বাংলা সাহিত্যের আধুনিক আঙিনায় রহস্য-রোমাঞ্চ ও অপরাধকে উপজীব্য করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার দীপ্ত ফসল, 'বৃশ্চিক'। ঋজু গাঙ্গুলীর এই মানসকন্যাটির নাম শুনছি অনেকদিন। বছরের পর বছর, একের পর এক খন্ডে, এপার বাংলার নবীন-প্রবীণ লিখিয়েদের সমন্বয়ে অন্ধকারের এক সরেস মিলনমেলা এই সিরিজ। আমি লেট টু দ্যা পার্টি যথারীতি। পড়বো পড়বো করে, কোনোটাই আর পড়া হয়ে উঠছিলো না।
শেষমেশ, ষষ্ঠ খন্ডের পর টনক নড়ে ওঠে। 'শুরু থেকে শেষ' কি 'শেষ থেকে শুরু'র বিবাদে না ফেঁসে, কতকটা তাড়াহুড়োয় এই খণ্ডটি কেনা। তবে, সেও প্রায় বছরখানেকের হিসেব। এই মেলাতে সিরিজের সপ্তম খন্ড বেরোচ্ছে। সেই দেখেই বুঝি আমার বইটা শেলফ থেকে অসন্তুষ্টি ও কটাক্ষের বন্যা বইয়ে দিল। অগত্যা...
এসব সংকলন নিয়ে বসলে, কোনো অ্যান্থলজি ক্রাইম শো দেখার অনুভূতি হয়। চোদ্দটা গল্প, যেন চোদ্দটা এপিসোড। ডিরেক্টরের চেয়ারে আসীন লেখক-লেখিকা। স্ক্রিনপ্লে, স্টোরি ও বিন্যাস, সবটাই তাদের হাতে। আমিও বেশ সময় নিয়ে সবটা পড়লাম। প্রতি রাতে একটা কি দুটো এপিসোড। মন জানে, এ জিনিস, বিঞ্জ-ওয়াচের খোরাক নয়। প্রতি গল্পের অন্তরে প্রোথিত অন্ধকারের নির্যাস। যা উপভোগ করার জন্য দরকার সময়। সময় ও ধৈর্য। যার পরিবর্তে বইটি আপনাকে হতাশ করবে না, বলেই আমার বিশ্বাস। আর যদি করেও ফেলে... জানেনই তো, ইনভেস্টমেন্ট ইস সাবজেক্টিভ টু মার্কেট রিস্ক :)
সংকলনের নিয়ম অনুযায়ী সব গল্পই সমান নয়। কিছু ভালো জমাটি থ্রিলার ('বালির রঙ লাল', 'জাজমেন্ট ডে', 'আয়ুধ')। কিছু অলৌকিকের কালচে দংশন ('অমৃত', 'কাল', 'মৃত্যুহীন প্রাণ')। একখান চমৎকার পৌরাণিক রহস্যকথন ('সারস্বত') ও একটি দারুন শার্লক প্যাস্টিশ ('লক্ষণ')!
এসবের মাঝেই, কিছু লেখা প্রেডিক্টবল, তবুও পড়ে যেতে হয় লেখনীর টানে ('ফোবিয়া')। আবার কোনও গল্প ভোগে বিশ্রী অতিকথনের দোষে ('সবুজ অসুখ'), শিশুতোষ গদ্যে হারিয়ে যায় গোয়েন্দাগিরির রোমাঞ্চ ('সজ্জিত গরল')। বইয়ের দুর্বলতম হিসেবে শনাক্ত করা যায় 'রয়েছ দাঁড়ায়ে' ও 'স্তম্ভন' নামক গল্পদুটিকে। সাবলীল ভাবে শুরু হয়েও, প্রথমটি ডোবে কার্টুনিশ পরিণতির অধীনে। দ্বিতীয়টির ভরাডুবি, গুরুগম্ভীর লেখনী ও ওভারস্মার্ট ঘটনাপ্রবাহের চাপে। লেখকের লেখা আগে পড়া হয়নি। আক্ষেপ, তন্ত্রের ফাঁপা হুঙ্কার বাঁচাতে পারে না কর্ণ শীলের এই কাহিনী।
এছাড়াও ভালো লাগে, অর্ক পৈতন্ডি অঙ্কিত সুন্দর হেডপিসগুলো। শুধু, ওনার বঙ্গীকৃত গল্পটি ('নীরব') খুব একটা জমে না, এই যা। বইটির পাঠ অভিজ্ঞতা, আরেকটু সজাগ সম্পাদনা ও দরকারি কাটছাঁটে সমৃদ্ধ হতো, বলেই আমার ধারণা। তবুও, একান্তই ব্যক্তিগত মতামত, তাই সাড়ে তিন তারা সই। সিরিজের অন্য বইগুলো পড়বো কি না, সেটা সময় বলবে। আপাতত আসি।
রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনির একটি অনন্য সংকলন হল বৃশ্চিক। এর আগের দুটি খন্ডও আমার খুব পচ্ছন্দের.. তবে এখন এর তৃতীয় খন্ডের গল্পগুলোকে নিয়ে অল্পবিস্তর আলোচনা করা যাক।
১. বালির রঙ লাল.. বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী : মরুভূমির বুকে একটুকরো প্রাণের স্পর্শ নিয়ে আলগোছে পড়ে রয়েছে একটি ছোট্ট শহর, ঘুঙ্ঘর। এর আশপাশ থেকে বেশ কয়েকজন মানুষই কর্পূরের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। কী হয়েছিল তাদের? গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাশি অরোরা কী পারবে সেই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজ করতে? চমৎকার ওপেনিং। অনেক ধরণের সম্ভাবনা কে জাগিয়ে রেখে যেভাবে গল্পটিকে দিশা দিয়েছেন ও পাঠকদের দিশাহারা করেছেন লেখিকা তারজন্য ফুল মার্কস।
২. নীরব.. অর্ক পৈতন্ডী : এই পুঁচকে গল্পটি আমায় বেশ বড়োসড়ো ধাক্কা দিয়েছে। ছোট্ট পরিসরে মানবমনের অন্ধকারের এমন অদ্ভুত গল্প সচরাচর পড়া হয় না। এক কথায় অ..সা..ধা..র..ণ..!!
৩. জাজমেন্ট ডে.. মেঘা চ্যাটার্জি : পৃথিবীর শেষ সময় আসন্ন.. কিভাবে? কার বা কাদের থেকে? বাঁচার কী কোনো রাস্তাই নেই? থাকলেও সেটা কী? টিজার নয়.. বরং গল্পটি পড়তে পড়তে যে প্রশ্নগুলো উঠে এসেছিল আমার ভিতর থেকে সেগুলোই মেলে ধরলাম আপনাদের সামনে। এবার উত্তরের খোঁজে এগিয়ে যান গল্পটির দিকে। এই বহুস্তরীয় গল্পটি এরকম কর্কটকালে একেবারে মাস্ট রিড।
৪. অমৃত.. তমোঘ্ন নস্কর : অভিজ্ঞতার পুঁজি যাদের ঝুলিতে রয়েছে.. তারা যে কোনো আসর তাদের গল্প দিয়ে জমিয়ে দিতে পারে। এমনই একজন হলেন শ্রীশচন্দ নারায়ণ। নাতি নাতনিদের সামনে তিনি সেই ঝুলি থেকে নানান বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা বের করে আনেন। ভয়ের নয় বরং ভয়ের আবহ তৈরি করে গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ, প্রাচীন উপাচার ও এক লৌকিক দেবীর ক্রোধের গল্প শুনিয়েছেন লেখক। তারিণীখুড়ো কে পছন্দ হলে শ্রীশচন্দ নারায়ণকেও আপনার ভালো লাগতে বাধ্য। তার ঝুলির অন্যান্য গল্প শোনার জন্য আমি এখন থেকেই ইট পেতে রাখলুম।
৫. ফোবিয়া.. অমৃতা কোনার : "নকল হইতে সাবধান" এর পর আবার এই গল্পে হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টের অফিসার ইন্দ্রজিৎ রায়ের দেখা পাওয়া গেল। এবারেও শহরে কয়েকটি অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত। অস্বাভাবিক বলার কারণ.. প্রতিটা মৃত্যুই কোনো না কোনো ফোবিয়ায় দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। শুধু তাই নয়.. তদন্তে উঠে এসেছে এই ফোবিয়া জনিত সমস্যাগুলি সম্প্রতি তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল.. আর তারপরই... যাই হোক.. মৃত্যুগুলো কি সত্যি স্বাভাবিক নয়? না হলে, এর পিছনে কে আছে এবং তার মোটিভটিও বা কী? সত্যি বলতে, কী হতে চলেছে বুঝতে পারলেও দুর্দান্ত পরিবেশনার জন্য এই গল্পকে আমি ছাড়তে পারিনি।
৬. কাল... কৌশিক সামন্ত : ঐতিহ্যবাহী অনেক কিছুই হারিয়ে গেলেও নরেন্দ্রনারায়ণ তার পিতামহের আমলে শুরু হওয়া মাছ ধরা তথা দিঘিকে পরিচ্ছন্ন করার উৎসবটিকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। তা সেইবার জেলেদের জালে উঠে আসে মুখ সিল করা একটা বিশাল ধাতব ঘড়া। গুরুদেবকে না দেখিয়ে তা খোলা ঠিক হবেনা বুঝতে পেরে তিনি সেটিকে সবার চোখের আড়ালে সরিয়ে রাখেন। কিন্তু হায় রে অদৃষ্ট! তার স্ত্রী উমা লোভের বশবর্তী হয়ে সেই ঘড়ার সিল খুলে ফেলায় তাদের জীবনে নেমে আসে ভয়ংকর এক অভিশাপ। সেটা কী? তার থেকে মুক্তি কি আদৌ সম্ভব? নাকি কালের গর্ভে বিলীন... যাক গে, আর কিছু বলব না.. তবে শুধু বিদেশি নয় দেশীয় এলিমেন্টে ভয় দেখাতেও যে লেখক সিদ্ধহস্ত তা এটা পড়ে আমি ভালোমতন বুঝে গেছি।
৭. রয়েছ দাঁড়ায়ে.. আত্রেয়ী দত্ত : প্রতিশোধের জন্য মানুষ কতদূর যেতে পারে বা কতটা নীচে নামতে পারে? এটা বলা মাত্রই নিউজপেপার, সিনেমা, ওয়েব সিরিজে দেখা অজস্র ঘটনা মস্তিষ্কে এসে ভীড় করছে জানি.. এই গল্পটাও এমনই এক নৃশংস প্রতিশোধের... যার আগুন যুগের পর যুগ ধরে জ্বললেও নিভবে না। সেই আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলে পুড়ে ছারখার হতে থাকবে কিছু জীবন.. অন্ততকাল ধরে..। প্লট খুব ভালো। কিন্তু গল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ছোট্ট ছোট্ট মোচড় দিয়ে পাঠকদের চমকানো আর ইতিহাস���র একটি ছোট্ট ঘটনাকে লিঙ্ক করে...লেখিকা গল্পটিকে অন্য লেভেলে নিয়ে গেছেন।
৮. সারস্বত.. চয়ন সমাদ্দার : মার্ডার মিস্ট্রি আমার পছন্দের টপিক.. এই গল্পকেও সেই ট্যাগে ট্যাগানোই যায়.. তবে আমার কাছে এই গল্পটা তারচেয়েও স্পেশাল হয়ে থাকবে। যদি বলেন কেন? তাহলে শুধু এটুকুই বলব, হাজার হাজার বছর আগের এক সত্য অন্বেষণও স্থান পেয়েছে এই গল্পে.. যা পড়ে আমি স্পেলবাউন্ড।
৯. সজ্জিত গরল.. ইপ্সিতা মজুমদার : গোয়ার ভয়ানক কেসটার পর ক্রিমিনাল সাইকোলজির স্টুডেন্ট অহনাকে আবার পাওয়া গেল এই গল্পটিতে। অহনার বন্ধু তিয়াসার বিল্ডিং এর একটি বছর আটেকের বাচ্চা তিনদিন ধরে নিখোঁজ। প্রথমে কিডন্যাপিং মনে হলেও তিনদিন পর দিল্লিগামী হাইরোডের পাশের একটা পুকুরে একটি বড়ো স্যুটকেশে তার লাশ পাওয়া যায়.. অ্যাবিউজড অ্যান্ড মার্ডারড। কে, কেন ফুলের মতো মেয়েটির এই অবস্থা করল.. তা জানতে অহনার সাথে সফরটি কমপ্লিট করতে হবে। এখানে বলে রাখা ভালো.. এটিকে মার্ডার মিস্ট্রি হিসেবে খুব বেশি পয়েন্ট আমি দিতে পারব না। টিকলির মায়ের মতো আমিও বলব খুব সহজেই...... যাই হোক...গল্পটা পড়ে সিরিয়াসলি ভয় পেয়েছি। বাস্তব অথচ সমাজের কালো দিকটা দেখতে কে চায় বলুন... আমার মনে হয়, লেখিকা ওইদিকটিই আমাদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
১০. স্তম্ভন.. কর্ণ শীল : গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে একের পর এক শিশু। কোথায় যাচ্ছে তারা? কার লোভের শিকার হচ্ছে? এই লোভের অন্ধকার কী কখনও কাটবে? নাকি সে গ্রাস করতে থাকবে একের পর এক নিস্পাপ প্রাণ? ক্ষমতার লোভে মানুষ অন্ধ হয়ে সব সীমাই অতিক্রম করতে চায়.. এই গল্পেও সেরকম ঘটৈছে। মুশকিলটা হচ্ছে এযাবৎ তন্ত্র আর পিশাচ নিয়ে একের পর এক গল্প পড়তে পড়তে বদহজম হয়ে গেছে। ভয় পাচ্ছিলাম এক্ষেত্রেও সেইটা হতে চলেছে.. কিন্তু তন্ত্র থাকলেও তার বিভৎসতা দিয়ে এখানে গল্পের তড়ি পার করা হয়নি.. তাই গল্পটি আমার বেশ ভালোই লেগেছে।
১১. সবুজ অসুখ.. দোলা দাস : একটা টাইমে উনিশ কুড়ি ম্যাগাজিন বের হলেই তার গল্পগুলো গোগ্রাসে গিলতাম। কেননা সেখানে আমাদের গল্প থাকতো। আর সেই সময়ে আমাদের গল্পগুলো যিনি অবলীলায় বলে যেতেন তিনি আর কেউ নন একমেবাদ্বিতীয়ম স্মরণজিৎ চক্রবর্তী। এই গল্পটি শুরু করতেই যেন পুরানো সেইসব ফ্লেভারগুলো হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল...এমনকি স্মরণজিৎ চক্রবর্তীও তার গদ্য আর পদ্যের কিছু অমূল্য সৃষ্টি নিয়ে চলে এলেন...ফলে, তরুণ প্রজন্মের কয়েকজনকে চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে দেখলাম। তাদের আনন্দ দুঃখ সবকিছুই বড্ডবেশি আপন মনে হতে শুরু করল.. তারপরই লোডশেডিং এর মত ঝুপ করে একটা খুন হয়ে গেল। "গভীরে যাও' -র মত করে তার তদন্ত শুরু হল.. আগাথা ক্রিস্টিময় পরিবেশ সৃষ্টি করে রহস্যভেদও হল.. আর আমিও লেখিকার উদ্দেশ্যে খটাশ করে একটা স্যালুট ঠুকে দিলাম। দুর্দান্ত মার্ডার মিস্ট্রি।
১২. মৃত্যুহীন প্রাণ.. মিথিল ভট্টাচার্য : এই গল্প নিয়ে কিছু বলতে গেলেই স্পয়লার হয়ে যাবে... তবুও টিজারের খাতিরে এটুকুই বলব.. ইতিহাসের কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকদের মধ্যে একজনের দেখা পাবেন এখানে বা বলা ভালো তার চোখ দিয়েই দেখবেন গোটা গল্পটাকে..কিছুটা অন্যভাবে। আমার বেশ লাগলো।
১৩. আয়ুধ.. অনুষ্টুপ শেঠ : এই গল্পের দুটি পার্ট আছে। প্রথম পার্টে, পায়েল নামের একজন অভিনেত্রীকে যৌন হেনস্থার শিকার হতে হয়। দ্বিতীয় পার্টে, ঘৃণ্য কাজটি যে করেছে তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া হয়। বুঝতেই পারছেন প্লট প্রেডিক্টেবল। কিন্তু তাও পড়তে ভালো লাগে দুটো কারণে.. ক. এই নোংরা মানুষগুলোকে সাজা পেতে দেখলে শান্তি আসে। খ. সাজাটা দেওয়ার পদ্ধতি আর তার পিছনে জড়িয়ে থাকা এক ইতিহাস।
১৪. লক্ষণ.. ঋজু গাঙ্গুলী : উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এক কিম্ভুতকিমাকার এলিমেন্টই হচ্ছে এই গল্পের মূল উপজীব্য। আর এর সাথেই রিলেটেড এক খুনের তদন্ত গিয়ে পড়ে হোমসের ওপর। হোমসিয়ান ব্যাপার স্যাপারগুলো এখানে না পাওয়া গেলেও এর প্লটের গভীরতা আমায় রীতিমতো নাড়িয়ে দিয়েছে। এক্সিলেন্ট ফিনিশিং!
অর্ক পৈতন্ডীর করা প্রচ্ছদ ও অলংকরণ প্রতিবারের মতই চমৎকার হয়েছে। আমার মনে হয় না আর কিছু বলবার দরকার আছে। হাইলি রেকমেন্ডেড। অবশ্যই পড়ুন। নমস্কার!