পূর্ব ইউরোপের ইউক্রেন, বেলারুশ, এস্তোনিয়া হয়ে ককেশীয় রাজ্য জর্জিয়া, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, এদিকে আবার রেনেসাঁর মাতৃভূমি ফ্লোরেন্স হয়ে হিমালয়কন্যা নেপালের পোখরা -সঞ্জয় দে ঘুরেছেন, দেখেছেন, জেনেছেন আর জানিয়েছেন তাঁর চমৎকার সব অভিজ্ঞতা। ফাঁকে ফাঁকে দিয়েছেন ইতিহাসের মশলাও। মাঝে মাঝে সঙ্গী হয়েছেন নানা দেশের নানা কিসিমের লোক। সব মিলিয়ে বইটির কতটা ভ্রমণকাহিনী হলো আর কতটা হলো ইতিহাসের বৃত্তান্ত - তা পাঠকই নির্ধারণ করবেন।
লেখক সঞ্জয় দে এর ভ্রমণ কাহিনী "স্তালিনের বাস্তুভিটায়", যেখানে লেখকের ঘুরে বেড়ানো ককেশাস অঞ্চলের নানান ইতিহাস, সংস্কৃতি, সভ্যতা উঠে এসেছে এবং সেই সাথে জোসেফ স্তালিনের বসতভিটে। ইউক্রেনের চিত্রকলার ইতিহাস থেকে শুরু হয়ে, রাতের তালিন শহর, ফ্লোরেন্সে ভিঞ্চি আর মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর শিল্পের পেছনের গল্প, কখনো আরারাত পর্বতের বা জর্জিয়া বা বাকুর পথে প্রান্তরে। মোট ১৩টি গল্পে সাজানো নানান অভিজ্ঞতার ঝুড়ি। অনেকদিন পর কোন ভ্রমণ গল্প শেষ করলাম।
বইয়োর নাম: স্তালিনের বাস্তুভিটায় লেখক: সঞ্জয় দে ঘরানা: ভ্রমণ উপন্যাস প্রকাশনী : সময় প্রচ্ছদ: আরাফাত করিম
"স্তালিনের বাস্তুভিটায়" ভ্রমণ উপন্যাসে ১৩ টি গল্প আছে যার মূল কেন্দ্রবিন্দু ককেশাস অঞ্চল। যে অঞ্চল ছিল একসময়ের প্রতাপশালী রাষ্ট্রনায়ক, সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্ণধার জোসেফ স্তালিনের আঁতুড়ঘর। স্নায়ুযুদ্ধে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়, সেই ১৬ টি রিপাবলিক লেখক সঞ্জয় দে চষে বেড়িয়েছেন। এই বইতে তুলে ধরেছেন ককেশাস অঞ্চলের সভ্যতা, সংস্কৃতি, সাধারণ মানুষের দুঃখ-সুখের গল্প, ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাস। লেখক ইউক্রেনের আর্ট মিউজিয়ামে খুঁজে বেড়ান পেইন্টিং - পোর্ট্রেটের আড়ালের ইতিহাসকে। বাইজেনটাইন, গথিক, সমাজতান্ত্রিক, পরিশেষে ইউক্রেনিয় জাতীয়তাবাদী শিল্পের উত্থান। তুলে ধরেছেন স্তালিনের আমলে বয়চুকিস্ট শিল্পগোষ্ঠীদের নির্যাতনের গল্প যারা সমাজতান্ত্রিক ধারার বাইরে কথা বলতে চেয়েছে। সেই ইতিহাস পড়তে পড়তে এসে পড়ি কিয়েভের কোনো কফিশপে, পানশালায়, জাজ সঙ্গীতের মূর্ছনায়, আপ্লুত হই। কখনো বাল্টিকের ধারে মেঘে ঢাকা দিনে অজানা শোকে বিমূঢ় হই, হয়তো কোনো কফিশপে প্রিয়জন হারানোর বেদনায় বেদনাহত প্রেয়সীর মেলানকলির ছায়া মাখা আর্দ্র চোখে বিহ্বল হই। গল্পের রাশ টেনে নিয়ে যায় রেঁনেসার শহর ফ্লোরেন্সে। যেখানে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, রাফায়েলের গল্প, রেঁনেসা যুগের শিল্পের বিকাশ ও বৈশিষ্ট্য জানতে জানতে হঠাৎ চমকিত হয়ে দেখি পার্থিব পৃথিবীর সমকালীন সাধারণ মানুষের গল্পে মিশে গেছি। জর্জিয়ান মোহমুগ্ধ সকালের ভাবালুতায় হারিয়ে যাই যে সকালের স্তুতি গেয়েছেন সমাজতান্ত্রিক শাসকের শাসনে অবরুদ্ধ সাহিত্যিক বরিস পাস্তেরনাক। স্তালিনের বাস্তুভিটায় স্তালিনের উত্থানের গল্প, তার শাসন,দমনের গল্প আর মৃত্যুর গল্প জানি। হারিয়ে যাই আজারবাইজানের গ্রাম খেলানুগে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ছয় হাজার ফুট উচ্চতায়, এখানে দাঁড়ালে খেলানুগকে পৃথিবীর শেষপ্রান্ত বললে অত্যুক্তি হবে না। মুগ্ধ হই যখন সেই দুর্গম গাঁয়ে জাদুঘরের খোঁজ পাই, খুঁজি ফিরি ইতিহাসে, আপ্লুত হই গাঁয়ের লোকদের আতিথেয়তায়। এরকম ১৩ টি গল্প আবেশে আটকে রাখে।
যারা ভ্রমণ গল্প পছন্দ করেন, যারা ইতিহাস পছন্দ করেন, যারা শুধুই নিছক গল্প পছন্দ করেন, "স্তালিনের বাস্তুভিটায়" বইটি অবশ্যই পাঠ করা উচিত।
স্তালিনের বাস্তুভিটায় সঞ্জয় দে সময় প্রকাশনী দামঃ ৩২০/-
গ্রেডিংঃ Exceeds Expectation
ইউক্রেন, নেপাল,ইতালি,আর্মেনিয়া,জর্জিয়া আর আজারবাইজান এর বিভিন্ন শহরের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা এসেছে ছোট ছোট অধ্যায়ে। আর্ট এবং হিস্ট্রির প্রতি লেখকের আলাদা টান লক্ষ্য করা যায়। আর এই বর্ণণাগুলোই বইটাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। লেখার ভাষা আরেকটু সহজ হলে পড়ে আরাম পাওয়া যেত। শেষের অধ্যায়- 'আজারবাইজানের খেনালুগ গ্রামে' পড়তে https://arts.bdnews24.com/?p=23203
প্রথমেই বলে রাখি এটা ঠিক রিভিউ নয়। বরং বইটির সারসংক্ষেপ - আমার ভাষায়। সঞ্জয় দের ‘স্তালিনের বাস্তুভিটায়’ ছড়িয়ে থাকা তেরোটি ভ্রমণ কাহিনীর প্রতিটি নিয়েই আমার কিছু না কিছু বলার আছে। বৈচিত্র্যময় বর্ণনা, সাথে ফ্রিতে ইতিহাসের জ্ঞান - সঞ্জয় দে তাঁর ট্রেডমার্ক বজায় রেখেছেন এই বইটিতেও।
ইউক্রেনের বয়চুকিস্ট চিত্রশিল্পীরা : ইউক্রেনের ভলদোমির পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এক চিত্রকলা জাদুঘর দিয়ে শুরু হয় সঞ্জয় দের পূর্ব ইউরোপের অভিযান। স্তালিনের পার্জে নিহত নিগৃহীত বয়চুকিয় শিল্পীদের আর্টই মূলত এই কাহিনীর আলোচ্য। মিখাইল বয়চুক, ইভান পাদালকা, ভাসিল সেদলিয়ার, ওকসানা পাভলেনকো, কিরাইল ভযদিক ইত্যাদি আর্টিস্টদের বিষয়ে নানা তথ্য তুলে এনে সঞ্জয় দে দেখিয়েছেন প্রবল রাজনীতির চাপ আর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের মাঝেও কিভাবে শিল্প ঠিকই তার জায়গা খুঁজে নেয়।
কিয়েভের জ্যাজ সন্ধ্যা : ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ। তারাশ শেভচেঙ্কোর নামাঙ্কিত রাস্তা পেরিয়ে বিখ্যাত কিয়েভ কেক গলাঃধকরণ করে লেখক পা রাখেন মায়দান চত্ত্বরে। শোনান ২০১৩ এর বিপ্লবে অলিগার্কদের কূটচালের কথা। ইউক্রেনে চলমান রাশিয়ান আগ্রাসনের প্রভাবও ফুটে উঠে তাঁর লেখায়। কাহিনীর শেষদিকে ক্যারিবিয়ান ক্লাবে দেখা মিলে স্ত্রীবিয়োগ এক শোকাতুর স্বামীকে। যার শোক স্পর্শ করে লেখককেও।
কুপালা রাত্রি : ইয়াঙ্কা কুপালা। বেলারুশের প্রখ্যাত কবি। তাঁরই স্মৃতিবিজড়িত মিনস্কে পা রাখেন লেখক। এই লেখা যত এগোয় তত জানিয়ে যায় বেলারুশের সাথে রাশিয়ার সম্পর্কের কথা, মিনস্কবাসীর পরিচ্ছন্নতা বাতিকের কথা, আর আজকের যুগে এসেও বেলারুশের সমাজতন্ত্র ঘেঁষা মনোভাবের কথা। কুপালা জাদুঘর ঘুরে এসে লেখক সঞ্জয় দে তার কিস্যা শোনান মারিয়া নামের এক পোলিশ দূতকে। মারিয়ার সাথে খুনসুটি আর মিষ্টতার মাঝেই ফুরিয়ে আসে কাহিনী।
বাল্টিকের ধারে মেঘে ঢাকা দিন : এই মেঘে ঢাকা দিন মূলত বাল্টিক পাড়ের দেশ এস্তোনিয়ায়। হেলসিংকি যাবার প্ল্যান থাকলেও বাজে আবহাওয়ার কারণে শেষমেশ সেই প্ল্যান বাদ দেন লেখক। তাল্লিনের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বিবরণ দেন স্যামন স্যান্ডউইচ, ভারতীয় মহারাজা রেস্তোরাঁ, আলমন্ড ভাজা, ম্যারাথন দৌড় ইত্যাদির। কাহিনী শেষ হয় দুই অতিথিপরায়ণ যুবক যুবতী আর্নল্ড আর নিনার সঙ্গ নিয়ে। এস্তোনিয়ায় ক্রমবর্ধমান এস্তোনিয়ান বনাম রুশি বিরোধও উঠে এসেছে লেখায়।
পোখারার লেকসাইড রোড : এই লেখাটা কিছুটা বেমানান। পূর্ব ইউরোপের মাঝে হুট করেই নেপালের আগমন। শেষটা বেদনাবিধুর। কন্যা হারানো এক পিতার গল্প। দুঃখভরা এক টুইস্ট যেন।
রেনেসাঁর শহর ফ্লোরেন্স-এ : এই লেখাটিকে আমি বলবো বইয়ের শ্রেষ্ঠ লেখা। পুরো লেখাটা জুড়েই রেনেসাঁ যুগের বিখ্যাত সব ভাস্কর, চিত্রকর ও স্থপতির বিবরণ। উফিজি গ্যালারি হয়ে দুয়েম ক্যাথেড্রালের দরজা ঘুরে ঘুরে লেখক আমাদের শোনান শত শত বছর আগের কাহিনী। সেই কাহিনীতে ভিঞ্চির মোনালিসা, এনানসিয়েশন, ব্যাপটিজম যেমন আছে, তেমনি আছে মাইকেল এঞ্জেলোর ডেভিড, পিয়েতা, বতিচেল্লির ভেনাস, প্রিমাভেরা, রাফায়েলের ম্যাডোনা ও গোল্ডফিঞ্চ পাখি, গিবেরত��র স্বর্গের দরজা কিংবা, ব্রুনেলেস্কির দুয়েমের ডোম! জত্তো চিমাবুয়ে মাজাচ্চো দোনাতেল্ল সহ আরো অনেক শিল্পীর আখ্যান শুনতে শুনতে আমরাও আক্রান্ত হই ফ্লোরেন্সের সেই পুরনো রোগে - ‘কিছুই তো দেখা হলোনা!’
আর্মেনিয়ার গারনি গ্রামে - লেখকের ককেশাস ঘোরা শুরু হয় এই লেখাটা দিয়ে। শুরুতেই লোভনীয় লাভাশ রুটি আর পনির। এছাড়া ডালিমের আমসত্ত্ব ক্লাপি আর আর্মেনীয় মিষ্টি কাথা তো আছেই।
তুর্কিদের জেনোসাইড থেকে বাঁচতে আর্মেনীয়রা যে চিলির মত দূরদেশে আশ্রয় নিয়েছিলো তা জানতে পারি এই লেখাটি পড়ে। একই অবস্থা হয়েছিলো ক্রোয়েটদের, যখন বলকানের রাজা ছিলো অস্ট্রো হাঙ্গেরীয়রা। এই লেখাটি গারনি নামে এক প্রাচীন গ্রামে যাত্রা নিয়ে লেখা, সঙ্গী ছিলেন আর্মেনিয়ান ভদ্রলোক গ্রাহাম।
রহস্যময় নৌকার সন্নিকটে - বলা হয়ে থাকে নূহের মহাপ্লাবন থেকে রক্ষাকারী নৌকাটা নাকি সর্বশেষ বাঁধা হয়েছিলো আরারাত পর্বতের চূড়ায়। আর্মেনিয়ার শ্রদ্ধার পাত্র হলেও, স্ত্যালিনের দোষে সেই পর্বত এখন তুরস্কের কবলে! তবুও আবেগ আটকানো যায়না। নানাভাবে এখনো সেই পবিত্র পর্বতকে স্মরণ করে আর্মেনীয়রা। কবি চ্যারেন্টের ভাষায় - আরারাতের শিখর জগতের সকল পর্বত শিখরের মাঝে শুভ্রতম। আরারাত ছাড়াও এই লেখায় আছে বাঙালিদের নবান্নের মতই আর্মেনীয়দের আঙুর ঘরে তোলার উৎসবের কথা, আছে মঠে মঠে প্রবল যীশুপ্রেমের কথা, এবং সর্বশেষে আছে - কাতালান জাতীয়তাবাদের একটু রেশ!
আরেনির আদিম গুহা : আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ান লেখক। সে হোক শহরের কেন্দ্রে থাকা লাইমস্টোনের বিশাল সৌধ কিংবা ক্লক টাওয়ার। এক উন্নাসিক কুয়েতির কাছ থেকে লেক সেভানের সাজেশন পান সঞ্জয় দে। কিন্তু পরে প্ল্যান পাল্টিয়ে পৌঁছে যান নোরাভাঙ্ক অঞ্চলের আরেনিতে। এই আরেনির প্রাচীন গুহার সাথে জড়িয়ে আছে আঙুরের মদ ওয়াইনের স্মৃতি। এছাড়া আছে মঙ্গোলদের স্মৃতিবিজড়িত নোরাভাঙ্কের আর্মেনিয়ান মঠ, ওয়াইনের কারখানা ইত্যাদি। লেখাটির শেষে এসে আমরা দেখা পাই ইরানি তরুণী শাহনাজের, আর তার আচরণ, কাজকর্ম দেখে আমরা রক্ষণশীল ইরানের সমাজব্যবস্থা নিয়ে দ্বিতীয়বারের মত ভাবতে বাধ্য হই।
স্তালিনের বাস্তুভিটায় : স্ত্যালিন। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের অবিসংবাদিত নেতা। কারো চোখে লৌহমানব কারো চোখে রক্তপিপাসু খুনী। লেখকের এবারের লক্ষ্য বহুল আলোচিত সমালোচিত এই রাষ্ট্রনায়কের জন্মভূমি জর্জিয়ার গরি গ্রাম।
বইয়ের টাইটুলার এই ভ্রমণকাহিনীতে আমরা দেখতে পাই কিভাবে ক্যারোলিন নামের এক জার্মান উকিলকে সঙ্গী করে স্তালিনের জন্মস্থানে রওনা দেন লেখক।
কাহিনী জুড়েন শুধুই স্তালিন। তাঁর মাতৃ অভক্তি, তাঁর সন্দেহবাতিক, তাঁর রহস্যময় মৃত্যু সবটাই আছে পাতাজুড়ে। জর্জিয়ার আধুনিক জনগণের স্ত্যালিন বিদ্বেষ সত্ত্বেও গরি গ্রামবাসী এখনো তাঁকে নিষ্পাপ ভাবে! গরি গ্রামের সযত্নে গড়ে ওঠা স্ত্যালিন স্মৃতি জাদুঘরটি তাই এখনো অটুট। স্ত্যালিনের স্মৃতিবিজড়িত নানা জিনিস যেমন ডেথ মাস্ক, হার্জেগোভিনা ফ্লোর সিগারেট, তামাকের পাইপ, লাল ট্রেনের বগিসহ তাঁর বেড়ে ওঠা যে কাঠের কুঁড়েঘরে-সেটা পর্যন্ত সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সঞ্জয় দের সাথে সাথে আমরাও যেনো দিব্যচক্ষুতে দেখতে পাই সেসকল স্মৃতিকীর্তি।
জর্জিয়ার তিবলিসি শহরে : ধীরে ধীরে পুরো তিবলিসি শহরটা চষে বেড়ানোর গল্প। বহুল প্রচলিত খাবার আচারুলি আর কাছাপুরি দিয়ে জম্পেশ ব্রেকফাস্ট সেরে লেখক ঢুঁ মারেন রাস্তার পাশে ফুটপাথে পুরনো বইয়ের দোকানে, উদ্দেশ্য বরিস পাস্তারনেকের কবিতার বই। সেটা না পেয়ে হার্ব বেচতে বসা এক অসহায় বৃদ্ধাকে পাশ কাটিয়ে লেখক এগিয়ে যান লিবার্টি স্কয়ারের দিকে। পথিমধ্যে আমরা জানতে পারি জর্জিয়ায় ১৯৫৬ এর প্রো স্ত্যালিন আন্দোলনের কথা, দেখি আইকন আঁকায় রত যুবাকে, শুনি পুরনো শহরের ক্লক টাওয়ার নির্মাণের গল্প, অবাক হই পাথুরে পাহাড়ের গা বেঁয়ে গড়ে ওঠা সারিসারি বাড়ি দেখে। এর মাঝেই একফাঁকে মেতকাভারি নদী তীরের এক হাম্মামখানায় ঢুকে সালফার জলে চমৎকার একটা স্নান সেরে ফেলেন লেখক। ফুরফুরে মনে সমাপ্তি ঘোষণা করেন জর্জিয়া ভ্রমণের।
অগ্নিময় বাকু : লেখক এবার আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে। উঠেছেন কাস্পিয়ান সাগরের তীরে গোলকধাঁধায় ঘেরা এক মাঝারি মানের হোটেলে। ট্যুর গাইড কাম ড্রাইভার সামিরকে নিয়ে চষে বেড়াচ্ছেন বাকুর আশপাশ। বাকুর তেলের প্রাচুর্য নিয়ে নানান তথ্য দিয়েছেন তিনি। এরমাঝে আলফ্রেড নোবলের ধনী হওয়া থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বাকু নিয়ে হিটলার স্ত্যালিন দ্বন্দ্বের কথাও আছে। কাদামাটির আগ্নেয়গিরি, আদিম পাথরের জঙ্গল, ভাজা মাংসের রেস্তোরাঁ, আতেসগাহের জরথ্রুস্ট মন্দির হয়ে তাঁদের যাত্রা থামে বাকুর ট্রেডমার্ক হায়দার আলিয়েভ সেন্টারে। এরই ফাঁকে জর্ডানের সমাজব্যবস্থা, পার্সি সংস্কৃতি ও বাকুতে স্বৈরশাসন নিয়ে কিছু ধারণা দিয়েছেন লেখক।
আজারবাইজানের খেনালুগ গ্রামে : পূজা, মিত্তাল নামের দুই প্রবাসী ভারতীয় ও বেঞ্জামিনা নামের এক স্লোভেনীয়কে সঙ্গী করে আজারবাইজানের প্রাচীন গ্রাম খেনালুগে পাড়ি জমান সঞ্জয় দে। পাথুরে পাহাড়ের উপর পাথর ভেঙেই তৈরী হয়েছে ঘরবাড়ি। প্রায় বিচ্ছিন্ন এই গ্রামে সুযোগসুবিধা সামান্যই। শত প্রতিকূলতার মাঝেও গ্রামের মোড়ল আদর আপ্যায়নের ত্রুটি রাখেনা। তা দেখে বিগলিত হয় লেখকসহ সকল ট্যুরিস্টের মন। লেখকের আজারবাইজান সফরের সমাপ্তিও ঘটে এই কৃতজ্ঞ বিকেলে এসে।
চমৎকার এই বইটি পড়ে পূর্ব ইউরোপ নিয়ে জ্ঞান আরেকটু বাড়লো, আরেকটু সমৃদ্ধ হলাম। যদিও যে হারে ভুলোমনা হচ্ছি, কতদিন এই জ্ঞান স্মৃতিতে ধরে রাখতে পারব জানিনা।
বইয়ের জগতে অবহেলিত জনরা ভ্রমণকাহিনী। লেখক সঞ্জয় দে নিজ কাজের সুবাদে ঘুরেছেন নানা দেশে, লিখেছেন বেশ কিছু ভ্রমণ কাহিনী। স্তালিনের বাস্তুভিটায় লেখক লিখেছেন সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিনের জন্মদেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। স্তালিনের বাস্তুভিটায় লেখক দেখেছেন ইতিহাস, কৃষ্টি আর ঐ সময়ের সাথে বর্তমানের ফারাক। জানিয়েছেন স্টালিনের জীবদ্দশায় ঘটা কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা। মূলত ককেশাস অঞ্চল অর্থাৎ আর্মেনিয়া, জর্জিয়া আজারবাইন, ইউক্রেন, ফ্লোরেন্স সহ নেপাল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে বইয়ে। ইউক্রেনের বয়চুকিস্ট চিত্রশিল্পীরা কিভাবে চিত্রকলার মাধ্যমে স্টালিনের সময়কে তুলে ধরেছে,, কিয়েভের জাজ সন্ধ্যা উদযাপন, কুপালা রাত্রি যাপন, বাল্টিকের ধারে মেঘে ঢাকা দিন, পোখারার লেক সাইড রোড, রেনেসাঁর শহর ফ্লোরেন্স, আর্মেনিয়ার গারনি গ্রাম, আরেনির আদিম গুহা, স্তালিনের বাস্তুভিটায় পাওয়া ইতিহাস, জর্জিয়ার তিবলিসি শহর, আজারবাইনের অগ্নিময় বাকু, অজারবাইনের খেনালুগ গ্রাম ভ্রমণ ইত্যাদি যত্নের সাথে লেখক লিখেছেন। এতগুলো দেশ ভ্রমণে ঐ সকল স্থানের কৃষ্টি কালচার, ভূ প্রকৃতি, রাজনীতি, মানুষ, ইতিহাস , সংস্কৃতি, খ���দ্যাভ্যাস, আচরণ ইত্যাদিতে ভ্রমণের অম্ল মধুর অভিজ্ঞতা ছেয়ে আছে বইটিতে।ককেশাস অঞ্চলের পাশাপাশি নেপালের পোখারা ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও রয়েছে কাহিনীতে। লেখক তার লেখায় একদম পিউর অভিজ্ঞতা টুকুই তুলে ধরেছেন বলে মনে হয়েছে। মানুষে মানুষের মধ্যে আচরণগত পার্থক্য, খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতা তুলে ধরেছেন এবং চষে বেড়িয়েছেন স্থল জল উভয়েই। কখনো পাহাড়, কখনো কংক্রিট, কখনো উত্তপ্ত বাকু , কখনো ফ্লোরেন্সে মাইকেল এঞ্জেলোর চিত্রকর্ম দর্শন সব কিছুই পাওয়া যাবে বইয়ে।প্রত্যেকটি অধ্যায়ে রয়েছে জানার মত অসংখ্য বিষয় কিন্তু লেখক জানিয়েছেন এমনভাবে যেন এক পথিক হেঁটে বেড়াচ্ছেন শহর আর বলে বেড়াচ্ছে গল্প। বইয়ের ভ্রমণ অধ্যায়গুলোকে আমার কাছে কিছুটা অগোছালো মনে হয়েছে। সেই সাথে লেখক লেখনী একটু কঠিন ধরণেরই। হেভি রাইটিং।সময়কে তিনি মুঠোবন্দি করেছেন চেয়েছেন তাঁর পাঠককেও সমান আনন্দ দিতে তাই প্রতিটি অধ্যায়ে জুড়ে দেয়া হয়েছে স্থানগুলোয় কাটানো সময়ের বিভিন্ন মুহূর্তের বিভিন্ন ছবি। বইটিতে অনেক সুন্দর করে প্রতিটি স্পটে কাটানো সময়ের অভিজ্ঞতা আর স্মৃতি সংবলন করেছেন লেখক যা কিনা আমার লেখায় আমি তেমনভাবে উল্লেখ করতে পারলামনা। যাদের ভ্রমণ কাহিনী পছন্দ এবং নতুন কিছু জানবার আগ্রহ আছে তাঁদের জন্য নিঃসন্দেহে ভালো চয়েস হবে "স্তালিনের বাস্তুভিটা" ।