স্ত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পরে দুই যুগ ধরে নিশিপুরের নির্জন বাড়িতে নিজেকে একঘরে করে রেখেছিলেন নেছার উদ্দিন। ছেলে মেয়ে, নাতি নাতনীদেরকেও দূরে সরিয়ে রাখতেন তিনি। কাউকে এই কঠিন নিঃসঙ্গতার কারণ না জানিয়েই এক দিন মৃত্যুর ওপারে তিনি পাড়ি জমালেন। অতঃপর এক বর্ষণমুখর দিনে স্ত্রী মিরাকে সাথে নিয়ে দাদা নেছার উদ্দিনের ভিটেবাড়িতে এসে হাজির হলো শাহেদ।
পুরনো এই বাড়ির চারপাশ ঘিরে রেখেছে এক প্রাচীন বন। সেখানে থাকে শতবর্ষী নারী মন্দিরা আর গাঁয়ের চোর মতি। বনের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এক হারিয়ে যাওয়া রাজবাড়ি। আর আছে এক অভিশপ্ত পুকুর। ভুলেও কেউ সে পথ মাড়ায় না। কারণ, বনের মাঝে ঘুরে বেড়ায় জুগু বুড়ি। যার ভয়ে গ্রামসুদ্ধ ছেলে বুড়ো কাঁপে।
কে এই জুগু বুড়ি? কোথা থেকে এসেছে মন্দিরা? নেছার উদ্দিনের স্ত্রীর মৃত্যু রহস্যই বা কী? এসব কিছুর উত্তর পাওয়া যাবে জুগু বুড়ির ভয়াল ইতিহাসের পাতায়।
কাহিনী সংক্ষেপ : লোকালয় থেকে বেশ দূরে একটি গ্রাম।গ্রামের নাম নিশিপুর।সেই নিশিপুরের পাশেই আছে একটি বন।নিশিপুর গ্রামের নামের সাথে মিলিয়ে গাছপালায় ঘিরা বনটির নাম নিশিবন।সেই নির্জন নিশিপুর গ্রামে নেছার উদ্দীন নামের এক লোক দুই যুগ ধরে এক নির্জন বাড়িতে একাকী বাস করছে।কেউ জানে না কি কারণে তিনি তাঁর নাতি নাতনী ছেলে মেয়েদের কে এই গ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে এখানে দীর্ঘদিন একা বাস করছেন। তবে কি ভয়াবহ কোন কিছু আছে গ্রামে?? যার ভয়ে সবাইকে দূরে সরিয়ে একাকীত্ব বরণ করেছেন নেছার উদ্দীন?
অতঃপর একদিন এই একাকীত্বের কোন কারন না জানিয়েই পরলোকে পাড়ি জমান নেছার উদ্দীন।মৃত্যুর আগে তাঁর জমিজমার দেখভালের দায়িত্বে দিয়ে যান গল্পের আরেক মুখ্য চরিত্র জবেদ মাস্টারের কাছে।কিছুদিন পর স্ত্রী সমেত নিশিপুরের সেই ভিটেবাড়িতে জবেদ মাস্টারের কাছে দাদার জমিজমার হিসেব বুঝে নিতে আসেন নেছার উদ্দীন এর নাতি শাহেদ।আসার পর পরই শাহেদ এবং তাঁর স্ত্রী মিরা জড়িয়ে পরে একের পর এক রহস্যে।ঘন গাছপালায় ঘেড়া নিশিবনের ভিতরে আছে পুরোনো এক হারিয়ে যাওয়া রাজবাড়ি এবং অভিশপ্ত একটি পুকুর।সেই পুকুরেই শাহেদের দাদী কে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল অনেক বছর আগে।সেই বনের মধ্যে বাস করে "মন্দিরা" নামের এক শতবর্ষী বৃদ্ধা।আর আছে এক "জুগু বুড়ি" যার নামে গ্রামে লোকমুখে প্রচলিত আছে অনেক কাহিনী।আসলেই কি এই নামে কেউ আছে নাকি মিথ?বনের মাঝখান দিয়ে হেঁটে বেড়ানোর সময় মনে মনে তার নাম নিতে সবাই ভয় পায় কেন? জুগু বুড়ি নিয়ে ছড়া উচ্চারণ করলে বনের প্রানী সহ আশেপাশের সব নির্জীব কেন হয়ে যায়??ছড়া বললেই কি আসলেই সে সবার সামনে আসে??
পাঠ-ভাবনা : ★ প্রথমেই এক বাক্যে বলতে চাই, "গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত একটি চমৎকার মৌলিক হরর থ্রিলার হচ্ছে এই বইটি"। ★পুরো বইটি জুড়ে ছিল এক ভৌতিক আবহ,সাসপেন্স,নিগূঢ় রহস্য যা আমার অন্যতম পছন্দের গল্প হওয়ার প্রধান কারন ছিল এটি। ★গল্পের শুরুতেই নিশিপুর গ্রামের বর্ণনা,গ্রামের পাশে গাছপালায় ঘেড়া গা ছমছমে নিশিবন,শত বছরের পরিত্যক্ত রাজবাড়ি,অভিশপ্ত পুকুর,জুগু বুড়ি নিয়ে শতবছর ধরে চলমান মিথ,গ্রামের চিরাচরিত মানুষের মধ্যেকার কিছু কুসংস্কার,পাশাপাশি রয়েছে রহস্যময় কিছু চরিত্র মাজেদা,রানু,মনা,ফিরোজ,জলিল,আনিস,মতি চোর,মাওলানা সিরাজ এবং সেই শতবর্ষী বৃদ্ধা মন্দিরা। সব কিছুর মিশেলে দুর্দান্ত গা হিম করা ভৌতিক আবহে গল্পটি এগিয়েছে।এক মিনিটের জন্যও বোর হয় নি। জাস্ট লাইন বাই লাইন গল্পটি পড়ছিলান আর যেন পুরো নিশিপুর গ্রাম এবং আশপাশের অঞ্চল টা বইয়ের পাতায় পাতায় ভিজুয়ালাইজ করছিলাম।গল্পটি তে এতটাই মনোনিবেশ করেছিলাম যে পড়ার সময় আশেপাশে সামান্য শব্দেও চমকে উঠেছিলাম। ★ একটি সাধারণ স্টোরি যেমন অসাধারণ মেকিং এবং সংলাপের দরুণ একটি দারুন সিনেমা তে রুপান্তরিত হয় তেমনি একটা সাধারণ গল্পও অসাধারণ লেখনশৈলী,বাক্যগঠন এবং গল্প বলার ভংগির কারণে অসাধারণ হয়ে উঠে।এই বইটির সার্থকতা এখানেই। এখানে মাথা ঘুরানো টুইস্ট টার্ণ নেই।কিন্তু আছে লেখকের অসাধারণ লেখনীর ছোঁয়ায় সৃষ্ট ভৌতিক আবহের সাথে একটি মিথের সংমিশ্রণে তৈরি এক গল্প।যেটা চুম্বকের মত আমাকে আকর্ষন করছিল প্রতিটি পাতা উল্টানোর সাথে সাথে।তবে হ্যাঁ শেষ দিকে একটা ছোট্ট টুইস্ট আছে তবে রেগুলার থ্রিলার পাঠক যারা তাঁরা সহজেই টুইস্ট টা ধরে ফেলতে পারবেন। ★গল্পের শেষ দিকে অর্থাৎ ক্লাইম্যাক্স এ নৃশংসহতা টা বেশ ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল।ভালই নৃশংশহতার অবতারণা করেছিলেন লেখক শেষ দিকে।এক রকম ওয়েস্টার্ন হরর ফিল্মের স্বাদ টা যেন পাচ্ছিলাম।কারন শুধুমাত্র ভৌতিক পরিবেশ টাই আমাদের দেশে যে কোন হরর গল্পের মুখ্য বিষয় হিসেবে থাকে,নৃশংসহতার ব্যাপারটি অনেকেই গল্পে যোগ করেন না বা এড়িয়ে যান।এক্ষেত্রে লেখক কে ধন্যবাদ ভায়োলেন্স এর অংশটুকু যোগ করার জন্য যা আমার কাছে দারুন লেগেছে। ★গল্পটির টাইমলাইন ছিল ১৯৯৬ সালের।নব্বই দশকের গ্রামীন পরিবেশের একটা ফিল পাওয়া গেছে।কোন প্রযুক্তির ছোঁয়া ছিল না,মোবাইল ইন্টারনেটের কোন অস্তিত্ব নেই গল্পের মধ্যে যার ফলে গল্পের রক্ত হিম করা ভৌতিক ভাবটা আরো বেশি উপভোগ্য ছিল। ★বইটা আমি দুই রাতে শেষ করেছি। হ্যাঁ আমি বইটি সকালে বা দিনের আলোতে পড়িনি। আমি ভৌতিক আবহ টা ফিল করতে চেয়েছিলাম রাতের নিরিবিলি এবং নিস্তব্দ পরিবেশের মধ্যে।তাই যারা পড়েননি তাদেরকে অব্যশই সাজেস্ট করব রাতে বইটি পড়ার জন্য আর সবচেয়ে ভাল হয় যাদের বাড়ি গ্রাম্য এলাকায় বা মফস্বলের দিকে তারা বইটি রাতে পড়তে তাহলে গল্পটির স্বাদ পুরোপুরি উপভোগ করতে পারবেন।এটা একদম গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশে পড়ার জন্য উপযুক্ত একটা বই। ★জুগু বুড়ি নিয়ে ছড়াটি বেশ ভাল লেগেছে। বেশ কয়েকবার পড়ে বেশ মজা পেয়েছি।প্রায় মুখস্ত হয়ে গেছে!তবে সাবধান রাতের অন্ধকারে কেউ ছড়াটা গুনগুন করবেন না কে জানে জুগু বুড়ি এসে যেতে পারে😝!
যা ভাল লাগে নি : ★মূল চরিত্র শাহেদ কে আরো শক্তিশালী ভাবে উপস্থাপন করা যেত। জমিজমার ব্যাপারে সন্ধানের পাশাপাশি তাঁর দাদীর মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে বা শতবছরের পুরোনো রাজবাড়ির কাহিনী এসব সম্পর্কে জানার জন্য শাহেদের আরো তৎপরতা আশা করেছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে বেশ দুর্বলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে চরিত্রটি কে।
প্রচ্ছদ,বাইন্ডিং ও অন্যান্য : ★প্রচ্ছদ টা খুব সুন্দর হয়েছে। একদম গল্পের প্লট এর সাথে খাপে খাপ মিলে গেছে।প্রচ্ছদের বড় বড় গাছগুলো যেন একদম নিশিবনের গাছগুলোর মত যেটি অতিক্রম করলে যেন দেখা যাবে সেই পুরানো রাজবাড়িটি!! ★পেইজের কোয়ালিটি এবং কাভার ও ছিল একদম টপ ক্লাস। ★বাইন্ডিং নিয়ে সন্তুষ্ট না। একটু টাইট বাইন্ডিং ছিল। টেবিলে রেখে দুই পাশ খুলে পড়া যায় না। আরেকটু হালকা বাইন্ডিং দিলে বেশ ভাল হত। ★কিছু কিছু জায়গায় বানান ভুল ছিল বিশেষ করে যতি চিহ্ন গুলোর ব্যবহার ঠিকমত করা হয় নি। আশা করি পরবর্তী মুদ্রণে ঠিক হয়ে যাবে।
রাতে গা ছমছমে ভৌতিক পরিবেশের স্বাদ যদি পেতে যান তাহলে অবশ্যই "জুগু বুড়ি" গল্পটি পড়ুন। একটি অসাধারণ আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে রচিত ভৌতিক থ্রিলার এটা।
"জুগু বুড়ি" নামটা বেশ কৌতুহলোদ্দীপক তাই না? এই নামটা আমাকে আগ্রহী করে তুলেছিল সেই ২০২০ এই,যখন বইটা প্রকাশিত হয়।কিন্তু,ব্যাপক পড়ালেখার চাপ ফিকশনাল বই থেকে আমাকে সরিয়ে রেখেছিল ২ বছর।অবশেষে ২ বছর পর হলেও এই কৌতুহল মেটানোর সুযোগ পেলাম প্রফ শেষে।তবে বেশ একটু অস্বস্তিতে ছিলাম গুডরিডস এ "অযথা টেনে বাড়ানো হয়েছে" টাইপ রিভিউ দেখে।তবে লেখকের উপর আস্থা ছিলো সেই "ব্ল্যাকগেট" বইটা পড়ার দরূন। - গল্পের প্লটটা ১৯৯৬ সালের।এক দম্পত্তির নিশিপুর গ্রামে আগমন।মূল "protagonist" এর নাম মিরা যে কিনা তার স্বামী শাহেদের সাথে শাহেদের বাবার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিজমা তদারকি করতে আসে।আসার পথেই তাদের পরিচয় হয়ে যায় এই গ্রামের মানুষের ত্রাসের "নিশিবন" এর সাথে।গ্রামের মানুষ কোনো এক ভয়ে সেই বনের ভেতর দিয়ে রাতের বেলা পথ মাড়ায় না।এক অজানা "জুগু বুড়ির" ভয়ে ভীত পু���ো গ্রামবাসী,কেউ তার নামও নিতে চায় না ভয়ে,তার বাস নাকি ওই নিশিবনে।শহুরে আধুনিক শাহেদ ও মিরা এসব পাত্তা না দিলেও দেখা যায় যে তারা যে ভ্যানে করে এসেছিলো সেই ভ্যানচালক নিশিবনের ভেতর বৃষ্টিতে ভিজে "কালান্তক" জ্বরে আক্রান্ত পরদিনই। গল্প এগোলে আরও কিছু চরিত্রের সমন্বয় ঘটে।জবেদ মাস্টার,যে কিনা পড়ালেখা জানা থাকা সত্ত্বেও এই অজগ্রামে পড়ে আছে।কেন? গ্রামের চোর মতি,যে নিশিবনের ভিতর কিছু একটা দেখে ভয় পায়।কি সেটা? মাজেদা খালা,কি হয়েছিলো তার সাথে,কেনই বা তার শরীর পাওয়া গেলো রক্তাক্ত? তাও বা তার নিজের স্বামীর? কোথায়ই বা তার স্বামী,যাকে শেষ দেখা গিয়েছিলো নিশিবনে?কিইবা হলো তার? কে মিরার জানালার বাইরে হুটোপুটি করে?কেনই বা কেউ "জুগু বুড়ির" নাম নিতে চায় না মুখে?বনের ভেতর ওই রাজবাড়ির রহস্যটাই বা কি? মন্দিরা নামের রহস্যময়ী শতবর্ষী বৃদ্ধাই বা কে?কিভাবে তার শরীরে এতো শক্তি? কেনই বা নিছার উদ্দীন সাহেব তার সন্তানদেরকে এই গ্রামে আসতে দেননি বছরের পর বছর? কে জুগু বুড়ি? এসব উত্তর পাওয়া যাবে এই বইয়ের ২৪০ পৃষ্ঠার মধ্যে। - আমার কাছে বইটিকে বেশি "prolonging" লাগে নাই যেই অভিযোগে লেখককে অনেকে দেখলাম অভিযুক্ত করেছে গুডরিডস এ।আর গ্রামের উপন্যাস এমনিতে আমার বেশ ভালো লাগে,তার মাঝে এমন রহস্য হলে তো আরো ভালো।কিন্তু,কিছু কিছু জায়গায় প্রকৃতির বর্ণনা একটু বেশিই হয়ে গেছে।আর বানান ভুল তো আছেই,শব্দচয়ন এরও কিছু মারাত্মক ভুল আছে,যা মেজাজ খারাপ করবে,যেমন একজায়গায় দেখলাম "নিষ্পাপ" এর জায়গায় "নিষ্প্রাণ" লেখা xD যাইহোক আশা করি ঈহা তাদের বানানের দিকে আরও নজর দিবে সামনে। ৩. ৫/৫ (০.৫ বেশি কাটলাম বানানের জন্য)
নামটা খুবই আকর্ষনীয়,হোরর গল্পের জন্য যথাযথ।কিন্তু কাহিনিতে সেই দম নেই।মনে হলো একটা ছোট গল্পকে ২৪০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত অযথা টেনে নেয়া হলো।খুবই হতাশ।শেষ ২০ পৃষ্ঠায় কিছু চমক ছিলো।
বইটা খুব সুন্দর, সাবলীল ভাষায় লেখা। গ্রামবাংলা, বনবাদাড়, নদী, রহস্য এবং ভৌতিক ছোয়া গল্পটিকে আকর্ষনীয় করে তুলেছে। চরিত্রগুলো খুব সুন্দর ফুটে উঠেছে। এক কথায় অসাধারন।
জুগু বুড়ি, দা দিবি? দা দিয়া করবি কী? পিঁড়ি চাঁছমু। পিঁড়ি দিয়া করবি কী? বউ বসামু। বউ কোথায়? ঘাটে গেছে। ঘাট কোথায়? জলে গেছে। জল কোথায়? ডাহুকে খাইছে। ডাহুক কোথায়? বনে গেছে। বন কোথায়? পুইড়া গেছে। ছাইমাটি কোথায়? ধোপায় নিছে। ধোপা কোথায়? কাপড় কাচে। কাপড় কোথায়? রাজায় নিছে। রাজা কোথায়? হাটে গেছে। হাট কোথায়? মিল্লা গেছে।
গ্রামের নাম নিশিপুর। সে গ্রামকে ঘীরে রয়েছে সুবিশাল, গহীন এক প্রাচীন বন। তার নাম নিশিবন। সে বনে বাস করে অগুণতি ডাহুক পাখি। কর্কশ স্বরে ডেকে চলে সে পাখিরদল। কী বার্তা দেয় তারা? বয়ে চলা বাতাসেরা করে ফিসফাস, গাছের পাতারাও বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে করে আন্দোলন, যেন সম্মোহিতের মত কোন মন্ত্র পড়ছে। এই বনের রহস্য কী? রাতবিরাতে তারস্বরে কেঁদে ওঠে এক কুকুর। লোকে বলে কুকুর কাঁদা নাকি বিপদের আভাস। কীসের বিপদ? গ্রামবাসীরা যে করেই হোক এই বন এড়িয়ে চলে। কোন কারনে যদি বনে যেতেই হয়, অন্ধকার নামার আগেই ফিরতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে তারা। আর বনের মাঝখানে কেউ কোন অবস্থাতেই যায়না। কেন? বনের সীমানায় হঠাৎ হঠাৎ পাওয়া যায় কুকুর, বিড়াল বা ছোটখাট জীবজন্তুর ক্ষতবিক্ষত লাশ। কাউকে কাউকে বনের ভেতর টেনেও নিয়ে যায়। কীসে? কী আছে এই বনে? গ্রামবাসীরা তার নাম নিতেও ভয় পায়, ছড়া কাটতে আরও ভয় পায়। সে কে? সে হল জুগুবুড়ি। সে কে, কী, দেখতে কেমন এসব কেউ জানেনা। যারা জানত, তারা কেউ ফিরে আসেনি।
পাঠপ্রতিক্রিয়া পিছিয়ে পড়া একটি গ্রাম, এমনকি বিদ্যুৎ সংযোগও নেই। তার চারপাশে শতবর্ষেরও পুরনো এক জঙ্গল। গ্রামের সাথে জড়িয়ে আছে এক জমিদার বংশের অতীত ইতিহাস। গ্রামে সস্ত্রীক বেড়াতে এসেছেন সেই জমিদার বংশেরই বর্তমান উত্তরাধিকার। বর্ষণমুখর, থমথমে পরিবেশ। গ্রামের পুরাতন জমিদার বাড়ি দেখাশোনা করে একদল রহস্যময় লোকজন। যে বনে সবাই ঢুকতে ভয় পায় সে বনেরই ভিতরে বাস করে মন্দিরা নামে এক রহস্যময় বৃদ্ধা। হরর গল্পের জন্য এরচেয়ে চমৎকার আবহ বোধহয় সম্ভব না। লেখক তাকরিম ফুয়াদ সাহেবও তাই পাঠকদের উপহার দিয়েছেন হাড়হিম করা, অসাধারণ এক ভয়াল আখ্যান। হররের নানা জনরার মধ্যে আবহভিত্তিক হরর (Atmospheric Horror) আমার অত্যন্ত প্রিয়। এরকম গল্পে কী হতে যাচ্ছে, কী ধরনের বিপদ আসন্ন, সে সম্পর্কে পাঠকের মনে আগেভাগে টেনশন বিল্ডআপ করা হয়। তারপর ক্লাইম্যাক্সে গিয়ে বিগ রিভিল করা হয়। বিষয়টিতে যথেষ্ট মুন্সিয়ানার প্রয়োজন। ভীতিকর, থমথমে আবহ সৃষ্টি করে লাস্টে যদি দেখা যায় যে, যার জন্য এত আয়োজন সে আসলে অত ভয়ংকর না, তখন গল্পই খেলো হয়ে যায়। আবার যদি এমন হয়, শুরুতে তেমন ভয় নেই, শেষভাগে হঠাৎ অনেককিছু আনা হয়েছে, তখন তাড়াহুড়োয় গল্প ইনকনসিস্ট্যান্ট হয়ে পড়ে। কিন্তু জুগু বুড়ির ক্ষেত্রে লেখক চমৎকারভাবে সামাল দিয়েছেন সব। শেষভাগে অপ্রত্যাশিত কিছু টুইস্টও দিয়েছেন।
তবে ক্লাইম্যাক্সের সবচেয়ে মনোহর দিক হল, লেখক পুরো বইজুড়ে ছোট ছোট ক্লু দিয়েছেন, তারপর সবকিছু একসূত্রে গেঁথেছেন চূড়ান্ত পরিণতিতে। এমনকি বইয়ের শুরুতে প্রাপ্ত ছড়াটিই একটি বিশাল টুইস্ট। পাঠক যখন বিষয়টি ধরতে পারবেন, তখন উচ্ছসিত হবেন কোন সন্দেহ নেই। সেই সাথে বিমূর্ত হয়েছে বহু পুরনো সেই ধারনা, কখনো সখনো মানুষের কাজকর্ম পিশাচকেও হার মানায়।
লেখক সিক্যুয়েলের আভাস দেননি, কিন্তু ওপেন এন্ডিং দিয়ে গল্প শেষ করেছেন। এরকম ভয়াল গল্পে যেরকম ভয়াল এন্ডিং হওয়া উচিত লেখকও সেরকমই দিয়েছেন, তবে স্যাড এন্ডিং না। পার্সোনাল রেটিং ৪/৫
দাদা মারা যাওয়ার পর সহায় সম্পত্তি বুঝে নিতে নিশিপুরে যায় শাহেদ আর মীরা। নিশিপুরকে ঘিরে আছে এক রহস্যময় বন,নিশিবন। এই নিশিবনে এক আতংকের নাম জুগু বুড়ি। এ বুড়ির ভয়ে মুষরে থাকা নিশিপুরবাসী এমনকি জুগু বুড়ির নাম পর্যন্ত নেয় না কেউ।
জুগু বুড়ির সাথেও নিশিবনে আছে এক ভয়ানক জ্বর, যার নাম কালান্তক জ্বর। যে জ্বরে আক্রান্ত হলে কেউ বাচে না।
দাদা নেছার উদ্দিন বিশাল সম্পত্তি রেখে যায়। যার দেখাশুনা করতো জবেদ মাস্টার। শাহেদ মীরা নিশিপুরে পুরনো এক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়,প্রাচীন, আদিম, নিগূর অপ্রাকৃত এক পিশাচ যেন তাদের পিছনে আছে। তারা কী পারবে বেচে ফিরতে? জানতে হলে আপনাকে পড়তে হবে....
সম্পূর্ণ গ্রামীণ পরিবেশে গ্রাম্য পটভূমিতে জুগু বুড়ি লেখা। যারা আমার মত গ্রামে থাকেন তারা বইটির পুরোপুরি আনন্দ নিতে পারবেন।
প্লটটা সুন্দর। বইয়ে অনেক বানান ভুল। তবে প্রোডাকশন একদম প্রিমিয়াম৷ আমি অফারে ৩ টা বই নিয়েছিলাম এ নাহলে ঈহার বই আমি এফোর্ড করতে পারতামনা। এন্ডিংটা যেন একদম আহামরি ছিলো। ৫০% শেষ করার পর বুঝে গিয়েছি বইয়ের পুরো কাহিনি। হরর এলিমেন্টগুলিও গ্রাম্য পরিবেশে সেট আপ করা। সর্বোপরি একটা মুটামুটি বই।
শেষমেষ মোটাসোটা বইটা গুলশান লেকের পাড়েই পড়ে শেষ করলাম। আরে অফিসের মিটিং ছিলো গুলশানে, ডেটিং না। শুরু করেছিলাম ২ দিন আগেই। নির্ঘুম রাত, অফিস আর লেক পাড় - এই মিলিয়েই ছিলো জুগুবুড়ি।
নামের মত শুরুটা ভালো লাগলেও মাঝখান থেকে মজা হারিয়ে যাচ্ছিলো এবং গেছেও। এইরকম প্লটের গল্প অনেক জমাটি হয়। টানটান উত্তেজনা, পাতা উল্টানোর ব্যাগ্রতা যেন শেষ না করে রেহাই নেই।
জবেদ মাষ্টার যে কুকামের হোতা সেটা পরিষ্কার হয় মাজেদার তুকতাকের তথ্য থেকেই। নেছারউদ্দিন নিতান্তই ছিলেন পরস্থিতির শিকার। শাহেদের দাদী অনেক কষ্ট পেয়েছেন। তবে মধুরাণীর বংশের কোনও সূত্র যদি কাহিনীতে জড়ানো যেতো তাহলে আরও জমতো। কারণ মন্ত্রের ব্যাপারটা তার কাছ থেকেই শুরু হয়। জবেদ মাষ্টার তো ছিল অনেক দূরের লিংক। মন্দিরা মাজেদাকে না মারলে তো খবরই ছিল। আর জইল যে এতো আকামের সাথে জড়িত কে জানতো! নজর ভালো না, বদ শালা!
গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত একটি চমৎকার হরর থ্রিলার হচ্ছে এই বইটি। নিশিপুর গ্রামের পাশে গহীন গাছপালায় ঘেরা গা ছমছমে নিশিবন পরিত্যক্ত রাজবাড়ি, অভিশপ্ত পুকুর, জুগুবুড়ি নিয়ে শতবছর ধরে চলমান মিথ, গ্রামের মানুষের চিরাচরিত কিছু কুসংস্কার,পাশাপাশি রয়েছে রহস্যময় কিছু চরিত্র এবং শতবর্ষী বৃদ্ধা মন্দিরা।
বইটিতে লেখক অত্যান্ত সুনিপুণ ভাবে গ্রামের পরিবেশের সাথে ভৌতিক আবহ, রহস্য, সাসপেন্স, ভায়োলেন্সকে ঘিরে গল্পটিকে বইয়ের পাতায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
জুগু বুড়ি একটি গ্রাম্য মিথ কে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়েছে। গ্রামের বর্ণনা পড়তে পড়তে মনে হয় গল্প একজায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। মীর জাহানের একই গল্প দুবার করে বলে পৃষ্টা ভরানোর অর্থ বুঝলাম না। নেছার উদ্দিনের ডায়রির কথাগুলো মাস্টার আগেই বলেছিলেন। লেখকের কি মনে ছিল না? বাক্য গঠন ,শব্দ চয়ন ভীষণ আলগা, বাঁধুনি নেই। সময় থাকলে পড়তে পারেন। না পড়লেও ক্ষতি নেই।
গ্রাম্য মিথ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া একটা গল্প,পুরানো দিনে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর এক সত্যের বাস্তবতা যা বর্তমানকেও পিছু ছাড়ে না-গল্প ভালো লেগেছে।কিন্তু স্টোরি টেলিং আরো আকর্ষণীয় হতে পারতো বোধহয়।