প্রায় ত্রিশ বছর ধরে দেখা সর্বোচ্চ সুন্দর সংসারের পরিচালক বাবা-মায়ের নাম বইয়ের উৎসর্গপত্রে লিখে প্রথমেই যেন আশীর্বাদ নিয়ে নিলেন। তারপর ভূমিকাতে "এখানে ভীষণ রোদ" গ্রন্থটিকে সাহিত্যের কোন জনরার অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে তা নিয়ে দিলেন সন্দিহান মত। তারপর একে একে আটটি অজানা এক জনরার অন্তর্ভূক্ত লেখার জন্ম দিলেন এই গ্রন্থে।
...
সিনেমার এক দৃশ্যে নায়ককে ঝুলানো হবে ফাঁসিতে। চিত্রপরিচালক এই ফাঁসির দৃশ্যকে জীবন্ত করে ফুঁটিয়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। নায়কের গঠনের সাথে মিল রেখে ফাসির আসামী খুঁজে বের করা দিয়ে গল্পের শুরু। ফাসির এক আসামীও এক চিত্রপরিচালকের কাছে এত মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে তা নিয়ে উদাস হয়ে ভাবতে থাকা আসামি মঞ্জুর পূর্ব জীবনের দিনকাহিনী যেভাবে লেখক ফুঁটিয়ে তুলেছেন তা যেন অসম্ভব সুন্দর। নিম্নবিত্ত পরিবারের অভাব অনটন থেকে শুরু করে গ্রামের মোড়লদের অত্যাচারী ও স্বার্থান্বেষী মনোভাব কিরকম বাজে প্রভাব বয়ে আনতে পারে মঞ্জুর মতো কৃষকদের শান্তির জীবনে তা যেন ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। তবুও এক জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হিসেবে মজুকে দাঁড় করিয়েছেন লেখক। এভাবেই গল্প এগিয়ে গিয়ে মঞ্জুর পরিবারে একদিন রঙিন টেলিভিশন আসে। এর মধ্যের দিনগুলোতে প্রচন্ড রকমের পরিবর্তন আসে সবার জীবনেই। সবকিছু মিলিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠা এই গল্পটি পড়তে পারলে অসম্ভব সুন্দর লেখনশৈলীর সাক্ষী হবার গর্ব নিশ্চয়ই অনুভব করবেন।
...
বিশ্ববিখ্যাত ব্যান্ড 'কুইন' এর গায়ক ফ্রেডি মার্কিউরির এক সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেকে এক অনন্য উপাধি দেয় দিলশাদ চৌধুরী। নিজের নামটাও পরিবর্তন করে রেখে দেয়া হয় "দৃশ্য" বানিয়ে। আর্ট ইন্সটিটিউট এর আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে যোগ দিতে ঢাকায় আসা এক বিদেশিনীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় দৃশ্য'র। দৃশ্যকে অনুরোধ করা হয়, তাকে যেন পুরো ঢাকা শহর ঘুরিয়ে দেখানো হয়, দেখানো হয় মানুষের সুখ এবং দুঃখ। এই পরিপ্রেক্ষিতেই গল্প এগিয়ে চলে। টিএসসি'র বাঁয়ে রাধাচূড়া গাছ থেকে শুরু করে, ঢাকার আকাশ-বাতাশ, ফার্মগেটের এক হোটেলে বসে ভাত খেতে খেতে দৃশ্যের বর্ণনা এগিয়ে চলে।
রেলস্টেশনের গতিময় জীবন থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা মানুষের জীবন্ত বর্ণনা দৃশ্যের চোখ দিয়ে দেখতে গিয়ে একসময় দৃশ্যের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ে সেই বিদেশিনী। দৃশ্যের মতে আমরা জন্মই নেই ছেড়ে দেয়ার জন্য। তো সেই বিদেশিনীর জন্যে দৃশ্য কেন ঢাকা ছেড়ে বিদেশ যাবে না, তা বিদেশিনী জানতে চায়।
দৃশ্য কি উত্তর দেয়?
সবটুকু জানার জন্যে এই বই, এই লেখা, এই লেখকের ভাবনার প্রতি গভীর এক ডুব দিতেই হবে।
তা না হলে ভয়ঙ্কর সুন্দরভাবে সাজানো গোছানো একেকটা জীবনকে অনুভব কিভাবে করবেন আপনি?
...
কোনো এক রাজার ছবি সংবলিত নীলচে একশো টাকার একটা নোট, যার এক কোনায় লাল রঙ লাগা, হয়তো রক্ত, কে জানে! এই নীলচে নোটটা যে পুরো শহরের কয়েকশো গল্পের সাক্ষী, মানুষের সুখ-দুঃখের সাক্ষী তা যেন জীবন্ত করে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছেন এই গ্রন্থের লেখক। মাঝারি মানের একটা হোটেলের স্পেশাল চড়ুই পাখি দিয়ে ভাত খেয়ে তৃপ্তি মেটায় এক পথচারী। সকালের রাগারাগিতে বাসায় রান্না হয়নি কিছুই। স্ত্রী আর পুত্রের জন্যে হোটেল থেকে খাবার কিনে বাসায় ফিরলেন এক ভদ্রলোক। আবার রাগারাগি হলো এক পশলা। বাবা-মায়ের ঝগড়ায় অতিষ্ট হয়ে মাঝরাতে শহরে রিক্সায় চড়া সত্যজিৎকে হাতিরঝিল নিয়ে যেতে যেতে গল্পে আসেন রিক্সাচালক কাশেম আলী। অভাবের সংসারে জহুরাকে নিয়ে স্বপ্ন সাজান মাঝরাতে বাড়ি ফিরে। প্রতিরাতে ঘরে ফিরতে দেরী হয় বলে ছোট্ট ছেলে সুজনকেও জেঁগে থাকা অবস্থায় না দেখতে পারার কষ্ট লুকিয়ে রাখেন। দেখতে দেননা কাউকেই। উচ্চবিত্ত পরিবারে অন্যসব কিছুর অভাব না এলেও, ভালোবাসার যে নিদারুন অভাব পরিলক্ষিত হয়, তার জীবন্ত সাক্ষী হয়ে ঘুরে বেড়ায় অইযে গল্পের শুরুতে বর্ণিত নীলচে একশো টাকার নোট।
কিন্তু কিসের সাক্ষী হয়? ভেতরের গল্পগুলোই বা কিরকম?
সবকিছুর সাক্ষী হতে হলে আপনাকেও সুন্দর এই গল্পটি পড়তেই হবে, পড়তেই হবে।
...
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার আত্মত্যাগী আয়েশা তার পিতাকে বাঁচাতে নিজের জীবনটাই এক নরপিশাচের হাতে সপে দিয়ে গল্পটাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তৎকালীন সময়ের এইরকম হাজারো গল্প অজানা রয়ে যায় আমাদের, হাজারো আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মর্জাদাটাও আমরা দিতে ভুলে যাই।
পুত্রের মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের ক্ষতিপূরণ হিসেবে নিজের জীবনটা ই বিলিয়ে দিয়ে গল্পটা জীবন্ত করে তোলেন হরনাথ দত্ত। প্রচন্ড স্বার্থপর মনে হয় হয়তো মজিদ খলিফাকে, হরনাথ দত্তের লাশের পাশে। কি থেকে কি হয়?
কেনই বা এসব হয়?
আয়েশা ই বা কোথায় যায়?
প্রত্যেকটি উত্তর খুঁজে পেতে পেতে হয়তো চোখ ভার হয়ে আসবে, কন্ঠ জড়িয়ে যাবে, প্রচন্ড জোরে চিৎকার করতে মন চাইবে।
...
সরকারের নিবন্ধনের বাইরে গড়ে উঠা অনেক পুরানো এক পতিতালয়ের এক বালিকার প্রতিদিনকার জীবনের কাহিনীই যেন ফুটে উঠেছে এই গল্পে। হয়তো জীবিকার তাগিদে নিষিদ্ধ এক কাজে জড়িত, তবুও নিজের চরিত্রে আঁচড় পড়তে না দেয়া রেশমাকে কঠিন এক শাস্তিই যেন প্রদান করে স্ত্রী বিমুখ স্বামী আকবর।
ঘরে স্ত্রী থাকা সত্বেও প্রতিদিন এই নিষিদ্ধ জায়গায় আসতো আকবর। কোন এক কারণে একদিন আসা বন্ধ করে দেন, তারপর চিরতরে। আকবরের দোষে রেশমা শুরু করে শাস্তিময় জীবন। একসময় বোঝা সইতে না পেরে নিজের সবচেয়ে আপন দুটি জিনিশ সে বিক্রি করে দেয়।
কি ছিলো সেই দুটি জিনিশ?
এরপর গল্প আগায়। অনেক দূর গড়ায়। পতিতালয়ের বড়পা সামান্য কিছু টাকার জন্যে রেশমার প্রিয় জিনিশ বিক্রি করে দেয়ার ফলেই পানি গড়ায় বহুদূর। একসময় নিয়তি বদলায়।
গল্প যেখান থেকে শুরু হয়, থামে কিন্তু দেখানেই।
সবকিছু মিলিয়ে চমৎকার সব প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের সাক্ষী হতে আর দারুণভাবে বর্ণিত কয়েকটা জীবন্ত ঘটনার সম্মুখীন হতে এই সবজিওয়ালার গল্প না পড়লেই নয়।
...
পুরো গ্রন্থের মূল গল্প 'এখানে ভীষণ রোদ' যেন সবচাইতে মধুর করে বর্ণিত উপাখ্যান। মানুষের বিব্রত হয়ে বসে থাকার এক দারুণ বর্ণনা দিয়ে গল্পের শুরু। গল্পের মাঝে বা শেষে যতোটা ভালোবাসা গেঁথে রেখেছে লেখক, তা যেন সম্পূর্ণ গল্প না পড়লে কেউ ই টের পাবে না।
মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বামী স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসার সম্পর্কে যে কতো শীতের কত শিশিরবিন্দু জমে থাকে, তা যেন তারা ছাড়া কেউ ই কখনো আঁচ করেনা। একজনের প্রতি আরেকজনের সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বজায় রাখতে কি পরিমান আত্মত্যাগ করে চলতে হয়, তাও গল্প না পড়লে বোঝা মুশকিল। প্রত্যেকটা ভালোবাসার গল্পে অশ্রুসজল চোখ থাকবেইন, হোক তা কষ্টের বা হোক তা সুখের। অশ্রুসিক্ত মুহূর্তগুলোকে জীবন্ত করে তোলার জন্য এই গ্রন্থের লেখককে যেকোনো কিছু দিয়ে পুরষ্কৃত করলেই হবে না। সম্মানজনক কিছু অবশ্যই দেয়া লাগবে।
মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালাতে হিমশীম খাওয়া পিতা নিজের ভালোবাসাকেও আত্মত্যাগ করতে রাজি হয়, তা দেখে যেকোন সন্তান যেন নিজেদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে। নিজেদের ভুল শুধরে সঠিক পথে চলে আসে, তা যেন প্রত্যেকটা পাঠকই আশায় বুক বাঁধে।
এরপরেও, এই গল্পে আসলে ই কি আছে?
মনসুর আহমেদের ভালোবাসাতেই বা কি আছে? সবকিছু জানলে একটা বিশাল ঘোরের মধ্যে পড়ে যাবেন নিতান্তই বলা চলে। সেই ঘোরটা থেকে অপরাধবোধ কাজ করবে না ভালোবাসা জাগ্রত হবে তা যাচাই করার জন্যে হলেও এই ভীষণ রোদে ভিজে হলেও গল্পগুলো পড়তে হবে।
...
' তুমি একটা প্রেমের গল্প লেখার জন্য আকাশ-পাতাল ঘুরে এসেছ, মানুষ মানুষীর কাছে গিয়েছ। অথচ তুমি খোঁজই করলেনা আমার ঠোঁটে তোমার জন্য যে কতো গল্প জমা আছে। লেখক সাহেব, ভুল জায়গায় খুঁজলে কি প্রেম পাওয়া যায়?'
প্রেম বা ভালোবাসার সংজ্ঞা খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে ছুটে চলা লেখক কি আদৌ খুঁজে পেয়েছিলো ভালোবাসার গল্প?
এই শহরের আনাচে-কানাচে?
মায়ের কাছে?
গ্রামের জীর্ণ একটা দোকানে সন্ধ্যা থেকে বসে থাকা হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের কাছে?
নিখোঁজ সেই ভালোবাসার গল্পটাও কি শুনার আগ্রহ জন্মায় না?
...
দেশের সবচাইতে দুঃখী মানুষকে সম্মানিত করা হবে। সম্মানিত হবার আশায় পথে পথে ছুটে চলা আশাহীন, নিরাশ মানুষদের মধ্য থেকে তিনজন মানুষ বিচার বিবেচনায় সেরা তিনে স্থান পায়। তারপর তারা সেরা হবার লড়াইয়ে বিচারকের অপেক্ষায় বসে থাকে তাদের সম্পূর্ণ দুঃখের গল্প শোনানোর জন্য।
জীবনের দৌড়ে পরাস্ত, অবহেলিত এই তিনজন মানুষই দুর্দশাগ্রস্থ, দুঃখে জর্জরিত। সবাই সবার গল্প শোনায়। বিচারক যেন সামনে বসে থেকেও শোনে না তাদের গল্প। শুনলেও যেন অনুভব করতে পারে না। বিচারককে দুঃখের গল্প শোনায় তারা তিনজন। তিনজনের দুঃখ পড়তে গিয়ে যেকোন বয়সের পাঠকেরই গলা বসে যাবে, কন্ঠ ভার হয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে উঠবে। পলক ফেললেই যেন অশ্রুগুলো ঝড়ে পড়বে। এমন সব গল্পে যখন ভীষণ মন খারাপ হয়, তখন খুব করেই এই গল্প লেখককে খুঁজতে ইচ্ছে করে।
আচ্ছা, গল্পগুলো লেখার সময়ও কি আপনার চোখে জল জমেছিলো?
একেকটা চরিত্রকে কাঁদিয়ে কি নিজেও কেঁদেছিলেন?
কিছু প্রশ্নের উত্তর অজানাই রয়ে যাবে। তবে গ্রন্থটি পড়লে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আপনি ঠিকই ঘোরের মধ্যে থাকবেন। বিশ্বাস করতে মন চাইবে না যে গল্পটি শেষ, আর আগাবে না। কেননা, পড়তে পড়তে চরিত্রগুলোর ভীড়ে হারিয়ে ফেলবেন নিজেকে, কোন এক চরিত্রকে আপন করে নিয়ে ডুবে যাবেন গল্পে। তার জীবনেই বেঁচে থাকবেন। হাঁটবেন, আকাশ দেখবেন। যখন গল্প শেষ হবে?
সে আসক্তি থেকে বের হবার পথ কি লেখক বলে দিয়েছেন? দেননি...
বইয়ের নামঃ এখানে ভীষণ রোদ
লেখকঃ ওয়ালিদ প্রত্যয়
প্রকাশনীঃ নালন্দা