অবশ্য খুব মজা দিয়েছে, লেখকের রসবোধের প্রশংসা করতেই হয়। এ গল্পের শেষে লেখক সিরিজের পরবর্তী বইটির ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন।
বিবলিওফাইল প্রকাশনী এই বইটি দিয়ে সবে যাত্রা শুরু করেছে। 'অনিন্দ্য' প্রচ্ছদ, মজবুত বাঁধাই আর ঝকঝকে পাতাগুলো সন্তুষ্ট করেছে। পাশাপাশি বইয়ের বিভিন্ন অংশে ফন্ট সাইজ আর লাইন স্পেসিংয়ের রকমফের তাদের অনভিজ্ঞতার ছাপ রেখেছে। দু'টি গল্প যেহেতু, একটি সূচীপত্র বা নিদেনপক্ষে পেজমার্ক রাখার চিন্তা করা যেত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনাল সাইকোলজির ক্লাসে এসে সাবেক পুলিশ অফিসার শোনান এক আজব কেসের ঘটনা। কক্সবাজারের এক রিসোর্টে পাওয়া যায় অদ্ভুত এক লাশ। লাশের কাটা পা পড়ে আছে ওয়াশরুমের ড্রাই-আইসের মাঝে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে মারা গেছে ব্যক্তিটি। কিন্তু খুন নাকি আত্মহত্যা এ নিয়ে জল ঘোলা হতে থাকে। অফিসার রাফসান জানতে পারে এক বিরল রোগে আক্রান্ত ছিলেন মৃত ব্যক্তিটি। সে সাথে জানা যায় চট্টগ্রামের মাদক চক্রান্ত নিয়ে। যা কেসকে আরও জটিল করে দেয়। রাফসান জড়িয়ে যায় এক রহস্যজালে, পারবে কি সে জাল ছিন্ন করতে?
বাজ মাল্টিমিডিয়ার অধীনে মুক্তি পেতে যাচ্ছে চলচিত্র 'নিঠুর খেলা'। পরামর্শক হিসেবে যিনি ছিলেন হঠাৎই উধাও হয়ে যায়। তদন্তের জন্য ছদ্মবেশে পরামর্শক হিসেবে যোগ দেয় সাব্বির। জানতে পারে এক ভয়ানক সত্য; সাবেক পরামর্শক খুন হয়েছে। কিন্তু কেন? অহিংশের কালোছায়া ঘিরে ধরতে থাকে সাব্বিরকে, পারবে কি সে বের হতে?
" অহিংশের খেল", প্রথম অংশ 'অঙ্গভ্রম'- এ অফিসার রাফসানের কাহিনি আছে। রাফসানের পরিচয় এবং পুলিশের চাকরি ছাড়ার পিছনের যে গল্প তা পাওয়া যাবে আর. এন. এ. সিরিজে। এইবারের বইয়ের গল্পে আসি, ছুটি কাটাতে যেয়ে জড়িয়ে পড়ে সে একটি অদ্ভুত কেসে। কাহিনি বর্ণনায় দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম খুন নাকি আত্মহত্যা। সাথে নতুন এক রোগের বিষয়েও জানলাম। বইয়ের দ্বিতীয় অংশ 'নিঠুর খেলা' প্রথম অংশের মতো তেমন ভালো লাগে নাই। আসলে দোষী কে এটা তো আগে থেকেই জানা খালি খুঁজে বের করার পালা।
বিদেশে এমন কলেবরের কাহিনিগুলোকে ছোটগল্প আখ্যা দেয়া হয়। বাংলাদেশে বলে নভেলা। আমি নভেলার বিশেষ ভক্ত না, থ্রিলার-নভেলার আরও না। মাথা খাটানোর বিশেষ সুযোগ থাকে না এতে৷ কাহিনির ভেতরে ঢোকার আগেই কাহিনি শেষ হয়ে যায়। তবে গল্পের কুশীলব নিজে হলে এক্সেপশন করা যায় বৈকি! দুটো নভেলা নিয়ে মূলতঃ বইটি- অঙ্গভ্রম আর নিঠুর খেলা। অঙ্গভ্রমের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে রাফসানকে ঘিরে। মাসুদ রানা'র মতো কক্সবাজারের বালুকাবেলায় ছুটি কাটাতে গিয়ে এক খুনের তদন্তে জড়িয়ে পড়ে সে। তারই কাহিনি অনুজদের শুনানোর দায়ভার পড়েছে। আ ক্লাসিক হু-ডান-ইট! দুটোর মাঝে কলেবরেও বড় অঙ্গভ্রম। আর নিঠুর খেলায় সাব্বিরের দায়িত্ব পড়েছে বাজ মাল্টিমিডিয়ার কোটি টাকার ছবি নিঠুর খেলার পুলিশ পরামর্শক হিসেবে। তবে বের করতে হবে ঢাকার নতুন গডফাদার কান কাটা ফারুকের সাথে এর যোগসূত্র, সাথে অহিংশেরও... দুটোই অ্যাডাপ্টেশন। প্রথমটায় লেখক তার নিরীক্ষাধর্মী কাজে উৎরে গেছেন বেশ ভালভাবেই। মাথা খাটানোর সুযোগ ছিল প্রচুর। কক্সবাজারের পারিপার্শ্বিকের যে বর্ণনা দিয়েছেন তার সাথে র��লেট করতে মোটেও বেগ পেতে হয়নি। এজন্যই গল্পটা আরও উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয় গল্পটা সম্ভবত কিছুটা তাড়াহুড়োয় লেখা। প্রেডিক্টেবল প্লট। দুয়েকটা বিষয়ে আমার কনফিউশন আছে, কিন্তু এখানে উল্লেখ করছিনা কারণ স্পয়লার দেয়া হয়ে যাবে। প্রচ্ছদের কনসেপ্টটা ভাল ছিল। সূচী থাকলে ভাল হতো, তবে কাহিনি যেহেতু কেবল দুটো সেটা পড়ায় বিশেষ বিঘ্ন ঘটাতে পারেনি।
এক নজরে, অহিংশের খেল মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ প্রকাশকঃ বিবলিওফাইল পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৬০ মূল্যঃ ২০০ টাকা রেটিংঃ ৪/৫ (কৃতিত্ব অঙ্গভ্রমের)
আর.এন.এ সিরিজের ২.৫ নাম্বার গল্প অঙ্গভ্রম। ডাক্তার থেকে পুলিশ হয়ে পুনরায় ডাক্তার পেশায় ফেরত যাওয়া রাফসানের গল্প এটা। অনুরোধের ঢেকি গিলে ক্রিমিনাল সাইকোলজির ক্লাস নিতে যায় রাফসান পুলিশের। সেখানে তার 'ছাত্র' দের উদ্দেশ্যে চালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। সে ধাপে ধাপে একটা কেস বর্ননা করবে তাদের, কেউ যদি শেষ হবার আগেই সমাধান করে ফেলতে পারে তাহলে চাইনিজ খাওয়াবে সে তাদের। ঘটনার যায়গা কক্সবাজারে, এক বিখ্যাত এনজিও এর উচ্চপদের কর্মকর্তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় এক হোটেল থেকে, পা কাটা অবস্থায় আর কাটা পা পাওয়া যায় বাথটাবে ড্রাই আইসে ডোবানো অবস্থায়। সাথে পাওয়া যায় পরিষ্কার ভাবে গোছানো এক সেট কাপড় আর একটা বোরখা। রাফসানকে সমাধান করতে হবে আত্মহত্যা নাকি খুন?
সময় সিরিজের ১.৫ নাম্বার গল্প হল নিঠুর খেলা। কাহিনীর নায়ক সাব্বির, নাহ কাহিনী সিনেমার সেটা হলেও সিনেমার নায়ক নয়, পরামর্শক হিসেবে যোগ দেয় সাব্বির। যেয়ে আবিষ্কার করে পূর্বের পরামর্শক খুন হয়ে গেছে অলরেডী, খুনি সেটের মাঝেরই কেউ একজন। শেষ মুহুর্তে অহিংসের আগমন। যদিও ২য় গল্প খুব বেশী টানেনি, তবে পরবর্তী সময় সিরিজের রেশ টেনে গেছে।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ এই বই শেষ করি ডিসেম্বর মাসে, বই পড়া শেষ করে কিছু লিখা অনেকটা নিয়মের মতন হয়ে গেছে, কিন্ত এটা নিয়ে লিখতে প্রায় ৬ মাসের অধিক লেগে গেল।
রোহিত শেঠির কপ ইউনিভার্সের সাথে যারা পরিচিত আছেন, তারা নিশ্চয়ই চরিত্রগুলোর সাথেও ওয়াকিবহাল। সিংঘাম, সিম্বা আর কিছুদিন পরই আসছে সূর্যবংশী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করে, ভারী অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে নামে, গাড়ি উড়িয়ে দর্শকের মন মাতায়। লেখক ফুয়াদ আল ফিদাও বাংলাদেশের থ্রিলার জগতে এমন একটা কপ ইউনিভার্সের সূচনা করেছেন। এখানে হাই বাজেটের দৃশ্যায়ন নেই, তবে লেখায় আছে বুদ্ধি আর যুক্তির খেলা। মাঝে মাঝে একশনও যে নেই, সেটাও কিন্তু বলা যাবে না। তবে সবকিছু ছাপিয়ে যেটি রয়েছে, তা হচ্ছে চরিত্রগুলোর পাকাপোক্ত স্থান। নীলনক্সা, চন্দ্রাহত, সময় এখন থমকে যাবার পড়বার পর হাতে নিয়েছিলাম অহিংশের খেল। কোনো রিভিউ পড়িনি কিংবা রেটিং দেখিনি। সময় এখন থমকে যাবার মতো স্লো বার্নিং থ্রিলার আয়েশ করে পড়েছি। সাব্বির নামের চরিত্রটাকে পছন্দ করেছি। সেখান থেকেই অহিংশের খেল হাতে নেয়া। আর চন্দ্রাহতের রাফসানের কথা তো বলাই বাহুল্য। রিভিউ দিতে গেলে অনেক কথাই বলতে হয়। এতকিছু আসলে বলতে যাচ্ছি না। নিজের মতো টুকটাক কিছু কথা বলে পাঠ প্রতিক্রিয়া দেই। তার আগেই বলে নিচ্ছি, গল্পদুটো এডাপটেশন। তবে ফুয়াদ আল ফিদাহের চমৎকার লেখার সুবাদে বোঝাই যায়নি যে ছায়া অবলম্বনে তৈরি হয়েছে এই গল্পদুটো। যাই হোক-
১) ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে কথাটার প্রমাণ দিতেই রাফসান কক্সবাজারে এসে জড়িয়ে গেল একটি কেসে। তবে না, এবার সে কোনো সমস্যার সমাধান করছে না। বরং ক্রিমিনাল সাইকোলজির একটি ক্লাস নিতে এসে নিজের জীবনের একটি কেস নিয়ে আলোচনা করছে শিক্ষার্থীদের সাথে। রাফসানের শিক্ষার্থীরাও এলেবেলে কেউ নয়। যার যার কর্মক্ষেত্রে একেকজন বিগশট বলতে পারেন। রাফসান ইন্টারপার্সোনাল কমিউনিকেশনের মাধ্যমে কেসটার "শিল্লুক" একটা একটা করে ভাঙতে শুরু করে। হু ডান ইট, হাউ ডান ইট প্লটের একটা সুন্দর কম্বিনেশন। প্রশ্নোত্তর পর্বটা খুব ভালো লেগেছে। কক্সবাজারের মাদক ব্যবসায়ের টুকরো চিত্র এসেছে চমৎকারভাবে। লেখক বোধ করি কর্মক্ষেত্রের সুবাদে এখানে অনেকদিন যাবত কাজ করছেন। লেখার মাধ্যমে কক্সবাজারের দৃশ্যায়ন পাঠকের চোখে ফুটিয়ে তুলবারও কোনো কসুর করেননি। কেসটার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, এটা খুন নাকি আত্মহত্যা। বাথটাবে পাওয়া ড্রাই আইস, পাশে রাখা হ্যাক স নিয়ে পড়তে পড়তে চোখের মাঝে অজান্তেই Saw ছবির কিছু দৃশ্য ভাসতে থাকে। গল্পটার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে, এটা খুন নাকি আত্মহত্যা, সে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে লেখক দুটো পাল্লাকেই সমান দিকে রেখেছেন। কেসের শেষে একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। লেখক সার্কেলে থাকবার একটা সুবিধা বোধহয় সেদিনই পাই। দেরি না করে রাত দুটোয় নক করে বসলাম লেখককে। মাথায় জেঁকে ধরা প্রশ্নটা করে ফেললাম। এরপর আরও একবার গল্পটা পড়ি। উত্তরটা বের করে ফেললাম। অঙ্গভ্রম ভালো লেগেছে। বেশ ভালো লেগেছে। সাব্বির আর রাফসানের ব্যক্তিগত জীবনের কিছু দিকও লেখক উঠিয়ে এনেছেন। সেখানে চর্বিত চর্বন কিছু ছিল না। স্বাদটাও ঠিকঠাক।
২) এবার আসি দ্বিতীয় গল্প নিঠুর খেলার দিকে। বাংলা কিছু কিছু সিনেমার নামগুলো যেমন কাব্যিক টাইপ হয়, এই গল্পটার নামও তেমনই। কিংবা প্লট সিনেমাপাড়াকে কেন্দ্র করেই হয়তোবা। একটি সিনেমা ইউনিটের পরামর্শকের দায়িত্ব নিয়ে গাজীপুর এলো সাব্বির। উপরি কিছু পাওয়ার উদ্দেশ্যে তার চোখগুলো চকচক করছে। হিসেবের খাতায় যখন পাওনার যোগফল কষা শুরু, ঠিক তখনই বাঁধল গোল। প্রাক্তন পরামর্শক খুন হয়েছেন। তাছাড়া সাব্বিরও যে একেবারে ঝাড়া হাত-পা হয়ে এসেছে, তাও বলা যাবে না। শহরের বিশাল এক ডনের সাথে সিনেমার প্রোডাকশন হাউজের কী সম্পর্ক, তাও খুঁজে বের করতে হবে। চরিত্র আছে, প্লট আছে। গল্পও হয়ে গেল। যেসব নাম ব্যবহার করা হয়েছে চরিত্রায়নে, তাতে হাসিও পেল কোনো কোনো জায়গায়। এখানে অঙ্গভ্রমের মতো তেমন বুদ্ধির খেলা নেই। কাহিনীর লেয়ারও গভীর লাগেনি। তবে এক্সিকিউশন ভালো লেগেছে। দিনশেষে এটাই বড় কথা। তবে ব্যক্তিগত একটা আক্ষেপ আছে। চাইলে অহিংশের খেলে দুটো গল্প না রেখে স্রেফ অঙ্গভ্রমের কলেবরটাই বড় করা যেত। জমজমাট লেগেছে। তাছাড়া ক্লিফহ্যাঙ্গারে পরবর্তী বইয়েরও আভাস দেয়া আছে। লেখককে শুভকামনা।
প্রচ্ছদের কনসেপ্টটা ভালো লেগেছে। হাতের মাঝে পাশা। খানিকপর দান চালা হবে। বাঁধাই নিয়েও অভিযোগ নেই। তবে সামনের বার পৃষ্ঠাগুলো আরেকটু উন্নত করবার অনুরোধ থাকল।
প্রথমত যাদের চন্দ্রাহত ও নীল নক্সা (আর.এন.এ সিরিজ) পড়া হয়নাই, তারা কানেক্টিভিটি ও রেফারেন্স বুঝবে না একদম। দ্বিতীয়ত, নিঠুর খেলা গল্পটাই বকোয়াস।
"সময় এখন থমকে যাবার" এর যে স্টেক, যে ভাইব, যে স্টাইল - তার কোনো কিছুই নেই "অহিংশের খেল" বইয়ে। অঙ্গভ্রম তাও উৎরে যেতো। কিন্তু নিঠুর খেলা একেবারেই আজগুবি লেগেছে। যদি এটাকে ইলাবোরেট করে আর.এন.এ সিরিজের ঘটনার ব্যাপারে একটু তথ্য দেয়া হতো, তাহলে হয়তো একটু কানেক্টিভিটি ফিল করা যেতো। তারপরেও নিঠুর খেলার রহস্যের বুনট একেবারেই কাঁচা ছিলো, ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনাশৈলী হাস্যকর+বিরক্তিকর লেগেছে। একবিন্দু থ্রিল দেয়নি আমাকে।
রেটিংটা পেয়েছে কেবল অঙ্গভ্রমের জন্য।
অঙ্গভ্রম ৫ এ ৩ পাওয়ার যোগ্য। নিঠুর খেলা ০.৫।
এটাকে সিরিজের অংশ হিসাবে না ধরে উনার দুই সিরিজের ক্রসওভার হিসেবে আলাদা করে ইন্ট্রোডিউস করলে ভালো হতো। যদিও জানি না, বইটার প্রচারের সময় তা করা হয়েছিলো কিনা। আমি যে অফারে সময় সিরিজ কিনেছিলাম, সেখানে এটাকে সময় সিরিজের দ্বিতীয় বই হিসেবে ইনক্লুড করা হয়েছিলো। এটার সাথে যে আর.এন.এ সিরিজের কানেকশন আছে, তা বলা হয়নি। নিঠুর খেলার লাস্ট দৃশ্যে সামান্য সাসপেন্স ক্রিয়েট করা হইছে, যেটা আমাকে আর.এন.এ সিরিজ পড়তে আগ্রহী করে তুলেছে, অইজন্য নিঠুর খেলা ০.৫ রেটিং পাইলো। নাইলে জিরো বা মাইনাস দিতাম।
অঙ্গভ্রম ইজ গুড। হাইস্টেক কিংবা হাইসাসপেন্স কিংবা হাই অক্টেন থ্রিলার না ধরে, একটা সিম্পল মার্ডার মিস্ট্রি + মেডিক্যাল ফিকশন হিসাবে পড়লে মন্দ লাগবে না।
গল্প দুটোর কোনোটা পড়েই চমকাইনি। তবে মুগ্ধ হয়েছি এক্সিকিউশনে। অঙ্গভ্রম ভালো লেগেছে বেশি, বিজ্ঞানটার জন্য। রাফসানের গল্প বলার স্টাইলটাও সুন্দর ছিল। ইট ওয়াজ ফান।
দ্বিতীয় গল্পটা সিনেমা সেটের। বিশ্বাস করে ফেলার মতো করে বলা। ব্যাকগ্রাউন্ড রিসার্চ ভালো ছিল। খুবই ছোট গল্প, শেষে অহিংশের টাচটা-ই এর মূল উপজীব্য। আর, ফরেনসিক এক্সপার্ট মিঞ্জিয়ার ক্যারেক্টারটা সুন্দর হয়েছে।
বইয়ে দুটো গল্প আছে। প্রথম গল্পের প্লট, কাহিনী বিল্ডআপ, চরিত্রায়ন ভালো লেগেছে। দ্বিতীয় গল্পটার প্লট শুরুতে স্ট্রং থাকলেও শেষে এসে কেমন হালকা হয়ে গেছে। ফিনিশিং ভালো লাগেনি।
বেশ হতাশাজনক একটা বই। ফুয়াদ আল ফিদাহ এর লেখা মনে হয় না। অযথা কথা আর সংলাপ দিয়ে ভর্তি। থ্রিলার বা এডভেঞ্চার বই হিসেবে যায় না৷ বলা যায় হয়ত জোর করে লেখা হয়েছে এমন। বইটা আরও ভালো হতে পারত।