Whereas previous studies of the end of British rule in India have concentrated on the negotiations of the transfer of power at the all-India level or have considered the emergence of separatist politics amongst India's Muslim minorities, this study provides a re-evaluation of the history of Bengal focusing on the political and social processes that led to the demand for partition in Bengal and tracing the rise of Hindu communalism. In its most startling revelation, the author shows how the demand for a separate homeland for the Hindus, which was fuelled by a large and powerful section of Hindu society within Bengal, was seen as the only way to regain influence and to wrest power from the Muslim majority. The picture which emerges is one of a stratified and fragmented society moving away from the mainstream of Indian nationalism, and increasingly preoccupied with narrower, more parochial concerns.
Joya Chatterji is Professor of South Asian History and a Fellow of Trinity College, Cambridge. She specializes in modern South Asian history and was the editor of the journal Modern Asian Studies for ten years.
জয়া চ্যাটার্জীর "বাঙলা ভাগ হল" পড়লাম। আংরেজি পড়ি নাই, ইউপিএলের বাংলা অনুবাদ পড়লাম।
মিশেল ফুকো মানুষের ইতিহাসকে "ক্ষমতার ইতিহাস " বলেছিলেন। যাইহোক, ফুকো বড়ো তাত্ত্বিক বলতে তাঁর বাঁধন নাই।
দেশবিভাগ সম্পর্কে জানতে আমার ভীষণ আগ্রহ। এ বিষয়ক বই পাইলেই পড়ি, পড়লেই পাই। কী পাই? পাই একেক ব্যক্তি একেকভাবে দেশভাগ ব্যাখা করেন, দায়চাপানোর খেলা খেলেন। খেলাধুলার মাঝে আসল সত্য বের করা, নিদেনপক্ষে বোঝাও আমার মতো নাদানদের জন্য কঠিন।
সেসব কথা থাক। এই বইয়ের শুরু ১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের মাধ্যমে, আর ষোলকলা পূরণ হয় বাঙলা ভাগে।
সব্বাই মুসলিম লীগকে গালি দেয়, অতিউগ্র সাম্প্রদায়িকতার ট্যাগ দেয়। এখানেই জয়া চ্যাটার্জীর স্ট্যান্ড। তিনি খুব পড়াশোনা করছেন, শুধু রাজনীতি নয় সাহিত্যেও তাঁর অসামান্য দখল চোখে পড়েছে ।
শুধু লীগ নেতৃত্বই কী জনতাকে বিভ্রান্ত করতো? না,লেখক কাগজেকলমে দেখাতে চেয়েছেন বাঙলার "অসাম্প্রদায়িক" কংগ্রেস কোনোকালেই অসাম্প্রদায়িক তো ছিলই না বরং লীগের মতই ধর্মেকে ক্ষমতার সিড়ি বানিয়েছে, সেই সিড়ি ছিল বাঙলার বর্ণ ও তসফিলি হিন্দুরা। লীগের জুজুরভয় দেখিয়েছে হিন্দুমহাসভা, এই উগ্রবাদীদদের অপ্রকাশ্য রাজনৈতিক সমর্থন যোগাতে বাঁধে নি কংগ্রেসের। লীগের যেমন বাঁধেনি ঠিক তেমন।অথচ নাম শুধু লীগের পড়ে।
বাঙলাভাগ আসলে ক্ষমতার ভাগের ইতিহাস বৈ কিছু নয়। এই ইতিহাস কংগ্রেসের ভদ্রবাবুলোকদের ক্ষমতার লোভের, যে ক্ষমতার মধুকে তারা তাদের সাম্প্রদায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী লীগের সাথে ভাগাভাগি করতে চায়নি-ফলাফল বাঙলা ভাগ, অথচ ১৯০৫ সালে হিন্দুরাই আন্দোলন করেছিল বাঙলাভাগের বিরুদ্ধে! কী নিদারুণ দ্বান্দ্বিকতা!
সবার হাত রক্তে রাঙা, কাদের ইতিহাস সত্য বয়ান করছে সে প্রশ্ন মনে থেকেই যায়।
'মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মোসলমান। মুসলিম তার নয়ণ-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।'
অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দু মুসলিমের সম্প্রীতি বোঝাতেই পঙক্তিদ্বয়ের অবতারণা করেছিলেন। আবার এই গানের শেষ শব্দ 'হিন্দুস্থান' দেখলে অনেকে নাক সিঁটকাবেন যে হিন্দুস্থানে মুসলিমদের অবস্থান কী! যাই হোক কবির উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমার সন্দেহ নেই যে, তিনি সম্প্রীতির কথাই বলেছিলেন। ভারত পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হলো ধর্মের ভিত্তিতে। প্রায় পুরো অঞ্চলটা ঠিকঠাকমতো ভাগ হলেও সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছিল বাংলা ও পাঞ্জাব অঞ্চলের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে। বাংলা প্রদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে ধর্মীয়ভাবে আলাদা হওয়া সত্ত্বেও ভাষা ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ছিল প্রায় অভিন্ন। অবশেষে ত্রিপক্ষীয় রাজনীতির খেলায় বাংলাকে ভাগ হতে হলো। ভাগ প্রক্রিয়ার কারণ হিসেবে একদল দুষছেন হিন্দুদের তথা কংগ্রেসকে, আরেক দল দুষছেন মুসলিমদের তথা মুসলিম লীগকে। এই দোষারোপের রাজনীতিকেই খোলাসা করার চেষ্টা করেছেন জয়া চ্যাটার্জী।
বঙ্গভঙ্গ, অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলনে ভারতবর্ষ টালমাটাল থাকলেও তখনো হিন্দু মুসলিম বিভেদের ভিত্তিতে দেশ ভাগের প্রক্রিয়া শুরু হয় নি। বঙ্গভঙ্গের সময় যে ভদ্রলোক শ্রেণি বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে আন্দোলনে নেমেছিল তারাই কিনা ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেন! বাংলা ভাগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয় মূলত ১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের মাধ্যমে। এই অঞ্চলে বিভেদের বীজ অনেক গভীরে প্রোথিত ছিল। সেই বিভেদকে উস্কে দিতে এবং বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনকে সীমাবদ্ধ করতেই এই রোয়েদাদের উত্থাপন। বেঙ্গল কাউন্সিলে হিন্দু আসনের সংখ্যা বেশি থাকলেও সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদে দেখা যায় হিন্দুদের জন্য রাখা হয়েছে মাত্র ২৮ ভাগ আসন যেখানে মুসলিমদের ছিল ৪৭ ভাগ আসন। এই প্রথম পরিলক্ষিত হয় যে বাংলার রাজনীতিতে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া দলিত ও তফসিলি সম্প্রদায়ের জন্যেও হিন্দু অর্থাৎ সাধারণ ৮০ টি আসনের মধ্যে ১০ টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়। যা ভদ্রলোক সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই ভদ্রলোক শ্রেণি কারা? মূলত ইউরোপীয় ভাবধারাপুষ্ট হিন্দু অভিজাত শ্রেণিদের ভদ্রলোক বলা হতো। সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের পূর্ব পর্যন্ত এই ভদ্রলোক শ্রেণিই আধিপত্য বিস্তার করেছে বাংলার রাজনীতিতে। সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ তাই তাদের গলার কাঁটা হিসেবে আবির্ভূত হয়। দলিত ও তফসিলি সম্প্রদায়কে যেখানে কোনো স্থানই দেওয়া হতো না সেখানে তাদের সাথে আসন ভাগাভাগি মেনে নিতে পারেনি বেঙ্গল কংগ্রেসের নেতারা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস এই দলিত সম্প্রদায়ের সাথে পুনা চুক্তি করে এবং এই চুক্তি কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের সাথে বেঙ্গল কংগ্রেসের সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। চুক্তির মাধ্যমে সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি তফসিলি সম্প্রদায়কে আরো বেশ কয়েকটি আসন ছেড়ে দেয় কংগ্রেস; এতে করে বেঙ্গল অ্যাসেম্বলিতে সাধারণ হিন্দুদের আসন সংখ্যা আরো কমে যায়। আমরা পরবর্তীতে দেখবো যে, যারা তফসিলি সম্প্রদায়কে গ্রহণ করছিল না; তারাই আবার তফসিলিদের নিজ দলে পেতে মরিয়া হয়ে উঠবে।
ত্রিশের দশকের আগে বাংলার রাজনীতিতে কলকাতা তথা ভদ্রলোকদের আধিপত্য থাকলেও সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের পরে অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে কৃষি উৎপাদনের দিকে ঝোঁক বৃদ্ধি এবং ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে গ্রামীণ সমাজের ভোটার তৈরি হওয়াতে মফস্বল ও গ্রামীণ রাজনীতিও বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলে বিরাট ভূমিকা পালন করে। কলকাতা বড় শহর হলেও বাংলার গ্রামগুলোতে বিপুল পরিমাণ ভোট ছিল। এই ভোটারদের সামনে তখন তিনটা দল আবির্ভূত হয়। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ এবং কৃষক প্রজা পার্টি।
আইনসভার মুসলিম আসনের প্রায় সবগুলোই সংরক্ষিত করা হয় পল্লী অঞ্চলে। ফলস্বরূপ কলকাতা থেকে বাংলার রাজনৈতিক কেন্দ্র পল্লী অঞ্চলে চলে যায়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ ছিল মূলত কলকাতা এবং ঢাকাকেন্দ্রিক অভিজাত ব্যক্তিবর্গের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। পল্লী অঞ্চলের কৃষকেরা কলকাতা ও ঢাকাবাসী জমিদারদের অধীন ছিল। তাই তাদের প্রতি বিদ্বেষ বংশানুক্রমে প্রবাহিত ছিল। এদিক দিয়ে এগিয়ে ছিল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি। তিনি একেবারে পল্লী অঞ্চল থেকে উঠে আসা নেতা ছিলেন এবং কৃষকদের এক ছাতার তলায় আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই দেখা গেল ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক দলগুলোর সামনে থেকে ছোঁ মেরে আইনসভার কর্তৃত্ব পেয়ে গেল কৃষক প্রজা পার্টি। তবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়াতে যৌথ সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ দুই দলের সাথেই আলাপ আলোচনার পরে কৃষক প্রজা পার্টি মুসলিম লীগের সাথেই সরকার গঠন করে। সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের পর এটা ছিল ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের আরেকটি পরাজয়। এরপর তারা নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করলেন এবং ধর্মীয় রাজনীতিতে মেরুকরণের প্রক্রিয়া শুরু হলো।
কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগ যৌথ সরকার গঠন করলেও আইনসভায় কংগ্রেস ছিল প্রধান বিরোধী দল। সরকার ক্ষমতায় বসেই প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ণ করেন। যার ফলে প্রজারা স্বাধীনভাবে জমি ভোগদখল করার অধিকার পায়। এটা কংগ্রেসের জমিদারশ্রেণির স্বার্থে আঘাত করে কিন্তু কংগ্রেস এই ব্যাপারে ছিল ক্ষমতাহীন। হক সরকার গ্রামগুলোতে ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করে প্রজাদের ঋণ পরিশোধ না করতে উৎসাহী দেয় বলে কংগ্রেস অভিযোগ করে। এছাড়া হক সরকারের বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম কংগ্রেসের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন তারা বেঙ্গল কংগ্রেসকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়। প্রথমত কংগ্রেসের মধ্যে বাম ধারার কর্মীদের আনাগোনা দেখা যায় কিন্তু এটা কংগ্রেসের রাজনৈতিক চরিত্রকে কলুষিত করার চেষ্টার নামান্তর হলেও একটা শক্ত চিত্র উপস্থাপন করে। অন্যদিকে হিন্দু মহাসভা কংগ্রেসের পাশাপাশি জোটে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তাদের কার্যক্রম বেশ জোরেশোরেই চলতে থাকে। কংগ্রেসও পল্লী অঞ্চলে ব্যাপক গণসংযোগ করে কিন্তু খাজনার পরিমাণ কমে যাওয়াতে জমিদারেরা উদ্বিগ্ন হতে শুরু করেন। তখন একটাই উপায় ছিল এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার এবং তা হলো বাংলার ক্ষমতায় যাওয়া। কংগ্রেসের রাজনীতিতে হিন্দু মহাসভার যুক্ত হওয়া কংগ্রেসকে তার অসাম্প্রদায়িক ধারার রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।
হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। বাংলা ভাগের পেছনে একচেটিয়াভাবে মুসলিমদের দোষারোপ করে ভদ্রলোক সম্প্রদায় নিজেদের দায়কে চাপা দিতে চান। অথচ পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায় দীর্ঘসময় শাসন পরিচালনা করার পরেও মুসলিমদের বরাবরই তারা বহিরাগত শাসক হিসেবে অবহিত করেছেন। অথচ বহিরাগত ইংরেজদের গ্রহণে যদুনাথ সরকার প্রমুখেরা আধুনিক যুগে প্রবেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ব্রিটিশ শাসন পূর্ববর্তী নবাব শাসনামলকে হেয় প্রতিপন্ন করতে ভদ্রলোক সম্প্রদায় নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মুসলিম শাসকেরা লুটপাট, সন্ত্রাস, ধর্ষণ ইত্যাদির মাধ্যমে হিন্দুদের নিপীড়ন করতো এটাই ছিল তাদের দাবি। অথচ ইতিহাসকে স্বচ্ছ আয়নার মাধ্যমে নিলে দেখা যায় উল্টো চিত্র। বাংলা সাহিত্যের অগ্রজপ্রতিম বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখাতেও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলিম বিদ্বেষের পরিচয় পাওয়া যায়। হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করলে সেটা ধর্মীয় অনুশাসন হলেও মুসলিমদের ধর্ম পালনকে গোঁড়ামি আখ্যা দেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গোরা, বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ, শরৎচন্দ্রের পথের দাবী, বিপ্রদাশ ও বিভিন্ন প্রবন্ধে হিন্দু সমাজের উন্নতিকল্পে ব্যাপক প্রচারণা করা হয়েছে। অন্যদিকে মুসলিমদের পশ্চাৎপদ, ইতর শ্রেণির মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন অনেকেই। বাংলার সংস্কৃতির সাথে আত্মীকরণ করতে গিয়ে মুসলিমদের ধর্মীয় বিধিনিষেধ থাকাটা স্বাভাবিক ছিল কিন্তু এটাকে হিন্দুরা হীন অর্থে গ্রহণ করেছে।
হিন্দুরা যখন ক্ষমতার কেন্দ্রে যেতে পারলো না তখন তারাও মাঠে নেমে পড়ে ভোট টানতে। পূর্ববৎ দলিত-তফসিলি সম্প্রদায়কে তারা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেও এবার তাদের পক্ষে নিতে নমনীয় হয়। সাঁওতালসহ আরো কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও নিম্ন-পেশার মানুষদের হিন্দু হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জেলায় জেলায় কংগ্রেসের কমিটিগুলো শক্তিশালী করার দিকে জোর দেওয়া হয়। কয়েক জায়গায় মুসলিম সদস্যরা কংগ্রেসের কমিটি প্রধান থাকলেও তারা বাঁধার সম্মুখীন হন। অন্যদিকে মুসলিম লীগও পল্লী অঞ্চলে কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি করে। এই সময়ে বাংলা অঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও ক্ষমতার রদবদল হয়। স্কুল কলেজগুলোতে আগে হিন্দুরা পূজার অনুষ্ঠান করতো কিন্তু মুসলিম লীগ সরকারে থাকায় এই কাজগুলো বন্ধ করতে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক রেষারেষি সৃষ্টি হয়। স্কুল কলেজের কমিটিগুলোতে মুসলিম সদস্য বৃদ্ধি পায় এবং ইউনিয়ন বোর্ডেও অভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। ফলস্বরূপ বিভিন্ন এলাকাতেই ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে; যা ধীরে ধীরে হিন্দু-মুসলিম চূড়ান্ত সংঘাতে রূপ নেয়।
১৯৪৬ সালের নির্বাচনের পূর্বেই বাংলার রাজনীতিতে মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেস দুই পক্ষ হয়ে যায়। যারা মুসলিম ও হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করে। মাঝে থেকে হারিয়ে যায় হক সাহেবের কৃষক প্রজা পার্টি। ১৯৪৬ সালে নির্বাচনে মুসলিম লীগ সরকার গঠন করলে দেখা যায় যে, দলটি একচেটিয়াভাবে মুসলিমদের ভোট পেয়েছে। অন্যদিকে বর্ণহিন্দু ও দলিতদের ভোট পেয়েছে কংগ্রেস। অর্থাৎ কোনো দলই হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের দাঁড় করাতে পারেনি। নির্বাচনের এরূপ ফলাফল বাংলা ভাগের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে মুসলিম লীগ সরকারের সময় ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি করে। কংগ্রেসপন্থী রাজনীতিবিদরা বলে থাকেন যে এই দাঙ্গা হয়েছিল একমাত্র মুসলিম শাসকদের প্রত্যক্ষ মদদে এবং পুলিশের সাহায্যে। অথচ প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের ভাষ্যে বলা যায়, তখন কলকাতা পুলিশে মুসলিম পুলিশের সংখ্যা ছিল নগণ্য তাহলে সোহরাওয়ার্দী কীভাবে দাঙ্গা পরিচালনা করলেন! তবে দাঙ্গার দায় সরকারপ্রধান হিসেবে সোহরাওয়ার্দীর উপরেও কিছুটা বর্তায় সেটা অস্বীকার করা যায় না; এই দাঙ্গা একদিনের ফসল না। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন অনুশীলন সংগঠন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করছিল। তারা এই দাঙ্গায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে অবস্থা আরো ঘোলাটে করে তোলে।
বাংলা কেন ভাগ হলো? এই প্রশ্নের একটাই, তা হলো বিভেদের রাজনীতি। ১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ, বাংলায় মুসলিমদের নিম্ন শ্রেনির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা, মুসলিম কৃষকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে জমিদারশ্রেনির প্রতি বিদ্বেষসহ নানাবিধ ঘটনাপ্রবাহ ধীরেধীরে বাংলা ভাগের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। মহাত্মা গান্ধী প্রথমদিকে বাংলা ভাগের বিপক্ষে থাকলে জওহরলাল নেহেরু এবং বল্লভভাই প্যাটেলের জোরাজুরিতে বাংলাকে ভাগ করতে রাজি হন। মূলত কংগ্রেস চাচ্ছিল না মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গকে নিজেদের ভাগে নিতে আবার অখণ্ড বাংলা রাখলেও হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ হাতছাড়া হয়। এজন্য অ্যাসেম্বলিতে যখন বাংলা ভাগের প্রশ্ন উত্থাপিত হলো তখন কংগ্রেস বাংলাকে ভাগেরই সিদ্ধান্ত নিল। এদিকে মুসলিম লীগ অখণ্ড বাংলা ও পাকিস্তানে যোগ দিতে চাইলেও সেটা আর সম্ভব হয়নি কংগ্রেসের তীব্র বিরোধিতায়। বাংলা ভাগ যেন এক অনিবার্য পরিণতিতে রূপান্তরিত হলো।
লেখিকা জয়া চ্যাটার্জী তাঁর পিএইচডি থিসিসে বাংলা ভাগ নিয়ে গবেষণা করেন। তারই ফসল এই বইটি। লেখিকা বাংলা ভাগের ক্ষেত্রে মুসলিম লীগ ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তার, ভদ্রলোকের রাজনীতি ও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার এপিঠ-ওপিঠ নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন। ঠিক এই কারণে তিনি হিন্দু রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের বিরাগভাজনও হয়েছেন। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি বাংলার রাজনীতিতে কতটা ভূমিকা রেখেছিল এবং বাংলা ভাগের আরো সব নিয়ামক সম্পর্কেও আলোকপাত করেছেন। সুখপাঠ্য অনুবাদ। বাংলা ভাগের রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য বই। হ্যাপি রিডিং।
Very informative. Although long and detailed, the forth and fifth chapters are eye openers. The bibliography is also extensive and helpful for anyone interested in identity politics, Bengal history and the Hindu Muslim chemistry.
জয়া চ্যাটার্জির ভদ্রলোক সমাজই মূলত সাম্প্রদায়িক বাংলা বিভক্তির জন্য দায়ী। বইটার বিশেষত্ব হইলো তিনি এখানে দেখাইছেন কিভাবে এই ভদ্রলোক শ্রেণী গড়ে উঠলো এককথায় এই ভদ্রলোক শ্রেণীর হিন্দু রাজনীতির সাম্প্রদায়িক বন্ধন কিভাবে গড়ে উঠছে সেটা তিনি দেখালেন। এখানে মহাসভার প্রভাব, কংগ্রেসের মহাসভাকরণ যার একটা চুড়ান্ত পরিণতিই। বাংলার মফস্বলি রাজনীতি, জমিদার - জোতদার প্রভাব মুসলিম লীগের জন্ম ও মুসলিমদের নিয়ে insecurity থেকে বাংলা ভাগের সাম্প্রদায়িক চিন্তা দেখাইলেন। মুসলিম স্বেচ্ছাচারিতা দেখাইয়া নিজের ব্যালেন্স পজিশন দেখাইলেন ও তার সাথে নমশূদ্রদের " শুদ্ধ হিন্দু " বানানোর প্রজেক্ট দিয়ে কিভাবে কিভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটানো হলো তাও দেখালেন। এককথায় বইটা পলিটিকাল ভিউ দেয় যে কোন প্রক্রিয়ায় সব ঘটে।
জয়া চ্যাটার্জির বাংলা দেখা অর্থডকস ব্রিটিশ বাংলায় যেখানে বাংলা এক থাকে পরে ভাগ হয়ে যায়। এটা খেয়াল রাখা ভালো।।
বাংলা ভাগ হবার পেছনে মুসলিম লীগের উচ্চাকাঙ্খা, কংগ্রেসের ঔদাসিন্য আর দুই দলের নেতাদের পারস্পরিক অবিশ্বাসকে দোষ দেওয়া হয় সাধারণত। কিন্তু এর আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ উদীয়মান মুসলিম সমাজের হাতে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ক্ষমতাসীন হিন্দু ভদ্রলোক সমাজের বাংলাভাগের সুতীব্র ইচ্ছার ইতিহাস। বাংলা ভাগের পেছনে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার দায় অনুসন্ধান করেছেন লেখিকা, সাধারণত এড়িয়ে যাওয়া হয় এমন অনেক রূঢ় সত্য তুলে এনে দেখিয়েছেন কিভাবে status quo এর অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন আঁচ করতে পেরে ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করতে চেয়েছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের একাংশ। লেখিকার পিএইচডি থিসিসের উপর লেখা বই বলে বেশ খটোমটো ভাষা, তত্ত্ব আর তথ্যের ভিড়ে খেই হারানোর অবস্থা হয় প্রায়ই। সেসব সামলে কামড়ে ধরে বইটা শেষ করতে পারলে, দেশভাগকে নতুন একটা চোখে দেখা যায়।
An amazing book that tells of the Indian east, the lush green bountiful Bengal. It takes you through the minds and hearts of 'bhadralok' , 'thr Bengali babu' and their political charades. Of the resenting east Bengal, of the rising West Bengal and of the blood and of faith.
It tells of Bengal and her partition. Much refreshing for those whose understanding of partition is overwhelmed with the western borders.
বইটার বাঙলা কপিটা আমার হাতে , যার ৩০ শতাংশের ও বেশি পৃষ্ঠা জুড়ে লেখক এ বইয়ের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ যে স্বীয় অন্তর উদ্গত নয় তার প্রমাণ রাখার জন্য টিকা/তথ্যসূত্র এর খাতিরে ব্যয় করেছেন। ( বইটার দাম অন্যথায় কম হয়ে থাকতো , হাহা )। কিন্তু এমন জটিল বিষয়, যার সাথে এ অঞ্চলের মানুষের অতীত,অনুভূতি জড়িত, এর আলোচনা করাটা নিরাপদ/সুঠাম রাখার উপায় হিসেবে লেখক অতীতের নানান বিবৃতি/দলিলপত্র এর উল্লেখ রাখার প্রয়োজন বোধ করেছে।
কিভাবে ব্রিটিশ শাসনের শেষের দিকের সময়ে( রোয়েদাদ এর পর ) দেশীয় রাজনীতির চিত্র পরিবর্তিত হয়েছে, কিভাবে স্বদেশী আন্দোলনের পাশে এসে কাধে কাধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিল "বিভক্তির প্রতিমা", কিভাবে সেই বিভক্তি শুধু ভূখণ্ডের নয় মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের হয়ে উঠলো, কিভাবে মানুষের একে অপরের সাথের যেকোনো বিরোধ শেষমেশ ধর্মের খাতেই বইতে থাকলো, এমনি আরো জটিল প্রশ্নের উত্তর এই বইয়ের মধ্যে লেখক তুলে ধরেছেন। ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল রাজনীতিক দল কংগ্রেসের মধ্যকার চিন্তা ধারার পরিবর্তন, বাঙলার মধ্যবিত্ত ও বণিক শ্রেনীর মুসলিমলিগের শাসন এর দরুন ভীতি, দিনশেষে বাঙলার নিজেই নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে তার বিভাগ বাসনার আলাপ লেখক তার গবেষণার হাতের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছে। বই থেকে প্রাপ্ত অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে কিভাবে সাধারণ মানুষ নিজেদের অজান্তেই বিভাগ চাইবার কাতারে এসে দাড়ালো, সেটা এক মুহূর্তে ঘটেনি নিশ্চই, তবে উপরের শ্রেনীর লোকদের পরিকল্পিত প্রভাবে সময়ের একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যেই তার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।
বইটা নিঃসন্দেহে তথ্যবহুল। লেখকের শ্রম ও নিষ্ঠা পাঠের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়। মূল বইয়ের কত বলতে পারবো না তবে যে অনুবাদটি আমি পড়েছি তা কিছু কিছু জায়গায় একদম অনিবদ্ধ করে ফেলে, যার কারণে পাঠের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। বইটি পড়ার একটা বড় চ্যালেঞ্জ হলো এখানে অনেক ব্যক্তির ও সংস্থার নাম উল্লেখিত যেগুলোতে ধ্যান না থাকলে লেখাটা প্রায় সময়ই অস্পষ্ট ঠেকতে পারে। এ কারণেই বইটা পড়তে আমার সাধারণ সময়ের থেকে কিছুটা বেশি সময় লেগেছে।
Bengal Divided is a very nice primer to the inter politics of the Bengal presidency and post--presidency Bhadralok and Chottalog. While I do think that this book is a bit biased in it's assessment, especially with the Fazlur movement and Dhakaite Persian administrators vs. the Bhadralok Hindus, it is a very nice book that exemplifies a rich tapestry of Indian regional historical writing.