ধনুর্ধর এক হারানো কালের উপাখ্যান। পরাভূত রাজ্য, উন্নাসিক রাজা, বিগ্রহের দামামা, মানসিক দ্বন্দ্ব কিংবা আমূলে বিশ্বাসভঙ্গের এক বৈচিত্র্যময় কাহিনী। অথবা এটিকে জাতহীন, গোত্রহীন অতি সাধারণ একজন মানুষের ভালবাসার প্রগাঢ়তায় মোড়ানো, শত সহস্র দুঃখের এক আখ্যানও বলা যেতে পারে। অনভিলাষে যাকে বারবার রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হতে হয় নিজ বৈশিষ্ট্যের স্বতন্ত্রতা আর দুঃসাহসিকতা নিয়ে। কিন্তু নির্বাণলাভের ঋদ্ধি ক'জনের অদৃষ্টেই বা জোটে!
যুদ্ধ জেতা যায় তিন ভাবে- ছলে, বলে এবং কৌশলে। তবে এক্ষেত্রে তিনটির কোনটিরই আশ্রয় নিতে হয়নি লেখককে, সম্পূর্ণ লেখনীর জোরে পাঠকের মন জয় করে নিতে পারবেন তিনি “ধনুর্ধর” উপন্যাসটির মাধ্যমে। অন্তত আমার ক্ষেত্রে এই কথাটি সত্য। বাতিঘর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বই মাত্রই “থ্রিলার” ট্যাগিয়ে দেয়া হলেও “ধনুর্ধর” থ্রিলার বাদেও আরো বেশ কয়েকটি জনরায় অনায়াসে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। যেমন হিস্ট্রিকাল ফিকশন বা ইতিহাস আশ্রিত কল্পকাহিনী।
গল্পের পটভূমি গৌতম বুদ্ধের জন্মেরও ২৬৫ বছর আগে। তখন উপমহাদেশের কোশল আর পাঞ্চাল রাজ্যের মধ্যে সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়। কোশল রাজের আবাস রাজধানী শ্রাবস্তীতে। ভীষণ এক যুদ্ধও হয়েছিল দুই রাজ্যের মধ্যে। ধনুর্ধর সেই হারানো সময়েরই উপাখ্যান। পরাভূত রাজ্য, উন্নাসিক রাজা, বিগ্রহের দামা, মানসিক দ্বন্দ্ব কিংবা আমূলে বিশ্বাসভঙ্গের এক বৈচিত্রময় কাহিনী। অথবা এটিকে জাতহীন, গোত্রহীন অতি সাধারণ একজন মানুষের ভালোবাসার প্রগাঢ়তায় মোড়ানো, শত সহস্র দুঃখের এক আখ্যানও বলা যেতে পারে। যুদ্ধে কোশলরাজ পরাজিত হয়ে বংশরক্ষায় তিনদিকে তিনদল নিয়ে যাত্রা করেন। এক দলে মহারাজা স্বয়ং, আরেক দলে যুবরাজ অভিরাজা এবং তৃতীয় দলে রাজকন্যা মল্লিকা। মহারাজা এবং রাজকন্যার কি পরিণতি হয়েছিল, তা সমকালীন ইতিহাস ব্যক্ত করে না, লেখক এখানেই নিজ কল্পনার ঝাপি খুলে দিয়েছেন।
ধনুর্ধর আবর্তিত হয়েছে মূলত একজন চরিত্রকে ঘিরে। কোশলরাজ উদ্বাহুর সেনাপতি সুধামা পুত্র রুদ্রদামা এই আখ্যানের প্রধান চরিত্র। তৎকালীন তুখোড় ধনুর্ধর কৌলীয়র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নামহীন, জাতহীন, দাসীপুত্র, ভীষণ সাহসী এই যুবক কিভাবে বীর হয়ে উঠলো তার বর্ণনা পাওয়া যাবে গোটা বইয়ে। প্রধান চরিত্রগুলোর চরিত্রায়নের দক্ষতা আসলেও চোখে পড়ার মতন। প্রায়শই দেখা যায় যে মূল চরিত্রের আড়ালে খল চরিত্রের সেরকম প্রস্ফুটনই হয়নি। কিন্তু পাঞ্চাল রাজা প্রসেনজিত যতবার চিত্রপটে এসেছে, সম্পূর্ণ মনোযোগ তার দিকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেছেন।
কাহিনী ভীষণ গতিশীল। পুরো অভিযানে টুইস্ট বা মোচড়গুলোও সময়োপযোগী। তবে আলাদা করে বলতে হবে ভাষার যথার্থ প্রয়োগের ব্যাপারে। হিস্ট্রিকাল ফিকশনে যদি ভাষার কারুকাজ ঠিকঠাক না থাকে, তাহলে অনেকটাই ফিকে হয়ে যায় আকর্ষণ। কিন্তু ধনুর্ধরে সিদ্দিক আহমেদ ভাষার প্রতি তার দখল দেখিয়েছেন দারুণভাবে। উপমার যথার্থ ব্যবহার, সংস্কৃত শ্লোক গোটা উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করেছে। অতিবর্ণনাও চোখে পড়েনি কোথাও। যুদ্ধরীতি, অস্ত্রচালনা এবং রণকৌশলের বর্ণনাও জীবন্ত। শত্রুপক্ষ বা মিত্রপক্ষ কেউ কারো চেয়ে কম যায় না। শব্দবাণ, বক্রবাণ, অসিচালনা, উর্মি, কৃপাণ- এসব নিয়েও নিশ্চয়ই ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছে অনেক। শেষটুকু অনেকের ভ্রূকুটির উদ্রেক ঘটালেও আমার ভাল লেগেছে, এমনটাই হবার ছিল। সব মিলিয়ে দারুণ একটি লেখা উপহার দিয়েছেন সিদ্দিক ভাই। তার এ যাবত প্রকাশিত চারটি বইয়ের মধ্যে এটিকেই এগিয়ে রাখবো। সিকুয়েল চাই।
বইটা একবছর ধরে আমার বাসায় পরে ছিল। এতোদিন কেন পড়িনি তার জন্য আফসোস হচ্ছে। সিদ্দিক আহমেদ তো এই এক বই দিয়েই নিজের ফ্যান বানিয়ে ফেলেছেন।
অসাধারণ বইটা। লেখক বলেছেন বইটা শুরুতে সিনেমার স্ক্রিপ্ট হিসেবে লিখেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে সেটা বই আকারে প্রকাশ পায়। আমি বলি বইটা থেকে অসাধারণ এক সিনেমা হবে এখনো। কেউ যদি এগিয়ে এসে সিনেমা বানানোর কাজে হাত দেয় তবে খুবই ভালো হবে। কারণ বইটার স্টোরিটেলিং, ডায়লগ সবকিছুই মানসম্মত ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
স্পয়লারের ভয়ে বইয়ের ডিটেইলস বলতে চাচ্ছিনা, তবে এইটুকু বলি, গৌতম বুদ্ধের জন্মের ২৬৫ বছর আগে কোশলের রাজা আর পাঞ্চালের রাজার ভেতর ভয়ানক এক যুদ্ধ হয়েছিল। লেখক সেই যুদ্ধকে আশ্রয় করে এই পুরো বইটি লিখে ফেলেছেন। সাথে ছিল ধনুর্ধর রুদ্রদামার কাহিনী।
১৯ এপ্রিল, ২০২০ এর পর এই প্রথম কোনো ফিকশন বইয়ে ৫ তারা দেয়ার মত সৌভাগ্য হলো! ( প্রায় এক বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান! 🙂)
বাংলার থ্রিলার জনরা অনেক এগিয়েছে, এগিয়ে যাচ্ছে। পিছনের মূল কান্ডারি বাতিঘর প্রকাশনী। আমার সহ বেশিরভাগ মৌলিক থ্রিলারপ্রেমীদের সূচনাই বাতিঘর দিয়ে। বেগ-বাস্টার্ড সিরিজ, রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেন নি সিরিজ, সাম্ভালা সিরিজ, ২৫শে মার্চ, আর্কন, অক্টারিন - বাংলা থ্রিলারের শুরুর দিকে কিংবদন্তী! বর্তমানেও দারুণ কিছু থ্রিলার বের হচ্ছে প্রতিবছর। হীরকখন্ডে ঘুমিয়ে কুকুরদল, জাদুঘর পাতা আছে এই এখানে, সপ্তরিপু, ছায়াসময়, আলবা নেরা, দশগ্রীব, বাজি সিরিজ ইত্যাদি ইত্যাদি।
তবে বর্তমানে প্রতিবছর বাতিঘর থেকে প্রকাশিত বইয়ের কোয়ান্টিটি অনেক বেড়ে যাওয়ায়, কোয়ালিটি কতটা ensure থাকছে - এটা একটা প্রশ্ন!
ধনুর্ধর - বাতিঘরের কিংবদন্তি বইগুলোর সেলফে আরেকটা গ্রেট এডিশন। হিস্টোরিকাল আ্যকশান থ্রিলার৷ হিস্টোরিকাল থ্রিলারে সাধারণ ইতিহাসের সাথে বর্তমান সময়কাল সমান্তরালে চালানো হয়৷ অনেকক্ষেত্রে, তিন বা ততোধিক সময়কাল। এ জনরার থ্রিলারে লেখককে সাধারণত ইতিহাস নিয়ে যথেস্ট পড়াশুনা করার প্রয়োজন পরে। তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। এজন্য দেখা যায়, ফিকশনেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য ইনক্লুড করে দেয়ার প্রবণতা৷
ধনুর্ধর এই সবগুলো দিক থেকেই ব্যতিক্রম। লেখক ইতিহাস না, বরং গল্প ই বলতে চেয়েছেন। বাহারি তথ্য উপস্থাপনের চেস্টা করেন নি। গল্পটি ইতিহাসের একটি সময়কালেই ধাবিত হয়েছে এবং পাঠ মনোযোগ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
কালক্ষেপন না করে, অতি দ্রুত ই মূলগল্পে প্রবেশ। ২৮৮ পেজের বইয়ে এক মুহুর্তের জন্যেও গল্প ঝিমিয়ে পড়ে নি। শেষ না করে বই হাত থেকে নামানো খুবই মুশকিল। পুরোটা সময় মোহচ্ছন্ন মুগ্ধতায় পাতা উল্টাতে হয়েছে।
ধনুর্ধর শেষ করার পর অনুভব করতে পারি - বইয়ের প্লট ভালো হলেও, গল্প আহামরি নয়। বরং বই হিসেবে নাটকীয়তা খানিকটা বেশি। আর আমি সর্বদা অতিনাটকীয়তা অপছন্দকারীদের দলে।
তবে বইটি পড়ার পুরোটা সময় একবারও মাথায় আসে নি এমন। এখানেই লেখকের দক্ষতা, মুন্সিয়ানা। গল্পের দারুন উপস্থাপনা, দারুন বর্ণনারীতি। লেখনীতে সিদ্দিক আহমেদ লেটার মার্ক ডিজার্ভ করেন।
যুদ্ধের কুটিলতা, নিষ্ঠুরতা, রাজনীতি, ছল, কৌশল - পারফেক্ট আ্যকশান প্যাকেজ৷ সবমিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য ছিল "ধনুর্ধর"৷
ভিন্ন টাইম প্লটের বই যাদের পড়তে অসুবিধা হয় না, তাদের জন্য হাইলি রিকমন্ডেড থাকবে।
গৌতম বুদ্ধের জন্মের ২৬৫ বছর আগে কৌশলের রাজা আর পাঞ্চলের রাজার ভেতর এক ভয়ানক যুদ্ধ হয়েছিল। সেই সুপ্রাচীন সময়ের ইতিহাসকে আশ্রয় করে হিস্ট্রিকাল ফিকশন, থ্রিলার অথবা মহাকাব্যিক এক উপাখ্যান ধনুর্ধর। এখানে বলে নেয়া ভালো, কৌ��ল-পাঞ্চলের যুদ্ধ এবং তাগায়ুং (বর্তমান বার্মা) এর প্রথম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা অভিরাজ বাদে বাকি সবকিছুই লেখকের কল্পনাপ্রসূত।
হারানো এক কালের উপাখ্যানে উঠে এসেছে পরাভূত রাজ্য, উন্নাসিক রাজা, বিগ্রহের দামামা, মানসিক দ্বন্দ্ব কিংবা আমূলে বিশ্বাসভঙ্গের এক বৈচিত্র্যময় কাহিনী। অথবা এটিকে জাতহীন, গোত্রহীন অতি সাধারণ একজন মানুষের ভালবাসার প্রগাঢ়তায় মোড়ানো, শত সহস্র দুঃখের এক আখ্যানও বলা যেতে পারে। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে পাঠকের কাছে ধনুর্ধর নিছক এক গল্প হিসেবে নয়, বরং যেন উপস্থিত হয়েছে সুদক্ষ এক কাব্যকারের মুখে আওড়ানো অস্থির সময়ের ঐতিহাসক দলিল হিসেবে।
লেখক হিসেবে সিদ্দিক আহমেদের স্বার্থকতা এখানেই। ধনুর্ধর বইটির মূল অলঙ্কার হিসেবে আমি বর্ণণাভঙ্গি, শব্দ অথবা উপমার ব্যবহার, সংস্কৃত শ্লোকের উপস্থিতি, শক্তিশালী চরিত্রায়ন - এসব দিককে এগিয়ে রাখব। কেননা সুদূর অতীতের কাহিনী বলতে গিয়ে যদি ভাষার প্রয়োগ ঠিকমতো না হয়, তবে গল্পের আট আনাই খেলো হয়ে যায় বলে আমি মনে করি।
লেখকের রিসার্চ ওয়ার্কের পাল্লাটা বরাবরের মতোই বেশ ভারী। চক্র, ঊর্মী ইত্যাদি ইত্যাদি প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্রের নিখুঁত বর্ণণা; বক্রবাণ, শব্দবাণ, অস্ত্রচালনা আর চমৎকার সব রণকৌশলের কথা উঠে এসেছে গল্পের ফাঁকে ফাঁকে। গল্পের উত্তেজনা বজায় রাখতে বারবার হাজির হয়েছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। যুদ্ধের ময়দানে কী শত্রু, কী মিত্র - রণকৌশলের সামনে কারও কোন আপোষ নেই!
অভিযোগের কথা বলতে গেলে, পরিসমাপ্তির অংশে তাড়াহুড়োর কিছুটা ছাপ ছিল। গল্পের প্রয়োজনেই বোধকরি সেই অংশতে আরো খানিকটা বিস্তৃতি কাম্য।
ধনুর্ধরকে আমি নিঃসন্দেহে এবছর পড়া পছন্দের বইগুলোর শীর্ষতালিকায় রাখব। সেই সাথে অপেক্ষা করব, সিদ্দিক ভাই তার দক্ষ সৃষ্টিশক্তি আর বিস্তৃত গবেষণার সুযোগ্য মেলবন্ধন ঘটিয়ে সৃষ্টি করবেন আরও সব সুখপাঠ্য সাহিত্যকর্মের।
একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমানতালে পড়েছি বইটা। এত দ্রুত শেষ হবে নিজেও ভাবিনি। বাতিঘর প্রকাশনীর যে বইগুলো বেশি ভালো লেগেছে তার মধ্যে এটিও থাকবে। বইয়ের সবথেকে যে বিষয়টি ভালো লেগেছে তা হল ঐতিহাসিক থ্রিলার হলেও, ইতিহাস বর্ণনার থেকে গল্পের দিকে বেশি নজর দিয়েছেন লেখক এবং সেই জন্যই পড়তে বেশি ভালো লেগেছে। এই বইটা প্রিয় বইগুলোর তালিকায় থাকবে। ব্যক্তিগত ভাবে এন্ডিংটা মনমতো হয়নি।😷 কিন্তু সবমিলিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বইটা অসম্ভব ভালো লেগেছে। এন্ডিংটা ছাড়া বাকি সবটুকুই একদম মনমতো এবং এন্ডিং নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও সলিড ৫★ দিতে কোনকিছু আটকাতে পারেনি। এক কথায় বইটা অসাধারণ।
“সিদ্দিক আহমেদের ‘ধনুর্ধর’ পড়া শুরু করেছি এই সপ্তাহে। ভূমিকায় তিনি লিখেছেন যে এই গল্পের মূল লক্ষ্য ছিল রূপালী পর্দায় জায়গা করে নেওয়া। পরে তিনি একে উপন্যাসে রূপান্তর করেছেন, কারন, সিনেমার বিপুল বাজেট পান নি। মূল পান্ডুলিপি (সিনেমার উদ্দেশ্যে প্রণীত ছিল যেটি) হারিয়েছেন আর নতুন করে কয়েক বছর পর আবার লিখেছেন। লেখক যে প্রথমে একে চিত্রনাট্যের রূপ দিতে চেয়েছিলেন, লেখনীতে সেই বিষয়টা স্পষ্ট। চিত্রনাট্যের মতোই চিত্রবহুল তাঁর বর্ণনাভঙ্গি। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে, পৌরানিক এই কল্পগাঁথা থেকে আসলেই খুব দারুন একটা সিনেমা হতে পারে । জানি না, তিনি এখনো এ থেকে ছবি বানাতে চান কিনা, যদি এখনো ইচ্ছা অটুট থাকে, উনি যাতে কোন না কোনদিন নিজের এই ইচ্ছাটা পূরণ করতে পারেন, সেই প্রত্যাশা করছি।”
উপরের কথাগুলো লিখেছিলাম, বইটি শুরু করবার পরপর। এখন শেষ করে মনে হচ্ছে, এই উপন্যাস নিয়ে রিভিউ লিখতে গিয়ে বেশি কথা বলাটা বেশ ঝুঁকির হয়ে যায়। কাহিনীর নানা বাঁক, এমনকি মূল চরিত্র বা অন্য সব চরিত্রের কথা না বলে কি করে এই বই নিয়ে লেখা যায়, তা আমি ভেবে বের করতে পারছি না। কারন, প্রতিটা বাক্য মোটাসোটা স্পয়লার হয়ে বসতে পারে। আর আমি চাই না, পড়ে আমি যেই আনন্দ পেয়েছি, সেই আনন্দ থেকে এই বই পড়তে ইচ্ছুক একজনও বঞ্চিত হোক।
আমি ফ্যান্টাসি জনরার নিয়মিত পাঠক নই। এক হ্যারি পটার বাদে আর তেমন কিছুই পড়ি নি। এই জনরার কিছু বই তুলে নিয়ে মন টানে নি বলে রেখে দিয়েছি। সেই আমি ‘ধনুর্ধর’ এর এই জগতের এমন এক বাসিন্দা বনে গিয়েছিলাম পড়া শুরু করে যে শেষ হবার পর আমার মাথায় ঘুরছে, এরপরের কাহিনী কি লেখক লিখবেন না? কারন, শেষটা যে মন ভরায় না! মনে হয় আরো কিছু পর্ব হলে মন্দ হতো না। কারন, এতোখানি এতো সবিস্তারে বলার পর সেই উপন্যাসের একটা মোটামুটি সমাপ্তি এপিলোগে কিছু কথা বলে লেখক টানতে চাইলেও তা পাঠক হিসেবে মেনে নেওয়া দুষ্কর।
কাহিনী না বলে কতোটুকু কি বলা যায়, দেখি।
পৌরানিক বা ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রতি প্রথম যেই আশাটা থাকে যে বইটি একটি টাইম মেশিনের মতো আচরন করবে এবং অচেনা এক কালে উপস্থিত হয়ে সেখানের প্রতিটি অজানা বস্তু চিনিয়ে দিবে ও অন্য এক জগতে নিয়ে যাবে। লেখক এক্ষেত্রে একশোভাগ সফল হয়েছেন। বাড়িঘরের, বনজঙ্গলের, পরিধেয়র, কোন রাজ্যসভায় কার কি পদ, নগরের বর্ননা, যানবাহনের বর্ননা, এমনকি নানা ধরনের অস্ত্র, ছোটখাটো বস্তু, সেগুলোর সে সময়ের উপযোগী নাম, ব্যবহার, কোনকিছুর বর্ননায় লেখক কোন কার্পন্য করেন নি। পরিপার্শ্বের নিখুঁত এসব বর্ননা চরিত্রগুলোর সাথে আরো নিবিড়ভাবে একাত্ম হতে সহায়তা করে।
আর এতো খুটিনাটির বর্ননা দিতে গিয়ে ইনফো ডামপিং এর যেই লোভ, তাও লেখক সামলেছেন। একবারও কাহিনীর সাথে সম্পর্কহীন কিছু নিয়ে গালগল্পে মেতে পাঠককে মূল গল্প থেকে দূরে সরিয়ে দেন নি। এরকম পরিমিতিবোধের পরিচয় দেখিয়েছেন বলে লেখককে ধন্যবাদ।
উপন্যাসটিতে সাবালকত্ব, বীরত্ব, সাহস, যুদ্ধ, কুটিল রাজনীতি, সম্পর্ক, প্রেমের এমন ছবি এসেছে, যা যতো এগোয়, ততো ঘোরালো ও আকর্ষনীয় হয়ে ওঠে। আর লেখক সেসব জটও খুলেছেন আশা ভঙ্গ না করে। ভাষার ব্যবহারেও তিনি বেছে নিয়েছেন বাংলা ভাষার এমন একটি রূপ যা পৌরানিক এই পরিবেশের সাথে মানিয়ে যায়। চোখকে একারনেই চক্ষু বললে এখানে বাড়াবাড়ি মনে হয় না। পাঠক পড়তে পড়তে বুঝতে পারে যে কাহিনীর এই পটভূমি ও কাল এমন সব অপ্রচলিত শব্দের জন্যই উপযুক্ত।
ভালো লেগেছে, সবার মধ্যে সংলাপ আদান-প্রদানের কৌশলী দিকটি। কোন চরিত্রের কথাবার্তাই এই উপন্যাসে শুধু পাতা ভরায় না, বরং, যার মুখে যখন যা শোনা গেছে, তা মনে হয় আসলেই বক্তার অনেক ভেবেচিন্তে বলা কথা। কারন, চরিত্রগুলোই এখানে এমন যে এদের মুখে সাবলীল দৈনন্দিন বাক্যালাপ মানায় না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই ধাঁচটা ধরে রাখার কারনে পাঠকের মনোযোগে ছেদ পড়ে না।
শেষে বলব যে, এ থেকে একটি ছবি বানাতে হলে তা বিশাল পরিসরেই বানাতে হবে আর সিনেমা বোঝেন এমন একজন প্রযোজকের সাহায্য ব্যতীত সেটা সম্ভব নয়। আমি বইটি শুরু করবার কয়েকদিনের মাথায় যা বলেছিলাম তার জের ধরে বলতে চাই যে, লেখক এই উপন্যাসকে উপন্যাসে রূপ দেবার আগে এর কাহিনী নিয়ে সিনেমা বানানোর যেই স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণ হলে আমাদের লাভ বৈ ক্ষতি হবে না। বরং, ঠিকঠাকভাবে বানাতে পারলে বাংলা ছবির দর্শক হিসেবে আমরা দারুন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হব।
কোশলের রাজা হটাৎ করে টের পেলেন পাঞ্চলের সম্রাট প্রসেনজিৎ খুব শিগ্রহী আঘাত হানতে চলেছে তার রাজ্যে। দলীয় কোন্দল, রাজনীতি, ষড়যন্ত্রে জরাজীর্ণ রাজ্যকে কোনোমতেই রক্ষা করা গেল না। রাজা, রাজপুত্র ও রাজকন্যা তিনভাগে ভাগ হয়ে তিনদিকে ছুটলেন। রাজকন্যার দায়িত্ব এসে পড়লো প্রহরী, রাজ্যের সেরা ধনুর্ধর ও যোদ্ধা রুদ্রদামার হাতে। সে কি পারবে সকল প্রতিবন্ধকতা হটিয়ে রাজকন্যাকে মুক্ত করতে? নাকি বন্দি হবে কৌশলী রাজা প্রসেনজিতের হাতে? এসব নিয়ে দারুণ এক আখ্যান ধনুর্ধর।
দশগ্রীব খ্যাত সিদ্দিক আহমেদের নতুন বই ধনুর্ধর। দশগ্রীবে লেখক নিজের জাত চিনিয়েছিলেন, এবার দেখালেন অন্য রকম পারদর্শীতা। তুলে এনেছেন এক প্রাচীন সময়কাল। বুদ্ধের জন্মেরও দুশো বছর আগের কাহিনী। প্রেক্ষাপট কোশল সম্রাজ্যে জয়ের লক্ষে লড়াই। গল্পের নায়ক রুদ্রদামা, অর্জুনের চেয়েও ভয়ানক এক ধনুর্ধর। সবধরনের তীর ছুড়তে যে পারদর্শী। একইসাথে বুদ্ধিদীপ্ত যোদ্ধা। সুন্দর প্রাচীনকালের রাজনীতি তুলে ধরেছেন লেখক বইটাতে। ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা, যুদ্ধ তো রয়েছেই। দারুণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন সব পরিস্থিতির। বাস্তব ভিত্তিক গেম অব থ্রোন্স অথবা বাংলার গেম অব থ্রোন্সও বলা চলে। এত কঠিন প্রেক্ষাপটেও বর্ণনাভঙ্গি ছিল সাবলীল ও সরল। পাঠকদের বুঝতে কোনোরকম অসুবিধা হবে না। সবথেকে বড় কথা এবারের চরিত্রগুলো স্ট্রং। এমনকি খলনায়কের ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়তেও বাধ্য আপনি। ডায়লগগুলো ছিল খুব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও সুন্দর। কয়েক জায়গায় অনুপ্রেরণামূলক লাইনও অবতীর্ণ হয়েছে। গুপ্তচরবৃত্তি লক্ষ করা গেছে কাহিনীতে। সেদিক দিয়ে প্রাচীন আমলের স্পাই থ্রিলারের রূপধারণ করেছে। এবার আসি কাহিনীর প্রসঙ্গে। সাধারণ এক যুদ্ধের কাহিনী অসাধারণভাবে ধরা দিয়েছে বইটিতে। একঘেয়েমি একেবারেই নেই। রয়েছে টানটান উত্তেজনা। গতিশীল কাহিনী, এককথায় পেজ টার্নার। আর শেষে টুইস্ট তো রয়েছেই। সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের, টানটান , দারুণ একটা থ্রিলার উপন্যাস ধনুর্ধর। পাঠকেরা উপভোগ করতে বাধ্য।
অনেক সময় অনেক গুলো গল্প আছে যার রিভিউ লেখা অসম্ভব হয়ে দ্বারায়। চাইলেও লেখতে পারিনা, অথবা ইদানিং হাত থেকে লেখা বের হচ্ছেনা। তবুও দুটো কথা না জানালেই নয়।
আমি ব্যক্তিগত ভাবে ইতিহাস প্রেমী। ইতিহাস বিষয়ক যেকোন ফিকশন চুম্বক এর মতো টেনে ধরে।
সিদ্দিক আহমেদ ভায়ের লেখা লেখির সাথে আমি আগে থেকেই পরিচিত। কিন্তু তার লেখা এই বইটি তার আগের সব বইগুলোর চেয়ে উপরে রাখতে চাই আমি।
মানে সত্যি বলতে ধনুধর্র যে আসলে কতটা ভালো লেগেছে তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। মোস্ট অফ অল বাতিঘর এর এই পর্যন্ত সেরা বই গুলোর একটি।।
কি গল্প কিংবা কি চরিত্র বিল্ডিং সব কিছু এতো সুন্দর লেগেছে।
গল্পের মূল চরিত্রে রুদ্রদামা একজন যোগ্য নায়ক, অন্য দিকে খল চরিত্র প্রসেনজিৎ এর কৌশলি মনোভাব এতোটা তীক্ষ্ণ যে পাঠক হিসাবে আমি মুগ্ধ।
বিগত ১ বছর পর আমার মন মতো একটা হিস্টোরিক্যাল ফিকশন পড়লাম।। শুধু আমি কেন পুরো গুডরিডস এ এই বই এর রেটিং ১বছরে ৪.৫২। ভাবা যায় এতো!!
আমি একটানা নাওয়া খাওয়া ছেরে পড়ে গেছি। মাত্র দুই বসায় বই শেষ।
আমার হিস্টোরিক্যাল ফিকশন পড়ার অভিজ্ঞতায় ধনুর্ধর অন্যতম। সিদ্দিক ভাইকে ধন্যবাদ।।
গৌতম বুদ্ধের জন্মের ২৬৫ বছর আগে পাঞ্চাল-কোশল এই দুই রাজ্যের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধের পটভূমিকায় এই গল্প লেখা। এখন পর্যন্ত আমার পড়া সেরা হিস্ট্রিকাল ফিকশন / হিস্ট্রিকাল থ্রিলার। প্রতিটা চরিত্র, ঘটনায় লেখকের বর্ণনাভঙ্গি এককথায় অসাধারণ। ধনুর্বিদ্যা, তখনকার আরো কিছু অস্ত্রচালনা , তৎকালীন যুদ্ধরীতি সব কিছুই অনেক সহজে সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন, মনে হচ্ছিল চোখে ভাসছে। প্রধান খলচরিত্র পাঞ্চালের রাজা প্রসেনজিত , যে নরম সুরে কথা বললেও আশেপাশের সবাই ভয়ে কাঁপতে থাকে। পাঞ্চালরাজার রাজনৈতিক, কূটনৈতিক চাল , ঠাণ্ডা মাথায় ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, একই সাথে নিজের সেনাবাহিনী , নতুন প্রজা সবাইকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়া, আবার ষড়যন্ত্রকারীদের কে কিছুই বুঝতে না দিয়ে নীরবে তাদের উপরে চাল দেয়া – এগুলো করতে হলে একটা চরিত্রকে যতখানি শক্তিশালী হতে হয় বইতে অল্প কথায় ঠিক ততখানি শক্তিশালীভাবে দেখানো হয়েছে। প্রধান চরিত্র ধনুর্ধর রুদ্রদামা, কোশলের সেনাপতি সুধামার পুত্র। বাবার কাছে পরিচয় পায়নি, রণকৌশল, অস্ত্রচালনা কিছুই শেখেনি, শিখেছে পাঞ্চালের এক গুরুকুলের আচার্য কৌলিয়ের কাছে। দুই রাজ্যের শ্রেষ্ঠ ধনুরবীদের কাছে। কৌলিয়ের শিষ্য থেকে একসময় মহাশক্তিশালী ধনুর্ধর হয়ে ওঠে রুদ্রদামা। তারই গল্প এটা। ধনুর্বিদ্যা সম্পর্কে এত কিছু এই বইতে পড়লাম। ছোটবেলায় রবিন হুড পড়ার পর ধনুর্বিদ্যা শিখে রবিন হুড হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা তখন থেকেই ছিল । এই বই পড়ে ইচ্ছা আরো বেড়ে গেছে। এখন মনে হচ্ছে আচার্য কৌলীয়, চক্রপাণি বা রুদ্রদামাকে প্রশিক্ষক হিসাবে পেলে ভাল হয়। এটা এখন নিঃসন্দেহে আমার সবচেয়ে প্রিয় বইগুলার একটা হয়ে গেছে।
" চোখের সামনে শর এসে বিদ্ধ করল একজন অধ্যাপককে। অবিশ্বাস্য কোণ থেকে। আরেকজন অধ্যাপক বিদ্ধ হলো একইভাবে। ভবলীলা সাঙ্গ হতে সময় লাগল না তারও। কৌলিয় হাতের মুঠি দেখিয়ে সবাইকে থেমে যেতে আদেশ করলেন। ঠোঁটে আঙুল দিয়ে শব্দ করতে নিষেধ করলেন আচার্য। বিপক্ষ দলনেতা চরম ভয়ংকর। সে বক্রবাণের সাথে মিশিয়েছে শব্দ-বেধ। "
তুষারশুভ্র পর্বতমালা, গহীন অরণ্য কিংবা বিস্তৃত জনপদের তপ্ত বালুকণারা সাক্ষী শত-সহস্র সভ্যতার, সময়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে হারিয়ে যাওয়া হারানো কালের উপখ্যানের। তারা সাক্ষী বীরবেশে এগিয়ে যাওয়া রথের, রাজকুমারীসমেত এগিয়ে যাওয়া শকট কিংবা সেনাপতির অবলা ঘোড়ার ক্ষুরের টগবগে ধ্বনির। কিন্তু জৌলুস কি আজীবন রয়ে যায়? স্বর্ণাবৃত রাজপ্��াসাদ, কোটি কদম সুদীর্ঘ রাজ্য, উপেক্ষিত প্রজাকূল, রক্তচক্ষু সৈন্যদল, বিশ্বাসঘাতকের তলোয়ারের ঝংকার কিংবা হীরে, মুক্তা ও পান্নার আচ্ছাদনে আবৃত থাকা রাজপরিবার - সবই আজ কালের ধূলোয় ধুসরিত। তবুও সেসব রক্তের দীপাবলি স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু আফসোস, ইতিহাসও বাহ্যিক চাকচিক্য ভালোবাসে, নিজের মাঝে কেবল ধারণ করে ক্ষমতার ছায়া। তাইতো ইতিহাস কেবল পরাভূত ভীরু অযোগ্য রাজা, প্রতারক প্রধাণমন্ত্রী কিংবা ক্ষমতার মোহে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সম্রাটের কথাই তুলে ধরে, এড়িয়ে যায় সেসব বীরদের যারা কেবল নিজ ধর্মকে অটল রেখে আমরণ যুদ্ধ চালিয়া যায়। নিজ মাতৃভূমি আর ওয়াদা রক্ষার্থে সকল রণকৌশল চালনা করা, সম্মুখ যুদ্ধে পরিজনকে ভুলে অসি উঠানো মহাবীরদের কয়জনই চিনে? সিদ্দিক আহমেদের ইতিহাস আশ্রিত থ্রিলার 'ধনুর্ধর' ঠিক এমনই এক বীরের উপখ্যান। রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ, ক্ষমতার মোহ, দু' রাজ্যের বিভীষিকাময় যুদ্ধের আড়ালে চাপা থাকা কিছু মহাবীরের অপ্রাপ্তি, বিগ্রহ আর বিশ্বাসভঙ্গের গল্প 'ধনুর্ধর'।
*কাহিনী সংক্ষেপ- বংশ পরম্পরায় চলে আসা প্রতিবেশী রাষ্ট্রদ্বয় কোশল আর পাঞ্চালের স্নায়ুযুদ্ধ চূড়ান্তরূপ ধারণ করেছে। একদিকে কোশলের রাজা আত্মগরিমায় নিষ্ক্রিয় থাকছেন, আরেকদিকে প্রধাণমন্ত্রী সারায়ু ক্ষমতার লোভে আর প্রতিহংসায় অভ্যন্তরীণ চাল চালতে ব্যস্ত। পাঞ্চালের নবীন রাজা আরেক ধুরন্ধর, পদে পদে গুপ্তঘাতক দ্বারা নিজের গুটি সাজিয়ে নিচ্ছেন। বিগ্রহের দামামা নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়তে লাগল দুই রাজ্যজুড়ে। এদিকে ধনুর্ধর কৌলিয়ের শিষ্য, কোশলের মহাপ্রতিহারক সুধামার তথাকথিত অবৈধ পুত্র রুদ্রদামা ঘটনাচক্রে জড়িয়ে পড়ে রাজপরিবার রক্ষার কাজে। পিতার প্রতি ক্ষোভমিশ্রিত আবেগ আর সর্বদা শত্রু দমনের আকাঙ্ক্ষা সমান্তরালে চলছে তার। কী হতে চলেছে কোশল-পাঞ্চাল দ্বন্দ্বের? দুই রাজ্যে লিপ্সা মোড় ঘুরিয়ে দেবে কি সুধামা, রুদ্রদামা আর কৌলিয়ের জীবনে?
*পাঠপ্রতিক্রিয়া- 'ধনুর্ধর' শব্দটা শুরু থেকেই আমায় অদ্ভুত আকর্ষণে টানছিল। মহাভারত নিয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞান না থাকায় ধনুর্ধর অর্জুন ছিল অপরিচিত, তার উপর প্রাচীণ ভারতের ইতিহাস নিয়েও আপাদমস্তক অজ্ঞ আমি। তাই ঘটনাচক্রে ইতিহাস আশ্রিত থ্রিলারের দেখা পেয়েই লুফে নেই । ঘটনার শুরু ঘটেছে কোশলের রাজসভায়, সেখানেই ঘটনাক্রমে কোশল- পাঞ্চালের শত্রুতার তীব্রতা আঁচ করতে পেরেছিলাম, শুরু থেকেই গল্প বেশ জমজমাটভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। খানিকক্ষণ বাদেই গল্পের মূল প্রোটাগনিস্ট তথা রুদ্রদামার আবির্ভাব ঘটে। রুদ্রদামার হার না মেনে নির্ভীকের মত খাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া আমার শ্বাস রুদ্ধ করতে বাধ্য করেছে। গল্পের গভীর যেতে যেতেই যুদ্ধবিদ্যাসহ রাজনৈতিক কুটকৌশলের নির্দশন ইতিউতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। রাজনৈতিক খেলা, মনস্তাত্ত্বিক আলাপ, গুপ্তঘাতকের কুটকৌশল, শস্ত্রের আস্ত্রের মিলন ধরা দিচ্ছিল প্রতি পাতায়। কী হবে পাঞ্চালের? কী হবে কোশলের? কোথাকার জল কোথায় গড়াবে?- এমন সহস্র প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল মানসপটে। যুদ্ধবিদ্যা আর পাঞ্চালের রাজার মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাচেতনা অপূর্ব লেগেছে। রোমাঞ্চের পাশাপাশি রুদ্রদামার মায়ের প্রতি ভালোবাসা আর জীবন নিয়ে আক্ষেপ কিছুটা আবেগপ্রবণ করবে পাঠকদের। গল্প বেশ গতিশীলভাবে এগিয়ে যায় এভাবে, এত দ্রুত সব হয়েছিল কিছুতেই আঁচ করতে পারিনি কী হতে চলেছে। বইয়ের শেষাংশ জুড়ে রুদ্রদামা প্রকট হয়ে ধরা দেয়। রাজকুমারীকে রক্ষা করার পণ নিয়ে ছুটে চলা রুদ্রদামার পেছনে ধাওয়া করে সহস্র সৈনিক৷ পথিমধ্যে থাকা খণ্ডযুদ্ধগুলোর বর্ণনা একদম বাস্তব মনে হয়েছে। প্রতি মুহুর্তে টান টান উত্তেজনা, অসির ঝংকার আর ধনুর্ধর রুদ্রদামার রণকৌশল আপনাকে মুগ্ধ করবেই। রাজত্ব নিয়ে গড়ে ওঠা গল্প কখন এর যুবকের পারিপার্শ্বিকতায় মুখরিত হয়ে যাবে তা টেরও পাবেন না। আমার মতে, কাহিনীর এণ্ডিং পাঠকদের আশাতীত হলে লেখক অনেকাংশে সফল থাকেন। এদিক থেকে সিদ্দিক আহমেদ ষোল আনা সফল। মারাত্মক সমাপ্তি বাস্তবিক অর্থেই কল্পনাতীত ছিল। চরম রোমাঞ্চের ইস্তফা টেনে শেষে আবেগঘন শূণ্যতা ছাড়খার করে দিয়েছিল হৃদয়টা। ঘোরগ্রস্ত হয়ে কতক্ষণ ছিলাম তার ইয়াত্তা নেই। এক অনবদ্য সমাপ্তি।
*চরিত্রায়ন- লেখক চরিত্রায়নে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। প্রতিটি চরিত্র তাদের স্বতন্ত্রতা রক্ষা করে চলছিল। আচরণ আর মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাচেতনা সবাইকে অনুভব করতে সাহায্য করেছিল। রুদ্রদামাকে শুরু থেকেই অপ্রতিরোধ্য এবং জেদি হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। তবে জেদের আড়ালে থাকা আক্ষেপ আর অপ্রাপ্তির ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। সমাজের কাছে পুত্র হিসেবে সুধামার স্বীকৃতি আদায়ের স্বপ্নে বিভোর থাকত সে। কিন্তু শেষে বিভীষিকা যেন ভুলিয়ে দিল সকল জাত-ধর্ম। তার পিতা সুধামা এবং গুরুজি কৌলয়ের নিষ্ঠা আমায় মুগ্ধ করেছে। লোভী সরায়ু আর উদাসীন রাজা উদ্বাহুর উপর আমি চরম রাগান্বিত। তাদের প্রতি মনের তীব্র ঘৃণা লেখক জাগ্রহ করতে শতভাগ সফল হয়েছেন। এছাড়া গল্পের অন্যতম খলনায়ক পাঞ্চালের রাজা প্রসেনজিতের প্রতিবার আগমন আমায় আতঙ্কিত করত। তার ধূর্ততা, ছল এবং কৌশলের যথাযথ প্রয়োগে আপনাতেই ভয় জেঁকে বসেছিল মনে।
*ভালো মন্দের দিকগুলি- প্রথমতই লেখকের লেখনশৈলীর তারিফ না করলেই নয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাপেক্ষে ব্যবহৃত শব্দচয়ন পুরো অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে। অস্ত্র এবং যুদ্ধকৌশলের যেমন- শব্দবেধ, চল বেধ, বক্রবাণ, গুর্ণমুষ্ঠি ইত্যাদির আলোচনা বেশ জীবন্ত ছিল। রাজ্যের খুঁটিনাটি বর্ণনা না থাকলেও বিশ্বাসঘাতকতা, রাজনৈতিক কুটকৌশল, সম্মুখ যুদ্ধের খুঁটিনাটি ব্যাখা রোমাঞ্চ এনেছে দ্বিগুণ। নিঃসন্দেহে লেখককে প্রচুর গবেষণা করতে হয়েছে, এমন উপন্যাস জীবন্ত বানানো বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। নেগেটিভ দিক বলতে গেলে কেবল একটাই ঠেকেছে মনে, কয়েকটি বানান ভুল ছিল। তবে বানান ভুলের দিকটা ধর্তব্যে না রাখলে নির্দ্বিধায় 'ধনুর্ধর'-কে পার্ফেক্ট হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার বলা চলে। বইয়ের শেষদিকে সিক্যুয়াল আসার ইংগিত রয়েছে।
পরিশেষে, 'ধনুর্ধর' হারানো কালের উপাখ্যান এবং রাজনৈতিক দ্বৈরথ ছাপিয়ে একজন ধনুর্ধরের অপ্রাপ্তির গল্প, বিশ্বাসঘাতকতায় সুখী রাজ্য হারানোর গল্প। আবেগ আর রোমাঞ্চের পূর্ণ মিশেল গল্পটাকে আজীবন পাঠকদের মানসপটে গেঁথে রাখবে।
এই বছরের নতুন প্রকাশিত হওয়া থ্রিলার গুলোর মাঝে ডিফেরেন্ট ধরাণার একটি বই।৷ ঐতিহাসিক এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বইটি। কুশল ও পাঞ্চাল নামক দুটি রাজ্যের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ঘটনার আবর্তন। আগাগোড়া খুবই দারূণ একটি প্লট। যেজন্যে ৪ তারা দেয়া, শেষে এসে মনে হলো, হুট করেই যেনো হার্ডব্রেক করে গাড়ি থামিয়ে দেয়া হলো। এত সুন্দর করে সাজিয়ে আনা গল্পে শেষে খুব অল্পতেই খতম। লেখক চাইলে আরো ডিটেইলস সহ কাহিনীর সব কিছু নিয়ে একটি ভালো এন্ডিং দিতে পারতেন। তাড়াহুড়োর ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য না। সবমিলিয়ে, খুব বেশি ভালো একটা বই। সুপাঠ্য।
গৌতম বুদ্ধের জন্মের দুইশত পঁয়ষট্টি বছর আগে প্রাচীন ভারতবর্ষের কেশলের রাজা আর পাঞ্চালের রাজার মধ্যে একটা ভয়ংকর যুদ্ধ হয়েছিলো। এই যুদ্ধের উপর ভিত্তি করে লেখা 'ধনুর্ধর' একটি ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস।
গুপ্তচর আর তীর-ধনুক - এ অাখ্যানের মূল চালিকাশক্তি। তবে সবকিছু ছাপিয়ে উঠে সামনে চলে এসেছে প্রধান চরিত্র রুদ্রদামার রণকৌশল আর পাঞ্চালের সম্রাট প্রসেনজিৎ-এর কুটিল বুদ্ধি।
মুগ্ধ হয়েছি লেখকের বর্ণনাভঙ্গি, শব্দ চয়ন, চরিত্রায়ন, আর রিসার্চ ওয়ার্ক দেখে। ধনুর্বিদ্যা সম্পর্কিত জ্ঞান এবং তৎকালীন কিছু অস্ত্রশস্ত্রের পরিষ্কার বিবরণ চমৎকার লেগেছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে, এ বইটা লিখতে লেখককে প্রচন্ড পরিশ্রম করতে হয়েছে।
ফলশ্রুতিতে, আমি নিঃসন্দেহ যে - 'ধনুর্ধর' এখন আমার পড়া সেরা কয়েকটা বাংলা থ্রিলারের একটি।
লেখকের নটরাজ পড়ে ভয়ানক বিরক্ত হয়েছিলাম, ধনুর্ধর পড়ে সে বিরক্তি অনেকটাই কেটে গেল। লেখায় তামিল সিনেমা টাইপের মেলোড্রামাটিক আর অ্যাকশন এলিমেন্ট আছে (পরে দেখলাম লেখক নিজেও মূলত সিনেমার বানানোর লোক), কয়েক জায়গায় কিছু ভুল শব্দ আর বানান আছে, কিন্তু প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ টেনে রাখে। কাহিনীতে খাপছাড়া কিছু নেই, কোশল আর পাঞ্চাল দুই রাজ্যের মারামারির মাঝে পড়ে ধনুর্ধর রুদ্রদামার জীবনের বারোটা বেজে যাওয়ার কাহিনী বেশ বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলা হয়েছে। ফ্যান্টাসিতে আগ্রহ থাকলে (ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যেতে পা���তো, কিন্তু ফ্যান্টাসি এলিমেন্টটাই প্রধান মনে হয়েছে) খারাপ লাগবে না। পশ্চিমবঙ্গে এ ধরণের থীমে উপন্যাস লেখা হলেও, বাংলাদেশে এ ধরণের কাজ হয়নি বললেই চলে। পুনশ্চঃ ফ্যান্টাসি লেখার ক্ষেত্রে ইংরেজি-বাংলা সব জায়গাতেই দেখেছি প্রাচীন ভাষারীতি, বা বাংলার ক্ষেত্রে সাধু ভাষা বা মূল সংস্কৃত শব্দের আধিক্য থাকে। এখানেও লেখক সে রীতিই অনুসরণ করেছেন, কিন্তু বেশ কিছু জায়গায় ভাষা চলিত হয়ে একেবারে ফেসবুকীয় হয়ে গেছে। জিনিসটা বেশ বেখাপ্পা লাগে। ভাল একজন সম্পাদকের অভাব আমাদের দেশের নতুন বইগুলোতে প্রকট, এটা তারই একটা নমুনা।
বইটাকে নিয়ে সবার চমৎকারসব রিভিউ আমাকে বেশ দ্বিধায় ফেলেছে। ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, আমি কি আমার প্রত্যাশার শিকার হলাম, নাকি পাঠক হিসেবে আমার সংকীর্ণতাই প্রকট হলো?
ধনুর্ধরকে কেউ আখ্যা দিয়েছেন 'হিস্টোরিক্যাল ফিকশন' হিসেবে, আবার কেউ বলেছেন 'হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার'।
আমার কাছে মনে হলো দুইটা জনরাকে একত্রে মিশাতে গিয়ে লেখক দুটোর কোনো জনরার প্রতিই সুবিচার করে উঠতে পারেন নি। সবটা সময় জুড়ে মনে হচ্ছিলো 'বাহুবলী' টাইপের কোনো সিনেমার স্ক্রিপ্ট পড়ে যাচ্ছি, যেখানে ইতিহাসের ছোঁয়া আছে সাথে অতিনাটকীয়তা আর ধুন্ধুমার অ্যাকশন ফ্রী । 'কাটাপ্পা নে বাহুবলী কো কিউ মারা থা?' টাইপের প্রেডিক্টেবল টুইস্ট উপরি পাওনা।
হিস্টোরিক্যাল ফিকশনের মধ্যে যে ব্যাপারটাকে আমি গুরুত্ব দিয়ে দেখি সেটা হলো 'সময় নির্মাণ'। লেখক সেই সময়টাকে কিভাবে এবং কতটুকু আমার চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলতে পারছেন; সেই সময়ের আবহে নিজেকে একাত্ম করতে পারছি কিনা এবং ইতিহাসের সেই সময়ের যাত্রা আমাকে আক্রান্ত করতে পারছে কিনা। ধনুর্ধরে এর কোনোটাই পাই নি। লেখক যেভাবে দ্রুততার সাথে এগিয়ে গেছেন, সেখানে সময়টাকে ঠিকঠাক ছোঁয়া আসলেও প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।
এরপরে আসে চরিত্র নির্মাণ। চরিত্রগুলো কতোটা জীবন্ত, বিশ্বাসযোগ্য এবং সময়কালের প্রেক্ষিতে আমার চোখে যথার্থ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
বলতে বাধ্য হচ্ছি, লেখক বেশকিছু চরিত্রের মধ্যে জটিলতা আছে বোঝালেও সেটা ঠিকঠাক দেখাতে পারেন নি, অন্যসব চরিত্র এগিয়েছে ভালো-খারাপের বাইনারিতে।
আমাদের প্রোটাগোনিস্ট মি. হিরো, প্রচন্ড ভালো এবং একই সাথে শক্তিমান, দক্ষ ধনুর্ধর, যার তুলনা কেবল সে নিজেই। আর অ্যান্টাগোনিস্ট মহাশয় নিষ্ঠুর, ধূর্ত, ক্ষমতালোভী। এরকমটা হয়, হতেই পারে। কিন্তু বইয়ের সবগুলো চরিত্রই যদি এরকম বাইনারিতেই চলে সেক্ষেত্রে আমার কাছে সমস্যা বলেই মনে হয়। তাদেরকে সবসময় আর্দশিক রূপে বিরাজমান হতে দেখলে তাদেরকে ঠিক রক্ত মানুষের বলে কল্পনা করতে কষ্ট হয়।
লেখক গৌতম বুদ্ধের জন্মের প্রায় দুইশত পঁয়ষট্টি বছর আগের কোশল-পাঞ্চালের যুদ্ধকে প্লট হিসেবে বেছে নিয়েছেন। প্লটটা ইন্টারেস্টিং। কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু মার খেয়ে গেছেন গল্পে এসে। এরকম একটা যুদ্ধে যে পরিমাণ রাজনৈতিক জটিলতা থাকা উচিত তার সিকিভাগও নেই। প্রধান গল্প এগিয়ে গেছে কেবল হিরো রুদ্রদামার রাজকুমারীকে নিয়ে পালানোকে কেন্দ্র করে। মারামারি, কাটাকাটি বাদ দিলে সম্পূর্ণ গল্পের সারাংশ সাত লাইনেই বলে দেওয়া সম্ভব।
এরকম ইন্টারেস্টিং প্লটে লেখক চাইলেই দারুণ দারুণ গল্প ফাঁদিয়ে বসতে পারতেন। একটু পরপর মারামারি সেই সুযোগ অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে। অবশ্য থ্রিলার হিসেবে ধরলে ঠিকই আছে। থ্রিলারে মারামারি ছাড়া কি থাকবে আর?
এখানেও আমার মনে হয়েছে থ্রিলার হিসেবেও অসম্পূর্ণ থেকে গেছে বইটা। টুইস্টগুলো প্রেডিক্টেবল ছিলো, এবং মোচড়গুলো জায়গামতো লাগতে লাগতে লেগে গেল না, এরকম একটা ভাব সবসময়ই থেকে গেছে। একটা জমপেশ থ্রিলার আর কি কি আশা করা যেতে পারে? লুকোচুরি, থ্রিল,সাসপেন্স, রহস্য....
কোনোটাই আহামরি ভাবে পাই নি।
আরেকটা ব্যাপার চোখে লেগেছে খুব। চরিত্রদের অতিনাটকীয়তা। লেখক বেশ ভালো বর্ণনা করতে পারেন, কিন্তু মেলোড্রামাটিক ভাইব আনতে সংলাপে যে কথা-বার্তাগুলো ঢুকানো হয়েছে, তাতে বইটাকে সিনেমার স্ক্রিপ্টছাড়া অন্যকিছু ভাবা মুশকিল। মা-ছেলে, বাবা-ছেলে, প্রেমিক-প্রেমিকা টাইপের নাটকীয়তা একটু বেশি চলে এসেছে মনে হলো। এরকম ঘটনা ঘটা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু অতিনাটকীয়তা মানানসই লাগে না। কিন্তু বেশ কিছু ঘটনা বা দৃশ্যে ইচ্ছাকৃত নাটকীয়তা চাপানোর মতো একটা ব্যাপার ঘটেছে বলে মনে হয়েছে। গুরু-শিষ্যের যুদ্ধ, প্রোটাগনিস্ট-রাজকন্যার প্রেম ইত্যাদি ইত্যাদি।
সবমিলিয়ে একে না থ্রিলার বলতে পারছি, না হিস্টরিক্যাল ফিকশন। দুইটার মিশ্রণে যে জগাখিচুরি উৎপন্ন হয়েছে সেটা খারাপ লাগে নাই। কিন্তু ওই যে, নিজের এক্সপেকটেশনের কাছে মার খেয়ে গেছি আরকি। অসাধারণ কিছু একটা হইতে হইতেও ঠিক যেন হইয়া উঠিলো না।
যাই হোক, বাংলাদেশে এই ধরনের কাজ খুব কম হয়েছে। লেখকের যে প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন, এইজন্যে তার সাধুবাদ প্রাপ্য। গদ্যের স্টাইলও ভালো। লেখতে গিয়ে বেশ কাঠ-খড় পুড়িয়েছেন, এটাও বেশ বোঝা যায়। লেখকের পরবর্তী কাজগুলোর জন্যে শুভকামনা।
এক লাইনে বললে বলবো, 'ধনুর্ধর' লাস্ট কয়েক বছরে আমার পড়া সেরা থ্রিলার বই। তবে এটাকে শুধু থ্রিলার ট্যাগ দিলে আসলে খাটো করে দেখা হবে। কারণে 'ধনুর্ধর' এ যেমন সামাজিক দিকগুলো আছে, তেমনি আছে পলিটিক্স। আবার প্রেম ভালোবাসার মত অনুভূতিও এখানে অন্যরকম রুপ পেয়েছে। মোদ্দাকথা বইটা একটা প্যাকেজ যেখানে আমি কোন ফ্ল খুঁজে পাইনি এবং হাতে সময় পেলে ভবিষ্যতে আমি আরো কয়েকবার বইটা পড়বো।
সিদ্দিক আহমেদের নাম ডাক শুনলেও তার লেখা কোন বই আমি এই প্রথম পড়লাম। এবং বলতে দ্বিধা নেই, তার একটি বই পড়েই আমি তার ফ্যান হয়ে গেছি। লেখক যেন আরো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকেন আর আমাদেরকে 'ধনুর্ধর' এর মতো চমৎকার বই উপহার দিন, সেই কামনা থাকলো।
ইদানিং কী জানি হইসে.. উইশলিস্টে থাকা অনেক বই পড়ে ফেলতেসি :3
কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া অথবা সত্যিই ফিকশনাল কোন ক্যারেক্টার এক বিখ্যাত ধনুর্ধর রুদ্রদামা। যে সারাটাজীবন নিজেকে খুঁজে পেতে চেয়েছে। নিজেকে খুঁজে পেতে চাওয়ার মানে অবশ্য এই না যে সে স্বার্থপর। অনেকদিন পর সত্যিকারের একটা 'নায়ক' চরিত্রের যেন দেখা পেয়েছি। রুদ্রদামার চরিত্রের গঠন, যুদ্ধ পরিচালনা, দ্বৈরথ... গোটা ব্যাপারটাই দারুণ আকর্ষণীয় ছিলো। আর সেই সাথে ভিলেন একরাট প্রসেনজিত। (এই ব্যাটার ক্যারেক্টারাইজেশনও মারাত্মক! কথা বললে বা উপস্থিত হইলেই মনে হয় একটা ঠান্ডা বাতাস এসে ঝাপটা দিচ্ছে) বইয়ের লেখনী ভালো হলেও প্রথম হাফ খুব স্লো লেগেছে (অথবা হতে পারে সর্বশেষ পড়া বইটার প্রভাব থেকে বের হতে না পেরে মনযোগ ভেঙ্গে ভেঙ্গে যাওয়া..) শেষ হাফ চমৎকার গতিতে এবং দুর্দান্তভাবে শেষ হয়েছে। আই লাভিট! বিস্তারিত রিভিউ দিতে গেলে স্পয়লার হবে.. কিন্তু রুদ্রদামাকে নিয়ে লেখক আরেকবার ভেবে দেখতে পারেন। আশা করি, সেটাও দারুণ কিছু হব��।
ভাষাশূন্য অবস্থায় অসাধারণ ছাড়া আর কিছুই বলার নেই। হয়তো পরবর্তী তে আপডেট করব। এখন বসে বসে ভাবতে চাই। জানিনা ধনুর্ধর এর রেশ কখনো কাটবে কিনা, তবে লেখক সিদ্দিক আহমেদ তার প্রতিভা চিনিয়ে দিলেন!
ভারতের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে লিখতে গেলে বেশ কিছু শূন্যস্থানের সম্মুখীন হতে হয়। সেই অংশগুলোর না-আছে পাথুরে প্রমাণ, না আছে অন্য কোনো ডকুমেন্টেশন। অথচ সেই সময়গুলোতে যে কিছু ঘটেছিল, তার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে নানা কথা আর উপকথায়। ধনুর্ধর তেমনই এক অধ্যায়ের কাল্পনিক, রোমহষর্ক এবং ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা উপাখ্যান। হ্যাঁ, এই কাহিনিও ক্যাম্পবেল-কথিত 'হিরোজ জার্নি' ছক অনুসরণ করে এক নায়কের উত্থানের কথাই বলে। তবে এতে এমন একটি 'কহানি মে টুইস্ট' আছে, যা একে আর পাঁচটা ইতিহাসাশ্রয়ী ফ্যান্টাসি থেকে আলাদা করে দেয়। লেখা স্বচ্ছন্দ ও নির্ভার। পড়তে শুরু করলে শেষ না করে থামা প্রায় অসম্ভব। তবে কয়েকটি চরিত্রকে বড়ো মোটা দাগে আঁকা হয়েছে। আবার কয়েকটি, বিশেষত নারী চরিত্র, একেবারেই জায়গা পায়নি। এ-জন্য একটু দুঃখ রয়ে গেল। ফ্যান্টাসি বলেই এতে কিছু মানচিত্র থাকলে ভালো হত। ভালো হত কিছু অলংকরণ ও মোটিফ থাকলেও। তা বাদে আলোচ্য সংস্করণের ছাপা শুদ্ধ ও প্রমিত। ফ্যান্টাসি-পাঠের মাধ্যমে কিছুটা সময় ভালোভাবে কাটাতে চাইলে এটি চমৎকার উপায় হতে পারে।
চার তারা দিতাম। কিন্তু সম্পাদনার অভাব আর একের পর এক ভুল শব্দের ব্যবহারের জন্য তিন তারা দিচ্ছি। ভালো সম্পাদকের হাতে পড়লে এই বইটা অন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে পারতো৷ আফসোস.....
ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস বরাবরই পছন্দের। তার ওপর 'ধনুর্ধর' আমাদের নিয়ে যায় মহাভারতের কিছুকাল পরের সময়টাতে, যখনও সিদ্ধার্থ জন্মলাভ করেননি কিন্তু বৌদ্ধধর্ম অস্তিত্বশীল। মহাভারতে শোনা কোশল, পাঞ্চাল এসব রাজ্যগুলোর কালের স্রোতে পাল্টে যাবার মুহূর্তে এক হীন সৈনিক 'রুদ্রদামা'-কে নায়ক করে তৈরী গল্পে লেখক শ্রেণিবাদের কলুষমুক্ত বাস্তববাদী চোখে আলোকপাত করেছেন 'মহাভারতীয়' আবহের এক সময়ের ওপর।
গৌতম বুদ্ধের বুদ্ধের জন্মের ২৬৫ বছর আগে চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই রাজ্য কোশল ও পাঞ্চালের মধ্যে এক ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয়।পাঞ্চালের রাজা প্রসেনজিতের কুটিল পরিকল্পনার সামনে অসহায় হয়ে পড়ে কোশল রাজা উদ্বাহু। এমন এক ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ সময়ে মহাপ্রতিহারক সুধামার অবৈধ পুত্র রুদ্রদামা পাঞ্চাল থেকে স্নাতক হয়ে কোশলে ফিরে আসে। শুরু হয় আর্যবর্তের সেরা ধনুর্ধর কৌলীয়র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জাতিহীন , গোত্রহীন এই যুবকের বীর হয়ে উঠার গল্প।
ধনুর্ধর পরাভূত রাজ্য, উন্নাসিক রাজা, বিগ্রহের দামামা, মানসিক দ্বন্দ্ব কিংবা আমূলে বিশ্বাসভঙ্গের এক বৈচিত্র্যময় কাহিনী । অথবা এটিকে জাতহীন, গোত্রহীন অতি সাধারণ একজন যুবকের ভালবাসার প্রগাঢ়তায় মোড়ানো, শত সহস্র দুঃখের এক আখ্যানও বলা যেতে পারে। অনভিলাষে যাকে বারবার রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হতে হয় নিজ বৈশিষ্ট্যের স্বতন্ত্রতা আর দুঃসাহসিকতা নিয়ে। কিন্তু নির্বাণলাভের ঋদ্ধি ক'জনের অদৃষ্টেই বা জোটে!
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ ধনুর্ধর বইয়ের কাহিনী সংক্ষেপ বেশ আগ্রহ জাগানিয়া ছিল আমার জন্য। হিস্ট্রিকাল ফিকশন আমাকে বরাবরই অনেক টানে।আর হিস্ট্রিকাল থ্রিলার হলে তো কথাই নেই। গৌতম বুদ্ধের জন্মের ২৬৫ বছর আগে চির শত্রু দুই রাজ্যের যুদ্ধ নিয়ে হিস্ট্রিকাল থ্রিলার – এটুকুই যথেষ্ট ছিল আমাকে বইটির প্রতি আকর্ষিত করতে। ধনুর্ধর বইয়ের প্লটটা এক কথায় দারুণ। প্লটের পাশাপাশি এক্সিকিউশনও চমৎকার। একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বইটি আমার পূর্ণ মনোযোগ ধরে রেখেছিলো। লেখক বইটিকে ৪৮টি অধ্যায়ে সুন্দরভাবে ভাগ করেছেন। দারুণ মুনশিয়ানার সাথে লেখক প্রতিটি অধ্যায়ে ইতি টেনেছেন। বইতে একশনের পরিমাণও একদম যথার্থ মনে হয়েছে। অনেক গতিশীল একটি বই ধনুর্ধর। গল্পের গতি ও ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনায় লেখকের দারুণ মুনশিয়ানার কারণে এক মুহূর্তের জন্যও বিরক্তি আসেনি। পুরো বইতে একটি অরিরিক্ত বাক্যও চোখে পড়েনি। শুরু থেকেই বেশ কিছু ছোট ছোট কিন্তু দারুণ টুইস্ট দিয়ে লেখক গল্প এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
সিদ্দিক আহমেদের ছোটগল্প আগে পড়া থাকেলও উনার বই এই প্রথম পড়লাম। সিদ্দিক আহমেদের বর্ণনাভঙ্গি , গল্প বলার ধরণ এই বইতে অসাধারণ ছিল। জাস্ট অসাধারণ। লেখকের বর্ণনায় সেই সময়টা এমনকি বইয়ের প্রতিটি দৃশ্য খুব সহজেই কল্পনা করতে পারছিলাম। এত প্রাচীন একটা সময়কে লেখক দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন বইয়ের পাতায়।লেখক যে এই বই লিখতে অনেক রিসার্চ করেছেন তা বইটি পড়লেই বুঝতে পারবেন। সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে ধনুর্বিদ্যা, যুদ্ধরীতি ,রণকৌশল, রাজনিতির কূটকৌশল ও প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্রের নিপুণ বর্ণনা। বিশেষ করে শব্দবান , বক্রবান , ঊর্মি, শরক্ষেপণ, চক্র, অসিচালনা ও বল্লমকে ঘিরে বর্ণনাগুলো অনেক উপভোগ্য ছিল।একশন সিকুয়েন্সগুলি; যুদ্ধের দৃশ্যগুলো একদম জীবন্ত হয়ে উঠেছিল লেখকের বর্ণনায়। লেখক গল্পের প্রয়োজনে বিভিন্ন উপমা ও শ্লোক ব্যবহার করেছেন যা একটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হয়েছে। বইয়ের সংলাপগুলোও আমার বেশ ভালো লেগেছে। চরিত্রগুলির সাথে সংলাপগুলো একদম মানানসই ছিল। বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপে অন���ক সুন্দরভাবে কিছু দর্শন উঠে এসেছে। লেখকের ভাষার উপর দখলের প্রশংসা করতে হয়। সেই সময়কে তুলে ধরতে লেখক অনেক জায়গাতেই কিছু কঠিন শব্দ ব্যবহার করেছন যার বেশিরভাগই বুঝতে পারিনি। কিন্তু একবার কাহিনীতে ভালোমতো ঢুকে যাওয়ার পর তা আর সমস্যা হয়ে দাড়ায়নি।
ধনুর্ধর বইয়ের চরিত্রগুলির মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে প্রধান চরিত্র রুদ্রদামাকে। রুদ্রদামার চরিত্রটি একদম ওয়েল ক্রাফটেড ও ওয়েল ডেভেলাপড। নিঃসন্দেহে জাতহীন , গোত্রহীন এই সাহসী যোদ্ধার কথা অনেক দিন মনে থাকবে। গল্পের খল চরিত্র পাঞ্চাল রাজা প্রসেনজিতকেও দুর্দান্ত লেগেছে। তার চরিত্রটা আমার কাছে অনেক শক্তিশালী মনে হয়েছে এবং যখনই সে দৃশ্যপটে এসেছে পূর্ণ মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নিয়ে গেছে।বাদ বাকি চরিত্রগুলোকেও ভালোই লেগেছে। বিশেষ করে কোলীয়, সরায়ু, সুধামা এদের উপস্থিতি বইতে খুব বেশি না থাকলেও নিজস্ব একটা ছাপ রেখে যেতে সক্ষম হয়েছে।
ধনুর্ধর বইয়ের ফিনিশিং আমার বইয়ের বাকিটুকের মতো অসাধারণ না লাগলেও ভালো লেগেছে। ফিনিশিং যেভাবে হয়েছে তা নিয়ে আমার কোন আপত্তি নেই, বরং এভাবে হওয়াতে আমার বেশ ভালোই লেগেছে। কিন্তু কিছুটা তাড়াহুড়োর ছাপ পেয়েছি ফিনিশিংয়ে। মনে হয়েছে ফিনিশিংটা আরেকটু বিস্তৃত হলে আরও ভালো হতো।
ধনুর্ধর বইয়ের একমাত্র খারাপ দিক হলো দুর্বল প্রুফরিডিং। বানান ভুল আর প্রিন্টিং মিস্টেক অনেক ছিল। চরিত্রদের নামও অদল বদল হয়ে গেছে কয়েক জায়গায়। আবার কয়েকটা বড় ব্যাকের মধ্যে দাড়ি দেওয়া যেখানে কিছুক্ষেত্রে কমা হওয়ার কথা আর কিছুক্ষেত্রে কিছুই হওয়ার কথা না। “ এটা তিনি করে ফেললেন তিনি” , “এখানে সে এসে পড়েছে সে” এরকম বেশ কয়েকটা বাক্যও নজরে পড়েছে। ধনুর্ধরের মতো অসাধারণ একটা বইয়ের এরকম দুর্বল প্রুফরিডিং ও সম্পাদনা প্রাপ্য ছিল না। পড়ার সময় মাঝেমধ্যেই এই বিষয়গুলো কিছুটা বিরক্তি সৃষ্টি করেছে এবং ফ্লো নষ্ট করেছে। আশা করছি পরবর্তী মুদ্রণে এগুলি ঠিক করে নেওয়া হবে। ধনুর্ধর বইয়ের বাইন্ডিং ও পৃষ্ঠার মান ভালো ছিল। ফরিদুর রহমান রাজীবের করা প্রচ্ছদটাও অনেক সুন্দর লেগেছে। নামলিপির নিচে সাদা দাগটা অবশ্য প্রচ্ছদের সৌন্দর্য কমিয়ে দিয়েছে (এটা সম্ভবত ছাপায় ঝামেলা হয়েছে কোন)।
সর্বোপরি , ধনুর্ধর আমার অসাধারণ লেগেছে। বইটি একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা ধরে রেখেছিল। যুদ্ধ , ইতিহাস , একশন, থ্রিল সবকিছুকে দারুনভাবে ব্লেন্ড করে সিদ্দিক আহমেদ রচনা করেছেন এই চমৎকার হিস্ট্রিকাল থ্রিলারটি যা আমার অনেক দিন মনে থাকবে। এ বছরে আমার পড়া অন্যতম সেরা বই ধনুর্ধর। হিস্ট্রিকাল ফিকশন বা থ্রিলার প্রেমীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য একটা বই। টানটান গতিশীল থ্রিলার যারা পছন্দ করেন তাদেরও অনেক ভালো লাগবে বলে বিশ্বাস করি। বইয়ের একদম শেষে সিকুয়েলের ইঙ্গিত দেয়া আছে এবং সিকুয়েল যে আসছে লেখক তা কনফার্মও করেছেন। অধীর আগ্রহে সিকুয়েলের অপেক্ষায় থাকলাম। লেখকের জন্য অনেক শুভ কামনা।
অসাধারণ একটি বই।🤍🤍 সিদ্দিক আহমেদ এর লেখা আমার পড়া প্রথম বই এটি। ইতিহাসকে আশ্রয় করে হিস্ট্রিকাল ফিকশন, থ্রিলার বা মহাকাব্যিক এক উপাখ্যান ধনুর্ধর। বইয়ের প্রথম থেকে শেষ অব্দি প্রতিটি লাইন ছিলো একদম মারাত্মক। উনার ফ্যান হয়ে গেছি এই বই পড়ে। উনার লিখা বাকি গুলো পড়ার ইচ্ছা জেগে উঠলো।
লেখকের কল্পনাশক্তি আসলেই প্রশংসনীয়। লেখক নিজের কল্পনাশক্তি এবং যুদ্ধ ও ইতিহাস সংক্রান্ত জ্ঞানকে অনেক দক্ষভাবেই ব্যবহার করেছেন। তবে রুদ্রদামাকে কিছু কিছু জায়গায় একটু ওভার পাওয়ারড মনে হয়েছিল।
চমৎকার একটা বই । সিদ্দিক আহমেদের ছোটগল্প দিয়ে যাত্রা শুরু করি, এবার পড়লাম ধনুর্ধর । গল্পটা এককভাবে রুদ্রদামা, রাজকন্যা মল্লিকা বা কোশল পাঞ্চালের নয় । গল্পটা সার্বজনীন, পৃথিবীতে হয়ে আসা প্রতিনিয়ত যুদ্ধের গল্প, বেঁচে থাকার গল্প, টিকে থাকার গল্প । আবার একই সাথে আছে নির্মম বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্প, নির্মম বাস্তবতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সবকিছু ধ্বংস করে ফেলার ইঙ্গিত । গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর চরিত্রায়ন খুব সময় নিয়ে যত্নের সাথে করা । বইটি পড়ার সময় লেখক বেশ রিসার্চ করেছেন, সেগুলো খুব ছোট ছোট ডিটেলিং এর ব্যাপার থেকে বোঝা যায় । ঘটনা প্রবাহেও খুব একটা তাড়াহুড়ো ছিল না, আবার ইলাস্টিকের মতোন ঝুলেও যায় নি কোথায় । টানটান উত্তেজনা ছিল, বিশেষ করে ক্লাইম্যাক্স সিনে । বিশ্বাসঘাতকতা, মানবিকতা, ভালোবাসা, ঘৃণা, মমতা, উন্নাসিকতা - সবকিছুর এক অপূর্ব মিশেল "ধনুর্ধর" ।