“আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস, আমার মৃত্যুর খবর জানানোর জন্য সুটেড বুটেড ডাক্তারের দরকার পড়েছে। ডাক্তার যখন জানাল, কেবল তখনই আমি বিশ্বাস করলাম। অথচ আমার রব সারাটা জীবন ধরে মৃত্যুর বিষয়ে সতর্ক করে গেছেন, আমি আমার রবের কথায় বিশ্বাস করিনি।”
- আলি বানাত (রহ.)
.
বইয়ের শুরুর দিকের কয়েক পর্বে এমন কিছু মানুষের জীবনের শেষ সময়ের কথা বলা, যাদেরকে তাদের মৃত্যুর সম্ভব্য সময় বলে দিয়েছিল। তারা কেউ ই বৃদ্ধ ছিল না। কিন্তু মৃত্যু নিকটবর্তী জেনে তারা হাতে থাকা সময়টুকুকে নিজের সেরা সময় বানানোর চেষ্টা করে। কারণ মৃত্যু হলেই হিসাব শুরু। বর্তমানেও দেখা যায় মানুষ শুধু বৃদ্ধ বয়সটাকে আল্লাহর জন্য রাখে। কিসের ভিত্তিতে যেন আমরা ধরে নেই যে - বৃদ্ধ হওয়ার আগে আমাদের মৃত্যু হবে না।
.
প্রথম কয়েক পর্ব পড়ার পর অনেকের মনে হতে পারে যে - আমার মৃত্যুও যদি ক্যান্সারে হতো তাহলে আগে সতর্ক হয়ে মৃত্যুর আগের সময়টা শুধু আল্লাহর জন্যই দিতাম। এরকম সময়ে এসেই লেখক সতর্ক করলেন -
"এটা ভাববেন না যারা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়, তারা একে ভালো পথে ব্যবহার করে। আমরা ভাবি, হ্যাঁ ভাই ক্যন্সার ভালো, এটা আপনাকে তাওবা করতে সময়, সুযোগ দেয়, যদি আমার ক্যান্সার হতো! আল্লাহু আকবর! কত বড় স্পর্ধা আমাদের। যখন কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় সবাই আশ্চার্যান্বিত হয়, ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ কি আপনাকে বলেন নি যে, আপনি যেকোনো সময় মারা যেতে পারেন? আমাদের মাঝে অনেকের কোট-টাই পরিহিত আর সার্টিফিকেট পাওয়া ডাক্তারের কথায় যতটুকু বিশ্বাস আছে, ততটুকু বিশ্বাস রাসূল (সাঃ) এর হাদিসেও নেই। আপনি যখন হাদিস বা আয়াত পড়েন, মৃত্যু যেকোনো সময় আসবে, আপনি তখন আতঙ্কিত হন না, কিন্তু ডাক্তার যখন বলে, ভাই আপনাকে পরীক্ষা করে দেখলাম আপনি হয়তো আর সপ্তাহ দুএক বাঁচবেন, আপনার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে, দুই সপ্তাহ! এই কয়দিন আছে মাত্র? কিন্তু আপনি এরকম রিএকশান দেখাননি, যখন আল্লাহ বললেন যেকোনো সময় মৃত্যু আসবে!"
.
মৃত্যুর স্বরণের পর লেখক নিয়ে গেলেন আমাদের দুনিয়ার বাস্তবতা বুঝতে। এখানে এমন কিছু মানুষের জীবনের গল্প বলা, যারা দুনিয়ায় বাস্তবতা বুঝতে পেরে নিজের জাঁকজমকপূর্ণ জীবন থেকে ফিরে এসেছিল। অনেকেই হয়তো তাদের চিনেন।
আর এর মাঝে মাঝে আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা হল। সত্যিকার পুরুষ কিরকম হয় তা চিনিয়ে দিল।
.
আমরা নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে গাফেল। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনরতদের সমালোচনায় আমরা বিভোর। গঠনমূলক সমালোচনা খারাপ বিষয় নয়, কিন্তু আত্মসমালোচনা করতে না পারাটা খারাপ।
.
যখন আমাদের দায়িত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয় তখন আমরা হাজির হই বিভিন্ন অজুহাত নিয়ে। আসলে কীসে আমাদের বাধা দেয়?
"খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) জীবনের শেষ প্রান্তে কুরআন তিলাওয়াত করতেন আর বলতেন, আল্লাহর কসম! যেই জিনিস আমাকে তোমায় হিফয করা হতে বাধা দিয়েছে তা হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। সালাহউদ্দীন আইউবি (রহ.) কখনও হজ্ব করেননি। জেরুজালেম জয় করেছেন, কিন্তু হজ্ব করা হয়নি। তিনি শেষ জীবনে বলতেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা ছাড়া আর কোনোকিছুই আমাকে হজ্ব করা থেকে বাধা দেয়নি।
এখন নিজেদের প্রশ্ন করে দেখি আপনি-আমি কী বলব? কীসে আমাদের সালাত থেকে, কুরআন থেকে, সুন্নাহ থেকে বাধা দিল? চাকরি? ব্যবসা? নারী? গাড়ি? সন্তান? মদ? কীসে বাধা দিল? আপনি আমাকে বোকা বানাতে পারেন, আমি আপনাকে বোকা বানাতে পারি। কিন্তু নিজেকে নিজে অন্তত বোকা বানাবেন না। আমাদের সবাই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, একদিন হুট করে সেই সময়টা চলেও আসবে। আমাদের প্রত্যেকে আল্লাহর সামনে একাকী দাঁড়াব। সেদিন আপনার ছেলে-মেয়ে, পিতা-মাতা, শাইখ কেউ আপনার সাথে থাকবে না। আপনি একা দাঁড়াবেন।"
.
আমরা সবাই একটা সুন্দর মৃত্যুর আশা করি অথচ যেসকল কাজ আমাদের সুন্দর মৃত্যু উপহার দিবে তা করিনা। আমরা পরিশ্রম করতে চাইনা কিন্তু ফলাফল ভোগ করে চাই। কিছু সুন্দর মৃত্যুর ঘটনা বর্ণানা করে কবরের তিন বন্ধু ও তিন শ্ত্রুর কথাও লেখক জানিয়ে দিলেন।
.
তারপর আসল উম্মাহ এর কথা। এই টপিক আসতেই আমরা আলোচনা জুড়ে দেই। সবাই তখন মহাজ্ঞানী। মুসলিমরা এক না, আরব শাসক / মুসলিম শাসকদের সমস্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আসল সমস্যাটা কি? এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কি? সবই কিন্তু নবীজি সা. জানিয়ে গেছেন। আমরা সেই সব বিষয় মানছি না, উল্টো যেসব কাজ থেকে সতর্ক করেছেন সেগুলোতেই আমরা জড়িয়ে যাচ্ছি।
.
বইয়ের শেষটা হয় আল্লাহর বড়ত্ব, আমাদের প্রতি দয়া এবং শয়তানের কৌশল সম্পর্কে সচেতন করে। আর আমাদের সেই আক্ষেপ দিয়ে - "কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য? "
.
বইটা আপনাকে ভাবাবে জীবন সম্পর্কে, বাস্তবতা সম্পর্কে, আর সাবধান করবে মৃত্যুর ব্যাপারে।
আপনার অবস্থা যেমনই হোক না কেন বইটাকে আপনি ভালবাসতে বাধ্য হবেন ইন শা আল্লাহ।
.
কিছু বই থাকে যেগুলো ইচ্ছে করে অন্য সবাইকে পড়াতে। এটাও আমার কাছে এমনই একটি বই।