'২৯' নিছক কোনো সংখ্যা নয়, এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে গা শিহরে ওঠার মতো কিছু কঠিন সত্য। এক অভিনব ক্রাইম কোড, হারিয়ে যাওয়া অতীত, মনুষত্বের আড়ালে গর্জে ওঠা ভয়ঙ্কর সত্তা, খন্ডিত-ঝলসানো বীভৎস লাশ, নিকষ কালো অাঁধারে জেগে ওঠা আবছায়া মূর্তি, পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা রহস্য, সর্বোপরি চরম ক্ষোভ-প্রতিশোধ আর ঘৃণার জ্বলন্ত লাভা।
বয়সটা ভালোই লুকাতে জানেন মুশফিক আনাম। পঞ্চাশ যে ছুঁইছুঁই বোঝার উপায় নেই। ফিটফাট পোশাক, কেতাদুরস্ত চুলের ছাঁট আর সুদর্শন মুখাবয়বের কিছুই অবশ্য আর আগের অবস্থায় নেই এখন। টুকরো টুকরো হয়ে নিজের বসার ঘরে পড়ে আছেন দৈনিক ব্রেকিং নিউজের চিফ এডিটর!
পুরস্কারপ্রাপ্ত খ্যাতনামা এই সাংবাদিকের বীভৎস হত্যাকাণ্ডটি যে একটি হাই প্রোফাইল কেস, সন্দেহ নেই। সাত সকালেই তাই হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টের গোয়েন্দা শিহাব সালেহীন উপস্থিত হলো মুশফিক আনামের বাড়ি 'স্বপ্নকুঞ্জ'তে। বস আজম আলীর তত্ত্বাবধানে সহকারী শামিম রেজাকে নিয়ে তদন্ত শুরু করলো শিহাব।
বাড়ির কেয়ারটেকার রাজন চমকে যাবার মতো তথ্য দিল কিছু। জানালো স্বনামধন্য সাংবাদিকের ব্যক্তিগত জীবনে নারীদোষ ছিল, নিত্যনতুন রাত্রিকালীন সঙ্গিনীরা হাজির হতো স্বপ্নকুঞ্জে। তাদেরই একজন কাল রাতে ছিল মুশফিক আনামের সাথে। সকালে তাড়াহুড়ো করে চলে গেছে। অবাক ব্যাপার, মেয়েটি যাবার সময় রাজনের হাতে দিয়ে গেছে ঠিক ২৯ টাকা বকশিস!
চমক বাড়তে লাগলো। মুশফিক আনামের দেহটিকে ২৯ টুকরো করা হয়েছে, মৃত্যুর তারিখটি ছিল ২৯শে ডিসেম্বর,প মৃত্যুর আগে তিনি সঙ্গিনীর সাথে খেলছিলেন 'টোয়েন্টি-নাইন' কার্ড গেম। তার মোবাইলে শেষ যে কলটি এসেছে তার ডিউরেশনও ঠিক ২৯ সেকেন্ড!
মুশফিক আনামের দ্বিতীয় স্ত্রী'র সম্পত্তি পাবার সম্ভাবনা বা পত্রিকার নিউজ এডিটর সোবহান সাহেবের চেয়ার দখলের লোভ - কোনোটাই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কিন্তু আজম আলী থমকে গেলেন, যখন হাতে পেলেন একটি রিপোর্ট। মুশফিক আনামের কললিস্টের সেই নাম্বারটির মালিক খোদ শিহাব সালেহীন!
তালগোল পাকানো রহস্যের পিছে লুকিয়ে আছে প্রতিহিংসার এক গল্প।
হারুন অর রশীদ ভাই 'বইপোকাদের আড্ডাখানা'র প্রিয়মুখ এবং নিয়মিত রিভিউয়ার। এ বছর 'উনত্রিশ' রহস্যোপন্যাসটির মাধ্যমে তিনি লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। বেশ আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষা করছিলাম তাই তাঁর বইটির জন্য। বই নিয়ে লিখতে লিখতে যে তিনি হাত পাকিয়েছেন, তার প্রতিফলন পাওয়া যায় থ্রিলারটিতে। 'হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টে'র উল্লেখে একজন জনপ্রিয় লেখকের থ্রিলারের ধাঁচ পাচ্ছিলাম। তবে সেটা উৎরিয়ে লেখক নিজের মতো এগিয়ে নিয়ে গেছেন গল্পকে। প্রথম দিকে কিছুটা ধীরে এগোলেও, ক্রাইম কোড মেলানো শুরু করার পর থেকে বেশ থ্রিল অনুভব করছিলাম। প্লটটি খুব জটিল তা নয়, লেখকের গল্প বলার ধরনের কারণেই এক বসায় বইটি পড়ে ফেলেছি।
নিয়মিত থ্রিলার পড়া হয় বলেই কি না জানি না, পাশাপাশি কিছু বিষয় খটকাও লেগেছে। খন্ড বিখন্ড লাশ দেখে ঘটনাস্থলেই কত টুকরো করা হয়েছে তা ধরতে পারা, বা ডিসেম্বরে শীতকালে প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টির রাত, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক, মগ এবং কিছু বিষয়ের সূত্রপাত ঘটেছে থ্রিল আনার জন্য। এগুলোকে আরো যুক্তিগ্রাহ্যভাবে সাজানো সম্ভব ছিল বলেই মনে হচ্ছিলো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশ তাড়াহুড়োর ভাব ছিল, যা বিস্তৃত পরিসরে লিখলে ভালো লাগতো। মাঝে মাঝে বর্ণনাগুলো বেশ নাটকীয় হয়ে যাচ্ছিলো, বিশেষ করে কারো জবানবন্দির মাঝে এ ধরণের শব্দচয়ন খাপ খায় না।
স্বস্তি পেয়েছি বইটির ছাপার ভুল সহনীয় মাত্রার হওয়ায়, যা মেলায় প্রকাশিত বইয়ের ক্ষেত্রে সহজ নয়। সজল চৌধুরীর করা চমৎকার প্রচ্ছদ আর চিরকুট প্রকাশনীর পরিবেশনায় বইটি নিঃসন্দেহে নান্দনিক।
রবী ঠাকুরের এই বচনটি একদম সত্য। জগৎ বড়ই কঠিন স্থান। আদতে আমরা যাদের সাথে চলি, কথা বলি, উদার মনের মানুষ ভাবি, আমরা কি কখনো তাদের ভেতরটা দেখেছি? নাহ তা দেখা যায় না। তাই তো সকালে যাকে দেখে মনে হয় ফেরেশতাতূল্য, কী করে দিন শেষে তিনি হয়ে যান শয়তানের ডান হাত!!! বিকৃতি মানুষিকতায় ভরপুর তাদের ভেতরটা। ক্ষমতার কারণে আইনও আজ বধির। তারপরও সবাইকে নিয়েই চলতে হয় আমাদেরকে এই জগৎ সংসারে।
যাইহোক গল্পের সারাংশে আসি। ঘটনার শুরু এক নৃশংস হত্যাকান্ড দিয়ে। দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা দৈনিক ব্রেকিং নিউজের চিফ এডিটর ‘মুশফিক আনাম’ খুন হন। মানুষটা অনেকের কাছেই দেবতুল্য ছিলেন। অনেক সাংবাদিক তার সাথে দাঁড়িয়ে একটি সেলফি তুলতে পারলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতো। মাঝবয়সী মানুষ মুশফিক আনাম। কিন্তু তার সাজসজ্জার বদৌলতে এখনো তাকে যুবকদের কাতারে রাখতে হয়। কাগজে তিনি ছিলেন অকুতোভয় একজন মানুষ। দেশের সরকার স্থানীয় লোকের বিরুদ্ধেও কলম তুলতে তার বুক কাপতো না। সেই মানুষটিই কিনা আজকে নিজের পত্রিকার প্রধান শিরোনামে পরিনত হলো।
“২৯” খন্ডে খন্ডিত মুশফিক আনাম।
কতটা বিভৎস! কিন্তু কেন এই নৃশংসতা? আসলে কী হয়েছিলো সেদিন? এ কী কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নাকি ব্যাক্তিগত কোন প্রতিশোধ?
এই হাই প্রোফাইল ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব এসে পড়ে পুলিশের নতুন শাখা “হোমিসাইড ডিপার্টমেন্ট”এর উপর। হোমিসাইডের প্রধান আজম খান তার ডিপার্টমেন্টের সেরা ইনভেস্টিগেটর শিহাব সালেহিনকে পাঠিয়ে দেন ঘটনাস্থলে।
স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশ চলে যান “শিহাব সালেহিন”। দেশে ফিরে এসে যোগদেন হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টে। বিদেশ যাবার আগে প্রেমিকা “অধরা”কে কথা দিয়ে যান ফিরে এসে তারা একত্রিত হবেন। কিন্তু তিনি অধরার আর কোনো সন্ধান পেলেন না। ভিতরে ভিতরে তার খোঁজও তিনি করে যাচ্ছেন।
ডিপার্টমেন্টে ইতিমধ্যে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। যেসব কেস সাধারণ পুলিশের কাছে অসাধারণ কেস বলে মনে হয়, সেগুলো তুখোড় এই গোয়েন্দর কাছে কিছুই না। এখন আর এসব কেসের তদন্তে যেতে ইচ্ছে করে না তার। তবে আজকের ক্রাইমসিনে এসে মুশফিক আনামের খন্ডিত লাশ দেখে নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে ‘মাই গড!'। ঘরের ফ্লোর জুড়ে যেন রক্তের বন্য। সারা ঘরময় জুড়ে খন্ডিত লাশ। তারপরই নেমে পড়েন খুনের রহস্য উদঘাটনে। চলে খুনির অন্বেষণ। কিন্তু তার পরেই যেন তুখোড় গোয়েন্দা শিহাব সালেহিন পড়ে গেল দ্বন্ধে। কারণ খুনির কোন প্রকার ক্লু রেখে যায়নি। সবকিছুই ছিলো একদম পরিষ্কার। কোনো ছাপ নেই কোথাও। তবে একটি সংকেত তার চোখে পড়ে। “২৯”! দেয়ালে লেখা ২৯, লাশ খন্ডিত ২৯ টুকরায়, খুনের সময় ২৯ তারিখ, এবং খুনের দিন ভিকটিম খেলছি ‘টোয়েন্টি নাইন'! এই ২৯ দিয়ে খুনি কিসের মেসেজ রেখে গেলো?
ঠিক যখন শিহাব এই কেস নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন তার বস আজম সাহেবের কাছে আসে এক বিদঘুটে তথ্য। তিনি খোদ ইনভেস্টিগেটর শিহাবকেই এই খুনের পিছনে সন্দেহ করে বসলেন। শিহা��� পড়ল অকুল পাথারে। এখন আগে নিজেকে নির্দোষ প্রমান করবেন নাকি প্রকৃত খুনি খুঁজবেন?
এভাবেই চলতে থাকে “২৯” এর কাহিনী।
★★★
-চিরকুট প্রকাশনী- থেকে লেখক “হারুণ-অর-রশিদ”এর প্রথম -ক্রাইম থ্রিলার- “২৯” প্রকাশীত হয় ২০২০ সালের বই মেলাতে।
আমি বরাবরই বলি, নতুন লেখক বলে লেখককে অপমান করতে পারবো না। কারণ লেখাটা ভেতরের জিনিষ। তবে যখন কোন লেখকের লেখা প্রচ্ছদাকারে প্রথমবারের মতো ছাপা হয়, তখন সেইটা নিয়ে লেখক কিছুটা চাপ অনুভব করেন। তাই পাঠকদের উচিত তাকে ভরকে না দিয়ে উৎসাহিত করা।
গল্পটা ইউনিক তা বলবো না। তবে কাহিনী আমার ভালো লেগেছে। লেখকের চিন্তাধারার প্রশংসা করি। তবে কয়েকটা দৃশ্য সিনেমাটিক হয়েছে গেছে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনেকরি। যেমন, শিহাবের সিম ডুপ্লিকেটের ব্যাপারটি। এখানে শিহাবের সাথে বিষয়টি না ঘটিয়ে অন্যভাবে ঘটালে বোধহয় আরো সুন্দর হতো।
আরেকটি হলো, মূল বিষয় নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা না করা। মানে অপরাধ সংঘটনের বর্ণনা এবং অপরাধীর কিছু চলাফেরার বর্ণনা, যে অস্ত্র দিয়ে খুন হয়েছে তার সন্ধান করা, খুনের মোটিভ খোঁজা। এসব দিকগুলো আরো ফুটিয়ে তোলা যেতো বলে আমি মনে করি।
উপরের বিষয়গুলো আমার বর্ণনা করতেই শুধু এতো শব্দ ব্যয় হলো, আদতে বই পড়ার সময় এগুলো খুব বেশি কষ্ট দিবে না কিন্ত। আমি বই হাতে পেয়ে একটানে পড়ে শেষ করেছি। লেখকের লেখার হাত দারুণ ভালো।