বাংলা বইয়ের জগতে ব্যোমকেশ-কে কেন্দ্রে রেখে প্যাস্টিশ লেখার স্বাধীনতা না থাকা নিয়ে আক্ষেপ অনেকদিনের। আমি নিজেও ভেবেছি, মধ্যবিত্ত বাঙালির সবচেয়ে আইকনিক হিরোকে নিয়ে কেন এই প্রজন্মের শক্তিশালী লেখকেরা লিখবেন না? আজ একটা কথা বুঝলাম। এই আই.এস.বি.এন বর্জিত, অচিরেই কালের গর্ভে তলিয়ে যাওয়া ধর-তক্তা-মার-পেরেক পেপারব্যাক যা করেও ব্যোমকেশের খুব একটা ক্ষতি করেনি, কপিরাইট উঠে গেলে আরও অনেকে মিলে সেটা করে আমাদের জীবনে অন্ধকার নামিয়ে আনতে পারে। সেটা কী? চরিত্রহনন। প্যাস্টিশ লেখার নামে এই উপন্যাস আমাদের অতি প্রিয় তিনটি চরিত্রের অকারণ অবমাননা করেছে। সেই তিনটি মানুষ এই কাহিনিতে এমনভাবে এসেছেন যা পড়ে মনে হয়, কেন? কী অপরাধ করেছিলেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর সৃষ্ট এই চরিত্ররা, যেজন্য এই ভ্রষ্ট প্রয়াসের শিকার হতে হল তাঁদের? এই কাহিনিতে নিম্নবিত্ত জীবনের ঘিনঘিনে দশা লেখক যেভাবে ফুটিয়েছেন তাতে মনে হয়, তাঁর আরেকটি 'বারো ঘর এক উঠোন' লেখার সাধ ছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য, তিনি সেদিকে না এগিয়ে অন্যদিকে এগিয়েছেন। ডিকনস্ট্রাকশন করে আইকনিক চরিত্র নিয়ে কেমন প্যাস্টিশ লেখা যায়, তা আমি অল্পবিস্তর জানি। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই কাহিনির লেখক শুধু ভাঙতেই জানেন। এর চেয়ে কম দামে এর চেয়ে অনেএএএএক ভালো বই পাবেন। এটা বিষবৎ পরিহার্য।
বইটি বেশ ভালো লাগল। প্রথম থেকে সুন্দর করে গল্পের প্লট সাজানো। মাঝে গিয়ে একটা টুইস্ট। তারপর একদম শেষে গিয়ে দুমাদুম তিন চারটে টুইস্ট একের পর এক। ব্যোমকেশ কে কেন্দ্র করে এমনি গল্প লেখা যেতে পারে তা কল্পনাতীত। 😮 ১৫৬ পাতার বই তাই একদিনেই শেষ করে ফেলেছি। ৮২ পাতার পর থেকে বই থেকে মুখ তুলতে পারিনি। কেউ পারবে বলেও মনে হয়না। 🥰 গল্পের রহস্যের কেন্দ্রটা খুব বেশি চাঞ্চল্যকর না হলেও লেখার গুনে তা বেশ সুখপাঠ্য হয়েছে। 🧐 বইয়ের সবই ভালো শুধু একটা জিনিস বাদে। লেখক পরিবেশ বর্ণনায় বেশ পটু তবে কিছু ক্ষেত্রে তা অতিরিক্ত মনে হয়েছে।🥱🥱
সময়টা ১৯৯৮... খ্যাতনামা লেখক 'নবীন পাঠক' তার নিজস্ব ভুবনে শিল্প সাধনায় আত্মমগ্ন ছিল। কিন্তু হুট করে আসা একটি ফোন তার সমস্ত চিন্তাভাবনা কে ঘেঁটে দেয়। এখন প্রশ্ন হলো ফোনটি কে করেছিল? কোনোরকম ভনিতা না করেই বলি, ফোনটা করেছিল অজিত! অজিত বন্দোপাধ্যায়। ভ্রু কুঁচকে লাভ নেই, আপনি ঠিকই ধরেছেন.. সেই শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই ব্যোমকেশ বক্সী আর সেই তাদের অজিত। যাক গিয়ে.. তা তিনি ফোন করে বললেন, ব্যোমকেশ কে নিয়ে কিছু জরুরী কথা আছে যা তিনি আমাদের অর্থাৎ নবীন পাঠক কে জানাতে চান। তাকে নিজের বর্তমান ঠিকানাটুকু দিয়েই তিনি ফোন রেখে দেন। ফোনের ওপাশের ব্যক্তিটি হয়তো কোনো ঠকবাজ, তাকে কোনোরকম ফাঁদে ফেলতে চায়- এরকম নানাবিধ আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও কৌতুহলের মোড়কে মুড়ে আসা ফোনকল টি তাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেয়না। অগত্যা কৌতুহলের নিরসন করতে সেদিনই সে সটান হাজির হয় সেই ঠিকানায়। নবীন কে পেয়ে অজিতও তাঁর গল্প শুরু করলেন। ২৮ বছর আগের অসমাপ্ত "বিশুপাল বধ" কেসটিতে ফিরে গেলেন তিনি। তবে এখানে বলে রাখা দরকার, গল্পটি কিন্তু ওই কেসটিকে নিয়ে নয় বরং ব্যোমকেশ সত্যবতী ও অজিতের জীবনের একটা না- দেখা , অজানা দিক কে নিয়ে। বিশ্বাস করুন, সেটা দেখতে একটুও ভালো লাগছিলো না। শুধু মনে হচ্ছিল, মুদ্রার ওপিঠ টা দেখানোর আদৌ কি লেখকের কোনো দরকার ছিল? এইসব ভাবতে ভাবতে ৭৪ পেজ পর্যন্ত গেছি এমন সময়ই ঘটে যায় অপ্রীতিকর ঘটনাটি.. ব্যোমকেশের মৃ..( টাইপ করাও কষ্টকর) ... বুঝতেই পারছেন নিশ্চয়ই.. তবে এই ধাক্কা সামলানোর আগেই আরো কয়েকটি প্রশ্ন এসে হাজির হবে আপনার সামনে.. স্বাভাবিক মৃত্যু না খুন? যদি খুন-ই হয়ে থাকে তবে কে, কিভাবে করল? এর সমাধান-ই বা কে করবে? অজিত? সত্যবতী? নবীন? নাকি অন্য কেউ?? এবার এইসমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে স্বাভাবিকভাবেই আপনাকে পুরোটা পড়তে হবে, তাই না? কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেতে যেতে যদি দেখেন আপনার প্রশ্নগুলোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাল্টে যাচ্ছে, কেমন হবে বলুন তো? বুঝলেন না তাই তো?? আমি আর কিছু বলব না। বাকিটা আপনারাই পড়ে বুঝুন। শেষমেশ কয়েকটা পয়েন্ট শুধু তুলে ধরতে চাই..
ক. প্রথমদিকে আমার মনে হয়েছিল, গল্পটিকে অযথা টেনে লম্বা করা হয়েছে। কিন্তু গল্পটি শেষ করার পর বুঝলাম গল্পটির সাথে একাত্ম হতে প্রথম ৭৩ পেজের একটা বিশাল ভূমিকা আছে।তাও বলব.. আরেকটু কমপ্যাক্ট করা যেত।
খ. মানব-মনের জটিলতাই হচ্ছে এই উপন্যাসটির ভিত। আর মানব মন তো এমনিতেই শত শত রহস্যের এক ধুম্রজাল। তাই গল্পের কিছু চমক বা টুইস্ট আপনার কাছে অবাস্তব বলে মনে হতেই পারে। তবে ওই যে বললাম, বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করে মৌলিক গবেষণা করা যায় বটে, তবে মানব মনের গতি কোনও বিজ্ঞানের সূত্র মানে না।
📝 বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ‘আইকনিক’ চরিত্রটিকে নিয়ে এইরকম একটি কাহিনী রচনার সত্যিই কোনো প্রয়োজন ছিল কি ? পড়তে পড়তে রীতিমতো শিউরে উঠেছি, এটা কি পড়ছি !!!
‘ব্যোমকেশ খুন’ উপন্যাসে লেখক শুধু ব্যোমকেশকে নয়, বরং তার সাথে সত্যবতী এবং অজিতের চরিত্রগুলিকেও খুন করেছেন সুনিপুণভাবে । ‘ব্যোমকেশ’ কাহিনীগুলির একটি মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যোমকেশ-সত্যবতী-অজিতের সম্পর্ক, যা উপন্যাসগুলিকে আলাদা মাত্রায় নিয়ে যেত । কিন্তু এখানে যেভাবে চরিত্রগুলিকে উপস্থাপিত করা হয়েছে, তা ভীষণ বেদনাদায়ক ।
📝 লেখকের লেখার হাত ভালো, এটা স্বীকার করতেই হয়... তাই একটা তারা । আর উপন্যাসের শেষ অধ্যায়টির জন্য একটা তারা । তবে, আইকনিক চরিত্রগুলিকে বাদ দিয়ে শুধু উপন্যাস হিসেবে এই বইটি নেহাত খারাপ নয় ।
▪️আমি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে রেকমেন্ড করবো না এই বই পড়তে ।
স্বনামধন্য সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে লেখা এই প্যাস্টিশ। কিন্তু সত্যি বলতে কী ব্যোমকেশের গন্ধ নেই বললেই চলে। কাহিনীর রহস্যে যে সূত্রগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বেশ জোরালো, তবে প্রচুর চরিত্রের শুধুমাত্র নাম অবতারণা করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের আরও ভালোভাবে ব্যবহার করা যেত উপন্যাসের স্বার্থে। যে চরিত্রগুলিকে নিয়ে খেলতে চেয়েছেন লেখক, আল্টিমেটলি চরিত্রগুলোকেও তিনি ব্যোমকেশের পাশাপাশি খুন করেছেন। শেষের দুটো অধ্যায় অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। অন্যভাবে হয়ত শেষ করা যেত। শুধু শেষের অধ্যায়টা বাদ দিলে একটা কন্টিনিউইটির সম্ভাবনাও রয়ে যেত। ব্যোমকেশের বিকারের ঘটনাগুলো খুব বাজে রকমভাবে 'The Adventure of the Dying Detective'-এ শার্লক হোমসের খ্যাপামি থেকে অনুপ্রাণিত। বইতে বানানের প্রতি খুব একটা যত্ন নেওয়া হয়নি বলে বারবার পড়তে গিয়ে চোখে লেগেছে বানান। লেখকের উপন্যাস সৃষ্টির ক্ষমতা রয়েছে। তবে পরবর্তী কাহিনীতে আরও শক্তিশালী লেখনী ও আরও তথ্যমূলক রিসার্চ আশা করি।