রঙিন টিভি’র সামনে বসে থাকা সবজিওয়ালাও এই শহরের অনেককিছুর সাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিতার পিতাও জানেন গগন হরকরার গান। ফুটপাথে বসে থাকা চিত্রশিল্পী মাদী-কুকুরীর সাথে পাউরুটি ভাগ করে খেতে খেতে গল্প করে-‘এই পৃথিবী রঙহীন।’ মধ্যরাতে ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোর নীচে দাঁড়িয়ে জনৈক মাতাল বিশ্ব-রাজনীতি আলোচনা করে এক পতিতার সাথে। আর একজন নব্য-লেখক এদের জীবন দেখতে দেখতে সিদ্ধান্ত নেয়- এদের সবাইকে একদিন সাদা পৃষ্ঠায় নিমন্ত্রণ জানাবেন, প্রখর রোদের মধ্যে দাঁড়িয়েও গল্প করবেন চলনবিলে বৃষ্টির সৌন্দর্য্য নিয়ে।
'একজন শিল্পীকে প্রতিনিয়ত সঙ্গম করতে হয় তার শিল্পের সাথে। শিল্প যেহেতু থাকে নিজের মাঝে, অর্থাৎ শিল্পীর মাঝে, তাই কখনও সে সঙ্গম হয় নিজেরই সাথে'।
এই এতটুকু কথা নিয়ে ব্যখ্যা বিস্তৃতি দিয়ে লেখা যায় একটা আস্ত বই। আমাদের প্রচলিত সাহিত্যের এমন অবস্থা যে এরকম কয়েকটা লাইন প্রকাশ করতে খানিকটা হলেও সাহস লাগে কেননা এই কথার অর্থ করা যায় অনেক ভাবে। তবু সে গভির কথাটাই লিখেছেন লেখক তার গল্পে। একজন শিল্পী কীভাবে মানুষকে দেখে আর সে দেখা থেকে ছবি তৈরি করে নিজের মনের মাঝে, সে গল্পের নাম 'আর্টিস্ট প্রস্টিটিউট'।
আসলে শিল্পী হতে হলে চোখ খুলে দেখতে হয়। ওয়ালিদ প্রত্যয় সেই দেখাটা দেখতে জানেন। জানেন বলেই একটা লাল ছোপ লাগা টাকা, তার গল্পের মুখ্য অনুষঙ্গ হুয়ে ওঠে। তাকে কেন্দ্র করে গল্পকার নিয়ে আসেন কিছু মানুষের জীবনের গল্প; উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত মানুষের গল্পের সাক্ষী টাকা। সে গল্পের নামও তাই 'সাক্ষী'।
'এখানে ভীষণ রোদ' লেখকের প্রথম বই। আমি বলবো না যে পড়লে মনে হয় না এটা প্রথম বই, বরং মনে হয় ছাপার অক্ষরে লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে যতোটা যত্নবান হওয়া উচিৎ, হাত পাকানো উচিৎ, ওয়ালিদ প্রত্যয় সে পরিশ্রমটা করেছেন। তাই তার প্রথম গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো যথেষ্ট 'ম্যাচিওর'।
গল্পকার প্রথম গল্প 'রঙিন টিভি'তেই চমক দেন। জেলখানার ফাঁসীর আসামীকে নিয়ে এমন গল্প হতে পারে, ভাবিনি কখনও। সেখান থেকে যখন 'সবজিওয়ালার ঘামে ভেজা পালং শাক' নামে এক পতিতালয়ের সঙ্গে জড়িত কিছু মানুষের গল্প আসে তখন আরেক দিগন্ত আবিষ্কার করা চলে। আবার সেখান থেকে আমাদের তিনি নিয়ে যান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে।
লেখকের একেকটা গল্পের মাঝে মিশে আছে মায়া মমতার অদ্ভুত মিশ্রণ। এই সংকলনের নাম-গল্পটাই তার বড় পরিচয়। যেখানে এক অতি মধ্যবিত্ত প্রৌঢ় দম্পতির ভালোবাসার নিস্তরঙ্গ গল্প আমাদের মাঝে কল্লোল তুলতে পারে।
গল্প নিয়ে কথা বলা মুশকিলে ব্যাপার এই সময়ে। কারণ বেশিরভাগ পাঠকেরই ধারণা গল্প আসলে বাচ্চাদের ব্যাপার স্যাপার। বড় লেখকেরা গল্প লিখবেন না; লিখবেন উপন্যাস। বিশাল কলেবর থাকবে। পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যাবেন তাও বই শেষ হবেনা।
কিন্তু সমস্যা হলো ছোট গল্পের ব্যাপারটা আমাদের অতি অবহেলার পরও হারিয়ে যায়নি। কেন হারিয়ে যায়নি সেটা সিরিয়াস পাঠকেরা ভালোই বুঝে। কিন্তু কাটতি কিংবা অন্যসব কারণে অনেকেই গল্প নিয়ে বইয়ের কাজ করতে চান না। প্রকাশকেরাও আগ্রহ দেখায়না। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে ‘এখানে ভীষণ রোদ’ বইটি বেশ অন্যরকম বটে।
বইটি লিখেছেন ওয়ালিদ প্রত্যয়। একটা অর্ধচেনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তিনি। লিখেছেন আটটি গল্প নিয়ে একটি একক গল্পের সংকলন। এটিই তার প্রথম বই। বইটি বের করেছেন প্রকাশনা সংস্থা নালন্দা।
বইটা পড়ার ক্ষেত্রে একটা মজার জিনিস খেয়াল করলাম। সেটা হলো গল্পের ক্রমান্বয় বেশ বৈচিত্র্যপুর্ণ। প্রথম গল্প ‘রঙিন টিভি’। গল্পের প্রথম অনুচ্ছেদে গল্পের পুরো স্পয়লার! একটা নাটকে ফাঁসির দৃশ্য দেখানো হবে। এইটুকু পড়েই এক বিশেষ লেখকের কাজের ইশারা পাই। কিন্তু এসব গল্পে যেটা হয় তা হলো একটি সমস্যা দিয়ে শুরু করা হয়। মানে ঘটনার ভেতরের ঘটনা নিয়েই আগানো হয়। আমি অবাক হয়ে দেখলাম এটা বেশ ব্যাতিক্রম। গল্পের শুরুতে স্পয়লার দিয়ে কঠিন এক সমস্যায় ফেলে দেয়া হয়েছে। সমস্যা নিয়ে সামাজিক উপাখ্যানও হয় তা আমি এটা না পড়লে বুঝতে পারতাম না।
প্রত্যেক গল্পের রূপতাত্ত্বিক আলাদা একটা ব্যাপার আছে। আমি বহুদিন আগে একবার ফাঁসির এক আসামীর কথা নিয়ে একটা গল্প লেখার চেষ্টা করেছিলাম। নাম দিয়েছিলাম শুকনো পাতা। সমস্যা হলো যখন গল্পের মাঝে গেলাম তখন। কোনভাবেই আমি আমার মত আগাতে পারছিনা। মনে হচ্ছে জোর করে একপেশে হয়ে যাচ্ছে। ভালো প্লটের গল্প নিয়ে কাজ করতে গেলে আপনার কোন না কোনভাবে গুবলেট পাকাতে হবেই। অথচ এই বইতে কোন প্রকার গুবলেট নেই। একবারের জন্যও মনে হয়নি, ‘ধুরু এন্ডিং এমন কইরাই তো নষ্ট কইরা দিলো।‘ আমি খুবই অবাক হয়েছি এটা ভেবে যে একদম গল্পকে হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়ার মত সব গল্প সে কিভাবে লিখলো!
রূপতাত্ত্বিক আরো একটা ব্যাপার নিয়েও বলা যায়। সেটা হলো সংলাপ দিয়ে ভর্তি না করে মুল টেক্সট নিয়ে কাজ করা। এটা বেশ জটিল একটা ব্যাপার। যখন আপনি মস্কিস্ককে ভাবাতে চান তখন সবচেয়ে ভালো উপায় হলো কারো মুখ দিয়ে আপনার মনের কথাটা আপনার মত বলে ফেলা। ওয়ালিদ প্রত্যয় সেটা করেননি। তিনি গল্প নিয়ে খেলেননি। গল্পকে মুখে লাগাম দেয়া কোন গাভীর মতও জোর করে টেনে নিয়ে যাননি। মনে হয়েছে এক দীর্ঘ পথিকের সাথে রাস্তায় পরিচিত হওয়া এক মেনি বিড়াল যে কিনা পিছু ছাড়তে রাজী নয় পথিকের। গল্প নিজ ইচ্ছায় মেনি বিড়ালের মত পথে পথে হেটেছে।
কিন্তু এতেই গল্পের মুল কাজ শেষ হয়না। দেখতে হবে আপনি গল্পকে কোন হিসেবে ট্রিট করতে চান। তাকে ভিক্ষুক বানিয়ে ভিক্ষুকের মত ব্যবহার করতে পারেন অথবা এক তুলতুলে প্রেমিক প্রেমিকা বানিয়ে ন্যাকামোর মধ্যে গল্প ফাঁদতে পারেন। এটা সম্পূর্ণ আপনার রুচি ও দক্ষতার ব্যাপার। ওমা! ওয়ালিদ প্রত্যয়ের এমনই শক্তি যে গল্পগুলোকে মেনি বিড়ালের মত তুচ্ছ করতে হয়নি কিংবা কোলে তুলে দুলালী বানাতে হয়নি। তারা সময়মত দুলেছে। দোলার কথা যেহেতু চলেই এলো।
গল্পের গভীরতম বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝবো প্রত্যেকটা গল্প অর্থাৎ সব গল্প একপ্রকার দ্যোদুল্যমান গল্প। আপনাকে গল্পের মাঝে পেন্ডুলাম হতে হবে। সমাজ ও ব্যক্তির কী এক দুর্দান্ত দ্বান্দিক বিরোধ! যা আপনাকে কোনভাবেই একটি চরিত্রের হয়ে ভাবাতে পারবেনা। আপনাকে ভাবতে হবে পেন্ডুলাম হয়ে। ভাসতে হবে গল্পের দোলাচলে।
সত্যি বলতে কোন গল্পকে স্পর্শ না করেও এই বই নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখা যায়। গল্প নিয়ে কথা বললে ডজনখানেক চায়ের কাপ একসাথে জমিয়ে ফেলা যায়। প্রত্যেকটা গল্প পেন্ডুলাম আর দোলাচলে ফেলবার গল্প। এগুলো হাসি বা দুঃখের গল্প নয়; বরং এগুলো আপনাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবে জীবনটা আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার এমসিকিউ প্রশ্ন না, যে আপনাকে ভালো বা মন্দ পছন্দ করতে হবে। সুখ আর দুঃখ দিয়েই জীবন নয়। জীবন এক দোলাচলের নাম। ‘এখানে ভীষণ রোদ’ বইটি সেই দোলাচলের এক অনন্য উপাখ্যান।
দয়া করে বইটা পড়ুন। বারবার পড়ুন। ওয়ালিদ প্রত্যয় নামের বাংলা ভাষাভাষী এক ছেলেকে যে আমরা লেখালেখিতে পেয়েছি তা বইটা না পড়লে উপলব্ধি করতে পারবেন না। অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে গিয়ে নালন্দার বইটি দেখুন। গল্প নিয়ে আপনার ভাবনা পাল্টে যাবে।
It is difficult to talk about the story at this time. Because most readers think the 'story' is actually a children's affair. Great writers don’t write stories; Write novels. There will be huge bodies. Even if you fall asleep while reading, the book will not end.
But the problem is that the short story is not lost even after our gross negligence. Serious readers understand why it was not lost. But for sale or other reasons, many people do not want to work on a book with stories. Publishers are also not interested. Standing in that place, the book 'Ekhane Bhishon Rod' (It's very sunny here) is quite different.
The book is written by Walid Suffix. He is a student of a semi-familiar university of science and technology. Wrote a single-story collection of eight stories. This is his first book. The book was published by publishing house Nalanda.
I noticed an interesting thing while reading the book. That is, the sequence of the story is quite diverse. The first story is 'Color TV'. The whole spoiler of the story in the first paragraph of the story! A play will show the execution scene. After reading this, I get a hint of the work of a special writer. But what happens in these stories is that they start with a problem. This means that the incident is dealt with inwardly. I was surprised to see that it was quite an exception. At the beginning of the story, there is a difficult problem with spoilers. I would not have understood if there was a social anecdote about the problem without reading it.
Every story has a morphological difference. I tried to write a story about a hanged man a long time ago. I named the 'Shukno Pata' (dried leaves). The problem was when I got in the middle of the story. There is no way I can go on like this. It seems to be forcibly becoming one-sided. If you want to work with a good plot story, you have to cook goof somehow. But there is no goof in this book. I didn't even think for a second, ‘Dhuru Ending was ruined by someone like that.’ I was amazed at how he wrote all the stories, like blowing up a story!
One more thing can be said about morphology. That is to work with the original text without filling it with dialogue. It's a very complicated matter. When you want to think in the brain, the best way is to say what you think with your mouth. Walid didn't do that. He didn’t play with the story. He didn't pull the story like a cow with a bridle in its mouth. It seemed that a little cat who had met alone passerby on the street was not willing to give up. The story voluntarily walks the path like a little cat.
But this does not end the main work of the story. It remains to be seen which way you want to treat the story. You can use him as a beggar by making him a beggar or you can trap the story in lame by making him a flirtatious lover. It is entirely a matter of your taste and skill. Oma! The power of Walid's sentence is such that the stories did not have to be trivialized like a cat or made into a cradle. They shook in time. Since the word of the swing came.
If we analyze the story in-depth, we will understand that every story, that is, all stories, is a kind of oscillating story. You have to be the pendulum in the middle of the story. What a great dialectical conflict between society and the individual! Which in no way can make you think of a character. You have to think of it as a pendulum. You have to float in the swing of the story.
To be honest, this book can be written page after page without touching any story. Talking about the story, dozens of cups of tea can be frozen together. Every story is a pendulum and a swinging story. These are not stories of laughter or sadness; Rather these will show you with a finger in the eye that life is not actually the MCQ question like university admission test, that you have to choose good or bad. Life is not about happiness and sorrow. Life is a fluctuating name. The book ‘Ekhane Bhison Rod’ is a unique book of that oscillation.
Please read the book. Read again and again. If you don't read the book, you won't realize that we have found a Bengali boy named Walid Prattay in writing. Visit Amar Ekushey Book Fair and see Nalanda's book. Your thoughts on the story will change. The book ‘Ekhane Bhison Rod’ is a unique book of that swing.
‘এখানে ভীষণ রোদ’ গল্পগ্রন্থটি—লেখক ও কবি ওয়ালিদ প্রত্যয়ের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। ফেসবুকের নীল দুনিয়ায় ওয়ালিদের লেখাগুলোকে আমার লাল রঙা মদের মতো মনে হতো, কবিতাগুলোকে লাগত শাড়ি পরে দেখা করতে আসা প্রেমিকার মতন। তাই ইচ্ছা ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থটি পড়ার, কিন্তু অর্থাভাবে কেনা হয়ে উঠছিল না। অবশেষে এবার বইমেলাতে এক শান্ত ও মৃদুভাষী মেয়ের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছি লেখকের নতুন-পুরাতন দুটি বই-ই। ছোট-বড় আটটি গল্প নিয়ে রচিত লেখকের এক বছর বয়সী বইটিকে লেখকের ভাষায় ‘প্রথম সঙ্গম অভিজ্ঞতা’ বলা যেতে পারে!
প্রথম গল্প ‘রঙিন টিভি’ থেকেই লেখক—একজন লেখক হিসেবে কতটা আত্মবিশ্বাসী তা বুঝিয়েছেন; এটা বোঝানো দরকার, না হলে পাঠক লেখকের লেখার উপরে ভরসা করতে পারবে না। সেজন্যেই হয়ত উনি বেছে নিয়েছেন একটু কঠিন প্লট, যে গল্প কতটা সম্ভব বা অসম্ভব তা নিয়ে পাঠক নিশ্চিত হতে পারবে না আবার অমূলক বলে উড়িয়ে দিতেও পারবে না।
তবে দ্বিতীয় গল্প ‘আর্টিস্ট-প্রস্টিটিউট’ আমাকে কিছুটা হতাশ করেছে! দৃশ্য নামক দেশীয় আর্টিস্টের মুখের কথাগুলোতে আমার মনে হয় না কানাডার কোন নারী এত সহজেই এত অল্প সময়েই প্রেমে পড়ে যাবে! দৃশ্যের সংলাপগুলোও জোড়ালো নয়, কথা বলার ধরনে আত্মবিশ্বাসী ভাব থাকলেও কথাগুলো ভাসা ভাসা, লেখক যেন জোর করে চমৎকার কিছু বলানোর চেষ্টা করছেন! দৃশ্যের সংলাপ শুনে কানাডাবাসী জেরিসার মুখ থেকে যদি ‘ওয়াও’ ‘গ্রেট’ এই জাতীয় কথা শোনা যেত তাহলে বেশী মানানসই হতো, লোক দেখানো মুগ্ধতা এদের মাঝে প্রবল। আর তাছাড়া এই গল্পটা হুমায়ূন আহমেদের হিমু সিরিজের বই ‘তোমাদের এই নগরে’র মতো মনে হয়েছে কিছুটা।
এরপরে ‘সাক্ষী’ গল্পটা ভালো লেগেছে, একটু ভিন্ন ধরনের গল্প। কিন্তু দুই এক জায়গায় আরেকটু সতর্ক হলে আরও ভালো লাগত। যেমন, বেসরকারি একটা টিভি চ্যানেলের মালিক হয়ে ওবায়দুর রহমান নিজে গাড়ি চালান, নিজে একটা হোটেল থেকে খাবার কেনেন—সেটা ঠিক মানা যায় না, বিশেষত দরিদ্র অবস্থা থেকে ধনী হলে তার মাঝে আরও ‘ফুটানি’ বৃদ্ধি হবার কথা ছিল। এমনকি ওবায়দুর রহমানের বাড়ির পরিবেশটাও ঠিক কোন বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মালিকের মতো হয়নি, অনেকটা ব্যাংকের মোটামুটি পদে চাকরি করা কোন ব্যক্তির ভাড়া বাড়ি মনে হয়েছে, সেখানে কাজের লোকের ছড়াছড়ি নেই, ‘স্যার-ম্যাডামদের’ মুখে নেই মেকী ভদ্রতা।
পরের গল্প ‘আয়শা’—মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত গল্পটি মুক্তিযুদ্ধের পরিচিত গল্পের প্রায়-ভিন্ন একটা গল্প নিয়ে রচিত। এই গল্পের একটি প্রধান চরিত্র মেজর ইশহাক—সে খারাপ কী ভালো বোঝা মুসকিল, তবে তাকে ‘মন্দের ভালো’ বলা যায়। লেখাটি লেখকের পুরোপুরি কল্পনাপ্রসূত নাকি জনশ্রুতি থেকে লেখা তা জানা নেই। কল্পনাপ্রসূত না হয়ে জনশ্রুতি হলে খুশি হবো। কারণ যুদ্ধের সময় এরকম একটা বিয়ে বড্ড বেমানান হলেও যেহেতু এ বিষয়ে আমার সঠিক কোন ধারণা নেই তাই আমি নির্দিষ্ট করে কোন মন্তব্য করতে চাই না।
‘সবজিওয়ালার ঘামে ভেজা পালংশাক’—আকারে বেশ বড় একটা গল্প। পতিতা ও তাদের সন্তানদের যে জীবনচক্র দেখানো হয়েছে তা যথেষ্টই বাস্তবসম্মত। এবং তাদেরকে এই সমাজ ও তাদের ‘ভদ্র’ কাস্টমারেরা কী চোখে দেখেও তাও বাস্তবসম্মত। তবে আমার মনে হয়েছে পতিতালয়টির প্রকৃত অবস্থান বাংলাদেশের কোথায় সেটা জানা থাকলে ভালো হতো, কারণ গল্পের পরবর্তী অংশ যেহেতু ‘ঢাকা’ কেন্দ্রিক তাই পূর্বের জায়গাটি কাল্পনিক হওয়ায় পরের ‘বাস্তব জায়গার’ সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না, তাই শেষ দৃশ্যে সবজিওয়ালা আকবরের ঢাকাবাসী হওয়াটা মনে কিঞ্চিৎ খটকা লাগায়। যদিও ধরে নেওয়া যায় যে আকবর কিছুকাল শ্বশুরালয়ে থেকে তারপর বউ ও শালিকাকে নিয়ে ঢাকাবাসী হয়েছে এবং শেষ দৃশ্যে যে কাকতালীয় ঘটনাটি ঘটে সেটা গল্পের প্রয়োজনে আমাদের মেনে নিতেই হয়!
‘এখানে ভীষণ রোদ’ গল্পটি একটি পরিপূর্ণ গল্প। হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে মধ্যবিত্তের যে ন্যাকা কান্নার শুরু হয়, বর্তমান জনপ্রিয় লেখকেরাও তার ধারা বজায় রেখেছেন, বরং এঁরা একটু বেশীই যেন কান্নাকাটি করছেন মধ্যবিত্ততা নিয়ে, তার হালকা আঁচ ওয়ালিদ-কে স্পর্শ করলেও উনি নিজেকে একেবারে ভাসিয়ে দেননি। তার পরিচয় পাওয়া যায় এই গল্পে। গল্পটি মধ্যবিত্তের দুঃখের মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে দেখানো হয়েছে মধ্যবিত্ত জীবনের ভালো দিক, পারিবারিক সুখ ও ভালোবাসার বন্ধন। আর এই গল্পটা পড়ে লেখকের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে—লেখক শহরের চেয়ে মফস্বল ও গ্রামের গল্প ভালো বলেন, উচ্চবিত্তের চেয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের; আনন্দের চেয়ে হতাশার কথা ভালো বলেন এবং প্রেমিকার সাথে শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি নিয়ে যতটা ভালো বলতে পারেন অতটা ভালো প্রেমের কথা বলতে পারেন না। সেজন্যে নেওয়াজের সাথে মিতুর পরিচয় থেকে যাবতীয় প্রেম পর্বের আলাপ বর্তমান সময়ের তথাকথিত জনপ্রিয় লেখকদের পাঠক মনোরঞ্জনের জন্য লেখা সংলাপের মতো মনে হয়েছে।
এর পরের গল্পের নাম ‘কাজোরী’। কবিতার যেমন গদ্য ছন্দ আছে, গল্পেরও হয়তো পদ্য ধারা আছে। যেমন রবীন্দ্রনাথের কিছু কিছু গল্পের গোটাকতক লাইন কবিতার মতো সাজালে তাকে কবিতা বলে ভ্রম হয়, লেখকের এই গল্পটাও তেমনই কবিতার মতো। একটা প্রেমের গল্প লেখার জন্য ‘কবি’ যে দিকে তাকিয়েছেন ‘কবি’ জীবনের গল্প খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু যাঁর দিকে তাকানোর কথা তাঁর দিকে তাকাননি। এই গল্পের একটা বিশেষত্ব আছে। এই গল্পে এসে আমরা লেখকের নিজস্ব ধারা খুঁজে পাই! যার জন্য লেখাটি সাবলীল এবং সুন্দর। যেন একটা অক্ষরও এদিক ওদিক করার ক্ষমতা স্বয়ং লেখকেরও নেই!
এই বইয়ের শেষ গল্পের নাম—‘রক্তশুন্যসমগ্র’। লেখকের গল্পগুলো তাঁর গল্পলেখার ‘টাইমলাইন’ অনুসারে ছাপা হয়েছে কিনা জানি না, তবে প্রথম গল্প থেকে শুরু করে এই শেষ গল্পে এসে দাঁড়ালে দেখা যাবে লেখক অনেক বেশী পরিণত হয়ে গেছেন। আমার মতে এই গল্পটি এই বইয়ের সেরা গল্প। একটু দ্বিম��� আছে— গল্পের মাঝে তিনজন মানুষ তাদের জীবনের গল্প বলছে, তবে প্রত্যেকেরই গল্প বলার ধরণ একই, যেহেতু তাদের জবানীতে হচ্ছে, তাই বলার ধরণের ভিন্নতা থাকলে আরও একটু জম্পেস হতো, তবে এটা এমন কোন বিষয় নয়, গল্পগুলো ভালো ছিল, নাটকীয়তামুক্ত। এবং সবশেষে লেখক একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন, সে প্রশ্নের উত্তর কি আমরা জানি?
সবমিলিয়ে বলব প্রথম বই হিসেবে লেখক ভালোই লিখেছেন। যদিও সাহিত্য সময়ের সাথে তুলনা চলে ব্যক্তির সাথে না, তবুও বলতে হচ্ছে লেখক বর্তমান সময়ের অনেক জনপ্রিয় লেখকের তুলনায় ভালো লিখেছেন। তাছাড়া লেখক যে মাত্র এক বছরেই বেশ পরিণত হয়েছ���ন তা তার দ্বিতীয় বই ‘জলের দেশে স্থলপদ্ম’ পড়লেই বোঝা যায়। লেখকের প্রতি রইল শুভকামনা, ভবিষ্যতের একজন ‘পরিপূর্ণ লেখক’ হবার সম্ভাবনা তাঁর মাঝে ভালোভাবেই আছে। সেই সম্ভাবনা যেন অটুট থাকে।
লেখকের সাথে পরিচয়টা কুঁড়িতেই। এটা লেখকের প্রথম বই। সাজেস্ট করার জন্য শুভাকাঙ্ক্ষীকে ধন্যবাদ।
লেখক বইটা উৎসর্গ করেছেন উনার বাবা-মাকে।
গল্পগুলোর চিন্তা-ভাবনা অসাধারণ। আমার বেশ ভালো লেগেছে । আটটি গল্প ভিন্ন ভিন্ন ধাঁচের। নতুনত্বে ঘেরা । গল্পগুলো পড়েছি একটু সময় নিয়ে প্রতিদিন একটি করে। যদিও একটানে পড়ে ফেলা সম্ভব ।কিছু গল্প বেশ আকৃষ্ট করেছে ।ব্যক্তিগতভাবে আমার বেশি ভালো লেগেছে যে গল্পগুলো ~
ওয়ালিদ প্রত্যয় একজন সম্ভাবনাময়ী তরুণ লেখক।আশা রাখি বাংলা সাহিত্য একজন শক্তিশালী লেখক পেতে যাচ্ছে। আর সবার হাতে পৌঁছে যাক "এখানে ভীষণ রোদ" সেই প্রত্যয়ে...
গল্প নিয়ে কিছুকথা --
১. রঙিন টিভি
সিনেমার শেষদৃশ্যে ফাঁসি দেয়া হবে নায়ককে,কিন্তু সেটা সত্যিকারের ফাঁসি -এই চিন্তাটা চিত্রপরিচালক অনিবার্ণ সেনের ।সেই অনুযায়ী কাজ। নায়কের গঠনের একজনের সাথে মিল রেখে ফাঁসির আসামী খুঁজে বের করা হয় একসময় এবং রাজী করানো হয়। আসামি মঞ্জুরের পূর্বজীবনের নিম্নবিত্ত পরিবারের অভাব অনটন সাথে গ্রামের উচ্চশ্রেণির অত্যাচারী ও স্বার্থান্বেষীতার কারণে মঞ্জুরের মতো নিরীহ কৃষকদের বিনা দোষে কারাবাস এবং ফাঁসির রায়। অসহায়ত্বের করুণ পরিণতি লেখক খুব সুন্দর ফুটিয়ে তুলেছেন। একমাত্র ছেলের রঙিন টিভির ইচ্ছে পূরণে অনিবার্ণের শর্তে রাজী হয় মঞ্জুর। একসময় ফাঁসিও কার্যকর করা হয়।.... একদিন টিভিতে একটি সিনেমা হয় নাম "আড়াল" ফাঁসির দৃশ্য দেখে মঞ্জুরের ছেলের খুব খারাপ লাগে।
২.আর্টিস্ট- প্রস্টিটিউট
আর্ট ইন্সটিটিউটের আয়োজনে এক প্রদর্শনীতে যোগদান করতে ঢাকায় আসা এক বিদেশিনীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় 'দৃশ্য'র! বিদেশেনীর অনুরোধে পুরো ঢাকা শহর ঘুরিয়ে দেখায় দৃশ্য। দেখানো হয় মানুষের সুখ এবং দুঃখের গল্প।
মানুষের গতিময় জীবন থেকে শুরু করে প্রকৃতি-জড়ের জীবন্ত বর্ণনা দৃশ্যের চোখ দিয়ে অনুভব করতে গিয়ে একসময় দৃশ্যের প্রতি ভালো লাগা কাজ করে সেই মানবীর। ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে দৃশ্যকে বিদেশেনীর সাথে যাওয়ার প্রস্তাব দেয় কিন্তু দৃশ্য প্রত্যাখান করে।দৃশ্য থেকে যায় এই দেশের তার নতুন শিল্পের খুঁজে। একজন আর্টিস্টের তুলির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ পাবেন গল্পটাই। ❤️
৩.সাক্ষী -
“সাক্ষী”গল্পটা একটু ব্যতিক্রম ধরণের। অসাধারণ একটি গল্প। একটি একশ টাকার নোট যার এককোণায় লেগে আছে লাল রঙ। নিন্মবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত মানুষের জীবনের কাহিনীই সাক্ষী হয় ১০০ টাকার ঐ নোটটা ।
৪.আয়েশা -
"আয়েশা" গল্পটা মুক্তিযুদ্ধের সময় নিয়ে।কিশোরী আয়েশা তার পিতার জীবন রক্ষা করতে নিজের জীবনটা তুলে দেয় এক পাকিস্তানি সেনার হাতে। ছেলের মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের ক্ষতিপূরণ হিসেবে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয় হরনাথ দত্তের ।আয়েশার শেষ পরিণতি কি হয়েছিল? জানতে পড়ুন গল্পটা।
৫. সবজিওয়ালার ঘামে ভেজা পালংশাক
পতিতালয়ের কিশোরী রোশমার জীবনের কাহিনীই যেন ফুটে উঠেছে এই গল্পে।ঘরে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন এই নিষিদ্ধ জায়গায় আসতো আকবর। কোন এক কারণে একদিন আসা বন্ধ করে দেন, তারপর চিরতরে অদৃশ্য হোন । । আকবরের দোষে রেশমা শুরু করে শাস্তিময় জীবন।আকবরের এক সন্তান জন্ম নেয় রেশমার ঘরে ।একসময় অজান্তে ভুল বুঝিয়ে তার সন্তানকে বিক্রি করে দেয়। তার উদ্দেশ্য ছিল তার সন্তান যেন সুখে থাকে শহরে গিয়ে । কিন্তু ভিক্ষা করার এক সংগঠনে যুক্ত হয়। কিন্তু রেশমার সন্তান একসময় আকবরের ঘরেই নিঃসন্তান স্ত্রীর কাছে পৌঁছে কাকতালীয়ভাবে।
৬.এখানে ভীষণ রোদ
'এখানে ভীষণ রোদ' গল্পটা সবচাইতে সুন্দর মনে হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বামী স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসার সম্পর্ক যে কতোটা সহজ-সরল তাই পড়লেই বোঝা যায়। গল্পটি এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের। উপার্জনকর্তার একটি লাইব্রেরি দোকান আছে, কিন্তু অর্থাভাবে দোকানে নতুন বই তোলা যাচ্ছে না। একমাত্র পুত্র ইন্জিনিয়ারিং এ অধ্যয়নরত,সেই বাবা-মা মায়ের শেষ ভরসা। পুত্রের লেখাপড়ার খরচ মিটাতে এবং ঋণের বোঝা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বিক্রি করা হয় একজোড়া কানের দুল। যে কানের দুল সাক্ষী হয়ে আছে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ।যেটা তরুণ বয়সে স্ত্রীকে দিয়েছিল, স্ত্রীও আগলে রেখেছিলেন সন্তানের মতো করে।
৭.কাজোরী ❤️
এই গল্পটা নিয়ে কিছুই বলবো না।কাজোরীর প্রেমে পরে গেছি এক্কেবারে 🙃
' তুমি একটা প্রেমের গল্প লেখার জন্য আকাশ-পাতাল ঘুরে এসেছ, মানুষের কাছে গিয়েছ, মানুষীর কাছে গিয়েছ । অথচ একবারও আমার কাছে প্রেমের গল্প খুঁজতে আসোনি। আমার ঠোঁটে তোমার জন্য যে কতো গল্প জমা আছে,তুমি খোঁজই করলল না দ। লেখক সাহেব, ভুল জায়গায় খুঁজলে কি প্রেম পাওয়া যায়??"
কাজোরী কথাটা বলেই ফোন কেটে দিল। আমি সিগারেট ধরিয়ে মনে মনে আবৃত্তি করলাম --
এই রাষ্ট্রের রোদ ছাড়া কোনো প্রেমিকা নেই এই রাষ্ট্র জীবন চালায়, কল্পনায় -- কায়ক্লেশে। তবু নরক থেকে ট্রেন মারফত সবুজ শাড়ি পরে হঠাৎ হঠাৎ কবির ঘরে কাজারী-রা আসে।
৮.'রক্তশূন্যসমগ্র
একটা প্রতিযোগিতার গল্প তাও সবচেয়ে দুঃখী মানুষ খোঁজার প্রতিযোগিতা। যাচাই-বাছাই ও বিবেচনার পরে তিনজন মানুষ সেরা তিনে স্থান পায়। সেরা হবার লড়াইয়ে সম্পূর্ণ দুঃখের গল্প শোনানো হয় বিচারককে। তিনজনই জীবনের দৌড়ে পরাস্ত, অবহেলিত, দুঃখে জর্জরিত।একসময় সবাই সবার গল্প শোনায়।কিন্তু বিচারকই ছিল বধির অন্ধ। তিনজনের দুঃখ পড়তে গিয়ে পাঠকের কষ্ট হবে হয়তো।
বইয়ের নামঃ এখানে ভীষণ রোদ ধরণঃ গল্পগ্রন্থ লেখকঃ ওয়ালিদ প্রত্যয় প্রকাশনাঃ নালন্দা প্রচ্ছদঃ ধ্রুব এষ পৃষ্ঠাঃ ১১২ প্রচ্ছদমূল্যঃ ২৫০/- ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৯.৫/১০
অনেক দিন পরে একটি চমৎকার বাংলা গল্পের বই পড়েছি। সম্ভাবনাময় তরুণ লেখক ওয়ালিদ প্রত্যয়। আমি ভাল রিভিউ দিতে পারি না তাই বেশি কিছু লিখছি না। ভিন্ন স্বাদের ৮টি গল্প। একটানে পড়ে ফেলা যায় কিন্তু আবার শেষ করতেও ইচ্ছে করেনা; ফুরিয়ে যাবে বলে- এমনই লেখনি। আমার পড়তে শুরু করতে না করতেই আরেকজন নিয়ে চলে গিয়েছিল তাই আমার এতদিন লেগে গেল! বইয়ের অনেক গুলো উক্তি বেশ পছন্দ হয়েছে আমার। এ বছর পড়া অন্যতম সেরা ফিকশন বই এটি।
"নবীন লেখকদের লেখার ভিত ভালো না" কিংবা "আজকাল লেখকেরা মাকাল ফল টাইপের লেখা লেখে"- এই টাইপের সব ধারণা গুলো তাঁর ক্ষেত্রে একদমই খাটবে না- বিশ্বাস রাখুন।
প্রায় ত্রিশ বছর ধরে দেখা সর্বোচ্��� সুন্দর সংসারের পরিচালক বাবা-মায়ের নাম বইয়ের উৎসর্গপত্রে লিখে প্রথমেই যেন আশীর্বাদ নিয়ে নিলেন। তারপর ভূমিকাতে "এখানে ভীষণ রোদ" গ্রন্থটিকে সাহিত্যের কোন জনরার অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে তা নিয়ে দিলেন সন্দিহান মত। তারপর একে একে আটটি অজানা এক জনরার অন্তর্ভূক্ত লেখার জন্ম দিলেন এই গ্রন্থে।
...
সিনেমার এক দৃশ্যে নায়ককে ঝুলানো হবে ফাঁসিতে। চিত্রপরিচালক এই ফাঁসির দৃশ্যকে জীবন্ত করে ফুঁটিয়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। নায়কের গঠনের সাথে মিল রেখে ফাসির আসামী খুঁজে বের করা দিয়ে গল্পের শুরু। ফাসির এক আসামীও এক চিত্রপরিচালকের কাছে এত মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে তা নিয়ে উদাস হয়ে ভাবতে থাকা আসামি মঞ্জুর পূর্ব জীবনের দিনকাহিনী যেভাবে লেখক ফুঁটিয়ে তুলেছেন তা যেন অসম্ভব সুন্দর। নিম্নবিত্ত পরিবারের অভাব অনটন থেকে শুরু করে গ্রামের মোড়লদের অত্যাচারী ও স্বার্থান্বেষী মনোভাব কিরকম বাজে প্রভাব বয়ে আনতে পারে মঞ্জুর মতো কৃষকদের শান্তির জীবনে তা যেন ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। তবুও এক জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হিসেবে মজুকে দাঁড় করিয়েছেন লেখক। এভাবেই গল্প এগিয়ে গিয়ে মঞ্জুর পরিবারে একদিন রঙিন টেলিভিশন আসে। এর মধ্যের দিনগুলোতে প্রচন্ড রকমের পরিবর্তন আসে সবার জীবনেই। সবকিছু মিলিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠা এই গল্পটি পড়তে পারলে অসম্ভব সুন্দর লেখনশৈলীর সাক্ষী হবার গর্ব নিশ্চয়ই অনুভব করবেন।
...
বিশ্ববিখ্যাত ব্যান্ড 'কুইন' এর গায়ক ফ্রেডি মার্কিউরির এক সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেকে এক অনন্য উপাধি দেয় দিলশাদ চৌধুরী। নিজের নামটাও পরিবর্তন করে রেখে দেয়া হয় "দৃশ্য" বানিয়ে। আর্ট ইন্সটিটিউট এর আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে যোগ দিতে ঢাকায় আসা এক বিদেশিনীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় দৃশ্য'র। দৃশ্যকে অনুরোধ করা হয়, তাকে যেন পুরো ঢাকা শহর ঘুরিয়ে দেখানো হয়, দেখানো হয় মানুষের সুখ এবং দুঃখ। এই পরিপ্রেক্ষিতেই গল্প এগিয়ে চলে। টিএসসি'র বাঁয়ে রাধাচূড়া গাছ থেকে শুরু করে, ঢাকার আকাশ-বাতাশ, ফার্মগেটের এক হোটেলে বসে ভাত খেতে খেতে দৃশ্যের বর্ণনা এগিয়ে চলে। রেলস্টেশনের গতিময় জীবন থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা মানুষের জীবন্ত বর্ণনা দৃশ্যের চোখ দিয়ে দেখতে গিয়ে একসময় দৃশ্যের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ে সেই বিদেশিনী। দৃশ্যের মতে আমরা জন্মই নেই ছেড়ে দেয়ার জন্য। তো সেই বিদেশিনীর জন্যে দৃশ্য কেন ঢাকা ছেড়ে বিদেশ যাবে না, তা বিদেশিনী জানতে চায়। দৃশ্য কি উত্তর দেয়? সবটুকু জানার জন্যে এই বই, এই লেখা, এই লেখকের ভাবনার প্রতি গভীর এক ডুব দিতেই হবে।
তা না হলে ভয়ঙ্কর সুন্দরভাবে সাজানো গোছানো একেকটা জীবনকে অনুভব কিভাবে করবেন আপনি?
...
কোনো এক রাজার ছবি সংবলিত নীলচে একশো টাকার একটা নোট, যার এক কোনায় লাল রঙ লাগা, হয়তো রক্ত, কে জানে! এই নীলচে নোটটা যে পুরো শহরের কয়েকশো গল্পের সাক্ষী, মানুষের সুখ-দুঃখের সাক্ষী তা যেন জীবন্ত করে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছেন এই গ্রন্থের লেখক। মাঝারি মানের একটা হোটেলের স্পেশাল চড়ুই পাখি দিয়ে ভাত খেয়ে তৃপ্তি মেটায় এক পথচারী। সকালের রাগারাগিতে বাসায় রান্না হয়নি কিছুই। স্ত্রী আর পুত্রের জন্যে হোটেল থেকে খাবার কিনে বাসায় ফিরলেন এক ভদ্রলোক। আবার রাগারাগি হলো এক পশলা। বাবা-মায়ের ঝগড়ায় অতিষ্ট হয়ে মাঝরাতে শহরে রিক্সায় চড়া সত্যজিৎকে হাতিরঝিল নিয়ে যেতে যেতে গল্পে আসেন রিক্সাচালক কাশেম আলী। অভাবের সংসারে জহুরাকে নিয়ে স্বপ্ন সাজান মাঝরাতে বাড়ি ফিরে। প্রতিরাতে ঘরে ফিরতে দেরী হয় বলে ছোট্ট ছেলে সুজনকেও জেঁগে থাকা অবস্থায় না দেখতে পারার কষ্ট লুকিয়ে রাখেন। দেখতে দেননা কাউকেই। উচ্চবিত্ত পরিবারে অন্যসব কিছুর অভাব না এলেও, ভালোবাসার যে নিদারুন অভাব পরিলক্ষিত হয়, তার জীবন্ত সাক্ষী হয়ে ঘুরে বেড়ায় অইযে গল্পের শুরুতে বর্ণিত নীলচে একশো টাকার নোট। কিন্তু কিসের সাক্ষী হয়? ভেতরের গল্পগুলোই বা কিরকম?
সবকিছুর সাক্ষী হতে হলে আপনাকেও সুন্দর এই গল্পটি পড়তেই হবে, পড়তেই হবে।
...
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার আত্মত্যাগী আয়েশা তার পিতাকে বাঁচাতে নিজের জীবনটাই এক নরপিশাচের হাতে সপে দিয়ে গল্পটাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তৎকালীন সময়ের এইরকম হাজারো গল্প অজানা রয়ে যায় আমাদের, হাজারো আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মর্জাদাটাও আমরা দিতে ভুলে যাই। পুত্রের মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের ক্ষতিপূরণ হিসেবে নিজের জীবনটা ই বিলিয়ে দিয়ে গল্পটা জীবন্ত করে তোলেন হরনাথ দত্ত। প্রচন্ড স্বার্থপর মনে হয় হয়তো মজিদ খলিফাকে, হরনাথ দত্তের লাশের পাশে। কি থেকে কি হয়? কেনই বা এসব হয়? আয়েশা ই বা কোথায় যায়? প্রত্যেকটি উত্তর খুঁজে পেতে পেতে হয়তো চোখ ভার হয়ে আসবে, কন্ঠ জড়িয়ে যাবে, প্রচন্ড জোরে চিৎকার করতে মন চাইবে।
...
সরকারের নিবন্ধনের বাইরে গড়ে উঠা অনেক পুরানো এক পতিতালয়ের এক বালিকার প্রতিদিনকার জীবনের কাহিনীই যেন ফুটে উঠেছে এই গল্পে। হয়তো জীবিকার তাগিদে নিষিদ্ধ এক কাজে জড়িত, তবুও নিজের চরিত্রে আঁচড় পড়তে না দেয়া রেশমাকে কঠিন এক শাস্তিই যেন প্রদান করে স্ত্রী বিমুখ স্বামী আকবর। ঘরে স্ত্রী থাকা সত্বেও প্রতিদিন এই নিষিদ্ধ জায়গায় আসতো আকবর। কোন এক কারণে একদিন আসা বন্ধ করে দেন, তারপর চিরতরে। আকবরের দোষে রেশমা শুরু করে শাস্তিময় জীবন। একসময় বোঝা সইতে না পেরে নিজের সবচেয়ে আপন দুটি জিনিশ সে বিক্রি করে দেয়। কি ছিলো সেই দুটি জিনিশ?
এরপর গল্প আগায়। অনেক দূর গড়ায়। পতিতালয়ের বড়পা সামান্য কিছু টাকার জন্যে রেশমার প্রিয় জিনিশ বিক্রি করে দেয়ার ফলেই পানি গড়ায় বহুদূর। একসময় নিয়তি বদলায়। গল্প যেখান থেকে শুরু হয়, থামে কিন্তু দেখানেই। সবকিছু মিলিয়ে চমৎকার সব প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের সাক্ষী হতে আর দারুণভাবে বর্ণিত কয়েকটা জীবন্ত ঘটনার সম্মুখীন হতে এই সবজিওয়ালার গল্প না পড়লেই নয়।
...
পুরো গ্রন্থের মূল গল্প 'এখানে ভীষণ রোদ' যেন সবচাইতে মধুর করে বর্ণিত উপাখ্যান। মানুষের বিব্রত হয়ে বসে থাকার এক দারুণ বর্ণনা দিয়ে গল্পের শুরু। গল্পের মাঝে বা শেষে যতোটা ভালোবাসা গেঁথে রেখেছে লেখক, তা যেন সম্পূর্ণ গল্প না পড়লে কেউ ই টের পাবে না। মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বামী স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসার সম্পর্কে যে কতো শীতের কত শিশিরবিন্দু জমে থাকে, তা যেন তারা ছাড়া কেউ ই কখনো আঁচ করেনা। একজনের প্রতি আরেকজনের সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বজায় রাখতে কি পরিমান আত্মত্যাগ করে চলতে হয়, তাও গল্প না পড়লে বোঝা মুশকিল। প্রত্যেকটা ভালোবাসার গল্পে অশ্রুসজল চোখ থাকবেইন, হোক তা কষ্টের বা হোক তা সুখের। অশ্রুসিক্ত মুহূর্তগুলোকে জীবন্ত করে তোলার জন্য এই গ্রন্থের লেখককে যেকোনো কিছু দিয়ে পুরষ্কৃত করলেই হবে না। সম্মানজনক কিছু অবশ্যই দেয়া লাগবে।
মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালাতে হিমশীম খাওয়া পিতা নিজের ভালোবাসাকেও আত্মত্যাগ করতে রাজি হয়, তা দেখে যেকোন সন্তান যেন নিজেদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে। নিজেদের ভুল শুধরে সঠিক পথে চলে আসে, তা যেন প্রত্যেকটা পাঠকই আশায় বুক বাঁধে।
এরপরেও, এই গল্পে আসলে ই কি আছে? মনসুর আহমেদের ভালোবাসাতেই বা কি আছে? সবকিছু জানলে একটা বিশাল ঘোরের মধ্যে পড়ে যাবেন নিতান্তই বলা চলে। সেই ঘোরটা থেকে অপরাধবোধ কাজ করবে না ভালোবাসা জাগ্রত হবে তা যাচাই করার জন্যে হলেও এই ভীষণ রোদে ভিজে হলেও গল্পগুলো পড়তে হবে।
...
' তুমি একটা প্রেমের গল্প লেখার জন্য আকাশ-পাতাল ঘুরে এসেছ, মানুষ মানুষীর কাছে গিয়েছ। অথচ তুমি খোঁজই করলেনা আমার ঠোঁটে তোমার জন্য যে কতো গল্প জমা আছে। লেখক সাহেব, ভুল জায়গায় খুঁজলে কি প্রেম পাওয়া যায়?'
প্রেম বা ভালোবাসার সংজ্ঞা খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে ছুটে চলা লেখক কি আদৌ খুঁজে পেয়েছিলো ভালোবাসার গল্প? এই শহরের আনাচে-কানাচে? মায়ের কাছে? গ্রামের জীর্ণ একটা দোকানে সন্ধ্যা থেকে বসে থাকা হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের কাছে? নিখোঁজ সেই ভালোবাসার গল্পটাও কি শুনার আগ্রহ জন্মায় না?
...
দেশের সবচাইতে দুঃখী মানুষকে সম্মানিত করা হবে। সম্মানিত হবার আশায় পথে পথে ছুটে চলা আশাহীন, নিরাশ মানুষদের মধ্য থেকে তিনজন মানুষ বিচার বিবেচনায় সেরা তিনে স্থান পায়। তারপর তারা সেরা হবার লড়াইয়ে বিচারকের অপেক্ষায় বসে থাকে তাদের সম্পূর্ণ দুঃখের গল্প শোনানোর জন্য। জীবনের দৌড়ে পরাস্ত, অবহেলিত এই তিনজন মানুষই দুর্দশাগ্রস্থ, দুঃখে জর্জরিত। সবাই সবার গল্প শোনায়। বিচারক যেন সামনে বসে থেকেও শোনে না তাদের গল্প। শুনলেও যেন অনুভব করতে পারে না। বিচারককে দুঃখের গল্প শোনায় তারা তিনজন। তিনজনের দুঃখ পড়তে গিয়ে যেকোন বয়সের পাঠকেরই গলা বসে যাবে, কন্ঠ ভার হয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে উঠবে। পলক ফেললেই যেন অশ্রুগুলো ঝড়ে পড়বে। এমন সব গল্পে যখন ভীষণ মন খারাপ হয়, তখন খুব করেই এই গল্প লেখককে খুঁজতে ইচ্ছে করে।
আচ্ছা, গল্পগুলো লেখার সময়ও কি আপনার চোখে জল জমেছিলো? একেকটা চরিত্রকে কাঁদিয়ে কি নিজেও কেঁদেছিলেন?
কিছু প্রশ্নের উত্তর অজানাই রয়ে যাবে। তবে গ্রন্থটি পড়লে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আপনি ঠিকই ঘোরের মধ্যে থাকবেন। বিশ্বাস করতে মন চাইবে না যে গল্পটি শেষ, আর আগাবে না। কেননা, পড়তে পড়তে চরিত্রগুলোর ভীড়ে হারিয়ে ফেলবেন নিজেকে, কোন এক চরিত্রকে আপন করে নিয়ে ডুবে যাবেন গল্পে। তার জীবনেই বেঁচে থাকবেন। হাঁটবেন, আকাশ দেখবেন। যখন গল্প শেষ হবে?
সে আসক্তি থেকে বের হবার পথ কি লেখক বলে দিয়েছেন? দেননি...
বইয়ের নামঃ এখানে ভীষণ রোদ লেখকঃ ওয়ালিদ প্রত্যয় প্রকাশনীঃ নালন্দা
দু'কলম লেখতে জানলেই তাকে যেমন লেখক বলা যায় না৷ আবার ভালো লেখার কদর না করলেও লেখকের প্রতি করা হয় অন্যায়৷ আমি অনেক বাজে লেখা যেমন পড়েছি, তেমন ভালো লেখাও পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। এই বইটিও আমার সেই সৌভাগ্যের একটি অংশ হলো। লেখক ‘ওয়ালিদ প্রত্যয়’এর প্রথম বই এটি। তবে গল্প গুলো পড়ে মনে হয়নি তিনি তার প্রথম বই লিখেছেন। প্রতিটি গল্প যেন অতি যত্ন করে আদর করে একটু একটু করে সৃষ্টি করেছেন।
“আর্টিস্ট প্রস্টিটিউট” গল্পটি পড়ে আমি মোটামুটি বুঝতে পেরেছি লেখক কেন এতো চমৎকার লেখেন। গল্পে তিনি বলেছেন
‘একজন শিল্পীকে প্রতিনিয়ত সঙ্গম করতে হয় তার শিল্পের সাথে, তাই কখনো সেই সঙ্গম হয় নিজেরই সাথে’
আসলে কথাটা কিন্তু অতিব সত্যি। স্রষ্টা যদি নিজেই নিজেকে না বুঝে তাহলে সে সৃস্টি করবে কি? গল্পের প্রধান চরিত্রটি একজন চিত্র শিল্পী। যার আর্টিস্ট নাম আর্টিস্ট প্রস্টিটিউট। যার প্রতিটি চিত্র দেখে মনেহয় ছবিটি কথা বলছে। তার খন্ডকালীন জীবনের কিছু চিত্রই লেখক গল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন।
“সাক্ষী” অদ্ভুত অসাধারণ এক গল্প। একটি একশো টাকার নোট, যার এককোনে লেগে আছে লাল রং। সেই টাকাটাই সাক্ষী হয়ে রইলো নিন্মবিত্ত, মধ্যবিত্ত, এবং উচ্চবিত্ত কিছু মানুষের কর্মকান্ডের বা কিছু রঙিন স্বপ্নের। আমি আসলে গল্পটি পড়ার সময় চিন্তাই করিনি যে এমন কিছু হবে।
“এখানে ভীষণ রোদ” গল্পটিতে লুকিয়ে আছে এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তার স্বপ্ন। যার একটি লাইব্রেরি দোকান আছে। কিন্তু অর্থের অভাবে নতুন বই তুলতে পারছে না দোকানে। তার এক ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিংএ পড়াশোনা করছে। তাকে নিয়েই লাইব্রেরিয়ানের স্বপ্ন। ছেলের লেখাপড়ার খরচ জোগাতেই শেষ পর্যন্ত হাত দিতে হলো স্ত্রীকে যুবক বয়সে দেয়া একজোড়া কানের দুলের উপর। যা কিনা এতোদিন যকের ধনের মতো আগলে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। গল্পটির শেষ পরিণতি আপনাকে অবশ্যই বিমোহিত করবেই।
★★★
সাহিত্য আমি বুঝি না। আমি বুঝি যে লেখা পড়লে মন এবং মানষিকতার দিক পরিবর্তন হয় বা দেখার নতুন দিক উন্মুক্ত হয় সেই সবই আসলে সাহিত্য।
“ওয়ালিদ প্রত্যয়”এর লেখা “এখানে ভীষণ রোদ” বইটিকে আটটি গল্প দিয়ে সাজানো হয়েছে। বইটি প্রকাশ করেন ‘নালন্দা প্রকাশনী’। নান্দনিক প্রকাশনীর নান্দনিক বই।
বিঃদ্রঃ বইটি আমাকে Taslima Islam আপু পড়তে দিয়ে ঋণী করে রাখলেন।
ওয়ালিদ প্রত্যয়ের লেখালেখির সাথে পরিচয় হয়েছে ফেসবুকে। ওয়ালিদ প্রত্যয়ের স্পেসিফিক কোন লেখাটা পড়ে ভালো লেগেছিল আজ আর মনে নেই। তবে সেই লেখাটি পড়ে লেখককে বড় দুরন্ত পাঠক মনে হয়েছিল।আর সেই থেকে আজও তার লেখা আমি মন দিয়েই পড়ি। পড়ে মনে হয়েছি, মানুষটি দুর্দান্ত অবজারভার।
“এখানে ভীষণ রোদ” একটি ছোটগল্পের বই। যদিও ছোটগল্প আমার কাছে মনেই হয় নি। লেখকের জীবনে প্রথম বই “এখানে ভীষণ রোদ”। আমি আরও একটু বেশি প্রত্যাশা করে বইটি পড়তে শুরু করেছিলাম। কেননা আমার এক পরিচিতা লেখকের লেখা নিয়ে উচ্চমার্গের কথা আমাকে শুনিয়েছিল। যদিও আমার প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও খুব একটা নিরাশও করে নি। 'কাজোরী' গল্পটি ছাড়া আমার খুব একটা অন্য গল্পগুলো ভালো লাগে নি।
কিন্তু প্রথম বইয়ে একটু ত্রুটি বিচ্যূতি থাকতেই পারে সে হিসেবে বেশ ভালো মানের বই না হলেও পড়া যায়। পড়তে বিরক্তি লাগে না।
বড়সড় পাঠকদের এই বই পড়তে পরামর্শ দিতে চাই না।
অনেকদিন পর এমন কটুকথা লিখছি কোনো বই নিয়ে। তবে আশার বাণী হচ্ছে খুব শীঘ্রই ওয়ালিদ প্রত্যয়ের নতুন বই বের হচ্ছে এবং সম্ভবত আমি ওটা সংগ্রহ করে পড়ব কেননা “এখানে ভীষণ রোদ” এর ওয়ালিদ প্রত্যয় আর নতুন ওয়ালিদ প্রত্যয়ের লেখার মধ্যে বেশ পার্থক্য হয়েছে। লেখক আরও বেশি পরিণত হয়েছেন।
জীবন সম্পর্কে আমাদের ধারণা আর আদর্শকে প্রশ্ন করে বইটি। সকল আনন্দময় কিংবা বেদনাদায়ক ঘটনার মাঝে কোথাও একটা সৌন্দর্য্য আছে। পরমুহূর্তে আমাদের সঙ্গে কী হতে পারে তা আমরা জানি না। হোক সে ফাঁসির আসামি অথবা তরুণ শিল্পী কিংবা কোনো পতিতাপল্লীর কিশোরী মেয়ে হয়তো কোনো মধ্যবিত্ত পরিবার যাদের সংসারের টানাপোড়ন চলছে আবার হয়তো মুক্তিযুদ্ধে বলিদান হওয়া একজন - প্রতিটি জীবনের সতন্ত্র গল্প রয়েছে। জানা অজানা এসব গল্পগুলো অনুভব করা যায় যেনো বইটি পড়ে। অসাধারণ! বইটির শেষে হয়তো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিন্তায় মগ্ন হয়ে উঠবে পাঠক।
এই বইটা পড়ার এক মাস আগে সাহিত্যের কোনো বই পড়া হয়নি। একমাস বইয়ের সংস্পর্শে না থাকায় নতুন বই শুরু করার আগে একটু ভয় হচ্ছিল যে রিডার্স ব্লকে পড়ে যায় কিনা।
তবে সেরকম কিছু হয়নি। ওয়ালিদ প্রত্যয়ের এই গল্পগ্রন্থ মোটামুটি ভালো লেগেছে। সর্বমোট ৮টি গল্প আছে। গল্পগুলো যে খুব আহামরি ধরণের তা নয়। তবে পড়ে আরাম পেয়েছি। ‘সাক্ষী’ এবং ‘সবজিওয়ালার ঘামে ভেজা পালংশাক’ শিরোনামের গল্পদুটো সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। বাকিগুলো মোটামুটি।
বই একটা পড়লে তা নিয়ে দুই কলম লেখার একটা নোট করে রেখেছিলাম মনে মনে। আজকাল তীব্র ব্যস্ততায় সেই সময় হয়ে উঠছে না। তাই সংক্ষেপে সারি।
লেখকের সাথে আমার পরিচয়ের সূত্র হচ্ছে তার ফেসবুক পোস্ট। মুগ্ধ হয়েছি বলেই বই পড়ার ইচ্ছে হওয়া। তবে, যতখানি আশা নিয়ে বইটি হাতে তুলে নিয়েছিলাম, ততখানি পূরণ করতে পারেনি বইটি। দু'টো কারণ থাকতে পারে এর পেছনে। এক, লেখকের সাথে আমার পরিচয় যতদিনে হয়েছে ততদিনে বইটির বয়স এক বছরের বেশি। মানুষ যেহেতু সময়ের সাথে সাথে বেড়ে ওঠে, অবশ্যই লেখকও বিস্তৃত হয়েছেন মধ্যবর্তী সময়ে। প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির সংযোগ তাই ততটা ঘটেনি হয়ন্ত। দুই, ফেসবুকে আমি মূলত যে লেখাগুলো পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম, সেগুলো অবশ্যই মনোলগ ঘরানার- ফেসবুক পোস্ট যেমন হয়। বইটা এখানে ছোটোগল্পের। লিটারেরি ফর্ম পরিবর্তন হলে লেখার ধাঁচও পরিবর্তিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
গল্পগুলো নিয়ে আলাদা আলাদা করে বলছি না তেমন। ছোটোগল্প যেহেতু, দ্রুত পড়ে শেষ করা যায়। লেখকের দ্বিতীয় বইটিও সংগ্রহ করেছি একসাথেই। আশা করি নিরাশ হবো না।
ছোটগল্প আমার তেমন একটা পড়া হয়না। কিন্তু অনেকদিন পর প্রথম একটা ছোট গল্পের বই পড়লাম। বলা যায় প্রত্যয় ভাইয়ের লেখনি আসলেই ভালো। ছোট ছোট গল্পের মাধ্যমে বড় ধরনের অনুভূতি তৈরি করতে পারেন। অনেকগুলো গল্প নিয়ে এ বইটি তৈরি। অল্প কথায় যেভাবে ভাবগুলো ফুটিয়ে তুলেছে তা সত্যিই অসাধারণ।
বেশ ইন্টারেস্টিং লেখনি ওয়ালিদ প্রত্যয়ের! তবে "রঙিন টিভি, আয়েশা এবং রক্তশূন্যতাসমগ্র" এই গল্প তিনটা বেশি ভাল লাগলো। বাকি গল্পগুলো এভারেজ কিন্তু সুন্দর!
ওয়ালিদ প্রত্যয়ের গদ্যের প্রশংসা শুনেছি গত কয়েক বছর ধরেই। কিন্তু এতোদিন তার কোনো লেখা পড়া হয়নি। জুবায়েরকে বলার পর জুবায়ের উনার 'এখানে ভীষণ রোদ' বইটি উপহার দেয়।
গল্পসংকলনের রিভিউ লেখা কঠিন। আমি যেহেতু রিভিউ লিখতেই পারি না, তাই আমার জন্য আরও কঠিন। তবুও চেষ্টা করছি আলাদা আলাদা করে গল্পগুলো নিয়ে কিছু না বলে, তার লেখা কেমন লেগেছে সেটা বলতে।
বইটিতে মোট আটটি গল্প আছে। প্রত্যেকটি গল্পই বেশ ভালো লেগেছে। বিশেষ করে রঙিন টিভি, সাক্ষী, সবজিওয়ালার ঘামে ভেজা পালংশাক গল্প তিনটি আমার মনে গভীর দাগ কেটেছে। গল্পগুলোতে ওয়ালিদ প্রত্যয় আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোই বর্ণনা করেছেন তার স্বভাবসুলভ মুন্সিয়ানায়। গল্পগুলোতে উঠে এসেছে সামাজিক জীবনের টানাপোড়েন, প্রেম, বিষাদ, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আর হতাশার চিত্র।
এক কথায় বলতে গেলে বেশ ভালো একটা গল্পসংকন 'এখানে ভীষণ রোদ'। ওয়ালিদ প্রত্যয়ের পরবর্তী লেখাগুলো পড়ারও আগ্রহ হচ্ছে এই বইটি পড়ার পর