আমাদের রোজকার পড়াশোনা কেমন জানেন? জ্যোতিরীন্দ্র মৈত্র'র ভাষা ধার করেই বলি~ "... ইট বের করা দেয়ালের কোণে কোণে। তেলমাখা পাঁচ আঙুলের দাগ, বোনে পুরোনো স্বপ্নের জাল, মলিন জীবন মহীরুহের ডাল। তারই নীচে --- শ্রীহরি সহায় --- আঁকাবাঁকা কাঠকয়লায় আঁকা, জগন্নাথের পট পেরেক দিয়ে আঁটা, কোনো সিনেমা-বনিতার জঘন্য সুন্দর মুখ আঠা দিয়ে সাঁটা অপর দেয়ালে। এই আবহাওয়াই সার অধমর্ণ অস্তিত্বের সাধু টঙ্কার।" এইরকম পাঠাভ্যাসে হঠাৎ করে আলোচ্য বইটির মতো কিছু হাতে এলে কেমন লাগে জানেন? তার জন্যও 'মধুবংশীর গলি'-রই দ্বারস্থ হই~ "হঠাৎ চিঠি আসে, কোনো তন্ময় মুহূর্তে। জানলা গলিয়ে পিয়ন দেয়, কাশে একটু জানানি হিসেবে। হলদে খামে পোরা শ্রান্ত বিকেলের রঙ!..." চোখের চেয়েও বেশি করে মন জুড়িয়ে দিল বারোটি গদ্যরচনার এই সংকলন। প্রবন্ধের বৈদগ্ধ্য ও স্মৃতিচারণের মেদুরতা মিশিয়ে লেখা হয়েছে এদের। নাতিদীর্ঘ পরিসরে, অত্যন্ত সুখপাঠ্য এই লেখাগুলোতে যে কতরকম বিষয় ধরা পড়েছে, তার পরিচয় দিই এবার। ভূমিকা-র পর এতে এসেছে নিম্নলিখিত লেখাগুলি: ১. ত্রিপুরার ত্রিপুরেশ্বরী ২. চর্যাপদে কৃষিজীবনের চিহ্ন ৩. জীবনানন্দের ছায়াশরীরিণী নায়িকা ও কবিতার অনুভবী পাঠক ৪. গদ্যের গলগথা ৫. ক্রুদ্ধ মণীষীদের আরক্তসুন্দর মুখশ্রী ৬. বিবেক-মানসে আবির্ভূত শ্রীরামকৃষ্ণ-প্রণামমন্ত্র ৭. একটি গল্পে ভারতের জাতীয় ইতিহাস ৮. সারদা দেবী: এই বেদনাক্লিষ্ট পৃথিবীতে দুঃখজয়ের এক আশ্চর্য অভিজ্ঞান ৯. স্বামী বিবেকানন্দ, একটি নাট্যানুষ্ঠান ও এক অলোকসামান্যা অভিনেত্রী ১০. Angels Unawares'-এর ভাবালোকে স্বামী বিবেকানন্দের জীবনদর্শন ১১. বিবেকবাণীর ভাষ্যকার স্বামী রঙ্গনাথানন্দ ১২. হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি... শেষ রচনাটিতে লেখক ভাবীকালের পাঠকের উদ্দেশে বলেছেন, "হয়তো বাংলা ভাষাটাই পালটে যাবে তখন।... তবু মনে হয়, নিতান্ত অবোধ্য হয়তো মনে হবে না এগুলো। কারণ, আমি জানি, আপনি আমার মানবভ্রাতা বা মানবভগিনী।" সবক'টি রচনায় মিশে থাকা এই অস্তিবাচক ভাবনার মুখোমুখি হয়ে মনে হয়, যেন শতাব্দীর ওপার থেকে সেই 'সিস্টার্স অ্যান্ড ব্রাদার্স' সম্বোধনের মানবতাই কড়া নাড়ছে আমাদের মনের দরজায়। আমরা 'অবনী' হব না দরজা খুলব - সেটা ঠিক করার ভার অবশ্য লেখক আমাদের ওপরেই ছেড়ে দিয়েছেন। ইতিহাস, দর্শন, সুললিত মুক্তগদ্য, ধর্ম - এদের মধ্যে যদি একটিও আপনার পছন্দের বিষয় হয়, তাহলে এই বইটি আপনি উপভোগ করবেন বলেই আমার বিশ্বাস। অলমিতি।