১৯৭১ সাল। যুদ্ধের দামামা বাজছে চারপাশে। কিন্তু এই হট্টগোলের মাঝে নিজেদের মিশনে নেমেছে এক যুবক আর এক কিশোর। কি যেন একটা খুঁজছে তারা।
বাংলাদেশেরই এক মফস্বল। কিন্তু এই মফস্বল ছেড়ে বেরুবার বা মফস্বলে ঢুকবার কোন উপায় নেই। চারদিকে হানাদার বাহিনীর কড়া পাহারা। কি এমন জিনিস পাহারা দিচ্ছে তারা?
জায়গাটার ওপর দিয়ে কোন পাখি ওড়ে না। যতদূর চোখ যায় কেবল বড় বড় কাঁটাঝোপ। শোনা যায় ভেতরে নাকি বদলে যায় বাস্তবতার সব হিসেব নিকেশ।
এসব নিয়েই তমসামঙ্গল। মুক্তিযুদ্ধের নয়, ১৯৭১ সালের গল্প।
মুক্তিযুদ্ধের নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গল্প তমসামঙ্গল। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গল্প সেহেতু মুক্তিযুদ্ধ না এসে পারেই না। ফলে মুক্তিযুদ্ধের আবহেই গড়ে উঠেছে গল্পটা। একেবারে ভিন্নধর্মী একটা প্লট। হলফ করে বলতে পারি, মুক্তিযুদ্ধের সময়কে কেন্দ্র করে এরকম কাজ আগে সম্ভবত হয়নি। বইয়ের গল্প এক তরুণ ও এক সদ্য কৈশোর পেরোনো ছেলের। পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে, জীবন বাঁচাতে হাস্যকর এক মিশনে যেতে হয় ওদের কিন্তু পরবর্তীতে মিশনটা রূপ নেয় গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যাপারে, যা এমনকি বদলে দিতে পারে যুদ্ধের গতিপথ। তমসামঙ্গলের স্টোরিটেলিং নিয়ে কিছুই বলব না। সালমান ভাইয়ার গল্প বলার ধরন আমার আগে থেকেই ভালো লাগে। যেটা বলব, সেটা হল উপমার প্রয়োগ। প্রত্যেকটা অধ্যায়েই দারুণভাবে, শৈল্পিক উপায়ে উপমার প্রয়োগ করেছেন তিনি। যা গল্পটাকে নিয়ে গিয়েছে অনন্য মাত্রায়। অনন্য সিমিলি, মেটাফোর উভয়ই বাড়িয়ে দিয়েছে গল্পের আমেজ। সেইসাথে গল্পে প্রয়োগ ঘটেছে কিছুটা জাদুবস্তবতার। পুরো গল্প জুড়েই বিষণ্নতার একটা ছাপ থাকলেও মাঝেমধ্যে ছোটখাটো হিউমারে মজা পেয়েছি। সেইসাথে যুদ্ধের সময়কার স্পাইয়িং আমেজ সৃষ্টি করেছে একধরণের সাসপেন্স। শেষের দিকে এক ইন্টারেস্টিং মিথলজির সামান্য প্রয়োগ বদলে দিয়েছে পুরো কাহিনীকে। সবথেকে উপভোগ্য ছিল এই অংশটাই। সবমিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য সময় কাটালাম বইটার সাথে। ভাইয়ার কাছে থেকে এরকম আরও কাজ চাই। হাইলি রিকমেন্ডেড।
"নিজের ওপর খুব বেশি যে করুণা হচ্ছে তা নয়। তবে একটা কৌতুহল কাজ করছে। এত কিছুর পরেও বেঁচে আছি কিভাবে? নিজেকে মাঝেমাঝে তেলাপোকা মনে হয়।"
গল্পটা উনিশশো একাত্তরের বাংলার। গল্পটা সুন্দরপুর, এখানে আটকে থাকা মানুষ, পাখিশূন্য আকাশ, বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকা হাড্ডিসার প্রাণ , দুডজন ডিম, প্রান্ত আর মেলানের! গল্পটা তেলাপোকার মতো গর্তে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর!
সহজ কথায় এর চেয়ে ভালোভাবে এ বইকে নিয়ে কিভাবে বলব জানিনা। মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। প্রান্তর বালকসুলভ সবকিছুর প্রতি ভীষণ বিতৃষ্ণা, মেলানের ছেলেমানুষী আটকে রেখেছিল বইয়ের পাতায়। বারবার ওরা মনে করিয়ে দিয়েছে, এত কষ্ট, এত দুঃসহ আতঙ্ক নিয়েও মানুষ যে স্বপ্ন দেখে, ভালোবাসে, ভালো থাকতে চায়! দুইজন ১৭-১৮,২১ বছরের ছেলেদের মুখে কি সহজভাবে যুদ্ধের সত্যিটা উঠেছে! কি অবলীলায় বলে ফেলেছে- "আমাদের জাতিটা অদ্ভুত, বুঝলি? সবকিছু বড্ড তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়ার অভ্যাস আমাদের। এই অত্যাচার থেকে পাওয়া শিক্ষা তো অনেকদিন মনে থাকার কথা। কিন্তু দেখবি দশ বছর যেতে না যেতেই সবকিছু আগের মতন। নতুন কোনো শক্তির উদয় হবে আবারো"
জানিনা সত্যিই যুদ্ধের সময় এমন করে কেউ ভেবেছিল কিনা! ভেবেও যুদ্ধ করে গেছে কিনা! তবে আমার ভাবতে ভালো লাগে যে আমরা জানতাম আসলে যুদ্ধের পর ভালো দিন কিছু নেই, জেনেও আমরা যুদ্ধ করেছি, জেনেও একটুও ভয় পাইনি!
বইটা ভালো লেগেছে! ভীষণই ভালো লেগেছে। এত সাবলীল লেখা বহুদিন পর পড়লাম। বইটা ভালো লাগার অনেকখানি কারণ বইয়ের চরিত্ররা। @salman_reads ভাইয়া এত সুন্দর করে চরিত্রদের সত্যিকারের মানুষে রূপ দেন, মুগ্ধ হবার মতো!
শেষটায় কাহিনী যে মোড় নিয়েছে, তা ভালো লেগেছে না মন্দ লেগেছে এখনো ঠিক করতে পারিনি। তবে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে তা আমার বইয়ের প্রতি ভালোলাগা কমিয়ে দেয়নি কোনো অংশেই!
অনেক বেশি সাবলীল লেখা, মুগ্ধতা নিয়ে একটানা শেষ করলাম। বইটা আমার অনেক ভালো লেগেছে। গল্পটাও দারুণ, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গল্প কিন্তু ঠিক মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে না, আবার মুক্তিযুদ্ধ বাদ দিয়েও না। ফ্যান্টাসিও আছে কিছুটা। বিস্তারিত কিছু বলবনা কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে বইটা পড়ে ভালো লেগেছে।
ফ্যান্টাসি! ভেবেছিলাম মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে থ্রিলার বা ওরকম কিছু লেখা হয়ে থাকবে, কিন্তু ভূমিকা পড়ে ফ্যান্টাসি জেনে আমি খুশিতে বাকবাকুম হয়ে গেছিলাম, কারণ আমার ফ্যান্টাসি বেশিই পছন্দ, আর সালমান হকের মতো সুলেখক ফ্যান্টাসি লিখেছেন তার মানে একটা ভাল ফ্যান্টাসি বই পড়তে পারব।
বইটা ৩ ঘন্টায় একটানা পড়লাম। ইফোর্টলেসলি? না, তা বলতে পারব না। প্রথম ৭০ পৃষ্ঠা মোটামুটি ঠেলে এগিয়ে নিতে হয়েছে নিজেকে। কারণ?
প্রথমত, লেখার ধাঁচে আরাম পাচ্ছিলাম না। আমি সালমান হকের লেখা পড়েছি, পছন্দ করি। বাংলাদেশে আমার সবথেকে প্রিয় জনরা-লেখকদের (মানে যারা থ্রিলার সাইফাই ফ্যান্টাসি হরর ইত্যাদি জনরায় ফিকশন লিখে আসছেন) মাঝে না ধরলেও সালমান হকের লেখা গল্প আমার সবসময় ভালোই লেগেছে।
তাহলে কেন এবার ভালো লাগছিল না? একটা কারণ হতে পারে, কিশোর-সুলভ বালখিল্য দেখতে পাচ্ছিলাম বর্ণনায়। কিশোর উপন্যাস, এমন হওয়া স্বাভাবিক। আর এই ভাল-না-লাগা পুরোপুরি ব্যাক্তিগত কারণ।
আরেকটা কারণ, কিছু ঘটনা এবং কাজ আমার কাছে অযৌক্তিক ঠেকছিল, তাই পড়তে যেয়ে আরাম পাচ্ছিলাম না। [ মাইল্ড স্পয়লার এলার্ট : ক্ষতি হবে না, তাও স্পয়লার না নিতে চাইলে পরের প্যারায় চলে যান ] রাজাকার সর্দার দুজন বন্দীকে ছেড়ে দিচ্ছেন বিয়ের জন্য ডিম খুঁজতে, তাও এমন গুরুত্বপূর্ণ আর্মি বেইসের অবস্থান বা অন্য তথ্য ফাঁস হবার ভয় না করে, এটা খুবই খামখেয়ালী মনে হয়েছে। এমনকি তাদের গ্রাম ছেড়ে যাবারও কোনো বাঁধাধরা নাই, আর গ্রামের ছেলেপেলে, একবার পালালে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব তাকে তার গ্রামে। তাও, ছেড়ে দেওয়া হলো। এমন আরো হোঁচট আমাকে খেতে হয়েছে।
তদুপরি, গল্পে সেঁটে যাবার যা উপকরণ আমার দরকার ছিল, তারা-ই এসেছে একটু দেরীতে। তারপর আর পড়তে বেগ পেতে হয়নি, লেখক মোটামুটি উড়িয়ে নিয়েছেন বলতে গেলে।
লেখক বইটাকে বলেছেন 'লো ফ্যান্টাসি'। মানে, হ্যারি পটারের হগওয়ার্টস অথবা লর্ড অব দ্য রিংসের মিডল আর্থের মতো সম্পূর্ণ আলাদা একটা দুনিয়া এখানে নেই, বরং আমাদের চেনা পৃথিবীতেই ফ্যান্টাসি এলিমেন্টগুলো সীমিত আকারে বিরাজ করছে। কিন্তু সেই প্রেক্ষাপটের নির্মাণ বা ডিজাইনও গুরুত্বপূর্ণ। আর এখানে লেখকের কাজ একদম একশ'য় একশো। মানে দেড়শ পৃষ্ঠার উপন্যাসে যেমন করে ডিটেইল দেখিয়েছেন, এ-ই ঢের। মুক্তিযুদ্ধের কারণে খাবারের সঙ্কট, মূল্যবৃদ্ধি, এমন সব সুচারু বর্ণনা আসলে তখনকার আবহকে অনেক বেশি অনুভবযোগ্য করেছে। যেখানে আমরা আমাদের প্রজন্মের লেখকদের সাধারণত দেখি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখতে বসে আগাগোড়া যুদ্ধটাকেই দেখান, যুদ্ধকালীন মানুষগুলো তাঁরা সামনে আনেন না।
একশন এই বইটার মূল বস্তু না, একশন তেমন একটা আসে-ও নি। যে কয়টা সম্মুখ যুদ্ধ এসেছে, তার বর্ণনায় লেখক আরো যত্নশীল হতে পারতেন, তাহলে পাঠক হয়ে ঘটনাপ্রবাহের খেই হারাতাম না। ** [ স্পয়লার এলার্ট : বই শেষ না করে থাকলে পরের প্যারায় চলে যান ] কাউকে আক্রমণ করে তার পিঠে চড়ে বসতে হলে কমপক্ষে একটা হাত ব্যবহার করতে হয় আঁকড়ে ধরার জন্য। সে��্ষেত্রে, একইসাথে চেইন খুলে নেবার জন্য, আবার ছুরি মারার জন্য হাত মুক্ত থাকে না। লেখক বড়সড় হোঁচট খাইয়েছেন এই দৃশ্য বর্ণনায়। **
আর বাকি থাকে ফ্যান্টাসি। শুরু থেকে এই এলিমেন্টটা লেখক যেমন করে গুছিয়ে এনেছেন, ছোটখাট সূত্র ফেলে রেখে শেষে মিলিয়েছেন, তা চমৎকার ছিল। চমৎকার মিথোস তৈরী করেছেন লেখক, যুদ্ধের সময়ের মাঝে তাকে বসিয়েছেন সুন্দরভাবে। তিনটা ধারার চরিত্রদের মাঝে দুটাকে ডেভেলপ করেছেন ভালোভাবে, খামতি রয়ে গেছে একটায়। কোনো ফোরশ্যাডো ছিল না, যেন মিলিয়ে দিতে হবে বলে মিলিয়ে দিয়েছেন লেখক, এটুকুই।
ঘটনাপ্রবাহ যখন পুরোপুরি ফ্যান্টাসি'র হয়ে উঠলো, তখনকার তাড়াহুড়ো-টা খুব চোখে লেগেছে। শুরু থেকে এতটা যত্ন করে সবটা এগিয়ে এনে, উপসংহার টেনেছেন যে গতিতে, সেটা বাকিটুকুর তুলনায় বেখাপ্পা হয়েছে, এক। আর দুই, ফ্যান্টাসি পাঠক হিসেবে যে-ই না জাঁকিয়ে বসতে চলেছি, তখনি সমাপ্তি। শান্তি পাইনি।
এইটুকু পড়া হলে আপনারা বলতে পারেন, এত সবিস্তারে আমি কেন 'পচা কথা'-ই বলে গেলাম। বইটা কি আমি ভালোমতোই নাকচ (ক্যান্সেল) করছি? না, তা মোটেও না। আধা ঘন্টায় এত কথায় রিভিউ লিখছি তার কারণ, তা-ই লিখেছি যা আপনাকে সাক্ষাতে বলতাম, এবং বইটা নিয়ে বলতে আমি ক্লান্তি বোধ করবো না কখনোই।
সারকথা : চমৎকার একটা কিশোর উপন্যাস। যদি কাউকে ফ্যান্টাসির প্রথম পাঠ দিতে চান, নির্দ্বিধায় তমসামঙ্গল ধরিয়ে দেবেন। উপভোগ্য, গতিশীল একটা বই, তার মাঝে ফ্যান্টাসি রয়েছে এক চামচ। পড়ে ভালো লাগবে যে কারো।
রেকমেন্ডেড? ওই যে, একশ'য় একশ!
তমসামঙ্গল লেখক : সালমান হক জঁরা : কিশোর উপন্যাস, লো-ফ্যান্টাসি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস প্রকাশক : আফসার ব্রাদার্স প্রকাশকাল : বইমেলা ২০২২ পৃষ্ঠাসংখ্যা : ১৬০ মুদ্রিত মূল্য : ৩০০ টাকা
মৃত্যুবাজির শব্দে শহর চুপ, ফুটপাতে জমা রক্তকরোটির স্তূপ; তমসার মাঝে খুঁজি মঙ্গলের ধূপ।
সময়কাল ১৯৭১, সুন্দরপুর গ্রামের পরিবারগুলো এক এক করে গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে। দিনকে দিন পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের অত্যাচার যে বেড়েই চলেছে। তবে সবচেয়ে বেশি যে দুটো বিষয় প্রান্তর চোখে পড়ে তা হলো চরম খাদ্যাভাব ও পাখি শূন্য আকাশ। গ্রামটা যেন হঠাৎ-ই মারা গেছে! মা-বোন গ্রাম ছেড়ে গেলেও প্রান্ত যায়নি। বাবার কবর ছেড়ে কোথাও যাওয়া তারজন্য প্রায় অসম্ভব বলা যায়। কিন্তু বন্ধুদের সাথে খাবার চুরি করতে যেয়ে ধরা পড়ে যায় গ্যাদা রাজাকারের লোকদের হাতে। অন্ধকার ঘরে বসে মৃত্যুর অপেক্ষা করতে থাকা প্রান্ত তখনও জানে না যে নিজের অজান্তেই অদ্ভুত এক মিশনে জড়িয়ে যাবে সে! যুদ্ধের ফলাফল কোনোভাবে জড়িত নয়তো?
যুদ্ধের সময়কারের কথা বলতে চায় না এক দাদু তার নাতিকে। কিন্তু অবশেষে জোরাজুরিতে বলে অদ্ভুত এক গল্প! গল্প নয় বরং স্মৃতিচারণ বলা যায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন একসপ্তাহের গল্প বলেন দাদু যখন তিনি প্রথমবারের মতো দেখা পান প্রিয়বন্ধু ও জীবনসঙ্গিনীর। সাথে এটাও বলেন মেরেছেন দু'জন পাকিস্তানি সৈন্য। লেখক প্রথমেই বলেছেন গল্পটা যুদ্ধের সময়ের হলেও মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস নয় বরং লো ফ্যান্টাসি। কিন্তু আমার কাছে ফিকশন অংশই বেশি মনে হয়েছে ফ্যান্টাসি অল্প একটু আছে বটে।
অপরিচিত কেউ হঠাৎ আপন হয়ে যায় এমনই এক বন্ধুত্বের গল্প বইয়ে ফুটে উঠেছে। মেলানদা-প্রান্তের সম্পর্ক, অভিযান, খুনসুটি পড়ার সময় বেশ মজা পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের গল্প নাহলেও যুদ্ধ, মুক্তিবাহিনী, রাজাকার ও পাকিস্তানি সৈন্যদের কথাও আছে। তবে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়ে ফোকাস করা হয়েছে তা হলো একটা মিথ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এই অংশের আলোচনা তুলনামূলক খুবই কম। ফ্যান্টাসি অংশের কাহিনী যেন রকেট স্পিডে ছুটে চলেছে। প্রথম দিকে কাহিনী যেমন ধীরে এগিয়েছে শেষে তেমনি তাড়াতাড়ি হুট করেই যেন সমাপ্তি টানা হয়েছে। মনে অনেকগুলো প্রশ্ন ও খটকা থেকে গেছে। শুরুতেই যে দু'জন সৈন্য মারার কথা বলা হয়েছে বই শেষ করেও তার হদিস পাইনি! মালানরা অতীত বা ভবিষ্যতে একদিনের জন্য যেতে পারে। কিন্তু পুরোহিত কীভাবে বুঝলো সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ওই সময়েই পাঠাতে হবে? কারণ পড়ে মনে হয়েছে পুরোহিতের বংশ অনেকদিন আগেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। পুরোহিত ও মালান বংশের সাথে শেষে হুট করে জারাই বংশ কীভাবে চলে এলো? প্রথম দুই বংশের মোটামুটি একটা ধারণা দেওয়া হলেও জারাই বংশ অনেকটা অন্ধকারেই থেকে গেছে। প্রেরিত মালানকে শেষে কে গুলি করলো? ফ্যান্টাসি অংশ আরও কিছুটা বড় হলে ভালো হতো।
সালমানের কাজ আমার পছন্দ। তবে ওর মৌলিক কাজ এই প্রথম পড়লাম। এক বসায় না হলেও দুই বসায় পড়ে শেষ করা গেল।
বিষয়বস্তু নির্বাচন ভালো। কিশোর কিংবা সদ্য যুবক হওয়া চরিত্র। ছোট ছোট খুনসুটি, আলাপ, সংলাপ, সাথে যুদ্ধের সময়ের আবহ একটা ভালো অনুভব দেয়। কিন্তু যেই দ্বন্দ বা ঘটনাকে উপজীব্য করে সালমান কাহিনি এগিয়ে নিতে চাইল সেই জায়গাটাই আমার আক্ষেপ রয়ে গেল। শেষে গিয়ে মিথিক্যাল একটা ফিল পাওয়া গেল বটে কিন্তু আশা পূর্ণ হলো না। সালমানের তিন ডাহুক এরপর পড়ব। আর অনুবাদ তো পড়বই সন্দেহ নেই৷
যুদ্ধের সময়কাল নিয়ে লেখা হলেও এই গল্পে আছে রহস্য, ফ্যান্টাসি আর অসাধারণ কিছু চরিত্র।
গল্প শুরু হয় আসলে যখন ১৭ বছর বয়সী প্রান্ত-র দেখা হয় ২১ বছর বয়সী ঠান্ডা মাথার আত্মবিশ্বাসী--অকুতোভয়ী মেলানের সাথে। যুদ্ধের গল্পে আমরা সবসময় সাহসী মানুষের কথা পড়ি। শিঁড়দাড়াহীন ভিতু মানুষ রাজাকারের কাতারে পড়ে। এই গল্পে আমরা এমন একজন চরিত্রের দেখা পাই যার যাত্রা শুরু হয় কাপুরুষ হিসাবে কিন্তু গন্তব্য হয় সাহসীদের কাতারে। ভাল লেখনী তখন-ই হয় যখন লেখক পুরো বই জুড়ে ছোট ছোট ক্লু রাখেন। শেষ-টুকু পড়ে মনে হয়েছে, আরে তাই তো, পুরো বই-তে তো এসব ক্লু রাখা ছিল। ভীষণ উপভোগ্য এক বসায় শেষ করে ফেলার মতো বই।
বেশ দারুণ। এক বসায় পড়ার মতো বই। প্রান্ত এবং মেলানের রসায়নটা দারুণ। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ সুখপঠ্য। তবে আরও বিস্তৃতি করার সুযোগ ছিল। শেষটা হুট করেই হয়ে গেলো। তবে কিছু প্রশ্ন রয়ে গেলো। আরকটু বিস্তৃত করলে খারাপ হতো না।
বইটা উপহার পাঠানোর জন্য আফসার ব্রাদার্সকে অসংখ্য ধন্যবাদ!
তমসামঙ্গল পড়ার আগে দুটো বই পড়ার চেষ্টা করেছি, পারিনি। এই বইটা পড়তে কোনো চেষ্টাচরিত্র করতে হয়নি, তাকিয়ে থাকলেই গড়গড় করে পড়া হয়ে যাচ্ছিল এবং একটানে শেষও হয়ে গেছে!
বইয়ের পটভূমি ১৯৭১ সাল। চরিত্ররা কিশোর বয়সী। বইটা যুদ্ধ নিয়ে নয়, যুদ্ধের সময়কে কেন্দ্র করে লেখা ফ্যান্টাসি ঘরানার উপন্যাস। তবে যুদ্ধকে নিখুঁতভাবে ধরে রাখা আছে কাহিনিজুড়ে। ডিটেলের প্রতি মনোযোগ আমার সবসময়ই ভালো লাগে যেমন শুরুতেই লেখক বলছেন─আগে দাদার দিকে মাথা উঁচু করে তাকাতে হতো, আর এখন আমিই দাদার চেয়ে একটু লম্বা। এখান থেকেই আসলে বইটা খুব ভালো লাগতে শুরু করে। এমন আরো একটা জায়গা আছে, চৌদ্দ ডিসেম্বরের প্রতি সম্মান দেখিয়ে লেখা সম্ভবত।
গল্প বলা টাইপ রচনাশৈলী, হিউমার, যুদ্ধ ও যুদ্ধকালীন মানুষের জীবনযাপন নিয়ে লেখার সময় যত্নের ছাপ সব মিলিয়ে আমার অনেক ভালো লেগেছে তমসামঙ্গল। উপহারের বই এত ভালো লাগাটা বিশেষ আনন্দের ব্যাপার।
সুন্দর প্রচ্ছদ, পুস্তানি, ইলাসট্রেশন আর প্রতি অধ্যায়ের শুরুতে (স্বাধীনতার প্রতীকস্বরূপ?) সূর্যটার জন্য প্রকাশককে আরো একটা ধন্যবাদ!
তাই বলে সে সময়ের সব গল্পই কি মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই হতে হবে? গল্পের প্রয়োজনে কিংবা সময় পরিক্রমায় যুদ্ধের উল্লেখ আসবে বটে, কিন্তু যুদ্ধই মূলকথা নয়। যুদ্ধের ডামাডোল আছে, নৃশংসতা আছে, আছে মুক্তিকামীদের সাহসিকতার আখ্যান। কিন্তু সব পাকিস্তানি যোদ্ধাদের লক্ষ্য যেমন সরকারি নির্দেশ মানা নয়, ঠিক তেমন মুক্তিযোদ্ধা দলের সবার উদ্দ্যেশও নয় স্বাধীনতা। ব্যক্তিগত কিছু টার্গেট নিয়ে দুপক্ষেই ঘাপটি মেরে আছে কেউ কেউ।
মুক্তিযুদ্ধের গল্প, স্বাধীনতার গল্প এর সাথে হালকা ফ্যান্টাসি কিংবা ইতিহাস যোগ করে দিয়ে নিজের এই মৌলিক লিখেছেন সালমান হক ভাই। 🚩🚩🚩 < স্পয়লার থাকতে পারে > কিছু খটকা যে একেবারেই ছিলো না এমন না। যেমন রসুলপুর থেকে যাওয়ার পথে একেবারেই নির্বিঘ্নে বের হয়ে গিয়েছে দুজন, অথচ প্রথমেই বলা যা জনপদের চারিদিকেই কড়া পাহারা পাকিস্তানিদের৷ এতোটাই কড়া, বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসতেও সমস্যা হয়। আবার, যে রাজাকার দলের হাতে ধরা পড়েছিলো তারা, পুরোপুরি গেরিলা দলের মতো আচরণ করেছে। হুট করে এসে পড়েছে, আবার মিটমাট হওয়ার পর অনেকটা হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার মতো করেই চলে গিয়েছে। রেললাইন থাকে সাধারণত আশপাশ থেকে সামান্য উঁচু, সেক্ষেত্রে রেললাইন ধরে গেলে দিনের বেলায় বহু দূর থেকেই চোখে পড়বে, অথচ প্রান্ত-রা দুজন কারো চোখেই পড়েনি। আরেকটা জিনিস খটকা লেগেছে, ১৯ বছর বয়সের তুলনায় প্রান্তকে অনেক ইমম্যাচিউর মনে হয়েছে। 🚩🚩🚩
তবে সবমিলিয়ে উপভোগ্য আর এক বসায় শেষ করে ফেলার মতো বই। ভালো লেগেছে।
তমসামঙ্গল সালমান হক প্রকাশনী: আফসার ব্রাদার্স
This entire review has been hidden because of spoilers.
তমসামঙ্গল- বাংলাদেশের যুদ্ধ সময় যত কিছু নিয়ে যত গল্প পড়ছি তারচেয়ে অনেক বেশি আলাদা এইটা। গল্পটা যেমন যুদ্ধের তেমনই মালান বংশের।সুন্দরপুরের মালান মন্দিরের চাবি খুজতে তাদের বংশধরেরা কিভাবে যুদ্ধের সময়টা পার করে তার দুইটা মিশ্রণ এতো অসাধারণ।আমার পড়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অন্যান্য ঘটনা নিয়ে অন্যতম একটা সেরা বই।শেষের মিথলজি টা এককথায় সেরা।গল্প নিয়ে কোনো ধারণা আমি দিবো নাহ।পড়লেই বুঝবেন কেমন অসাধারণ।থ্রিলার ব্যাপারস্যাপার , সেই সময়ের অন্ধকারের দিনগুলিও আসল গল্পের পাশাপাশি সমান ভাবে জায়গা কারে।বেশ মজা পাবেন ডিম খোঁজা নিয়ে মেলানদা আর প্রান্তর পরিচয় এবং নানান ঘটনা।মেলানদা চরিত্রের প্রেমে পড়ে যাবেন এমন অসাধারণ ভাবে প্রকাশ করা হইছে।এক অদ্ভুত মিথলজি আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেমন ভাবে মিলিত হইলো পড়ে দেখেন।সেরা একটা গল্প!
৩.৫ প্রথমেই বলি,ফ্ল্যাপের লেখা পড়ে মানে প্রথম লাইন পড়ে যা ভেবেছিলাম বইটার গল্প তার ধার দিয়েও যায়নি। ১৯৭১ সাল, যুদ্ধের দামামা বাজছে চারপাশে- একথা শুনলে যে দৃশ্য চোখের সামনে ভাসে,বই মোটেও তেমন নয়।অবশ্য এ কথা লেখজ নিজেই বলে দিয়েছেন।মুক্তিযুদ্ধের নয়,১৯৭১ সালের গল্প। আমি যখন ফ্যান্টাসি কথা শুনি,আমার মাথাতে অনেক গল্প,অনেক সিনারিও ঘুরতে থাকে,অদ্ভুত অদ্ভুত সব সম্ভবনা চোখের সামনে ভাসে। পড়ার সময় এর সাথে যদি একটুও মিলে যায়,তবে আহ্লাদে আটকানা হয়ে যায়।এটার ক্ষেত্রেও অল্প মিলে গেছে। লেখকের ভাষা যে সাবলিল,তা ওনার অনুবাদগুলো পড়লেই বুঝা যায়।এই বইয়েও তার ব্যতিক্রম হয়নি।যুদ্ধের সময়ের লেখা এভাবে লেখা যায়,তা আগে চিন্তা করিনি।আবার মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস নয়,কিন্তু যুদ্ধের কিছু কিছু দিক যে উঠে আসেনি,তাও কিন্তু নয়।এ যেমন গল্পের এক অংশে হানাদারেরা নৃশংসভাবে কিছু লেখাপড়া জানা মানুষ হত্যা করলো।এ কী আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ইঙ্গিত করেনা?
কয়েকটি জায়গায় যে ভ্রু কুঁচকে যায়নি এমন না। আবার বিভিন্ন অংশ পড়ে মনে হচ্ছিলো এতে আরো কিছু থাকা দরকার ছিলো,আরেকটু বিস্তারিতভাবে চরিত্রগুলোকে সাজানো যেতো। শেষটাও যেনো ধুম করে হয়ে গেছে। তাও সুপাঠ্য বলেই বিবেচ্য হবে এই বই। ১৯৭১ এর সময়কার অন্যরকম গল্পের স্বাদ নিতে এই বই তুলে নিতে পারো।নিরাশ হবে না।
সালমান ভাইয়ের অনুবাদের ভক্ত আমি, কিন্তু মৌলিক এটাই প্রথম পড়লাম। শুরুটা ভালো লেগেছিল, যদিও গল্পটা শুরুতেই অ্যাটেনশন গ্র্যাব করে না, তবে সাবলীল লেখনীর কারণের একটানা পড়ে যাওয়া যায়। যুদ্ধের সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, খাদ্যাভাব, ফ্যান্টাসি এলিমেন্টের বিল্ডাপ ভালো ছিল। বইয়ের দ্বিতীয় অর্ধেকে সম্পাদনা এবং প্রুফ্রিডিংয়ের ঘাটতি প্রবলভাবে চোখে পড়েছে। প্রচুর মিসিং শব্দ ছিল, বানান ভুল ছিল। এছাড়া অ্যাকশন সিকোয়েন্সের ডিটেইলিংয়ে ঘাটতি ছিল। হঠাত জারাই গোত্র কোত্থেকে এলো তাও বুঝলাম না। শেষটা যাস্ট তাড়াহুড়া করে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে মনে হল। বইটা আরো ৫০/৬০ পৃষ্ঠা বেশি হলে হলে এই বিষয়গুলোর উপযুক্ত সমাধান পাওয়া যেত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা, ধ্রুবর দাদার দুজন পাক সেনা মারা দিয়ে গল্প শুরু হলেও পুরো গল্পে সেই পাক স���না মারার হদিস পেলাম না।
ঠিক এইমাত্র বইটি শেষ করে তা নিয়ে লিখছি আমি। সাধারণত কোনো বই শেষ করবার পর প্রতিক্রিয়া লিখতে আমি কিছুটা সময় নেই, চিন্তা করি আগে বইটা নিয়ে। এক্ষেত্রে বইটা এখনও আমার পাশে আধখোলা হয়ে পড়ে আছে। কারণ খুব বেশি কথা বলবার ইচ্ছে নেই বইটি নিয়ে, আমার ধারণা তাতে বইটির সঠিক মূল্যায়নটা আমি করতে পারবোনা। এই মূহূর্তে যেমনটা অনুভব করছি শুধু সেটা লিখব, বিশ্লেষন করবো পরে।
তমসামঙ্গল, যেটাকে খন্ডালে অর্থ দাঁড়ায় অন্ধকার কাব্য, কিংবা অন্ধকার পুরাণ। বইটি নিতান্তই এই ভুখন্ডের সবচাইতে অন্ধকার সময়ের এক গল্পই বলে, ১৯৭১! একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের বই এটি নয় তা ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন যারা বইটি নিয়ে খোঁজখবর রেখেছেন। বইটি একটি লো ফ্যান্টাসি যা মুক্তিযুদ্ধ এর সময়কে কেন্দ্র করে লেখা। আমার সবসময় একটা ইচ্ছা ছিলো যুদ্ধের সময়ের সাধারণ মানুষদের গল্প পড়তে। সেই আকাঙ্খা খুব বেশি পূরণ হয়নি যেমনটা, সেরকম এই ধরণের বই সেই পটভূমিতে লেখা যেতে পারে এরকম চিন্তাও মাথায় আসেনি কখনও। সেক্ষেত্রে বইটি বিষয়বস্তুর দিক থেকে অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার।
বইটির ভালো লাগার দিক ছিলো সবার প্রথমেই গল্প, লেখকের অত্যন্ত সাবলীল লেখা, আর শেষ করা একটা Bizarre অনুভূতি দিয়ে। এই সময়কার পটভূমি নিয়ে এই কিছুদিনের মধ্যেই আমি দুই একটা অলৌকিক গল্প পড়েছি, এখানে সেরকম একটা ব্যাপার থাকলেও অলৌকিকতা ঠিক সরাসরি উপস্থিত নেই। লেখক সালমান হক কিংবা প্রকাশক আবরার আবীর ভাইকে আমি নিজে বইমেলায় গিয়ে দুই তিনদিন জিজ্ঞেস করে এসেছিলাম 'তমসামঙ্গল' কবে আসবে? এ থেকে বইটা নিয়ে আমার আগ্রহ কতটা ছিলো বলার আর প্রয়োজন পড়বেনা।
অল্প কিছু ব্যাপার ঠিক মন মতো হয়নি আমার জন্য। যেমন গল্পে আমার মনে হয়েছে অনেক ছেঁড়া সুতো মেলেনি। শেষদিকে এসে অবশ্য মনে হচ্ছিলো ইচ্ছাকৃত ভাবেই সেটা করেছেন লেখক। আর শুরুর দিকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না কি হচ্ছে। গল্পটা শেষের দিকে এসে যেভাবে জমলো, সেটা শুরুতে আরেকটু আভাস পেলে হয়তো ভালো লাগতো। কারণ একেবারেই প্রায় তুচ্ছ একটা বস্তুকে কেন্দ্র করে গল্প ধরে অন্ধের মতো আগাচ্ছিলাম কিছুটা। তবে হ্যাঁ সে সময়টার একটা চিত্র মাথায় ঢুকিয়ে দেবার জন্য হয়তো সময় নিয়েছেন লেখক এবং সে ব্যাপারে তিনি সফল।
ভিন্নমাত্রার একটা মেলানকলিক এই বইটা, বাস্তবতাই যে সময় অস্বাভাবিক ছিলো সেই সময়ে একটা অন্যরকম গল্প বলার চেষ্টা করাটা অবশ্যই সাহসের ব্যাপার।
একটা কিশোর উপন্যাস জমে উঠতে যা যা লাগে প্রায় সব উপাদানই সালমানের তমসামঙ্গলে আছে। কাহিনীর গতি ও ত্রুটির পাশাওয়াশি লেখকের আবহ নির্মাণের চেষ্টাটা প্রশংসনীয়। প্রায় অনুভব করা যাচ্ছিলো একটা পর্যায় অব্দি। আমার ভালো লেগেছে একাত্তরের প্রেক্ষাপটে ওর এই পেজটার্নার।
একটা দরকারি সমালোচনা শুধু যোগ করবো। সালমান শুরুতে আমাদের সুন্দরপুর দেখাচ্ছিল, এর মানুষগুলোকে ও গল্পটাকে। শেষে এসে সে দেখানো বন্ধ করে বলা শুরু করে। শেষে এসে সাসপেন্সের যে নিরসন, সেই এক্সপ্লানেশনের উপকরণগুলো পুরো উপন্যাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখলে মনে হয় আমার খুব ভালো লাগতো।
লেখকের পরবর্তি মৌলিক উপন্যাসের জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করবো।
গল্পটা মুক্তিযুদ্ধের সময়ের,কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের গল্প নয়, আবার মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিয়েও নয়! গল্পটা এগিয়েছে একজন ১৯ বছরের কিশোর প্রান্ত আর ২১ বছরের তরুণ মেলানকে নিয়ে।মেলানের ছেলেমানুষী আর প্রান্তর কিশোর বয়সের বিরক্তি পুরো গল্পটাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। তারা আসলে একটা মিশনে নেমেছে।তাদের মিশনের সাথী হয়েছে অনেকে,অনেকে হারিয়ে গিয়েছে।অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েও,তারা সফল হয় তাদের কাজে। এইটাই আমার প্রথম এই লেখকের পড়া কোনো বই।অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় লেখা হয়েছে পুরো বইটা। মুক্তিযুদ্ধের সাথে মিথলজি মিলিয়ে লেখক গল্পটাকে অন্যমাত্রায় রূপ দিয়েছে।
১৯৭১ মানেই আমরা জানি মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম, ত্রিশ লক্ষ মানুষ যে যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। অনেক মানুষ দেশছাড়া হয়েছেন, অনেক নারী সহ্য করেছেন অসহনীয় নির্যাতন। কিন্তু সে সময়ে আমাদের না জানা কোন গল্প কি থাকতে পারে? সশস্ত্র যুদ্ধ, গণহত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘর লুটপাটের আড়ালে অন্য রকম কোনো অন্ধকার কি লুকিয়ে থাকতে পারে না? কখনো ভেবে দেখেছেন এভাবে?
আমাদের লেখক ভেবেছেন। আর সেরকম গল্প নিয়েই বই তমসামঙ্গল। ১৯৭১ এর গল্প, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের গল্প নয়। মুক্তিযুদ্ধ প্লটের গল্প, আড়ালে থাকা অন্ধকারের গল্প।
আমি সাধারণত নতুন নতুন বেরিয়েছে এমন বইয়ের হাইপ দেখে কিনি না, কিন্তু এই বইয়ের ফ্ল্যাপের লেখাটা কেন যেন খুব টেনেছিল। তাই অর্ডার করে ফেলেছিলাম, পড়ে ফেলতেও দেরি করি নি একদম। পাঠ প্রতিক্রিয়া জানতে চান? আমি পড়া শেষ করে অনেকটা সময় স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম, বুঝেই উঠতে পারি নি কিভাবে কি হয়ে গেলো। এভাবেও যে একটা গল্পকে সাজানো যায়, আমাদের চিরচেনা প্লটে এত অভিনত্ব আনা যায় সেটি গ্রহণ করতে বেশ সময় লেগেছিল। নিঃসন্দেহে সালমান হকের অন্যতম একটি সৃষ্টি "তমসামঙ্গল"।
এতদিন জানতেন কেচো খুঁজতে কেউটে বেরিয়ে পড়া, আজ হয়তো জানবেন কি করে ডিম খুঁজতে গিয়ে বছর বছর পুরোনো বলিদান বেদী বেরিয়ে পড়ে, শত শত পাখির নিস্পন্দ দেহ খুঁজে পাওয়া যায়।
মুক্তিযুদ্ধ এই বইয়ের মুখ্য কেন্দ্রবিন্দু না হলেও মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে যে অত্যাচার, অনাচার, ত্রাস চলেছিল পুরো দেশে আর মানুষ যে ভয়াবহ জীবন যাপন করেছিল, খাদ্যাভাব, পালিয়ে বেড়ানো, দুঃখ বেদনা, বাড়িঘর, সম্পত্তি হারানো - তা স��পষ্ট এবং জোরালো ভাবে তুলে ধরেছেন লেখক।
সব মিলিয়ে আমার কাছে বেশ লেগেছে বইটি। যদিও কিছু জায়গায় ভাষাগত কারণে অসামঞ্জস্য আর অস্পষ্টতা রয়েছে, এবং কাহিনীর টাইমলাইন মাঝে মাঝে গুলিয়ে ফেলেছি আমি। এ বাদে আমার চোখে আর কোনো ত্রুটি পাই নি।
নতুন লেখকের বই পড়েন যারা তারা তো বটেই, যারা সাধারণত পড়েন না তারাও বেশ উপভোগ করবেন বলে আমি মনে করি। এমন গল্পের ধারা অন্তত আমি এর আগে পাই নি।
পড়া শুরু করে যা বলেছিলাম “ ২৫শে মার্চ থ্রিলার পড়ার পরে আর কোন থ্রিলার ভালো লাগছে না”। অনুভূতি শেষ পর্যন্ত তাইই থাকলো। তমসামঙ্গল নামটা, বইয়ের প্রচ্ছদ আর বইয়ের ফ্ল্যাপের লিখা যতটা সুন্দর ঠিক ততটা সুন্দর যদি পুরো গল্পটা হতো তাহলে একদম খাপে খাপ হয়ে যেত। প্রথমত পুরো বইটাকে ২১ টা অধ্যায়ে ভাগ করা অযৌক্তিক লেগেছে কেননা এক অধ্যায়ের শেষ লাইন থেকে পরের অধ্যায়ের শুরুর লাইন শুরু হয়েছে। সুতরাং এইখানে ২১ টা অধ্যায়ের কোন দরকার ছিল না। ফ্ল্যাপের লেখা পড়ে যা ভেবেছিলাম বইটার গল্প তার ধার দিয়েও যায়নি। প্রথম দিকের ডার্ক কমেডির প্রচেষ্টা যেমন মাঠে মারা গিয়েছে তেমনি শেষ অঙ্কে অকাল্ট থ্রিল বা মিস্ট্রি যেটাই আসুক না কেন ১৯৭১ এর সেটাকে বড় বেমানান ঠেকেছে। কোন চরিত্রের সুন্দর কোন বর্ণনা নেই আবার বিশ্বাসযোগ্য কোন তথ্য পাই নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা, ধ্রুবর দাদার দুজন পাক সেনা মারা দিয়ে গল্প শুরু হলেও পুরো গল্পে সেই পাক সেনা মারার হদিস পেলাম না।
পার্সোনাল রেটিংঃ ১/৫
এই ১ তারকা দিয়েছি কয়েকটা স্পেসিফিক লাইনের জন্য যা মনে ধরেছে।
“আমাদের জাতিটা অদ্ভুত, বুঝলি? সব কিছু বড্ড তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়ার অভ্যাস আমাদের। এই অত্যাচার থেকে পাওয়া শিক্ষা তো অনেক দিন মনে থাকার কথা। কিন্তু দেখবি দশ বছর যেতে না যেতেই সবকিছু আগের মতন। নতুন কোনো শক্তির উদয় হবে আবারো।" আমরা আসলেই সব কিছু খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যাই। তা না হলে কি আমাদের এই অবস্থা হয়?
বইঃ তমসামঙল লেখকঃ সালমান হক প্রচ্ছদ শিল্পী: আরাফাত করিম প্রকাশনীঃ আফসার ব্রাদার্স প্রথম প্রকাশঃ একুশে গ্রন্থমেলা, ২০২২ পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৫০ মুদ্রিত মূল্যঃ ৩০০ টাকা ১৯৭১ সালের একটা গল্প, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গল্প তবে মুক্তিযুদ্ধ কে কেন্দ্র করে না। বলা যেতে পারে সেই অস্থির সময়ে কয়েকটি চরিত্রের জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে বলা একটি গল্প এটা।
একটু ফ্যান্টাসিও আছে, কিশোরবয়সী পাঠকদের ভাল লাগবে বলে মনে হয়। একটা চরিত্রে প্রতি বিরক্তি একটা সময়ে মায়ায় রুপ নেয়, তাই বলা যায় চরিত্র নির্মানে লেখক সফল।
এটায় ফ্যান্টাসি এঙ্গেল আছে একটা - যেকোন জিনিস তখনি ভাল লাগে যখন রুপকথা হলেও সেটায় একটা রিলেভেন্স কিংবা খানিকটা বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে, এক্ষেত্রে রেলেভেন্স দুর্বল।
কাজেই ফ্যান্টাসির গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা কম বলে মনে হয়েছে। ঝরঝরে গল্প, টানা পড়ে যাওয়া যায়। আমি একদিনে পড়ে শেষ করেছি। প্রচ্ছদটা সুন্দর লেগেছে তাই পৃষ্ঠা উলটে প্রচ্ছদশিল্পীর নাম দেখে নিয়েছি। বইয়ের নামটাও ভাল লেগেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গল্প বলেই আলাদা একটা আগ্রহ ছিল, সেক্ষেত্রে মিশ্র অনুভূতি হয়ে পড়ার পর।
প্রচুর তাড়াহুড়ো আর অসংলগ্ন সংলাপের ছড়াছড়িতে আমার পড়তে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। প্রথম দিকের ডার্ক কমেডির প্রচেষ্টা যেমন মাঠে মারা গিয়েছে তেমনি শেষ অঙ্কে অকাল্ট থ্রিল বা মিস্ট্রি যেটাই আসুক না কেন ১৯৭১ এর সেটাপে বড় বেমানান ঠেকেছে। প্রচুর সময় নিয়ে প্লট বিল্ড আপ আর ক্যারেক্টারাইজেশন করলে হয়তো এটা সামলানো যেত। অনুবাদক সালমান হক আমার প্রিয়। আমি চাই তিনি সময় নিয়ে মৌলিক লিখুন। গল্পের প্লট পয়েন্টের চেয়েও সংলাপ কিংবা চরিত্র চিত্রায়নে কাজ করুন।
৪.৫⭐ অসম্ভব সুন্দর একটি বই পড়া শেষ করলাম। বইটির শুরু থেকেই দারুণ মুগ্ধতার সাথে পড়ছিলাম। লেখক সালমান হক ভাইয়া অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় লিখেছেন। বইটি একটানা পড়েছি, এবং বইটির অন্যতম চরিত্র মেলানকে আমার সবথেকে বেশি ভালো লেগেছে। আমার মতে, 'তমসামঙ্গল' বইটি এই ২০২২ বইমেলায় প্রকাশিত অন্যতম সেরা মৌলিক উপন্যাস। যার মধ্যে পাঠক একই সাথে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পরিস্থিতি, রহস্য এবং ফ্যান্টাসির স্বাদ পাবে। এবং পরিশেষে বইটির প্রচ্ছদের প্রশংসা করতেই হয়। প্রচ্ছদটি অসম্ভব ভালো লেগেছে। হ্যাপি রিডিং
ইন্টারেস্টিং! মুক্তিযুদ্ধ আমার খুব পছন্দের জনরা। আবার ফ্যান্টাসি অপছন্দের। প্রথমদিকে পড়তে বিরক্ত লাগছিল কিছুটা। কি এক ডিম খোঁজাখুঁজির কাহিনি! শেষে এসে খুব দ্রুত গল্প টার্ন নিয়ে শেষ হয়ে গেল। আর শেষটার জন্যই বিরক্তিটা ভালো লাগায় পাল্টে গেল! অন্যসব ফ্যান্টাসি গল্পের মত গাদা গাদা থিওরি বা রুপকথা দিয়ে ভরা না। খুব অল্প কয়েকটা লাইনে ফ্যান্টাসির পুরো গল্পটা বলা হয়ে গেছে। পুরো বই জুরে স্লো চলা একটা গল্পের খুব ফাস্ট একটা এন্ডিং এ সব প্রশ্নের উত্তর মিলে গেছে। পারফেক্ট একটা এন্ডিং ছিল!
যদিও একদম শুরুতেই বলা আছে এটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প না বরং মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গল্প তবুও মুক্তিযুদ্ধের মত সেনসিটিভ একটা বিষয়ের সাথে ফ্যান্টাসি যুক্ত করাটা আমাকে টানে নি। প্রথমে শুরুটা ভালো লাগলে শেষের পুরো কাহিনীটা একদমই ভালো লাগেনি। বইটা পড়ে যারপনাই হতাশ হয়েছি।
অনেকদিন পর এত্ত সাবলীল কোনো লেখা পড়লাম। গল্পটা মুক্তিযুদ্ধকালীন তবে ঠিক মুক্তিযদ্ধ নিয়ে নয়, আবার মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিয়েও নয়। ভেবেছিলাম যুদ্ধভিত্তিক কোনো থ্রিলার হবে, কিন্তু শেষে ফ্যান্টাসির যে মোড় টা ঘুরলো!! ক্লাইম্যাক্সে মিথিক্যাল কন্টেক্সট এসেছে কিন্তু মিথ বিষয়ক একটা অতৃপ্তি রয়েই গেছে। হুট করে শেষ হয়ে গেলো, কিছু প্রশ্ন রয়ে গেলো মনে। overall 3.9✪/5