Jump to ratings and reviews
Rate this book

পিতামহ

Rate this book
৪৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ইয়াসরিবের সবুজ ভূ-খণ্ডে জন্ম নেয় এক বিস্ময়কর আরব শিশু। মাথাভর্তি সাদা চুল দেখে মা তার নাম রাখেন শাইবা। পরিণত বয়সে এই শাইবা হয়ে ওঠেন জাহিলি আরবের কিংবদন্তিতুল্য নেতা আবদুল মোত্তালিব। পিতামহ-এই শুভ্র চুলের মক্কানেতা আবদুল মোত্তলিবের জীবনাশ্রিত উপন্যাস। ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আবদুল মোত্তালিব, তার সময়ের মক্কা স্মরণকালের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি পাড়ি দিচ্ছিল। নবী-জন্মের পূর্বাভাস, কন্যাশিশু হত্যা, গোত্রীয় দাঙ্গা, কৌলীন্য প্রথা, প্রেম-দ্রোহ, কাব্যযুদ্ধ, দাসব্যবস্থা, লুটতরাজ, হস্তিবাহিনীর কাবা আক্রমণ—গোটা আরব অগ্নিগর্তের কিনারায় অবস্থান করছিল। পিতামহ সেই অগ্নিগর্ভ সময়ের দলিল।

528 pages, Hardcover

Published February 1, 2020

9 people are currently reading
137 people want to read

About the author

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
35 (54%)
4 stars
22 (34%)
3 stars
4 (6%)
2 stars
2 (3%)
1 star
1 (1%)
Displaying 1 - 21 of 21 reviews
4 reviews7 followers
March 3, 2020
পড়বার পর : পিতামহ

পিতামহ লেখার সময় সাব্বির ভাই লিখেছিলেন, তাঁর এক প্রতিবেশীর ধারনা, ‘সাব্বির সারাদিন কুরান শরিপ লেখে’! কোরানের মত আযীম কিতাব না হোক পিতামহ যে একটি মহৎ উপন্যাস সে সম্পর্কে কোন সন্দেহ নাই। নামে পিতামহ হলেও এটি আদতে কেবল আবদুল মুত্তালিবের জীবনীগ্রন্থ নয়, সে উদ্দেশ্যে কেউ পড়লে আশাহত হবেন। এটির উত্তমাংশে যদিও আবদুল মুত্তালিব প্রধান চরিত্র, কিন্তু তার সঙ্গে অন্তঃসলিলা যে ধারাটি বয়ে চলেছে, সেটি ইতিহাস। এমনকি দ্বিতীয় খন্ডে এসে সেই ধারাটিই প্রধান। আবদুল মুত্তালিবের সাড়া পাওয়া যায় কেবল দূর থেকে, রাতের মুসাফিরের জ্বালানো আগুনের মতোন।

কায়েস, তালহা, হুমাইরা, নাম না জানা কায়েসের মা ইত্যাকার নানারূপী চরিত্রের ওপর ভর করে সাব্বির জাহিলী যুগের দাস ব্যবস্থার ওপর যে একটি নিষ্ঠাপূর্ণ তদন্ত চলিয়েছেন তাতে সন্দেহ নাই। গোত্রীয় দ্বন্দ্ব, মানবেতর জীবন, না হওয়া/হতে হতে ভেঙে যাওয়া প্রেম, জীবন্ত প্রোথিত কন্যাশিশুর আর্তনাদ, কী নাই সেই উপাখ্যানে। এবং সেই সাথে হাজির থাকছেন জাহিলী আরবের সবচেয়ে বর্ণিল চরিত্র আবদুল মুত্তালিব তার আভিজাত্য, মর্যাদা আর ইতিহাস সমেত। এই দুই বিষয়ের সম্মিলনের কারণেই পিতামহ হয়ে উঠতে পেরেছে সময়ের একটি মহৎ সৃষ্টিকর্ম।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাসগুলোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তার নিজ সময়ে একে বাস করতে হয়, একই সঙ্গে পাঠকের কাল উপযোগী হতে হয়। যাতে ঔপন্যাসিক বিশ্বস্ত বর্ণনায় পাঠকের আস্থা হাসিল করতে পারেন। পিতামহ এই ক্ষেত্রে আধাআধি সফল।

এটি কেবল সংলাপাশ্রয়ী উপন্যাস নয়, অনেকাংশেই বর্ণনাপ্রধান। সেই রেওয়ায়াতের জায়গা থেকে সাব্বিরের গদ্য দুর্দান্ত। বিশেষত প্রথম পর্বে থেকে থেকেই চমকে উঠতে হয় চমৎকার উপমা-প্রয়োগে। ‘সিদরাতুল মুনতাহার পাতা হলুদ হয়ে আসা’ ‘তলোয়ারে শান দেওয়া’ ‘তোমার মুখে ধূলো নিক্ষিপ্ত হোক’ ইত্যাদী মুদ্রার ব্যবহার পাঠককে এক ঝটকায় নিয়ে যায় উপন্যাসের সময়ে। বইয়ের লাইনের মাঝের খালি জায়গায় তখন ধরা দেয় সীমাহীন বালিয়াড়ি, তরবারি ঝনাৎ আর ছুটে যাওয়া ঘোড়ার খুরের শব্দ। অবশ্য গদ্যের এই অলংকার উপন্যাস এগোনোর সাথে সাথে ক্রমশই ফিকে হয়ে এসেছে। ইয়েমেন পর্বের শেষদিকে এসে যে গদ্যের দেখা পাওয়া যায় তার সঙ্গে আধুনিক গোয়েন্দা কাহিনীর সাথে ফারাক করে ওঠা মুশকিল। অবশ্য যৌথ পর্বে এসে সেই ফিকে রঙে পাক ধরে, আবার পাওয়া যায় মরুচারী আরবের ঝর্ণার ধ্বনি, কাফেলার আওয়াজ।

এ তো গেল গদ্যের কথা, উপন্যাসের কাহিনী-সেতারের আরেকটি জরুরী তার হল সংলাপ। পিতামহ’তে সেটার ব্যপারে মুগ্ধতা ধরে রাখা কঠিন। প্রায় সারাটি উপন্যাসেই সংলাপগুলো মনে হয়েছে খানিক আরোপিত, আড়ষ্ট। ঠিক যেন দেড় হাজার বছরের পুরনো বেশবাস গায়ে আঁটছে না, ফাঁকফোকর দিয়ে তার আধুনিক দেহখানি নজরে পড়ে যাচ্ছে। এই মরুভূমির সারল্য দেখতে না পাওয়ার কারণ বোধকরি চরিত্রদের পারস্পরিক সম্বোধন, যা কিনা একেবারে আধুনিক। হতে পারে, না-ও হতে পারে।

কিন্তু এহ বাহ্য। এমন বড় কলেবরের উপন্যাসে কাহিনীর যে সটান চলার গতি, কোথাও না ঝিমিয়ে পাঠকের বিরক্তির কারণ না হয়ে এগিয়ে যাওয়া, সেটি অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। বড় আকারের উপন্যাসে যেমন দেখা যায়, একটি দুটি চরিত্র উপযুক্ত ভূমিকা ছাড়াই পাঠকের মগজে চেপে থাকে। পিতামহে সে ধরনের কোন চরিত্রই নেই। একেবারে গজ-ফিতা দিয়ে মেপে যেন তাদের হাজির করা হয়েছে দৃশ্যপটে। আর কাজ শেষ হলেই হয় দস্যুর হাতে, নয়ত বেঘোরে প্রাণত্যাগ করে মুক্তি পেয়েছে অক্ষরের বন্দীশালা থেকে।

‘ইসলামী’ ঘরানার ঐতিহাসিক উপন্যাসে আরেকটি যে বাহুল্য থাকে সেটি হচ্ছে যুদ্ধের (অথবা/এবং) যৌনতার রগরগে বর্ণনা — যা কিনা জোশিলা পাঠকের গা-গরমের একটি উপায়ও বটে, এতে সেই বাহুল্য নেই। থাকলেও সেটি এমন মানবিক আবরণে হাজির হয়েছে, যা পাঠকের চিন্তায় রেখে যাবে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ৷ আবরাহার হাত কাটার সাজা, তালহার ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকা সেসবের উদাহরণ। যা কিনা পিতামহকে দিয়েছে মহত্বের সম্মান।

আগামীর দিনগুলোতে কাল সেই মহত্বকে আশা করি যোগ্য কদর করবে। কারণ, আমরা জানি, কাল বড় নিষ্ঠুর বিচারক।
Profile Image for Kazi Hasan Jamil.
62 reviews22 followers
November 12, 2023
"আবদুল মোত্তালিব বললেন, আপনার সৈন্যরা আমার দুশো উট লুট করেছে৷ আমি উট ফেরত চাই। আবরাহা বললেন, আমি আপনাদের উপাসনালয় ধ্বংস করতে এসেছি, অথচ আপনি সামান্য উট নিয়ে চিন্তিত। কেমন নেতা আপনি! আবদুল মোত্তালিব বললেন, আমি উটের মালিক, তাই আমার চিন্তা উট নিয়ে। কাবাঘরের যিনি মালিক, তিনি তার ঘর সামলাবেন।"

----------------------------------------------------------------------------


৪৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ইয়াসরিবের সবুজ ভূ-খণ্ডে নিজের মাতুলালয়ে মক্কার সরদার হাশিম ইবনে আবদে মানাফ ও বনু নাজ্জার গোত্রের প্রভাবশালী, বিত্তবান সরদারের মেয়ে সালমা বিনতে আমর এর কোল আলো করে জন্ম নেয় এক বিস্ময়কর আরব শিশু। মাথাভর্তি সাদা চুল দেখে মা তার নাম রাখেন শাইবা। বিয়ের সময় স্বামীর কাছে দেওয়া বিশেষ শর্তের কারণে সালমা বিনতে আমর কখনো মক্কা যাননি। পিতা হাশিমের মৃত্যুর পর প্রায় চৌদ্দ বছর বয়সে শাইবাকে মক্কায় নিয়ে যেতে তাই চাচা মোত্তালিব আসেন ইয়াসরিবে। অবশেষে ভাতিজাকে নিয়ে দীর্ঘ যাত্রাশেষে মক্কায় প্রবেশ করলে মরু সফরের কারণে বিধ্বস্তত, ধুলোরাশিতে ঢেকে থাকা চেহারা এবং মলিন পোশাক দেখে মক্কার মানুষ শাইবাকে মুত্তালিবের কেনা নব্য দাস মনে করে। সেই থেকেই এই বিস্ময়কর আরব শিশুর নাম হয়ে যায় আবদুল মোত্তালিব বা মোত্তালিবের দাস। পরিণত বয়সে এই শাইবা হয়ে ওঠেন জাহিলি আরবের কিংবদন্তিতুল্য নেতা আবদুল মোত্তালিব। অল্প কদিনে সুবিচার, মানবপ্রেম, নির্মল চরিত্র, দরিদ্রের প্রতি ভালোবাসা এবং হজ পরিচালনায় শৃঙ্খলা তার যোগ্যতাকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে। মক্কার সরদারের কার্যাবলির গোপন পৃষ্ঠায় লুকিয়ে থাকে এমন সব অদ্ভুত ঘটনা যা তাকে জাহিলি আরবের সবচেয়ে বিস্ময়কর চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করে।

'পিতামহ' এই শুভ্রচুলের মক্কানেতা আবদুল মোত্তলিবের জীবনাশ্রিত উপন্যাস। ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আবদুল মোত্তালিব, তার সময়ের মক্কা স্মরণকালের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি পাড়ি দিচ্ছিল। পিতামহ সেই অগ্নিগর্ভ সময়ের দলিল।

◑ পাঠ প্রতিক্রিয়া:

পিতামহ হযরত মুহাম্মদ (স.) এর দাদা আবদুল মোত্তালিবের জীবনাশ্রিত উপন্যাস। যিনি জন্মেছিলেন এমন এক সময়ে যখন কন্যাশিশুকে জন্মের পরপরই জীবন্ত কবর দেওয়া, গোত্রীয় দাঙ্গা, কৌলিন্য প্রথা, দাসব্যবস্থা, লুটতরাজ, ব্যাভিচার ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। যখন মক্কার পবিত্র কাবাঘরে ভেতরে প্রতিষ্ঠিত ছিল দেবতা হোবলের মূর্তি। সাথে ছিল দেবী ওজ্জা, লাত ও মানাতের মূর্তি যাদের তৎকালীন আরবরা আল্লাহর তিন কন্যা হিসেবে পূজা করতো। যখন মানুষ মুখে মুখে ছিল দেবতা ওজ্জার কসম, লাতের লানত। পুরোপুরি পৌত্তলিকতায় মত্ত ছিল আরবের মানুষ।

পিতামহ উপন্যাসের মাধ্যমে লেখক তৎকালীন আরবের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন বিশদ ভাবে। উপন্যাসে উঠে এসেছে মক্কার প্রাচীন ইতিহাস। মক্কায় কুরাইশদের গোড়াপত্তন ও প্��ভাবশালী হয়ে ওঠার ইতিহাস, কাবার নিকট দারুন নাদওয়া সভাগৃহ নির্মাণ, মক্কার বিচারব্যবস্থা, দাস প্রথার কঠোরতা, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি নির্বাচন, আস সাবউল মুআল্লাকাত বা কাবার দেয়ালে স্বর্নাক্ষরে লেখা সাতটি ঝুলন্ত কবিতা, মেয়েদের প্রথম ওড়না দেওয়ার উড়নি অনুষ্ঠানসহ মক্কার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট। যে সমাজ ব্যবস্থায় প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়াকে দেবতার অসন্তুষ্টি মনে করে জন্মের পরপরই জীবন্ত কবর দিয়ে হত্যা করা হয়। যে সমাজে সদ্য জন্ম নেওয়া ছেলে সন্তানকে মনে করা হয় তায়েফের স্নিগ্ধ গোলাপ।

এই বইটি আবদুল মোত্তালিবের জীবনাশ্রিত উপন্যাস হলেও বইয়ের অন্যতম প্রধান চরিত্র হলো তালহা নামের এক কাল্পনিক চরিত্র। বনু সুলাইলাম গোত্রের সাধারণ এক ছেলে তালহা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় অনির্দিষ্টকালের জন্য উমাইয়ার দাসত্ব গ্রহণ করতে হয় ওসমান ও তালহাকে। কিন্তু নিয়তি তালহার ভাগ্যে শুধু উমাইয়ার দাসত্বই নয়, লিখে রেখেছিল আরো বড় কিছু। নিয়তি যাকে নিয়ে যায় ইয়েমেনের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের রাজনৈতিক চক্রে।

তালহা নামের এই কাল্পনিক চরিত্রের মাধ্যমে লেখক উঁকি দিয়েছেন কখনও তপ্ত মরুভূমিতে, কখনো মক্কা থেকে ইয়াসরিবে কখনো ইয়েমেনের রাজপ্রাসাদে আবার কখনো বেদুইনপল্লীর কঠোর জীবনে। পাশাপাশি তালহার মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন ইয়েমেনের সম্রাট আরিয়াত কে ক্ষমতাচ্যুত করে সম্রাট আবরাহা আল আশারামের উত্থান, মক্কা আক্রমণকে।

সুবিশাল এই প্রেক্ষাপটে অনেক চরিত্রের আগমন ঘটিয়েছেন লেখক। ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো পরিণতি অবিকৃত রেখে কাল্পনিক চরিত্রগুলোকে সম্মিলিত করেছেন লেখক। আবদুল মোত্তালিবের জীবনাশ্রিত উপন্যাস হওয়ায় এই চরিত্রের সামাজিক প্রভাব, প্রতিপত্তি, স্বভাব লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন দক্ষতার সাথে। যেখানে মনিবদের প্রতি দাসদের ছিল ভীতি, ক্ষোভ, ঘৃনা সেখানে আব্দুল মুত্তালিবের দাসদের কাছে তাকে রক্তমাংসের মানুষ বলে মনে হত না; আসমান থেকে নেমে আসা ক্রোধ লালসামুক্ত এক ফেরেশতা মনে হত। একজন ফেরেশতার সঙ্গী হতে পেরে তারা দাসত্বের বেদনা ও গ্লানি ভুলে যেত। আবদুল মোত্তালিব এমন এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব যাকে কেউ যদি এক পেয়ালা পানি দিতে কার্পণ্য করে, সে তাকে একটি ঝরনা দেওয়ার মত উদার। যেখানে সম্ভ্রান্ত আরবরা ঘোড়সওয়ারকে আরবদের ঐতিহ্য ভেবে দাসদের এসব থেকে দূরে রাখতেন সেখানে তিনি ঘোড়সওয়ারি শিখতে উৎসাহ দিতেন। এছাড়া সামান্য দাস তালহার প্রতি মনিব কন্যা সাফিয়ার সহানুভূতি ও সত্য মিথ্যার পার্থক্য করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। পাশাপাশি এই বইয়ে তালহা-সাফিয়া, কায়েস-হুমায়রার যে প্রেম কাহিনি ছিল, তাও অপ্রয়োজনীয় মনে হয়নি। বরং এগুলোও ছিল এই আখ্যানের প্রাণ। সব চরিত্রগুলোকে যথাযথ চরিত্রায়নের মাধ্যমে আবেগ, অনুভূতি দিয়ে লেখক এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে কাল্পনিক চরিত্রগুলোকে কাল্পনিক হিসেবে মানতেও কষ্ট হয়।

সবকিছু মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বের আরব্য ইতিহাসের টালমাটাল সময়কে এতো বিশাল প্রেক্ষাপটে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক।

◑ লেখনশৈলী:

সাব্বির জাদিদের লেখার সাথে এই প্রথম পরিচয় ঘটলো। ইতিহাসের এতোগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে একত্রিত করে বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলার যে সম্ভাবনা ছিল তা লেখক উতরে গেছেন ভালোভাবেই। আবার লেখক ঐতিহাসিক বর্ণনা দিতে গিয়ে ইতিহাসকে কাঠখোট্টা ভাবে উপস্থাপন না করে মনোরম গদ্যশৈলীর ছাপ রেখেছেন। লেখকের লেখনশৈলীর দক্ষতার ছাপ চোখে পড়ে প্রতিটা অধ্যায়ের শুরুতেই। জীবন সেঁচে মুক্তো, সিদরাতুলমুনতাহার হলুদ পাতারা ইত্যাদি শিরোনামগুলোই যেন প্রতিটা অধ্যায়ের আংশিক প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে "সিদরাতুলমুনতাহার হলুদ পাতারা" অধ্যায়টা পড়তে গিয়ে মনের ভেতরে গভীর বেদনা অনুভব করেছি এবং উপলব্ধি করেছি যে এই অধ্যায়ের এর থেকে ভালো নামকরণ হতেই পারে না। সবমিলিয়ে লেখকের শব্দচয়ন, বাক্যগঠন, বর্ণনাভঙ্গি খুবই ভালো লেগেছে। তবে একটা অধ্যায়ে লেখক "মিশন" শব্দটির ব্যবহার করেছেন। এরকম একটা প্রেক্ষাপটে এই শব্দ কতটা যৌক্তিক আমার জানা নেই তবে চাইলেই এর পরিবর্তে "অভিযান" শব্দটি ব্যবহার করা যেত।

◑ বানান, সম্পাদনা, প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন ও অন্যান্য:

শুরু থেকে আমি ঘোরের মধ্যে ছিলাম নাকি বইটায় আসলেই তেমন বানান ভুল নেই তা বলতে পারব না, ৫২৮ পৃষ্ঠার এই সুবিশাল আখ্যানে কোনো বানান ভুল কিংবা ছাপার ভুল আমার চোখে পড়েনি। যদি থেকেও থাকে তার পরিমাণ হয়তো খুবই সামান্য। এছাড়া বইটির সম্পাদনাও ভালো ছিল।

এই বইটার প্রচ্ছদ একটু বেশিই সাদামাটা লেগেছে। এক কথায় যদি বলি, এই বইটা আরো সুন্দর প্রচ্ছদের দাবিদার। এছাড়া ঐতিহ্যের প্রোডাকশন নিয়ে কিছু বলার নেই। ওদের গতানুগতিক প্রোডাকশনই দেওয়া হয়েছে বইয়ে। তবে বইটা বেশ বড় হওয়ায় কিছু পেইজ খুলে আসছিল। এছাড়া বাকিসব ঠিকঠাক।

◑ প্রিয় অংশ:

✰ জীবনের সব চাওয়া পূর্ণ হতে নেই। যে জীবনে কোনো দীর্ঘশ্বাস নেই, নেই কোনো বেদনার হা হুতাশ, সে জীবন সাদাকালো, মহিমাহীন। কাজের ফাঁকে জীবনের অপ্রাপ্তিগুলোর গায়ে মমতার হাত বোলানো, গড়তে গড়তে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের জন্য হাহাকার করে ওঠা-এই তো সৌন্দর্য বেঁচে থাকার।

✰ সম্পদ, চেহারা কিংবা প্রতিপত্তি নয়; বরং মানুষের ভালোবাসাগুলোই জীবনের প্রাপ্তি। সম্পদ মৃত্যুর সাথে সাথে সন্তানদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়ে যায়। রয়ে যায় কেবল ভালোবাসা, যেগুলো মানুষ বুকে যত্ন করে রেখে দেয়।

✰ অবহেলায় কোনো স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলতে নেই। একটা সময় মানুষ স্মৃতি নিয়েই বাঁচে। যার স্মৃতি যত সমৃদ্ধ, তার জীবন তত সুন্দর।

◑ ব্যক্তিগত রেটিং: ৫/৫

◑ বই পরিচিতি:
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
➠ বইয়ের নাম: পিতামহ
➠ লেখক: সাব্বির জাদিদ
➠ জনরা: ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস
➠ প্রকাশনী: ঐতিহ্য
➠ প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২০
➠ প্রচ্ছদশিল্পী: কাজী যুবাইর মাহমুদ
➠ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৫২৮
➠ মুদ্রিত মূল্য: ৮০০ ৳
Profile Image for Parvez Alam.
310 reviews12 followers
January 27, 2024
প্রথম কথা হচ্ছে বইটা আমাদের নবীর দাদা কে নিয়ে লেখা না। এর পরের কথা হচ্ছে বইটা আমাদের নবীর দাদার জীবনিও না। যারা এমনতা ভেবেছেন (আমি তাদের একজন) তাদের এমন ভাবার কারন হচ্ছে বইয়ের নাম এবং প্রচার। বইটার নাম অন্য কিছু হইলে আমার কাছে মনে হয়ছে বেশি ভালোহত। বইটা সুন্দর আমার কাছে ভালোলেগেছে। বইটা আমার কাছে মূলত ক্রীতদাস তালহা কাহিনী বা জীবনী বেশি মনে হয়েছে, যার ভিতরে মাঝে মাঝে নবীর দাদা আবদুল মোত্তালিব, ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বিলাল রাঃ মায়ের কাহিনী থেকে শুরু করেছে অনেক কিছু চলে এসেছে। এই বইয়ে ভালো একটা ধারণা পাওয়া যাবে ঐ নবীর আসার আগে আরবের, ইয়েমেনের অবস্থা নিয়ে জীবন নিয়ে। সব কিছু মিলায় বইটা আমার কাছে ভালো লেগেছে।
Profile Image for Nusrat Faizah.
101 reviews38 followers
March 31, 2024
বহুদিন পর একটা বই শেষ করে আবেগে বুকটা এভাবে ভরে উঠল।লেখকের লেখনি কি অসাধারণ!
Profile Image for Sakib A. Jami.
346 reviews41 followers
October 13, 2024
পিতামহ! বইটি পড়ার সময় ব���রবার ভাবছিলাম, বইটির নাম কি আদৌ যৌক্তিক হলো? যাঁকে উদ্দেশ্য করে বইটির নামকরণ, তিনিই যে বইটির মূল চরিত্র হয়ে উঠতে পারেননি। হয়ে উঠেছেন পার্শ্ব চরিত্র। তবুও যে আলোর দীপ্তি তিনি ছড়িয়েছেন, যে ব্যক্তিত্বের বহর তিনি দেখিয়েছেন, যে মানবিকতা তিনি জমিয়েছেন— এক আরবের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন। এখানেই বইটির নামকরণ সার্থক মনে হয়। এক বিস্ময় বালক, এযাবৎকালের শ্রেষ্ঠ মানবসন্তানের পিতামহকে তো এমনই হওয়া সাজে। যিনি পার্শ্ব চরিত্রে থেকে সকল আলো কেড়ে নিজেকে উজ্জ্বল করেন। তখন মনে হয়, এরচেয়ে যথাযথ নাম আর হয় না। তিনি যেই বালকের পিতামহ পরিচয়ে পরিচিত হবেন, নিজের পরিচয়ও সেখানে শতগুণ মূল্যবান।

বলছিলাম আবদুল মোত্তালিবের কথা। সেই সময়ের আরবের কোরাইশ বংশের সর্দার যিনি। যিনি সামলে নিয়েছেন কাবার মর্যাদা। আল্লাহর ঘরকে আগলে রেখেছেন একা হাতে। তিনি কাবার সোবায়েত। প্রতিনিয়ত লড়াই করেন কাবাকে রক্ষা করা নিমিতে। যেই কাবাতে হজ হয়, দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন আসে। তাদের সেবা করার দায়িত্ব আবদুল মোত্তালিবের। তাদের যেন কোনো কষ্ট না হয়, সেবাযত্নে কোনো ত্রুটি না থাকে; তারই চেষ্টা থাকে সবসময়।

তখনকার সময়কে বলা হয় আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগ। আল্লাহর ঘর মূর্তিতে বোঝাই। কন্যা সন্তানকে অনেক জায়গায় অপয়া মনে করা হয়। পুত্র সন্তান আশীর্বাদ, বৃদ্ধ বয়সের বাবাকে ছায়া দিবে। শক্তি দিয়ে আগলে রাখবে। তাই কন্যা সন্তান হলেই কবর দেওয়া ছিল নিয়মিত ঘটনা। ব্যভিচার, অনাচারে ভরে গিয়েছিল সমাজ। সেই সমাজের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে আবদুল মোত্তালিব নিজেকে রেখেছেন সংযত। যিনি কখনও শরাব পান করেননি, ব্যভিচারে লিপ্ত হননি। অন্যায়ের সাথে আপোষ করেনি। তিনি সর্দার, তিনি নেতা। আর একজন নেতাকে তো এমনই হওয়া উচিত, যিনি মানুষের জন্য নিজের ধনসম্পদ উজাড় করে দিবেন। মানুষকে নিয়ে ভাববেন। তাই তো যেই হজের মৌসুমে সবাই লাভবান হওয়ার নিমিত্তে কর আরোপ করে, তিনি সেখানে বিনা করে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করতে দেন। পার্থক্য এখানেই। এই পার্থক্যের রেশেই উপর থেকে যিনি সবকিছু অবলোকন করেন, তিনি জমজম কূপের দায়িত্ব তাঁর হাতেই অর্পণ করেন। এই সুমিষ্ট পানির জলধারার যথাযথ ব্যবহার যে সবাই করতে পারবে না। হয়তো তখনই নির্ধারণ হয়ে গিয়েছিল এই বিশ্ব জাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের পূর্বপুরুষ হিসেবে তিনিই উজ্জ্বল হবেন।

আবদুল মোত্তালিবের নামে বইটির নামকরণ হলেও, শুরুতেই বলেছি তিনি বইটির পার্শ্বচরিত্র। তাহলে মূল চরিত্র কে? এখন যার কথা বলব, সে গুরুত্বপুর্ণ কেউ না। তবুও এই গল্প তাকে ছাড়া প্রাণহীন। তৎকালীন আরব সমাজে ক্রীতদাস প্রথা জোরদার ছিল। ছিল কন্যা সন্তানকে কবর দেওয়ার প্রচলন। তিন তিনটি কন্যা সন্তান যখন গরীব ওসমানের ঘর আলো করতে পারছিল না, তাদের ঠিকানা হয়েছিল মাটির নিচের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। এরপর আসে তালহা। তার জন্যও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। দশটি উটের কোরবানির বিনিময়ে তালহার জন্ম। কিন্তু গরিব পরিবার কী করে দশটি উট কোরবানি দিবে? স্মরণাপন্ন হয় অভিজাত উমাইয়ার। চতুর উমাইয়া নিজের সুবিধা প্রতিপন্ন করে ভিন্ন শর্তে দশটি উট ঋণ দেয়, যার যাঁতাকলে তালহার বাবা ও তালহা নিজে ক্রীতদাসের শিকলে বন্দি হয়ে পড়ে।

শুরু হয় সংগ্রাম। সবাই আবদুল মোত্তালিব না। যিনি ক্রীতদাসের সাথে সংযমের সাথে ব্যবহার করেন। তাই কায়েস ও তালহার পার্থক্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কায়েস আবদুল মোত্তালিবের ক্রীতদাস। অন্যদিকে তালহা উমাইয়ার ক্রীতদাস। কায়েস যেখানে আবদুল মোত্তালিবের সন্তানতুল্য হয়ে উঠেছে, মনিবের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত; তালহা সেখানে প্রতিনিয়ত ভয়ে থাকে, কোন ভুলে আবার শাস্তির খড়গ নেমে আসে। মনিবের পরাজয়েই তালহার শান্তি। দুই ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া তালহা ও কায়েস হয়ে ওঠে অন্তরঙ্গ বন্ধু।

কিন্তু জীবন হয়তো ভিন্ন গল্প লেখে। ভিন্ন উপাখ্যানে ছেয়ে যায় সময়। তাই ভাবনা ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক হয় বিস্তর। সে কারণেই হয়তো তালহার ছোটবোনের সাথে কায়েসের প্রণয় যখন পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনই একটি দুর্ঘটনা! দুর্ঘটনা, না হত্যাকাণ্ড? কায়েস ও তার প্রণয় প্রার্থী হুমায়রার হারিয়ে যাওয়া। এখান থেকেই গল্পটা মোড় নেয়।

ক্রীতদাসের জীবন থেকে মুক্তি মিলেছিল তালহার। নতুন করে জীবন শুরু করার অপার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আদরের ছোট বোন ও বোনের হবু জামাই নিজের বন্ধুর পরিণতি তাকে অন্যরকম করে তোলে। প্রতিশোধের নেশায় কতল করে কোরাইশদের অভিজাত উমাইয়ার পুত্র সুফিয়ানকে। উমাইয়াও যে ছেড়ে কথা বলবে না। এক রাতের মধ্যে পরিবারের সবাই জ্যান্ত পুড়ে ছাই। যেখান থেকে নতুন জীবন শুরু করার কথা ছিল তালহার, সেখানেই সব হারিয়ে নির্বাক ফেরারী হয়ে যেতে হলো। নিয়তি বোধহয় এভাবেই মানুষের দুর্ভাগ্যের গল্প লেখে।

মক্কা থেকে গল্পটা এবার ইয়েমেনের। পালিয়ে বেড়ানো তালহার চোখে জলছে প্রতিশোধের আগুন। মক্কা ওই ইয়েমেনের মধ্যে এক আকাশ-পাতাল ফারাক। মক্কা যেখানে নিজ গোত্র ও সর্দারদের দ্বারা পরিচালিত, ইয়েমেন সেখানে রাজ্যের কূটচালে নিমজ্জিত। এখানে সম্রাট নিজেকে সর্বেসর্বা দাবি করে। রাজ্য দখলের লড়াইয়ে কত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে হয়। তালহা দেখছে সবকিছু। ভাগ্য তাকে ইয়েমেনের গভর্নর, পরবর্তীতে সম্রাট আবরাহার গোয়েন্দা সহকারীর দায়িত্ব দেয়। যে দায়িত্ব সে পালন করলেও অতীত ভুলে যেতে পারবে কি?

বোধহয় না। তাই তো ধর্মের বিভেদ থাকার পরও অতীতের ধর্ম মান্য না করলেও ফেলে দিতে পারে না। ধর্ম এমন এক স্পর্শকাতর বিষয়, যেখানে খুব সহজেই সেই অনুভূতিতে আঘাত লাগে। প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান, ধর্মের নামে যুদ্ধ চলেছে। ধর্মের অবমাননার ফলস্বরূপ মানুষ তার জীবনের সুখকর দিনগুলিও হারিয়ে ফেলে। নিজ ধর্মকে বড় করতে গিয়ে অন্য ধর্মের সাথে রেষারেষি চলে। কিন্তু সব ধর্ম কি সেরা হতে পারে? সেরার মুকুট ওই একজনের মাথাতেই শোভা পায়। অতীতের যে ইতিহাস ঐতিহ্যের উপর ভর করে কাবার চত্বরে যে হজের প্রচলন হয়, তাকে হারিয়ে দেয়া বা তার সাথে তুলনা করার চেষ্টা করাটাও খোদ অন্যায়। কিন্তু সে অন্যায় মানুষের চোখে পড়ে না নিজের ধর্মে বিরুদ্ধে কথা বলাটাই যেন ধর্মদ্রোহিতার শামিল হয়ে ওঠে।

যে কাবা শরীফ আল্লাহর ঘর, যেখানে হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণ করা হয়; হজ পালনের উদ্দেশ্যে শান্তির আশায় আসে অজস্র মানুষ; সেই ঐতিহ্য কী রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব? আবরাহা সেই চেষ্টাই করেছিল। কিন্তু পেরেছিল কি? হিংসার ফল কখনও ভালো হয় না। যে ঘর আল্লাহর, আল্লাহ নিজে রক্ষণাবেক্ষণ করেন; সেই ঘরকে ধ্বংস করে কার সাধ্য! অলৌকিকতা বলি বা আল্লাহর কুদরত, একদিন ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে।

সাব্বির জাদিদের রচিত “পিতামহ” বইটি যেন ফিরিয়ে নিয়ে যায় ৫০০ খ্রিস্টাব্দের সেই সময়ে। যেই সময় কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, ব্যভিচার ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। দাসপ্রথা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। দাসদের জীবনের এক ঝলক এই বইটিতে উঠে এসেছে তালহার রূপে। দাসদের মানুষ মনে করার প্রচলন তখন ছিল না। মনিবদের সুখের জন্য নিজেদের বিসর্জন দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। যদিও বইটিতে লেখক মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ দেখিয়েছেন। তালহা মনিবের জন্য খাটুনি করে জীবন যায় যায় অবস্থা পরিণত হয়। অন্যদিকে কায়েস তার মনিবকে খুব ভালোবাসে। কেননা উমাইয়া ও তার সন্তানেরা যেখানে তালহাকে খাটিয়ে মারে, অন্যদিকে আবদুল মোত্তালিব নিজের দাসকে সন্তানের মতো মনে করেন।

আবদুল মোত্তালিব এমনই একজন সত্তা। আর ব্যক্তিত্ব ছিল অনন্য। এই ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্বগুণে গুণান্বিত ছিলেন বলেই হয়তো আল্লাহ তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। নাহলে হারিয়ে যাওয়া জমজম কূপের একচ্ছত্র মালিকানা এভাবে স্বপ্নে পাওয়া যায়! তাছাড়া তিনিই ছিলেন অবিশ্বাস্য একজন পুরুষ। যিনি কথার খেলাপ করতেন না। মানুষের জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। সাদা চুলের অধিকারী ছিলেন বলে ছোটবেলা থেকে নাম ছিল শাইবা।

তিনি সবাইকে সমান চোখে দেখতেন। সকল স্ত্রী, সন্তান, পুত্রবধূ, পরিবারের সকলে সমানভাবে তাঁর কাছে গুরুত্ব পেত। কেউ কোনো আবদার নিয়ে এলে ফিরিয়ে দিতেন না। যেকোনো রক্তপণ তিনি আদায় করে দিতেন। ত���নি এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, আল্লাহর কাছে মানত করার কারণে নিজের সবচেয়ে প্রিয় সন্তানকে পর্যন্ত আল্লাহর কাছে কুরবানি দেওয়ার সংকল্প থেকে পিছপা হননি। এরপর কী ঘটেছে, তা অন্য বিষয়।

মানুষের জীবনের মুল্য কোনোকালেই ছিল না। যা অতীত, বা বর্তমান। পশুপাখির চেয়ে মানুষের জীবন সস্তা হিসেবেই ধরা যায়। যে যখন পারছে মানুষকে মারছে। রক্তের এই খেলায় মানুষ খুবই অসহায়। প্রতিশোধের নেশায় যে যখন খুশি যে কাউকে কতল করতে পারে। পুড়িয়ে দিতে পারে বাড়িঘর। আবার যুদ্ধও করতে পারে। যুদ্ধে অসৎ উপায় অবলম্বন করে জিততেও পারে। কোথাও মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই।

“পিতামহ” বইটিতে উঠে এসেছে তৎকালীন আরব সমাজের ধর্মীয় দিক। সেই সময় মূর্তিপূজার প্রচলন ছিল উল্লেখযোগ্য হারে। ওজ্জা, লাত, হোবেল, নায়লা, মানাত, ইসেফদের মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল কাবা শরীফ। সেই সময়ের মানুষের ধ্যানধারণা, জীবনযাপনের চিত্র লেখক বইটিতে তুলে ধরেছেন দারুণভাবে। সেই সাথে ইতিহাস ঐতিহ্য ও উৎসবের দিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। হজের মতো পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ ইবাদতের দৃশ্য লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই সময় মক্কা যেন এক অন্যরকম আভায় পরিপূর্ণ থাকে। সরগরম হয়ে ওঠে প্রতিটি কোণা। ব্যবসা বাণিজ্যের দিক দিয়ে তখনকার যে সময়টা ছিল, লেখকের লেখায় তা পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। এছাড়া মরুভূমির পথেপ্রান্তরে যে কঠিন সময় ওঁৎ পেতে থাকে, লেখক তা-ও দেখানোর চেষ্টা করেছেন। মরু ঝড় কিংবা পানির সংকট; একটু সচেতনতা না থাকলে মৃত্যু অনিবার্য।

ক্ষমতা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। ক্ষমতা পাওয়ার লোভে অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তাই নিজেদের ক্ষমতার দম্ভে অনৈতিক কাজ করা অসম্ভব কিছু নয়। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার নেশায় গোত্রে গোত্রে, জাতিতে জাতিতে লড়াই চলে। বইটিতে লেখক দুইটি ভিন্ন সমাজব্যবস্থা দেখিয়েছেন। একদিকে আরব, যেখানে কোনো কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা নেই। গোত্রের প্রধান বা সরদারের মধ্য দিয়েই এই শাসন প্রচলিত। তাই এখানে রাজনৈতিক কূটচাল খুবই সীমিত। কোনো আক্রমণাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হলে, হাতে অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়া এখানে সহজ। অন্যদিকে রয়েছে ইয়েমেন। যেখানে রাজ্য পরিচালনা করে একজন সম্রাট। আর বাকিসব প্রদেশে গভর্নর নিযুক্ত থাকে। তাই সিংহাসনের লোভ মানুষকে ঘুমোতে দেয় না। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের খেলা এখানে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে।

“পিতামহ” নামটি আবদুল মোত্তালিবকে নির্দেশ করলেও বইটিতে তার বিচরণ খুবই সীমিত। বইটির মূল চরিত্র আমার তালহাকেইমনে হয়েছে। জীবনের অনেক কিছুই তালহা দেখেছে। তালহার এই জীবন বিচরণের মধ্য দিয়েই সেই সময়ের পরিবেশে চিত্র ফুটে উঠেছে। জীবনে প্রেম তো আসে বারবার। কিন্তু টিকে থাকে কি? সাফিয়া, হাম্মাম বা মাইমুনারা এসে থিতু হতে হতেই হারিয়ে যায়।

বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে বিষয়টি লেগেছে, তা হলো এর চরিত্রগুলোর অতীতকে ফুটিয়ে তুলে প্রতিটি চরিত্রকে জায়গা দিয়েছেন। চরিত্রগুলো বাস্তবিক, তাদের জীবনের গল্প তাই মনকে নাড়া দিয়ে যায়। হজরত বেল্লাল (রা) এর মায়ের কথা বা আবু লাহাব, আবু তালিবের নাম তাই জানান দেয়, ভবিষ্যতে তাদের খো গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা আছে। তবে আবদুল মোত্তালিবের ছোটবেলার ঘটনাক্রম একটু বিস্তারিত হলে ভালো হতো। যদিও লেখক তরুণ পিতামহকেই তুলে এনেছেন বইটিতে।

লেখকের ভাষাশৈলী, শব্দচয়ন মুগ্ধ করার মতো। বর্ণনা, উপমার প্রয়োগ যেন মনে গেঁথে যায়। বিশেষ করে প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে নামকরণ যেন বেশ আলোড়ন জায়গায় মনের মধ্যে। এই জাতীয় বইয়ের ক্ষেত্রে শব্দচয়ন যথাযথ হতে হয়। লেখক সেই কাজটি সুনিপুণভাবে করলেও কিছু অংশে হয়তো আরেকটু ভালো হতে পারত। ইতিহাসের অনেক জানা ঘটনা লেখকের উপস্থাপনে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। ঐতিহাসিক উপন্যাস কখনও ইতিহাসের দলিল হতে পারে না। লেখকের স্বাধীনতা থাকে নিজের মতো করে সব সাজানোর। ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে কল্পনাকে ছড়িয়ে দিতে হয়। কাল্পনিক হতে গিয়েও ভ্রান্ত কিছু আবার লেখা যায় না। তাই ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখা আমার কাছে সবসময় কঠিন মনে হয়। সেই কঠিন কাজটিই মুন্সিয়ানার সাথে লেখক করেছেন। দারুণ বললেও কম বলা হয়! কেননা, যে গল্পের সমাপ্তিতে এর রেশ মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়; সেই গল্পটিই তো অনবদ্য এক উপাখ্যান।

পরিশেষে, যখন সবকিছু অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়, মানুষ তখন আলোর খোঁজ করে। বাঁচার জন্য একটি আলো যে প্রয়োজন। সেই আলোর অপেক্ষায় সবাই আছে। কারণ আরব সমাজ ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। কেউ কেউ বাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন, একজন মহামানব আসবে সাম্যের বাণী ছড়িয়ে দিতে। সেই অপেক্ষায় অনেকের মতো আছে তালহাও। ভরসা করে দিন গুনছে, এমন এক সময়কাল দেখে যেতে চায় সে। সময় ঘনিয়ে এসেছে। এই অন্ধকার থেকে উদ্ধার করতে, ঔজ্জ্বল্যকে সঙ্গী করে আসমান থেকে নেমে আসবে ফুটফুটে এক শিশু। পিতামহ যার নাম রাখবেন, মুহম্মদ। আরবে এরূপ নাম এর আগে রাখা হয়নি।

▪️বই : পিতামহ
▪️লেখক : সাব্বির জাদিদ
▪️প্রকাশনী : ঐতিহ্য
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৫/৫
Profile Image for SuMaiya  MarJaan.
11 reviews1 follower
January 3, 2022
"কেউ কেউ মরে গিয়ে সংখ্যাও হয় না" এই গল্পের হাত ধরেই— পিতামহের লেখকের গদ্যের সাথে আমার পরিচয়। গল্পটিতে কি যেন একটা ছিল! আমার ভেতরটা কেমন নড়ে উঠেছিলো তখন। মুগ্ধতায় আমি বিবশ হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিনই বুঝেছিলাম, লেখক তার এই লেখালেখির মধ্য দিয়ে অনেকদূর এগোবেন। খুঁজে লেখকের আইডি বের করে টাইমলাইন ঘুরে তার বেশ কয়েকটি— লেখা পড়ে ভালো লেগেছিলো।
সে অনেক আগের কথা! লেখক মাঝে বই বের করেছেন। আমার পড়া হয় নি।
দুই হাজার বিশে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দাদা আব্দুল মুত্তালিবকে নিয়ে লেখকের, উপন্যাসের ভাষ্যে লেখা ইতিহাসগ্রন্থ "পিতামহ " প্রকাশ পেয়েছে। বইয়ের নাম শোনার পর থেকেই মনে হয়েছিলো, "আলোর পরশ,হাশিম সালমার প্রেমের ফসলের" মতো ইসলাম পূর্ব জাহেলী যুগের ইতিহাস এ বইটিতেও লেখা থাকবে। স্বাভাবিকভাবেই অন্যসব ইতিহাস জানার আগ্রহ থেকে, সে যুগের ইতিহাস জানার আগ্রহ বেশী। অটোগ্রাফ সহকারে সংগ্রহ করবো বলে, সরাসরি লেখকের কাছ থেকেই নিয়ে নিলাম। হাতে পেয়ে দেরি করলাম না। পড়া শুরু করলাম।
পড়তে গিয়ে কতবার যে অজান্তেই চোখ ভিজে উঠেছে! ইয়ত্তা নেই। জমজম প্রাপ্তির ফয়সালা হবার মুহূর্ত! জল টলমলে চোখে এই জায়গাটি বারবার পড়েছি। হামামার পুত্রকে নিয়ে তালহার ভবিষ্যদ্বাণী যে বেলাল রাঃ এর আখ্যানের দিকে ইঙ্গিত করে। এই জায়গাটি পড়তে গিয়ে চোখের পাতা কখন যে ভিজে উঠেছে! জানা নেই। আব্দুল্লাহ বিন শাইবার জবেহের দৃশ্য, কাবার প্রভু কর্তৃক কাবা রক্ষার দৃশ্য চোখের সামনে যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দিলো। কিচ্ছু বলার নেই। আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়েছে বারবার।
.
এতসব ভালোলাগার ভীড়ে কোথাও একটা ছন্দপতন টের পাচ্ছিলাম। যেন সুর ঠিকঠাক বাজছে না। সুরের লয় ছিড়ে ছিড়ে যাচ্ছে। অবশ্য শুরুর দিকের ছন্দপতন লেখক ধীরে ধীরে কাটিয়ে সুরের লয় ফিরিয়ে এনেছেন। আরেকটা ব্যাপার ছিল। যেমন করে "আলোর পরশ" পড়তে গিয়ে মক্কা,মদিনা,আবিসিনিয়া,বেদুঈন পল্লীর অলিগলিতে হারিয়ে গিয়েছিলাম,এই বই পড়তে গিয়ে ঠিক তেমনটা ঘটে নি। কেন এমনটা হলো নিশ্চিত বলতে পারছি না। বিভিন্ন জায়গায় আধুনিককালের কিছু ভাষা ব্যবহারের কারণে হয়তো। অবশ্য তা দোষের কিছু না। এতে বইয়ের মান একটুও ক্ষুণ্ন হয় নি। অথবা এইযে, এতক্ষণ বকবক করে গেলাম। হয়তো তা আ��ার মনের ভুল। পাঠের অযোগ্যতাও বলতে পারি।
জাহেলী যুগের জীবন্ত কন্যাসন্তান প্রোথিত করা, দাসত্ব প্রথা, গোত্রীয় দাঙ্গা,অন্যায় -অনাচারের দৃশ্যগুলো চোখের তারায়— যেরকম জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে, তাতে মনে করি লেখকের লেখা সার্থক। সবচেয়ে বেশী ভালোলাগা ছিলো, প্রতিটি পর্বের শিরোনামের প্রতি। হৃদয় স্পর্শ করার মতো একেকটি শিরোনাম।
তালহার হাত ধরে লেখক আমাদের বারবার নিয়ে গেছেন ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে। কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখেছেন আব্দুল মুত্তালিবকে। এই বিষয়টি হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। মোটকথা,অন্যান্য ইতিহাসগ্রন্থে যেমন একটানা ইতিহাসের বর্ণনা থাকে, পড়তে পড়তে ক্লান্তি এসে যায়। অথবা, উপন্যাসের ভাষ্যে লেখা ইতিহাসগ্রন্থে রগরগে প্রেমের বর্ণনাই মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে,এ বইটিতে দুটোর একটিও ছিল না। মুগ্ধ হয়ে একটানা শেষ করার মতো বইটি।
আমার বিশ্বাস, লেখকের এ বইটি সময়কে জয় করে নিবে। প্রথম বের হওয়া বইয়ের মতো বহুবছর পরও মানুশ আগ্রহ করে পড়বে। বইটি যুগ যুগ ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রাখবে। মক্কা, মদীনার প্রতি লেখকের দিলের টান ফুটে উঠেছে বইয়ের বাক্য বুনন ও বর্ণনায়। দোয়া করি, আল্লাহ্ তাকে শীঘ্রই মক্কা ও মদীনা জিয়ারতের তৌফিক দান করুন।
লেখকের জন্য রইলো শুভকামনা।

-পিতামহ।
-সাব্বির জাদিদ।
-ঐতিহ্য প্রকাশন।
Profile Image for Najmul H Sajib .
60 reviews
November 11, 2020
#অনুভূতির_প্রকাশক

#রিভিউ_নামে_খেজুরে_আলাপ

👉অল্পস্বল্পকথা--

সাব্বির জাদিদের লেখা "পিতামহ" একটি ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস।সুদীর্ঘ ১৫০০বছর আগের আরবের প্রেক্ষাপটে লেখা। লেখক তথ্যসূত্রে ১৮টি বইয়ের কথা তুলে ধরেছেন তাতে বুঝতে পারলাম অনেক পরিশ্রম করেছেন বইটা লিখতে।উপন্যাসটি তিনটি পর্বে বিভক্ত
১.মক্কা-পর্ব
২.ইয়েমেন-পর্ব
৩.যৌথ-পর্ব।
সবচেয়ে বেশি বর্ণনা মক্কা-পর্বেই আছে।আবার প্রত্যেকটা অধ্যায়ের শুরুর আগে থাকা টাইটেলগুলো খুবই আকর্ষণীয়।

উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর দাদা অর্থাৎ কুরাইশ বংশের জনপ্রিয় নেতা আবদুল মুত্তালিব। তালহা,কায়েস,উমাইয়া,সাফিয়া,হুমাইরা,হামামা, সামিরা বিনতে জুন্দুব,আবরাহাসহ আরো কিছু চরিত্রকে মনে হয় জীবনের একেকটা ব্রীজ।চরিত্রগুলি সহজেই পাঠক হৃদয়মাঝে স্থান করে নিবে ইনশাআল্লাহ।

👉লেখককথা--

সাব্বির জাদিদ ভাইয়ার সাথে পরিচয়টা উপরমহলের মাধ্যমেই। কিছু বই সাজেস্ট করে ছিল।যেমন -"ভাঙ্গনের দিন","একটি শোক সংবাদ"।লেখকের জন্ম কুষ্টিয়ায়,লেখাপড়া করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া থেকে, ধর্মতত্ত্বে অনার্স। প্রায় ১০ বছর অধিক সময় ধরে লিখছেন দৈনিক সাহিত্য পাতায়।

👉কাহিনীকথা-

১.
বনু সুলাইলাম গোত্রের একদম্পতি ওসমান-জয়নব, তিনকন্যার জন্মের পর তাদের জীবন্ত কবর দেয়া হয়।কন্যাশোকে একসময় দেবতার নিকট এক কঠিন মানত করে বসেন জয়নব। যদি ছেলে সন্তান জন্ম নেয় তাহলে দেবতার উদ্দেশ্য ১০টি উট কুরবানী করবেন। একসময় জন্ম নেয় "তালহা"। ১০টি উট ঋণ নেয় কুরাইশের এক গোত্রের নেতা উমাইয়ার কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে।কিন্তু ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ওসমানের পরে নিয়তির নিষ্ঠুরতায় মাত্র ১২ বছর বয়সে উমাইয়ার বাড়ির দাস হয় তালহা। তালহা উমাইয়ার বাড়ির ভেড়ার পাল দেখাশুনা করত।
উমাইয়া ও তার ছেলেরা তালহার সাথে কঠোর আচরণ করত কিন্তু উমাইয়াকন্যা 'সাফিয়া' ছিল ব্যতিক্রম,কোমল প্রকৃতির।যার হৃদয় তালহার জন্য অহরহ ব্যথিত হতো।
সমবয়সীপ্রায়, তালহার ভদ্রতা, সততা সাফিয়াকে মন্ত্রমুগ্ধ করে।সাফিয়া আকারে-ইঙ্গিতে তালহাকে তার আবেগ-অভিভক্তির কথা বুঝাতে চেষ্টা করে, তবে তালহা সবই বুঝে নিরবতা দিয়ে বাস্তবতায় পথ খোঁজে। তালহা জানে মনিব-দাসের গন্তব্য কখনও এক হয় না।

তালহার উমাইয়ার দাসত্বে থেকে বন্ধু বলতে একজনই আছে নাম 'কায়েস'। ভেড়ার পাল চড়ানোর সময় দুজনের গভীরতর বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।কায়েসের জন্ম হাজারা মাউতে কিন্তু তার নিয়তির কারণে এখন মক্কায়। কায়েসের পিতা মৃত্যুবরণ করেন এক ডাকাতদলের আক্রমণে প্রতিরোধ করতে গিয়ে। তার মা আর কায়েসকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয় ডাকাতদল । কায়েসের মনিব মক্কার সরদার আব্দুল মুত্তালিব, কায়েসের সাথে তার মনিব কখনোই দাসের মতো আচরণ করেনি।আবদুল মুত্তালিবের ব্যবহার ছিল অমায়িক। তিনি অন্য দাসদের থেকে কায়েসকে অত্যন্ত পছন্দ করতেন।

২.
আবদুল মুত্তালিবের জন্মটা ইয়াসরিবে মাতুলালয়ে। জন্মের সময় মাথাভর্তি শুভ্র চুল দেখে মাতা 'সালমা বিনতে আমর' ছেলের নাম রাখেন শাইবা।শাইবার মাতা বিয়ের সময় একটা শর্তজুড়ে দেয় শাইবার পিতা হাশিমকে -
"তিনি পিতৃগৃহে সর্বদা থাকবেন মক্কায় যাবেন না কখনই"।
শর্তসাপেক্ষে তিনি কখনোই মক্কা যাননি। বালক শাইবাকে তার চাচা মুত্তালিব মক্কায় নিয়ে আসেন। দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার ফলে শাইবার দেহসজ্জায় ধুলোবালিতে ভরপুর হয়ে যায়।আরবের লোকজন তাকে মুত্তালিবের নব্য কেনা দাস ভাবতে শুরু করে।

তখন আরবের দাসদের অমুকের দাস বলে ডাকার সুবিধার জন্য মনিবের নামের আগে আবদ্ শব্দ লাগানো হতো।যার ফলে শাইবা হয়ে উঠে "আবদুল মুত্তালিব"। কাবাঘরের ভবিষ্যৎ নেতার কথা বিবেচনা করে ভাতিজা শাইবাকে ঠিক মনে করেন চাচা মুত্তালিব।

আবদুল মুত্তালিব বাল্যকাল থেকেই সবার হৃদয় জয় করেন। পরিশ্রমী, ভদ্র, শান্ত প্রকৃতির,ধৈর্য্যশীল সব গুণাবলিতে আবদুল মুত্তালিবে বিদ্যমান।পরিণত বয়সে তার পিতার দায়িত্ব হজের সময় হাজীদের আহারকার্য পরিচালনার কাজ করেন। অল্পদিনেই আরবসহ অন্যান্য অঞ্চলে তার সুনাম ছড়িয়ে পরে।দরিদ্রদের সাহায্য, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো হয়ে উঠে তার অন্যতম কাজ।

৩.
আল্লাহ তায়ালা স্বপ্নের মাধ্যমে জমজম কূপের সন্ধান দেন আবদুল মুত্তালিবকে।(বইটা পড়লে টুইস্ট পাবেন এখানে) এবং একসময় জমজম কূপ আবিস্কার করেন কিন্তু আরবের কুরাইশ নেতারাও কুয়ার মালিকানা দাবি করে ।এই বিষয়টা মীমাংসিত হয় এভাবে শামের এক বিচক্ষণ নারী জ্যাোতিষীর সিদ্ধান্ত সবাই মেনে নিবে।

নির্দিষ্ট দিনে সকল গোত্রের লোকবল নিয়ে শামের উদ্দেশ্য যাত্রা করে আবদুল মুত্তালিব ও তার দাস কায়েস।আব্দুল মুত্তালিবের মিত্রগোত্রের সাথীদের মুর্খতা,উটের অসুস্থতা, একসময় পথ হারিয়ে পানিশূণ্য হয়ে পড়ে সবাই অজানা মরুভূমিতে।ভবিষ্যৎ আশঙ্কা করে সবাই মৃত্যুর জন্য নিজের কবর খোঁড়া শুরু করে। কিন্তু আবদুল মুত্তালিবের উটের তলা থেকে অলৌকিকভাবে পানি বের হওয়া শুরু হলে সবাই বুঝতে পারে জমজমের মালিক একমাত্র আবদুল মুত্তালিব হবে এটা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা চান।যার ফলে কেউ আর আবদুল মুত্তালিবের বিরুদ্ধাচারণ করেনি।

৪.
জমজম কুয়ার কাজে ও শাম যাত্রায় মনিবের প্রতি কায়েসের অতিভক্তি মুগ্ধ করে আবদুল মুত্তালিবকে। তিনি কায়েসকে মুক্তি দান করেন দাসত্ব থেকে।
উমাইয়াকন্যা সাফিয়া ও আবদুল মুত্তালিবের চেষ্টায় একসময় তালহাও দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে শর্তসাপেক্ষে ।আবদুল মুত্তালিব থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে কায়েস এবং জড়িয়ে যায় তালহার বোন হুমাইয়ার সাথে প্রণয়ে। হজের পরই তাদের বিয়ে সবকিছুই আগে থেকেই ঠিকঠাক হয় ।

হজ মৌসুমে প্রত্যেক বছর মক্কায় বৃহৎ মেলা হয়, বসে কবিদের কবিতাপ্রতিভা দেখানোর সুযোগ।এই মেলাতে তালহা,হুমাইরা আর কায়েস এসেছিল এবং কারণবশত তালহা থেকে যায় মেলাতে। মেলা দেখে রাতে ফেরার পথে উমাইয়াপুত্র সুফিয়ানের আক্রমণে হুমাইরা আর কায়েস মারা যায়। মৃত্যুর পূর্বে তালহাকে হুমাইরা সুফিয়ানের নাম বলে যায়।
তালহা উমাইয়ার বাড়িতে গিয়ে সুফিয়ানকে হত্যা করে এবং সাফিয়াকে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর ফলে তালহাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। সুফিয়ানকে হত্যার ফলে উমাইয়া তালহাদের বাড়িতে আগুন দিয়ে তার বাবা-মা,দাদি ও ছোট ভাইকে পুড়িয়ে হত্যা করে। পরিবার হারিয়ে তালহা পাড়ি দেয় অজানার পথে....

৫.
পলাতক তালহা মক্কা থেকে পৌঁছে যায় সুদূর মাআরিবে। বিপদ থেকে রক্ষা করে পরিচয় হয় হামামার সহিত, হামামার চাচা আবরাহা মাআরিবের গভর্নর। আবরাহার শয়নে স্বপনে জাগরণে শুধুই ইয়েমেনের সম্রাট হওয়ার তীব্র লোভ।
আবরাহার স্বপ্নপূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে স্বয়ং তালহা। একসময় অন্যায়যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আবরাহা ইয়েমেনের সম্রাট হন এবং তালহাকে রাষ্ট্র��র গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দেয়।কিন্তু তালহাকে ধর্মদ্রোহী বলে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং বেদনাদায়ক শাস্তিস্বরুপ হাতের আঙুল কেটে নেয়।

সুদীর্ঘ ৫বছরের কারাবাসের পর হামামার সহায়তায় কারাগার থেকে পালাতে সক্ষম হয় তালহা। কিন্তু পালাতে গিয়ে একসৈন্যের আক্রমণে রক্তাক্ত হয়ে তুবাইক পাহাড়ের নিচে পড়ে থাকে জীবন্মৃত হয়ে। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে এক বেদুঈন পল্লীর সরদার শেইখ সামির এবং তার একমাত্র কন্যা মাইমুনা। সরদার কন্যার সেবাযত্নে তালহা সুস্থ হয়ে উঠে। একসময় মাইমুনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় তালহা।

৬.
ইয়েমেনে সম্রাট আবরাহা অতিশয় এক গির্জা তৈরি করে মূলউদ্দেশ্য মক্কা ছেড়ে পৃথিবীর মানুষ তার এই গীর্জায় হজ পালন করবে। কিন্তু কাবার প্রতি মানুষের ভালোবাসার দরুন গীর্জায় আবরাহার ডাকে কেউ সারা দেয় নি।নব্য নির্মিত গীর্জায় মলত্যাগ করে কেউ এবং তালহারা আক্রমণ করে পালিয়ে যায়।

আবরাহা ধারণা করে মক্কার মানুষের এই কাজ। তখন বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে মক্কার পথে যাত্রা করে কাবাঘর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে। আবদুল মুত্তালিবের উট চারণভূমি থেকে চুরি হলে আবরাহা থেকে ফেরত নিয়ে বলেন,কাবার মালিক কাবাকে রক্ষা করবেন।
আবরাহার বাহিনী কাছাকাছি আসার আগেই মক্কার সমস্ত মানুষ একটি পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। হস্তীবাহিনী কাবা আক্রমণ করলে ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট ছোট আসমানি পাখিরা এসে পাথর নিক্ষেপ করে আবরাহার বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়, আবরাহাসহ অনেকে পালিয়ে যায়।কিন্তু একসময় সবাই মৃত্যুবরণ করেন।

তালহাকে দিয়ে উপন্যাসের সূচনা হয় আবার ইতি টানেন তালহাকে দিয়েই।
সাফিয়া তার স্বামীকে খুন করে পালানোর সময় তালহার সাথে দেখা হয়।দুজন পাড়ি দেয় নবজীবনের সন্ধানে...

উপন্যাসের লাস্ট দুটি লাইন তুলে ধরলাম--

"সুবহে সাদিকের সময় তালহা ও সাফিয়া ইয়াসরিবের উদ্দেশ্যে ঘোড়ায় চড়ে বসে। আর ঠিক তখনই আসমান ছিঁড়ে মা আমেনার কোলে নেমে আসে এক বেহেশতি শিশু"

(বিঃদ্র- "পিতামহ" পড়ার পর আপনার পছন্দসই একটা সীরাত পড়া বাধ্যতামূলক মনে করি। রেইনড্রপসের সীরাহটা বেশ সুন্দর )

👉চরিত্রকথন-

১.
আবদুল মুত্তালিব সম্পর্কে বলার তো কিছুই নাই জাস্ট ওয়াও।প্রত্যেকটা গুণাবলি আবদুল মুত্তালিবে বিদ্যমান। একজন মানুষ কতটা মহৎ প্রকৃতির হতে পারে বুঝতে পারলাম।

২.
উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র তালহা।উপন্যাসের শুরু-শেষ হয়েছে তালহার মাধ্যমে । তালহা ও আবদুল মুত্তালিব সম্পর্কে জানতে উপন্যাসই শ্রেয়।

৩.
কায়েস চরিত্রটা খুবই ইন্টারেস্টিং লেগেছে আমার কাছে। হাসিখুশি,সাহসী কিন্তু জীবনে লুকিয়ে আছে বেদনাময় কাব্য। কিন্তু তার শেষ পরিণতিটা বেদনাদায়ক।

৪.
সামিরা বিনতে জুন্দুব অর্থাৎ আবদুল মুত্তালিবের ১ম স্ত্রী। কঠিনতম সময়ে স্বামীকে সহায়তা করায় তার তুলনা হয়না।

৫.
উমাইয়াকন্যা সাফিয়া চরিত্রটা কোমলপ্রাণ।তালহার দাসত্বের সময় সবচেয়ে হেল্প করেছে সাফিয়া।যাই হোক সাফিয়াকে উপন্যাসে ডুবেই খুঁজে নিলেই ভালো হবে।

৬.
হুমাইরা,হামামা, মাইমুনা, ফাতেমা চরিত্রগুলো নজর করা।
হামামা ছিল সম্রাট আবরাহার ভাতিজি ভাগ্যক্রমে সে একসময় হয় মক্কার দাসী।একসময় তার গর্ভে জন্ম নেয় ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বিলাল(রা.)।
হুমাইরা হলো তালহার বোন। মাইমুনা হল বেদুইন সরদারকন্যা এবং তালহার স্ত্রী। তার পরিণতি ছিল গর্ভাবস্থায় মৃত্যু।ইয়াসরিবে ফাতেমার সেবায় মৃত্যু থেকে তালহা বেঁচে ফিরে তালহা। ফাতেমা চরিত্রটাও দারুণ।

আরো অনেক চরিত্র আছে জানতে পারেন "পিতামহ" এ ডুব দিয়ে।☺

👉অগোছালোকথা

উপন্যাসের সবচেয়ে আর্কষণীয় চরিত্র তালহা। লেখকের লেখার জাদুতে তালহাকে সমস্ত আবেগ ঢেলে চিত্রিত করেছেন।
"সুখ সে তো ক্ষণিকের জন্য জন্য আসে দুঃখই যেন চিরসাথী"
এই কথাটি তালহার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।তালহা চরিত্রটাই সবার মনে দাগ কাটে।

"যে জীবন ফরিঙের" ও "সিদরাতুল মুনতাহার হলুদ পাতারা" পর্বটা পড়ার সময় বিষন্নতায় ছুঁয়ে যায় মন।

"কুমারিত্বের পরিক্ষা" পর্বটা পড়ে হাসতে হাসতে শেষ।😂 এই জন্যই তো যুগটারে অন্ধকারাচ্ছন্ন জাহেলিয়াত বলে।

👉মনের কথা

সাব্বির জাদিদের চমৎকার বর্ণনা আর চরিত্রচিত্রণ খুবই নান্দনিক। বেশি কিছু বলবো না শুধু বলে রাখি লেখকের এই বইটার জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাকে মনে রাখবে আজীবন।

👉সমালোচনা নহে অভিমত

১.
আবরাহার মক্কা আক্রমণের বর্ণনা একটু সময় নিয়ে শেষ করতে পারতেন।তাড়াহুড়ো করেছেন মনে হল।
২.
মাইমুনা-তালহার মিলনের বর্ণনাটা একটু দৃষ্টিকটু লাগল।
৩.
" অন্ধ উনাইসের ভিক্ষাবৃত্তির ঘটনা নবি মুহাম্মাদের স্ত্রী আয়েশা আমাদের জানাবেন "
এই বাক্যে দরূদ শরীফ লেখা এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার নাম নেয়া উচিত ছিল। নেক্সট সংস্করণে ঠিক করার অনুরোধ রইল লেখকের প্রতি।

পরিশেষে "পিতামহ"কে স্বয়ং বিচার করুন প্রিয় পাঠক।

বইয়ের নামঃ পিতামহ
লেখকঃ সাব্বির জাদিদ
প্রকাশনীঃ ঐতিহ্য
প্রকাশঃ২০ বইমেলা
প্রচ্ছদ মূল্যঃ ৮০০ টাকা
পৃষ্ঠাঃ ৫২৪
প্রচ্ছদ-কাজী যুবাইর মাহমুদ

©নাজমুল হাসান সজিব
Profile Image for Rehnuma.
449 reviews26 followers
Read
October 10, 2024
❛নেতার চরিত্র জন্ম থেকেই হয়তো বোঝা যায়। বোঝা যায় তার প্রজ্ঞা, ব্যক্তিত্বের বিশালতা। ছোটো থেকেই একজন নেতার চরিত্রে এমন কিছু প্রকাশ পায় যা তার ভবিষ্যতে যোগ্য নেতা বা সর্দার হওয়ার আগাম বার্তা দেয়। তেমনই একজন ছিলেন শাইবা ইবনে হাশিম।❜


খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় ৫০০ বছর পরের কথা। সালটা ৪৯৭। ইয়াসরিবের (বর্তমান মদীনা) সবুজ ভূখন্ডে সালমা এবং হাশিমের কোল আলো করে এলো এক অদ্ভুত শিশু। আরব সেই শিশুর মাথাভর্তি সাদা চুল। তাই দেখে মা জননী তার নাম রাখলেন ❛শাইবা❜ অর্থাৎ ❛সাদা চুলের অধিকারী❜।

ইয়াসরিব শাইবার মামার বাড়ি। এই বাড়িতেই বেড়ে উঠতে থাকে সে। পিতার ওকাল মৃ ত্যুর পর মা এবং মামার নিরাপদ ছায়ায় শৈশবের ১৪ বছর পার করে সে। এরপর একদিন মক্কা থেকে হাজির হয় হাশিমের ভ্রাতা মোত্তালিব। ভাতিজাকে মক্কায় নিয়ে যেতে চায়। চাচার সাথে শুরু হয় শাইবার মক্কা যাত্রা।
পথিমধ্যে ধুলো, রোদ আর পথের ক্লান্তিতে সৌম্য সুদর্শন চেহারার শাইবার দশা হয় একদম ধুলোর আস্তরণ পড়া মানুষের মতো। মক্কার লোকেরা তাকে দেখে ভাবে গোত্রের সর্দার মোত্তালিব বুঝি নতুন দাস কিনে এনেছে। সবাই ছেলেটিকে ❛আবদুল মোত্তালিব❜ (মোত্তালিবের দাস) নামে ডাকতে শুরু করে। ছেলেটিকে পরিষ্কার করে মক্কাবাসীর সামনে তার আসল পরিচয় তুলে ধরলেও চাউর হয়ে যাওয়া নামটিই লোকমুখে উচ্চারিত হতে থাকে। একসময় শাইবা নামটি বিস্মৃত হয় সবাই। মহাকাল তাকে চিনে আবদুল মোত্তালিব হিসেবে। যে কিনা মুসলিম ধর্মের প্রেরিত পুরুষ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) এর পিতামহ।

শাইবার সময়ের মক্কা ছিল স্মরণকালের সবথেকে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে। যাকে বলে আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ। ম দ্যপান, ব্য ভি চার, মূর্তিপূজা, জীবন্ত কন্যা শিশুকে ক বর দেয়া, দা ঙ্গা, ক্ষমতার ল ড়া ই, প্রেম-দ্রো হ, কাব্যযুদ্ধ থেকে শুরু করে নানা কর্মে লিপ্ত ছিল আরববাসী। সেই সময়েই সচ্চরিত্র, নিষ্ঠাবান, যোগ্য এক নেতারূপে বেড়ে উঠেছিলেন আবদুল মোত্তালিব তথা শাইবা। পারিবারিক ধারা অনুযায়ী যিনি লাভ করেছিলেন কাবার সেবায়েতের সম্মান। অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে এবং নিষ্ঠা নিয়ে পালন করতেন সে কাজ। সাথে সামাল দিতেন গোত্রের সংঘাত এবং যারা ছিনিয়ে নিতে চাইতো তার এই সম্মান।

মক্কার ইতিহাসে অলৌকিক ঘটনার অন্যতম ছিল শিশুপুত্র ইসমাইলের (আ) ছোট্ট পদাঘাতে তৈরি জমজম কূপ। আরবের ধূ-ধূ মরুভূমিতে জমজম কূপ ছিল আল্লাহর এক আশীর্বাদ। কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায় সেই পানির ধারা। আল্লাহ্ শাইবাকে স্বপ্নের মাধ্যমে সন্ধান দেন সেই স্বর্গীয় পানির ধারার। এক ভোরে পুত্রকে নিয়ে সে পুনঃআবিষ্কার করেন জমজম কূপ।
মক্কা তখন পানির অভাবে ধুকছিল। সামনেই হজ। কী করে হজ যাত্রীদের পানির খোরাক মিটাবেন সাথে মক্কাবাসীর পানির অভাব পূরণ করবেন তাই নিয়ে যখন চিন্তায় মশগুল তখনই আল্লাহর দেখানো স্বপ্নের মাধ্যমে পেয়ে যান ইসমাইলের আমলের এই বারিধারার।
মক্কার ক্ষমতার ল ড়াইয়ের ভিড়ে আর রাজনীতিতে আল্লাহর দেয়া এই সম্মানে ভাগ বসাতে আসে কোরাইশ গোত্রের অন্যান্য সর্দারেরা। আল্লাহর দেয়া এই সম্মানের অংশীদার কাউকে করতে চান না শাইবা। তাই এক মানত করে বসেন।

❛আল্লাহ্ যদি তাকে দশটি পুত্র সন্তান দান করেন, এবং পিতাকে শ ত্রু থেকে বাঁচানোর মতো বলবান যদি তারা হয়ে ওঠে, তবে তিনি তাদের থেকে একজনকে আল্লাহর নামে কোরবানি দিবেন।❜

আল্লাহ্ তার মনের আশা পূরণ করেন। এক অলৌকিক ঘটনার মধ্যে দিয়ে জমজম কূপের মালিক হন আবদুল মোত্তালিব। কিন্তু নিজের করায়ত্তেই রেখে দেন না এটি। উন্মুক্ত করে দেন সারা বিশ্ববাসীর জন্য।
আবদুল মোত্তালিব ধনে মানেই শুধু বড়ো ছিলেন না। বড়ো ছিলেন মনেও। তার দাসদের সাথে তিনি তৎকালীন আরব মালিকদের মতো আচরণ করতেন না। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ কায়েস। কায়েসের সাথে তার ব্যবহার ছিল পিতা পুত্রের মতোন। কায়েসের বিচার বুদ্ধি গুণ দেখে তাকে মুক্ত করে দেন তিনি। যে ছেলেটা শৈশবেই পিতাকে হারিয়েছে দূরদেশে। মা বিক্রি হয়েছে কোনো দাস বাজারে। তার জীবনের দুঃখ দূর করতে শাইবা যে অবদান রেখেছেন তা অনন্য। কিন্তু নিয়তির খেলা এড়ায় কে? তার ভাগ্যে যেন লেখা ছিল ভিন্ন পরিণতি। সিদরাতুল মুনতাহার পাতার হলুদাভ যেন আগেই ছিল তার ভাগ্যে। যেমন ছিল উমাইয়ার দাস তালহার ভগ্নী হুমাইয়ার ভাগ্যে।
আরব তখন মূর্তিপূজার আখড়া। লাত, মানাত, ওজ্জা, হোবল, নায়েলা, ইসেফ দেবতার পূজা করা হতো। তারা আল্লাহকেও মানতো। তাদের ধারণা ছিল সবার মূল আল্লাহ্। আল্লাহ্ অনেক দূরের। তাই বাকি দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করলে সেটা তারা আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেয়। কাবাঘরেও আসন পেয়েছিল অসংখ্য মূর্তি। ছোট্ট শাইবা মাঝেমাঝে এই মূর্তিদের আদতেই কোনো ক্ষমতা আছে নাকি ভাবতেন। তৎকালীন আরবে এই কথা প্রকাশ্যে বলার শাস্তি ছিল ভয়াবহ।

সময় ঘুরে দশটি পুত্র সন্তানের গর্বিত পিতা হোন শাইবা ওরফে আবদুল মোত্তালিব। এই ঘটনা প্রায় পুনরাবৃত্তি করে ইতিহাসের ইব্রাহিম (আ) ও ইসমাইলকে (আ)। কোরবানি করতে নাম উঠে তার প্রিয় পুত্র আবদুল্লাহর। এরপর বারবার লটারি করতে করতে একশ উটের বিনিময়ে রক্ষা পায় আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মোত্তালিব। তারই মাধ্যমে আরো অনেক বছর পর মক্কার কোরাইশ বংশে জন্ম নিবে আমাদের নবী (স)। ইতিহাসের কী অদ্ভুত খেলা!

সেই সময়ের আরবে উমাইয়ার দাস ছিল তালহা। দাস হওয়ার পিছে তার ঘটনা ছিল হৃদয়বিদারক। যা তৎকালীন আরবের সুদ প্রথাকে মনে করিয়ে দেয়। দাসদের সাথে নিচু ব্যবহার, তাদের বঞ্চিত করার চিত্র ছিল সে সময়। তালহা এমনই এক মালিকের দাস ছিল। মক্কায় তার প্রিয় ছিল মালিক কন্যা সাফিয়া। সাফিয়া তাকে প্রশ্রয় দিতো। অসম এই কাহিনীর পরিণতি আদতেই কি ভালো ছিল?
অনেক কাঠখড় পেরিয়ে তালহার জীবনের বাঁক ঘুরে চলে। মক্কায় হৃদয়বিদারক ঘটনার পর সে চলে যায় ইয়েমেন। সেখানের রাজনীতির পরিবর্তনের অন্যতম চরিত্র হয়ে যায়। গর্ভনর থেকে সম্রাট বনে যায় আবরাহা। যাকে সাহায্য করেছিল তালহা। সেখানেও দীর্ঘকাল থাকার পর এক ঘটনায় বন্দী হতে হয় তাকে। আবারো সময় পেরিয়ে পালিয়ে সে আশ্রয় নেয় বেদুইন পল্লীতে। সময়ের চক্রে ঘুরে বয়স বাড়ে তার, বাড়ে স্মৃতি আর দুঃখ। আবার হাজির হয় মক্কায়।

মক্কায় তখন চলছে ভয়ানক সময়। ইয়েমেনের সম্রাট আবরাহা মক্কার কাবা আর হজকে টক্কর দিতে তৈরি করেছিলেন গির্জা। এই নিয়ে সংঘাতে বাঁধে। তখন সে ঘোষণা দেয় গুড়িয়ে দিবে কাবা। ষাট হাজার সৈন্য আর দশটি হাতি নিয়ে সে আসে মক্কায়। তখনও মক্কার নেতা আবদুল মোত্তালিব। জীবনের চক্রে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন তিনি। আবরাহার সাথে মোত্তালিবের এই ঘটনার বর্ণনা আমরা পাই সুরা ফিল-এ।

❛আবদুল মোত্তালিব বললেন, আপনার সৈন্যরা আমার দুশো উট লুট করেছে। আমি উট ফেরত চাই। আবরাহা বলেন, আমি আপনাদের উপাসনালয় ধ্বং স করতে এসেছি, অথচ আপনি সামান্য উটের চিন্তা করছেন। কেমন নেতা আপনি! আবদুল মোত্তালিব বললেন, আমি উটের মালিক, তাই আমার চিন্তা উট নিয়ে। কাবাঘরের মালিক যিনি, তিনি তার ঘর সামলাবেন।❜

এমন বক্তব্যে আবরাহা অবাক হয়ে যান। এরপরেও কাবাঘর আক্রমণ করতে আসলে তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। আবদুল মোত্তালিব সহ মক্কাবাসীর দোয়া বৃথা যায় না। আকাশ থেকে আবাবিলের ঝাঁক তাদের থাবায় কঙ্কর নিয়ে হাজির হয়। শেষ হয়ে যায় আবরাহা বাহিনী। নিরাপদ থাকে কাবা।
আরো একবার অলৌকিক ঘটনা দৃশ্যমান হয় মক্কার জীবনে। প্রৌঢ় মোত্তালিবের ঘরে তখন মা আমেনার কোলে জন্ম নেয় আবদুল্লাহর সন্তান। যার নাম তিনি রাখেন মুহাম্মদ। আমাদের নবী কারীম (স) তার পিতামহের ছায়ায় ছিলেন শৈশবের আটটি বছর। এরপর জীবনপ্রদীপ নিভে যায় সফেদ চুলের অধিকারী মক্কার অবিসংবাদিত নেতা শাইবা ওরফে আবদুল মোত্তালিবের।

মক্কায় সে সময় থেকেই লোকমুখে প্রচলিত ছিল শেষ জমানার একজন নবী আসবেন। যে কিনা আরবের কুসংস্কার দূর করবেন। যেমন জীবন তালহা চেয়েছিল। বৈষম্যহীন। দূরের ধূ-ধূ বালিতে তালহা অপেক্ষা করে আছে সেই প্রেরিত পুরুষের আগমনের। সাথে কে আছে? যার সাথে ইয়াসরিবে অপেক্ষা করবে সেই পুরুষের আগমনের।



পাঠ প্রতিক্রিয়া:

❝পিতামহ❞ সাব্বির জাদিদের লেখা ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস। যেখানে উঠে এসেছে তৎকালীন আরবের এক চিত্র।
নাম দেখে অনেকেই মনে করতে পারেন (আমিও) এটি নবীজীর (স) পিতামহের জীবনীগ্রন্থ। তবে পড়ার সময় সে ধারনা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

বইটি তিনটি পর্বে বিভক্ত। মক্কা, ইয়েমেন এবং যৌথ পর্বে দারুণ সব শিরোনাম দিয়ে বইটি সাজিয়েছেন লেখক।
উপন্যাসের কাহিনি শুরুই হয়েছে উমাইয়ার দাস তালহা ইবনে ওসমানের ঘটনা দিয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় শেষও হয়েছে তাকে দিয়েই। তাই মোটাদাগে একে শুধু আবদুল মোত্তালিবের জীবনী বলা যায় না। ইতিহাসের ঘটনা নিয়ে নিজের কল্পনা মিশিয়ে চমৎকার এক উপন্যাস বলা যায়।
যেখানে স্থান পেয়েছে মক্কার জীবন, সে সময়ের অন্যায়ের চিত্র, রাজনীতি, সংস্কৃতি, মূর্তিপূজা, খ্রিস্টান ধর্মের বিস্তার।
লেখকের পড়া প্রথম উপন্যাস এটি। সন্দেহাতীতভাবেই লেখকের বাচনভঙ্গি, উপমার প্রয়োগ সর্বোপরি লেখার ধরন আমাকে মুগ্ধ করেছে।

উপন্যাসে মূল চরিত্রের আসন দখল করেছিল আবদুল মোত্তালিব। তবে তার উপস্থিতি থেকেও বেশি উপস্থিত ছিল তালহা। বলা যায় উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র তালহা। উপন্যাসের একটা পর্ব প্রায় পুরোটাই তালহার জীবনের উত্থান পতন পরিবর্তন নিয়ে এগিয়েছে। যেখানে এসেছে মোত্তালিব। তার যৌবন থেকে বার্ধক্যের নানা সময় এসেছে। এসেছে তার ���ীবনের নানা মোড়, ঘটনা গুলো।
লেখকের লেখায় সে সময়ের আরবের চিত্র বেশ ভালো ভাবে প্রকাশ হয়েছে। যখন মানুষ আল্লাহর সাথে ওজ্জার কসম খেতো। লাতের লানত নিক্ষেপ করতো। লেখকের লেখার কৌশলে সে সময়ের মানুষের জীবনযাপন, ধ্যান ধারনা, কথার ধরন উঠে এসেছে।
মক্কার মরুর ধূ-ধূ প্রান্তর, পানির কষ্টে থাকা মানুষের বিলাপ, জমজম কূপ আবিষ্কারের পর হওয়া রাজনীতি সবকিছু দারুণভাবে লিখেছেন। ঘটনাগুলোর প্রায় সবই জানা ছিল। বিশেষ করে পিতামহের জীবনের ঘটনা। ইতিহাস বিস্মৃত ঘটনাগুলো এখানে এসেছে। তালহা সহ সে সময়ের নবী আগমনের পূর্বাভাস, তাই নিয়ে মূর্তিপূজকদের চিন্তা এবং নবী আগমনের জন্য অপেক্ষমান মানুষগুলোর অভিব্যক্তি গুলো লেখক নিপুণতার সাথে তুলে ধরেছেন।

তবে আমার মনে হয়েছে এখানে শাইবার কিশোরকালের বর্ণনা আরো কিছুটা প্রাধান্য পেতে পারতো। বইয়ের নামটা যেহেতু মূল চরিত্র হিসেবে শাইবাকেই নির্দেশ করে সে হিসেবে উপন্যাসে তার উপস্থিতি সেভাবে ছিল না। টাইম ল্যাপসের মতো তার ঘটনা গুলো ঘটে গেছে। সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে তালহা। তার শৈশব, কৌশর, যৌবন, মধ্যবয়সের সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উঠে এসেছে। উঠে এসেছে যায়েদের কথা, বেলাল (রা) এর মায়ের কথা। তালহাকে যতটা অনুভব করতে পেরেছি সেরকমভাবে মূল চরিত্র ধরা দেয়নি। তবে তাই বলে উপন্যাস পাঠের অনুভূতি ফিকে হয়ে যায়নি। লেখকের বর্ণনা, ইতিহাসের অলিগলিতে সামনের ঘটনাকে জানান দেয়ার ধরন দারুণ লেগেছে। মুগ্ধ হয়ে পড়ে গেছি লেখাটা।

পড়ার সময় সবথেকে দারুণ লেগেছে উপমার প্রয়োগ। জীবনের অবসান বুঝাতে ❛সিদরাতুল মুনতাহার পাতার হলুদ হয়ে যাওয়া❜ কে যেভাবে উল্লেখ করেছেন দারুণ ছিল।
শেষটা তাড়াহুড়ো ছিল। আবাবিলের ঘটনা আরেকটু দীর্ঘায়িত করা যেত। এই ঘটনা থেকেই যে মক্কাবাসী হাতিবর্ষ গুনত সেগুলোর উল্লেখ থাকতে পারতো (নেই তাতে সমস্যা নেই)।
পুরোটা পড়ার পর পাঠক অবশ্যই তৃপ্তি পাবেন। ইতিহাসের আলোকে সত্য এবং কল্পনার সুন্দর মিশ্রণে লেখা উপন্যাস একবার পাঠ করলে অভিজ্ঞতা মন্দ হবে না।


❛পিতামহের চারিত্রিক গুণাবলী কিছুটা হলেও কি আমাদের নবী (স) এরমাঝে প্রভাব ফেলেছিল কি? যার পিতামহ এত মহান তার নাতি তো আল্লাহর প্রেরিত বিশেষ পুরুষ হবেনই।❜


Profile Image for Mehedi Hasan Bappi.
42 reviews
May 24, 2025
আব্দুল মোত্তালিব বললেন, আপনার সৈন্যরা আমার দুশো উট লুট করেছে। আমি উট ফেরত চাই। আবরাহা বললেন, আমি আপনাদের উপাসনালয় ধ্বংস করতে এসেছি, অথচ আপনি সামান্য উট নিয়ে চিন্তিত। কেমন নেতা আপনি?! আব্দুল মোত্তালিব বললেন, আমি উটের মালিক, তাই আমার চিন্তা উট নিয়ে। কাবা ঘরের যিনি মালিক, তিনি তার ঘর সামলাবেন।


বই : পিতামহ

লেখক: সাব্বির জাদিদ

প্রকাশনী: ঐতিহ্য

পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৫২৮

মূল্য: ৯৫০ টাকা

ব্যক্তিগত রেটিং: ৪.৭৫/৫

জনরা: ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস



৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে ইয়াসরিবের সবুজ ভূখণ্ডে জন্ম নেয় এক আশ্চর্য শিশুপুত্র, যার মাথা ভর্তি ছিল শুভ্র চুল। এই শিশুর নাম রাখা হয় শাইবা, আর সেই শাইবাই পরিণত বয়সে হয়ে ওঠেন জাহিলি আরবের কিংবদন্তিতুল্য নেতা – আব্দুল মোত্তালিব।

‘পিতামহ’ মূলত এই মহান নেতার জীবননির্ভর ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস। আব্দুল মোত্তালিব এমন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যখন গোটা আরব উপদ্বীপ এক অগ্নিগর্ভ সময়ের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছিল। কন্যা শিশু হত্যা, গোত্রীয় দাঙ্গা, কৌলিন্য প্রথা, প্রেম-দ্রোহ, দাসপ্রথা, হস্তীবাহিনীর আক্রমণ এবং নবীর আগমনের পূর্বাভাস—সব মিলিয়ে ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল মক্কা।


পাঠপ্রতিক্রিয়া :

প্রথমেই যদি নামকরণের দিকে যাই বইটি হওয়ার কথা ছিলো আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর দাদাকে নিয়ে। কিন্তু উপন্যাসে তিনি কম গুরুত্ব পেয়েছেন। যেহেতু এটি ইতিহাস আশ্রিত ফিকশন তাই তালহা নামে এক কাল্পনিক চরিত্র এসেছে উপন্যাসে এবং তালহা-ই উপন্যাসে মূখ্য চরিত্র হয়ে উঠেছে। গল্পে উঠে এসেছে আইয়ামে জাহেলিয়া যুগের নানা কু-আচার। এক কু-আচারা পালন করতে ওসমানের ঘরে জন্ম নেওয়া তালহাকে বরণ করতে হয় দাসত্বের জীবন। তালহা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য হয়ে ওঠেন উমাইয়ার দাস।  উমাইয়ার দাস হিসেবে তালহাকে সহ্য করতে হয় অমানবিক নির্যাতন ও যন্ত্রণাদায়ক জীবন। অন্যদিকে আবদুল মোত্তালিবের দাস কায়েস। আবদুল মোত্তালিব দাসের সাথে অত্যন্ত সদাচার করেন। ঘটনাক্রমে দু'জনের বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এদিকে উমাইয়ার কন্যা সাফিয়া ভালোবেসে ফেলে দাস তালহাকে। সাফিয়া, বন্ধু কায়েস আর আবদুল মোত্তালিবের কারণে দীর্ঘ সময় পর দাসত্ব থেকে মুক্তি পায় তালহা। স্বপ্ন দেখে নতুন জীবনের।

কিন্তু এমন সময় আদরের ছোট বোন আর তার হবু বরকে হত্যা করে উমাইয়া পুত্র আবু সুফিয়ান। হত্যার প্রতিশোধের সুফিয়ানকে কতল করে তালহা। প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে ছাই হয় তালহার পুরো পরিবার। এরপর তালহা পালিয়ে যায় ইয়েমেনে। সেখান থেকে ঘটনাক্রমে ইয়েমেনের রাজধানী সানার শাসকের ছদ্মবেশী গোয়েন্দা, ধর্ম অবমাননার দায়ে জেলবন্দী, জেল-পালানো, বেদুইন জীবন ইত্যাদি নানা নাটকীয় মোড় নেয় তালহার জীবনে।

ওদিকে সময়ের সমান্তরালে চলতে থাকতে ঐতিহাসিক সব ঘটনা। আবদুল মোত্তালিবের জমজম কূপ পুনরুদ্ধার ও সাথে ঘটে যাওয়া অলৌকিক ঘটনা। শত্রুপক্ষের চক্রান্ত থেকে জমকূপের মালিকানা নেওয়া ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা। মক্কার হাজীদের সেবায়েতি হওয়া। দশ পূত্র সন্তান লাভের  মানতের জন্য পুত্র আবদুল্লাহকে কুরবানি দিতে উদ্যত হওয়া৷ সেখান থেকে একশ উঠের বিনিময়ে পুত্র আবদুল্লাহ'র প্রাণ ফিরে পাওয়া। 

সম্রাট আবরাহার মক্কা আক্রমণ প্রতিহত করার অলৌকিক ঘটনা সহ আবদুল মোত্তালিবের জীবনের অনেক কিছুই ফুটে উঠেছে।


উপন্যাসে স্থান পেয়েছে সেই সময়কার মক্কার রাজনীতি, মূর্তিপূজা(ওজ্জা, লাত, হোবল, মানাত,নায়লা ইত্যাদি), সংস্কৃতি, কু-আচার, অন্যায়-অবিচার, খ্রিস্ট ধর্মের বিস্তার সহ অনেক ঘটনা। লেখক গল্প বলার ছলে ঐতিহাসিক চরিত্রের সাথে যেভাবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন তা বেশ উপভোগ্য ছিলো। বিশেষ করে ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বিল্লাল (রা:) এর মায়ের কথা। লেখকের বর্ণনা, গদ্যশৈলী, উপমার প্রয়োগ বেশ ভালো লেগেছে। 


তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যেহেতু উপন্যাসের নাম পিতামহ, তাই আব্দুল মোত্তালিবের চরিত্রে আরও গভীরতা আশা করেছিলাম। পাশাপাশি আবাবিলের ঘটনা আরও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা যেত। তবুও, ইতিহাস ও কল্পনার সুচারু মিশেলে লেখা এই উপন্যাস পাঠককে মুগ্ধ করতে বাধ্য।


উপসংহার : পিতামহ শুধু একটি উপন্যাস নয়, এটি একসময়ের আরব সমাজ, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহের এক জীবন্ত চিত্র। ইতিহাসপ্রেমী ও সাহিত্যরসিক পাঠকের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি দুর্দান্ত পাঠ্যসঙ্গ।
Profile Image for Tusar  Abdullah.
12 reviews
April 22, 2023
বইঃ পিতামহ
প্রকাশনীঃ ঐতিহ্য

ইতিহাস যখন আমাদের চিন্তার দরজায় গল্প হয়ে কড়া নাড়ে। তখন আমরা তাকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত থাকি৷ প্রস্তুত থাকি একারণেই যে, ইতিহাস পাঠের আগ্রহ থাকলেও সরাসরি সেটি আমাদের মর্মস্পর্শী হয়না।

ইতিহাসের আশ্রয়ে যখন কেউ গল্প লেখার জন্য কলম তোলে তখন সর্বপ্রথম প্রশংসা করতে হয় ��েখকের সাহসিকতার।

পিতামহ বইটি মূলত আমাদের প্রিয়নবী (সঃ) এর দাদা আবদুল মোত্তালিব এর জীবনচরিতের উপর লেখা একটি মাস্টারপিস গ্রন্থ। সেই আবদুল মোত্তালিব, যিনি মক্কা আক্রমণকারী সম্রাটকে বলেছিলেন - "আপনার সৈন্যরা আমার দুশো উট কব্জা করে নিয়েছে, আমি আমার উট ফেরত চাই"।
সম্রাট তখন অবাক হয়ে বললেন - "আমি আপনাদের উপাসনালয় পবিত্র কাবাঘর ধ্বংস করতে এসেছি আর আপনি শুধুমাত্র উটের চিন্তা করছেন! কেমন নেতা আপনি"।
আবদুল মুত্তালিব জবাবে বলেছিলেন - "আমি উটের মালিক, তাই আমার চিন্তা উট নিয়ে। কাবাঘরের যিনি মালিক তিনি কাবা সামলাবেন"। ইতিহাসের এমন এক বীরদীপ্ত ব্যাক্তির গল্প এই পিতামহ।

জাহেলিয়াতের যে খুচরো বর্ণনা আমরা নানান জায়গায় পেয়ে থাকি যেমন - কন্যা সন্তান জীবন্ত কবর দেয়া, গোত্রীয় দংশন, দাসত্ব প্রথা, পৌত্তলিকতা সমসাময়িক এসব অরাজকতার একটা ক্লিনেস্ট এক্সপ্লেনেশন বইটাতে পাওয়া যায়। এছাড়াও তৎকালীন আরবের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা পারিবারিক অবস্থার একটা সচিত্র স্থাপন করতে লেখক সক্ষম হয়েছেন। লেখকের বর্ণনশক্তির কাছে আমি হেরে যেতে বাধ্য হয়েছি মক্কার ছায়াবেষ্টিত অংশে যেখানে আবদুল মোত্তালিব বিশ্রাম নিতেন। মক্কার অলি গলিতে যেখানে ছোট বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করত, খেলা করত। অথবা মক্কার সেই চারণভূমিতে যেখানে তালহা আর তার বন্ধু কায়েস মেষ চড়াতো। মক্কা, ইয়েমেন, ইয়াসরিব, মুআরিব প্রতিটা স্থান এবং অবস্থানের অথবা যুদ্ধের বর্ণনা লেখক এতটা দৃঢ়তার সাথে বর্ণনা করছেন যে পাঠকের বাস্তবতা বনাম কল্পনা প্রশ্নবোধক চিহ্নে গিয়ে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।

মরুভূমির মানুষদের জীবন, তাদের প্রেম, ভালোবাসা, মমতা, যুদ্ধ, বিদ্রোহ, অসম সাহসিকতা বইয়ের মূল দুটি অধ্যায় মক্কা এবং ইয়েমেনের প্রতিটি খন্ডিত অধ্যায়ে গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছে। পুরো গল্প জুড়ে আমরা কেবলই মরু সন্তানদের রূঢ়তাই দেখতে পাই না। দেখতে পাই তাদের অতিথিপরায়ণতা, সহমর্মিতা, উচ্ছলতা এবং হাস্যোজ্জ্বলতার পেছনে অতলস্পর্শী বেদনা। সেই অতলস্পর্শী বেদনার মূর্তিমান এক যুবকের নাম তালহা। যে চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক পরিচয় করিয়েছেন মরু কবিলাদের সংস্কৃতি, দাসত্বের বেড়াজাল, বিচ্ছেদ এবং ভালোবাসার হাতছানি। যে ভালোবাসা তাকে দিয়েছিল মুসতানজার সাফিয়া, ইয়েমেনের হুমাইরা, বেদুইন স্ত্রী মাইমুনা। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় হয়নি একবারো। ভাগ্যের ফেরে যার পুরো জীবনটাই কেটেছে দুঃখ, কষ্টের অথৈসমুদ্রে। পুরো গল্প জুড়ে যার বিস্তৃত পদচারণ পাঠককে কখনো করে তুলবে অশ্রুসিক্ত, কখনোবা হাত হবে মুষ্টিবদ্ধ। 🖤
2 reviews2 followers
Read
July 14, 2022
পিতামহ : কালির আঁচড়ে দাদা আব্দুল মুত্তালিবের জীবনালেখ্য

একবার ভাবুন তো এতদিন পর্যন্ত যাদের নাম পেয়েছেন নিরস ইতিহাসের ব‌ইয়ে, তারাই যদি আপনার চোখের সামনে উপন্যাসের পৃষ্ঠায় হেঁটে বেড়ান, কথা বলেন তাহলে কেমন লাগবে! সেই চরিত্রগুলো যদি হয় আব্দুল মুত্তালিব, উমাইয়া, আনতারা ইবনে শাদ্দাদ, আবদুল্লাহ, আমেনা, আবু লাহাব, ওরাকা ইবনে ন‌ওফেল, তালহা তাহলে তো কথাই নেই।

বলছিলাম সাব্বির জাদিদের ব‌ই "পিতামহ" এর কথা। আব্দুল মুত্তালিবের জীবনীভিত্তিক এই উপন্যাস কালের ভেলায় চড়িয়ে আপনাকে নিয়ে যাবে তৎকালীন আরবে। লেখকের বর্ণনায় ফিরে ফিরে আসবে প্রাচীন সেই আবহ, সেই আমেজ।
একুশ শতকের যান্ত্রিকতাকে পিছনে ফেলে নিজের অজান্তেই আপনি হারিয়ে যাবেন মক্কার অলিতে গলিতে, ইয়াসরিবের খেজুর বাগানে, আন নুফুদ মরুভূমির বালুকাময় প্রান্তরে।

সীরাত সাহিত্য পড়ার শখ অনেক দিনের। বলতে গেলে ছোটবেলা থেকেই। তাই রাসূলে আরাবির জীবনাচরণ, তার শৈশব, কৈশোর, নবুওয়াত নিয়ে যেমন ছিল অপার আগ্রহ তেমনি রাসূলের সাথে সম্পৃক্ত সবার সাথেই গড়ে উঠে ছিল একধরনের ভালোবাসা। আব্দুল মুত্তালিব ছিলেন সেই ভালোবাসার মানুষদের একজন।

রাসূলুল্লাহর দাদা আব্দুল মুত্তালিব সম্পর্কে কয়েকটি গৎবাঁধা কথা ছাড়া আমরা তেমন কিছু জানিনা। কিন্তু তার সমগ্র জীবনটাই ছিল রোমাঞ্চে ভরপুর। ইয়াসরিবে থেকে মক্কায় এসে কাবার দায়িত্ব লাভ, হজের মৌসুমে হাজীদের সেবা করার সম্মান, জমজম কূপের সন্ধান লাভ, তৎকালীন কুরাইশ গোত্রের অবিসংবাদিত সরদার, আব্রাহা কাবা আক্রমণের সময় তার দৃঢ়তা ইত্যাদি ঘটনাকে লেখক ইতিহাসের আয়নার তুলে নিয়ে এসেছেন যথার্থ ভাবেই।

উপন্যাসে তালহা চরিত্রের মাধ্যমে তৎকালীন আরবের সমাজ বাস্তবতা ও নিষ্ঠুরতা ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই সাথে  তালহা চরিত্রের মাধ্যমেই লেখক আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তৎকালীন ইয়ামেন ও মরু কাবিলার সংস্কৃতির সাথে। ভাগ্যের নির্মমতার কারণে তালহা যখন বনু মুসতানজায় সাফিয়াকে, ইয়ামেনে হুমাইরাকে, বেদুইন জীবনে স্ত্রী মাইমুনাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবেন তখন তালহার মত আপনার‌ও মন বেজায় খারাপ হবে, অগোচরে হয়তো দু-এক ফোঁটা অশ্রুজল গড়িয়ে পড়বে গন্ডদেশ বেয়ে।

ব‌ইটির আরেকটি ভালো দিক হচ্ছে লেখক তৎকালীন আরবের বাক্য শৈলীর প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রেখেছেন। আপনারা যারা কিছুটা আরবি ভাষার সাথে পরিচিত তারা হয়ত জানবেন প্রাচীন আরবিতে কসম, আকাঙ্ক্ষা, তিরস্কার ও ভৎর্সনা ইত্যাদির প্রাধান্য ছিল। লেখক উপন্যাসের সংলাপে  সেই আবহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন জ্ঞাতসারেই।

ঐতিহাসিক চরিত্র আব্দুল মুত্তালিবের জীবনালেখ্যে আপনাকে স্বাগতম।

ব‌ইয়ের নাম: পিতামহ
লেখক: সাব্বির জাদিদ
প্রকাশক: ঐতিহ্য প্রকাশনী
মুদ্রিত মূল্য: ৮০০৳
Profile Image for Rafiq Shardar.
42 reviews3 followers
April 2, 2020
বইঃ পিতামহ
লেখকঃ সাব্বির জাদিদ
প্রকাশনীঃ ঐতিহ্য
প্রচ্ছদঃ কাজী যুবাইর মাহমুদ
মুদ্রিত মূল্যঃ ৮০০ টাকা মাত্র
পিতামহ নবী করিম (সঃ) এর দাদা আব্দুল মোত্তালিবের জীবনাশ্রিত উপন্যাস। তালহার হাত ধরে আইয়্যামে জাহিলিয়াতের সবচেয়ে বিষ্ময়কর চরিত্র আবদুল মোত্তালিবের জীবনের যেসকল ঘটনা তাকে বিষ্ময়কর করে তুলেছে তার বর্নণা দিয়েছেন লেখক সাব্বির জাদিদ। এটা কোনো ইতিহাস গ্রন্থ নয় বরং ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস।
পাঠ সংক্ষেপঃ ৪৯০ সালে ইয়াসরিবে জন্ম নেয় এক বিষ্ময়কর শিশু যার মাথার চুল সাদা। তাই তার মা নাম রাখেন শাইবা। এই শাইবা হয়ে ওঠেন আইয়্যামে জাহিলিয়াতের কিংবদন্তিতূল্য নেতা আব্দুল মোত্তালিব। তিনি কুরাইশ বংশের নেতা। সামনে হজ্জ তাই তার চিন্তা হাজীদের আপ্যায়ন নিয়ে। মক্কার পানির উৎস প্রায় শুকিয়ে গেছে। এমন সময় তিনি সম্মানিত হন জমজম কূপের সন্ধান ও মালিক হয়ে এবং তা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। জমজম কূপের মালিক তিনি এমনি এমনি হননি তার জন্যে তাকে দিতে হয়েছে বিভিন্ন পরীক্ষা আর সেসব দিতে গিয়েই তিনি একটা কঠিন মানত করেন। যদি তার দশটি ছেলে হয় তাহলে তিনি তার একটি ছেলেকে কুরবানি দিবেন। কুরবানি দেওয়ার দিন তিনি দেখতে পান দূর থেকে একজন তাকে দেখছে। তিনি জানতে পারেন এ আর কেউ না তালহা যে কিনা উমাইয়ার ক্রীতদাস ছিল। এই গল্পের প্রথম থেকেই তালহার হাত ধরেই তার সম্পর্কে বলে গেছেন লেখক। মক্কা থেকে ইয়াসরিব, ইয়েমেন সব খানেই সেই তালহার সাথে ঘটে গেছে নানা কাহিনী যা মাঝেমধ্যে ভাল লেগেছে আবার মনে হয়েছে তালহার সাথেই কেন এত অবিচার হয়। প্রথমে ক্রীতদাস তারপরে স্বাধীন হয়ে আবার নিজ বাসস্থান থেকে পালানো এমনকি শেষে বেদুইনের জীবনেও তালহা স্থায়ী হতে পারেনি। শেষে তার ছোটবেলার সাথি সাফিয়ার সাথে দেখা হয় এবং তারা ইয়াসরিবে গিয়ে স্থায়ী হতে চায় প্রতীক্ষিত সেই মহামানবের প্রতিক্ষায়। ঘটনা অনেক যার সংক্ষেপ করা আমার পক্ষে সম্ভব না।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ লেখকের বর্ণ্না অনেক ভাল লেগেছে। তালহার সাথে যেভাবে সবখানে নিয়ে গিয়েছেন লেখক তা সত্যিই অনেক চমৎকার। মাঝেমাঝে একটু খাপছাড়া লাগলেও কিভাবে যে শেষ করে ফেললাম এইটা ভেবে লেখকের কলমের প্রশংসা করতে হয়। অবশ্য আমার ক্ষেত্রে শেষ করাটা একটু চ্যালেঞ্জিং ছিল। শুরুর পর থেকে প্রায় অনেকটা সময়ই লেগেছে শেষ করতে। বইয়ের কোয়ালিটিও অনেক ভাল ছিল। বলা যায় পয়সা উসুল।
This entire review has been hidden because of spoilers.
Profile Image for Sumaiya Jesmin.
5 reviews
January 28, 2025
বই:পিতামহ
লেখক: সাব্বির জাদিদ

৪৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ইয়াসরিবের সবুজ ভূখন্ডে জন্ম নেয় এক বিস্ময়কর আরব শিশু। মাথাভর্তি সাদা চুল দেখে মা তার নাম রাখেন শাইবা। শাইবা থেকে আবদুল মুত্তালিব হওয়া
ব্যক্তিই হলেন নবী মুহাম্মদ (সা.) এর পিতামহ। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের একজন নেতা এবং পবিত্র কাবা ঘরের রক্ষক।
আইয়ামে জাহেলিয়া যুগে থেকেও যিনি ছিলেন সব অন্যায়, ব্যাভিচার থেকে দূরে থাকা একজন বিশুদ্ধ মানুষ। তার পরোপকারীতা, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব পুরো আরবজুড়ে সমাদৃত ছিলো। তার হাত ধরেই হারিয়ে যাওয়া জমজম কূপের আবার পুনর্জন্ম হয়।
পিতামহ বইটি আবদুল মোত্তালিবকে নিয়ে লেখা হলেও উনি থেকে গেছেন পার্শ্ব চরিত্রে। অবশ্য একজন মানুষকে জানার উত্তম পন্থা হলো তাকে অন্যের চোখ দিয়ে দেখা।আমরা পিতামহকে দেখি তালহার চোখ দিয়ে। তালহা; যে উমাইয়ার কৃতদাস হতে বাধ্য হয় শুধুমাত্র একশ উটের ঋণ শোধ করতে না পারার কারণে।
আরবের বর্বর দাসপ্রথা,কন্যা সন্তানকে জীবিত করব দেওয়ার মতো ঘটনার সাক্ষী হই আমরা তালহার সাথে সাথে। তালহার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জেনে নেই ইয়ামেনের শাসন ব্যবস্থা। ইয়েমেনের শাসক আবরাহা আল-আশরাম যিনি ক্বাবা ধ্বংস করতে হস্তিবাহিনী নিয়ে মক্কায় অভিযান করেছিল। আল্লাহ তা'আলা ছোট ছোট পাখির দ্বারা তাদের বাহিনীকে ধ্বংস করে ধুলায় মিশিয়ে দেন। তাদের সে করুণ পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছে সূরা ফীলে। আবু কুবাইস পাহাড়ের পাদদেশে মক্কাবাসীর সাথে আমরা তাদের সেই করুণ পরিণতি দেখি। তালহা চরিত্রের সাথে ইতিহাসের কোনো মিল আছে কি-না জানি না তবে তার মতো দুর্ভাগ্যের কেউ হোক। তবে আল্লাহ নিশ্চয়ই উত্তম পরিকল্পনাকারী। সেই পরিকল্পনার দরুন সমগ্র আরবজাহান পায় নবী মোহাম্মদ (সা.) কে যিনি পরবর্তীতে আরবের সব অনাচার দূর করে এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য নিয়ে আসে এক সুন্দর জীবন-বিধান।

নবি-জন্মের পূর্বাভাস,কন্যাশিশু হত্যা, গোত্রীয় দাঙ্গা, কৌলিন্য প্রথা, প্রেম-দ্রোহ, কাব্যযুদ্ধ, দাব্যবস্থা,লুটতরাজ,হস্তিবাহিনীর কাবা আক্রমন - গোটা আরব অগ্নিগর্তের কিনারায় অবস্থান করছিল।পিতামহ সেই অগ্নিগর্ভ সময়ের দলিল।
Profile Image for Rezwan Khan.
37 reviews
June 10, 2025
"পিতামহ" বইটি নিয়ে ইতিমধ্যেই বেশ ভালো ভালো রিভিউ পেয়েছি।বইটি যেহেতু পড়া হয়েছিল সম্প্রতি; তাই বইটি সম্পর্কে কিছু কথা বললাম,এটা কোনো রিভিউ না।মিশ্র প্রতিক্রিয়া বলতে পারেন,তবে ৫২৩ পৃষ্ঠার বিশাল কলেবরের এই উপন্যাসটি বেশ উপভোগ করেছি।

মহানবী (সাঃ) এর পিতামহ আবদুল মোত্তালিবের জীবনাশ্রিত উপন্যাস হলেও উপন্যাসের মূল চরিত্র হিসেবে আমরা তালহা'কে ই দেখতে পাই।উপন্যাসের মূল চরিত্র এবং ঘটনা আবর্তিত হয় মূলত তালহা তার পরিবার,কায়েস,সাফিয়া এবং সর্বোপরি মক্কার কোরাইশ বংশের নেতা আবদুল মোত্তালিব, উমাইয়া এবং
আবরাহা সহ প্রমুখ ব্যক্তিদের নিয়ে।সে হিসেবে বলতেই হয় যে আবদুল মোত্তালিবের ঘটনাগুলো এবং চরিত্রের উপরই কিন্তু বেশী জোর দেয়া উচিৎ ছিলো।অথচ এখানে মনে হবে
যে আবদুল মোত্তালিবের চরিত্রটি একটি পার্শ্বচরিত্র,মূলত তালহার জীবনীতে এবং জবানবন্দিতে আমরা উনাকে পাচ্ছি।সরাসরি লিডিং ক্যারক্টারে তিনি নেই।

উপন্যাসটি মূলত তিনটি পর্বে বিভক্ত হয়েছে - মক্কা পর্ব,
ইয়েমেন পর্ব এবং যৌথ পর্ব। এর মধ্যে শুধু মক্কা পর্বই বিশাল কলেবরের (৩১৪) পেজের যদিও বেশ উপভোগ করেছি,তবে যৌথ পর্ব তে কলেবর আরেকটু বেশী থাকলে, শেষের দিকের বর্ননাগুলো আরেকটু বিস্তারিত থাকলে ভালো হতো।খুব দ্রুতই শেষ হয়ে গেলো যেনো!!

উপন্যাসটি শেষ হয় আমাদের মহানবী (সাঃ) এর পৃথিবীতে আগমনের শুভ বার্তা দিয়ে।সেই হিসেবে মহানবীর জীবনাশ্রিত আরেকটি উপন্যাস লেখকের কাছ থেকে পেলে ভালো লাগতো।
লেখকের লেখনশৈলী,বাচনভঙ্গি, উপমার প্রয়োগ সবমিলিয়ে উপন্যাসটি দারুণ উপভোগ্য ছিল।
রেকমেন্ডেড।✅

🔴বইঃ পিতামহ
🟢লেখকঃ সাব্বির জাদিদ
🔵প্রকাশনীঃ ঐতিহ্য
Profile Image for Rifat Rohan.
17 reviews
March 3, 2023
পিতামহ উপন্যাসটির সবচেয়ে উত্তম দিক হলো বইটি সুখপাঠ্য।

বইটিতে ইরানের নাম প্রায় জায়গাতেই 'পারস্য' উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু এক জায়গায় হঠাৎ আবার 'ইরান' লিখেছেন। জিনিস একটা ছোট ভুল ধরে নেওয়া যাক!

বইটির কাহিনীতে আব্দুল মোত্তালিব কে যতটা গ্লোরিফাই করার কথা ঠিক কেন জানি ততটা হলো না। কেন জানি লেখক বার বার তালহা- কায়েস, কায়েস-তালহা তে ফিরে গেছেন। শেষতক উপন্যসটি কেন জানি তালহার জীবনের প্রিয়জন হারানোর উপন্যাসে পরিনত হয়েছে।

লেখক এই জিনিসগুলোর প্রতি আরেকটু সদয় দৃষ্টি দিলে ভালো করতেন।
Profile Image for Shahriar.
48 reviews1 follower
February 26, 2024
'পিতামহ' নাম অনুযায়ী মনে হয়েছে বইটা মুহাম্মদ (সা:) এর দাদাজান আব্দুল মোত্তালিব এর জীবনী নির্ভর উপন্যাস এবং বইয়ের প্রথমে সেটা উল্লেখ করাও আছে। কিন্তু পড়ার মনে হলো বইটা বরং সেই সময়কার আরবের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, তাদের ধর্ম পালন এবং তালহা'র জীবনী নিয়ে লেখা।
যাই হোক, বিশাল কলেবরের বইটা পড়তে সময় নিয়েছি মাত্র ৪দিন। এর অন্যতম কারণ বইয়ের আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক প্লট আর লেখকের লিখনী। সব মিলিয়ে বইটা বেশ ভালো লেগেছে।
Profile Image for Fahad Ahammed.
387 reviews45 followers
July 25, 2025
১. জমজম কুয়ার সন্ধান, কুরাইশদের কুয়ার মালিকানা নিয়ে বাকবিতন্ডা এবং পরবর্তী ঘটনা।
২. বাদশাহ জুনুয়াস, জাদুবিদ্যা শিখতে যাওয়া বালক এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার অপরাধে গ্রামবাসী কে আগুনে পুড়িয়ে মারা।
৩. আবরাহার হস্তি বাহিনী।

এই তিনটি বড় ঐতিহাসিক ঘটনা, মাঝে আরু কিছু ছোট ছোট ঘটনা যাদের মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করেছে লেখকের কল্পনা শক্তি।

বইয়ের নাম পিতামহ হলেও মূল চরিত্র তালহা। তালহার দাস থেকে রাজসভার দিকে যাত্রা র পাশাপাশি রাজসভা থেকে অন্য একজনের দাস হবার গল্প।
Profile Image for Shihabul Bashar  Robi.
52 reviews2 followers
September 1, 2025
এই বছরে তো বটেই, এই অনেকদিনে পড়া বইগুলার মধ্যে, বিশেষ করে আধুনিক সাহিত্যে এইটা ওয়ান অফ দ্যা ফাইনেস্ট ওয়ার্ক বলতে হয়।
মূলত নবীজি (স.) এর পিতামহ, আবদুল মুত্তালিবের জীবন উঠে এসেছে এখানে, যেটা প্যারালাল হিসেবে এসেছে তুলনায় ইতিহাসে অপরিচিত মুখ তালহা ইবনে ওসমানের জীবনের সাথে। এই দুই জীবনের গল্প একসাথে যেভাবে সমান্তরালে টেনে গেছেন লেখক, মাস্টারফুল কাজ বলতেই হয়।
7 reviews4 followers
October 3, 2025
মুহাম্মদ পরবর্তী নিয়ে আমরা যত আলাপ করি উনি যে গোত্রে জন্ম সেই কুরাইশদের নিয়ে তত হয় না, লেখকের লেখা বইটা আমাদের সেই সময়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে, মক্কার ইয়াসরিব ইয়েমেন থেকে নানান জায়গায় চিত্রপট খুব সুন্দর করে মুদ্রিত হয়েছে।
Profile Image for Sazzad Hossain.
22 reviews
December 16, 2023
২০২৩ সালে পড়া সেরা বই এটি। পড়ে এতটাই বাকরুদ্ধ হয়েছিলাম, রিভিউ লেখার জন্য কোনোভাবেই শব্দ মেলাতে পারিনি। এটার রেটিং ইনফিনিটি৷
Displaying 1 - 21 of 21 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.