বাসনা বসে মন অবিরত,
ধায় দশ দিশে পাগলের মতো।
স্থির আঁখি তুমি ক্ষরণে শতত
জাগিছ শয়নে স্বপনে।
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে
রয়েছ নয়নে নয়নে,
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে
হৃদয়ে রয়েছ গোপনে।
চরনগুলো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রার্থনা কবিতার অংশবিশেষ। অনেক ছোটকালে তিনি লিখেছিলেন এই কবিতা। পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এর সামনে কবিগুরু নিজ জবানিতে পাঠ করে শোনান এই কবিতা। কালজয়ী এই কবিতার পাঠ সন্তানের কণ্ঠে শুনে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখেন কবিগুরুর পিতা। পরক্ষণেই চোখ খুলে স্মিত হেসে পুত্রের হাতে পাঁচশত টাকার একটি চেক ধরিয়ে দিয়ে তিনি বললেন,
“দেশের রাজা যদি দেশের ভাষা জানিত ও সাহিত্যের আদর বুঝিত, তবে কবিকে তো তাহারা পুরস্কার দিত। রাজার দিক হইতে যখন তাহার কোনো সম্ভাবনা নাই তখন আমাকেই সে-কাজ করিতে হইবে।”
বাংলা সাহিত্যে অতিপ্রাকৃত জনরার বরপুত্র এ সময়ের জনপ্রিয় লেখক মনোয়ারুল ইসলামের 'নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে' বইটি শেষ করে সত্যিই আজ কবিগুরুর প্রতি পিতার এই রোমাঞ্চকর স্মৃতিটা আমার মনের দুয়ারে কড়া নাড়ছে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ঘটেছে এর উল্টোটা। আমার খুব করে ইচ্ছে করছে লেখককে ডেকে নিয়ে কানে কানে বলি, 'মশাই বই লিখেন সমস্যা নেই। পাঠকের ঘুম কেড়ে নেয়ার অধিকার তো আপনাকে কেউ দেয়নি। এহেন অপরাধে (?) আপনার নামে আদালতে মামলা ঠুকে দেয়া উচিত'।
প্যাঁচাল বাদ দিয়ে এবার আসি মূল কথায়। এখানেও সমস্যা। আলোচনা শুরু করতে গিয়েও চরম বিপত্তিতে পড়ে গেলাম। কিভাবে শুরু করব, কোত্থেকে শুরু করা যায়, মাথার ভেতর ক্রমাগত কিলঘুষি মারছে এরকম নানান প্রশ্ন। একে তো বইয়ের ঘোর এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি, অপরদিকে স্পয়লারের চরম আশঙ্কার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রিভিউ লিখতে বসেছি। কেন জানি বার বারই মনে হচ্ছে, গল্পের প্লটটা আলোচনায় আনতে গেলেই বুঝি স্পয়লার হয়ে যাচ্ছে। মশাই, বড়ই বেকায়দায় ফেলে দিলেন আমাকে। আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি, স্মিতা চৌধুরানি চরমভাবে গ্রাস করে ফেলেছে আপনাকে।
তথাপি অতি সতর্কতার সাথে কিছু আলোচনা নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। আসাদের সাথে পালিয়ে যাবার প্রত্যয়ে ঘর থেকে সোনা-গয়না নিয়ে বেরিয়ে আসে সুমি। সন্ধ্যা লগনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিদ্যা ভবনের সামনে এসে সুমি মুখোমুখি হয় এক ভৌতিক পরিবেশের। দমকা উড়ে আসা কালো মেঘের আচ্ছাদনে রোদ্রোজ্জ্বল সূর্য হঠাৎ করে আড়াল হয়ে যাওয়ার মতোই এক অবর্ণনীয় মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয় সুমির মাঝে। আবছায়া অন্ধকারে মুখোমুখি সুমি আর আসাদ। সাইড ব্যাগ থেকে একটা সুইস নাইফ হাতে নেয় সুমি। নিচের দিকে থাকা বাটনে চাপ দিতেই চিক করে বেরিয়ে আসে ধারালো ফলা। এই ভর সন্ধ্যায় মাথাটা হঠাৎ ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল সুমির। ক্যাঁচ করে একটা জোরালো শব্দ হলো।
বেশ স্বাচ্ছন্দেই কেটে যাচ্ছিল সুমন-মারিয়ার দাম্পত্য জীবন। এক অজানা কারণে ব্যাংকার সুমনের সংসারে উদিত হয় এক ভয়াবহ দুর্যোগের ঘনঘটা। ওয়াশরুমের আয়নায় ধুম করে লাথি মারে সে। হঠাৎ করেই মেরুদণ্ডে চোরা হিমশীতল স্রোতে বয়ে যায় সুমনের। ভাঙা কাচের সুচালো ফালিটা হাতে নেয় সে। খচর খচর শব্দে এক নিমিষেই অন্ধকার নেমে আসে সুমন-মারিয়ার সুখের সংসারে।
এভাবেই একের পর এক খুন হয়ে যাচ্ছে কিছু মানুষ। খুনের তদন্তে নেমে এক ইস্পাত কঠিন সময়ের মুখোমুখি হন সাব-ইনস্পেকটর মুরাদ। নিজেই জড়িয়ে পড়েন কঠিন সময়ের জালে।
আপাত দৃষ্টিতে সবগুলো ঘটনাই আত্মহত্যা মনে হলেও এতে বাধ সাধে আধুনিক প্রযুক্তি। ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিপোর্ট হাতে পেয়ে চোখ দুখান বেরিয়ে আসার উপক্রম হয় ইনভেস্টিগেশন টিমের। চরম বিপত্তিতে পড়ে যায় পুরো ডিপার্টমেন্ট। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। এর ডালপালার বিস্তৃতি পেতে থাকে রাজধানী পেরিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর থেকে শুরু করে আখাউড়ার রূপনগর গ্রাম পর্যন্ত। যার বিভিন্ন দৃশ্যপটে দেখা মেলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মুখোশধারী বিভিন্ন মানুষের।
লেখক অত্যন্ত সিদ্ধহস্তে প্রত্যেকটি চরিত্রকে দিয়েছেন আলাদা স্বকীয়তা। একজন থ্রিলারপ্রেমী হিসেবে আমি শতভাগ রহস্যের স্বাদ অনুভব করেছি। বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এর গতি রোলারকেস্টার থেকেও বেশি অনুভব করেছি। এক মলাটে এতো থ্রিল নিয়ে খুব কম সংখ্যক বই-ই আমি পড়েছি।
রহস্য, রোমাঞ্চ, হিংসা, লোভ, ক্ষোভ, ঘৃণা আর ভালোবাসার মিশেলে সৃষ্ট 'নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে' আমার পড়া বেস্ট বইয়ের তালিকায় জায়গা করে নিলো। কিছু দৃশ্যপটে লেখক রেখেছেন পাঠকের ভাবনার ক্ষেত্রে নিজস্ব স্বাধীনতা। পাঠক এগুলো নিজের মতো করে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাবেন। এই বিষয়টা আমাকে দারুণভাবে বিমোহিত করেছে। কিছু অবৈজ্ঞানিক বিষয় বইটিতে স্থান পেয়েছে, লেখক যা মুখবন্ধে নিজেই নিরুৎসাহিত করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বিষয়গুলো অবৈজ্ঞানিক হলেও পড়তে গিয়ে পাঠক চরম রহস্য অনুভব করবেন। দৃশ্যপটের সাথে লেখার চমৎকার বর্ণনাশৈলীর কারণে এসব অবৈজ্ঞানিক বিষয়গুলোও বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে আমার কাছে। আর এখানেই বোধহয় লুকিয়ে আছে অতিপ্রাকৃত জনরার রহস্য।
আগে নিয়মিত রিভিউ লিখতাম। বই পড়া শেষ করেই রিভিউ লেখার জন্য মনপ্রাণ উতলা হয়ে উঠতো। নানাবিধ কারণে অনেকদিন রিভিউ লিখি না। মনে হচ্ছে যেন ভুলে গেছি সব। কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছি রিভিউ লেখার প্যাটার্ন। যাই হোক, আজকে মূলত রিভিউ লিখি নাই। বইটি পড়া শেষে মনের অভিব্যক্তিটুকু অগোছালোভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। সবশেষে যা বলে আজকের বকবকের ইতি টানতে চাই তা হলো, সত্যিকার অর্থেই দুর্দান্ত একটি বই পড়েছি অনেকদিন পর। নালন্দা থেকে প্রকাশিত মোন্তাফিজ কারিগরের করা চমৎকার প্রচ্ছদে প্রকাশিত বইটির বাইন্ডিং থেকে শুরু করে প্রিন্টিং এবং কাগজের মানও ছিল অতি চমৎকার। বইটির আরেকটি বিশেষ দিক হলো পুরো বইটিতে, একটি মাত্র ভুল বানান আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ঝরঝরে লেখা আর ছোট ছোট বাক্যগঠনে পুরো বইটি ছিল পাঠরস আস্বাদনের এক ইনটেনসিভ রস ইউনিট।
মশাই, চালিয়ে যান। কলম চলুক অামৃত্যু। অনেক অনেক শুভকামনা জানবেন। এবার বাঁশি বাজানোর পালা। হ্যাপি রিডিং প্রিয় পাঠক।
বইঃ নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে
লেখকঃ মনোয়ারুল ইসলাম
প্রকাশনীঃ নালন্দা
প্রচ্ছদঃ মোস্তাফিজ কারিগর
পৃষ্টা সংখ্যাঃ ১৪৮
মুদ্রিত মূল্যঃ ৩০০ টাকা।