একজন মানুষকে কি দেখে বোঝা যায় যে সে আসলে কে? মানুষের ওপরটা দেখে কি তার ভেতরের রূপটা জানা যায়? মানবমনের ফাঁকফোকড়ে লুকিয়ে থাকে কতশত ব্যাখ্যাতীত অনুভূতি, ত্রুটিবিচ্যুতি আর জটিলতা। আচ্ছা ইতিহাসও কি মানুষের মতো নয়? নিজের ফাঁকফোকড়ে যে ইতিহাস কতশত ব্যাখ্যাতীত ঘটনা লুকিয়ে রেখেছে তা আমরা একটু নজর দিলেই হয়তো দেখতে পাই। আমরা কি আদৌ জানতে পারি যে আসলে কী ঘটেছিলো? বা আমাদের কী জানানো হয়? বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণ এসে উঠলো এক পুরোনো বাড়িতে। রাত হলেই পাশের জনশূন্য ঘর থেকে ভেসে আসে রহস্যময় হাসির শব্দ। এই কাহিনির সাথে রাজা অশোকেরই বা কী সম্পর্ক? কিংবা আরেকজন বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে কেন দেখা যাচ্ছে মাঝেমধ্যে উঁকি দিয়ে যেতে? আমাদের দৃশ্যমান জগতই কী সব? নাকি অন্তরালে আছে আরো ভিন্ন কোনো ভুবন? ধীরেধীরে যখন উন্মোচিত হয় সব সত্য, তখন জাপ্টে ধরে আরো রহস্য। সবই কি আসলে ভ্রম? এই মানবজীবনের মতো? পাঠক তা আবিষ্কার করবে এই দুই মলাটের পাতায় পাতায়। অলৌকিক আর অন্ধকারাচ্ছন্ন ভুবনে আপনাদের স্বাগতম।
প্রথমে মোটাদাগে কিছু কথা বলে, তারপর খুঁটিনাটিতে যাওয়া যাবে। তবে অ্যাজ ইউজুয়াল, প্রথমেই বলে নিই—রিভিউটা পাঠক হিসেবে আমার মনের কথা। যাই হোক, লোশক, উপন্যাসিকা, ফ্যান্টাসি জনরার প্রথমে...এরপর থ্রিলার বলা যেতে পারে। ছোটখাটো বই, পড়তে খুব একটা কষ্ট হয় না। ঘণ্টা দেড়েকের স্মুথ রিড। ছাপা-বাঁধাই-কাগজ ইত্যাদির ব্যাপারে যাব না। ছাপা বাতিঘরের কখনও খারাপ হয় না। কাগজ আগে খারাপ ছিল, এখন ভালোই লাগে ধরতে-দেখতে। বাঁধাইয়ের পূর্বাভিজ্ঞতা ভালো না বলে অ্যান্টিক বইয়ের মতো অতিরিক্ত সাবধানে পড়েছি প্রথম থেকেই। তাই ভালো-মন্দ যেকোনোটাই হতে পারে। প্রচ্ছদ, গতানুগতিক। আলাদা কিছু নেই। উপন্যাসিকার সবচাইতে বড় শক্তি হলো—এর আকার। বেশ ছোট হওয়ায় এতে চরিত্রের আনাগোনা কম, তাই প্রতিটা চরিত্রকে আলাদা ভাবে তুলে ধরে যায়। লোশকের চরিত্রের সংখ্যা বেশি। আমার কাছে সফল চরিত্রায়ন মানে—বইটা পড়ার পর যেন আমি প্রতিটা (মানে অধিকাংশ) চরিত্রকে নাম ধরে মনে করতে পারে, তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাঝে কিছু-না-কিছু যেন আমার মনে থাকে। এই দিক দিয়ে লোশক সফল। কেবলমাত্র খল চরিত্রগুলো ক্রিমিনালি আন্ডার ডেভেলপড মনে হইছে। মূল খলকে খানিকটা আলাদা করা যায় শুধু সে শক্তিশালী বলে। বাকিরা ইন্টারচেঞ্জেবল। নায়কের চরিত্র একপেশে, নায়িকা রহস্যময়ী, জলিল চরিত্রটার মাঝে কিছুটা বৈচিত্র্য আছে। তবে একপেশে নায়ক আর রহস্যময়ী নায়িকার কম্বিনেশন বন্ধ হয়নি। দ্বিতীয় ভালো দিক একটা সুচিন্তিত দুনিয়া গঠন, নিঃসন্দেহে এর পেছনে বেশ সময় গেছে। যদিও বিস্তৃতি এত বেশি যে সেটা ঠিকমতো ধরে রাখাটা কঠিন হবে মনে হয়। দেখা যাক, সামনে কী হয়। মোটা দাগে খারাপ দিকেও আসি। উপন্যাসিকার সবচাইতে দুর্বলতা হলো—এর আকার (!!)। কোনো আইডিয়াকেই পুরোপুরি বিকশিত করা যায় না। আবার খুব ক্ষুদ্র ব্যপ্তির মাঝে অন্তত গ্রহণযোগ্য একটা গল্পের সেটাপ, সেটাকে এক্সপ্যান্ড করে আবার যতি টানতে হয়। Show, don’t tell—মোটামুটি লেখক মাত্রই মূলমন্ত্র অনুসরণের চেষ্টা করেন। লোশকে সেটা শুরুর দিকটায় পরিপূর্ণভাবে থাকলেও, পরের দিকে অনুপস্থিত। দ্রুত একটা বিশ্ব স্থাপনের চিন্তায় লেখক ‘না-দেখিয়ে’ ‘বলে দেবার’ পথ বেছে নিয়েছেন। আমার একদমই পছন্দ হয়নি ব্যাপারটা। দ্বিতীয় মন্দ দিক, মোটা দাগে আরকী, প্রচুর সাম্প্রতিককালের রেফারেন্স অতি অল্প বিরতিতে ব্যবহার করা। বইতে বাপ্পী খান ভাইয়ের বইয়ের উল্লেখ আছে, আছে মুশকান জুবেরি, সাম্ভালার মিচনার, হ্যারি পটার, এবং আরও একটা চরিত্রের কথা। আমি প্রথম চারটা সম্পর্কে অবগত, পঞ্চমটা ধরতে পারিনি। মনেও রাখিনি। স্বল্প ব্যবধানে চারটা পপ-কালচার রেফারেন্সের ব্যবহার চরিত্রায়নের একটা দুর্বল দিক দেখায়। কেননা এরপর আর চরিত্রটা রেফারেন্স ব্যবহারও করেনি। যার জন্য করা হয়েছে, সে অন্য জগতের প্রাণী হয়েও ধরে ফেলল...এটাও একটু কষ্টকল্পনা। বরঞ্চ রেফারেন্স কমিয়ে, একটা-দুটো ব্যবহার করে সেটাকে দ্বিতীয় চরিত্রের কাছে এক-দুই লাইনে পরিচয় করিয়ে দিলে সম্ভবত বইয়ের সঙ্গে যেত বেশি। আমরাও ‘ফিস-আউট-অভ-ওয়াটার’ পরিস্থিতির একটা দর্শন পেতাম। তৃতীয় মন্দ দিক, অযাচিত ভাবে দুয়েকটা ইংরেজি শব্দের ব্যবহার। মূলত লোশক এবং লোশকের গোত্রদের বর্ণনায় নামগুলো বাংলা রাখা যেত। তাদেরকে অন্য পুরাণের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েট করতে চাইলে সহজেই ‘যাদেরকে অমুকরা অমুক নামে চেনে’ টাইপ ডিভাইস ব্যবহার করলে মন্দ হতো না (উদাহরণ-স্বরূপ বললাম। অন্য কে কোনো পন্থাও সমান অগ্রহণযোগ্য)। শেষের দিকে স্পেল ক্যাস্ট ধরনের শব্দ একটু মর্মপীড়ার উদ্রেক করেছে বৈকি। ইংরেজি ব্যবহারের সমস্যা হলো, ক্রিয়াপদ আর বিশেষ্যের সমস্যা। যেমন কোনো মানুষ হ্যালুসিনেট করে, হ্যালুসিনেট দেখে না বা হ্যালুসিনেটের শিকার হয় না বা তার হ্যালুসিনেট হয় না (হ্যালুসিনেশন হয়, পৃষ্ঠা ৯২)। বানান ভুল, বাংলা সাহিত্যের অভিশাপ, ছোবল কোথায় বসায় না? তবে বাতিঘরের অতি পরিচিত বহুল ভুলের পরিমাণে কমে এসেছে এই বইতে। আছে, তবে সেগুলো টাইপো বলেই মনে হয়। আপনি-তুমির ভুলটা আছে ৮-১০ স্থানে। ছোট বই বলে নজরে লাগে বেশি। এবার খুঁটিনাটির দিকে আসা যাক। এগুলো খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ না, তবে হয়তো কারও কাজে আসবে: ১. লেখনশৈলী খারাপ লাগেনি। তবে ক্ষেত্র বিশেষে একটু সুরতাল কেটে গেছে। তিনজনকে দেখা যায় আর তিনজনকে দেখা গেল, এখানে ‘যায়’ আর ‘গেল’ আলটিমেটলি একই উদ্দেশ্য সাধন করলেও, পরের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে ‘গেল’টাই বেশি মানানসই। তেমনি নজর রাখতে শুরু করল চারপাশ (চারপাশে), একটা কোদাল তুলে দেয়া হলো বালকটিকে (বালকটির হাতে) ইত্যাদি। ২. পৃষ্ঠা ৩৩: অশোকের (শুরুর দিকে সম্রাট ও পরবর্তীতে রাজা বলা হয়েছে, দুটো শব্দের ওজনের ভিন্নতা তো আমরা জানিই) স্ত্রীর নাম বলা হয়েছে মায়াদেবী। আমার জানা মতে এটা বিদিশা মহাদেবী হবে। মায়াদেবী সিদ্ধার্থের মায়ের নাম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। দুটোয় একটু কনফিউশন লেগে যায়, বিদিশাদেবী হিসেবে একবার যখন বলা হয়েছে তখন পুরোটা বললেও মন্দ হতো না। ৩. পৃষ্ঠা ৪৬: এটা তথ্যগত ভুল। চায়ের সঙ্গে চিনি মেশানো হয়েছে অনেক, তাই আরামে ঘুম চলে আসছে—ব্যাপারটা এমন হয় না। বরঞ্চ চিনি একটা ড্রাগের মতো কাজ করে, জাগিয়ে রাখে মানুষকে। বাচ্চাদেরকে চিনি জাতীয় খাবার দিতে এজন্যই নিষেধ করা হয়। সুগার ক্রাশ নামে একটা পরিস্থিতি আছে যা মানুষের দেহে শক্তির অভাব বোধের জন্য দিতে পারে। তাতে ঘুম আসে না, বরঞ্চ মানুষ আরও বিরক্ত হয়ে ওঠে। ৪. জাহানারা সংক্রান্ত একটা থিয়োরি আছে বইতে। দ্যাটস অল অ্যান্ড গুড, কিন্তু আওরঙ্গজেব ইতিহাসে গোঁড়া ধার্মিক সম্রাট নামেই পরিচিত; তাই ব্যাপারটা ঠিক মিল খায় না। ৫. মেকাপ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বড় বইতে অনেক কিছুই চোখে পড়ে না যা ছোট বইতে পড়ে। যেমন এখানে প্রতিটা সাব-চ্যাপ্টারে *** ব্যবহার করা হলেও একটায় মিসিং, আবার সংলাপের মাঝে প্যারা হলে প্রথম প্যারার শেষে উদ্ধৃতি চিহ্ন বসে না; আবার পরবর্তী প্যারার প্রথমে বসে। ৬. আমার মূল আপত্তি হলো কোনো সিরিজের বইকে শুরু থেকেই সেভাবে পরিচয় না করিয়ে দেয়া। প্রচ্ছদে, প্রথম পাতায় কিংবা ভূমিকায় তা থাকতেই হবে। পেলাম না, তবে জানতাম। এই জন্য বেশি হাউ-কাউ করাও যাচ্ছে না। খুঁটিনাটি যা-যা উল্লেখ করলাম তা আসলে বইটাকে আরও সুন্দর করার উপায় হিসেবে আমার পরামর্শ। তেমন বড় ধরনের কোনো সমস্যা এগুলো না।
৩ স্টার না, আসলে ২.৫ স্টার দেবো বেশ হাইপ ওঠা বই 'লোশক'কে। কিন্তু সে হাইপের বলতে গেলে কোন কিছুই পাইনি। লেখকের বলার মত একটা গল্প ছিলো ঠিকই এবং ���মি নির্দ্বিধায় স্বীকার করছি তার গল্পটা চমকপ্রদ ছিলো কিন্তু তিনি বলতে গিয়ে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। মোদ্দাকথা প্লট বেশ ভালো সুন্দর কিন্তু লিখনশৈলী মারাত্মক রকমের দূর্বল।
গল্পের প্রোটাগোনিস্টকে একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ, কিন্তু তাকে দেখি জলিল মিয়া নামক একজন বাবুর্চি কাম বাসা দেখাশোনা করার মানুষের সাথে সাইন্সের অ্যাডভান্সড বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে। এটা আসলে মোটামুটি রকমের অযৌক্তিক একটা ব্যাপার এবং এই ব্যাপারটা প্রথম যে অধ্যায়ে আসে সে অধ্যায়ে মোটামুটি এই ব্যাপারটা নিয়েই লেখা হয়েছে যেটা আমার মনে হয়েছে কাহিনীর সাথে অপ্রাসঙ্গিক এবং অপ্রয়োজনীয়। এরপর এক জায়গায় লেখা হয়েছে, প্রোটাগনিস্ট রুম অন্ধকার করে গান শুনতে শুনতে হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনতে পায় এবং আওয়াজ লক্ষ্য করে এগিয়ে সেখানে 'অত্যন্ত সুশ্রী' একটা মেয়ে দেখতে পায়। অন্ধকারে সুশ্রী মেয়ে দেখতে পারার ব্যাপারটা কিভাবে সম্ভব হলো সেটির কোন ব্যাখ্যা পেলাম না। আবার দেখলাম, জলিল মিয়ার একটা খাবারকে অমৃত বলা হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, সেই অমৃত হচ্ছে, পরোটা আর ডিম ভাজা! পরোটা আর ডিম ভাজা আসলে এতই সাধারণ খাবার যেটাকে আসলে চাইলেও খুব ভালো করে তৈরী করার কোন ব্যাপার নেই। সুতরাং আমি বলবো, এখানে অমৃত উপমাটার ভুল প্রয়োগ হয়েছে। তবে সবচাইতে বিরক্তির যে ব্যাপারটা আমার মনে হয়েছে সেটা হলো, লেখক জায়গায় জায়গায় কিছু সমসাময়িক লেখকের বইয়ের চরিত্রের উদাহরণ টেনেছেন। তাও আবার জলিল মিয়ার সাথে কথা বলার সময়। যেমন : 'এখন কি এই জ্বীন তাড়ানোর জন্য মুমিনকে নিয়ে আসতে হবে?' (এখানে 'মুমিন' নামটি দ্বারা তানজীম রহমানের 'অক্টারিন' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র 'মুমিন' এর দিকে আলোকপাত করা হয়েছে)। মুমিন চরিত্রটি অন্য উপন্যাসের এবং সে উপন্যাসটি আমার পড়া হয়েছে বলে আমি ধরতে পেরেছি। কিন্তু যে পড়েনি, তার কি হবে? সে তো বুঝবে না৷ আর এই ব্যাপারটা একবার ঘটেনি, কমপক্ষে ৩ বার আলাদা আলাদা উপন্যাসের আলাদা আলাদা চরিত্র আনাটা আমার চোখে পড়েছে। আমার মতে, আবেগ বলি আর সম্মান বলি, এইরকম ভাবে এক্সপ্ল্যানেশান ছাড়া অন্য উপন্যাস থেকে চরিত্র আনাটা বা কোটেশন করাটা আসলে একদমই আনাড়ী একটা কাজ হয়ে যায়। শুধু তাই না, উপন্যাসের প্রয়োজনে লেখক অনেকগুলো কন্সপারেসী থিওরী তুলে ধরেছেন যেগুলা স্রেফ তুলেই দিয়েছেন কিন্তু কোন ডিটেইল বর্ণনা বা এক্সপ্ল্যানেশান দেননি। এক্সপ্ল্যানেশান/বর্ণনা না দেয়ায় এই থিওরীগুলো একদমই ঠুনকো স্টান্ট মনে হয়েছে।
এবং সবশেষে প্রচন্ড অস্বস্তি নিয়ে বলতে হচ্ছে, যে জায়গায় বর্ণনা দরকার ছিলো ঐ জায়গায় না দিয়ে, অপ্রয়োজনীয় জায়গায় বর্ণনা দেয়ার কারণে মাত্র ১২৭ পৃষ্ঠার বইটিকেও আমার মেদযুক্ত একটা বই মনে হয়েছে।
তবে সবকিছু শেষে আশার বাণী এই যে, বাংলায় ফ্যান্টাসি লেখার প্রচেষ্টা শুরু হচ্ছে এবং সেই বন্ধুর পথে হাঁটার পদক্ষেপ নেয়ার জন্য লেখককে শুভকামনা। তাছাড়া তিনি বেশ সুন্দর একটা কাহিনী দিয়ে শুরুটা করেছিলেন এবং স্টোরীটেলিং যেমনই হোক তিনি চমৎকার একটা ক্লিফহ্যাঙ্গার এন্ডিং দিয়েছেন। এন্ডিং দেখে মনে হচ্ছে, এটা একটা সিরিজ হতে যাচ্ছে৷ যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে আমি আগ্রহ ভরে অপেক্ষা করছি পরের ইন্সটলমেন্টটার জন্য। কে জানে হয়তো, সিক্যুয়েলে/প্রিক্যুয়েলে আর কোন সমস্যাই হবে না। সে আশা নিয়ে লেখককে শুভকামনা।
To do good is difficult. One who does good first does something hard to do. - Ashoka
- লোশক - খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩ তে জন্ম নেয় তৎকালীন শাক্যবংশের এক রাজপুত্র, কিন্তু সে জন্মের পরপরেই তার মায়ের মনে দানা বাধে নানা আশংকার। বড় হবার পরে সেই রাজপুত্রের কাছে দেখা যায় এক অদ্ভুত ক্ষমতা। যার কারণে তাকে শেষ পর্যন্ত সন্ন্যাস বাস নিতে বাধ্য হয়। - খ্রিস্টপূর্ব ২৬১ তে কলিঙ্গ এবং মগধের ভিতরে সংগঠিত হয় ভয়াবহ এক যুদ্ধ, শোনা যায় সে যুদ্ধে ব্যবহৃত হয় নানা ভয়াবহ অতিপ্রাকৃতিক শক্তি। ভারতবর্ষের ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি বদলে দেয়া সে যুদ্ধের পরপরই সম্রাট অশোক হয়ে যান শান্তির দূত। - তাহমিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক তরুণ উঠেন তার এক আত্মীয়ের পুরোনো বাসায়। কিন্তু বাড়িতে আসার পর পরেই বুঝতে পারেন বাড়িতে রয়েছে অতিপ্রাকৃতিক কোন কিছু। সে রহস্য উদঘাটনে অদা জল খেয়ে নেমে পরে সে। - এখন শাক্যবংশের সেই রাজপুত্রের অদ্ভুত ক্ষমতা আসলে কি? মগধ - কলিঙ্গের সেই যুদ্ধে আসলে কি ঘটেছিলো যে সম্রাট অশোক "চণ্ডাশোক" থেকে "ধর্মাশোক" এ পরিণত হলো? তাহমিদ কি সেই বাড়িতে আসলেই অতিপ্রাকৃতিক কিছু দেখছে নাকি সবই তার মনের কল্পনা? এ সব কিছুর সাথে যে "লোশক" নামটি জড়িত সেটি আসলে কি জিনিস? এ সব কিছুর উত্তর জানতে হলে পড়তে হবে লেখক সালেহ আহমেদ মুবিনের লেখা ফ্যান্টাসি থ্রিলার ভিত্তিক উপন্যাসিকা "লোশক" .
"লোশক" লেখক সালেহ আহমেদ মুবিনের লেখা প্রথম উপন্যাসিকা। ১২৮ পেজের টানটান এ উপন্যাসিকাটি আসলে এক বসায় শেষ করার মতো। উপন্যাসিকাটির প্লট বেশ আকর্ষণীয়, হিস্টোরিক্যাল সময়ের সাথে বর্তমান সময়ের কালপ্রবাহের মেলবন্ধনে এগিয়েছে গল্পটি। উপন্যাসিকাটির বর্তমান সময়ের লেখনী বেশ ভালো, তবে ইতিহাসের অংশগুলোর বর্ণনা আরেকটু সহজ সরলভাবে বলা যেতে পারতো। - "লোশক" উপন্যাসিকাটিতে ঐতিহাসিক এবং ফিকশনাল নানা ধরনের চরিত্র আসলেও অনিনিন্দা বাদে আর কারো ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট খুব একটা মনমতো হয়নি, যদিও চাইলেই সেটা করা যেত বলে মনে হয়। মূল প্লটের সাথে কয়েকটি সাবপ্লটও ছিল যার কয়েকটার ব্যপারে শেষ করার পরেও ধোঁয়াশা কাটেনি।তবে বইয়ের বেশ কিছু জায়গায় বাংলাদেশী এবং বিদেশী নানা ধরনের ফিকশনাল ক্যারেক্টারের এস্টার এগ চমকপ্রদ লেগেছে। - "লোশক" উপন্যাসিকাটিতে গল্পের প্রয়োজনে নানা ধরণের মিথিক জিনিসপত্র, প্রানী, স্থান ইত্যাদির মাধ্যেম লেখক আরবান ফ্যান্টাসি ঘরানার একটি ওয়ার্ল্ড তৈরী করতে চেয়েছেন এবং সেদিক থেকে তিনি সফল বলা যায়। তবে লেখক যে কলেবরে কাহিনী ফেদেছিলেন সে অনুসারে বইটি ছোটই লেগেছে। সামনে হয়তো এই ফিকশনাল ওয়ার্ল্ড থেকে আরো গল্প পাবো, এই আশায় থাকলাম। - কারিগরি দিক থেকে লোশকের বাঁধাই, কাগজের মান, প্রচ্ছদ বেশ মানান সই লেগেছে। বানান ভুল বা টাইপিং মিস্টেক দুই এক জায়গা বাদে চোখে পড়েনি, যা বইটির একটি প্লাস পয়েন্ট। - এক কথায়, আরবান ফ্যান্টাসি হিসেবে "লোশক" কে বলা যায় ভালো মানের একটি উপন্যাসিকা। যারা হিস্টোরিক্যাল বেজড আরবান ফ্যান্টাসি পড়তে পছন্দ করেন তারা বইটি পরে দেখতে পারেন। সামনে লেখকের কাছ থেকে আরো ভালোমানের লেখা আশা করছি।
অতীতকে নিশ্চিত বলে জানি যতটুকু, সেটা ইতিহাস। এই ইতিহাসে স্পষ্টভাবে না জানা অনেক অধ্যায় থেকে যায়। কিছু ফাঁকফোকর। এই ফোকরগুলোও সুন্দরভাবে মুদে যায় কিছু সর্বজনস্বীকৃত কল্পকাহিনীর আবর্তে। ওগুলো 'কিংবদন্তী', বা 'লিজেন্ড'। গাজী-কালু-চম্পাবতীর গল্পে যে বাঘের সাথে কুমিরের লড়াই হয়েছিল, এই ন্যারেটিভ সবার জানা। নমরুদের সেনাবাহিনীর পরাজয়ের রহস্য কি? মশা। এটাও আবার ধর্মীয় কিংবদন্তী। কিছু ফাঁকফোকর অথবা 'অস্পষ্ট ইতিহাস' বা প্রশ্নবিদ্ধ্ ইতিহাসের জবাবে ঐকমত পাওয়া যায় না, সে যৌক্তিকই হোক বা কাল্পনিক। সেই জায়গাগুলোয় জুড়ে বসে নানান কন্সপিরেসি। আমাদের উপমহাদেশের এমন এক বি-শা-ল কন্সপিরেসির বিষয় হলেন সম্রাট অশোক। যার নাম নিলেই সর্বাগ্রে মাথায় আসবে 'শত ভ্রাতার হত্যাকারী', 'চন্ডাশোক'। নিজ দেশ মগধ কর্তৃক কলিঙ্গ আক্রমণের পর এই অশোকেরই আবার কি ঘটলো, চন্ডাশোক পরিণত হলেন 'ধর্মাশোক'-এ, গ্রহণ করলেন বৌদ্ধ ধর্ম, তারপর ভারতবর্ষজুড়ে যে উন্নয়ন এবং সংস্কার করলেন তা প্রবাদপ্রতীম। ঠিক কি ঘটেছিল কলিঙ্গের যুদ্ধের সময়ে? উপমহাদেশের এমন তুমুল জনপ্রিয় এক কন্সপায়ারেবল টপিকে হাত দিয়েছেন সালেহ আহমেদ মুবিন, তার প্রথম বইয়ে। এই পর্যায়ে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, বই পড়ার প্রায় আধা মাস পর রিভিউ লিখতে বসেছি বলে। অনেক কিছুই মনে নেই, বই শেষ করার রেশ কেটে গেছে, রিভিউতে সুবিচার করতে পারব না। এর মাঝে তাই বসে গুডরীডসে অন্য রিভিউগুলো পড়ছিলাম। দুয়েকটা রিভিউ ছাড়া মনে হলো বাকিরাও খুব সুবিচার করতে পারেননি। একজন বোধ হয় ধরতেই পারেন নি হিস্টোরিক্যাল ফ্যান্টাসি জিনিসটা কি। যা হোক। সর্বোপরি একটু গুছিয়ে গপ্পো শুরু করতে চাচ্ছি নিজের স্বল্প জানা থেকে। প্রথমত, ফ্যান্টাসি। মানে কল্পকাহিনী। এখানে যেসব যুক্তি কাজ করে সবই কাল্পনিক। সায়েন্স ফিকশনে যেমন অভাবিত ব্যাপারগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকে, নিদেনপক্ষে হাইপোথিসিস থাকতে হয়, সেখানে ফ্যান্টাসি আরো এক ধাপ উপরে, যেকোন অভাবিত ব্যাপারকেই আমাদের কল্পনার স্বাধীনতা থেকে একটা স্বীকৃতি দিতে পারি। এখানে কল্পিত নিয়মে সবকিছু ঘটতে পারে। ওয়ান্ড হতে পারে স্মার্টফোনের মতো অপরিহার্য, ম্যাজিকই হতে পারে একমাত্র বিজ্ঞান (পদার্থবিদ্যার টুকটাক সূত্র ছাড়া… ওটা না থাকলে আবার বেশিই বাড়াবাড়ি হয়ে যায়।) আমাদের দেশে ফ্যান্টাসির চর্চা খুব নতুন কিছুও না। ‘কিশোর তারকালোক’ যারা পড়তেন, সেসময়কার ফ্যান্টাসি গল্পের চর্চাটা চোখে পড়ে থাকবে তাদের। যেমন আবার ‘কিশোরকন্ঠ’ পাঠকরা ম্যাগাজিনটাকে মনে রাখবেন কিশোরতোষ সায়েন্স ফিকশনের জন্য। ‘লোশক’ বইটা ফ্যান্টাসি জনরার কয়েকটা সাব-জনরাতে পড়ে। তার মাঝে প্রথমত, ‘হিস্টোরিকাল ফ্যান্টাসি’। কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার কল্পিত বর্ণনায় জন্মাতে পারে হিস্টোরিকাল ফিকশন। এখন, যে হিস্টোরিকাল ফিকশনে ফ্যান্টাসি এলিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে তাকে হিস্টরিকাল ফ্যান্টাসি বলা হবে। যে গল্পের প্লট রচিত হয়েছে মোগল বাদশাহ বাবরের আমলে, সেখানে বাবরের যুদ্ধ, ছেলে হুমায়ুনের মৃত্যুশয্যা ইত্যাদি ইত্যাদি ঐতিহাসিক ঘটনা আসবেই, লেখকের নিজস্ব ফ্যান্টাসি এলিমেন্ট ব্যবহার করার স্বার্থে। বইটাই যখন হিস্টোরিকাল ফ্যান্টাসি’র, ইতিহাস আশা না করার উপায় আপনার নাই। দ্বিতীয়ত, ‘লো ফ্যান্টাসি’। এর বিপরীতে আছে ‘হাই ফ্যান্টাসি’। সাধারণত একটা কল্পিত পৃথিবীতে কাহিনী রচিত হয় হাই ফ্যান্টাসির। সেখানে লোশকের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে এই আমাদের ভারতবর্ষের চেনা ইতিহাসের পাতায়। এই যেমন হ্যারি পটার আমাদের সময়কার পৃথিবীতে বিরাজ করেছে, তাই তাকে লো ফ্যান্টাসি বলা যায় আবার আলাদা করে একটা উইজার্ডিং ওয়ার্ল্ডও সাজানো হয়েছে ওতে, ওই অংশে আবার হাই ফ্যান্টাসির ওয়ার্ল্ডে সাজানো লো ফ্যান্টাসি বলা যেতে পারে হ্যারি পটারকে। ‘উইচার’ হাই ফ্যান্টাসির ওয়ার্ল্ডে সাজানো। কিন্তু লো ফ্যান্টাসি। তৃতীয়ত, আরবান ফ্যান্টাসি। আরবান কেমন? আমাদের চেনা জগতের চেনা নিয়মে চলা জিনিসগুলোকে যদি ফ্যান্টাসি এলিমেন্ট দ্বারা চালিত করেন, অর্থাৎ নেহাত এই ইট-কাঠের বাস্তব দৈনন্দিনতায় ফ্যান্টাসি আনতে পারেন, তাকে বলা যাবে আরবান ফ্যান্টাসি। আপনার ঘরে ফ্যান আছে। সুইচ টিপলে চালু হবে। আপনি বিছানায় বসে ম্যাজিক ওয়ান্ড দুলিয়ে ফ্যান চালু করলেন। এখন এটা যদি এসগারডের প্রাসাদের কক্ষে ভেন্টিলেটর খুলে দিলে বাতাস আসার ব্যাপার হতো, সেখানে আরবান ফ্যান্টাসি বলতে পারতাম না।
ফিরে আসি ‘লোশক’এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। সম্রাট অশোককে নিয়ে সাম্প্রতিক বাংলাদেশি ফিকশনে মনে রাখার মতো ‘নাড়াচাড়া’ হয়েছে দুটা। এক হলো শরীফুল ইসলামের ‘সাম্ভালা’, আরেক সিদ্দিক আহমেদের ‘দশগ্রীব’। সাম্ভালায় নবরত্নের কথাই এসেছে শুধু। কিন্তু সিদ্দিক আহমেদ তো বোম ফাটিয়ে দিলেন! তিনি কিন্তু বাস্তবতা থেকে খুব বেশি দূরে না গিয়ে, অশোকের ইতিহাসে খুব বেশি ফ্যান্টাসি এলিমেন্ট ব্যবহার না করেই যা করেছেন তাতে পাঠকের মাথা ঘুরে গেছে। এবং এই মুনশিয়ানা হয়েছে খুব মনে রাখার মতো একটা কিছু। এই দুজনের পর, ‘লোশক’-এ একই প্লট হাতে নিয়েছেন মুবিন। এবং দুঃখজনকভাবে বলতে হচ্ছে, মুবিন এই প্লটটার হক আদায় করতে পারেনি। কারণ? বইয়ের দৈর্ঘ্য ১২৭ পেইজ। এক বসায় পড়ে ফেলার যোগ্যতা দিয়েছে হয়তো সেটা এই বইটাকে, কিন্তু এমন একটা প্লট হ্যান্ডেল করার অনেক সুযোগ লেখকের হাতে ছিল, লেখক সেটা করতে পারেননি। একই প্রসঙ্গে আসে অনিন্দিতা’র ন্যারেটিভের প্রসঙ্গে। আসলে দুর্ভাগ্যক্রমে আমি সবে Mistborn ট্রিলজির দুইটা বইয়ের পরই মুবিনের বইটা হাতে নিয়েছি। ঝামেলাটা বড্ড চোখে লেগেছে তাতে। ‘লোশক’-এর মাঝে অনিন্দিতা’র মুখে একটা গল্প শুরু হয়। গল্পের ভেতরে আরেকটা গল্প শুরু হলো, আলিফ লায়লার মতো। এবং আমার যা ‘এক্সপ্লোর’ করার, সেটুকু একটা চরিত্র আমার হয়ে করে দিচ্ছে, “মাঝরাতে একটি গল্প শুনিয়েছিলে” ( :p ) …mistborn এর কথা বলতে হয় এজন্য, সেখানে পাঠককে একটা প্লটে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো তাড়া নেই। পাঠক চরিত্রদের সাথে যাচ্ছে, ঘুরছে, খুঁজছে। একটু একটু করে খোলাসা হচ্ছে সবকিছু তার কাছে। আবার দশগ্রীবের কথাই ভাবা যাক। সম্রাট অশোকের সাথে করে গল্পের ট্রাঞ্জিশন কতটা ধীরেসুস্থে এগিয়েছে। ‘লোশক’-এ এই হাতে-কাহিনী-ধরানো-টা পড়ার আনন্দকে নষ্ট করেছে। স্যরি, মুবিন। সিদ্ধার্থ গৌতম, সম্রাট অশোক – এই সব মিলে খুব বড় কিছু হতে পারতো প্রজেক্টটা। সিদ্ধার্থ গল্পে বলতে গেলে কোনো কন্ট্রিবিউটই করেননি। ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের কথা অনেকেই বলেছেন। আমিও তিন ভিলেইনের ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট আশা করছিলাম, নিদেনপক্ষে রাধাগুপ্তের, যেহেতু তার ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে সামনে। সব শেষের দৃশ্যে একটা একশন সিকোয়েন্স দেখানো হয়েছে। একটা কক্ষে। ৫টা চরিত্রের সংঘাত। কঞ্জাস্টেড ফিল করছিলাম, আহনাফ তাহমিদের ‘আলাদিন’-এর মতো। সর্বোনবতি’র ব্যবহার দেখানো যেত, ম্যাজিক ডিজাইন করা যেত। এবং বইয়ে কিছু মিস করলাম কোথায় জানি না, লুসিডের ব্যাপারটা শেষে গিয়ে ধরতেই পারিনি :3
ভালো লাগার দিক বলতে গেলে, গল্পের আবহ, স্বীকার করতে হবে, চমৎকার ছিল! আমিয়েন্দ্র/অমিয়েত্রা’র মতো মৃদু গা ছমছম আবহ পেয়েছি। ভাষার কাজ লক্ষ্য করার মতো! গল্প যখন অতীতে, আর গল্প যখন বর্তমানে, এই দুইয়ের ভাষার কাজ পুরই আলাদা। যেন গজেন মিত্রে’র ‘পাঞ্চজন্য’ পড়তে গেলে কালীদাসের মহাভারতের মতোই ওজনদার ভাষায় লেখা মনে হয়, তেমন ঐতিহাসিক অংশগুলোর ন্যারেটিভ আলাদা ছিল বর্তমান থেকে। এবং ‘লোশক’ একা একটা বই হিসেবে যতটা ভালো হয়েছে, তারচেয়ে ভালো তাকে বলা যাবে একটা সিরিজের চমৎকার শুরু হিসেবে। সামনে যদি আরো কিস্তি আসে, বর্তমান গল্পের সাথে যদি কুক্ষিবর এবং পৃথিবীর অন্ধকার ইতিহাসে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়, মন্দ হবে না। সালেহ আহমেদ মুবিনকে আর সবার মতো ‘ডেবিউ রাইটার’ বলতে পারব না। তার লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হ্যারি পটার ফ্যান ফিকশন ‘বাকবিক’ পড়ে। তখনও তার লেখা ম্যাচিওরড লেগেছে। লেখা ও অনুবাদ ছাড়াও মুবিন কাজ করেছে বাংলাদেশের ফ্যান্টাসির ক্ষেত্রটিতে, বেটা রিডার এবং সম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিল বেশ কিছু বইয়ে। দেখতে দেখতে নিজের প্রথম একক বই যখন বের করেছে-ই, তখন ভরসা রাখলাম মুবিন-এ :D পরের মৌলিকের প্রতীক্ষায় রইলাম।
আচ্ছা, পাঠক, আমার মতো কি আপনাদেরও মনে হয়েছে ‘লোশকে’র উপর অন্য আরেকটা সিরিজ পুরো ছায়া বিস্তার করে ছিল? কুক্ষিবর, এস্ট্রাল ডাইমেনশন, গুপ্তারিক এবং আঁধারের সত্ত্বারা, অতিপ্রাকৃত, মহামান্য, এস্ট্রালের হায়ার অর্ডার, ইন্টার-ডাইমেনশনাল যাতায়াত ইত্যাদি? এমনকি ইতিহাসের উপরেও তাদের গোপন প্রভাব বিস্তার করে হিস্টোরিকাল ফ্যান্টাসির জন্ম দেওয়া? :D
লোশক লেখকের লেখা প্রথম উপন্যাসিকা। জঁর বিবেচনায় মিথোলজিক্যাল ফ্যান্টাসি/ হিস্টোরিক্যাল ফ্যান্টাসি/ আরবান ফ্যান্টাসির ধারায় পড়বে। প্রথম দিকে কাহিনী যেরকম জমাট বাঁধবে মনে হচ্ছিল, উপযুক্ত ক্লাইম্যাক্সের অভাবে তেমনটা হয়নি। সেজন্যে খানিকটা হতাশ হয়েছি। ফ্যান্টাসি লিখতে হলে নিজের কল্পজগত তৈরিতে বেশ সময় দিতে হয়। এখানে লেখক সেটা দিয়েছেন। কিন্তু এত সুন্দর একটা ওয়ার্ল্ড বিল্ড করার পরে এক্সিকিউশন নিতান্তই সামান্য। বিশেষ করে খল চরিত্রগুলোর উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। সাহিত্যে একটা কথা আছে 'show, don't tell'. লোশক পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে লেখক কেবল আমাদের বলেই গেলেন, কিছু দেখালেন না। নতুবা কুক্ষিবর নিয়ে দারুণ একটা গল্প হতে পারতো। এখন যা হয়েছে, সেটাকে খারাপ বলা যাবে না কোনভাবেই। কিন্তু কলেবর বৃদ্ধি এবং আরেকটু সময় নিয়ে চরিত্রায়ণ করলে ভালো লাগার পরিমাণ বাড়ত বলেই মনে করি। লেখক নিজের কিছু শব্দ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন, এই বিষয়টা ভাল লেগেছে।
কাহিনি সংক্ষেপঃ কেমন হবে, আপনি যদি জানতে পারেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক মহামতি গৌতম বুদ্ধের জন্মের পর তাঁর গর্ভধারিণী মাতা মায়াদেবী তাঁকে একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করেছিলেন? মায়াদেবী কিছু অতিপ্রাকৃত আলামত পেয়ে ধরেই নিয়েছিলেন, তাঁর পুত্র সিদ্ধার্থ এই জগতের কেউ না। বরং অন্য কোন জগতের ভয়ঙ্কর অশুভ কোন সত্তা। আরেকটু অবাক করা যাক। শান্তির ধর্মের প্রবর্তক এই মহান পুরুষ একজন রক্তলোলুপ পিশাচ ছিলেন আমি যদি এমনটা বলে বসি, নিশ্চয়ই ভাববেন আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। গালি-টালিও দিয়ে ফেলতে পারেন। আমাদের জানাশোনা ইতিহাস আমাদেরকে যে গল্প শোনায়, তার কি ভিন্ন কোন রূপ থাকতে পারেনা? যেখানে লৌকিকতার হাতে হাত রেখে চলেছে অলৌকিকতা?
বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ তাহমিদ খান বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে না থেকে অনেক পুরোনো একটা বাড়ির দোতলায় গিয়ে উঠলো। ওখানে থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে নেয়ার ইচ্ছা তার। কিন্তু বাড়িটার কি কোন 'দোষ' আছে? গভীর রাতে তাহমিদের পাশের ঘর থেকে শোনা যায় এক নারীকণ্ঠের রিনিঝিনি হাসির শব্দ। এই হাসি রহস্যের অনুসন্ধানে গিয়েই আরো এক অদ্ভুত রহস্যের মুখোমুখি হতে হয় তাকে।
চণ্ডাশোক হিসেবে খ্যাত মৌর্য সম্রাট অশোক দাঁড়িয়ে আছেন কলিঙ্গের যুদ্ধ ময়দানে। মরণপণ যুদ্ধ চলছে মগধের সাথে কলিঙ্গের৷ সম্রাটের পাশে আছেন একান্ত সভাসদ রাধাগুপ্ত ও বিশ্বস্ত সেনাপ্রধানরা। যুদ্ধটা কি শুধু মানুষের সাথে মানুষের হয়েছিলো সেদিন? নাকি আঁধারের দুনিয়া কুক্ষিবর থেকে কেউ এই কলিঙ্গের যুদ্ধক্ষেত্রে অবমুক্ত করে দিয়েছিলো অন্ধকারের সত্তাদের? অতিপ্রাকৃত সেই ইতিহাস কে-ই বা সযত্নে আড়াল করেছিলো সমগ্র মানবজাতির কাছ থেকে?
এক রাতে দশ বছর বয়সী এক বালক ভয়ঙ্কর কি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলো? আলতাফ সাহেব ও তাঁর পরিবারের এতো গোপনীয়তাই বা কেন, কে জানে! দেহভৃৎ কি জিনিস? কুক্ষিবরের ভয়ঙ্কর সত্তা অসপ্রে আসলে কি চায়? অনিন্দিতার কাছে গেলেই তাহমিদ অমন বিবশ হয়ে পড়ে কেন? অন্ধকারের জগৎ কুক্ষিবর ও পৃথিবীর মধ্যকার সীমারেখা কি ক্ষয় হতে চলেছে? তার চেয়ে বড় কথা লোশক কি? শেষ প্রশ্ন, বিরক্ত হচ্ছেন? বিরক্ত হওয়ার কিছু নেই৷ এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুক্কায়িত আছে 'লোশক'-এর মধ্যে।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ চমৎকার একটা ফ্যান্টাসি থ্রিলার পড়লাম। 'লোশক' লেখক সালেহ আহমেদ মুবিনের প্রথম মৌলিক কাজ। এর আগে তিনি অনুবাদ করেছেন 'এ গেম অব থ্রোন্স', 'ম্যাগনাস চেইস' সহ আরো কিছু বই৷ ফ্যান্টাসি সাহিত্যের প্রতি সালেহ আহমেদ মুবিনের প্রবল ভালোবাসারই ফলাফল 'লোশক'।
একটা ব্যাপার একটু ক্লিয়ার করে নিই। বইটাতে ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর সাথে ঘটে যাওয়া যে ঘটনাবলীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে, তা নিছকই কল্পনা নির্ভর ফ্যান্টাসি। এগুলো নিয়ে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিতর্কে না জড়িয়ে উপভোগ করাটাই শ্রেয়। তবেই 'লোশক'-এর প্রকৃত রসাস্বাদন সম্ভব। এখানে লেখক ফ্যান্টাসির সাথে সাথে হরর ও মিস্ট্রিরও দারুন এক সমাবেশ ঘটিয়েছেন। কিছু কিছু স্থানের বর্ণনায় গল্পের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী লজিক্যাল ক্যারেক্টার মিসির আলী বিষয়ক উপন্যাসগুলোর মতো রহস্য ও ভয়ের উপাদানও পেয়েছি। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে এটা নিছকই একটা ফ্যান্টাসি নভেলাই ছিলো।
সালেহ আহমেদ মুবিনের প্রথম মৌলিক কাজ হিসেবে 'লোশক'-কে যথেষ্ট পরিণত মনে হয়েছে আমার কাছে৷ এতো সুন্দর একটা প্লট নিয়ে নভেলা না, রীতিমতো বড়সড় নভেল লিখে ফেলা যেতো। লেখনী ও বর্ণনাভঙ্গিতে কোন জড়তার দেখা পাইনি৷ এই নভেলার শেষে এটার সিক্যুয়েল আসার একটা আভাস পাওয়া গেছে। সেটা এলে মন্দ হয়না। সালেহ আহমেদ মুবিনের হাত ধরে বাংলা ফ্যান্টাসি সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হবে, এমনটাই আশা করি।
বাপ্পী খানের করা প্রচ্ছদটা চমৎকার লেগেছে। কংক্রিট সিরিয়াসনেস না নিয়ে শুধুমাত্র পাঠের আনন্দ উপভোগ করার জন্য বইটা পড়লে কেউ ঠকবেননা বলেই আমার বিশ্বাস।
কয়েক ঘণ্টায় পড়ে ফেললাম লোশক। এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠা ছেলে যে কোন এক বাসায় থেকে পড়াশোনা করে, সেখানে রাতে কিছু অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। সে সব অদ্ভুত, গা ছমছমে ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকে হাজার বছরের পুরনো কিছু ইতিহাস। এসব নিয়ে গল্প।
এবার প্রতিক্রিয়া জানাই।
ছিমছাম মেদহীন গল্প। পড়তে বিরক্ত লাগেনি। চুম্বকের মতো সেঁটে ছিলাম বইতে তা নয়, তবে একটানা পড়ে ফেলার মতো লেখা। আমি একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি। যে যেই ধরনের পরিসরে, জীবনে বসবাস করে, সেই পরিসর ও জীবনের আলোকে গল্প লিখলে গল্পটা অসম্ভব সুন্দর, জ্যান্ত হয়ে ওঠে। যেমন বিভূতিভূষণের আরণ্যক কিংবা ছফার গাভী বিত্তান্ত। মুবিন নিজেও ব্যাচেলর থাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র। ঘটনাস্থল��� হয়তো নিজেকে কল্পনা করে গল্প লিখেছে বলেই বোধহয় গল্পের মুখ্য চরিত্রটিকে ভাল লেগেছে, জীবন্ত লেগেছে।
যেভাবে গল্প এগিয়েছে, আমার মধ্যে আগ্রহ জন্মাচ্ছিল, এর পর কি হলো! শেষ হবার আগে আগে বুঝতে পারছিলাম যে এখনি শেষ হবে। মোটের উপর গল্পটা যতটুকু ভাল বলে দাবী করেছে লেখক, ততোটুকুই ভাল। খুব বেশি ভাল এমন নয়। মন্দ তো নয়! এক কথায়- A Good Read! বোঝাই যায় লেখক সূচনা করলেন মাত্র। গভীরে যাবেন আস্তে আস্তে, পরের বইগুলোতে। হালকা মেজাজে পড়ার মতো একটা বই।
যে সব জায়গায় আরও ভাল করার সুযোগ রয়েছে,
১। চরিত্র বিন্যাস। চরিত্রগুলো পাঠকের মাথায় শুধু কথোপকথনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ রূপ নিচ্ছিল না। একদম বোঝা যাচ্ছিল না তা নয়, তবে চরিত্র বিন্যাসে আরেকটু সময় দেওয়া যেতে পারে।
২। দু’টো কাহিনী প্যরালাল ভাবে এগিয়েছে এখানে। একটি বর্তমানের প্রেক্ষাপটে, একটি প্রাচীনকালের মিথোলজিক্যাল ধাঁচের গল্প। আমার মনে হয় মিথোলজিক্যাল ব্যাপারগুলো মাঝামাঝি কোন এক চ্যাপ্টারে শেষ করে দেওয়া যেত। পড়ার সময়ে শুধু বর্তমান সময়ের প্রতিই আগ্রহ বোধ করেছি। তবে আমি মিথোলজিক্যাল ফ্যান্টাসির ভক্ত নই, তাই হয়তো একটু একঘেয়ে লেগেছে মিথোলজিক্যাল অংশটা। তবে লেখকের স্বাধীনতা আছে আগে পরে করে গল্প বলার, এটাও ঠিক।
৩। লোশক-চরিত্রগুলোর পোশাকের বর্ণনাটা দিলে কল্পনা করতে সুবিধে হতো। যেমন (সামান্য স্পয়লার), অনিন্দিতা নামের মেয়েটা কখনো কখনো বাদুর হয়ে যায়, পিঠ দিয়ে ডানা গজায়, কখনো অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে (এটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছেন লেখক, পদার্থ ও আলোর ধর্ম দিয়ে, এখানে সাইফাইপ্রেমিরা একটু ভ্রু কুঁচকাতে পারে), এই সব সময়ে মনে হয় তার শরীরে কোন পোশাক ছিল না। এখানে বিস্তারিত বর্ণনাটা পেলে সুবিধে হতো বুঝতে।
মোটের উপর, বেশ ভাল একটা বই। আমি ৫ এ ৩.৫ দেব রেটিং। খুব সূক্ষ্মভাবে লেখক আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছে তার পরের বইটা পড়ার। এটা তার মুনশিয়ানা। বাংলা ফ্যান্টাসি সাহিত্যে লেখক অনেক ভাল করবেন, এবং তার চেয়েও বেশি করবেন অনেক অনেক এক্সপেরিমেন্ট, সন্দেহ নেই।
কাহিনী সংক্ষেপঃ একজন মানুষকে কি দেখে বোঝা যায় যে সে আসলে কে? মানুষের ওপরটা দেখে কি তার ভেতরের রূপটা জানা যায়? মানবমনের ফাঁকফোকড়ে লুকিয়ে থাকে কতশত ব্যাখ্যাতীত অনুভূতি, ত্রুটিবিচ্যুতি আর জটিলতা। আচ্ছা ইতিহাসও কি মানুষের মতো নয়? নিজের ফাঁকফোকড়ে যে ইতিহাস কতশত ব্যাখ্যাতীত ঘটনা লুকিয়ে রেখেছে তা আমরা একটু নজর দিলেই হয়তো দেখতে পাই। আমরা কি আদৌ জানতে পারি যে আসলে কী ঘটেছিলো? বা আমাদের কি জানানো হয়? বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণ এসে উঠলো এক পুরোনো বাড়িতে। রাত হলেই পাশের জনশূন্য ঘর থেকে ভেসে আসে রহস্যময় হাসির শব্দ। এই কাহিনির সাথে রাজা অশোকেরই বা কী সম্পর্ক? কিংবা আরেকজন বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে কেন দেখা যাচ্ছে মাঝেমধ্যে উঁকি দিয়ে যেতে? আমাদের দৃশ্যমান জগতই কি সব? নাকি অন্তরালে আছে আরো ভিন্ন কোনো ভুবন? ধীরেধীরে যখন উন্মোচিত হয় সব সত্য, তখন জাপ্টে ধরে আরো রহস্য। সবই কি আসলে ভ্রম? এই মানবজীবনের মতো? পাঠক তা আবিষ্কার করবে এই দুই মলাটের পাতায় পাতায়। অলৌকিক আর অন্ধকারাচ্ছন্ন ভুবনে আপনাদের স্বাগতম।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ গল্প শুরু থেকে মাঝারি গতিতে এগিয়ে গিয়েছে। যেহেতু পূর্বকাল আর বর্তমানকাল মিলিয়ে গল্প বলা হয়েছে। এবং সাথে জট পাকানো বেশ কিছু রহস্যের জাল ভেদ করার তাড়াও ছিল ; তাই গল্প বেশ সুখপাঠ্যই লেগেছে। শুধু শেষ দিকে গল্প একটু দ্রুত শেষ হয়ে গিয়েছে বলে মনে হয়েছে। শেষে হয়তো আরেকটু অ্যাকশন দিলে আরও জমে যেতো। আর বইটি তেমন বড় নয়। তবে গল্পে যে পরিমাণ তথ্য, রহস্য ও গতি ছিল ; লেখক ইচ্ছে করলে আরেকটু বড় পরিসরে গল্পটি মলাটবদ্ধ করতে পারতেন।
মুবিন ভাইয়ের লেখালেখির ব্যাপারে মোটামোটি একটা সময় ধরে পরিচিত ছিলাম। তখন থেকেই মুবিন ভাইয়ের ফ্যান্টাসির প্রতি আলদা যে আগ্রহ ; সেটা অজানা ছিল না। তারপর যখন বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় অনুবাদ বই প্রকাশ করা শুরু করলেন,তখন থেকেই তার কাছ থেকে মৌলিক লেখা পাওয়ার আশায় ছিলাম। ইতিমধ্যেই তিনি 'লোশক' এর মাধ্যমে তা দিতে সক্ষম হয়েছেন। আশাকরি সামনেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে। সে পর্যন্ত শুভকামনা
পরিশেষে বলতে চাই যে, একটি রিভিউ দিয়েই শুধুমাত্র বইটিকে বিচার করবেন না। নতুনদের বই পড়ুন, তাদের লেখা ভালো লাগলে তাদেরকে উৎসাহিত করুন। আর ভালো না লাগলে, তাদের ভূলগুলো শুধরিয়ে দেওয়া বা কোন কোন পয়েন্টগুলো আরেকটু ভালো হতে পারতে তা একটু ধরিয়ে দিন। এতে করে লেখক খুবই উপকৃত হবে। সামনে আমাদেরকে আরও ভাল কিছু উপহার দেওয়ার পাড়তটা তখন তার কাছে খুব বেড়ে যাবে।
লেখকের প্রথম বই হিসেবে তিনি অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। লেখার ভঙ্গি বেশ সাবলীল এবং গতিশীল ও। কিন্তু গল্পে প্রায় অনেকটা সময় জুড়েই শুধু ইতিহাসের কথাই হয়েছে যাতে তেমন কোনো থ্রিল বা আহামরি কিছুই ছিলো না; যা একসময় ক্ষাণিক বিরক্তির উদ্রেক ও করেছে। এছাড়া, বেশ কিছু জায়গায় বাক্যের গঠন আরো সুন্দর হতে পারতো বলে মনে হয়। লেখক নিজেও উল্লেখ করেছেন, বইটি তার জন্য শুরু। আমারও মনে হয়েছে সময়ের সাথে সাথে তার আগামী বইগুলোতে লেখার মান আরও বৃদ্ধি পাবে। শুভকামনা।
পড়াশুনার খাতিরে দুঃসম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে ওঠে তাহমিদ। সেখানে তাহমিদের পরিচয় হয় জলিল মিয়া নামক বাড়ির কাজের লোকের সাথে। জলিল মিয়া লোকটা ইন্টারেস্টিং হলেও অদ্ভুত। একটা রহস্য রয়েছে তার মধ্যে। কিছুদিন পর তাহমিদ লক্ষ্য করে বাড়িটাতে কিছু একটা ঠিক নেই। কেমন যেন রহস্যে ঘেরা। হটাৎ তাহমিদ কোনো একটা অস্তিত্ব অনুভব করতে আরম্ভ করে। বাড়িটার রহস্যে কি? কি এমন হয়েছিল বাড়িটাতে? বাড়ির মালিক কি এমন লুকাচ্ছেন? কাজের লোক জলিল মিয়ার রহস্যটায় বা কি?
যৌবনকালে কি এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল গৌতম বুদ্ধের যেকারণে পরবর্তীতে তিনি সন্যাস জীবন বেছে নিয়েছিলেন?
সম্রাট অশোক কলিঙ্গের যুদ্ধে কি এমন দেখে শান্তির বার্তাবাহক বনে গেলেন? এসব রহস্যের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সালেহ আহমেদ মুবিনের ফ্যান্টাসি নভেলা লোশক এ।
সালেহ আহমেদ মুবিনের প্রথম মৌলিক লোশক। এর আগে বেশ কিছু মৌলিক ছোটগল্প লিখেছিলেন উনি। ফ্যান্টাসি হিসেবে প্রথম বইয়ে বেশ ভালো কাজ দেখিয়েছেন তিনি। সুন্দরভাবে মিশ্রণ ঘটিয়েছেন ইতিহাস, মিথ ও ফ্যান্টাসির। ফ্যান্টাসি হলেও বেশ বুদ্ধিমত্তা ও যুক্তির সাথে রহস্যের সমাধান দেখানো হয়েছে। এছাড়াও ছিল একটা আলাদা ওয়ার্ল্ড বিল্ডআপের চেষ্টা। হরর এলিমেন্টস তুলনামূলক কম থাকলে নিজস্ব কিছু ক্রিয়েচার ও আবহ সৃষ্টি করে ভয় সৃষ্টি করা গেছে বলে আমি মনে করি। লেখনি বেশ সরল ছিলো লেখকের। মিথগুলো ভালোই। আগ্রহ জাগানিয়া। জটিলতার দিকে যাননি। তবে লেখক চাইলে বড় করতে পারতেন। অনেক স্পেস ছিল বা গল্প বলার ছিল বলে মনে হয়েছে। সেরকম কোনো টুইস্ট নেই তবে নিঃসন্দেহে গতিশীল। ফ্যান্টাসি প্রেমীদের জন্য দারুণ একটা হবে এক্সপেরিয়েন্স লোশক। এখানে পরিচিত একটা চরিত্রকে অন্য রূপে আবিষ্কার করবেন পাঠকেরা। চমকে যেতে পারেন কিন্তু।
গভীর রাতে পাশের বাড়ি কিংবা পাশের কোন রুম থেকে রিনিঝিনি শব্দে হাসির আওয়াজ বা নুপূরের শব্দ ভেসে আসছে এই ব্যাপারটা পড়লেই আমার মাথায় ❝ভুল ভুলাইয়া❞ ছবির গানের লাইন বাজতে থাকে, ❝আমি যে তোমার... ছিনছিনছিন (নুপূরের শব্দ) তুমি যে আমার...ছিনছিনছিন (নুপূরের শব্দ)❞
লেখাপড়ার খাতিরে ভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তাহমিদ খান উঠেছে তার দুঃসম্পর্কের এক চাচার বাসায়। উঠেই বুঝতে পারলো এ বাড়ির লোকেরা কেমন জানি। আহমেদ চাচা থাকেন তার স্ত্রী কন্যা নিয়ে। কিন্তু তাদের মুখোমুখি এখনও হয়ে ওঠা হয়নি। এদিকে আবার বাড়ির দেখভালের দায়িত্বে থাকা জলিল মিয়া শুনিয়েছে এ বাড়িতে রাতের বেলা নাকি কী কী দেখা যায়। তাহমিদ যদিও এসব গালগল্পে একেবারেই বিশ্বাস করে না। তবে রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে সে শুনতে পেলো রিনিঝিনি সুরেলা এক আওয়াজ। শব্দের উৎস যেখানে সেখানে আসলে কেউ থাকে না তালাবদ্ধ অবস্থায় আছে দীর্ঘদিন। তবে কি আসলেই কাউকে দেখতে পেয়েছিল এ বাড়ির লোকেরা? নাকি জলিল মিয়ার এইসব গল্প তাহমিদের মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলছে?
৫৬৩ খ্রিস্টপূর্বে কপিলাবস্তুর শাক্যবংশে জন্ম নেন এক রাজপুত্র। জন্মের পরেই নিজ মাতা তাকে হত্যা করতে চান। পরপর কয়েকবার চেষ্টা করেন নিজেরই ঔরসজাত সন্তানকে হত্যা করতে। তার ভাষ্যমতে সে কোন অশুভ সত্তার জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু জ্যোতিষি বলছেন তাদের এই পুত্র একদিন পরম বিখ্যাত হবে। তবে মাঝে কিছু ফাঁড়া আছে। শাক্যবংশের রাজা তবে কী করবেন? স্ত্রীর এমন আচরণের হেতু তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। পুত্রের সুরক্ষা করতে রাণীর এহেন আচরণ তিনি কীভাবে প্রতিরোধ করবেন? কালের পরিক্রমায় শাক্যবংশের সেই রাজপুত্র হয়ে উঠলেন সিদ্ধার্থ গৌতম বা গৌতম বুদ্ধ নামে। জীবনের এক পর্যায়ে বেছে নিলেন সন্ন্যাস জীবন। কিন্তু কেন?
২৬৯ খ্রিস্টপূর্বে ❝চন্ডাল❞ কিংবা ❝চন্ডাশোক❞ খ্যাত মৌর্য রাজা অশোক মেতে ওঠেন এক রক্তের খেলায়। কলিঙ্গ জয় করতে তিনি মেতেছেন এক অসুস্থ খেলায়। রাধাগুপ্তের জাদুবিদ্যার সহায়তায় নিমিষেই বিশাল বাহিনী লন্ডভন্ড হয়ে যায়। জিতে যান অশোক। লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয় অশোকের মনে সুখের অনুভূতি না এনে তাকে বিশাদে ভরপুর করে দেয়। নিষ্ঠুর হ*ত্যাযজ্ঞ দেখে তিনি শিউরে উঠেন। অনুতপ্ত হোন নিজের কৃতকর্মের জন্য। মুহুর্তেই ❝চন্ডাশোক❞ থেকে পরিণত হোন ❝ধর্মশোক❞ এ। স্ত্রীর কথায় বুদ্ধের আরাধনা শুরু করেন। গড়ে তোলেন অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার। আলোর পথে শুরু করেন নতুন যাত্রা। তবে আদতেই কি তা আলোর পথের যাত্রা ছিল? না কি ছিল অজান্তেই কোন অন্ধকারের সূচনা?
তাহমিদ দেখা পায় এক অনিন্দ্য সুন্দরীর। নাম অনিন্দিতা। ঘটনাক্রমে জানতে পারে সে আসলে এই জগতের বাসিন্দা নয়। আটকা পরে আছে। মুক্তির অপেক্ষায় আছে। তার দ্বারা রচিত হবে এক সাম্য। কুক্ষীবরের রাজকন্যা সে। কুক্ষীবরের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে অতি প্রাচীনকালের মানুষের ইতিহাসও। এর সাথে জড়িয়ে আছে বৌদ্ধ ধর্মের ত্রাণকর্তা গৌতম বুদ্ধ। এমনকি জড়িয়ে আছেন রাজা অশোকও। অতি প্রাচীনকালের এসব মানুষের সাথে বর্তমানে তাহমিদ, অনিন্দিতা আর এ বাড়ির যোগসূত্রটাই বা কী? জলিল মিয়া ছোটোকালে কবর খুঁড়তে গিয়ে কী এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিল যা তাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায়? অনিন্দিতার সেই সর্বোবনতি এর ব্যাপারটাই বা কী?
লোশক কী বা কারা? এর ইতিহাসের সাথে সম্রাট শাহজাহানের কন্যা জাহানারা, গৌতম বুদ্ধ কিংবা অনিন্দিতার যোগ কোথায়?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
তিনটা ভিন্ন সময়ের ঘটনায় রচিত বই ❝লোশক❞। সম্রাট অশোকের যুদ্ধ, গৌতম বুদ্ধের সময়কাল আর বর্তমানের তাহমিদের সময়। বলি বাহুল্য অসাধারণ প্লটের এক উপন্যাস লোশক। তিনটা সময়ের বর্ণনা ধারাবাহিকভাবে দিয়ে গেছেন লেখক। অতীতের ঘটনার রেশ ধরে নিয়ে গেছে সুদূর অতীতে, আবার সেই অতীত থেকেই নিয়ে এসেছেন বর্তমানে। তাহমিদের অনন্দিতাকে দেখা সেটা কি ঘোর না আসলেই সত্য, আবার আহমেদ চাচার বাড়ির চুপচাপ পরিবেশের কৌতূহল, জলিল চাচার নির্মল ব্যবহার খুব দারুণভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক। সম্রাট অশোকের সেই যুদ্ধের কথা কে না জানে? সে যুদ্ধের সূচনা এবং ইতি টেনেছেন লেখক সম্পূর্ণ নিজের মতো করে। এখানে যদি সত্য খুঁজতে যাই তবে ভিন্নমতের সৃষ্টি হবে। ফ্যান্টাসি জনরা এবং ফিকশন হিসেবে পড়লে উপভোগ্য লাগবে। গল্পের প্রয়োজনে এখানে লেখক অনেক ঐতিহাসিক চরিত্রের আগমন ঘটিয়েছেন বটে। তবে তাদের বিচরণ করিয়েছেন সম্পূর্ণ নিজের খেয়াল মতো। গৌতম বুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে লেখাটা ফ্যান্টাসি কিংবা ফিকশন হিসেবে পড়াই শ্রেয় বলে মনে করি। এর সাথে বাস্তবতার মিল আনতে গেলেই গোল বাঁধবে এবং তা বেঁধেছিলও। অনিন্দিতার ইতিহাস এবং লোশকের ইতিহাস আমার কাছে অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে। যদিও বইটা সিরিজ হবার কথা ছিল তাতে পূর্ণতা পেতে পারতো। বইয়ের শেষের দিকে নায়কের বেশ কিছু হিউমার এর দৃশ্য বেশ মজা লাগছিল। এখন কিছু অসংগতির কথায় আসি, বইয়ের পূর্বকথা অংশটুক বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে যথেষ্ঠ। এরপর গল্পের ধারা যেভাবে এগিয়েছে তাতে বইটাকে ভালো লাগতেই শুরু করছিল। কিন্তু মাঝে থেকে শেষে এসে আমার মনে হয়েছে লেখক তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। যৌক্তিক বর্ণনার থেকে পদার্থবিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বর্ণনায় পৃষ্ঠা ভরিয়ে ফেলেছেন। যেটার খুব বেশি প্রয়োজন ছিল আমার মনে হয়নি। ভরশূন্য এর শুধু কনসেপ্ট পর্যন্ত থাকলেই ভালো হতো। সেখানে জলিল মিয়াকে বিজ্ঞানের জটিল এ জাতীয় বর্ণনা দিয়ে পৃষ্ঠা ভর্তির কোন মানে ছিল না। এরপর, লেখক বইতে অন্য কিছু বইয়ের চরিত্রের নামের কথা এনেছেন। যেমন : বাপ্পী খানের অন্ধকার ট্রিলজির কথা, মুমিন নামে একজন চরিত্রের কথা (অক্টারিন বই পড়া না থাকলে এই রেফারেন্স কেউ ধরতে পারবেনা, ফলে তার কাছে এই ব্যাপার বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে। আমিও প্রথমে এই নাম বুঝতে পারিনি), সাম্ভালার মিচনারের কথা বলেছেন। এই বইগুলো কারো পড়া না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বুঝতে পারার কথা না। পড়ার সময় এই ব্যাপারটা আমার ভালো লাগেনি। শেষের দিকে লেখক অনেক বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেলেছেন। বিজ্ঞানের অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা, অন্য বইয়ের রেফারেন্স না টেনে চরিত্রায়নে একটু বেশি পৃষ্ঠা ব্যয় করলে বইটা বেশী উপভোগ্য হতো। রাধাগুপ্ত এবং তার সঙ্গী দুইজনের ভিলেন রোলে আরও বেশী কিছু আশা করেছিলাম। তাদের চরিত্র ঠিক ভিলেন হিসেবে খাপ খায়নি। লেখক থেকে ভবিষ্যতে আরও ভালো বই পাবো আশা করি।
বই নিয়ে বাড়তি কিছু কথা: ২০২০ সালের মেলায় বইটি প্রথম প্রকাশ পায় এবং এর প্রায় কয়েকমাস পরে বইটি নিয়ে প্রায় তুলকালাম হয়ে যায়। বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান গৌতম বুদ্ধকে নিয়ে বইতে যেভাবে লেখা হয়েছে সেটা নিয়েই বিরোধ। হয়তো এই ঘটনা সবারই জানা তাই আমি আর পুনরাবৃত্তি করলাম না। ধর্মীয় বিষয়গুলো যদিও বেশ স্পর্শকাতর। সে হিসেবে এই বইকে ফ্যান্টাসি হরর থ্রিলার হিসেবে পড়লে আর সত্য হিসেবে না নিলেই ঝামেলা কম লাগবে মনে করি। তবে লেখকের লিখনশৈলী ভালো এবং বইটা ১২৭ পৃষ্ঠার অনেক ইতিহাসের মিশ্রণে ছোট্ট বই না হয়ে আরেকটু বেটার হতে পারতো। লোশক ইউনিভার্সের এই বইয়ের শেষে যে ❝সর্বনাশ❞ এর কথা বলা হয়েছে তার কিছুটা ধারনা পেতে ফেসবুকেই প্রকাশিত ❝কুক্ষীবর কিংবা এক বিভ্রম❞ পড়ে নিয়েছি। এর সূচনা লোশকের চার বছর পর। আমার কাছে লোশক থেকে এই লেখাটা অপেক্ষাকৃত বেশি ভালো লেগেছে। এবার আসি আরেকটু বাড়তি কথায়, বইটা সম্পর্কে জেনেছিলাম গতবছরের একদম শুরুর দিক। তখনও বইটা পড়া বা সংগ্রহে রাখার জন্য খুব আগ্রহ পাইনি। জানতাম বইটা আর মার্কেটে আসবে না। হঠাৎ করেই মনে হলো বইটা আমার চাই। ভালো হোক কিংবা খারাপ এই বইটা আমার লাগবেই (যেগুলা পাওয়া যাবে না, একেবারেই নাই সেসবের প্রতি আমার অসীম আগ্রহ। সেটা ভালো-ম*ন্দ যাই হোক)। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও বইয়ের নাগাল পাচ্ছিলাম না। তখন বিভিন্ন গ্রুপে বইয়ের নাম লিখে অনুসন্ধান চালানো শুরু করলাম। বইয়ের রিভিউ, কমেন্ট ঘেটে ঘেটে প্রায় ২৫-২৭ জনকে বেছে ভেতরবাক্সে টোকা দিলাম (লেখক সহ)। প্রায় বেশিরভাগের থেকেই রিপ্লাই পেলাম বই ���িল এখন নেই, থাকলেও বিক্রি করতে ইচ্ছুক নয় এই জাতীয়। প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছি তখন একজন রিপ্লাই দিল বই আছে সে জোগাড় করে দিতে পারবে। সময় লাগবে। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। এর মাঝেই দুই-তিনদিনের ব্যবধানে আমাকে আরও দুইজন জানালেন বই আছে এবং তারা বিক্রি করবেন না। এমনি উপহার হিসেবে নিতে চাইলে নিতে পারি। এতদিন কোথাও পাইনা এখন প্রায় তিনকপি এসে হাজির। এই বইয়ের খোঁজে আমার পরিচিত দুইজন ছিল। তাই সেই তিন কপিই নিয়ে নিই এবং একটা নিজের জন্য রেখে বাকি দুইটা তাদের জন্য সংগ্রহ করি।
বইয়ের একটা উক্তি আমার খুব ভালো লেগেছে। সেটা দিয়ে দিচ্ছি, ❝পৃথিবীতে কেউ কেউ সম্ভবত সারাজীবন অশান্তিতে থাকবার জন্যই জন্ম নেয়। এটাও হয়তো একটা সাম্য। কে জানে তার জন্য হয়তো পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে কেউ একজন সুখী হয়েই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে।❞
প্লটটা ভালো ছিলো। এই প্লটে সুবিস্তারে লেখা যেতো। বাট সরি টু সে, বইটা খুব একটা ভালো হয়নি। বাতিঘরের বই বলেই একটু বেশি হতাশ হয়েছি। প্রচ্ছদ আর কাহিনী সংক্ষেপ আগ্রহী করেছিলো। কিন্তু পুরো বইতে বর্ণনা আর ডায়লগগুলো খুব আনাড়ি হাতে লেখা। ক্লাইমেক্স একদমই জমেনি। হয়তো আরও সময় নিয়ে এডিট করলে পড়তে ভালো লাগতো। লেখককে আরও পরিশ্রম করতে হবে লেখায় সাবলীল ভাবটা আনার জন্য।
অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় না গিয়ে সরাসরি নিজের কথাগুলো দ্রুত বলে শেষ করতে চাই। পুরো সময়টা উপভোগ করেছি। বইয়ের সাথে সময় বেশ ভালো কাটল। আজকাল ফিকশন খুব কম পড়া হয়, এটা পড়তে গিয়ে যেন ছোটবেলায় ফিরে গেলাম। ইতিহাস, উপকথা, কল্পনার মিশেলটা বেশ উপাদেয়। হাইস্কুলে থাকার সময় এই টাইপ বই খুব পছন্দ করতাম আমি। বইটা যদি আমি আমার টিনএজে পড়তাম তাহলে আনন্দটা এখনকার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হত। প্রশংসা করে অনেক কথা বলতে পারব, কিন্তু আপতত সেসব বাদ থাক। কিছু বিরক্তির কথা বলি। অনেকেই বইটা নিয়ে হাস্যকর মন্তব্য করেছেন। মন্তব্য তারা করতেই পারেন। কিন্তু একটা কথা আমার বারবারই মনে হয়, নিজেদের ছোট করে দেখার জাতিগত একটা দোষ আমাদের আছে। এই বইটা যদি বাংলাদেশের তরুন একজন লেখক না লিখে ইংরেজিতে লেখা হত, তাহলে আমরা অনেকেই সেটা পড়ে অভিভূত হয়ে রীতিমত অজ্ঞান হয়ে যেতাম। একই ধরনের ক্লাইম্যাক্স (কখনও কখনও এর চেয়েও খারাপ) দিয়ে রিক রাইওর্ডান কোটি পাঠকের মন জয় করেছেন অথচ ঘরের লেখক তাই আমাদের আহামরি কিছু মনে হচ্ছে না। লসট্রিস আর টাইটার প্রেম আমাদের আপ্লুত করে, অথচ তাহমিদ আর অনিন্দিতা প্রেমে পড়লে খুব সস্তা ঠেকে। এই প্রেমটা দরকার ছিল। যাদের এই লুতুপুতু প্রেমটা পছন্দ হয়নি, তারা সম্ভবত বইয়ের শেষপৃষ্ঠাটা ভালোভাবে পড়েননি। এই পাতাতে যে অস্থির একটা ইঙ্গিত আছে, সেই ইঙ্গিতটা এত আবেদনময় হতে পারত না, যদি না প্রেমটা এরকম লুতুপুতু হত। ইতিহাসের পাতা থেকে কোনো চরিত্র উঠে এসে কোলকাতার রাস্তায় উঠে এলে হয়ে যায় মাস্টারপিস। আর ঢাকার শাহবাগে আসলে ভ্রু কুঁচকে যায়। নিজেদের মূল্যায়ন না করার এই প্রবণতা থেকে আমরা করে বেরিয়ে আসতে পারব জানিনা। বইটার জন্য আমার রেটিং ৪/৫। এক কম দিলাম। বইয়ের আয়তন আরো তিনগুণ হলে প্লটের প্রতি সুবিচার করা হত। আর ডায়লগ কোথাও কোথাও পোশাকী লাগছিল। (অনেকের পোশাকী ভাল্লাগে, আমার লাগে না।) এই দুই কারণে এক কম। চরিত্রগুলো একটু খাপছাড়া হয়েছে। এইজন্য আরো হাফ কাটা।
প্রথমেই বলে রাখি, কারো সৃষ্টিকে রেটিং করার দুঃসাহস আমার নেই। যতদূর জানি, একজন লেখক তার সৃষ্টিকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসে। এখানে যা লিখেছি তা শুধুই আমার নিজেস্ব অনুভূতির প্রকাশ মাত্র।
লেখকের প্রথম মৌলিক সৃষ্টি লোশক। এর আগে তার অনুবাদ এবং ছোট গল্প পড়া হয়েছে। প্রাণবন্ত অনুবাদ দিয়ে অনেক আগেই পাঠকগণের মন জয় করে নিয়েছেন। তাঁর প্রথম মৌলিক হিসেবে লোশক অবশ্যই ভালো ছিল। পড়া শুরু করার পর শেষ না করে উঠতে ইচ্ছা করছিল না। প্রথম দিকে গল্পের গতি স্বাভাবিক মনে হলেও। হঠাৎ একটা পযার্য়ে গিয়ে একটু দ্রুত এগিয়েছে। তাই আমার মত নতুন পাঠকের কিছু ব্যপার বুঝতে একটু সময় লেগেছে। প্রায় পুরো বইতে লেখক একসাথে তিনটি সময়ের বর্ণনা দিয়ে গেছেন। এবং পূর্বের প্রতিটি ঘটনাকে লেখক বর্তমানে নিয়ে এসে একত্রিত করেছেন। এখানেই লেখক তার প্রতিভা ফুটিয়ে তুলেছেন। বুঝাই যায় লেখক প্রচুর পড়াশোনা করেছেন বইটি লেখার জন্য।
প্রতিটি লাইন পড়ার পর, পরের লাইনে কি আছে, তা জানার আগ্রহ সৃষ্টি করতে পেরেছে বইটি। লেখনি ভাল। আরো ভালো করার সুযোগ আছে। সুতরাং আশা করাই যায় পরবর্তি সৃষ্টি অসাধারণ হবে।
আমি কয়েকটি কপি গিফ্ট করেছি। সবার ফিডব্যাক ভালো ছিল। তবে কয়েক জনের অভিযোগ ছিল খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেল। আবার কেউ কেউ বলছেন দ্রুত শেষ হয়েই ভালো হয়েছে।
শুভকামনা এবং দোয়া রইলো লেখকের জন্য। সৃষ্টি করুন এমন আরো ভলো কিছু। ধন্যবাদ।
“এই তো চাবির বাকি অংশ এসে গেছে…” চাবির রহস্য বোঝার জন্য যেমন লোশক পড়তে হবে, তেমনি লোশক শব্দের মানে বোঝার জন্যেও লোশক পড়তে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তাহমিদ এসে উঠলো পুরাতন একটি দুইতালা বাড়িতে। রাতের বেলা ঐ বাড়িতে শোনা যায় রিনিঝিনি সুরেলা হাসির শব্দ। রহস্যময় বাড়ির সাথে সাথে রয়েছে জলিল মিয়া, আফতাব হোসেনের মত রহস্যময় চরিত্রগুলো। আলতাফ হোসেনের পরিবারের মধ্যেও তাহমিদ খোঁজ পেয়েছে রহস্যের। এই সব রহস্যের সমাধান করার পূর্বেই তাহমিদের সামনে হাজির শত বছর আগের এক ঘটনা, যা তাকে করে হতবাক। এও কি সম্ভব এই যুগে? শত বছর আগের চরিত্রের কি করে বর্তমান সময়ে আবির্ভাব!!!!! এখানেই লোশকের সার্থকতা। বর্তমান সময়ের সাথে গৌতববুদ্ধ এবং সম্রাট অশোকের সময়কালের কিছু ঘটনার দারুন সেতু বন্ধন ঘটেছে কাহিনিতে। লোশক কি তা বইয়ের নাম দেখেই জানতে ইচ্ছা হইছিলো, অনেক বার ভাবছিলাম যারা বইটা পড়ে ফেলছে তাদের জিজ্ঞাসা করবো। ভাগ্য ভালো জিজ্ঞাসা করিনি , আসল মজাই তাইলে নষ্ট হয়ে যেতো। এই বইয়ের কাহিনি যতই এগিয়ে গেছে ততই কাহিনির মাঝে ডুবে যেতে বাধ্য হয়েছি। সম্ভালা ছাড়া বাংলায় মৌলিক ফ্যান্টসি ঘোরানার আর কোনো বই পড়া হয়নি আমার। এক কথায় দারুন লাগছে এই বই। অনেক আগে কিনছিলাম বইটি, কিন্তু পরে পড়বো বলে রেখে দিছিলাম। অবশেষ পড়লাম এবং ভালো লাগলো। আমার মত ফ্যান্টসি পড়তে যারা অভ্যস্ত না তারা একবার পড়ে দেখেন, আশা করি ভালো লাগবে।
যতটা আশা নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম, ততটা পূর্ণ হয় নি। অশোক ও বুদ্ধকে নিয়ে এক আরবান ফ্যান্টাসি তৈরি করার প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়, কিন্তু আরো দক্ষতা প্রয়োজনীয় ছিল। শেষের দিকে আর অশোক/বুদ্ধের কোনো ন্যারেশন চ্যাপ্টার ছিল না। এটা ফ্লোতে একটা বাধা দিয়ে গেছে। দুই কালের চ্যাপ্টার একদম সমান্তরালেই দেয়া উচিত ছিল শেষ অব্দি। উত্তম পুরুষের বর্ণনায় হুমায়ুনীয় ছাপ স্পষ্ট। যদিও এতে খুব বেশি দোষ কিছু দেখছি না। তাহমিদের বয়ানে বেশ কিছু চরিত্রের কথা এসেছে যারা অন্য বইয়ের। ব্যাপারটা মজা লেগেছে, কিন্তু এত বেশি মেনশন না দিলেও হত। অনিন্দিতার জবানে দুই জগতের ইতিহাসের বর্ণনা বেশি হড়বড়ে লেগেছে। তথ্য একবারে ডাম্প করা হয়েছে। এটা আরো ছড়ানো দরকার ছিল। শেষের দিকের লড়াইটাও জমজমাট হয় নি। সর্বোনবতির পূর্ণ পটেনশিয়াল বুঝতেই পারলাম না। ১২৭ পৃষ্ঠা যেহেতু, সম্ভব ছিলো আরো গুছিয়ে আনার। তা হয়নি। তবে দুঃখজনক যে পরের পর্বগুলো আর পাওয়া হবে না। শোণিত উপাখ্যানের মত আরেকটা আরবান ফ্যান্টাসি পাওয়ার সুযোগ ছুটে গেল হাত থেকে। PR:2.5/5
ল্যাংডন স্টাইলে একবার মিথোলজিক্যাল ঘটনা আরেকবার বর্তমানের ঘটনা , অল্টারনেট করে লেখা। কিন্তু গৌতম বুদ্ধ ভ্যাম্পায়ার এটা দেখার পর আর পড়তে ইচ্ছা করেনাই।
"লোশক" এখন প্রিন্টআউট।কিছু কারণে বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল।
ফ্যান্টাসি হিসেবেও যে খুব ভালো লাগলো এমন না বরং আমার অনেক বেশিই ভালো লাগেনি।তবে সালেহ মুবিনের পরবাসীয় পাঁচালিতে "মায়াশূণ্যযান" পড়েছিলাম অনেক আগে।তার ফ্যান্টাসি লেখার হাত বেশ দারুন!