আটের দশকে বাংলাদেশের খুলনা জেলার ভৈরব নদের ঘাট অঞ্চলে দীর্ঘ বছর রাজত্ব করেছিল এক নরপিশাচ। যার নাম এরশাদ শিকদার। শৈশবকাল তার আর পাঁচটা বাচ্চার মতো কাটে নি, ফলে বড় হয়ে সে হয়ে ওঠে এক ভয়ঙ্কর বিকৃতকাম, সাক্ষাৎ যম। মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা শুধু নয়, তাকে নানাভাবে যন্ত্রনা দিয়ে খুন করার পদ্ধতিগুলিও ছিল তেমনি ভয়াবহ। জীবদ্দশায় শতাধিক খুন, ধর্ষণ সহ আরো অনেক অসামাজিক কাজে লিপ্ত এরশাদ শিকদারের জীবনটি ছিল চূড়ান্ত নাটকীয়। এই কাহিনীর মূল চরিত্র কালো মন্ডল সেই এরশাদেরই ছায়া অবলম্বনে রচিত। লেখকের কলমে জীবন্ত হয়ে ওঠা কালো মন্ডলের কথা পাঠক পড়তে পড়তে বারবার শিহরিত হবেন এবং জানতে পারবেন মানুষরূপী এক ভয়ঙ্কর নরপিশাচকে।
বিনোদ ঘোষাল-এর জন্ম ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ হুগলি জেলার কোন্নগরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যে স্নাতক। মফস্সলের মাঠঘাট, পুকুর জঙ্গল আর বন্ধুদের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা আর অভিনয়ের দিকে ঝোঁক। গ্রুপ থিয়েটারের কর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। কর্মজীবন বিচিত্র। কখনও চায়ের গোডাউনের সুপারভাইজার, শিল্পপতির বাড়ির বাজারসরকার, কেয়ারটেকার বা বড়বাজারের গদিতে বসে হিসাবরক্ষক। কখনও প্রাইভেট টিউটর। বর্তমানে একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত। নিয়মিত লেখালেখি করেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ২০০৩ সালে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প। বৃহত্তর পাঠকের নজর কেড়েছিল। বাংলা ভাষায় প্রথম সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার প্রাপক। ২০১৪ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার। তাঁর একাধিক ছোটগল্পের নাট্যরূপ মঞ্চস্থ হয়েছে।
খুলনার কুখ্যাত খুনি এরশাদ শিকদার কে নিয়ে লেখা। মোটের উপর বেশ ভালোই। লেখকের লেখাও বেশ গোছানো আর সুন্দর ছিলো। এরশাদ কে নিয়ে লেখার জন্য লেখক যে সাহস দেখিয়েছেন তা সার্থক। আসলে এমন একজন খুনির খুন করার বর্ণনা আর বিভৎসতা বর্ণনা করা চাট্টিখানি কথা নয় তবুও লেখক বেশ চেষ্টা করেছেন।
'কাল ভৈরবের ঘাট' মূলত বিনোদ ঘোষাল এর গল্প বলার সংকলন। তবে টাইটেল স্টোরীটা কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের জীবনকাহিনী।
টাইটেল স্টোরীর লেখাটা স্রেফ লিখে যাওয়া টাইপ একটা গল্প। মনে হয় যেন কোন ঘটনার নিউজ রিপোর্টিং পড়ছি, ঠিক সাহিত্য টাইপ মনে হয়নি কিংবা নন-ফিকশন যেমনটা হয় ঠিক তেমনও না। তবে তা সত্ত্বেও আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। কারণ একটাই, এরশাদ শিকদারকে নিয়ে ডিটেইল কিছু আমি জানি না। সে হিসেবে পাঠককে বলতে চাই, কেউ যদি এরশাদ শিকদারের কুখ্যাত হয়ে ওঠার ঘটনা, তার এরকম বিকৃত মানসিকতা কিভাবে তৈরী হলো সেটা জানতে চান তাহলে বইটা পড়তে পারেন। আমার কাছে ভালোই লেগেছে তবে শেষটা খুবই দ্রুত হয়ে গেছে। ওখানে খানিকটা সময় নিয়ে বর্ণনা দেয়া যেত।
এ বইয়ের/সংকলনের বাকি লেখাগুলো পিওর ফিকশন। একটা নন-ফিকশন গল্পের সাথে আরো ৪-৫ টা ফিকশন গল্প জুড়ে দিয়ে সংকলন বই প্রকাশ আমার চোখে কখনো পড়েনি। বেশ অবাক হয়েছি এই জিনিস দেখে। বাকি গল্পগুলো নিয়ে আমার তেমন কোন মন্তব্য নেই। কারণ ফেসবুকের কল্যাণে এই টাইপ গল্প অনেক পড়া হয়েছে। নাথিং স্পেশাল।
এরশাদ শিকদারকে নিয়ে লেখা কাহিনি। সব মিলিয়ে বইটি ভালই লেগেছে।লেখকের লেখনী বেশ গোছানো।তবে খুব তাড়াতাড়ি ই শেষ হয়ে গিয়েছে।আরেকটু বড় হলে পড়তে আরও উপভোগ্য হতো বলে মনে করি।
উপন্যাসটি মূলত কেন্দ্র করেছে আটের দশকে বাংলাদেশের খুলনা জেলার ভৈরবী নদীর ঘাটের ত্রাস 'এরশাদ সিকদার' নামক এক নরপিশাচকে যে এই কাহিনীতে লেখকের কলমে হয়ে উঠেছে 'কালো মন্ডল'। বইটির ভুমিকা যথাযথ লেগেছে যেখানে লেখক মুক্ত হস্তে একপ্রকার স্বীকারোক্তিই লিখেছেন, জানিয়েছেন এই কাহিনী লেখার সময়ে তাঁর মানসিক অবস্থার কথা এবং পাঠক হিসেবে পড়ার সময়ে আমি নিজেও প্রতিটা পরতে উপলব্ধি করেছি লেখকের অনুভূতি, যা ভাবলে এখনও শিউরে উঠছি।
কাহিনীর ভিষণতা এতটাই গভীর যে এই নিয়ে বেশি পর্যালোচনা করতে বসে সত্যিই কলম যেন আর চলছেনা। এ কথা একশোভাগ সঠিক যে নিমপাতার রসকে চিনি মাখিয়ে পরিবেশন করার কোনোই মানে হয়না এবং এই ক্ষেত্রে কালো মণ্ডলের জীবনদর্শন যেন বিশ্বের সকল তিক্ততার ঊর্ধে কাজেই সেখানে কিলো কিলো চিনি অথবা গুড় মেশালেও তা দূর হওয়ার নয়। তাই সবদিক বিবেচনা করে এই কথাই বলবো যে 'কালো মন্ডল' এর চরিত্র (হয়তো চরিত্র শব্দটা যায়না এই পিশাচের সাথে) লেখকের কলমে পূর্ণমাত্রায় সুবিচার পেয়েছে, সুবিচার পেয়েছে লেখকের ভাষায় যা শালীনতার বাধা পেরিয়ে পাঠকের দরবারে পেশ করেছে এই নারকীয় জগতের স্রষ্টাকে এবং এই কাজ একেবারেই সহজ নয়।
কিছু ত্রুটি যা চোখে পড়লো এবং না বললেই নয়, তা হলো শেষ পর্বের খানিক তাড়াহুড়ো যেখানে ডি.এস.পি হুমায়ুন আজাদকে আরেকটু আগে আনা যেতো এবং কালো মণ্ডলের দুঃস্বপ্নের বারংবার উল্লেখ না থাকলেও চলতো, কিছু বিশেষ জায়গা ছাড়া।
দ্বিতীয়ত কালো মন্ডল, যে কিনা নিজেকে বারবার বুঝিয়েছে যে বিশ্বের সকল মানুষই তার শত্রু যার উল্লেখ নানান স্বগোক্তিতে আমরা পাই, অনুচর এরশাদের প্রতি তার অন্ধত্ব খানিক অদ্ভুত ঠেকেছে অন্তত তার মতো গোখরো সাপের ক্ষেত্রে যেখানে সে নিজে কাসেম সর্দারের সাথে আক্রমের বিশ্বাসঘাতকতার সাক্ষী।
আমি লেখককে কুর্নিশ জানাই নিজের প্রতি এরকম একটা বিস্ফোরক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার জন্য কারণ যার কলম 'কে বাজায় বাঁশি', 'ডানাওলা মানুষ', 'সুপারম্যানের পিতা', 'গল্প না'র মতো কোমলতা দিয়েছে, ঠিক সেই কলমই ছুরির মতো ফালা ফালা করে দেবে পাঠকের কোমল চিন্তাধারাকে এই লেখার মাধ্যমে। কাজেই এই সূত্রে একটি প্রবাদ বাক্যই মনে পড়ছে,
Pen is mightier than Sword
এবারে আসি অন্যান্য গল্পগুলোয়।
প্রথমেই নজরকাড়া 'ঋ অথবা দীপার গল্প' যা একটু হলেও লেখকের কলমে 'ডিপি' গল্পটাকে মনে পড়িয়ে দেয় এবং শেষ হয় অপ্রত্যাশিত এক মনখারাপী আমেজ রেখে। তবে জার্মান কোম্পানীতে কাজের চাপের মধ্যেও ঋকের ভ্রমনকালীন ছুটি পাওয়া খানিক অবাক লেগেছে তবে গল্পটির বিন্যাস বেশ অন্যরকম।
আবেগের ধারাকে অব্যাহত রেখেই মা ছেলের এক অমোঘ বন্ধনের গল্প শোনায় 'রং নাম্বার', যে বন্ধন কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ধরা দেয় সব শেষ হয়ে যাওয়ার পরে। এই কাহিনীতে লুকিয়ে আছে এক গভীর মনস্তত্ব যা সত্যিই যথেষ্ট বাস্তবিক এবং আজও কোনো এক রাজীব হয়তো অপেক্ষা করে আছে ওপার থেকে টেলিফোনের উত্তরের আশায়।
বেশ শিহরণ জাগানো এক কাহিনী 'মিঃ সরখেলের স্টাডি রুম'। মিঃ সরখেল যে স্রেফ রাতেই দেখা দেন ইত্যাদি উল্লেখের মাধ্যমে গল্পের শেষটা বেশ খানিক আগেই আন্দাজ পেয়ে গেছিলাম কাজেই লেখক আরেকটু অন্যভাবে রোমাঞ্চকে ধরে রাখলে ভালো করতেন। তবুও এই কাহিনীর তবে এই গল্পে মানুষের তীব্র নেশাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যা পরকালেও তাকে ছেড়ে যায়না।
'একটি জন্ম ও মৃত্যুর গল্প' পাঠকের মনে হাজির করেছে কঠোর বাস্তবকে যেখানে আবারও প্রমাণিত যে শক্তির কাছে আবেগ নিতান্তই এক শিশু।
তুলনামূলক মাঝারি লেগেছে 'দুগ্ধজাতক' কাহিনীটি যেখানে গল্পের গতি ভালো হলেও মূল মর্মটি প্রতিষ্ঠা করায় বেশ খানিক অস্পষ্টতা থেকে গেছে।
Swiftboox এর কল্যানে বইটি অবশেষে পড়তে পারলাম এবং পাঠ সত্যিই ভালো হলো, আবারও মুগ্ধ করলো লেখকের সাবলীল শব্দচয়ন।
এখন কালো মন্ডলের নারকীয়তাকে ভুলতে দুখুমিয়াকে অতীব প্রয়োজন পর্ব ২ এর মলাটে।
"আমি তো মরে যাব, চলে যাব, রেখে যাব সবই আছস কি কেউ সঙ্গের সাথী, সঙ্গে নি কেউ যাবি? আমি মরে যাব আমি তো মরে যাব আমি তো মরে যাব..." ৮০র দশকে খুলনা অঞ্চলের ত্রাস ছিল কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদার। অর্ধশতাধিক খুনের অভিযোগ পাওয়া যায় তার নামে। তার জীবনী অবলম্বনে চরিত্রগুলোর নাম পরিবর্তন করে লেখা হয়েছে এ আখ্যান। এই গল্পে যেই নৃশংসতা উঠে এসেছে, তা অবিশ্বাস্য এবং বেশ ধারালো। লেখক বেশ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন এ ব্যাপারে। মূল চরিত্র কালো মণ্ডলের উত্থান, সন্ত্রাসী জীবন আর পতন বেশ চমৎকার লেগেছে পড়তে। বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল বিখ্যাত বলিউড মুভি "গ্যাঙস অফ ওয়াসিপুর" এর কথা। আমাদের দেশে যে এত নৃশংস এবং বীভৎস খুনি ছিল, জানাই ছিল না। বিবরণ দিতে লেখক কোনো কার্পণ্যই করেন নি। এক্ষেত্রে বেশ সাহসেরই পরিচয় দিয়েছেন। যদি ব্রুটালিটি হজম করার ক্ষমতা থাকে, তবে এই বই প্রচণ্ড উপভোগ্য একটা বই। আক্ষেপ একটাই, কলেবর খুবই ছোট। ১০০ পৃষ্ঠাও পেরোয় নি। আরেকটু বড় হলে রেশটা আরো অনেক সময় থেকে যেত।
ডার্ক ধাঁচের গল্পগুলো সবসময় আমাকে বেশি টানে, এটাও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভালো লেগেছে বইটি। একটানা পড়ে শেষ করেছি। তবে, হত্যার দৃশ্যগুলো পড়ার সময় গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গিয়েছিল 😷
অসাধারণ লেখনী। যদিও লেখক যতটা সাবলীল ভাবে সকল বিভৎসতা ফুটিয়ে তুলেছেন সবাই সেইটা নিতে পারবে না। সত্যি ঘটনার সাথে কল্পনার মিশ্রণ ঘটিয়ে দুর্দান্ত একটি উপন্যাস
হয়তো বিনোদবাবুর বইগুলির মধ্যে এটি সবচেয়ে দুর্বল। তবু যথেষ্ট উৎসাহ নিয়ে পড়েছি। শেষের দিকে বেশ কিছু গল্প মনের খোরাক জোটাতে ব্যর্থ হয়নি বরং একটা ভালোলাগা নিয়েই বইটা শেষ করলাম।