'ধ্রুবপদ' নামক পত্রিকার ২০০১ সালের পঞ্চম বার্ষিকীটির বিষয় ছিল 'যৌনতা ও সংস্কৃতি।' পাঠকের প্রশংসাধন্য সেই সংখ্যাটির পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপ হিসেবে এই বই আত্মপ্রকাশ করে ২০০২ সালে। তাতে মোট তেইশটি প্রবন্ধে এই জটিল ও বহুস্তরীয় বিষয়টির পর্যালোচনা করেছিলেন নানা ক্ষেত্রের দিকপাল লেখকেরা।
কী কী লেখা আছে এতে?
প্রথম পর্যায়ে এসেছে সামগ্রিক বিচারে যৌনতার ভাবনা ও তার রূপায়ন নিয়ে নানা আলোচনা। এতে স্থান পাওয়া লেখাগুলো হল:
১. যৌনতা ও সংস্কৃতি~ প্রদীপ বসু
২. আদিম যৌন-ভাবনা ও যৌন-প্রতীক~ দিব্যজ্যোতি মজুমদার
৩. ভারতের রূপসংস্কৃতি ও যৌনতা~ দিলীপকুমার ভারতী
৪. ভারতীয় সংস্কৃতিতে যৌনতা - কিছু 'যুক্তি-তক্কো-গপ্পো'~ সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়
৫. 'শ্বেতসভ্যতা' ও 'কৃষ্ণযৌনতা': সার্টজে বার্টম্যানকে খুন করল কে?~ ঈপ্সিতা চন্দ
৬. লোকায়ত দেহতত্ত্ব~ শক্তিনাথ ঝা
৭. আদিরসাত্মক বাংলা গান: ১৭৫০-১৯০০~ রমাকান্ত চক্রবর্তী
৮. ভারতীয় চিত্রকলায় আদিরস: সন্দীপ সরকার
৯. যৌনতা: নারীবাদের আলোয়~ যশোধরা বাগচী
১০. সমকামিতা ও সংস্কৃতি: দেশ ও বিদেশ~ অভিজিৎ গুপ্ত
১১. চলচ্চিত্র, যৌনতা, দর্শকসমাজ~ এস.ভি.শ্রীনিবাস
১২. সৌন্দর্য-ব্যবসার অন্তরালে~ সুচিত্রা ভট্টাচার্য
১৩. বলিউডের প্রেমের ছবি: অন্দর-বাহিরের সূত্র~ শিলাদিত্য সেন
এই লেখাগুলোর মধ্যে দিব্যজ্যোতি মজুমদার, দিলীপকুমার ভারতী এবং সন্দীপ সরকার প্রণীত তিনটি প্রবন্ধের মতো লেখা পড়তে পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের কথা। এই লেখক ও প্রাবন্ধিকদের একক রচনার সংকলন আছে কি না - এই বিষয়ে আলোকপাত করলে আমি সত্যিই ঋণী হয়ে থাকব। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের লেখার বক্তব্য আজও সত্যি হলেও সেগুলো শোনার ক্ষমতা বোধহয় দেড় দশকে আমরা হারিয়েই ফেলেছি। বাকি প্রবন্ধগুলো নিঃসন্দেহে মূল্যবান, তবে আমার সেগুলো বড়ো বেশি অ্যাকাডেমিক ও তত্ত্বাকীর্ণ ঠেকল।
দ্বিতীয় পর্বে আছে বঙ্গীয় সাহিত্য ও ভাবনায় যৌনতার পর্যালোচনা। সেই অংশের প্রবন্ধগুলো হল:
১৪. যৌনতা: বাংলা কথাসাহিত্য~ সুমন ভট্টাচার্য
১৫. নাটকে যৌনতা: বাংলা নাটকে~ শেখর সমাদ্দার
১৬. যৌনতার ক্লাস ও বাংলা কবিতা~ জহর সেনমজুমদার
১৭. রবীন্দ্র চিত্রকলায় নগ্ন পুরুষ ও নারী~ সুশোভন অধিকারী
১৮. বাংলা গানের শরীর-অশরীর~ রঙ্গন চক্রবর্তী
১৯. নারী আলোচনায় যৌনতা বনাম সংস্কৃতি: তসলিমা নাসরিনের সাহিত্য~ সুতপা ভট্টাচার্য
২০. ধরি মাছ না ছুঁই পানি: বাঙালি সমাজে যৌনতা - স্ল্যাং-এ ও প্রবাদে~ অভ্র বসু
এই অংশটি রীতিমতো দুঃসাহসিক, কারণ এতে অনেক প্রতিমা ভেঙে তার বদলে আমাদের নতুন করে ভাবতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে সুমন ভট্টাচার্যের লেখাটি ধারে ও ভারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটি বিবরণের বদলে বিশ্লেষণে আগ্রহী হয়ে মাঝেমধ্যে বড়ো জাজমেন্টাল হয়ে পড়েছে - এই আর কি।
বইয়ের শেষ পর্বটি নাতিদীর্ঘ। যৌনতার বাণিজ্যিক বা পেশাগত অংশ নিয়ে আলোচনা-নির্ভর এই পর্বে আছে:
২১. কলকাতার যৌনপল্লী~ দেবাশিস বসু
২২. যৌনশিক্ষা: একটি অভিজ্ঞতার বর্ণনা~ স্বপ্নময় চক্রবর্তী
২৩. যৌন কাজ কি কাজ?~ স্মরজিৎ জানা
২০১২ সালে প্রকাশিত আলোচ্য দ্বিতীয় সংস্করণের শুরুতে সম্পাদক সুধীর চক্রবর্তী স্পষ্টভাবে বলেই দিয়েছেন যে মাঝের দশ বছরে, মূলত আন্তর্জালের সুবাদে নগ্নতা, যৌনতা, সমকামিতা প্রভৃতি বিষয় আর আগের মতো স্পর্শকাতর নেই। তবে প্রায় একশো সত্তর বছর আগেই জঁ ব্যাপতিস্ত আলফান্সো-কার বলে গেছিলেন, plus ça change, plus c'est la même chose
(কোনোকিছু যতই বদলায়, ততই সেটা আগের মতোই থাকে)। কথাটা আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা বোঝার জন্য বইটা আমাদের পড়ে দেখা উচিত, তাই না?
মনের গভীরে বয়ে চলা এই অজানা বৈতরণির পরিচয় পেতে চাইলে বইটি অবশ্যই পড়ুন।