১৯ শতকের প্রথম দিকে বাংলার মধ্যবিত্তের বিভিন্ন ভাবে বিকাশ হয়েছে- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক। এই বইয়ে যে মধ্যবিত্তের বিকাশের কথা বলা হয়েছে, তা রাজনৈতিক এবং বিশেষ করে সেটা পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের রাজনৈতিক বিকাশ। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বাঙ্গালি মুসলিম প্রথম তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার উপলব্ধি করলো, মুসলিমদের মধ্যে তখন দুইটি প্রধান দল - মুসলিম লীগ এবং কৃষক প্রজা পার্টি। সময়ের ব্যবধানে বাংলার মুসলিমরা মুসলিম লীগকে বেছে নেয় তাদের প্রতিনিধি হিসাবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং শিক্ষিত, আদর্শিক অংশ বাংলার মুসলিমদের এই পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা নেয়। বাংলার মুসলিম লীগের শীর্ষ পর্যায়ে তখন কার্যত আহসান মঞ্জিল কেন্দ্রিক নবাব, জমিদাররা। বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্ত এবং শিক্ষিত তরুণ সমাজ আবুল হাশিম, সোহ্রাওয়ার্দীর নেতৃত্বে তখন আলাদা ফ্রন্টে। পাকিস্তান দাবিতে তারা এক হলেও কিছুদিন পরেই তাদের মধ্যে সেই বিবাদ মোটা দাগে বেড়িয়ে পড়ে। স্বাধীন পাকিস্তানে উচ্চবিত্ত আর নবাবদের অংশই সরকারি দলের মত সুযোগ সুবিধা পেতে থাকে, তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির সেই অংশই হয়ে যায় অলিখিত বিরোধীদল। এবং পরে তাদের মধ্য থেকেই গঠিত হয় পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। ৫৪ এর নির্বাচনে তারা দেখিয়ে দেয়, সাধারন মানুষের সমর্থন কাদের সাথে আছে।
৩৭ থেকে ৫৪ পর্যন্ত বাঙ্গালির রাজনৈতিক ইতিহাস যে কতো নেতা এবং ঘটনা দিয়ে কতভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তার মধ্যে থেকে বাছাই করা কয়েকটি নামই এখন শোনা যায়। কাম্রুদ্দিন আহমদ, এই পুরো সময় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে থেকেছেন। নিজে বিভিন্ন ভাবে অংশগ্রহণ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে রাজনীতির মঞ্চে উঠানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি তার এই "আত্মজীবনীর রূপরেখায়" সেই সব ঘটনাকে বিশ্লেষণ করেছেন, কুশীলবদের উদ্ধেশ্য প্রকাশ করে বিভিন্ন মিসিং লিঙ্ক পূর্ণ করার চেষ্টা করেছেন । লেখক ভুমিকায় লিখেছেন, তার আগেও অনেকে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস লিখেছেন, কিন্তু তাদের কর্মস্থল ছিল কলকাতা, ঢাকায় থেকে তিনি লেখক রাজনৈতিক ঘটনাকে যেভাবে দেখেছেন, আর কেউ সেইভাবে পারেনি।
ঢাকার নবাবদের নিয়ে কিছু মিথ এখনো আছে - ঢাকায় ইলেক্ট্রিসিটি, পানির লাইন, রাস্তা থেকে শুরু করে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত ঢাকা শহরের উনিশ শতকের সব কিছুতেই নবাবদের হাত আছে। তারাই যেন বাঙ্গালি মুসলিম সমাজকে জাতে তুলেছে। এই বইয়ে সেইসব মিথের অনেকটাই ভাঙবে।
শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন ও না, লেখক তার শৈশব কৈশোর আর ছাত্রজীবনের বর্ণনার মধ্য দিয়েও সেই সময়ের ঢাকা, বরিশাল কিংবা বিক্রমপুরের পল্লিগ্রামের কথাও তুলে এনেছেন পাঠকের মধ্যে। এককথায় ১৯ শতকের পূর্ব বাংলার মুসলিমদের ইতিহাস, বিশেষ করে রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য এই বইয়ের কাছে বার বার ফিরে আসতেই হবে।