সুভাষ মুখোপাধ্যায় (Subhash Mukhopadhyay) (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯ – ৮ জুলাই ২০০৩) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও গদ্যকার। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে, যা ছিলো তৎকালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্সী প্রদেশের অন্তর্গত। সারা জীবন কাটিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গেই।
মূলত কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও রিপোর্টাজ, ভ্রমণসাহিত্য, অর্থনীতিমূলক রচনা, বিদেশি গ্রন্থের অনুবাদ, কবিতা সম্পর্কিত আলোচনা, উপন্যাস, জীবনী, শিশু ও কিশোর সাহিত্য - সব ক্ষেত্রেই ছিলো তার বিচরণ। জীবনের এক পর্যায়ে বামধারার রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকলেও পরে অনেকটাই সরে আসেন সেখান থেকে।
কাব্যগ্রন্থের মাঝে রয়েছে - পদাতিক (১৯৪০), অগ্নিকোণ (১৯৪৮), চিরকুট (১৯৫০), ফুল ফুটুক (১৯৫৭), যত দূরেই যাই (১৯৬২), কাল মধুমাস (১৯৬৬), এই ভাই (১৯৭১), ছেলে গেছে বনে (১৯৭২), একটু পা চালিয়ে ভাই (১৯৭৯), জল সইতে (১৯৮১), চইচই চইচই (১৯৮৩), বাঘ ডেকেছিল (১৯৮৫), যা রে কাগজের নৌকা (১৯৮৯), ধর্মের কল (১৯৯১) ইত্যাদি। অনুবাদ করেছেন নাজিম হিকমত, পাবলো নেরুদা, হাফিজ, নিকোলা ভাপৎসারভের কবিতা, আনা ফ্রাঙ্ক ও চে গুয়েভারার ডায়রী।
সুভাষের "মে দিনের কবিতা" আমার অসম্ভব প্রিয় কবিতা।ঝাঁঝালো, তীব্র, ক্ষুরধার এ কবিতাটি চিরনবীন। কিন্তু যে কাব্যগ্রন্থে এটি সংকলিত হয়েছে সেই "পদাতিক" কি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলো? তিন চারটা কবিতা বাদে পুরো বইটিই আমার জন্য হতাশাজনক। এইগুলো কবিতা?
"হৃদয় সম্পর্কে হবু দম্পতির হিং-টিং-ছট; ফাল্গুনী শনাক্ত করে শিরোধার্য বৈমানিক পাড়া; বাহান্ন হাতির শুঁড়ে হাঁচিগ্রস্ত অহিংস শকট।
বাপুজি, দক্ষিণ করে আনো যুক্তরাষ্ট্রের মিঠাই সাঙ্গ, প্রভু, সত্যাগ্রহ? একচ্ছত্রে বেজেছে বারোটা ? শেষে কি নৈমিষারণ্যে পাবে আত্মগোপনের ঠাঁই ?" (নারদ বিষয়ে)
শব্দের ঘর্ষণে জিভ ছিলে যাওয়ার অবস্থা, বিষম ভারী সব শব্দের ওজনে পাঠকের তলিয়ে যাওয়ার দশা, শব্দের বিষম যুদ্ধে দাঁতে দাঁতে বাড়ি লেগে একাকার অবস্থা। এর মধ্যে প্রতিবাদ কই? সমাজচেতনা কই? সবচেয়ে বড় কথা- কবিত্ব কই?
"সুভাষ মুখোপাধ্যায় দুটি কারণে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, তিনি বোধহয় প্রথম বাঙালি কবি যিনি প্রেমের কবিতা লিখে কাব্যজীবন আরম্ভ করলেন না! এমনকি, প্রকৃতিবিষয়ক কবিতাও তিনি লিখলেন না। কোনো অস্পষ্ট, মধুর সৌরভ তাঁর রচনায় নেই, যা সমর সেনের প্রথম কবিতাগুলিতে লক্ষণীয় ছিলো। দ্বিতীয়ত, কলাকৌশলে তাঁর দখল এতই অসামান্য যে কাব্য রচনায় তাঁর চেয়ে ঢের বেশি অভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরও এই ক্ষুদ্র বইখানায় শিক্ষণীয় বস্তু আছে বলে মনে করি।" (বুদ্ধদেব বসু। পৌষ সংখ্যা, ১৩৪৭। "কবিতা" পত্রিকায় প্রকাশিত)
"আমাদের দেশে যাঁরা সাম্যবাদী কবিতা লিখতে শুরু করেছেন তাঁদের মধ্যে এক দল হচ্ছেন যাঁরা ভাব কিংবা ভঙ্গি কোনো দিক থেকে কবি নন। এঁরা যে-কর্তব্যবোধের প্রবর্তনায় গোলদীঘি থেকে সুদূর পল্লীগ্রাম পর্যন্ত সভাসমিতি করে বেড়ান, দৈনিক সাপ্তাহিক কাগজে প্রবন্ধ লেখেন, জেল খাটেন, সেই প্রবর্তনার বশেই কবিতা লিখছেন। এতে তাঁদের প্রপাগ্যান্ডার কাজ কতখানি হাসিল হয় বলা শক্ত, তবে বিশুদ্ধ সাহিত্যানুরাগী ব্যক্তি তাঁদের সাহিত্য-প্রচেষ্টাকে সন্দেহের চোখে না-দেখে পারেনা।" (আবু সয়ীদ আইয়ুব। "আধুনিক বাংলা কবিতা" বইয়ের ভূমিকায় লিখিত বক্তব্য)
তুমি আসলে বুক ভরা দিঘি হত সৌন্দর্যের। কেমন খাপছাড়া লাগে তোমাকে ছাড়া! সবকিছুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, অভিযোগ মাথা চারা দিয়ে উঠে। নিজের বুকে এক গাঁধা তোমাকে রেখে নিজেকে ভাবতে গিয়ে শূন্যতা খুঁজে পাই। তুমি জানো, শরতের বিকেল আমার মাঠে ছোট ফুল ফুটে তোমার সৌন্দর্যের। তেমনি তো কবি লিখে গেছেন সৌন্দর্যের আত্মকথা বিদ্রোহ নিয়ে। হয়ত তোমাকে লিখেছেন, কবি পদাতিক বানিয়ে।
বিদ্রোহ প্রেমিকার রাগ করা অভিমানের মত। হঠাৎ মানুষের মনে উৎপন্ন হয়ে সকল কিছু ধ্বংস করে মুহুর্তের মাঝে। লুকিয়ে রাখা বিষাদ যখন মাথা চারা দেয় বীজ হয়ে উঠবে তখন বিপ্লব যে অবিসম্ভ্যব। কবি "পদাতিক" বইয়ে তুমি মুক্তি, বিপ্লবের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। প্রেমিকার দিকে তাকিয়ে থাকার মাঝে যে শান্তি, তেমনি শান্তি মুক্তির বলে তিনি আখ্যায়িত করেছেন।
কবি বুর্জোয়া সমাজের উপর কঠোর আঘাত করেছেন ফুল দিয়ে। তার চিত্তে প্রকাশ পেয়েছে অকতোভয় হিংসা। তিনি বলেন, ফুল দিয়ে বিলাসিতা করার সময় এখন নয়। যদি কেউ তা করে তা বাস্তবতাকে মোকাবেলা না করে পলায়নতার লক্ষণ। তিনি তাই লিখেছেন,
" প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য কাঠফাঁটা রোদ সেঁকে চামড়া!
শ্রেষ্ঠ কবিতা পড়ার পর এই কবির আরো পড়তে ইচ্ছে করল ১৯৪০ সালে লেখা কবিতার বই। কি দারুন। সমসাময়িক। মে দিনের কবিতা দিয়ে শুরু। প্রতিটি কবিতা প্রতিবাদে ভরপুর। যে কবিতাগুলো ভাল লেগেছে আর্ষ, চীন ১৯৩৮ এবং অবশ্যই পদাতিক।