ইনিগমা, একটা নাম, এক রহস্য। এটা একজন কিংবদন্তিতুল্য বাংলাদেশি গুপ্তচরের ছদ্মনাম। পাকিস্তানের আইএসআই-এর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের প্রধান পারভেজ আলীর মতে, ইনিগমা হলো আইএসআই-এরই একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যিনি বহুদিন ধরে বাংলাদেশের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করে চলেছেন। তবে এ বিষয়ে নেই কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র বা শক্তপোক্ত প্রমাণ; ফলে এই তত্ত্ব বহুদিন ধরেই কেবল একটি মিথ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে এসেছে।
যদিও এক সময়, পারভেজ আলীর ডেপুটি হামিদ খান ইনিগমার তৈরি করা বাংলাদেশি এসপিওনাজ নেটওয়ার্কের কয়েকজনকে ধরতে সক্ষম হয়, তখন থেকেই সে ইনিগমা নামের এই রহস্যময় স্পাইয়ের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করে। ইনিগমাকে ধরার জন্য সে ছায়ায় ছায়ায় খোঁজ চালায়। ডিজিএফআই-এর বিলুপ্তপ্রায় ডিপার্টমেন্ট ‘সেক্টর আলফা’-র সঙ্গে ইনিগমার কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে? আর বাংলাদেশ-আসাম সীমান্তে নৈরাজ্য ছড়াতে আসা উলফা কমান্ডার নবজিৎ ভারালি, সে কিভাবে এইসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত?
ঠিক সেই সময়ে, ডিজিএফআইয়ের সবচেয়ে সক্রিয় ও সপ্রতিভ ডিপার্টমেন্ট ‘ব্যুরো এক্স’-এর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিন চৌধুরী তার শীর্ষ অ্যাসেট শাফাত রায়হান, কোডনেম ‘স্কারলেট’, এর মাধ্যমে একটা অত্যন্ত গোপন মিশন শুরু করেন, যার শিকড় ছড়িয়ে আছে ঢাকা, করাচি থেকে শুরু করে আসাম সীমান্ত পর্যন্ত।
সেই মিশনের অংশ হিসেবে ভারতের মাটিতে পাচার করতে হবে একটা স্নাইপার রাইফেল, যার দায়িত্ব গোপনে দেওয়া হয় সেক্টর আলফার অফিসার যায়েদ হাসানকে, যে এক সময় এজেন্সির হয়ে সীমান্তে স্মাগলিং করত। কিন্তু বিষয়টা নজরে পড়ে সেক্টর আলফার ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের কুখ্যাত লোক ‘চেকার’ ওরফে মনোয়ার ইসলামের। এভাবেই চরম গোপনীয় এই মিশনে ভর করে ডিজিএফআইয়ের দুই প্রধান ডিপার্টমেন্ট সেক্টর আলফা ও ব্যুরো এক্সের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব। শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে? তা জানতে হলে পড়তে হবে তাকরীম ফুয়াদের লেখা এসপিওনাজ থ্রিলার 'ইনিগমা'।
জাবেদ রাসিনের সাথে যৌথভাবে লেখা স্পাই-কন্সপিরেসি থ্রিলার 'সার্কেল ট্রিলজি'এর স্পিন-অফ প্রিক্যুয়েল হিসেবে 'ইনিগমা'এর গল্পটাকে বেশ ভালোভাবেই দাঁড় করিয়েছেন তাকরীম ফুয়াদ। তবে তা সার্কেল ট্রিলজির মূল গল্পের মতো টিপিক্যাল আর অতিরঞ্জিত নয়। সেইসাথে লেখকের গল্প বলার ধরনে ম্যাচিউরিটি স্পষ্ট। বিশেষ করে গতানুগতিক লিনিয়ার ন্যারেটিভ ছেড়ে ছয়টা আলাদা কিন্তু অবিচ্ছিন্ন ছোট গল্পের মাধ্যমে মূল গল্পটা বলে যাওয়ার আইডিয়াটা ভালো ছিল। এসপিওনাজের ধূসর জগতকে ফ্যাক্ট আর ফিকশনের মিশেলে বেশ বাস্তবিকভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক, যেটার জন্যে এই বইটাকে সার্কেল ট্রিলজির যেকোনো বইয়ের চেয়ে বেশি গ্রাউন্ডেড মনে হবে। এবং সেই অনুযায়ী, এই বইয়ের এক্সিকিউশনও দুর্দান্ত। ছোট গল্পগুলোর মধ্য দিয়েই লেখক অল্পতেই কাহিনী, চরিত্র, ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং, ক্রাইসিস আর সলিউশন যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
তবে দুর্বলতাও আছে। বিশেষ করে এক্সিকিউশনে ছোট গল্পের কাঠামো ব্যবহারের কারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঠিকভাবে ডেভেলপ হয়নি। আর প্রধান অ্যান্টাগনিস্টদের দিক থেকে যে ধরনের শক্তিশালী প্রতিপক্ষতা আশা করেছিলাম, তা পুরোপুরিভাবে পাই নি। আইএসআই-এর মতো শক্তিশালী সংগঠনের লোকদের এত সহজে বোকা বনে হেরে ভূত হওয়াটা একটু অস্বাভাবিক, একপাক্ষিক এবং অসংলগ্ন লেগেছে। কিছু গল্পের শেষে আসা টুইস্টগুলোকে খুব হালকা মনে হয়েছে। তারপরও 'ইনিগমা' নিঃসন্দেহে উপভোগ্য একটা স্পাই থ্রিলার। লেখক হিসেবে এই বইয়ে তাকরীম ফুয়াদের লেখনীর উন্নতি আর পরিপক্কতার পরিচয় স্পষ্ট। 'সার্কেল ট্রিলজি' যেখানে থ্রিল আর সাসপেন্স দিয়ে মুগ্ধ করেছিল, 'ইনিগমা' সেখানে কনটেন্ট আর প্রেজেন্টেশনের দিক থেকে দারুণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে।
📚 বইয়ের নাম : ইনিগমা
📚 লেখক : তাকরীম ফুয়াদ
📚 বইয়ের ধরণ : এসপিওনাজ থ্রিলার, অ্যাকশন থ্রিলার
📚 ব্যক্তিগত রেটিং : ৪/৫