মণীন্দ্র গুপ্তর জন্ম ১৯২৬ সালে অবিভক্ত বাংলার বরিশালের গৈলা গ্রামে। কৈশোর কাটিয়েছেন অসমের বরাক উপত্যকায় মামার বাড়িতে। একই সঙ্গে কবি, প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পী মণীন্দ্রবাবু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কবিতা লিখেছেন ১৯৪০-এর দশক থেকে। প্রথম কবিতার বই ‘নীল পাথরের আকাশ’ প্রকাশিত হয় অনেক পরে, ১৯৬৯ সালে। লিখতে এসেই পাঠকের নজর কাড়েন তিনি। বাংলা কবিতার তৎকালীন অভিমুখের সম্পূর্ণ বিপরীতেই অবস্থান করছিল তাঁর রচনা। এর পরে প্রকাশিত হয় ‘মৌপোকাদের গ্রাম’, ‘লাল স্কুলবাড়ি’, ‘ছত্রপলাশ চৈত্যে দিনশেষে’, ‘শরৎমেঘ ও কাশফুলের বন্ধু’ অত্যাদি কাব্যগ্রন্থ। ১৯৯১-এ বের হয় তাঁর আলোড়ন তোলা প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘চাঁদের ওপিঠে’। ১৯৯১-এ প্রকাশিত হয় আত্মজীবনী ‘অক্ষয় মালবেরি’-র প্রথম খণ্ড। তিন খণ্ডে বিন্যস্ত এই লিখন বাংলা সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। সম্পাদনা করেছেন ‘পরমা’ পত্রিকা। ১৯৭০-এর দশকে কবি রঞ্জিত সিংহের সঙ্গে যৌথ ভাবে সম্পাদনা করেছেন ‘এক বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা’-র মতো সংকলন। হাজার বছরের বাংলা কবিতা ঘেঁটে সংকলন করেছেন তিন খণ্ডে ‘আবহমান বাংলা কবিতা’। ২০১০ সালে পেয়েছেন রবীন্দ্র পুরস্কার। ২০১১ সালে সাহিত্য আকাদেমি।
সমরেশ বসু'র অসমাপ্ত "দেখি নাই ফিরে" পড়ে আফসোস রয়ে যাওয়ায় অরূপ এই বইটা পড়তে বলেছিলো। মণীন্দ্র গুপ্তের স্বভাবসুলভ ভাষিক সৌন্দর্য কিছুটা অনুপস্থিত এখানে; এছাড়া অভিযোগ জানানোর বিশেষ কিছু নেই। রামকিঙ্কর বেইজের পুরো জীবন, আদর্শ, সংগ্রাম, স্বভাব, স্বকীয়তা, খামখেয়ালিপনা প্রভৃতি লেখক দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। রামকিঙ্কর নিজের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার ঘাটতি নিয়ে কুণ্ঠিত ছিলেন ও অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ হওয়ায় শান্তিনিকেতনের মতো জায়গায় এসেও শ্রেণিবৈষম্যের শিকার হতেন প্রতিনিয়ত। পরিচারিকা রাধারানী দেবীর সাথে তার বিবাহ বহির্ভূত দাম্পত্য ও যৌন সম্পর্ক, যা আমৃত্যু স্থায়ী ছিলো, তা নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত আলোচনা করা যেতো। শিল্প বিষয়ে রামকিঙ্করের সাধারণ কথাবার্তাও বেশ তাৎপর্যবাহী। যেমন -
" অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি ছবি আঁকা এবং মূর্তি গড়ার কাজ কোনটাকে বেশি উপভোগ করি। আমি তাঁদের বলি- যখন বর্ণ এবং আলো-কে প্রকাশ করতে চাই, আকাশ আর জলের বিস্তার অথবা নারী এবং ফুলের রমণীয়তা উপভোগ করতে চাই, আমি আঁকি। কিন্তু সূর্য যখন তার শেষ আলোটি মুছে দিয়ে অস্ত যায় আমি চোখ বুজি। অর্ধরাত্রে আমার সন্তান যখন কাঁদে তখন অন্ধকারে তাকে আমি স্পর্শ করি, ভালোবাসি। অন্ধকারের ভিতরেই তাকে আমার বুঝে নিতে হয়। এমনটিই হয় ভাস্কর্যের বেলায়। একটা তীব্র গভীর ব্যক্তিগত অনুভূতি- রং এবং রোদের সাহায্য ব্যতিরেকেই। পাথরের ভিতরে জীবন এবং আকারের অনুভূতি- বর্ণ এবং রৌদ্রানুভূতির চাইতেও তীব্রতর, এটা একটা প্রস্তরীভূত সত্যের মতো।"
রামকিঙ্কর প্রতিনিয়ত মদ খেতেন, বৈষয়িক ছিলেন না একেবারেই, মনে যা আসতো বলতেন ও করতেন। নির্দ্বিধায় প্রেমকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, "যৌনতাই সবকিছু।" এসবের ফলে তিনি অনেকেরই চক্ষুশূল ছিলেন। এ বই পড়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো ভিন্নমতের প্রতি উনি কতোটা সহিষ্ণু ছিলেন তা জেনে। বুদ্ধদেবের "সব পেয়েছির দেশে" পড়ে শতবর্ষ আগের শান্তিনিকেতনকে আমি স্বর্গ ভাবা শুরু করেছিলাম। লীলা মজুমদার, সমরেশ বসু ও মণীন্দ্র গুপ্তের লেখা পড়ে জানা যাচ্ছে সে ধারণা আদ্যন্ত ভুল ছিলো। বইতে রামকিঙ্করের মৃত্যুকালীন বর্ণনা অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী।সমরেশ বসুর দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো রোমান্টিক, সেখানে মণীন্দ্র গুপ্ত অনেকটাই নির্মোহ; যেটা এই জীবনীর আরেকটি ইতিবাচক দিক।
‘আমি একটু একটু মূর্তিও গড়ি’, বেশ কুন্ঠা ভরেই আলগোছে বলেছিলেন বাংলার শ্রেষ্ঠ ভাস্কর রামকিঙ্কর ! করোনার অবরুদ্ধ দিনে সবার আগে বহুদিন ধরেই জমিয়ে রাখা এই বইটাই সবার আগে পড়লাম আগ্রহ ও ভালোবাসা নিয়ে। কবি মণীন্দ্র গুপ্ত আমাদের এক অতি প্রিয় নাম তাঁর আত্মজীবনী ‘অক্ষয় মালবেরি’র জন্য, বাংলায় আমার পড়া শ্রেষ্ঠ আত্মজীবনী সেটা, তাই বিদ্রোহী ছকভাঙ্গা ভাস্কর, চিত্রকর রামকিঙ্করের জীবনকে কিভাবে তিনি গড়বেন শব্দ ছেনি দিয়ে উপন্যাসের পাথুরে জমিনে, সে নিয়েও কৌতূহল ছিল।
বইতে লেখক ভূমিকা নিয়েছেন ঐতিহাসিক গবেষক গোয়েন্দার, যিনি রামকিঙ্করের জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি এমনকি মৃত্যুর পরেও সকল ঘটনার সুলুক সন্ধান নিয়েছেন নানা রটনা ও ঘটনার স্তর সরিয়ে সরিয়ে সত্যের সন্ধানে।
বাঁকুড়া শহরের যুগী পাড়ায় অতি দরিদ্র, নিরক্ষর এক নাপিত পরিবারের ছেলে রামকিঙ্কর প্রামাণিক কিভাবে গ্রামের মেলায় মূর্তি গড়ে হাত পাকালেন, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের নজরে এসে ১৯ বছরের রামকিঙ্কর পৌঁছালেন শান্তি নিকেতনে, সেখানে নন্দলাল বসুই বললেন যে এই ছাত্রকে শেখানোর নতুন কিছুই নেই, তবুও থাকুক সে ক’বছর।
সেই শুরু হলো যাত্রা, সেই যে ‘সুজাতা’ নামের ভাস্কর্য দেখে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং রামকিঙ্করকে বললেন ‘এই আশ্রমটা তুই ভরিয়ে দিতে পারিস তোর কাজে’, তারপর থেকে প্রতিটি ভাস্কর্য, প্রতিটি বিশেষ ছবি, প্রতিটি বিশেষ স্বীকৃতি সবই নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে তিনি বুনে গেছেন শব্দজালে পরম মমতায়।
বেশ প্রামাণ্য বইখানা, সুরেলা ভঙ্গীতে নদীর মত এগিয়ে গেছে রামকিঙ্করের জীবনের সকল বাঁক, উত্থান- নিজের কাছেই পতন, প্রতিটি সম্পর্ক, চরম শিল্প সৃষ্টির মুহূর্ত, শান্তি নিকেতনের বাকী সকলের কাহিনী।
এই বেশী লাইন পড়ার সময় মার্ক করেছি যে সেগুলো তুলে দিলেও কয়েক হাজার শব্দ পেরিয়ে যাবে, তাই আপাত এখানেই সমাপ্তি। তবে রামকিঙ্কর প্রামাণিক কী করে রামকিঙ্কর বেইজ হয়ে উঠলেন কেবল সেই অন্ত্যজ ব্যক্তিগত জীবন নয় তাঁর প্রতিটা মুখ্য সৃষ্টির অনবদ্য বর্ণনা খোঁদাই করা হয়েছে সুনিপুণ ভাবে। রামকিঙ্কর নিয়ে আগ্রহীদের জন্য, উপমহাদেশের আধুনিক ভাস্কর্য ও চিত্রকলা নিয়ে আগ্রহীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
রামকিঙ্কর- বুড়ো মানুষটি অত্যন্ত দুঃখী এবং সুন্দর।
শান্তিনিকেতনের শালীন-ভাবগম্ভীর আবহে প্রাণের উদ্দাম-উত্তাপ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন অন্ত্যজ রামকিঙ্কর। ভাবতেও অবাক হতে হয় ঐরকম রক্ষণশীল পরিবেশে কী করে রামকিঙ্করের আবির্ভাব হয়েছিল। অন্ত্যজ না উল্লেখ করলেই নয়, কারণ শুধু এই এক উত্তরাধিকারের কারণে রামকিঙ্করকে কম নাজেহাল হতে হয় নাই। উদার মনোভাব তৈরির আকাঙ্ক্ষা থাকলেও শান্তিনিকতনেও রামকিঙ্করকে কম ভুগতে হয়েছে। পদে পদে জমেছে হীনমন্যতার আক্রমণ। ছুটে পালিয়েছেন বনের আড়ালে। আড়ালে গিয়ে আওরেছেন ইংরেজি সংলাপ, নিজের ধাঁচে গলা ছেড়ে গেয়েছেন গান। আবার যুবক বয়েসে স্বাভাবিক রোমান্টিক আকর্ষণের জন্য শুনতে হয়েছে, “ভুলে যেওনা কে তুমি? কোত্থেকে এসেছ?” তারপরও শালীন পরিবেশ রামকিঙ্করকে গড়ে পেটে নিতে পারেনি। তিনি বেঁচেছেন নিজের বাঁধনহারা শক্তি নিয়ে। মনে হয়, মাটি আর জীবনের প্রতি গভীর টানই আছে এর মূলে। আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে তার পেছনে ছিল ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের সাগ্রহ নজর। রবীন্দ্রনাথের আশকারা ছিল বলেই রামকিঙ্কর বেঙ্গল স্কুলের কার্বন-কপি করার অচলায়তনে জোরাল-বেপরোয়া কাজ করতে পেরেছিলেন।
সমাজ শান্তিনিকেতনী শিল্পী হিসাবে যে কৌলীন্যের আশা করেছিল তার বিস্তর অভাব ছিল রামকিঙ্করের। আর তার সাথে বাস্তব-বিষয়বুদ্ধির দারুণ অভাব। জীবন সায়াহ্নে পেয়েছেন অঢেল সম্মাননা-রেকগনিশন। এসব তার কাছে কতটুকু মানে রাখত জানি না। তবে পদ্মভূষণ-দেশিকোত্তম-ডি.লিট উপাধি বা ললিতকলা একাডেমীর ফেলো নির্বাচিত হওয়ার পর নিশ্চয়ই শান্তিনিকেতনের শুরুর দিকের হীনমন্যতার দিনগুলোর কথা মনে পড়েছিল। বিদেশ থেকে বহু নিমন্ত্রণ পাওয়ার পরও সারা দেন নাই। নিজস্ব খামখেয়ালি স্বভাবে চিঠিপত্রের খাম না খুলেই রেখে দিয়েছেন। তার পেছনে নিজের যুক্তিও ছিল। “তিনি বলতেন- কী হবে গিয়ে? দেশ ছেড়ে লাভ কী? আমার ছবি আঁকা মূর্তি গড়ার যা প্রেক্ষাপট, যারা অনুষঙ্গ- তারা তো সব এখানেই আছে। বিদেশে গিয়ে শিখবই বা কী? ওদের সব কিছুর খবর তো এখানে বসেই পাওয়া যায়। আর ছবি আঁকা বা মূর্তি গড়া? সে তো এলেমের প্রশ্ন। তার জন্য অত দরজায়-দরজায় ভিক্ষে করা কেন? অনেকেই যান অবশ্য। বিশেষ-বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিল করে সেই তো ফিরে আসতে হয় এই দেশে। অবন ঠাকুর বিদেশ যাননি। যামিনী রায় যাননি। শুনেছি বড়ে গোলাম আলীরও এক ব্যাপার।”
বিদেশী শিল্পী ও শিল্পরসিকেরা তাঁকে নিজেদের মধ্যে চেয়েছিলেন চিন্তার বিনিময় ও কাজকর্মের পরিচয়ের জন্য। কিন্তু রামকিঙ্কর শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাবেন না বলে সমস্ত আমন্ত্রণ নাকচ করে দিয়েছেন। মনীন্দ্র গুপ্তের ভাষায়, “সন্দেহ হয়, ওঁর এই ইউরোপ যাত্রার অনীহা শুধু শান্তিনিকেতনপ্রীতির জন্যই নয়, এর পেছনে গভীরমূল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে তাঁর ছেলেবেলার হীনমন্যতা। অনেকদিন পরে সত্যিটা তিনি বুঝেছিলেন। কথায় কথায় বলেছিলেন- বিদেশ যাওয়া এবং পশ্চিমের শিল্পীদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাতের চেষ্টা না-করার ব্যাপারে আমার একটা ভুল ধারণা আছে। একজন শিল্পীর অ্যাডভেঞ্চার না থাকা ভাল নয়।” শিল্পীর মহিমা জানান দেয়ার জন্য ইউরোপ যেতেই হবে এমন না তবে বিংশ শতাব্দীর ৫০ এর দশকে প্যারিসের নতুন ধারার চিত্রশিল্পী ও ভাস্করদের আড্ডায় রামকিঙ্কর গিয়ে পড়লে পরে কী কাণ্ডটা ঘটতো তা নিয়ে আমাদের কল্পনার অবকাশ থেকেই যাচ্ছে। ভাগ্যিস পিকাসো-মাতিজের জন্ম ভারতবর্ষে হয় নাই, হলে পরে এমন হিংস্র বর্ণাশ্রমের জালে জড়িয়ে তাদের কী হাল হতো?
তারপরও সারা জীবন জুড়ে রামকিঙ্করের নিজস্ব ধারার অ্যাডভেঞ্চার জারি ছিল। তা সে দিশি সুরা প্রীতি বা রাধারানীকে নিয়ে বন্ধনহীন সংসার হোক, কাজের মধ্যে আপাদমস্তক ডুবে থেকে পুরো জীবনটা আনন্দে কাটিয়ে গেছেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী রামকিঙ্কর। চোখ বুজলে হয়তো আজও কেউ কেউ দেখতে পাবেন রামকিঙ্করকে শান্তিনিকেতনের মাঠে খালি গায়ে তালপাতার টোকা মাথায় নাওয়া-খাওয়া ভুলে মূর্তি গড়ে চলেছেন।
চতুর্দিকে ঘটে চলা অবিরত দুঃসংবাদ। এমন সময় যেন অনাচার আর বে-নিয়মই প্রতিষ্ঠিত সত্য। এসবের মাঝেও কিছু লেখা পড়লে মন ভাল হয়। মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত ভাল একদিন শেষ হয়ে গেলেও শুধু এমন কিছু লেখা পড়ে রইবে, পড়ার জন্য। যা কিছু শুভ তার ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে এইসব অক্ষরের ঘ্রাণ হয়তো তখনও বাঁচিয়ে রাখবে প্রাণবায়ু।
মনীন্দ্র গুপ্ত, যাঁর লেখা পড়লে মনে হয় মনে হয় কোথাও গিয়ে লেখালেখি জিনিসটা অতটাও যে সস্তা হতে পারেনি এখনও সে একদিক থেকে ভালোই। যাঁর শৈলী ইহজগত ভুলিয়ে দেয়। একটা ডেলিরিয়াম তৈরি করে। বলেন কম, কিন্তু ওই স্বল্প বলাতেই কোত্থেকে এক উড়ো মেঘ ভেসে আসে। আবার মিলিয়ে যায় আনমনে। যেন একরাশ রিক্ততা বাঁচিয়ে রেখে অকস্মাৎ আড়াল হয়ে গেলো মানুষটা। চৈত্রের শুরুর দমকা বাতাস যেমন। আর এই মনীন্দ্র গুপ্ত যখন রামকিঙ্করে ট্রাভেল করেন তখন সে এক অনির্বচনীয় পথ, যেন একঝাঁক নক্ষত্রপুঞ্জ ক্রমাগত স্পষ্ট হচ্ছে ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে।
বইয়ের বিষয়বস্তু অর্থাৎ কিনা যাঁর ওপর লেখা। খুব সোজা করে বললে তাঁকে নিয়ে বলা যায় না। বলা ধৃষ্টতা। যতটা ধৃষ্টতা ব্রহ্মকে বিশেষণ করা। তাঁকে শুধু প্রণাম করতে হয় দূর থেকে। দিগন্ত শেষে যাঁর প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে আচমকা। তাঁর হাসিমুখ তাঁর দুর্লঙ্ঘ্য বিশাল সৃষ্টির সামনে নতজানু হয়ে নির্বাক স্থবির হওয়া যায় শুধু। তিনি ঈশ্বর, তিনি রামকিঙ্কর...। বাঁকুড়া শহরের যুগীপাড়ার নিতান্তই হতদরিদ্র ঘর থেকে উঠে এসে গ্লোবাল ফিগার হয়ে ওঠা সেই চণ্ডে নাপ্তের ব্যাটা। সম্বল বলতে জন্মগত প্রতিভা বই কিচ্ছু ছিল না যাঁর। কনটেক্সচুয়াল মর্ডানিজমের পথিকৃৎ, দ্যা মাস্টার স্কাল্পচার অফ ইন্ডিয়া, রামকিঙ্কর বেইজ। যাঁর নিয়ে বলা শুরু করে সমরেশ বসু শেষ করে উঠতে পারেননি, যাঁর নিয়ে কাজ করতে শুরু করেও ঋত্বিক ঘটক চলে গেলেন পুরোটা বলার আগেই তাঁর নিয়ে আলাদা করে প্রণিধানযোগ্য বলে কিছু হয় কি! আকাশ বাতাস মহাসমুদ্রের মতোই তিনিও বর্ণনাতীত। বলার মাধ্যমে জানার মাধ্যমে আমরা শুধু তাঁকে নব্য আঙ্গিকে ভালবাসার যাচনাটুকু পরিতৃপ্ত করি মাত্র।
বইটি পড়তে গিয়ে একটি অংশে গিয়ে আমি কেঁদেছি। শেষবারের মতো তখন শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাচ্ছেন "কিঙ্করদা"। এখানে এসেই বোধ হয় বাঁকুড়া থেকে আসা শিল্পী রামকিঙ্করের মূর্ত জীবন পূর্ণ হয়েছে। বাকি এস এস কে এম-এর চিকিৎসার দিনগুলি একটি উপন্যাসের এপিলগ বলা যায়। মনীন্দ্র গুপ্তও চাইলে এখানেই যবনিকা টেনে সরাসরি মৃত্যুতে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু যথার্থ ক্লাইমেক্সের উপন্যাসের পরিপূর্ণতা তার কাছে বেশি জরুরি বলে মনে হয়েছে। রামকিঙ্করকে তিনি পাট খোলা শাড়ির মতো মেলে ধরেছেন। যেখানে অর্জন এবং ক্ষয় পাশাপাশি।
প্রকাশক হিসেবে অবভাসকে ধন্যবাদ। বেছে বেছে কি দারুণ কাজ করে!
রামকিঙ্করের জীবনে সারাজীবনই দুটো সংকট তাঁকে কুরে কুরে খেয়েছে। এক, তাঁর বংশ পরিচয় আর দুই, তাঁর শিক্ষাগত অসম্পূর্ণতা। এই সংকটে পিষ্ট রামকিঙ্কর তাঁর নিজের পরিচয় নিয়েই একসময় হীনম্মন্য ছিলেন। পিতৃপ্রদত্ত পদবি বাদ দিয়ে বেইজটা তাই নিজেই বেছে নেন। শিল্পে সুসংহত হওয়া যে কতটা জরুরি সেটা রামকিঙ্কর এবং চলচ্চিত্র জগতের এক দিকপাল, ঋত্বিক ঘটককে দেখলে উপলব্ধি করা যায়। দুজনের আচরণে আশ্চর্য মিল! সুরাসক্তি আর অসংলগ্ন জীবনযাপন দুজনের সৃষ্টিশীলতাকেই ব্যাহত করেছে। আর খুব কাকতালীয় ব্যাপার যে রামকিঙ্করকে নিয়ে তৈরি অত্যাশ্চর্য তথ্যচিত্রটিই ঋত্বিকের শেষ কাজ৷ কাজটি আলোর মুখ দেখার আগেই ঋত্বিক এবং রামকিঙ্কর দুজনেই অগস্ত্য যাত্রা করেন৷ রামকিঙ্কর এর নিম্নবর্গীয় অতীত শান্তিনিকেতনের মতন উদার স্থানেও তাঁকে ভুগিয়েছে। প্রেম এসেছিল তাঁর জীবনে, কিন্তু স্থায়ী হয়নি। আরেক অন্ত্যজ গোত্রের নারী রাধারানীই ছিলেন তাঁর সঙ্গিনী যিনি সৃষ্টিশীলতা বা বিদ্যাবুদ্ধি, অনুপ্রেরণা কোন দিকেই রামকিঙ্কর এর সহযোগী হয়তো ছিলেন না, কিন্তু রামকিঙ্কর এর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর সাথী ছিলেন। অগোছালো একটা জীবন কাটিয়ে গেছেন শিল্পী। আশ্চর্য এক নির্লিপ্ততা ছিল তাঁর। ঘরের বিছানার নিচে মদের বোতলের স্তুপ থাকত। অথচ সৃষ্টিকর্মের সময় অন্য মানুষ। গুরু নন্দলালের সঙ্গে আর্টের ফর্ম নিয়ে মনোমালিন্যের কথাও রূপকথা হয়ে আছে। মণীন্দ্র গুপ্ত তাঁর আশ্চর্য স্বাদু ভাষায় তাঁর গুরু, শিক্ষক এবং বন্ধু কিঙ্করদাকে পরম যত্নে এঁকেছেন৷ নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি অন্যদের কথা এবং সমরেশ বসুর 'দেখি নাই ফিরে' থেকেও রসদ নিয়েছেন। রামকিঙ্কর বেইজের কাজ এবং জীবন সম্পর্কে জানতে হলে রঙ কাঁকর রামকিঙ্কর এর বিকল্প নেই।