ব্রিটিশ আমলে বাঙালি মুসলমানদের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতো ইংরেজ মোসাহেব নবাব এবং নাইটরা। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের পেশা ছিল চাষাবাদ। সেই চাষীরা রাজনীতির বাইরে থাকতো। পুরো ব্রিটিশ আমলে এভাবেই রাজনীতি চলেছে। বিপত্তি বাধলো দেশভাগের পর। পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রিত্বের ভোটাভুটিতে সোহরাওয়ার্দী মাত্র ৩৯ টি ভোট পেলেন। খাজা নাজিমুদ্দীন পেল ৭৫ টি ভোট। নাজিমুদ্দীন হলো পূর্ববাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। মন্ত্রী হিসেবে গর্ভনর ফ্রেডারিক এফ বোর্ন সাহেবের কাছে শপথ নিলো হামিদুল হক চৌধুরী ও নুরুল আমিন। ক্ষমতার পাদপ্রদীপ থেকে মোটামুটি ছিটকে পড়লো সোহরাওয়ার্দীপন্থিরা।
কিন্তু বাংলার রাজনীতি কেন এমন হলো? যে নাজিমউদ্দীন কোনোদিন সরাসরি ভোটে দাঁড়িয়ে জিততে পারেন নি, যে নাজিমুদ্দীন শুধু ড্রয়িংরুমে বসে রাজনীতি করেছে তার কাছে কর্মীবান্ধব সোহরাওয়ার্দী কেন এভাবে পরাজিত হয়েছিল? যেদিন প্রাদেশিক সভার সদস্যদের ভোটে পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন হওয়ার কথা, সেদিন কেন আবুল হাশিমপন্থি সদস্যরা সোহরাওয়ার্দীকে ভোট দিলেন না? কে তাদের নিবৃত্ত করেছিল?
খাজা সলিমুল্লাহর পর তার বড় ছেলে খাজা হাবিবউল্লাহ ঢাকার নবাব হন। নবাব হাবিবুল্লাহ রাজনীতিতে পতিত নক্ষত্র। নাজিমুদ্দীন, শাহাবুদ্দীন এরা তো সলিমুল্লাহর বোন শহর বানুর ছেলে। অর্থাৎ নবাবের ফুপাতো ভাই। বাংলাদেশে তো সন্তানরা মায়ের পারিবারিক টাইটেল গ্রহণ করে না। বাবার বংশ পরিচয়ই মুখ্য হয়ে ওঠে। তাহলে নাজিমুদ্দীন, শাহাবুদ্দীন কেন কখনো তাদের পিতার বংশ পদবি ব্যবহার করেনি? কেন তারা আজীবন নানাবাড়ি কিংবা মামাবাড়িতে থেকেছে?
১৯৫০ সালের পর বাংলার রাজনীতি নবাব-নাইটদের হাত থেকে ফসকে গেল। নয়ানেতৃত্বের বলয় তৈরি হলো। উঠতি মধ্যবিত্ত, যারা মূলত পেশাজীবী এবার ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে গেল। তারা হয়ে উঠলো ব্রিটিশের জং ধরা, মরচে পড়া নেতৃত্বের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। ভাসানী, শেখ সাহেব, তাজউদ্দীনরা তো এই অংশেরই লোক। শামসুল হককে মনে আছে? প্রশ্নের উত্তরে পালটা জিজ্ঞাসা আসবে কোন শামসুল হক? কত শামসুল হকই তো এলো-গেলো। আমি বলছি, পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের কথা। যিনি উপনির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী জমিদার বায়েজিদ খান পন্নীকে হারিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। এবার হয়তো মনে পড়ছে তাঁর কথা। কী যেন হয়েছিল? পাগল হয়ে গেছিল। শেষে পাগলের বেশেই মৃত্যু হয় আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদকের। আচ্ছা, শামসুল হক যদি বেঁচে থাকতেন এবং রাজনীতিতে সরব থাকতেন তাহলে বঙ্গবন্ধুর সাথে কী নেতৃত্বের সংঘাত তৈরি হতো? শামসুল হকও তো শেখের ব্যাটার মতো কর্মীবান্ধব রাজনীতি করতো, একবারে তৃণমূল থেকে শামসুল হকও তো উঠে এসেছিল। সেও তো ছাত্ররাজনীতির কাণ্ডারি ছিল। ভাবুন তো শামসুল হক দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে, রাজনীতির ময়দানও গরম করছে। তাহলে এই দুই নেতার মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব তৈরি হতো কীনা।
১৯৪২ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত এ কে ফজলুল হক বাংলার রাজনীতি থেকে একপ্রকার নির্বাসিত। ১৯৫৩ সালে মওলানা আকরম খাঁ মুসলিম লীগের প্রাদেশিক সভাপতির পদ ছেড়ে দেয়। হক সাহেব পদখানা চাচ্ছিলেন৷ কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন নিজে সভাপতির পদ বাগিয়ে নিলেন। কিছুই পেলেন না হক সাহেব৷ এদিকে নাজিমুদ্দীন তার বলয়ের হামিদুল হক চৌধুরী, মোহন মিয়া, কফিলউদ্দিন চৌধুরীদের বখরা দেয়নি কিংবা দিলেও তারা সন্তুষ্ট হতে পারেনি৷ এরা এসে ভিড় করলো সভাপতি পদবঞ্চিত হক সাহেবের কাছে। ১৯৫৩ সালেই যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত পাকাপাকি হয়ে গেল। কিন্তু ধরুন, মোহন মিয়া, হামিদুল হক চৌধুরী কিংবা হক সাহেব যদি ক্ষমতার ভাগ ঠিকমতো পেতেন তাহলে কেমন হতো?
কামরুদ্দীন আহমদের ভাষ্য মতে, যুক্তফ্রন্ট আদর্শিক প্লাটফর্মের চেয়ে বেশি ছিল ক্ষমতা ভাগাভাগির প্লাটফর্ম। নতুবা যুক্তফ্রন্টের দলগুলোতে মন্ত্রিসভার ভাঙা-গড়া এত প্রকট হতো না৷ সংসদের ভেতর মারামারিতে মরতো হতো না ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীকে।
রাজনীতি নিয়ে গ্রন্থ দু'ধরনের লোক রচনা করেন। পয়লা দল রাজনীতিবিষয়ক বুজুর্গ এবং দ্বিতীয় দলে আছেন খোদ রাজনীতিবিদগণ। কামরুদ্দীন আহমদ নিজে রাজনীতিবিদ, বর্মায় রাষ্ট্রদূত ছিলেন এবং যথেষ্ট পড়াশোনা জানা মানুষ। বাংলার রাজনীতির অনেক গূঢ় অন্ধিসন্ধির খবর তাঁর বিলক্ষণ জানা৷ ' বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মপ্রকাশ' এক অত্যুত্তম রাজনৈতিক ইতিহাস গ্রন্থ। যেখানে ব্যক্তি রাজনীতিবিদ কামরুদ্দীন আহমদের ভূয়োদর্শী অভিজ্ঞতার সাথে যোগ হয়েছে তাঁর পাণ্ডিত্যের, পর্যবেক্ষণের মতো মহত্তম গুণ।
১৯ শতকের প্রথম দিকে বাংলার মধ্যবিত্তের বিভিন্ন ভাবে বিকাশ হয়েছে- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক। এই বইয়ে যে মধ্যবিত্তের বিকাশের কথা বলা হয়েছে, তা রাজনৈতিক এবং বিশেষ করে সেটা পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের রাজনৈতিক বিকাশ। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বাঙ্গালি মুসলিম প্রথম তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার উপলব্ধি করলো, মুসলিমদের মধ্যে তখন দুইটি প্রধান দল - মুসলিম লীগ এবং কৃষক প্রজা পার্টি। সময়ের ব্যবধানে বাংলার মুসলিমরা মুসলিম লীগকে বেছে নেয় তাদের প্রতিনিধি হিসাবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং শিক্ষিত, আদর্শিক অংশ বাংলার মুসলিমদের এই পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা নেয়। বাংলার মুসলিম লীগের শীর্ষ পর্যায়ে তখন কার্যত আহসান মঞ্জিল কেন্দ্রিক নবাব, জমিদাররা। বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্ত এবং শিক্ষিত তরুণ সমাজ আবুল হাশিম, সোহ্রাওয়ার্দীর নেতৃত্বে তখন আলাদা ফ্রন্টে। পাকিস্তান দাবিতে তারা এক হলেও কিছুদিন পরেই তাদের মধ্যে সেই বিবাদ মোটা দাগে বেড়িয়ে পড়ে। স্বাধীন পাকিস্তানে উচ্চবিত্ত আর নবাবদের অংশই সরকারি দলের মত সুযোগ সুবিধা পেতে থাকে, তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির সেই অংশই হয়ে যায় অলিখিত বিরোধীদল। এবং পরে তাদের মধ্য থেকেই গঠিত হয় পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। ৫৪ এর নির্বাচনে তারা দেখিয়ে দেয়, সাধারন মানুষের সমর্থন কাদের সাথে আছে।
৩৭ থেকে ৫৪ পর্যন্ত বাঙ্গালির রাজনৈতিক ইতিহাস যে কতো নেতা এবং ঘটনা দিয়ে কতভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তার মধ্যে থেকে বাছাই করা কয়েকটি নামই এখন শোনা যায়। কাম্রুদ্দিন আহমদ, এই পুরো সময় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে থেকেছেন। নিজে বিভিন্ন ভাবে অংশগ্রহণ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে রাজনীতির মঞ্চে উঠানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি তার এই "আত্মজীবনীর রূপরেখায়" সেই সব ঘটনাকে বিশ্লেষণ করেছেন, কুশীলবদের উদ্ধেশ্য প্রকাশ করে বিভিন্ন মিসিং লিঙ্ক পূর্ণ করার চেষ্টা করেছেন । লেখক ভুমিকায় লিখেছেন, তার আগেও অনেকে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস লিখেছেন, কিন্তু তাদের কর্মস্থল ছিল কলকাতা, ঢাকায় থেকে তিনি লেখক রাজনৈতিক ঘটনাকে যেভাবে দেখেছেন, আর কেউ সেইভাবে পারেনি।
ঢাকার নবাবদের নিয়ে কিছু মিথ এখনো আছে - ঢাকায় ইলেক্ট্রিসিটি, পানির লাইন, রাস্তা থেকে শুরু করে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত ঢাকা শহরের উনিশ শতকের সব কিছুতেই নবাবদের হাত আছে। তারাই যেন বাঙ্গালি মুসলিম সমাজকে জাতে তুলেছে। এই বইয়ে সেইসব মিথের অনেকটাই ভাঙবে।
শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন ও না, লেখক তার শৈশব কৈশোর আর ছাত্রজীবনের বর্ণনার মধ্য দিয়েও সেই সময়ের ঢাকা, বরিশাল কিংবা বিক্রমপুরের পল্লিগ্রামের কথাও তুলে এনেছেন পাঠকের মধ্যে। এককথায় ১৯ শতকের পূর্ব বাংলার মুসলিমদের ইতিহাস, বিশেষ করে রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য এই বইয়ের কাছে বার বার ফিরে আসতেই হবে।
Must-read for history enthusiasts to understand the rise of Awami League as sole representative of Bangali middle class, and how Muslim League failed to meet their demand
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বলয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কড়ি অব্যশই এইদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ, আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ; “সুশীল” শব্দটা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেলাম।
এখন, প্রশ্ন উঠতে পারে, এই মধ্যবিত্ত আসলে কারা? কামরুদ্দীন আহমদ সাহেবের মতে, “১৯৫৩ সালে বাংলাদেশের জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পরে সত্যি কোন স্থিতিশীল মধ্যবিত্ত গড়ে উঠেছে কিনা এবং তারা কোন পটভূমি থেকে এসেছে তা এখনো সঠিকভাবে নির্ণয় করা হয়নি। বিত্তহীন দিনমজুরি করে জমির মালিক হয়ে হাল কিনে কৃষক হয়েই সে বৃত্তহীনের পর্যায় থেকে উপরে উঠেছে। ছেলে স্কুলের পড়া শেষে, শহরে চাকরি পেয়ে হয়ে গেছে নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি, আর সেখান থেকে কিছুটা উপরে উঠতে পারলেই মধ্যবিত্ত। এমনি করেই উচ্চমাধ্যমিকদের জন্ম হতে পারে অবশ্য শহরের বাসিন্দা হতে হবে; গায়ে থাকলে উচ্চমাধ্যবিত্তের আসন পায় না। মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক বলতে আমাদের সমাজে যারা শহরে কাজ করে যেমন শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, কেরানি, ব্যাংক ও ইন্সুরেন্স কোম্পানির কর্মচারী, অফিসের কর্মচারী, উকিল বা ডাক্তারদের বোঝায়। তারা অবশ্যই শহরের কারখানার শ্রমিক বা মেহনতী লোককে গায়ের মেহনতী লোকের সাথে এক পর্যায়ে ফেলে রাখে। গাড়ির চালক ওয়ার্কশপের বড় মিস্ত্রি এরা যত টাকায় উপার্জন করুক না কেন তারা মধ্যবিত্ত সমাজের বাইরে তাদের নিম্নবিত্ত বলে মানতেও উপরিউক্ত স্কুল কলেজে পড়া স্বল্প বেতনভোগী লোকেরা নারাজ। মধ্যবিত্তের রাজনীতি তাই সদা পরিবর্তনশীল এবং সে কারণেই সমাজে শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার অভাব দেখা দেয়।” বাংলাদেশি মধ্যবিত্ত সমাজের এই আইডেন্টেটি ক্রাইসিস এবং যেকোন মূল্যে উপরে ওঠার বাসনা তাদের রাজনৈতিক এজেন্সি কমিয়ে ফেলে অনেকটাই। যার ফলে, বাম্পার ফলন ঘটে ক্রনি ক্যাপিটালিস্টদের।
কামরুদ্দীন আহমদ প্রথম জীবনে মুসলিম লীগের রাজনীতি এবং পরবর্তীতে ট্রেড ইউনিয়ন করেছেন। এছাড়াও রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও পালন করেছেন। ৪৭, ৫২, ৫৪, ৬৯, ৭১, ৭৫- বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপুর্ণ মাইলফলক শুধু যে দেখেছেন তাই নয় প্রত্যক্ষ ভূমিকাও রেখেছেন। অবশ্য এই বইতে তার শৈশব, কৈশোর এবং রাজনৈতিক জীবনের প্রথম অংশই শুধু উঠে এসেছে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজ, তাদের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের একদম কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল লেখকের। তারই পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের ফলস্বরূপ এই গ্রন্থ। বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে সামান্যতম আগ্রহও যাদের আছে তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।