সম্প্রতি Book street থেকে প্রকাশিত হয়েছে জাপানিজ রাইটার, ডিরেক্টর মাকাতো শিনকাই এর অসম্ভব জনপ্রিয় ও বিখ্যাত অ্যানিমেশন মুভি "ইয়োর নেম" এর লাইট নভেল ভার্শনের বাংলা অনুবাদ।
প্রথমেই বলতে হয়, লাইট নভেল কি? লাইট নভেলকে মূলত ইয়াং অ্যাডাল্ট ফিকশন বলা যায়। জাপানিজরা ইয়াং অ্যাডাল্ট নভেলকে নিজেদের ভাষায় লাইট নভেল বলে। মূলত কিশোর-কিশোরীদের জন্যেই এই লাইট নভেলগুলো বের করা হলেওবর্তমানে জাপানে লাইট নভেলের চাহিদা আকাশচুম্বী। এমনকি এই লাইট নভেলের গন্ডি জাপান থেকে বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পৃথিবীতে। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিখ্যাত মাঙ্গা অথবা এনিমের লাইট নভেল ভার্শন ফ্যানমেড হয়ে থাকে। তবে লেখক বা নির্মাতা নিজেও নভেলাইজেশনের কাজটা করে থাকেন। যেমনটা ঘটেছে "ইয়োর নেম" এর বেলায়।
'ইয়োর নেম'- রোমান্টিক, সাইফাই, ইয়াং এডাল্ট - যেই ঘরানাতেই পড়ুক না কেন, রিলিজের সাথে সাথে আকাশচুম্বী সফলতা ও প্রশংসা পায় মুভিটি। অবশ্য না পাওয়ারও কোন কারন ছিল না। এমন অভিনব প্যারালাল টাইমলাইন সংক্রান্ত প্লট ও তার পরিণতি, সেই সাথে আবেগ, বিষণ্নতার মিশেলে হয়ে গেছে অনবদ্য। মাকোতো শিনকাই নিজেই পরিচালনা করেছেন মুভিটি। আর তা রিলিজের প্রাক্কালেই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। মাকোতো শিনকাই নিজে মূল গল্পটকে 'লাইট নভেল' হিসেবে লিখেছিলেন। উপন্যাসটি যদিও মুভি রিলিজের পর আলোচনায় আসে, কিন্তু বইয়ের আবেদন যে সেলুলয়েডের ফিতা থেকে সবসময় বেশি তা আরও একবার প্রমাণিত হয়।
মিতসুহা এবং তাকি, হাইস্কুল পড়ুয়া দুই কিশোর কিশোরী। দুই ভিন্ন মেরুর মানুষ। মিতসুহার বাস পাহাড়ের গভীরের একটি ছোট শহরে, অন্যদিকে তাকি থাকে ইট পাথরে ঘেরা টোকিও শহরে।
মিতসুহা স্বপ্ন দেখে একদিন পাহাড় ঘেরা কিছুই না পাওয়ার শহর ছেড়ে টোকিও যাবে। স্বপ্ন অপূর্ণ থাকে না তার, পূরণ হয় তার স্বপ্ন। একদিন মিতসুহা ঘুম থেকে উঠে নিজেকে আবিষ্কার করে টোকিও শহরে। কিন্তু নিজের শরীরে নয়, তাকি নামের এক অচেনা ছেলের শরীরে। অন্যদিকে একই সময়ে তাকিও ঘুম থেকে উঠে নিজেকে আবিষ্কার করে অচেনা অজানা পাহাড়ঘেরা শহরের মিতসুহা নামের একটি মেয়ের শরীরে।
অচেনা অজানা পরিবেশে প্রথম প্রথম নিজেদের মানিয়ে নিতে কষ্ট হলেও শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে থাকে অদ্ভুত পরিবেশের সাথে। সেইসাথে দুজনে দুজন সম্পর্কে অল্প অল্প করে জানতে থাকে। এভাবেই দুজনের মধ্যে একটা অম্ল-মধুর সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু একদিন কোন রকম পূর্বাভাস না দিয়েই মিতসুহার সাথে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাকির।
অনেকগুলো না পাওয়া প্রশ্নের জবাব খুঁজতে তাকি নেমে পড়ে মিতসুহার খোঁজে। কিন্তু তাকির জানা নেই কোথায় থাকে মিতসুহা। কোথা থেকে শুরু করবে তাও বুঝতে পারছে না সে। যে নাম্বার মিতসুহা তাকে দিয়েছিলো সেটিও বন্ধ। বুঝতে পারে প্রায় দুঃসাধ্য একটি কাজে নেমে পড়েছে তাকি।
মিতসুহা আর তাকির এই গল্পটা অদ্ভুত এক বিষণ্ণতার ছাপ ফেলে যায় পাঠকের মনে। দেখা না হয়েও, একজনের জীবনের সমস্ত কিছুর সাথে মিশে গিয়েছিল অন্যজন। সেই বিচিত্র প্রেমের অনুভূতির কথা ভাবতে গেলেও কেমন যেন হাহাকার বোধ হয়! বইয়ের শেষাংশে রেললাইনে ট্রেনের সমান্তরালে চলে যাওয়ার রূপকের মাধ্যমে শিনকাই গভীর জীবনবোধের অবতারণা করেছেন। উল্টোপথে চলতে থাকা দুটো ট্রেন পাশাপাশি চলে যায়; কখনও দেখা হয়ে যায়, আবার হয়তো কখনো দেখা হয় না। তবে তাতে কিন্তু গতির কোন তারতম্য হয় না, জীবন চলে জীবনের নিয়মেই।
সময় আর মাত্রার ভিন্নতায় অবস্থানরত দুজন মানুষের গল্প ইয়োর নেম। সেই সময় কখনও বয়ে চলে সমান্তরাল, আবার কখনও পেঁচিয়ে যায় ভীষণ জটিলভাবে। জীবনকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেয়ার জন্য তাকি আর মিতসুহার দুই পথে চলা দুই জীবনের সুতোয় জট লেগে গেল, বদলে গেলো দুজনেরই অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। এর পরিণতি কী?
ইয়োর নেম শুধুমাত্র জাপানেই আয় করে ২৩ বিলিয়ন ইয়েন (১৯০ মিলিয়ন ইউএস ডলার)। এটি জাপানের সেরা ব্যবসাসফল সিনেমাগুলোর মাঝে দ্বিতীয়। জাপানের বাইরে চীন, থাইল্যান্ড সহ আরো অনেক দেশে সিনেমাটি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। 'কিমি নো নাওয়া' সমালোচকদের কাছেও বেশ প্রশংসিত হয়েছে। জিতে নিয়েছে অনেক পুরস্কার, আর মনোনয়ন পেয়েছে তার থেকেও অনেক বেশি। ২০১৬ সালে সিটগেস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র হিসেবে পুরষ্কৃত হয় 'কিমি নো নাওয়া'। একই বছর ২৯তম টোকিও ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সিনেমাটি তৈরি করার জন্য মাকাতো শিনকাই গ্রহণ করেন আরিগাতো বা ধন্যবাদ পুরষ্কার। ষষ্ঠ নিউটাইপ অ্যানিমেশন অ্যাওয়ার্ডসে সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়, ওই বছর লস এঞ্জেলসে ফিল্ম ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ডসেও সেরা চলচ্চিত্রের পুরষ্কার বাগিয়ে নেয় 'কিমি নো নাওয়া'। এছাড়াও ২০১৭ সালের ৪০তম জাপান অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে এক্সিলেন্ট অ্যানিমেশন অফ দ্য ইয়ার, ডিরেক্টর অফ দ্য ইয়ার, সেরা স্ক্রিনপ্লে আর সেরা সাউন্ডট্র্যাক ক্যাটাগরিতে পুরষ্কার জিতে নেয়। একই বছর ৩৬তম অ্যানিমে ফেস্টিভ্যালে দর্শকদের পছন্দে সেরা পুরষ্কার।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পাশাপাশি বাংলাদেশে বর্তমানে জাপানিজ ফিকশন ব্যপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। থ্রিলার, হরর, ক্লাসিক, সাইফাই, ডিসটোপিয়ান অথবা হারুকি মুরাকামির জাদুবাস্তবতার জগতের পাশাপাশি এমন ভিন্ন স্বাদের জাপানিজ ফিকশন পাঠককে মুগ্ধ করতে বাধ্য।