পাঠক সমীপে অতিক্রম করে প্রথম লেখাটা বিশেষত্বহীন নিতান্তই একটা সাধারণ গল্প। কিন্তু তারপরে 'মফস্বলের অতীতে' লেখিকার স্মৃতিচারণে কদম মেলানোর সাথে লেখিকার নিবিড় ভাবনার ওজন পরিমাপ করা যায়! প্রসঙ্গত জানায়ে রাখি, প্রতিটা গল্পের পরেই একটা নন-ফিকশন লেখা আছে, যেখানে লেখিকার স্মৃতিচারণ, বইয়ের পাঠ-প্রতিক্রিয়া/ বিশ্লেষণ, ভ্রমণবিষয়ক লেখা, অন্যান্য ভাবনা ইত্যাদি প্রতিফলিত হয়েছে। ফিকশন আর নন-ফিকশনের ফিউশনে এমন ব্যাতিক্রমধর্মী ফরম্যাটের জন্য লেখিকাকে সানন্দে সাধুবাদ জানাই।
'মফস্বলের অতীতে' স্মৃতিচারণে "মফস্বল থেকে পুরোদস্তুর নাগরিক হয়ে যাওয়া মানুষদের আর কোনোদিন ভালো করে রোদ পোহানো হয় না'' — লাইনটা করুণ নস্টালজিয়ায় ভুগিয়েছে। নিজের সাথে খুব রিলেটেবল। শীতের দিনে নানুর বাড়ীর পুকুরঘাটে সকালেবেলা হাওয়াই মিঠার রোদে বসে ধোঁয়া উঠা গরম ভাতের সাথে আলুভাজির দিনকালে ফিরে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছে জন্মায়। এখন আমাদের নাগরিক জীবনে ইট দালানের ভীড়ে পদদলিত হয়ে কুসুম রৌদ্রের শীতল মৃত্যু হয়। তারপরের জনক ও যাত্রী, যুক্ত, বৈদিক পাখির গান, কাজী নজরুল এবং এডগার অ্যালান পো'কে নিয়ে অত্যুত্তম লেখাগুলো; সবমিলিয়ে অন্যান্য গল্পগুলোতে মুগ্ধতার ভাব সমানুপাতিক হারে বেড়েছে কেবল।
লেখিকার বয়ান খুব বাস্তববাদী লেগেছে। প্রাঞ্জল গদ্যর ভাষা — কপাটহীন দোরে উন্মুক্ত বাতাসের প্রাণবন্ত সরল বয়ানের আনাগোনা — সাহিত্যর রুপ-ঢঙের আকার গঠনের জন্য লেখার গাত্রে কষ্টকল্পিত রঙের (বাক্যর) প্রলেপ চড়ানো হয়নি। যেমন, ''জনক ও যাত্রী'' গল্পতে একটা লাইন আছে — " কেউ নেই, বাইরের উঠোনে একটা তিন-চাকার রঙ-উঠা সাইকেল ভিজছে একলা ''। সাধারণ বয়ান। এমন দৃশ্য জীবনে বহুবার সাব-কনশাসলি এক নজর দেখেছি দেখার ছলে। কিন্ত��� এখন বাক্যটা পড়ে বৃষ্টির ভেতর একলা সাইকেলের মূমূর্ষ বিষণ্ণতা আমাকে প্রগাঢ়ভাবে জাপটে ধরে।
এখন খুঁতের দিকে দৃষ্টিপাত করলে, অধিক গল্পের একই গঠন কাঠামো এবং বৈচিত্র্যহীন সমাপ্তি — উপরন্তু গল্পের টোনে ভৌতিক আবহের পুনরাবৃত্তি মনঃপুত হয়নি। প্যাটার্ন বলতে মোটামুটি সব গল্পের সূত্রপাত হয়েছে সমাপ্তির গোড়া থেকে। ফলে, খানিক পথ অতিক্রম করলে গল্পের পরিণতি পাঠকের নিকট সহজেই অনুমেয়। তবে গল্পের ভেতর ভিন্নতা নেই সেটা বলছি না। ভাবগত দিক থেকে ভিন্নতা থাকলেও গঠন কাঠামো ও সমাপ্তি তীরের অভিন্ন নির্দেশনা গল্পের গুণগত মানে প্রভাব ফেলেছে।
সবমিলিয়ে, বৈদিক পাখির গান অবশ্যই সুখপাঠ্য বই। আমার মতে, পাঠক বইটা এক নাগাড়ে শেষ না করে বরং সময় নিয়ে অবসরে দুয়েকটা লেখা পড়লে বইয়ের নির্যাস ভালোরূপে ভোগ করতে পারবেন। ধন্যবাদ!