সে বছর বর্ষার শুরুতেই মহারাজ লক্ষণসেন যখন দক্ষিণের সুন্দরবন অঞ্চলের বিদ্রোহী পাল-নৃপতি ডুম্মনের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবেন বলে সুবিশাল নৌ- পদাতিক এবং হস্তীবাহিনী নিয়ে সমর সজ্জার উদ্যোগ করছেন, বখতিয়ার ততদিনের তাম্রকূট-অমরকূট জয় করে শোন-নদী পাড় হয়ে দুর্গম ঝাড়খন্ডের অরণ্য ভাগের উপর দিয়ে ঝড়ের বেগে অশ্ব হাঁকিয়ে বঙ্গ দেশের অভিমুখে ছুটে আসছেন।
অন্যদিকে, আত্রাই তীরের পরিত্যক্ত রাজপুত্র নরুনের ভাবনায় উঠে আসছে পুরনো পিতাদের টগবগে অহম। যুদ্ধ দিনের দুন্দুভি, “আমি কখনো ঘুমাই না। আমার ঘুম আসে না। দিবারাত্রি অষ্টপ্রহর ঘুমে কিংবা জাগরণে নিজেকে খুব ধীরে, খুব গোপনে তৈরি করছি আমি। যারা আমার রাজ্যপাট এবং আমার ঈশ্বর এবং প্রেমিকাদের চুরি করে নিয়ে গেছে- আমি তাদের বুকের পাঁজায় শানিত তরবারি ঠেসে দিয়ে স্বর্গীয় অপ্সরাদের চুম্বনের আনন্দ পাই। যেদিন আমার সত্যিকারের রূপ দেখবে - আমার মৃগচর্ম পরিহিত পাদুকাযুগলে চুম্বনের নেশায় লালায়িত হবে যাবতীয় কামাহত প্রেয়সীরা, আমি সেই প্রখর পুরুষ—”
প্রেম অথবা যৌনতা... নির্বাণ অথবা নৃশংসতা... জয় অথবা মৃত্যুর নদী পেরিয়ে কে হবেন যুদ্ধদিনের অগ্নিপুরুষ? বাংলার ইতিহাসের সেই অবিস্ময়রণীয় অধ্যায় নিয়ে রচিত প্রেম ও যুদ্ধ দিনের গল্পে আপনাকে স্বাগতম হে বন্ধু- হে প্রিয়-
মাত্র ১৭ জন সৈন্য নিয়ে তুর্কি-আফগান বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি নদীয়া আক্রমণ করেন এবং রাজা লক্ষ্মণ সেন পালিয়ে যান। বখতিয়ার খিলজি এত দ্রুতই ঘোড়া ছুটিয়েছিলেন যে, অল্প কয়েকজনই সঙ্গে পৌঁছাতে পেরেছিল। পাঠ্যবইয়ের ইতিহাসে এইটুকুই জেনেছিলাম। 'অগ্নিপুরাণ' বখতিয়ার খিলজির বাংলা আক্রমণ, লক্ষ্মণ সেনের শাসনামল এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে রচিত ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস।
দীর্ঘ চারশো বছরের পাল শাসনামলের সূর্য অস্তমিত গিয়েছে। পালদের পর সেন রাজবংশের জয়জয়কার। সর্বশেষ পাল রাজা মদনপালের দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে সেন বংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। বিজয় সেনকে সেন বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা গণ্য করা হয়। বিজয় সেনের পৌত্র লক্ষ্মণ সেনেরও বয়স হয়েছে। তবুও তিনি দক্ষিণের বিদ্রোহী সামন্ত রাজা ডুম্মান পালকে শায়েস্তা করতে বিরাট সৈন্য সমাবেশ করেন। তিনি কি পারবেন ডুম্মানকে পরাজিত করে নিজ রাজ্যের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে?
পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপালের একবিংশ বংশধরদের একজন নরুন পাল। দেড়শো বছর আগেও তার পূর্ব পুরুষরা আত্রাই-করতোয়া নদী বিধৌত অঞ্চলে শাসনকার্য পরিচালনা করেছে, সেই তারাই এখন ভাগ্যের ফেরে খুব কষ্টে দিনাতিপাত করে। সেন বংশের শাসকরা ক্ষমতা নেওয়ার পর পাল বংশের লোকেরা অনেকে নিহত হয়েছে কিংবা পালিয়ে অন্য এলাকায় বসবাস শুরু করেছে। তেমনই বনগড়ে বাস নরুনদের। বাবা-মা ও বোনকে নিয়ে কষ্টেসৃষ্টে দিন চলে। বনে ময়ূর শিকার করে বাড়ি ফিরে আসার সময় লক্ষ্মণসেনের আত্মীয় রাজদত্তের সামনে পড়ে যায় নরুন। ময়ূরটি রাজদত্তের পছন্দ হওয়াতে রেখে দেয়। ন্যায্য মূল্য চায় নরুন; কিন্তু মূল্য দেওয়ার বদলে তাকে আটক করে নৌকার ভ্রাম্যমাণ কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন নরুনের নিজেকে এক হতভাগ্য রাজপুত্র মনে হয়। রাজা হওয়ার আকাঙ্খা যেন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কী হবে সামনে?
বনগড়ের আরেক বাসিন্দা বৈদ্যগুপ্ত। তার পেশা নাচ-গান। একসময় হিন্দু থেকে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হলেও পুনরায় হিন্দু ধর্মে প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস চাপা দিয়ে রাখে। নিজ জন্মভূমি সুবর্নগ্রাম ভ্রমণ করে নৌকাযোগে বাড়ি ফিরছিল। পথিমধ্যে স্ত্রী উজুরাণী ও নাতনি সেমন্তি রাধিকা আবদার করে রাজপুত্র দেখবে। তাই তাদের লক্ষ্মণ সেনের প্রাসাদের সামনে নিয়ে যায়। তবে রাজপুত্রের সাথে দেখা না হলেও স্বয়ং রাজার সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। সেমন্তি উঠতি বয়সের কিশোরী। সবেমাত্র যৌবনে পদার্পণ করছে। নাতনিকে কোনো রাজপুত্রের হাতে তুলে দিতে পারার ইচ্ছাটা দীর্ঘদিনের। বাড়ি ফেরার পথে রাজদত্তের নৌবহরের দেখা হয় এবং রাজদত্ত অনুরোধ করে রাতে গানের আসর বসাতে। শাসনকর্তাদের অনুরোধই যেন আদেশ। আসর বসায় বৈদ্যগুপ্ত। সেই আসরেই সেমন্তিকে দেখে মুগ্ধ হয় রাজদত্ত। সেমন্তিকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা জাগে এবং ভৃত্য জগানন্দকে আদেশ দেয় সেমন্তিকে চোখে চোখে রাখতে। রাজদত্ত কি পারবে সেমন্তিকে নিজের করে নিতে?
ত্বরাইনের প্রথম যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহানের নিকট মুহম্মদ ঘুরী পরাজিত হলেও পুনরায় সৈন্য সমাবেশ করেন। ত্বরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে বিজয় অর্জন করে দিল্লীর সিংহাসনে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তখন ভাগ্যান্বেষনে বহু মুসলিমরা ভারতের ঘুরী সাম্রাজ্যে চলে আসে। সৈনিক পদে নিজেদের নাম লেখাতে শুরু করে। সুদূর আফগানিস্তান হতে এসেছেন তরুণ বখতিয়ার খিলজি। দ্বারে দ্বারে ঘুরেও বেঢপ চেহারার কারণে কোনো চাকরি পান না। তলোয়ার ও ঘোড়া কিনে সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেবেন সেই অর্থও নেই। নিঃস্ব অবস্থায় দীর্ঘদিন ঘোরাঘুরির পর বদায়ুনের হিজবর-উদ্দীনের নিকট চাকরি জোটে। নিজ দক্ষতায় বদায়ুন থেকে অযোধ্যায় চলে আসার পর দূর্গাপুর নামক একটি জমিদারি অঞ্চলের চৌকিদারির দায়িত্ব নেন। দূর্গাপুর ছিল ঘুর সাম্রাজ্যের শেষ সীমানা। তিনি কিছুদিন ঐ এলাকায় থাকার পর সাম্রাজ্য বিস্তারের দিকে মনোযোগী হন। কিছু এলাকা দখলের পর বিপুল সম্পদ তাঁর করায়ত্ত হয়। তখন খবর আসে, আরো সামনে আগালে বঙ্গ নামে এক রাজ্য আছে, যার সম্পদের পরিমাণ বিশাল। সেই অঞ্চলের রাজা লক্ষ্মণ সেন এবং এই অঞ্চল জয় করতে পারলে ইসলামের প্রসার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। সেই রাজ্য জয়ের নেশায় বেরিয়ে পড়েন ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বখতিয়ার খিলজি ।
ঐতিহাসিক চরিত্রের সাথে কাল্পনিক চরিত্রের সহাবস্থান বেশ ভালোভাবেই উপস্থাপন করেছেন লেখক। বখতিয়ার খিলজি ও লক্ষ্মণ সেনের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ অর্থবহ ছিল। বইটির শুরুতেই মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের ম্যাপ দেওয়া ছিল। এতে করে ঘটনাবলীর সাথে স্থানগুলোর প্রাচীন নাম চিহ্নিত করা সহজ হয়েছে। ঐতিহাসিক উপন্যাসে লেখকের স্বাধীনতা থাকে চরিত্রগুলোর উপস্থান নিয়ে। অনেক লেখক সেইসব চরিত্রগুলোকে ইতিহাসের বাইরে নিয়ে যান; এদিক দিয়ে এই বইটাতে কোনো সমস্যা ছিল না। বখতিয়ার খিলজি উপমহাদেশে আলোচিত কিংবা সমালোচিত একটি চরিত্র। লেখক বইতে বখতিয়ার কিংবা লক্ষ্মণ সেন কাউকেই খলনায়কের চরিত্র দেন নি। এতে করে লেখকের সূক্ষ্মতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
বইটির প্রধান দূর্বলতা হলো কাহিনির বর্ননা হয়েছে যাত্রাপালার ঢঙে। যেহেতু উপন্যাস তাই ইতিহাসবিদদের রেফারেন্স টানা ভালো লাগেনি। কিছু কিছু জায়গায় বাক্য সম্পাদনার অভাব রয়েছে। শব্দ বিন্যাস আরেকটু ভালো হওয়া উচিৎ ছিল। মধ্যযুগীয় সময়ের বাংলা অঞ্চলের একটা সংলাপে ইংরেজি শব্দ ছিল, যা বড় একটা ভুল। সেমন্তি রাধিকা ও রাজদত্তের পরিণতি হুট করে দৃশ্যপটে আনা হয়েছে। কিছুটা বিস্তারিত উপস্থাপন করলে চরিত্রগুলো পূর্ণতা পেত। লক্ষ্মণ সেনের সাথে ডুম্মান পালের যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ থাকলেও বখতিয়ার খিলজির নদীয়া দখল যেন হুট করে হয়ে গিয়েছে। এখানে আরো বর্ননার দরকার ছিল। এরপর বখতিয়ার খিলজির তিব্বত অভিযান যেন বইটির মেদ বাড়িয়ে অসুবিধা সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনাটুকু না দিলেই বোধহয় ভালো হতো কিংবা যেহেতু লেখক ঘটনাটুকু বর্ননা করেছে তার আকার বড় হলে ভালো হতো। বইটিতে যৌনতা আছে তবে তার মাত্রা কম। পাঠকের কোনো সমস্যা হবেনা। সর্বোপরি বলা যায় বইটি মোটামুটি ভালো। খুব ভালো বলব না; কারণ বইটি পড়ার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। তবে আগ্রহী পাঠকগণ বইটি পড়তে পারেন। ইতিহাস জানা বা শুধু আনন্দ এখানে মুখ্য নয়। ইতিহাস ও কল্পনার সংমিশ্রণের ভিন্নধর্মী বইটি পড়ুন। হ্যাপি রিডিং।
ফ্লাপে লেখা কাহিনী সংক্ষেপ পড়লেই এই উপন্যাস কেমন সেটা বোঝা যায়— অতি নাটকীয় কিন্তু উপভোগ্য।
ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি— ওই যে সেই রাশভারী নাম, যেইটা পড়ে ছোটবেলায় আমরা সবাই অবাক হয়েছি মানুষের নাম এতো-ও-ও বড় হয়! — তার ভারতবর্ষে আগমন পরবর্তী প্রথম জীবন, উত্থান, বঙ্গ বিজয় এবং মৃত্যুকে উপজীব্য করে লেখা উপন্যাস। তৎকালীন সামাজিক অবস্থা ফুটিয়ে তুলতে কাহিনীতে যেমন এসেছে রাজা লক্ষণ সেন, কুতুবউদ্দিনের মতো ঐতিহাসিক চরিত্ররা, তেমনি গল্পে এসেছে সমাজের নিম্ন শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করা বেশ কয়েকটি চরিত্র।
গল্পের বুননী তেমন একটা জুতসই লাগেনি। সব সুতো লেখক গুছিয়ে তুলতে পারেননি শেষ পর্যন্ত। লক্ষণ সেন এবং বখতিয়ার খিলজির কাহিনী সমান্তরালে এগিয়েছে পুরো উপন্যাস জুড়���, ফুটে উঠেছে তাদের জীবনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ের অর্জন কিংবা গ্লানি। তবে ইখতিয়ার খিলজির চরিত্রের মতো শক্তিশালী চরিত্র ছিল না লক্ষণ সেন কখনোই। তাই ক্লাইম্যাক্স ঠিক উপভোগ করতে যেমন পারিনি, তেমনি পারিনি চরিত্রের পরাজয়ে ঠিক রিলেট করতে।
পুরো উপন্যাস অভারল উপভোগ্য ছিল। কিছু কিছু চরিত্রের কথোপকথন শুনে মনে হচ্ছিলো যাত্রাপালার ডায়লগ পড়ছি, তবে প্রথম থেকেই যেহেতু অতি মাত্রায় নাটক���য় তাই খুব একটা চোখে বাঁধবে না। কিন্তু চোখে বাঁধবে কথোপকথনে লেখকের শব্দের ব্যবহার।
দোষ লেখকের না এখানে, ভুলটা সম্পাদকের। পুরো উপন্যাসে লেখক সচেতনভাবে প্রচলিত কিছু শব্দ বর্জন করে ব্যবহার করেছেন কঠিন কঠিন সব শব্দ। কিন্তু মুসলিম শাসনামলের আগেই হিন্দু এক চরিত্রের মুখে ‘দোয়া’ শব্দ, কিংবা সেই সময়েই ‘গভর্নর’ জাতীয় ইংরেজি শব্দ সত্যিই চোখে লাগে। কোথাও কোথাও বর্ণনা একঘেয়ে হয়ে যাওয়া, বাক্যের অর্থ স্পষ্ট না হওয়া— সবই সম্পাদনা ত্রুটি। পরবর্তী সংস্করণে এসব ভুল সংশোধন হলে উপন্যাস আরো উপভোগ্য হবে। তবে ভালো লেগেছে সম্পূর্ণ উপন্যাসে মাত্র একটা বানান ভুল দেখে। এখানে প্রুফ রিডারের বাহবা প্রাপ্য।
সব মিলিয়ে খারাপ লাগেনি। অনলাইনে যেমন হাইপ দেখছি ওতোটা ভালো না হলেও যথেষ্ট উপভোগ্য। দিনশেষে উপভোগ করতেই তো মানুষ উপন্যাস পড়ে, নাকি? সেদিক থেকে দেখলে স্বার্থক ‘অগ্নিপুরাণ’।
নাম দেখেই ধারণা করা যায়, ঐতিহাসিক উপন্যাস। পটভূমি মূলত ১২০০ সালের শুরুতে সেন শাসিত বাংলা।
এ গল্প শেষ সেন রাজা লক্ষণসেনের আর মুসলিম বীর বখতিয়ার খিলজির। যে সময়ে বাংলায় সেন শাসন শেষ হয় আর তুর্কি বীর বখতিয়ার ক্ষমতা দখল করে নেয় তখনকার সময় নিয়েই আবর্তিত এর কাহিনী। আছে বংশ হিসাবে রাজপুত্র অথচ সময়ের স্রোতে দারিদ্র্যতার কষাঘাতে জর্জরিত কল্পিত চরিত্র নরুনের কথা। আছে রাজদত্ত, বৈদ্যগুপ্তদের কথা। শুকপতি নামের এক সুত্রধর (কাঠমিস্ত্রি) গ্রামের মোড়লেরও ভূমিকা আছে বিশাল, যে কী না হুট করেই কল্পনাতীত দায়িত্ব পেয়ে যায়, হাজার পাঁচেক মানুষ নিয়ে হাজার হাজার রণতরী বানিয়ে ফেলে নিমিষেই।
অন্যদিকে বখতিয়ার খিলজির সাথে আছে শীরন, জহুরী, আলী মর্দানের মত চরিত্র। যারা কাধে কাধ লাগিয়ে, অশ্বের পিঠে চড়ে খাপ খোলা তলোয়ার হাতে একে একে জয় করে চলেছে তাম্রকূট, অমরকূট, ঝাড়খণ্ড। ক্রমেই এগিয়ে আসছে লখনৌ আর বাংলার দিকে.....
বখতিয়ারের রাজ্যের পর রাজ্য দখলের কৌশল আর সুন্দরবনে দস্যু ডুম্মনকে কাবু করতে লক্ষণসেনের নৌবহর নিয়ে আক্রমণের বর্ণনা ছিল বেশ চমৎকার। প্লট হিসাবেও অসাধারণ সন্দেহ নেই। তবে সেই অর্থে "সুখ পাঠ্য" নয়। হাজার বছর আগের জংলা, নদীবিধৌত বাংলার মায়াবী বর্ণনা যেমন আছে, কিছু কিছু জায়গায় সাথে আছে রগরগে যৌনতার বর্ণনা যা ভাল লাগেনি। বইয়ের ভাষা সেই অর্থে একদম সরলও না।
তবে নামের সাথেই যেহেতু "পুরাণ" আছে, একদম জলবৎ তরলং ভাষা আশা করাও বোধহয় ঠিক না। সব মিলিয়ে আমার কাছে বইয়ের রেটিং পাঁচে আড়াই, বা টেনেটুনে তিন। এটুকু না হলে আসলে প্রায় সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার এই বই শেষ করা হত না!
অগ্নিপূরাণ । মুহম্মদ নিজাম । বায়ান্ন ('৫২) । ২০২২র ১৯তম বই . লেখক প্রাক-কথনে জানিয়েছেন - প্রতিটা ভুমির নিজের কিছু গল্প আছে। "অগ্নিপূরাণ" বাংলাভূমির গল্প। রাজপুত্র নরুন সেই ভূমির নির্জলা নির্যাস। ইতিহাসের গালভরা রাজ-কাহিনীতে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। . নরুন ১২০০ খ্রীস্টাব্দের শুরুতে বিস্মৃত পাল-সাম্রাজ্যের, এক ভাগ্য বিতাড়িত ভুমিপুত্র। সেন-সাম্রাজ্যের সামন্তপতিদের নিপীড়নে জর্জরিত, কোণঠাসা, পতিত ও অবহেলিত। সমাজ-জাত বর্ণবৈষম্য তাঁর পিতা-আদৃত ধুসড় পুর্বপুরুষদের পাল-অহমকে মরতে দেয় নি। ভেতরর প্রবাহমান বহ্নিশিখা নিয়ে সে কি করবে, কোন পথে নিজের আবেগ কে চালনা করবে, তাঁর পথ খুঁজে পায় না। কিন্তু সময় নদীর ফল্গুধারায় সেই এই আখ্যানকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সে নায়ক নয়, কাণ্ডারী! . আছেন - . বৈদ্যগুপ্ত ও তাঁর স্ত্রী উজুরানী, তাঁদের নাতি সেমন্তি - নরুন এর মত এরাও কাল্পনিক চরিত্র। এঁদেরই চোখ দিয়ে লেখক যাঁতাকলে পড়া মধ্যবীত্তদের অবস্থা দেখিয়েছেন। . রাজাধীরাজ লক্ষণ সেন, তাঁর রাজ্য ও পরিবারবর্গ - ৮০ বছরের দীর্ঘ উত্থানপতনে রঞ্জিত-জর্জরিত মহীরুহ। . বখতিয়ার খিলজি - কুৎসিত চেহারা আর দারিদ্রজড়িত বঞ্চনা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর এক আলেখ্য। নম্র লৌহনির্মিত ধাতু থেকে কঠিন ইস্পাত-শানিত এক যোদ্ধাকে এঁকেছেন লেখক। ঔধ(অযোধ্যা) দুর্গাপুর, পঞ্চবটী, তাম্রকুট, অমরকুট, ঝাড়খণ্ড ছাড়িয়ে বঙ্গবিজয়ে আগত এক বিস্ময়(লুঠতরাজের জন্যে এক-দুটি লাইন বা পরিচ্ছেদ লেখক সংযুক্ত করেছেন সাহিত্যকর্ম দিয়ে নয়, বরং মিনহাজ এর তাবাকৎ-ই-নাসিরি থেকে)। আর খিলজির সাথে আছেন নতুন দুই তুর্কি - শীরন, ইওজ(এরাও খিলজি), জহুরী (মুলত উপদেষ্টা ও গুপ্তচর) ও তাঁর পুরাতন ইয়ারদোস্ত - আলী মর্দান। ক্রমাগত বর্ধমান সেনার মূল স্তম্ভ ও ভবিষ্যৎ এনারাই! এক এক জন কষ্টে অর্জিত স্বেদ দিয়ে ভাগ্য নির্নয় করে চলেছেন অজস্র উপমহাদেশবাসীর। . রাজদত্ত - সমাজ ও ক্ষমতার উপরিবর্গে আসীন উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক সামন্তপতি। ঐতিহ্য রীতিনীতির মাঝে যেমন রাজ-সহায়তায় পারঙ্গম, আবার নিজের ক্ষমতার সচেতন আঘাতে সমাজের অন্যান্য শ্রেণীদের নিপীড়নেও সিদ্ধহস্ত। . শুকপতি - সুত্রধর ও প্রেমিক। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আবার বিল্বগ্রামের মোড়ল ও সমরবিদ, যদিও লেখক তাকে বেশিরভাগ ব্যাবহার করেছেন এখানে উল্লিখিত ২য় অস্মিতায়। . ডুম্মণ - রাষ্ট্রদ্রোহী ভেকধারী লুঠেরা, যাকে লক্ষণসেন খর্ব করেন। . সহস্র বছর পূর্বের যাপিত জীবন, এই কাহিনীর বুননে লেখক সুনিপণ স্নেহে মাখিয়ে রেখেছন। বাংলার নদী-মাটি-জল-অরণ্য-বনানী-গৃহপ্রাঙ্গন, শীতগ্রীষ্মবর্ষা বিধৌত কুহকে মোড়া চাদরে। আছে কষ্ট-নীপিড়িত-তাড়িত পাঁচালীর গানও। সমরভিযানের কলাকৌষল ও বর্ণনা যথাযথ। . এই বইটি "বিশুদ্ধ সাহিত্যকর্ম" হলেও, ইতিহাসের মূল সূত্র, তথ্য ও ঘটনাক্রম বজায় রেখেছেন। এর রচনা হেতু লেখক প্রাচীন গ্রন্থ, টেরাকোটা, মুদ্রা, শিলালিপি ও প্রত্ন-উপাদান থেকে নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা গ্রহণ করেছেন বলে জানিয়েছেন। অনেকাংশে তা লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু... . উপন্যাসে সেই সময়ের প্রচলিত শব্দসমষ্টির সামঞ্জস্য রাখা হয়নি। সেই ক্ষেত্রে - এটি সম্পাদকের ভুল বলেই মনে হয় - যেমন - - গভর্ণর, ডিভিশন, রিজার্ভ, ডজন - যা মুলত ইংরেজি - দোয়া, গোসল, সেমিজ, দাদা/দাদী (ঠাকুর্দা/মা হিসেবে), সেমিজ - ইত্যাদি প্রাক ইসলামিক বঙ্গবাসীদের চরিত্রদের বচনে ব্যবহৃত হয়েছে, যা কালনৌচিত্য দোষে দুষ্ট। . কাহিনীতে লেখক নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের লুণ্ঠন কে ইপ্সিত ভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন। যদিও ওদন্তপুরী ও বিক্রমশীলা মহাবিহারের তাণ্ডবকে তিনি ঐতিহাসিক মিনহাজ এর বয়ান অনুযায়ী দর্শিয়েছেন। বঙ্গভূমীর ৬টি মহাবিহার - বিক্রমশীলা, নালন্দা, ওদন্তপুরী, সোমপুর, জগদ্দল ও শালবন(কত্রিত্ব অনুসারে) - বেশিরভাগ পালসম্রাট দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পালিত হয়ে এলেও, সেন আমলে - নিজেদের গরিমা অক্ষুন্ন রেখেছিল। লেখক হিন্দু-বৌদ্ধ সঙ্ঘর্ষ চিত্রণে ব্যাস্ত থাকায় এই সমীকরণ কি ভাবে সম্ভব ছিল - তা দেখান নি। নালন্দা-উল্লিখিত হয়েছে দুটি ক্ষেত্রে - ডুম্মণ ও শুকপতির শিক্ষাযোগ্যতা প্রমাণ হেতু। এবং এখানেই ফাঁক আছে। ডুম্মণ - নালন্দা আচার্যের পুত্র! এবং ছাত্র ও বটে। নালন্দায় ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীরা অবিবাহিত থাকতেন। তাঁদের সন্তান থাকার কথা নয়। হলেও, তাঁরা পিতৃপরিচয় দ্বারা নালন্দায় স্থান পেতেন না। শুধু নালন্দা নয়, ৬��ি মহাবিহারের প্রতিটি দ্বারপণ্ডিত দ্বারা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হলে তবেই জায়গা হত এই মহাবিহার গুলোতে। . পৃ ২৩৮ এ দেখছি - নরুন পিতা বলছেন - "মহাদেব বুদ্ধার আবার জন্ম হবে"। যিনি নিব্বানলাভ করেছেন, তিনি বৌদ্ধমতে আবার জন্ম নেবেন কি করে? বোধিসত্ত্ব, মৈত্রেয়, বুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য আছে, এখানে যা হয়ত মিশে গেছে? . পৃ ২৩৮ এ দেখলাম - ক্ষুদার্ত নরুন খুঁজছে - "কচুশাক কিংবা আলু ঝোলে একফালি মাছের গন্ধ"। মেটে আলু হলে হয়ত ঠিকই থাকত। কিন্তু আলু তো তখনও এই মহাদেশে আসতে অর্ধশতাব্দী পরে কিংবা ১৪০০ যোজন দূর আন্দেজ পর্বতে অবস্থিত। . পৃ ২৫০ এ লেখক জানাচ্ছেন - কুতুবুদ্দিন আইবক - বখতিয়ারের ওদন্তপুরীর লুণ্ঠনে প্রচন্ড বিরক্ত। এটি যদি হাস্যস্পদ মনে হয়, তাহলে বখতিয়ারের কৈফিয়ত পাঠ করার পর কি করবেন, সে আপনিই জানেন। তাম্রকূট, লখনৌতি ইত্যাদি প্রতিটি জায়গা আক্রমণ করার আগে বখতিয়ার প্রেরণ করেছেন গুপ্তচর জহুরীকে। এই জায়গাগুলির শাসক, শাসন, সৈন্য, ভৌগলিক সন্ধান, শক্তি ও দুর্বল জায়গা মেপে নিতে। জহুরী রাজপ্রসাদের এর ভেতরের নক্সা পর্যন্ত চিহ্নিত করেছেন, জায়গা বিশেষে। অথচ - বিশালকায় মহাবিহার গুলি যে শিক্ষাকেন্দ্র - এটি নির্নয় করতে পারেন নি? তাই সৈন্যদল এই স্থানগুলিকে রাজমহল ভেবে আক্রমণ করেছেন? এই যুক্তি মেনে নেওয়া যায় না। একটি সভ্যতার একাধিক শিক্ষাপীঠ ধ্বংসের কৈফিয়ত ১-২টি পংতিতে সীমাবদ্ধ রাখা, বা অনুপস্থিত করার চেয়ে যে সেটি ধর্মোন্মাদের কাজ - সেটি চিহ্নিত করাই উচিত। হিটলারের ইহুদিপ্রীতির জন্য জার্মানরা কৈফিয়ত দেন না। তাঁরা ইতিহাসকে ইতিহাস বলেই মেনে নেন। . পৃ ৩২০ তে - বালিকা সেমন্তিনি কে বিয়ে করে রাঘবগুপ্ত "তাকে গনিকালয়ে বাকি অন্তরং বন্ধদের কাছে তুলে দেয়। শত শত মেয়েকে তাঁরা এইভাবে ধরে নিয়ে এসে সম্ভোগ করেছে। জন্তু জানোয়ারের মতো পীড়ন করেছে।" লেখক এখানে কল্পনা করেছেন সেই সব অজানা মহিলা চরিত্রদের যারা কালযাত্রায় বারবার আটকে থেকেছেন। বাহিরবিশ্বের রাজামহারাজদের, ঘরের কাছে দাদা-ভাই-স্বামী-পিতাদের যুদ্ধে তাঁরা ম্রিয়মাণ উলুখাগড়া। পীড়ায় জর্জরিত মানুষজন কি আরো পীড়া চান, না মুক্তি? ব্যাথায় কাতর তাঁরা কি আরো কষ্টের জন্য লালায়িত হন? এই অধ্যায়ের শেষে দেখছি - এই সেমন্তিই আরেক নারী- দময়ন্তির প্রতিদ্বন্দ্বী। কিসের জন্যে? - বখতিয়রের প্রিয়পাত্রি হয়ে ওঠার জন্যে। "from the frying pan into the fire??" এই চরিত্রের শেষ যাচনা যদি এই হয়, সেটি সত্যিই অলস ভাবে কল্পিত। . পৃ ৩২৬ এ - তিব্বতফেরত এক যোদ্ধা - নুরু(আগের চরিত্র নরুন নয়) - ব্রহ্মপুত্র তীরে একটি মন্দিরের শিল্প সৌন্দর্যে অভিভুত। ক্ষুদা ও পিপাসায় জীর্ণ ব্যাক্তি আশ্চর্য হয় পাথরের কল্পিত দেব-দেবী-স্থাপত্যের সুষমায়। অথচ কয়েক মাস আগেই তাঁরা অসংখ্য মন্দির ও বিহার ধ্বংস করেছেন। হয়ত বা তখন তাঁরা যথাযথ খাদ্য ও পানীয় দ্বারা সুস্বাস্থ্য বজায় রেখেছিলেন - তাই এই সব অর্বাচীন ভাস্কর্য দেখে মোহিত হতে পারেন নি। হাতে আরো অন্য কাজ ছিল?
আমার পড়া সবচেয়ে নিম্ন মানের বই এর মধ্যে এই বই অন্যতম হয়ে থাকবে।
ঐতিহাসিক বিষয় আমাকে বেশ টানে সবসময় কিন্তু উনার লেখনীর মাঝে এক ধরণের ভাবগাম্ভীর্য ছিল,যেটা পড়ার গতি শুধুই কমিয়ে দিয়েছে।
আর যেভাবে নরুন আর সেমন্তির গল্পের গাথুনি ভাল দিয়েও পরিণতি কিছুই দেখান নি।ফোকাস বখতিয়ারে ছিল এইটা সত্য তবে যখন কোনো ঘটনা কে পাশাপাশি রেখে আগাবেন তখন দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বইটা প্রকাশ হবার আগে যে হাইপ ছিল সেটা থেকে কেনা হয়, কিন্তু কিছু ইতিহাস ছাড়া আসলে কিছু নাই বইয়ে। এই ইতিহাসের অনেক কিছু আমারা আগে থেকে জানি, ইখতিয়ার উদ্দিন বিন বখতিয়ার খিলজি কি ভাবে মারা যায় এইটা জানা যায় ভালো ভাবে।
উপন্যাসটা মূলত বাংলায় প্রথম মুসলিম শাসন নিয়ে আসা ঘুর সাম্রাজ্যের আফগান যোদ্ধা ইখতিয়ারউদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজিকে নিয়ে। এখানে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের সময়কার আবহ ভালভাবে ফুটে উঠেছে। নরুন এখানে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত বাংলার বৌদ্ধ সমাজের প্রতিচ্ছবি। সাধারণত আমরা লক্ষণ সেনকে যেরকম পলায়নপর ভীতু হিসেবে ভাবতাম এখানে দেখলাম তার পুরো উলটা ব্যাপার। পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ছিল লক্ষণ সেনের যুদ্ধক্ষেত্রের হিসাবের ভুল। শত্রুকে তিনি ঠিকমত বুঝতে পারেন নি। শত্রুকে বুঝতে না পারা পরবর্তী জীবনে বখতিয়ার খলজিরও পতনের মূল। ঐতিহাসিক উপন্যাসে অবশ্যই ম্যাপ দেয়া উচিত। ম্যাপের অভাবে ঘটনাক্রম বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল। বিশেষ করে ডুম্মন পালের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনা ও তিব্বত অভিজানের গতিপথ ক্লিয়ারলি বুঝা যাচ্ছিল না। আশা করি অগ্নি ট্রিলজির পরের দুইটা বইতে ম্যাপ থাকবে।
This entire review has been hidden because of spoilers.
“আমি কখনো ঘুমাই না। আমার ঘুম আসে না। দিবারাত্রি অষ্টপ্রহর ঘুমে কিংবা জাগরণে নিজেকে খুব ধীরে, খুব গোপনে তৈরি করছি আমি- যারা আমার রাজ্যপাট এবং আমার ঈশ্বর এবং প্রেমিকাদের চুরি করে নিয়ে গেছে- আমি তাদের বুকের পাঁজায় শানিত তরবারি ঠেসে দিয়ে স্বর্গীয় অপ্সরাদের চুম্বনের আনন্দ পাই- যেদিন আমার সত্যিকারের রূপ দেখবে- আমার মৃগচর্ম পরিহিত পাদুকাযুগলে চুম্বনের নেশায় লালায়িত হবে যাবতীয় কামাহত প্রেয়সীরা- আমি সেই প্রখর পুরুষ-“
প্রেম অথবা যৌনতা... নির্বাণ অথবা নৃশংসতা... জয় অথবা মৃত্যুর নদী পেরিয়ে কে হবেন যুদ্ধদিনের অগ্নিপুরুষ? বাংলার ইতিহাসের সেই অবিস্ময়রণীয় অধ্যায় নিয়ে রচিত প্রেম ও যুদ্ধ দিনের গল্পে আপনাকে স্বাগতম হে বন্ধু- হে প্রিয়-
বইটা ভালো। তবে অতটা ভালো না, যতটা শোনা গেছিলো। প্রপার এডিটিং জরুরী ছিল। লক্ষ্মণ সেনকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটা ভালো লাগেনি। পুরো বই 'বখতিয়ার' পক্ষপাতদুষ্ট।।
বাংলার ইতিহাস নিয়ে অনবদ্য একটি লেখা পাঠ করলাম। মুহম্মদ নিজাম এই সময়ের অন্যতম শক্তিমান লেখক। ইতিহাসের নির্বাক শবসমূহের মুখে আশ্চর্য প্রাণবন্ত একটি ভাষা তুলে দিয়েছেন তিনি। অগ্নিমঙ্গলের অপেক্ষায়!
* উগ্র অথবা আলফা টাইপ পুরুষদের গল্প অগ্নিপুরাণ। সেই সময় অল্প বয়সী মেয়েদের হাঁটে বাজারে বিক্রি করা হত। পরীমণির মতো বিউটিফুল একটা মেয়ের চাইতে বাজারে একটা ঘোড়ার দাম বেশি ছিল।
* হিন্দু রাজা বিজয়সেন ছিলেন একজন উগ্র হিন্দু। চারশ বছরের পাল শাসনের অবসান ঘটে তাঁর হাতে। বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় ভিক্ষুদের হত্যাও তাঁর হাত রয়েছে।
* রাজপুত্র নরুন এক উগ্র বৌদ্ধ। মন্দিরের ভেতর থেকে যাবতীয় হিন্দু দেব-দেবী সরিয়ে ফেলতে চায়। ভাঙচুর ও ধ্বংস লীলা চালাতে চায়।
* বখতিয়ার এক উগ্র মুসলিম যোদ্ধা। শুধুমাত্র সম্পদের লোভে বিভিন্ন জমিদারি মহালে আক্রমণ ও লুণ্ঠন চালায় সে।
* বখতিয়ার একটা বিস্ময়। জীবনে একশটা লাত্থিগোত্তা খেয়েও কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, সামান্য এক মুটে-মজুর থেকে সুবিশাল সৈন্যদল গড়ে তুলা। একের পর এক রাজ্য জয়-
* মহারাজ লক্ষণসেন একটা বিস্ময়। একজন সত্যিকারের জ্ঞ���নী মানুষ। ভালো মানুষ। ভালো মানুষ বলেই হয়ত, প্রেমে তিনি ব্যর্থ। এই পৃথিবী ভালো মানুষ খায় না, তরবারি খায়-
* রাজপুত্র নরুন একটা ফিনিক্স। আগুনে পুড়ে পুড়ে আলো হয়ে ফিরে আসবে সে। পুরনো পিতাদের জাত- যজ্ঞ – পদচিন্ত মুছে ফেলে সম্পূর্ণ নতুন পরিচয়ে- নতুন এক আযানের ধ্বনি নিয়ে ফিরে আসবে সে- নরুনের জন্য শুভকামনা-
* নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শুকপতি রাজা হবার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রেমিক হয়েছে। থেকে আটশ বছর আগেও মানুষ এতটা স্মার্ট ছিল, তাঁদের আধ্যাত্মতিক কিংবা যৌন অনুভূতি একটা সরস ছিল- কখনো ভাবতে পারি নি। শুকপতির আমাকে সিদ্ধ করেছে।
* বঙ্কিম চন্দ্রের মতো অনেক হিন্দু লেখকের দৃষ্টিতে বখতিয়ার শুধুই একজন দস্যু। একজন খুনী। অন্যদিকে কতিপয় অতি মুসলিমপন্থীর ভাষ্যমতে বখতিয়ার অতিমাত্রায় ভালো মানুষ। এতদিন এই জানতাম। অগ্নিপুরাণ পড়ে নতুন কিছু অনুভব করলাম। অগ্নিপুরাণের বখতিয়ার একজন যোদ্ধা। কুৎসিত চেহারা আর দারিদ্র্যের কারণে বারে বারে বঞ্চিত হচ্ছিল। কিন্তু সে হাল ছাড়ে নি। অদম্য সাহস আর কব্জির জোর খাটিয়ে "Survival of the fittest"এ সে নিজেকে চূড়ায় নিয়ে গেছে।
* লক্ষণসেন এতকাল শুধুই একটা নাম ছিল। অগ্নিপুরাণ পড়ার সময়ে সবচেয়ে বেশি শান্তি পেয়েছি রাজপুত্র লক্ষণ ও তন্দ্রাবতীর প্রেমে। সবচাইতে অবাক হয়েছি তাঁর দীর্ঘ বিস্তৃত জীবনের উত্থান-পতন দেখে।
* সম্রাট হুমায়ূনের পর বাংলা সাহিত্যে আকবর বাদশার মূখর পদধ্বনির আওয়াজ পাচ্ছি। মুহম্মদ নিজাম- শুভকামনা আপনার জন্যে। এই রকম দারুণ দারুণ বই দিন আমাদের। আপনি পারবেন। আপনি পেরেছেন।
গল্পটা আজ থেকে আটশো বছর আগের। গল্পটা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির। গল্পটা সেন বংশের রাজার লক্ষ্মণসেনের।
ঐতিহাসিক চরিত্রের সাথে কাল্পনিক চরিত্রের একটা দারুণ কম্বিনেশন লেখক ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন, সেটা হোক কেন্দ্রিয় চরিত্রগুলো অথবা নরুনের মতো ইতিহাসের পৃষ্ঠে হারিয়ে যাওয়া কোনো ক্ষুদ্র চরিত্র। লেখক দাবি করেছেন- বইটি রচনা হেতু শিলালিপি, টেরাকোটা, মুদ্রা, প্রাচীণ গ্রন্থ এসবের নির্দেশনা গ্রহন করেছেন। তার কথা রক্ষিত হয়েছে আবার কিছু কিছু জায়গায় খর্বিতও হয়েছে। উপন্যাসে সেই সময়ের সাথে শব্দসমষ্টির যথাযথ সামঞ্জস্যতা রাখা হয়নি। পুরো গল্পে এটা কয়েকবার চোখে পরেছে। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাও উঠে এসেছে লেখায়। সেটা লেখক ডুম্মন এবং আচার্যের পরিচয় হেতু বর্ণনা করেছেন। কিন্তু নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের লুন্ঠন ব্যপারটা লেখক কেমন যেন এড়িয়ে গেলেন। ওদন্তপুরী আর বিক্রমশীলা মহাবিহারের তান্ডব বর্ণনায় তিনি কেবল ঐতিহাসিক মিনহাজের বয়ান বর্ণনা করেছেন।
লক্ষ্মণ সেন এবং বখতিয়ার খলজি দুইজনই উপমহাদেশের আলোচিত দুইচরিত্র। দুইজনের কাউকেই লেখক খলনায়কের দৃষ্টিতে উপস্থাপন করেন নি। এটা লেখকের একটা বিশেষ সূক্ষ্মতা। তবে পুরো বইটা পড়ার পর কেমন যেন একটা সেটিশফেকশন আসছিলো না। এর কারণটা হয়ত লেখকের কাহিনী বর্ণনা নিয়ে। যেমন লেখক বখতিয়ারের নদীয়া দখল এটার আরো বিস্তৃত বর্ণনার প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে লক্ষ্মণসেনের সাথে ডুম্মনের যুদ্ধ লেখক ফলাওভাবে বর্ণনা করেছেন। তবে এইখানটায় এসে কাহিনী বুঝতে যেথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে যদি এর সাথে ম্যাপ দেয়া হতো তাহলে বিষয়গুলো আরো সুন্দরভাবে ফুটে উঠত। বখতিয়ার খলজির তীব্বত আক্রমনের ব্যপারটাও খাপছাড়া মনে হয়েছে এবং খুব দ্রুতই যেন শেষ হয়ে গেছে। তীব্বতের ব্যপারটা অতিরিক্ত মেদ ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছেনা আমার কাছে। শব্দ বিন্যাস আরেকটু ভালো হওয়ার দরকার ছিল। আরেকটা কথা একটু বলার আছে সেটা হচ্ছে প্রেম এবং যৌনতা। গল্পের কিছু কিছু জায়গায় মনে হয়েছে বস্ত্র খোলার চাইতে রোমান্টিকতা ধরে রাখাটাই প্রয়োজন ছিল। সবকিছু মিলিয়ে বইটা ভালোই বলব, যেহেতু হিস্টোরিক্যাল ফিকশন সেহেতু পাঠকের আগ্রহের জায়গাটাও থাকবে পরিপূর্ণ, যার ফলে পুরো গল্পটা পড়তে গিয়ে ক্লান্তি আসবে না।
পাঠক হিসেবে প্রথমবারের মতন মোঃ নিজাম এর বই কিনলাম. বইয়ের প্রথমটা যেভাবে শুরু করেছেন আগ্রহ বাড়িয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট. লক্ষণ সেন কে একদম আমাদের সামনে আমাদের মত সাধারন মানুষের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন, যিনি কিনা সৈমন্তীর মাথায় হাত বুলিয়ে দুষ্টুমির ছলে বলেন তোমার রাজপুত্রের মত বর হবে চুপটি করে লুকিয়ে রাখবে কিন্তু। প্রেম যুদ্ধ অমোঘ সত্য, যুদ্ধের মতো প্রবল বিগ্রহ যেখানে থাকবে, প্রেমের মতো তীব্র আবর্তন সেখানে থাকবে। তাতে মাঝেমধ্যে দ্বিধায় পড়ে গেল পড়ে যেতে থাকবেন। ইতিহাস প্রসঙ্গে কিছু বলতে পারব না থাকতেও পারে তবে পুথি গান কেচ্ছা থেকে প্রসঙ্গ নিয়েই গল্প উপন্যাস। গল্পের পরতে পরতে যদি একশন চান তাহলে আশাহত হবেন। সোহরাব-রুস্তমের মত নয় তার মতোই ঐতিহাসিক ভিত্তি করে রচনা করেছেন। লক্ষনসেনের শুরু থেকে শেষ, বখতিয়ার এর শুরু থেকে শেষ। নরুনেরএর উত্থান, সন্দিহান ছিলাম তবে তাকে যেভাবে অতি দ্রুত দেখানো হয়েছে হয়তো ইতিহাসে, তা আরো বড় হতে পারত তবে আমাদের মূল নায়ক নরুন ছিলেন না। আসলেই দুনিয়া বড়ই অদ্ভুত। যখন আসতে থাকে তখন এর মূল্য আমরা বুঝি না, আরো চাই। আর যখন মুখ ফিরে চাই আর যখন হঠাৎ আঘাত আসে বিপদ প্রসন্ন হয়ে যায়, তখন ভাগ্যের দোষ দেই। দুই পক্ষের দিক থেকে দেখলে একপক্ষের যেমন ভাগ্য খারাপ বলেই তো অপরপক্ষের ভাগ্য ভালো হয়। এর একটি উদাহরণ, বা আসলেই বাস্তব জগতে এটা দেখা যায়। আরো অনেক ভালো লেখা যেত। ইতিহাসিক ঘটনা গুলো অনেক সুন্দর চিত্রায়ন করা যেত। তবে ঘরগুলো মাঝেমধ্যে আদিম অসংযত ছিল। খারাপ না প্রচেষ্টা হিসেবে খারাপ না, ভালো গল্প। ভালো চেষ্টা আর তার বই নিয়ে আসলে ফেসবুকে যাবে প্রচার হয়েছে লেখক সামনের দিনে এরকম আরো অনেক উপন্যাস উপহার দেবেন আশা করছি।
চরিত্র গুলোর গঠন খুব ই দুর্বল। বেশ কিছু চরিত্র আছে, যাদের ছেঁটে ফেলে দিলেও উপন্যাসের কাহিনীর কোনরূপ পরিবর্তন হবে না। কিছু কিছু জায়গা সুখপাঠ্য অস্বীকার করবো না, তেমনি কিছু কিছু জায়গা যে যাত্রাপালাতে পরিণত হয়েছে সে কথাও লুকাবোনা। বখতিয়ারের প্রতি কিছুটা বায়াসড মনে হয়েছে লেখককে। উপন্যাসের বড় এক জায়গা জুড়ে ছিল নরুন নামক এক চরিত্র। কিন্তু এই চরিত্রের সার্থকতা আমি বুঝে উঠতে পারিনি।
এইবার প্রকাশকের কথায় আসি, একুশের বইমেলা ২০২০ এ যখন কিনতে গেলাম, স্টলে জিজ্ঞেস করলাম বইয়ের দাম বেশি কেন? বলা হলো বাঁধাই ভাল, কাগজ ভাল, যত্ন নিয়ে বানানো। মেনে নিয়ে কিনলাম। বই পড়ার মাঝে এসে দেখি ১৭৬-১৯২ পৃষ্ঠা অনুপস্থিত। এইসব ব্যাপারে একটু যত্নশীল হলে সবচেয়ে ভাল হয়। পৃষ্ঠা যদি নাই হয়ে যায় তবে বাঁধাই এবং কাগজের মানে পাঠকের কিছু যায় আসে না। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই যে বিরতি তাতে আমার কাহিনী বুঝে উঠতে কোন সমস্যাও হয়নি।