মানবসভ্যতায় গুল-গল্পের তথা গুল্পের ঐতিহ্য একেবারে স্বর্ণিম। সেই আদিম যুগ থেকে একেবারে হালের কথা ভাবুন। দুনিয়াদারি করে বেড়ানো কোনো মানুষ ঘরে ফিরে তার 'অভিজ্ঞতার' ঝুলি খুলছে, আর নিজের গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে অন্য কোথাও না যাওয়া মানুষেরা চোখ গোলগোল করে সেগুলো গিলছে। এটাই তো হয়, তাই না? সেইসব অভিজ্ঞতায় রাক্ষস, ভিনগ্রহী, পরি, ড্রাগন - সব মিশে যেতেই পারে। কোনো বেরসিক সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে রসভঙ্গ ঘটালে বাকিরা তাকে চুপ করিয়ে দেবে - এও স্বাভাবিক। এখনও রাজনীতিবিদেরা এইরকম নানা গপ্পোই আমাদের শোনান। তবে এই ধারায় একেবারে কোহিনূর হল ব্যারন মিউনখহাউজেন (যাঁকে আমরা মাঞ্চুসেন-ও বলে থাকি)-কে কেন্দ্রে রেখে সাজানো গুল্পগুলো। ত্রৈলোক্যনাথ থেকে স্টিভেন স্পিলবার্গ - প্রত্যেকে এই মানুষটির নানা আইডিয়া থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আর্থার সি ক্লার্ক থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্র - সবাই এই ধারায় নিজের মতো করে লিখেছেন। প্রায় দুশো চল্লিশ বছর আগের সেই আদি লেখাগুলো কিন্তু মূল জার্মান বা অনূদিত ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়নি এতদিন অবধি। এবার হল। এই মুহূর্তে বইয়ের বাজারে শিওর-শট সাফল্যের উপকরণ হল থ্রিলার, তন্ত্র, অন্য হরর, রহস্য-রোমাঞ্চ ইত্যাদি। সেগুলোর ত্রিসীমানায় না গিয়ে ব্যারনের 'অভিযানের' অনুবাদ করা কেন? জানি না, তবে রোমাঞ্চের মুখোশে হাস্যরসে ঠাসা এই বইটি আজকের বাজারে প্রকাশ করা সত্যিই দুঃসাহসিক ছিল। নবাগত প্রকাশনা সংস্থা বেঙ্গল ট্রয়কা সেই সাহস দেখিয়েছে। তাই আমরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।
তমোঘ্ন নস্কর ইতিমধ্যেই ইতিউতি অনুবাদে আর 'ট্রু ক্রাইম' নামক বইয়ে নন-ফিকশন লেখায় নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। এই বইয়ের তেইশটি গুল্পকেও তিনি সাবলীলভাবে ভাবানুবাদ করেছেন। তবে গুল্পগুলো পরিবেশনের ক্ষেত্রে কয়েকটা জিনিস টের পেলাম, যেগুলো সম্পাদিত সংস্করণে শুধরে নেওয়া যেত: ১. বেশ কিছু গল্প এগিয়েছে কথোপকথনের মাধ্যমে - যেমনটা গুল্পে হওয়া উচিত। অবিশ্বাসী ব্রডস্কি'র কথায় রেগে ওঠা ব্যারন আর বিশ্বাসী কথক রাম্পের "পোলাপানের কথা বাদ দ্যান" টাইপের মলম-লাগানো - এতে সেই গল্পগুলো অনেক বেশি 'খুলেছে'। কিন্তু বহু গল্প পেশ করা হয়েছে টানা ন্যারেটিভ হিসেবে। মাঝে কোনো সংলাপ নেই। এতে সেই আমেজটাই আসেনি। ২. গুস্তাভ ডোরের মূল অলংকরণগুলো এই বইয়ের সম্পদ। কিন্তু লে-আউট এমনিতে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন হলেও ছবিগুলো যে-সব জায়গায় বসানো হয়েছে সেখানে আদৌ ওই কথাগুলো আলোচিত হচ্ছিল না। অলংকরণের সংখ্যা বাড়িয়ে সেগুলো কীভাবে বসানো যায় - সেটা নিয়ে লেখক ও অক্ষরশিল্পী আরেকটু আলোচনা করে নিলে ব্যাপারটা জমত। জানি, অলংকরণের সংখ্যা বাড়ালে এই ব্যতিক্রমী প্রোজেক্ট আরও ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে যেত। তবে এমন কাজ যেহেতু আগে হয়নি (পরেও হবে কি না - তা নির্ভর করবে বইটির সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর), সেজন্যই কথাগুলো বলা। ৩. অনুবাদ অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ। কিন্তু আজকের পাঠকের সংবেদনশীলতার কথা মাথায় রেখে তমোঘ্ন কিছু ছাঁটকাট করতে পারতেন। ভাবানুবাদে এ জিনিস চলেই।
এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা হল এর প্রচ্ছদ। মজাদার বইয়ের প্রচ্ছদে যেমন ক্লাউনের ছবি থাকা কাঙ্ক্ষিত নয়, তেমনই এই বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে গভীরতর ভাবনার প্রয়োজন ছিল। মাথায় রাখতে হবে, ব্যারন ও তাঁর শ্রোতাদের কাছে কিন্তু এগুলো অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি। গুস্তাভ ডোরে সেভাবেই স্কেচগুলো এঁকেছিলেন। প্রচ্ছদশিল্পী এই কথাটা মাথায় না রেখে যা বানিয়েছেন তাতে বইটাকে ভাঁড়ামো-সম্বলিত কোনো জোকবুক ছাড়া কিছু ভাবা যাচ্ছে না। এটাই অধিকাংশ পাঠককে বইটা নিয়ে নিরুৎসাহিত করে দেবে। প্রকাশক আর কিছু করতে না পারলেও প্রচ্ছদটি অবিলম্বে বদলে, সেখানে মূল অলংকরণের কোনো একটিকে ব্যবহার করলে ভালো হয়।
ইতিমধ্যে, ডমরুধর ও ঘনাদা'র পদধূলিরঞ্জিত এই বাংলায় ব্যারনের আগমনকে স্বাগত জানাই। পাঠকেরা বইটিকে আপন করে নিলে ঠকবেন না। ব্যারনের কাণ্ডকারখানা পড়ে নির্মল হাসির খোরাক পাব না - এতটা বেরসিক আমরা কেউই নই, তাই না?
তন্ত্র - হররের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা এমন একটি বই, যা আরও বেশী করে পাঠকপ্রিয়তা ও সান্নিধ্য দাবী করে। 'বাংলায় ব্যারন', একটি ভিন্নধর্মী সাহসী প্রচেষ্টা এক নতুন কলমের এবং প্রকাশকের। যা আদ্যন্ত সফল হাসি ফুটিয়ে তুলতে পাঠকের ঠোঁটের কোণে। এইরকম আরো কাজ বাংলা সাহিত্যে আসুক। বর্তমানের প্রচলিত পঠনপাঠন ধারায় অক্সিজেন আসুক।