অন্ধকারের গর্ভে জন্ম নিয়েছিল সে। তার মগজ চলে বিদ্যুৎগতিতে। মানুষ তার চোখ দেখলে ভয় পায়। লোকে এড়িয়ে চলে তাকে। তার ওপর পিশাচের ভর হয় নাকি, এমনই গুজব। মধ্যবিত্ত কলকাতার ছাপোষা ভিড়ভাট্টায় কোথাও মিশে আছে রোগা-পাতলা মেয়েটা। দূর থেকে দেখে তাকে মনে হতে পারে নিরীহ, কিন্তু সাবধান। সে আপনাকে দেখছে। আপনার ওপর নজর রাখছে আবেগহীন, বরফশীতল একজোড়া চোখ।
আনপুটডাউনেবল— একমাত্র এই বিশেষণটাই প্রযোজ্য এই বইয়ের ক্ষেত্রে। একে রহস্য উপন্যাস বলা চলে না। তিনটি ইন্টারলিংকড কাহিনির সংকলন হলেও তার একটিতেও 'ক্লোজার' বলে কিছু পাই না আমরা। 'কাঠবাদামের গন্ধ' বিদ্যুৎলতা বটব্যাল, ওরফে বিবি'র সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। একইসঙ্গে আমরা চিনতে পারি লালবাজার হোমিসাইড-এর নীলকন্ঠ চৌধুরীকে। তারপর আমাদের পথ চলা শুরু হয় আপাতভাবে রহস্যভেদের গল্পে, যেখানে শার্লকপ্রতিম বিবি'র সাহায্য নিয়ে অপরাধের কিনারা করে ওয়াটসন নীলকন্ঠ। কিন্তু পরের কাহিনি থেকেই গল্প ঘুরে যায় অন্যদিকে। 'সাহেব, গোলাম এবং বিবি' নামের সেই প্রায় উপন্যাস পড়তে গিয়ে আমরা হারিয়ে যাই ঝাঁ-চকচকে কফিশপ থেকে সোনাগাছি, সাউথ সিটি থেকে রাজারহাট— এই বিস্তীর্ণ ও জটিল এক ভুবনে। তারপর আসে 'কালো সোনা'— যা আগের কাহিনির কন্টিনিউয়েশন বটে, কিন্তু যেখানে এই গল্পের শেষ হয় না। ক্রূরতা ও অন্ধকার, লোভ আর ক্রোধ মেশানো লাল-কালোর ঘোর রঙে এই গল্পটি আমাদের মাথা ঘুরিয়ে দিতে চায়। রহস্য বাড়ে বিবি'র অতীত নিয়ে, হয়তো ভবিষ্যৎ নিয়েও।
এরপর কী হবে? আত্মপ্রকাশ-এর পর আমরা কি দেখতে পাব বিদ্যুৎলতা বটব্যালকে স্বমহিমায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিদ্যুতের মতোই জ্বলে উঠতে? নাকি সিস্টেমের অমোঘ রথচক্র তাকে পিষে ফেলবে আপন গতিতে? এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হল প্রটাগনিস্ট বিবি নিজে। ইংরেজি সাহিত্যে এমন চরিত্র থাকলেও বাংলায় সে অদ্বিতীয়া। সোশিওপ্যাথ চরিত্ররাই যেখানে দুর্লভ, সেখানে তেমন একজনের জীবন ও মননকে এমন বেআব্রু করে দেখাতে সাহস ও দক্ষতা লাগে। অধীশা তা দেখিয়েছেন পূর্ণমাত্রায়। তাঁকে কুর্নিশ জানাই। গল্পটা একেবারে ক্লিফহ্যাংগার করে ছেড়ে দেওয়ায় পিত্তি চটকে রইল দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে। তাই একটি তারা খসালাম। ইতিমধ্যে বইটিকে থ্রিলার বলা যায় কি না— এই নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। আমার মতে একে ঠিক কী বলা যায়, তা তো শুরুতেই বলে দিয়েছি। আনপুটডাউনেবল।
তিন তারকা বিদ্যুৎলতা বটব্যাল ওরফে বিবির জন্যি, কারণ চরিত্রটা অসাধারণ হয়েছে (প্লিজ হইচইকে এই বইয়ের স্বত্ত্ব দেবেন না, নইলে সব শ্যাষ)।
গল্প আর প্লটের জন্যি একটাও তারকা দেব না। কারণ ব্যাটম্যান, শার্লক-মরিয়ার্টি সব হওয়ার পর গল্পের বিন্দুমাত্র কোনোওপ্রকার রেজোল্যুশন নেই। "কাঠবাদামের গন্ধ" গল্পে যতটা ভাল লাগা জন্মেছিল, সেইসবে লেখিকা জল ঢেলে ওয়েবসিরিজের স্ক্রিপ্ট লিখতে বসলেন। ধ্যার।
মোটামুটি ৮০-৯০এর দশক থেকে যখন established social order গুলো যেমন "পাড়া কালচার" গুলো ভেঙে পড়তে শুরু করলো, মোটামুটি সেই সময় থেকেই বাংলা সিরিয়ালগুলোতে এক ধরণের trope এর আমদানি ঘটে। যেটায় মেয়েরা যতো unqualified, bad habits, bad manners এর আখড়া হোক না কেন, হবে প্রচন্ড স্মার্ট, অচেনা পুরুষের সাথে সেক্স নিয়ে কথা বলতে এদের আটকাবে না, খাবার কম এবং সিগারেট বেশী খাবে, কথায় কথায় attitude দেখাবে (যেটা আবার স্মার্টনেস এরই অঙ্গ)।
উল্টোদিকে ছেলেগুলো হবে কমপ্লিট আতাক্যা*নে, বাড়িতে মা অথবা দিদি, অথবা বাড়ির বাইরে গার্লফ্রেন্ড দ্বারা dominated. যতোই কোয়ালিফায়েড হোক না কেন, আসলে তার মধ্যে একটা ক্লাস সিক্সের বাচ্চা কোথাও লুকিয়ে থাকবে, যে আবার সমাজে "মান ইজ্জত" নিয়ে প্রচন্ড sensitive.
এই ট্রোপ আমরা বহুত দেখে এসেছি। টিভি খুললেই আজকাল দেখা যায়। মজা হচ্ছে বাস্তবের সাথে এর কোন মিল নেই। ছেলেদের সাইকোলজি শুধুই সমাজের মান ইজ্জত, বড় চাকরি, লম্বা গাড়ি, অপরিসীম সেক্স, দীঘা, মন্দারমনি দ্বারা ডিফাইন্ড নয়। এর অনেক লেয়ার থাকে। লেখকের কাজ হোল ওই লেয়ার গুলোকে খুঁজে বার করা।
যাইহোক, অনেক গৌরচন্দ্রিকা হোল। এই বইটা হাতে নিয়েছিলাম গোয়েন্দা কাহিনী পড়ব বলে। দেখলাম এখানেও সেই গড়গড়ে ট্রোপের তরকারী। একটা সময়ে হলে খেয়ে নিতাম। এখন বড় বিরক্ত আর ক্লান্ত লাগে। হাতে সময়ও কম। সকালের ঘণ্টা দুয়েক এতে ইনভেস্ট করে যদি এই ক্লিচেড ট্রপের কাঁচা গন্ধ হাতে লেগে থাকে, তাহলে নিজেকে cheated মনে হয় বইকি।
বিদ্যুৎলতা বটব্যাল একটা রোগা সাধারন মেয়ে। কিন্তু তার বরফশীতল চোখের দৃষ্টি যে কারো বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট। সবাই ভাবে বিদ্যুৎলতা ডাইনি। এক অন্ধকার পাঁকের ভেতর বিদ্যুৎলতার জন্ম। সবাই যখন সাকির ভয়ে থরহরি কম্পমান তখন বিদ্যুৎলতা অকুতোভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক বিশাল সংগঠিত দলের বিরুদ্ধে। সে কি সফল হবে?
এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করার মত বই। প্রথম খণ্ড পড়েই দ্বিতীয় খণ্ড - "সংঘর্ষ" পড়তে শুরু করেছি। পুরো সিরিজ শেষ করে তারপরেই রিভিউ লিখব ঠিক করেছি। অনেক দিন পর বাংলা সাহিত্যে একজন লেখিকার কলমে সৃষ্ট নারী গোয়েন্দার (?) কীর্তিকলাপে মুগ্ধতা ছাপিয়ে গায়ে কাঁটা দেওয়া বিস্ময় বেশি অনুভূত হচ্ছে। পড়ছি আর ভাবছি সত্যিই এরকম তো হতেই পারে। গোয়েন্দা মানেই কি আর ঝাঁ চকচকে চেহারা - গতিবিধি বা টাঙিয়ে রাখার মত প্রোফাইল হতেই হবে? হতেই হবে বিখ্যাত পরিবারের রেকর্ড করা ডিগ্রি ধারী বাস্তবের মাটি থেকে দশ হাত উঁচুতে ভেসে থাকা কোনও চরিত্র? এমন গোয়েন্দাও তো হতেই পারে!! তবে ইনি কি আদৌ গোয়েন্দা??? কি জানি!! দেখা যাক শেষে কি হয়!!
A very modern way of story telling..this book has different layers.. Thrill, Mystery solving.. Adventure.. and moreover few very disturbing but true aspects of our society. Definitely worth reading! It has sequels also 🙂!
এত অখাদ্য গোয়েন্দাকাহিনী মানুষ কিকরে লিখতে পারে সেটা বড় কথা নয়, পড়ে কিকরে সময় ন���য়ে সেটাই হল আশ্চর্যের!! ভাবতে অবাক লাগে বাংলা থ্রিলারের মান কোথায় গিয়ে ঠেকছে!
বছরের ৩৭ নম্বর বই, গোয়েন্দা উপন্যাস বিদ্যুৎলতা বটব্যাল - আত্মপ্রকাশ।। লেখিকার এর আগে কোনো বই পড়া হয়নি, গুদের ভালো রিভিউ দেখে প্রথম দুটো পার্ট একসাথে সংগ্রহ করেছিলাম।। বইটির প্রচ্ছদ বেশ চোখ টানে, সুন্দর, ছিমছাম কিন্তু আকর্ষক, কৌতূহল জাগায়।।। একনিষ্ঠ পাঠক হওয়ার কারণে, গোয়েন্দা গল্প পড়া শুরু করার আগে মাথায় একটা প্যাটার্ন থাকেই, এই বই পড়া শুরু করার পর সেই সব প্যাটার্ন ছিন্ন করে লেখিকা লিখেছেন এক দুর্দান্ত রহস্য উপন্যাস, প্রথম বার হঠাৎ করে লেখিকার এই বইটি পড়লে পাঠকের হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি হবেই।। গল্পের গোয়েন্দা বিদ্যুৎলতা বটব্যাল সংক্ষেপে বিবি, সে প্রটাগোনিস্ট নাকি অ্যান্টাগোনিস্ট সেটা ভাবতেই ভাবতেই বই এগিয়ে চলে এক নির্নিমেষ গতিতে।।
🎭🎭 পটভূমি -
সূচিপত্র অনুযায়ী তিনটি গল্প রয়েছে বইটিতে কিন্তু, প্রথম গল্পটি স্বতন্ত্র হলেও, লাস্ট দুটো গল্প একে অপরের সাথে কানেক্টেড।।
১. কাঠ বাদামের গন্ধ -
বিদ্যুৎলতা বটব্যাল বা বিবির সাথে আলাপ হয় কলকাতা পুলিশের অফিসার নীলকন্ঠ চৌধুরীর সাথে এবং কিছুটা কাকতালীয় ভাবেই নীলকন্ঠের বাবার বন্ধু রিটায়ার্ড ডিসিপি অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু তদন্তে নীলকন্ঠ চৌধুরীকে সাহায্য করল বিবি। তাঁর খুনের তদন্তে সে নীলকন্ঠ কে সাহায্য করে বা বলা ভালো বিবির জন্যই খুনীকে নীলকন্ঠ ধরতে পারে। জটিল না হলেও গল্পটির ঘটনাবলী বা সমাধান পাঠককে খুব একটা নিরাশ করে না।
২। সাহেব, গোলাম এবং বিবি -
ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট সোমনাথ সেনের কন্যা পার্বতী সেন হঠাৎই নিঁখোজ। থেঁতলে যাওয়া বডির গলায় থাকা হীরের গয়না চিনিয়ে দিল। কিন্তু ঘটনার মোড় হঠাৎ করেই অন্য দিকে বাঁক নেয় যখন বিবি নীলকন্ঠ কে জানায় এই মৃতদেহ তার পরিচিত এক যৌনকর্মীর। তদন্তে উঠে আসে যৌনপল্লীর ত্রাস 'সাকী' র নাম। কে এই সাকী,, মৃতদেহ যদি পার্বতীর না হয় তবে পার্বতী কোথায়,, তার নিরুদ্দেশের কারণ কি, কেই বা আছে এর পেছনে, সোনাগাছির কুলসুমা নিঁখোজ হলে সেই তদন্তে কি আদৌ কেউ মাথা ঘামাবে? বিবি আর নীলের যুগলবন্দি আবার ফিরল তাহলে? বিবি যে ওই সোনাগাছির বাসিন্দা। চেনা মুখ হারিয়ে গেলে তার খোঁজ তো সে করবেই।
৩। কালো সোনা -
আইভির আসল ব্যবসা কি? সেই ব্যবসার খোঁজ কি পাবে? নাকি আড়ালে থেকে নিশ্চিন্তে চালিয়ে যাবে? 'জান' সঙ্গে আছে যে। সত্যিই সবকিছু কেমন বদলে যায়, হয়তো বদলে যাওয়াই ভবিতব্য। সেই বদলের খোঁজ পাওয়া মুশকিল হবে নীল-বিবির কাছে? কিন্তু শেষ অবধি কি নীলকন্ঠ পারবে অসহায় বাচ্চাদের উদ্ধার করতে..?? পার্বতী কে উদ্ধার করে যৌনপল্লীর আতঙ্ক সাকী কে ধরতে..?? শেষ পাতায় এসে এর বেশীর ভাগ উত্তর পাঠক পেলেও আসল প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে পরের বইয়ের জন্য।।
🎭🎭 পাঠ প্রতিক্রিয়া -
গল্পের প্রথম থেকেই পাঠককে ভাবতে শুরু করায়, কি হচ্ছে..? কেন হচ্ছে ..? বইটা আমার ব্যক্তিগত ভাবে খুব ভালো লেগেছে।। বইটির ভাষা কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্ক দের জন্য।। এই ধরনের কাজ বাংলা গোয়েন্দা গল্পে বেশ নুতুন, এইরকম সোশিওপ্যাথ চরিত্র দিয়ে যে কোনো গোয়েন্দা গল্পের প্রটাগোনিস্ট চরিত্র রচনা করা সম্ভব সেটা এই বই না পড়লে জানতে পারতাম না।। বইটি যেখানে শেষ হয়েছে সেই ক্লিফহ্যাঙ্গার পাঠক কে বাধ্য করবে দ্বিতীয় পার্টটি পড়ার জন্য।। বইটির জনার? গোয়েন্দা, রহস্য অথবা থ্রিলার হলেও এক শব্দে বইটি আনপুটডাউনেবল জাস্ট ছিটকে দেওয়ার মতো বই।।
বইটা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। অবশ্যই এখানে বলে রাখা ভালো যে কিংবদন্তি লেখক বা লেখিকাদের লেখার সঙ্গে এই লেখার তুলনামূলক বিচার অন্যায় হবে। তবু একথা বলতেই হয় যে বর্তমানের অধিকাংশ জঞ্জাল লেখার মাঝে এ বই পরম উপভোগ্য। বাস্তব জীবনে ঠিক-ভুল, ভালো-মন্দ যেমন সমাজের প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভর করে এবং বহু ক্ষেত্রেই এই শ্রেণী বিভাগ বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, ঠিক তেমনই প্রতিটি বাঁকে কাহিনীর ঘটনা প্রবাহ যেন বাস্তবকে অনুকরণ করে চলে। কিছু ক্ষেত্রে যদিও গল্পের নায়িকাকে অতিমানবী দেখানোর চেষ্টা চোখে লাগে, তবু সর্বোপরি গল্পগুলোর প্রবাহ এবং তার নিলম্বন আমাকে আকৃষ্ট রাখতে ব্যর্থ হয়নি।