মনের কোনে মাঝে মাঝে একটা অন্ধকার চোরা স্রোত এসে ধাক্কা দিয়ে যায়। পৃথিবী যেগুলোকে নিষিদ্ধ তকমা দিয়ে রেখেছে সেগুলো করতে চায় অবচেতন মন। ভালো আর খারাপের সংজ্ঞা তখন ব্যর্থ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। কল্পলোকে আঁকা হয় নৃশংস কোনো ছবি যার নাগাল পায় না অন্য কেউ। সত্তা নিজের অন্ধকার রাজ্যে নিজেই কল্পনায় তুলির আঁচড় দেয়।
জবাইঘরের প্রতিটি গল্পের কোনো না কোন অংশ কিংবা সম্পূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে Dark element। বইটি জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব উপাদানগুলো পাঠককের কল্পনাকে ছিন্ন করে দেয়। রচিত করে দেয় বিষন্ন একটা ধারা। প্রথম গল্প কুটুম পড়েই গভীর আগ্রহ আর মনোযোগ দিয়ে পড়তে বাধ্য করে বইটি। অন্ধকারাচ্ছন্নতা বইটির প্রতিটি গল্পে যেন আঁচড় কেটে গিয়েছে। এই গল্পসমগ্রের মধ্যে কুটুম, পুতুলবাড়ি, চিড়ল কাঁটার বাতাস, জবাইঘর, পাতালকুমার, এ্যাপ্লিকেশন, মানবী বিশেষ পছন্দের। এগুলো পড়তে গিয়ে যেমন থ্রিল পেয়েছি তেমন কোনো কোনো গল্পে সমানুপাতিক ধারার বাইরের স্বাদ পেয়ে মুগ্ধ হয়েছি।
লেখক হাসান মাহবুব সাহেবের সাথে প্রথম পরিচয় উপন্যাস এসিড বৃক্ষের গান পড়ে। এই উপন্যাসটা পড়ার সাথে সাথে কেন যেন ভালো লেগে গেলো। লেখকের চমৎকার লেখনী আর ডার্ক উপাদানগুলোকে ফুটিয়ে তোলার নৈপুণ্যতা আমাকে বেশ পুলকিত করেছে বলা যায়। তাই এরপরে শুরু করলাম জবাইঘর পড়া! এখানেও বেশকিছু চমৎকার চমৎকার গল্প আঁচড় দিয়ে গিয়েছে পাঠক মনে। সব মিলেই বেশ ভালো এবং উপভোগ্য।
গল্পগুলো অস্বস্তিকর। গল্পগুলো অশ্লীল। ভায়োলেন্সে ভর্তি প্রায় প্রতিটি স্টোরি। মানবজীবনের সাথে সেই ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা সমিল আছে গল্পগুলোর সেটা বলতে হবে। মানুষের জীবনের দুঃখ, দূর্দশা, নিত্যদিনকার শীতল নির্মানবিকতা ফুটে উঠেছে এই বইয়ে।
এক ডজন গল্পের সমন্বয়ে এই গ্রন্থের সৃজন। প্রতিটি স্টোরি মনে হয় কয়েক লেয়ার বা স্তরে লিখা। যত লেয়ারে সচেতন পাঠক প্রবেশ করবেন ততই অস্বস্তিকর এক একটা জানালা উন্মোচিত হতে থাকবে। সবগুলো গল্প আমার ভালো লেগেছে এই কথা বলবো না। তবে অধিকাংশ ক্লিশে ভর্তি, বিভিন্ন ডাইরেক্ট এবং ইনডিরেক্ট উপমা, ভঙ্গিমা এবং রূপকের ব্যবহার হয়েছে।
একজন সর্বভূক সচেতন পাঠকের কাছে এসব দূর্বোধ্যতা তেমন কঠিন কোন ম্যাথ হবে না সলভ করার জন্যে। বরঞ্চ ভালো রিডার নিজেকে অথবা নিজের পারিপার্শ্বিকতাকে হয়তো খুজে পেতে পারেন এই বইয়ে। গ্রন্থকারের লেখনী বেশ দ্রুতগামী। গল্পগুলো ঝুলে যায়নি কোথাও। এর মধ্যে হয়তো এই বইয়ের জনরা কি সেটা নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে রিডারদের মাঝে।
হাসান মাহবুবের লিখা কোন বই এই প্রথম পড়ে শেষ করলাম। এখন মনে হচ্ছে আরো আগে কেন খুঁজে নিলাম না এই লেখককে? বাংলা ভাষায় একজন আন্ডাররেটেড পাওয়ারফুল প্রোজ রাইটারের দেখা পেলাম এই বইয়ের মধ্য দিয়ে যাত্রা করার সময়। কি শক্তিশালী লেখনীর অধিকারী লেখক হাসান মাহবুব!
লেখকের কয়েক লেয়ারে লিখা এই বইয়ের কিছু গল্প থ্রিলার, কিছু গল্প জাদুবাস্তবতা এবং কিছু গল্প উদ্দেশ্যমূলকভাবে অর্থহীন মনে হতে পারে। তবে তার লেখনী যথেষ্ঠ ডার্ক। সবসময় আলো পথ দেখাবে এই চিন্তা ভাবালুতায় ভর্তি। মানবজীবনের বৃহৎ অংশ অন্ধকারে ঢাকা। মানবসন্তানের বেশিরভাগ গল্প নির্মমতম পরাজয়ের। লেখক হ্যাপি এন্ডিং দিতে চান নি। বেশিরভাগ সময় কি আসলে আমাদের গল্পের এন্ডিং গুলো হ্যাপি হয়?
এই বই দূর্বল হৃদয়ের অধিকারী পাঠকের জন্য নয়। এই বই নয় নায়কের জয় খুঁজে ফেরা রিডারের জন্য। বইটি বেশিরভাগ পাঠকের মন খারাপ করে দিতে পারে। তবে আমি মনে করি এরকম বই যদি হাসান মাহবুব লিখে যেতে থাকেন তাহলে তিনি বাংলা ভাষায় একজন কিংবদন্তী লেখকে পরিণত হবেন। তাঁর লিখা বইসমূহ ক্লাসিকের মর্যাদা পেতে পারে। বাংলা সাহিত্যকে হাসান মাহবুবের প্রাপ্য মর্যাদা দিতেই হবে।
লেখকের কথা ঠিক, "মানুষের অসুখ এবং আঁধারের ঠিকানা দরকার, কি বলেন?" হাসান মাহবুব বইয়ের পিছনে পাঠকের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন সাহস করে এসব অন্ধকারের মুখোমুখি হওয়ার জন্য।
চ্যালেঞ্জ আমি নিয়েছি। অন্ধকার অবচেতন জিতেনি। জিতেছি আমি।
কারণ জীবনে বিভিন্ন রূপে আমাদের সবার জন্য হয়তো জবাইঘরের সিরিয়াল আছে। আতঙ্কিত না হয়ে বরঞ্চ আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে জবাইঘরের দিকেই যাত্রা করার প্রস্তুতি থাকুক সবার।
মানুষের অন্ধকার দিক নিয়ে হাসান মাহবুবের মতন সাইকোপ্যাথ-সুলভ সুচারুতা নিয়ে আর কেউ কি লিখছেন এত দিন, এত কাল ধরে? আমার চোখে পড়ে নি। কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ মাৎসর্য্য – প্রতিটি রিপুকে তিনি হাতে তুলে নিয়ে, চোখের সামনে ধরে পর্যবেক্ষণ করছেন – দেখাচ্ছেন – দ্যাখো – আমরা কতটা ঘৃণ্য হতে পারি!
বইয়ের পেছনের কথাটা সত্যি। জবাইঘর পড়তে আমার ভালো লাগে নি। আমার বুক কেঁপেছে, ঘেন্না লেগেছে; অসহায় লেগেছে। ব্যক্তিগতভাবে যখন মিশে যাচ্ছিলাম নামচরিত্রের সাথে, ভয়ও লেগেছে ইকটু।
বইটার একদিকে আছে রূপক-ভারি গল্প – কুটুম, জবাইঘর, রঙানুপাতিক; বোর্হেসের, মার্কেজের ঘরানার নয় মোটেই, খুবই সমসাময়িক; কিন্তু সেখানে ভরা আছে জোরপূর্বক অভ্যেস করে নেওয়া অতি-স্বাভাবিকতার গুমোট বাতাস, দমবন্ধ হয়ে আসে।
আছে নিখুঁত সুস্বাদু স্যাটায়ার – চিরল কাঁটার বাতাস, পাতালকুমার, এপ্লিকেশন, গুড ওল্ড নাইন্টিজ; অরওয়েলের মতন লক্ষ্যভেদী বা কাফকার মতন উদ্দেশ্যহীন মিহি আতঙ্ক নয়, বরং আমলাতন্ত্রের চরমপন্থী মানসিকতাকে জীবন-আদর্শ, জীবন-সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া কিছু বিপন্ন মানুষের কাহিনি সামনে এসেছে এই গল্পগুলোর মাধ্যমে। অবশ্য, হ্যাঁ, আগের লাইনটা লিখে এখন মনে হচ্ছে কাফকার চিন্তার সাথে এরা মোটাদাগে মেলে। কাছাকাছি প্রজাতি।
উন্মুক্ত কামঘোরের প্রকাশ ঘটেছে নীল জবায়, সোমালিয়ান স্বপ্নে।
তবে আলাদা করে যে দুইটি গল্পের কথা বলব; তারা হচ্ছে অগ্নিজীবী, এবং মানবী।
অগ্নিজীবী – সোজা বাংলায় যেকোনো প্রাক্তন মদারুর জন্যে মেরুদণ্ড শিরশিরানো অনুভূতি জাগাবে এই লেখা। ধীরে ধীরে নেশাবৃত্তের গভীরে পিছলে যাচ্ছে একটা আপাতঃদৃষ্টিতে সরল স্বাভাবিক জীবনযাপন করা মানুষ – এই পরিচিত গল্পটা যতবার শুনি – ততবার বুকের ওপরে চড়ে বসে ভারী কিছু। জনাব মাহবুব হয় জীবন অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন, নইলে খুব ভালো রিসার্চ করেছেন। অল্পে নইলে এত পরিষ্কার ছাপ রেখে যাওয়া কঠিন।
মানবী – বইয়ের শেষতম এবং শ্রেষ্ঠতম গল্প। প্রচণ্ড হতাশার প্রতিচ্ছবি। ঈশ্বরী-দেবী-মহাত্মাগণ ততক্ষণই স্বর্গীয়, যতক্ষণ তারা স্বর্গে আছেন। মর্ত্যে সুন্দরের পূজারীরা সুন্দরের দেখা পান না, বরং তাদের ভ্রম সরাতে ব্যাঙের ছাতার মতন জেগে ওঠে পাপের কালো হাত; ���িচ্ছু থাকে না আর নিষ্পাপ, থাকে না সুন্দর।
এরকম গল্প পড়ে কিছুক্ষণ ফুল পাখি লতাপাতা বেড়ালের ভিডিও দেখা উচিত।
সুষম একজিস্টেনশিয়াল ক্রাইসিস উপহার দেওয়ায় মাহবুব সা’বকে পাঁচে চার। হাফ তারা বোনাস প্রচ্ছদকারের জন্যে; অসাধারণ চোখকাড়া একটা কাজ হয়েছে এটা।
আর বড়পীর তানজীম ভাইকে ধন্যবাদ পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
আমি জবাই ঘর থেকে বলছি। মার্চ, ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ, মনে হয় সারা পৃথিবীটা একটা জবাই ঘরে পরিণত হয়েছে। আর আমরা কীট পতঙ্গের মতো একেকটা জবাই ঘরের চরিত্র। কিসের জন্য অপেক্ষা করে আছি, যদি কসাই আমাকে উপেক্ষা করে যায় তার জবাই তালিকা থেকে? নাকি দয়া করে মাফ করে দেয়? নাকি উদাসিনতা পেয়ে বসেছে, যা ইচ্ছে হোক অথবা পাপে সিক্ত শরীরকে কসাই এর কাছে বিলীন করে চাইছি, বেশ শাপমুক্তি ঘটুক, আমি প্রস্তুত!
লেখক হাসান মাহবুবকে প্রশ্ন করেছিলাম, -আপনি কোনো জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছেন? উনি উত্তর দিয়েছিলেন, -না! আমি "জবাই ঘর" বইটি পড়ার সময় উনাকে সময় অসময়ে অসম্ভব বিরক্ত করেছি। উনি স্বল্পভাষী, ধৈর্যশীল মানুষ, সহ্য করে গিয়েছেন। এই বিরক্ত করার অধিকার আমার আছে দুটি কারণে আমি ভেবেছি, ১. প্রযুক্তির সময়ে টাটকা লেখাটার পাজেল পয়েন্টগুলো তাৎক্ষণিক বুঝে নেবার সুযোগ আছে সরাসরি লেখক বরাবর, তাহলে সুযোগ কেন কাজে লাগাবো না।
২. বইটা আমাকে টেনে ঘাড় নিঁচু করে থাকতে বাধ্য করেছে। আমি অবাক হচ্ছিলাম, লেখক কি প্রচুর অনুবাদ বই পড়েন বা বিদেশি লেখকের বই অথবা এতো দারুণ করে কিভাবে সমাজ বা মানুষ সৃষ্ট নেতিবাচক দিকগুলোর ভয়াবহতা সহজভাবে ইতিবাচক দিকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে নিয়ে নিয়েছেন। বার বার পড়ে আমাকে বুঝতে হচ্ছিল, আমি ঠিক বুঝতে পারছি তো। এত বিরাট মাপের লেখক কি সত্যি এই দেশে আজকাল আছে, বহুকাল পাই নি তো। বারবার নিশ্চিত হতে উনাকে বিরক্ত করা ছাড়া আমি পথ দেখি নি।
আমি "জবাই ঘর" এর পাঠ পর্যালোচনা করবো। তার আগে কিছু ভাল কথার সাথে সমালোচনা করতে চাইছি, যদিও সব থেকে বড় সমালোচনাটি লেখক নিজেই বই এর ফ্ল্যাপে করে পাঠকের মুখ বন্ধ করেছেন সুকৌশলে! হ্যা, এক ঘেয়েমি আসতে পারে সামান্য যদি আপনি বহুদিন লাগিয়ে দিন পড়তে। ঠিক কাচ্চি বিরিয়ানি না বইটি। সাধারণ ভাত ভর্তা কিন্তু অসাধারণ। গরম গরম তাড়াতাড়ি জুড়িয়ে যাবার আগেই খেয়ে ফেলাটা মন্দ হবে না ধরনের। পেন্ডুলাম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটিতে ১২ টি ছোট বড় গল্প স্থান পেয়েছে। ধরণটা নিয়ে আলোচনাতে আসি..
#কুটুমঃ
আত্মবিশ্বাসী এক অপরাধীর চিন্তাভাবনা জানতে চান? অহমিকায় অন্ধ হয়ে যখন বাঁকা হাসি দিচ্ছিলো, তখন মানুষ যারা তারা কিভাবে উল্টো বাঁকা হাসি দিয়ে তাকে বুঝিয়ে দিলো....মানুষ ছাড়া এই পৃথিবীতে কোনো কীট বাঁচতে পারে না, সেটা বুঝতে পড়ুন গল্পটি।
#চিরল কাঁটার বাতাসঃ
আচ্ছা মানুষ জন্মালে কি যত্ন করে আমরা কোলে নিয়ে নাম ধরে ডাকি, নাম রাখি, আমৃত্যু সেই নামে সারা দুনিয়াতে পরিচিত হয়। কিন্তু মারা গেলে ঠিক কোল থেকে নামিয়ে বলি, লাশটা নাও! সব মানুষের ডাক নাম কেন লাশ হয়? কিন্তু লেখক বলছেন না লাশেরও পরিচয় আছে। কি পরিচয় জানতে চাইলে গল্পটি পড়ুন না দয়া করে।
#জবাই ঘরঃ
দারুণ একটা শব্দ শিখেছি, "ছদ্মপাপ"! আপনি শুনেছেন আগে? আমি কিন্তু শুনেনি। শব্দটা মগজে কয়েকদিন বচসা ( লেখকের সম্ভবত বেশ পছন্দের শব্দ) করলো। আমরা সবাই কিন্তু কম বেশী ছদ্মপাপী। কখনো চরম অপরাধ বোধে দিশেহারা হয়ে পাপমোচন করতে চাই। আবার সেই অংশেও পাপে ডুবে যাই, যখন পাপ হয় মজ্জাগত অভিশপ্ত চরিত্র। ভয়াবহ এই গল্পটি না পড়লে পুরো বইটার অর্থই বুঝবেন না। বুঝতেই পারছেন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হলে এই গল্পটার নামেই লেখক আস্ত বইটির নাম করণ করে ফেলেছেন।
#রঙানুপাতিকঃ
লেখকের নতুন শব্দ ভান্ডার গুলো আমাকে মুগ্ধ করেছে। যেমন ঠিক খুব ভোরে ঘুম ছুটে আপনার মগজে একটা গানের কলি বাজতে শুরু করে সারাদিন জান্তে অজান্তে আসতে থাকে ঠিক তেমন। আর লেখনী কৌশল তো সত্যিই অদ্ভুত ভিন্ন আকর্ষণীয়। আতা লতা নিয়ে বাড়তি কথা বলে গল্পের মেদ বাড়ানোর মতো অসাধ্য সাধন করার কোনো লক্ষ্মণ নেই লিখাতে। এই গল্পে রক্তের রং যে সত্যিই নীল হয়, সেটা প্রমাণ করতে চেয়েছেন। মজার ব্যাপার লেখক খুবই দয়াবান বোঝা যাচ্ছে। কারণ, তিনি লাশকেও মত প্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার দিয়েছেন এখানে। আমার দেশের শ্রমজীবী জীবিত মানুষেরা পারতপক্ষে বেঁচে থাকা লাশ এই সমাজে, এদের মত প্রকাশের অধিকার নেই কিন্তু সুশীল সমাজের আবার লাশ হয়েও বলার অধিকার আছে, " ভাই দেখেন আমার রক্ত লাল, নীল না" আহ কি অসহায়! কষ্ট পাবো না খুশি হবো! দ্বিধান্বিত আমি। আপনি কি হবেন, আপনি পাঠ মাধ্যমে বুঝে নিন।
#পাতালকুমারঃ
কর্পোরেট কবর বিষয়টা কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার। যাবেন নাকি একটু লেখকের সাথে ঘুরে আসতে। ভয় পাবেন না, লেখক আপনাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে বেশ ভাল মন্দ খাওয়া দিবে, মরতে দিবে না। দিনের পর দিন সেই কবরে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার সব রসদ তিনি দিবেন, জানিয়েছেন গল্পটিতে। উফফফ....আপনি সত্যি বলুন তো কর্পোরেট কবরে আমি নেই হাহাহ নিজের অজান্তেই সেখানে বাস করছেন! সত্যি সত্যি...
#অগ্নিজীবীঃ
নোংরা কাজে মানুষের প্রবল আগ্রহ, এটা মানুষের স্বভাবজাত, স্বাভাবিক একটা চরিত্র। কিন্তু এটাকে জয় করার ক্ষমতাটা কিন্তু একমাত্র মানব জাতিকেই দেওয়া হয়েছে। সে যদি সেটাকে কাজে লাগাতে পারে তো জিদ না পারলে অমানুষ। অমানুষ হতে চাইলে অনেক কিছু জুটে যাবে আপনার আশেপাশে, প্রচুর উৎসাহ উদ্দীপনার মাধ্যমে আপনি অমানুষ হয়ে যেতে পারবেন। যে উপকরণ বাস্তবিক আপনার কোনো উপকারে আসবে না কিন্তু অণুঘটক হয়ে আপনার মনুষ্যত্ব ছিন্নভিন্ন করবে, তার ধ্যানে আপনি কিভাবে মগ্ন হচ্ছেন, পড়ে জানতে পারবেন এই গল্পটিতে।
#গুড ওল্ড নাইটিজ
অবক্ষয় সমাজকে এমন করে ঘিরে ধরেছে যে, আমাদের আশেপাশের ভয়াবহতা কেমন আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। মজার কোনো ভয়াবহতা আর নেই যেনো। রসিয়ে গল্পের উপকরণ কোথায় আমাদের। বিরক্ত আমরা বিষাক্ত এই সমাজের ফরামালিনযুক্ত বাসিন্দারা। "ঘোড়ার মুত" (লেখকের ভাষ্য) এর দোকানের আলোচনা আজ ম্রিয়মাণ প্রায়....কেন জানতে চাইলে আসুন না ঘুরে আসি একবার নব্বই সালের ওইদিকটাই লেখকের তৈরি সময়যন্ত্রে ভর করে!
#নীল জবাঃ
এই গল্পটা ঠিক আমার বোধগম্য হয় নি। কি বলতে চেয়েছেন লেখক। ধাঁধার মতো লেখা। আমি লেখককে প্রশ্ন করেও কোনো সদুত্তর পাই নি। নীল আলোতে আটকে যাওয়া একটা যুবতীর বোবা জবানবন্দী। আচ্ছা আপনার পড়ে বুঝতে পারলে দয়া করে আমাকে একটু বুঝিয়ে দিবেন তো!
#মানবীঃ
খুব আশা নিয়ে পড়তে যাবেন প্রতিটা বাঁকে বাঁকে আশা খুঁজবেন কিন্তু.... উঁহু কিন্তু নাকি স্বাভাবিক নাকি অথবা বলবো, আবাবো দ্বিধান্বিত। যাকজ্ঞে, আচ্ছা সোজাসাপ্টা বলি, আমাদের দেশে বাসে, ঝোপে, বাসায়, চিপায় বাচ্চা বাচ্চা মেয়ে অথবা নারীরা ধর্ষিতা হয় না? আবার এরপর উপরি পাওনা হিসেবে খুন ও করা হয় তাদের আবার তার উপর পুরষ্কার হিসেবে সেইসব লাশেরা কোনো বিচারও পায় না। তেমন একটা ভয়ানক মুহুর্ত আর গগণবিদারী চিৎকার নীরব দর্শক হয়ে দেখতে, শুনতে চান...অদৃশ্য অনুধাবন দিয়ে, এই মানবী গল্পটা পড়ুন। আর হ্যাঁ মাঝ পথে থেমে যাবেন না। লেখক প্রচন্ড কৌশলী ব্যক্তি। টুপ করে আপনাকে মাঝপথে বারবার দাঁড় করিয়ে দিয়ে বোঝাতে চাইবে, যাহ, পথ শেষ। ভুলেও ফাঁদে পা দেবেন না। এগুতে থাকবেন। সামনে আরো বহু পথ বাকি। সামান্য একটু এগিয়ে লেখক আপনাকে খানিক বিশ্রাম দিয়ে মহা দয়া করেছেন মাত্র।
দারুণ সব উপমা আর ইতিবাচক ও নেতিবাচক ছন্দে গড়ানো বইটি পড়ুন। টা টা....
১২ টা ছোটগল্পের প্রায় সবই নৈরাশ্যে পরিপূর্ণ। Wishful thinking ট্রিগার করার জন্য গল্পগুলো লেখা না, বরং তার বিপরীত, জগতের অন্ধকার বিষণ্ণ দিকটার ম���খমুখী করার জন্য গল্পগুলো চিত্রিত হয়েছে।
গল্পগুলোর প্রতিটাই দুর্দান্ত। আমার "জবাইঘর", "এপ্লিকেশন" আর "মানবী" - এই গল্প তিনটি সব থেকে বেশি ভাল্লাগছে। আর হাবিজাবি মনে হইছে "অগ্নিজীবী"। ওভারল উপভোগ করার মতই একটা বই। গল্পগুলোর অনেকগুলো অবাস্তব মনে হলেও বাস্তবতার সাথে কানেকশন আছে। লেখক তার চারিপাশ থেকেই লেখার উপাদান নিয়ে আর্ট তৈরি করেছেন তার স্পষ্ট ইশারা আছে। এই যাদুবাস্তবতার গল্পগুলো পিকাসোর একটা কথা মনে করিয়ে দেয় - "... Art is not truth. Art is a lie that makes us realize truth at least the truth that is given us to understand."
A book with short stories which will trigger you to look into your within. Black Mirror-ish vibe! Specially liked the story named, “Application”, “Somalian Shwapno”, “Putul Bari”.
আমি জবাই ঘর থেকে বলছি। মার্চ, ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ, মনে হয় সারা পৃথিবীটা একটা জবাই ঘরে পরিণত হয়েছে। আর আমরা কীট পতঙ্গের মতো একেকটা জবাই ঘরের চরিত্র। কিসের জন্য অপেক্ষা করে আছি, যদি কসাই আমাকে উপেক্ষা করে যায় তার জবাই তালিকা থেকে? নাকি দয়া করে মাফ করে দেয়? নাকি উদাসিনতা পেয়ে বসেছে, যা ইচ্ছে হোক অথবা পাপে সিক্ত শরীরকে কসাই এর কাছে বিলীন করে চাইছি, বেশ শাপমুক্তি ঘটুক, আমি প্রস্তুত!
লেখক হাসান মাহবুবকে প্রশ্ন করেছিলাম, -আপনি কোনো জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছেন? উনি উত্তর দিয়েছিলেন, -না! আমি "জবাই ঘর" বইটি পড়ার সময় উনাকে সময় অসময়ে অসম্ভব বিরক্ত করেছি। উনি স্বল্পভাষী, ধৈর্যশীল মানুষ, সহ্য করে গিয়েছেন। এই বিরক্ত করার অধিকার আমার আছে দুটি কারণে আমি ভেবেছি, ১. প্রযুক্তির সময়ে টাটকা লেখাটার পাজেল পয়েন্টগুলো তাৎক্ষণিক বুঝে নেবার সুযোগ আছে সরাসরি লেখক বরাবর, তাহলে সুযোগ কেন কাজে লাগাবো না।
২. বইটা আমাকে টেনে ঘাড় নিঁচু করে থাকতে বাধ্য করেছে। আমি অবাক হচ্ছিলাম, লেখক কি প্রচুর অনুবাদ বই পড়েন বা বিদেশি লেখকের বই অথবা এতো দারুণ করে কিভাবে সমাজ বা মানুষ সৃষ্ট নেতিবাচক দিকগুলোর ভয়াবহতা সহজভাবে ইতিবাচক দিকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে নিয়ে নিয়েছেন। বার বার পড়ে আমাকে বুঝতে হচ্ছিল, আমি ঠিক বুঝতে পারছি তো। এত বিরাট মাপের লেখক কি সত্যি এই দেশে আজকাল আছে, বহুকাল পাই নি তো। বারবার নিশ্চিত হতে উনাকে বিরক্ত করা ছাড়া আমি পথ দেখি নি।
আমি "জবাই ঘর" এর পাঠ পর্যালোচনা করবো। তার আগে কিছু ভাল কথার সাথে সমালোচনা করতে চাইছি, যদিও সব থেকে বড় সমালোচনাটি লেখক নিজেই বই এর ফ্ল্যাপে করে পাঠকের মুখ বন্ধ করেছেন সুকৌশলে! হ্যা, এক ঘেয়েমি আসতে পারে সামান্য যদি আপনি বহুদিন লাগিয়ে দিন পড়তে। ঠিক কাচ্চি বিরিয়ানি না বইটি। সাধারণ ভাত ভর্তা কিন্তু অসাধারণ। গরম গরম তাড়াতাড়ি জুড়িয়ে যাবার আগেই খেয়ে ফেলাটা মন্দ হবে না ধরনের। পেন্ডুলাম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটিতে ১২ টি ছোট বড় গল্প স্থান পেয়েছে। ধরণটা নিয়ে আলোচনাতে আসি..
#কুটুমঃ
আত্মবিশ্বাসী এক অপরাধীর চিন্তাভাবনা জানতে চান? অহমিকায় অন্ধ হয়ে যখন বাঁকা হাসি দিচ্ছিলো, তখন মানুষ যারা তারা কিভাবে উল্টো বাঁকা হাসি দিয়ে তাকে বুঝিয়ে দিলো....মানুষ ছাড়া এই পৃথিবীতে কোনো কীট বাঁচতে পারে না, সেটা বুঝতে পড়ুন গল্পটি।
#চিরল কাঁটার বাতাসঃ
আচ্ছা মানুষ জন্মালে কি যত্ন করে আমরা কোলে নিয়ে নাম ধরে ডাকি, নাম রাখি, আমৃত্যু সেই নামে সারা দুনিয়াতে পরিচিত হয়। কিন্তু মারা গেলে ঠিক কোল থেকে নামিয়ে বলি, লাশটা নাও! সব মানুষের ডাক নাম কেন লাশ হয়? কিন্তু লেখক বলছেন না লাশেরও পরিচয় আছে। কি পরিচয় জানতে চাইলে গল্পটি পড়ুন না দয়া করে।
#জবাই ঘরঃ
দারুণ একটা শব্দ শিখেছি, "ছদ্মপাপ"! আপনি শুনেছেন আগে? আমি কিন্তু শুনেনি। শব্দটা মগজে কয়েকদিন বচসা ( লেখকের সম্ভবত বেশ পছন্দের শব্দ) করলো। আমরা সবাই কিন্তু কম বেশী ছদ্মপাপী। কখনো চরম অপরাধ বোধে দিশেহারা হয়ে পাপমোচন করতে চাই। আবার সেই অংশেও পাপে ডুবে যাই, যখন পাপ হয় মজ্জাগত অভিশপ্ত চরিত্র। ভয়াবহ এই গল্পটি না পড়লে পুরো বইটার অর্থই বুঝবেন না। বুঝতেই পারছেন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হলে এই গল্পটার নামেই লেখক আস্ত বইটির নাম করণ করে ফেলেছেন।
#রঙানুপাতিকঃ
লেখকের নতুন শব্দ ভান্ডার গুলো আমাকে মুগ্ধ করেছে। যেমন ঠিক খুব ভোরে ঘুম ছুটে আপনার মগজে একটা গানের কলি বাজতে শুরু করে সারাদিন জান্তে অজান্তে আসতে থাকে ঠিক তেমন। আর লেখনী কৌশল তো সত্যিই অদ্ভুত ভিন্ন আকর্ষণীয়। আতা লতা নিয়ে বাড়তি কথা বলে গল্পের মেদ বাড়ানোর মতো অসাধ্য সাধন করার কোনো লক্ষ্মণ নেই লিখাতে। এই গল্পে রক্তের রং যে সত্যিই নীল হয়, সেটা প্রমাণ করতে চেয়েছেন। মজার ব্যাপার লেখক খুবই দয়াবান বোঝা যাচ্ছে। কারণ, তিনি লাশকেও মত প্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার দিয়েছেন এখানে। আমার দেশের শ্রমজীবী জীবিত মানুষেরা পারতপক্ষে বেঁচে থাকা লাশ এই সমাজে, এদের মত প্রকাশের অধিকার নেই কিন্তু সুশীল সমাজের আবার লাশ হয়েও বলার অধিকার আছে, " ভাই দেখেন আমার রক্ত লাল, নীল না" আহ কি অসহায়! কষ্ট পাবো না খুশি হবো! দ্বিধান্বিত আমি। আপনি কি হবেন, আপনি পাঠ মাধ্যমে বুঝে নিন।
#পাতালকুমারঃ
কর্পোরেট কবর বিষয়টা কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার। যাবেন নাকি একটু লেখকের সাথে ঘুরে আসতে। ভয় পাবেন না, লেখক আপনাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে বেশ ভাল মন্দ খাওয়া দিবে, মরতে দিবে না। দিনের পর দিন সেই কবরে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার সব রসদ তিনি দিবেন, জানিয়েছেন গল্পটিতে। উফফফ....আপনি সত্যি বলুন তো কর্পোরেট কবরে আমি নেই হাহাহ নিজের অজান্তেই সেখানে বাস করছেন! সত্যি সত্যি...
#অগ্নিজীবীঃ
নোংরা কাজে মানুষের প্রবল আগ্রহ, এটা মানুষের স্বভাবজাত, স্বাভাবিক একটা চরিত্র। কিন্তু এটাকে জয় করার ক্ষমতাটা কিন্তু একমাত্র মানব জাতিকেই দেওয়া হয়েছে। সে যদি সেটাকে কাজে লাগাতে পারে তো জিদ না পারলে অমানুষ। অমানুষ হতে চাইলে অনেক কিছু জুটে যাবে আপনার আশেপাশে, প্রচুর উৎসাহ উদ্দীপনার মাধ্যমে আপনি অমানুষ হয়ে যেতে পারবেন। যে উপকরণ বাস্তবিক আপনার কোনো উপকারে আসবে না কিন্তু অণুঘটক হয়ে আপনার মনুষ্যত্ব ছিন্নভিন্ন করবে, তার ধ্যানে আপনি কিভাবে মগ্ন হচ্ছেন, পড়ে জানতে পারবেন এই গল্পটিতে।
#গুড ওল্ড নাইটিজ
অবক্ষয় সমাজকে এমন করে ঘিরে ধরেছে যে, আমাদের আশেপাশের ভয়াবহতা কেমন আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। মজার কোনো ভয়াবহতা আর নেই যেনো। রসিয়ে গল্পের উপকরণ কোথায় আমাদের। বিরক্ত আমরা বিষাক্ত এই সমাজের ফরামালিনযুক্ত বাসিন্দারা। "ঘোড়ার মুত" (লেখকের ভাষ্য) এর দোকানের আলোচনা আজ ম্রিয়মাণ প্রায���....কেন জানতে চাইলে আসুন না ঘুরে আসি একবার নব্বই সালের ওইদিকটাই লেখকের তৈরি সময়যন্ত্রে ভর করে!
#নীল জবাঃ
এই গল্পটা ঠিক আমার বোধগম্য হয় নি। কি বলতে চেয়েছেন লেখক। ধাঁধার মতো লেখা। আমি লেখককে প্রশ্ন করেও কোনো সদুত্তর পাই নি। নীল আলোতে আটকে যাওয়া একটা যুবতীর বোবা জবানবন্দী। আচ্ছা আপনার পড়ে বুঝতে পারলে দয়া করে আমাকে একটু বুঝিয়ে দিবেন তো!
#মানবীঃ
খুব আশা নিয়ে পড়তে যাবেন প্রতিটা বাঁকে বাঁকে আশা খুঁজবেন কিন্তু.... উঁহু কিন্তু নাকি স্বাভাবিক নাকি অথবা বলবো, আবাবো দ্বিধান্বিত। যাকজ্ঞে, আচ্ছা সোজাসাপ্টা বলি, আমাদের দেশে বাসে, ঝোপে, বাসায়, চিপায় বাচ্চা বাচ্চা মেয়ে অথবা নারীরা ধর্ষিতা হয় না? আবার এরপর উপরি পাওনা হিসেবে খুন ও করা হয় তাদের আবার তার উপর পুরষ্কার হিসেবে সেইসব লাশেরা কোনো বিচারও পায় না। তেমন একটা ভয়ানক মুহুর্ত আর গগণবিদারী চিৎকার নীরব দর্শক হয়ে দেখতে, শুনতে চান...অদৃশ্য অনুধাবন দিয়ে, এই মানবী গল্পটা পড়ুন। আর হ্যাঁ মাঝ পথে থেমে যাবেন না। লেখক প্রচন্ড কৌশলী ব্যক্তি। টুপ করে আপনাকে মাঝপথে বারবার দাঁড় করিয়ে দিয়ে বোঝাতে চাইবে, যাহ, পথ শেষ। ভুলেও ফাঁদে পা দেবেন না। এগুতে থাকবেন। সামনে আরো বহু পথ বাকি। সামান্য একটু এগিয়ে লেখক আপনাকে খানিক বিশ্রাম দিয়ে মহা দয়া করেছেন মাত্র।
দারুণ সব উপমা আর ইতিবাচক ও নেতিবাচক ছন্দে গড়ানো বইটি পড়ুন। টা টা....
হাসান মাহবুবের লেখা চমৎকার। কিছু তথ্যগত ত্রুটি বাদে ( লিভার রোগে ডায়ালাইসিস, হার্টে নিউরনের উপস্থিতি ইত্যাদি) তার বেশ কিছু গল্প ভালই লাগসে। তার মধ্যে জবাইঘর প্রণিধানযোগ্য। কিন্তু লেখকের জবানিতেই এই বইটি পড়তে ভাল লাগবে না, কারণ মানুষের চরমতম মনোবৈকল্যের কাহিনী এর মূল রসদ। তবু অনেকগুলো ভাল গল্পে তথাকথিত "এজ" আনার জন্য এদের কিছু ডার্ক এন্ডিং দেয়া হইসে। এই আরোপিত "এজিনেস" গল্পের ধার বাড়ানোর বদলে তা আরো ভোতা করসে আর সাথে পাঠকের বিরক্তি উদ্রকে সক্ষম হইসে। এই আনডিজার্ভড অতি আরোপিত ডার্কনেসের কারণে আনডিজার্ভেডলি এই বইকে দুই স্টার দিয়ে বিরক্তির শোধ তুললাম।
It was an extremely slow read and difficult to finish. The stories were nothing special and easily forgettable, I forgot the plot right after I finished one of the stories. I know the writer gave a disclaimer sayings it's a dark comedy book and uncomfortable read, and I think I should not have experimented and took his word for it.
গল্পগুলো যে কেমন। কিছু গল্প আসলে খুব কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছিল আবার কিছু গল্প ছিলো একটু অন্যরকম তবে শেষ গল্পেটা পড়ে বেশ ভালো লেগেছিল একদম যেন গল্পে ডুবে গিয়েছিলাম।
বইয়ের প্রচ্ছদের দিকে তাকান, কতক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারবেন? একটা মানুষকে জবাই করা হচ্ছে, তার চারপাশে বয়ে যাচ্ছে রক্তের নদী। রক্তের রঙ খেয়াল করেছেন? লাল নয় কিন্তু, বরং অস্বস্তিকর একটা রঙ। ছাই! রক্তের রঙ এমন নির্বিকার হয় নাকি?
"নির্বিকার"। শব্দটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। চাপাতি হাতের কসাই, চেপে ধরে রাখা মানুষ কীংবা যে জবাই হচ্ছে সে, সবার চেহারাতেই এক অস্বস্তিকর নির্বিকারত্ব ফুটে আছে যা ক্রমাগত আপনার চোখে খোচা মারতে থাকবে৷ ফলাফল, আপনি প্রচ্ছদের দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারবেন না। কীংবা পারবেন, ঠিক যেমন সমাজে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত নানান অন্যায়, অস্বস্তিকর কাজ আমরা নির্বিকার বদনে করে যাচ্ছি, সয়ে যাচ্ছি, একইভাবে একই নির্বিকারত্বে আপনি চেয়ে থাকতে পারেন এই অস্বস্তিকর প্রচ্ছদের পানে!
প্রচ্ছদশিল্পী, আপনি জোস!
লেখকের গল্পের সাথে আমি পরিচিত মনে হয় সেই ২০১৬ থেকে। ওনার মন্মথের মেলানকোলিয়া বইটি পড়েছি, পড়েছি ব্লগ, ফেসবুক, ম্যাগাজিনে প্রকাশ হওয়া তার অগুনিত গল্প। লেখালেখির ক্ষেত্রে উনি যে বিষয়টি নিয়ে গর্ব করতে পারেন তা হল তার গল্প বলার স্বকীয়তা। ইংরেজিতে individuality. লেখকদের মাঝে এই ব্যাপারটা খুব বিরল যে তাদের নিজস্ব বৈচিত্র্য থাকবে গল্প বলার ক্ষেত্রে এবং একইসাথে তা পাঠকদের কাছে সমাদৃত হবে। না, তার গল্প বলার ধরণ হাসিখুশি, রসালো সুস্বাদু কোনো কিছু নয়। বরং, গল্পগুলো শুরু হয় স্বাভাবিক কোনো ঘটনা দিয়ে, হতে পারে কেউ সেলুনে চুল কাটতে গেছে, বা কেউ তার সন্তানের সাথে কোনো সিনেমা দেখবেন ঘুমোনোর আগে। আপনি গল্প পড়তে থাকবেন, এক পাতা দু পাতা ওল্টাবেন, এক দুই প্যারা স্ক্রল করবেন, কোনো লাইনে এসে হঠাৎ খটকা লাগবে। সেই শুরু। লাইনটা আবার পড়বেন, বিভ্রান্ত হয়ে পরের লাইনগুলোতে চলে যাবেন, এরপর আরো খটকাময় লাইন চোখে পড়বে। বিভ্রান্ত হতে হতে এগিয়ে যেতে থাকবেন। একপর্যায়ে আপনি অভ্যস্ত হয়ে যাবেন, তখন বিভ্রান্তিকে একপাশে নির্বাসন দিয়ে গল্পের ধোয়াশা কেটে মূল গল্প বা অন্তত এর মর্মার্থ বোঝার দিকে মনোনিবেশ করবেন। গল্প শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আপনি ভাবতে থাকবেন। একপর্যায়ে আপনার ক্লান্ত মস্তিষ্ক কোনো না কোনো ব্যাখা দাড় করিয়ে ক্ষান্ত দিয়ে পরের গল্পে চলে যাবেন!
খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই সেই তখন থেকে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে যাচ্ছি। বইয়ের গল্প নিয়ে কথা বলছি না। কারণ আমি ঠিক নিশ্চিত না কী বলব। বইটি পড়েছি সেই ফেব্রুয়ারিতেই। সেই থেকে রিভিউ লিখব লিখব করেও লেখা হচ্ছে না। এটার রিভিউ লিখতে বসে অন্য বইয়ের রিভিউ লিখে ফেলেছি। গল্পগুলোর ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই অস্বস্তি পেয়ে বসে৷ কিন্তু একই সাথে এটাও বুঝেছি রিভিউ না লিখে শান্তি নেই। তাই শুরু করা যাক।
টাইটেল স্টোরি "জবাইঘর"। আমাদের গ্রামের বাড়িতে বৈঠকঘর আছে। জলসাঘর ও থাকে। কিন্তু এ বাড়িতে জবাইঘর আছে একটা। এখানে, প্রতিমাসে মানুষ জবাই করা হয়। বাড়ির সদস্যদের নাম লটারি করে নির্বাচন করা হয় এ মাসে কাকে জবাই করা হবে। নির্বাচন হওয়ার পর মহামান্য কসাই তার চাপাতি চালিয়ে দেবেন ব্যক্তির গলা বরাবর। ব্যক্তিবেচারা কীংবা বেচারী মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ শেষে গলার ক্ষত আবার সেলাই করে দেয়া হয়। মৃত মানুষ আবার আগের মত হয়ে যায়, অপেক্ষায় থাকে পরবর্তী লটারির জন্য৷ কী নিদারুণ প্রায়শ্চিত্তাচার!
ভাবছেন কীসের প্রায়শ্চিত্ত? অনেক আগে যখন আমাদের এই পরিবার জমিদার ছিলেন তখন তারা নানা পাপ, অরাজকতায় লিপ্ত ছিলেন। তাই আজ এত বছর পর এভাবেই তারা রক্ত বিসর্জনে পাপমোচন করে থাকেন। কিন্তু পাপ কী এত সহজে পিছু ছাড়ে? যাদের রক্ত পাপে নীল হয়ে রয়েছে তারা প্রায়শ্চিত্ত চর্চায় সুষ্ঠুতা কেন বজায় রাখবেন? লটারিতে তাদের পরিবারের কারো নাম ওঠে না। নাম ওঠে ঝি-চাকরদের। জোরপূর্বক তাদের রক্তে ভাসানো হয় জবাইঘর, মিথ্যা প্রায়শ্চিত্তের মিথ্যা স্বস্তিতে কেটে যায় আরেকটা মাস। কিন্তু একদিন লটারিতে পরিবারেরই একজনের নাম আসে। এমন হওয়ার তো কথা না! এই হাওয়া বদলের কী হেতু? ছদ্মপাপের সত্যিকারের প্রায়শ্চিত্তের সময় এসে গেল কী?
গল্পটা আসলেই টাইটেল ডিজার্ভিং। এত সাবলীলতার সাথে এত ডার্ক একটা বর্ণনা শোনানো যাচ্ছেতাই কথা নয়। শুধু এই একটা গল্পের জন্যেই বলা যায়, লেখক, আপনি জোস!
এরপরে, " পুতুলবাড়ি"। এটা আগেই পড়া ছিল ম্যাগাজিনে। ছোট্ট একটা সংসার, সাথে দুই সন্তান। নীল পাখি, বা ডল হাউজ দিয়ে হেসে-খেলে সময় কাটায় তারা। বাবা মা সারাদিন বাইরে কাটান। বাসায় আসার সময় মজার মজার জিনিস নিয়ে আসেন। সুখী তাই না? এই সুখও আপনার সইবে না। লেখক "অন্যরকম প্যারেন্টিং" এ আছেন বলেই এমন গল্প লিখেছেন, নাকি এমন গল্প চাক্ষুস দেখেই "অন্যরকম প্যারেন্টিং" এ কাজ করছেন জানি না। পড়ুন, খারাপ লাগবে। আসলে, লেখকের উদ্দেশ্য তো সেটাই।
"কুটুম" গল্পটা একটু কেমন যেন। অপরাধী, সে অপর��ধ করে এক গ্রামের বাড়িতে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে। আদতে সে মেহমান। কিন্তু হঠাৎ একদিন জানা গেল, কুটুম আসবে। এই কুটুম কে? তার জন্য এত আয়োজন কেন? বাড়ির মহিলারা তার মত পুরুষের সামনেও এমন উদ্ভট আচরণ কেন করছে?
অপরাধীর মাথায় কী চলে জানতে চান? আত্মগরিমায় অন্ধ অপরাধী আসলে কীভাবে কীটতূল্য তা বুঝতে চান? পড়ে ফেলুন!
"চিরল কাটার বাতাস" গল্পে আমরা দেখতে পাই এক লোক তার গাড়িতে করে একটা মেয়ের লাশ নিয়ে যাচ্ছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই সে পুলিশি ঝামেলায় পড়ল। পুলিশের অভিযোগ সে মানুষের লাশ নিতেই পারে, কিন্তু লাশ এত নিখুত কেন? লাশ হবে লাশের মত। বাধ্য হয়ে তাই লাশকে লাশের রূপ দিতে যায় লোকটি। পাঠক, কোনো অসঙ্গতি চোখে পড়ছে কী? মেলাতে পারছেন কিছু? লাশের কী পরিচয় হয় না? গল্পের সাবলীল বর্ণনা আপনাকে মুগ্ধ করবে৷
"গুড ওল্ড নাইন্টিজ"। আহ! কী গল্প একখান! আমাদের, না আগের তুলনায় আমাদের স্বভাব তেমন বদলেনি৷ আমাদের চাই গল্প, রসালো গল্প। তা সে নাইন্টিজ হোক আর টুয়েন্টিজ। শুধু এই বিষয়টা ফোকাসে রেখে আস্ত একখান গল্প লেখা যায়? লেখার বাচনভঙ্গি অন্যগুলোর তুলনায় বেশ সাহিত্যিক। বিশেষ করে প্রথম প্যারাগ্রাফটা। এভাবে কোনো বই শুরু হলে ডিকশনারিও পড়া যায়। মাখন! ঘোড়ার মুতের ছিটেফোঁটাও নেই। থামেন, বিভ্রান্ত পরে হবেন, আগে গল্পখানা পড়ে আসেন।
" রঙানুপাতিক" গল্পটা পড়ে একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছি। মানে, আমি যা বুঝেছি, লেখক কী তাই বোঝাতে চেয়েছিলেন? নাকি ঘটনা অন্য কিছু? যাইহোক, গল্পটা দুই চাকুরীজীবিকে নিয়ে। তারা অর্থ সংকটে পড়ে বিধায় তৃতীয় একজনকে সাবলেট দিতে বাধ্য হয়। ঈর্ষা, নাকি অন্য কিছু? কেন খুন করে ফেলল তারা তৃতীয় কে? তৃতীয়ই বা অসহায় ভঙ্গিমায় কেন বলছিল, "ভাই দেখেন আমার রক্ত লাল, নীল না"? দ্বিধা দ্বিধা!
" পাতালকুমার" গল্পে এক কর্পোরেট কর্মচারী নিজেকে মাটির নিচে কফিনে আটক অবস্থায় আবিষ্কার করে। সাহায্য চায়। তার পরিচিত জন, তার অফিস তাকে খাবার যোগান দেয়, স্বান্তনা দেয়, কথা বলে। কোনোমতেই তাকে এই কবরে মরতে দেবে না তারা! কী মায়া কী মায়া! কিন্তু, তাকে তো কেউ বাচতেও দিচ্ছে না। গল্পের প্লট ইন্টারেস্টিং। ভাল লেগেছে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, কোনোদিন কর্পোরেট চাকরিতে না থিতু করেন তিনি। বলুন আমিন।
"মানবী" গল্পটা পড়ে ফাকা ফাকা লাগছিল। মনে হচ্ছিল লেখক ধোকা দিয়েছেন আমাকে। মনে হচ্ছিল, লেখক তার বাইরের সাদামাটা ভূষণের আড়ালে লালন করেন নিখাদনিষ্ঠ নিষ্ঠুরতা!
কেন সেটা আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করি৷ গল্পটা পড়ছিলাম, বেশ এগোচ্ছিল। সাদামাটা ওই একই ধর্ষণের কাহিনি ফাদছিলেন বোঝা যাচ্ছিল। ঠিক এখানেই ভুলটা করি আমি। সাদামাটা ধর্ষণের গল্প ভেবেছিলাম আমি। ওঃ কী বোকা ছিলাম! পুরো এগারোটা অ-সাদামাটা গল্প শেষ করে বারো এবং শেষ গল্পটা পড়তে শুরু করে কীনা এটাকেই সাদামাটা ভেবেছিলাম?! ফুল!
গল্পে দুইটা খাদ আছে। প্রথম খাদটা তেমন গভীর না, অনুমেয়। আপনি প্রস্তুত থাকবেন। তাই ব্যাথা পাবেন না। তবে খাদে পড়ে আবার দেখবেন আপনি হাটতে হাটতে আবার চূড়ায় উঠছেন। আপনার মনে এবার আশা জাগতে থাকবে, আর কে না জানে আশা ও কৌতূহলের সিড়ি সাধারণত উচুই হয়ে থাকে। আপনি নিজের সিড়ি নিজেই বানাতে বানাতে এত উচ্চতায় উঠে যাবেন যে আচমকা দ্বিতীয় খাদটায় পড়ে যাবেন! আই হেট দিস স্টোরি। কিন্তু রেটিং দিলে এটাকে দশে আট তবুও দিতাম।
বাকি গল্পগুলো নিয়ে কিছু বললাম না। ওগুলো মোটামুটি লেগেছে৷ আসলে, মনে হয়েছে ওগুলোতে লেখক একটু তাড়াহুড়োই করেছেন। সেগুলোর মাঝে কিছু গল্প বইয়ে না দিলেও পারতেন। যেমন, "অগ্নিজীবি"। এটা আসলে এই বইয়ের ধাচের সাথে যায় বলে মনে হল না। সুন্দর জ'লাইনের আক্কেল দাত।
হাসান মাহবুবের একটা গল্পকে আরেকটা থেকে আলাদা করা সহজ নয়। মনে হতেই পারে গল্পগুলো সব সুপারপজিশনে রাখা। অথচ বানোয়াট কী লিখেন তিনি? কিছুই না। যা লিখেছেন বইয়ে সব তো আমাদের চারপাশে আমরা দেখি/দেখছিই। ওনার পারদর্শীতা চেনা গল্পকে অচেনা রূপে সজ্জিত করা। চেনা জিনিসে আমরা হয়তো চিন্তাভাবনা কাজে লাগাই না, অচেনা নিয়ে ভাবি। উনি হয়তো আমাদের ভাবাতে চেয়েছেন। বইটি পড়ে যদি আপনার খারাপ লাগে, লেখক সার্থক। কারণ-
সবকিছু সবার জন্য নয়। সব বইয়ের পাঠক সবাই হতে পারে না। জবাইঘর শুরু করেছিলাম অনেক আগ্রহ নিয়ে, পরে বুঝলাম এই বইটা আসলে আমার জন্য না । আমি বই পড়ি এই অসুস্থ সমাজের কথা ভুলে থাকার জন্য, কিন্তু "জবাইঘর" এই সমাজের নানা নোংরা রূপ রম্যরচনার মাধ্যমে তুলে ধরেছে নির্দ্বিধায়। যা বুঝলাম টিনের চশমা খুলে সামনের আয়নার দিকে তাকানোর জন্য আমি প্রস্তুত না।
এ্যাপলিকেশন, নাইন্টিজ, সোমালিয়ান গল্পগুলো ভালো লেগেছে। গল্পগুলোকে লিখতে বসার আগেই যেন লেখক ঠিক করে রেখেছিলেন সব অন্ধকারের গল্পই লেখা হবে এমন লেগেছে। একগুচ্ছ জমাট আঁধার।
একটা মানুষকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করা হয়েছে ; রক্তগঙ্গা বয়ে যাচ্ছে চারদিকে আর চার পাঁচজন মিলে তাকে জাপটে ধরে আছে -- বইয়ের প্রচ্ছদে এটাই দেখা যাচ্ছে তাই না? কিন্তু রক্ত আর ধারালো অস্ত্র ছাড়াও প্রচ্ছদে আরেকটা জিনিস আছে। সেটা হল মানুষের নির্বিকার মুখ। নির্বিকার ভাবেই আমরা প্রতিনিয়ত করে চলেছি শরীর জবাই, মন জবাই, সম্পর্ক জবাই! মোট বারোটি গল্প দিয়ে বইটি সাজিয়েছেন লেখক।
প্রথম গল্পের নাম ‘কুটুম’। একজন ক্রিমিনাল ক্রাইম করার পর গা ঢাকা দিতে একজন পরিচিতের গৃহে আশ্রয় নিয়েছে। একটি বিদ্যুৎ-বিহীন নিস্তব্ধ অজপাড়াগাঁয়ে শেষরাতে ঘুম ভেঙে গিয়ে সেই লোকটা যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে তার মধ্যেই ঘটেছে পুরো গল্পটা। অন্ধকার রাতে পুরুষবিহীন সেই বাড়িতে মেয়েমানুষ গুলোর অদ্ভুত আচরণ, তাদের প্রতি একজন ক্রিমিনালের মনোভাব, শেষে গিয়ে চমৎকার অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি—প্রথম গল্প হিসেবে বেশ ভালো ও উপভোগ্য। রেটিং : ৮/১০
পরের গল্প 'পুতুলবাড়ি'। চার সদস্যের একটি পরিবারকে নিয়ে গল্প এগিয়েছে। আধুনিক জীবনে ব্যস্ত এক দম্পতি র তাদের ছোট্ট দুই সন্তানের গল্পটা আপনাকে ভাবাবে। মনে হবে সত্যিই তো, এমনটাই তো হচ্ছে আজকাল! গল্পটা মোটামুটি ভালো হলেও খুবই ধীরগতিতে এগিয়ে���ে। রেটিং : ৬/১০
এরপর ‘চিরল কাঁটার বাতাস’ গল্পটা একটা বিকৃত সোসাইটির। এক রূপসী নারীর লাশ গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়ার সময় আটক হন এক ব্যক্তি। পুলিশ তার গাড়ি চেক করে গাড়িতে একজন মেয়েমানুষের লাশ দেখে তাকে আটক করে। তবে আটকের কারণ লাশ বহন করা নয়, অক্ষত তরতাজা এক সুন্দরীর লাশ বহন করাটাই হচ্ছে অপরাধ। একজন দায়িত্ববান নাগরিক কখনোই এত সুন্দর লাশ বহন করতে পারে না। এতে করে লাশের প্রতি তার দূর্বলতা জন্ম নিতে পারে। তাই লাশকে মেরে কেটে বিভৎস করে তারপর বহন করতে হবে। অদ্ভুত না? গল্পটা বেশ ভালো লেগেছে আমার। রেটিং : ৮/১০
চার নম্বর গল্পটির নামেই এই বইয়ের নামকরণ করা হয়েছে ‘জবাইঘর’। মানুষের বাড়িতে বৈঠক ঘর, জলসাঘর, হাওয়াঘর ইত্যাদি থাকে, কিন্তু এখানে দেখা যায় এই বাড়িতে আছে একটা জবাইঘর। সেখানে প্রতি মাসে বাড়ির একজন করে সদস্যকে লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করে জবাই করা হয়। জবাই শেষে রক্ত বিসর্জনের মাধ্যমে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগের পর সেই কাটা গলা আবার সেলাই করে দেন মহামান্য কসাই, জবাইকৃত লোকটি তখন আগের মতো সুস্থ হয়ে যায়, সবার সাথে হেসেখেলে বেড়ায়। তাহলে কেন এই জবাই? পরিবারটা এককালে জমিদার ছিলো। ক্ষমতার জোরে তারা অনেক পাপকাজ করতো তারা। সময়ের সাথে ধীরে ধীরে তাদের ক্ষমতা কমে আসে। পাপের পাহাড় ততদিনে আকাশ ছুঁইছুঁই , শরীরে বইছে নীল রক্ত। এই অবস্থায় পরিবারের এক প্রবীণ পুরুষ পাপস্খলনের এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন - প্রতিমাসে পরিবারের একজনের জবাইয়ের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ হওয়া। কিন্তু তাতেও কি সত্যিও ন্যায়বিচার হচ্ছে? না। পরিবারের সদস্যদের রক্তে তো সেই পুরোনো পাপের রীতি এখনও রয়েছে , আর তাই প্রতিবার লটারিতে পরিবারের কারও নাম থাকেই না। তাই যাদের নাম ওঠে তারা আসলে ঐ পরিবারের কেউ নয়। ওরা ঘরের কাজের লোক। পাপের রীতি অব্যাহত রেখেই তারা চালিয়ে যায় দুর্বলের ওপর সবলের চিরপরিচিত শাসন কিংবা শোষণ। কিন্তু একদিন পাশার দান ঠিকই উল্টে যায়। ধীরে ধীরে পুরোনো দিনের সেই হাড় মরমরে জীর্ণ দুর্বলরা একটু একটু করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে। এবার কি তাহলে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে? খুবই ভালো লেগেছে গল্পটা। ডার্ক ফিকশনের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন লেখক এই গল্প দিয়ে। আমি মনে করতে পারি গল্পটার একেকটা লাইন পড়তেছি আর বারবার প্রচ্ছদটা উল্টে দেখছি। চরম অস্বস্তিকর এই গল্পটা আমার মন ছুঁয়ে গেছে। রেটিং : ১০/১০
এরপরের গল্প ‘রঙানুপাতিক’। দুজন নিম্নমধ্যবিত্ত চাকুরিজীবীর জীবন। একসাথে এক রুমে ভাড়া থাকে তারা। একজনের বাড়িতে বউ আছে, আরেকজন ব্যাচেলর। দুজনে আর্থিক অনটনে পড়ে সবলেট হিসেবে বাসা ভাড়া দেয় এক ছাত্রকে। ফ্রিল্যান্সার সে। সে খুব ভালো রান্না করতে পারে, কম্পিউটার চালাতে পারে, পিজ্জা বানাতে পারে। কিন্তু জানেন তার গায়ের রক্তের রঙ নীল? বেশ ইন্টারেস্টিং গল্প। ভালো লেগেছে আমার। ফিনিশিংটা দূর্দান্ত। রেটিং : ৮/১০
এরপরের গল্প 'পাতালকুমার'। ঘুম ভেঙে দেখলেন আপনাকে কেউ মাটির নিচে জ্যান্ত কবর দিয়ে রেখেছে। কী করবেন? কীভাবে বের হবেন? আর সেই অবস্থায় যদি সকলে আপনার সাথে রসিকতা শুরু করে তাহলে কেমন লাগবে? মোটামুটি মানের গল্প । রেটিং : ৬/১০
এরপরের গল্প ‘নীল জবা’। একটা খুন হয়। আর সেটা চাক্ষুষ করে ফেলে একজন। এরপর তার সদা ভীত, বিক্ষিপ্ত আর অস্বস্তিকর মনের দোটানার কথা ই গল্পে ফুটে উঠেছে। তবে ফিনিশিংটা আরো সুন্দর করা যেত । রেটিং : ৫/১০
‘সোমালিয়ান স্বপ্ন’ একটা অপরাধকাহিনী। চল্লিশ ছুঁই-ছুঁই এক নিঃসন্তান দম্পতি, যাদের মধ্যে পুরুষটি তার স্ত্রী সঙ্গীর প্রতি শারীরিক আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু তারা পরস্পরকে ভালোবাসে এবং তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে তারা খুব সৎ। কেমন তাদের জীবনটা? গল্পে কিছু অশ্লীলতা এলেও ফিনিশিংটা আপনাকে ভাবাবে। লেখক খুব সূক্ষ্ম ভাবে জীবনের গল্প বলেছেন। রেটিং : ৭/১০
এরপর ‘এপ্লিকেশন’ । পিতৃমাতৃহীন এক অসুস্থ আত্মীয়ের চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার দরকার। সবাই মিলে সেই টাকার জোগান দিয়েও কুল পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় আত্মীয়দের মধ্যে একজনের মাথায় চমৎকার একটা আইডিয়া আসে! মানুষ না থাকলে তো সমস্যাও থাকছে না, তাই না? তাকে খুন করে ফেললে তো এই রোজ রোজ টাকা খরচ হবে না ডাক্তারের পেছনে। তবে এই কাজ কি অতটা সহজ?
পরের গল্পের নাম ‘অগ্নিজীবী’। একটা সাধারণ মানুষের ধীরে ধীরে 'অগ্নিজীবী' তে পরিণতি হবার গল্প, কীভাবে মানুষটা ধীরে ধীরে মদ্যপ হয়ে ওঠে সেই কাহিনী। পাশাপাশি তার দেহমনের পরিবর্তনের গল্প লেখক বলতে চেয়েছেন। তবে এটা ভালো লাগেনি আমার। রেটিং : ৪/১০
‘গুড ওল্ড নাইন্টিজ’ গল্পটি সেকাল আর একালের সামাজিক অবক্ষয়ের কাহিনী অথবা বলা যায় তুলনামূলক আলোচনা। এটাও ভালো লাগেনি আমার। রেটিং : ৩/১০
সর্বশেষ গল্পটির নাম ‘মানবী’। বেশ দীর্ঘ একটা গল্প। এই গল্পটা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। পাঠক পড়ে দেখবেন। গল্পটা কষ্টকর, আমাদের সমাজে পুরুষের দৃষ্টি হতে শুধু নারী কেন একটা শিশুও যে নিরাপদ নয় সেই আখ্যান রচনা করেছেন হাসান মাহবুব। সত্যিই এই গল্পটা আমাকে ভাবিয়েছে। আর এই গল্পের রেশ নিঃসন্দেহে রয়ে যাবে দীর্ঘকাল। রেটিং : ৮/১০
আমার কথা ------------------------ 'জবাইঘর' বইটাতে লেখক অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় এমন কতগুলো গল্প ববেছন যেগুলো পড়লে আপনার ভাবনা জাগবে, মনে হবে ভাগ্যিস এমন অস্বস্তিকর অবস্থায় আমি পড়িনি। লেখকের লিখনীর প্রশংসা করতেই হয়। এত সুন্দরভাবে গল্প এগিয়ে নিয়েছেন যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। বইয়ের প্রচ্ছদটা বেশ ইন্টারেস্টিং। বাঁধাইও বেশ ভালো, ফন্ট ও পৃষ্ঠা উন্নত মানের। বইটা আকারেও ছোটখাটো এবং বেশ সুন্দর।
এক নজরে, বই : জবাইঘর লেখা : হাসান মাহবুব প্রচ্ছদ : ধ্রুব চন্দ্র প্রকাশনী : পেন্ডুলাম পাবলিশার্স মুদ্রিত মূল্য : ৩২০ টাকা পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৯৮
প্রতিটা গল্প আলাদা একেকটা অনুভূতি নিয়ে লেখা। সিম্বল এবং ইন্টারপ্রিটেশনের ব্যবহার দুর্দান্ত। প্রতিটা গল্প আপনার নিজের মতো করে ভেবে নেবার সু্যোগ আছে। এই ব্যাপারটাকে আমি মনে করি শিল্পের সবচেয়ে সেরা দিক।
হয়তো সবগুলো গল্প আপনার মনের মতো নাও হতে পারে, কিন্তু স্রেফ লেখনশৈলীর আনন্দ নিতে এই বই পড়া উচিত।
কিছু গল্প পড়ে আমি অস্বস্তিতে ভুগেছি, ঘৃণা জাঁকিয়ে ধরেছে। লেখক মানুষের অসুখ এবং আঁধারের ঠিকানা দেওয়ার সুচারু চেষ্টা চালিয়েছেন। পাঠক হিসেবে লেখকের চেষ্টা সফল মনে হয়েছে।
মানুষের অন্ধকার দিককে এভাবে বের করে আনার জন্য লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতার ঝুলি ঠিক কতখানি, আমি জানি না। ছোটোভাই লোচন তার রিভিউয়ে বলেছে ভদ্রলোকের রিসার্চ ওয়ার্ক ভালো। এ ব্যাপারে সহমত।
ডার্ক ফিকশন জনরার সাথে আমি খুব একটা পরিচিত না। অনলাইন গ্রুপে অনেক ভাল রিভিউ দেখে মূলত বইটা কেনা। কিন্তু আমার ��েন যেন খুব একটা ভাল লাগে নাই। বারবার পড়ার সময় ধৈর্য্য হারায় ফেলতেছিলাম। কয়েকটা গল্প ভাল ছিল যার মধ্যে "পুতুলবাড়ি" অন্যতম।