শীতকাল এলে একটা হাদীস খুব শোনা যায়, "শীত ঋতু মুমিনের বসন্তকাল।" (কারণ হিসেবে বলা হয়, শীতে দিন ছোটো, বেশি বেশি নফল সাওম রাখা যায়; রাতগুলো বড়, পর্যাপ্ত ঘুমিয়ে জায়নামাযে দাঁড়ানোর সুযোগও পাওয়া যায় বেশি।) এই হাদীস কারও কাছে শুনলে আমার মনে পড়ে দাদার কাছে শেখা একটা ফার্সি শের, যার অর্থ : "বসন্ত এসেছে বলে পাথরে তো আর ফুল ফুটবে না। রঙিন ফুল ফুটবে শুধু মাটিতে। ফুল যদি ফোটাতে চাও, মাটি হয়ে যাও।"
অন্তরটা মাটির মতো নরম না হলে বসন্তের কোনো প্রভাব তাতে পড়বে না। যেমনটি আমি ও আমার মতো কিছু কাষ্ঠকঠিন হৃদয়ের মানুষের ক্ষেত্রে ঘটছে। বসন্তকে কাজে লাগিয়ে ইবাদাতের ফুল ফোটাতে চাইলে, আত্মশুদ্ধির সুঘ্রাণে মুখর হতে চাইলে হৃদয়টা নরম হওয়া চাই। চৌচির পাথুরে জমিনও বৃষ্টিবর্ষণের পর নরম হতে শুরু করে। আমরা যারা হৃদয়টা পাথরপ্রতিম বানিয়ে রেখেছি, এই ভরা-বসন্তে একপশলা বৃষ্টিবর্ষণের কোশেশ করতে পারি। এই বৃষ্টির জন্যে মেঘ দরকার। সেই মেঘের ঠিকানা খুঁজে পেতে আপনার সহযোগী হতে চায় 'মেঘপাখি'।
আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজীব এর জন্ম চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা সদরে, ১৯৯৭ ইসাব্দের ২২ জানুয়ারি। ড. মাহমুদুল হক ওসমানি ও জাহান আরা হযেসমিন এর প্রথম সন্তান। অধ্যয়ন করছেন স্নাতক সম্মান (৪র্থ বর্ষ), আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা সাত। লেখালেখির পাশাপাশি বিতর্ক অঙ্গনে সরব পদচারণী। ২০১৭ ইসাব্দে কাতারে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় আরবি বিতর্ক চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন। ২০১৮ ইসাব্দে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ইসলামিক সিভিলাইজেশন কনফারেন্সে গবেষণাপত্র উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছেন। লেখকের অন্যান্য গ্রন্থ: এক মুঠো সবুজের স্বপ্ন (কাব্য), শেষরাত্রির গল্পগুলো (প্রবন্ধগল্প), সবুজ নায়ের মাঝি (অণুকাব্য), বৃষ্টিমুখর রৌদ্রমুখর (প্রবন্ধগল্প), সবুজ রাতের কোলজি (কাব্য), সবুজ চাঁদে নীল জোছনা (কাব্য)।
এক পশলা বৃষ্টির মতো ছিলো বইটি! কবিতায় কবিতায়, গল্প আর হাদিস! ব্যাপারটা মজার না? আল্লামা ইকবালের কবিতাগুলো ছিলো বেশ দারুন। আল্লামা ইকবালের একটি কবিতা ছিলো-
" ইশকুলগামী শিশুটা যেমন চঞ্চল অবিরত জীবনের এই পাঠশালে আমিও উজ্জল গ্রহের মতো সেই আলোকের সন্ধানী হয়ে ঘূর্ণনে আছি রত আলোকের দেখা পেলেই আমার সারবে সকল ক্ষত"
লেখক তার ‘বৃষ্টিমুখর রৌদ্রমুখর’ বইয়ে গ্রীষ্ম, বর্ষা আর বসন্ত ঋতু নিয়ে লিখেছিলেন। এই বইটি তারই সিকুয়েল বলা চলে। এটা তিনি লিখেছেন বাকি ৩ ঋতু নিয়ে অর্থাৎ শরৎ, হেমন্ত ও শীতকে নিয়ে। . প্রথম গল্পটা শরৎ নিয়ে। গল্পের নাম ‘মেঘপাখি’। লেখক শরৎের রূপবিভা নিয়ে সাবলীল ভংগিমায় গল্প বলে গেছেন। পড়ে মনে হচ্ছিল না যে এটা একটা গল্প। মনে হচ্ছিল যেন লেখক শরতের প্রত্যেকটা সৌন্দর্য এখনই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন আর তাই লিখে যাচ্ছেন। শরতের বর্ণনায় ফুল, ফল থেকে পাখি কিংবা রাতের আকাশ কিছুই সম্ভবত বাদ যায়নি লিখায়। প্রাসঙ্গিকভাবে অনেক কবিতাও এসেছে। সবচেয়ে মজাদার অংশ যা আমার লেগেছে তাহলো আরবি ভাষার উপর লেখকের দক্ষতা দেখে বারাকাল্লাহ। কুরআনের শব্দচয়ন এতটাই মুগ্ধ করেছে বলার অপেক্ষা রাখেনা সুবহানাল্লাহ। কিছুক্ষণ পরপর শুধু আফসোস হচ্ছিল কেন আরবিটা বুঝিনা। আল্লাহ তাওফিক দিন। এছাড়া রাসূল(সাঃ) এর অনেক হাদিসও এসেছে। সাহাবীদের নবীজী(সাঃ) কিভাবে উপমা দিয়ে বুঝাতেন তাও লেখক আলোচনা করেছেন এখানে। . দ্বিতীয় গল্পটা হেমন্ত নিয়ে, নাম ‘জলে জ্বলে জোনাকি’। হেমন্তের কথা শুনলেই আমার মাথায় যা প্রথম আসে তাহলো এসময়টা ধান ঘরে তোলার মৌসুম। লেখকও এখানে তা নিয়ে গল্প বলেছেন। ধান মাড়াই থেকে শুরু করে গোলায় তোলা তারপর নবান্ন উৎসব নিয়েও কথা উঠে এসেছে গল্পের ভংগিতেই। ধান মাড়াই করতে গিয়ে গরুর প্রতি কৃষকের মায়া যা রাসূল (সাঃ) আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন তাও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাছাড়া এসময়টায় জলাশয়গুলোতে পানি শুকিয়ে আসে। তাই মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠে গ্রামের দুরন্ত ছেলেরা,দলবেঁধে তারা খাঁড়িসেঁচে মাতে। মাছের কথা আসতেই লেখক বাদ রাখেননি ‘আসহাবুত সাবত’ মানে শনিওয়ালাদের গল্প করতে। এই ব্যাপারে সূরা আ’রাফে আলোচনাটা এখানে তুলে ধরেছেন এবং এখান থেকে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার কথাও বলেছেন। শেষের দিকে জোনাক পোকা নিয়েও গল্প আছে যেখান থেকে দ্বিতীয় গল্পটার নামকরণ। . তৃতীয় এবং শেষ গল্প হলো ‘মাঘনিশীতের কোকিল’। নাম শুনেই বুঝা যাচ্ছে শীত ঋতু নিয়েই গল্পটা। আগের গল্পের মতই এখানে শীতের প্রাকৃতিক পরিবেশ, ফুল, ফল আর পাখি সবকিছু নিয়েই গল্প এগিয়েছে। শীত আমার প্রিয় ঋতু তাই পড়তে আলাদাই একটা ভালোলাগা কাজ করছিল। যাইহোক, শীত আসছে তাতে খেজুরের রস-গুড় বা পিঠাপুলির আলোচনা হবেনা তা কি হয়, তাই এসব নিয়েও গল্প আছে৷ শীত আবার অনেক সাহাবিরাও পছন্দ করতেন৷ তাদের একজন হলেন আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ(রাঃ)। তিনি শীতকে রীতিমতো স্বাগত জানাতেন। আরেকজন সাহাবি মুয়াজ ইবনু জাবাল (রাঃ) মৃত্যুশয্যায় কেঁদেছিলেন শীতের রাতের ইবাদাতকে মিস করবেন বলে৷ রাসূল(সাঃ) শীতকে বলেছেন ‘মুমিনের বসন্ত’। কেননা এসময় রাত দীর্ঘ বিধায় সহজে তাহাজ্জুদে উঠা যায় আবার দিন ছোট বলে কম কষ্টে দিনে রোযা রাখা যায়। এছাড়া এই গল্পে প্রাসঙ্গিকভাবে রাসূল (সাঃ) পছন্দ করতেন ভালোবাসতেন এমন কিছু জিনিসের নামও আছে। আরো অনেক আয়াত এবং হাদিসকে এখানে সুন্দরভাবে আলোচনায় আনা হয়েছে৷ . নতুনভাবে আপনাকে অনেক কিছুই বুঝতে, ভাবতে শিখাবে বইটি। আর আমার মতো যারা আরবি পারেন না তাদের মনে মনে আফসোস হবে কেন আরবিটা বুঝেন না। এত সুন্দর আরবি ভাষা যা বুঝলে কুরআনের সৌন্দর্য উপভোগ করা যেত।