সবচেয়ে আগে দুটো কথা বলা যাক।
প্রথমত, বাংলা ভাষায়, এমনকি অনূদিত চেহারাতেও এমন ধরনের কল্পবিজ্ঞান আমি আগে কখনও পড়িনি। কল্পবিশ্ব পাবলিকেশন রীতিমতো দুঃসাহসের পরিচয় দিয়ে কার্লোস সুচলওস্কি কন-এর এই সাতটি গল্প অনুবাদ না করলে আমার এগুলো পড়াই হত না। কল্পবিজ্ঞান বা বিজ্ঞান-সুবাসিত কল্পকাহিনির ক্ষেত্রে এখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কী ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, তার পরিচয়ও পেতেন না এই সময়ের বাঙালি পাঠক।
দ্বিতীয়ত, এই বইয়ের সাতটা লেখা কতটা কল্পবিজ্ঞান, কতটা দর্শনের আলোয় জীবনের পরিণতি বিচার, আর কতটা ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে বর্তমানকে দেখে মনে হওয়া অনুভূতি— এর বিচার প্রাজ্ঞতর পাঠকেরা করবেন। আমার ধারণা, এরা কল্পবিজ্ঞান নয়।
তাহলে এরা কী?
যে-সব গল্প এখানে আছে, তাদের বাংলা ও স্প্যানিশ নাম তুলে দিলাম, যাতে সেগুলোকে চিনে নেওয়া যায়~
১. সময়ের ফাঁদে (Si una mala jugada del tiempo)
২. হাজার বছরের অপেক্ষা কবে শেষ হবে ব্রাউলিফেমো? (Comer con el pico y batir las a las hasta que haya maquinas en el cielo)
৩. শূন্য শুধুই শূন্য নয় (El hombre que descubrio la manera de alterar la armonia del universo)
৪. ভবিষ্যৎ আঁধারে (El futuro)
৫. চিরন্তনের দেশপ্রেম (Casting Patriotico)
৬. চাঁদের পথে (Un puntito oscuro entre los cuatro mares)
৭. আগামীর পরিকল্পনা (Para que se cumpla el plan)
সচেতনভাবে হোক বা অবচেতনে, লেখকের ভাবনায় জাদুবাস্তবতার প্রভাব প্রগাঢ়। তাঁর লেখায় আরও একটা জিনিস খুব বেশি করে ধরা পড়ে— মানবের নশ্বরতা কাটিয়ে অমরত্বের লোভ এবং তার ফল, যা কখনোই সুখের হয় না। এই দুয়ের সমন্বয়ে লেখকের এক নিজস্ব দর্শনের বাহন হয়েছে গল্পগুলো। তাদের মধ্যে কোনোটাতে এসেছে সময়-ভ্রমণের মাধ্যমে নিয়তিকে এড়ানোর চেষ্টার অসারতা। কোনোটাতে এসেছে ডিস্টোপিয়ার আতঙ্ক। আবার কোনোটাতে সমকাল এসেছে ভবিষ্যতের মুখোশ পরে।
প্রথাগত কল্পগল্পের প্লট-ড্রিভন ছক আর ক্ষুরধার সংলাপের ছকে এদের একেবারেই আঁটানো যায় না! তাই এদের, অন্তত আমরা যাকে কল্পবিজ্ঞান বলি, সেই খোপে কী করে রাখি বলুন তো?
অনুবাদ ঝরঝরে। সৌরভ ঘোষ তাঁর সহজসিদ্ধ গতিময় ভঙ্গিতে অনুবাদ করেছেন। কিন্তু কিঞ্চিৎ আবেগমথিত হয়ে নজরুল থেকে রবীন্দ্রনাথকে সেইসব অনুবাদের মধ্যে দনাদ্দন ইনফিউজ করায় আমার বিষম লেগে গেছে - এই আর কি। সেই তুলনায় রমা সরকার দাসের অনুবাদ সামান্য ভারী অথচ সুরেলা।
সব মিলিয়ে এটাই বলা যায় যে বিদেশি কল্পবিজ্ঞানের এক অনাবিষ্কৃত ভূখণ্ড আমাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করেছে এই বইয়ের মাধ্যমে। চরিত্রচিত্রণ থেকে পটভূমি নির্মাণ— সবেতেই স্বতন্ত্র এই গল্পগুলো আমাদের পরা দরকার। তাহলে হয়তো আমরা বুঝতে পারব, প্রথাগত মার্কিন ধুমধাড়াক্কা আর এই বাংলায় কল্পবিজ্ঞানের নামে 'রোবটের চোখে জল'-এর থেকে স্বতন্ত্র এই পথ ধরে কীভাবে চলা যায়।
সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলুন।