এক বসায় শেষ করে ফেলার মতো বই। কিন্তু আমি শেষ করেছি দুই বসায়। না, ধরে নেবেন না বইটি আমাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। আসলে সাচিকোর জীবনের গল্পে আমি এতটাই বুঁদ হয়ে গিয়েছিলাম যে ওর ভাইবোনদের মৃত্যুগুলো আর নিতে পারছিলাম না। নাগাসাকির বুকের ভেতর পারমাণবিক বোমা ফেলবার পর জাপানের তদসংশ্লিষ্ট অধিবাসীদের মানবেতর জীবনযাপন, সাচিকোর অন্তরাত্মার ক্রন্দন আর যুদ্ধের বিভীষিকায় রীতিমতো টালমাটাল হয়ে গিয়েছিলাম। আজ এখানে, কাল সেখানে- এভাবেই সাচিকোরা ছুটে চলেছিল জীবন রক্ষার তাগিদে। স্কুলে বন্ধুদের কৌতূক, এগিয়ে যেতে না পারার বেদনা ইত্যাদিকে ছাপিয়ে সাচিকো উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে আপন মহিমায়। সাহায্যে থাকে তার মা। আর সাচিকোর জীবনের আদর্শের প্রতিমা হয়ে আসে মহাত্মা গান্ধী, হেলেন কেলার, মার্টিন লুথার কিং-এর মতো আলোকবর্তিকারা। যুদ্ধ আছে, বিভীষিকা আছে, মানবেতর জীবনের কাহিনী আছে। সবকিছুই আছে। তারচেয়েও বড় হয়ে উঠেছে সাচিকোর জীবনের গল্প। আর এই জীবনের গল্পগুলোই চমৎকারভাবে কারেন স্টেলসন তুলে এনেছেন 'সাচিকো - অ্যা নাগাসাকি বম্ব সারভাইভার্স স্টোরি' নামক বইটিতে। কারেনের চোখে চোখ রেখে অকপটে সাচিকো চোখে চোখ রেখে বিভীষিকাময় দিনের গল্পগুলো তুলে এনেছেন, তুলে এনেছেন তার কষ্টের দিন শেষে ফিরে আসবার গল্প। শারীরিক কষ্টকে জয় করে সাচিকো একজন সারভাইভার, মানসিক জীর্ণতাকে জয় করে সাচিকো একজন সারভাইভার। জীবনের গল্প যে বানানো ফাঁদা গল্পকেও হার মানায়, সাচিকো তার প্রমাণ। বইটা পড়া শেষ করে সাচিকো যেমন ইশিরোর উদ্দেশ্যে আকাশপানে চেয়ে বলেছিলেন ভাই আমি পেরেছি, তেমন আমারও বলতে ইচ্ছে করছিল, "হ্যা সাচিকো, আপনি পেরেছেন!"
অনুবাদ চমৎকার, সাবলীল। একটানে পড়ে ফেলার মতো। আমার কাছে প্রচ্ছদটা অসাধারণ লেগেছে। প্রচ্ছদশিল্পীকে হ্যাটস অফ। আর অনুবাদকের মুনশিয়ানা যদ্দূর জানি এই জনরাতে প্রবল। তাই নিজের সেরাটাই তিনি দিয়েছেন। প্রথমদিকে পড়তে কিছুটা খটমটে লাগছিল, তবে তা মাত্র দু-তিন পাতা। এরপর চমৎকারভাবে অনুবাদ এগিয়েছে। ছবির সংযোজনগুলো বইটিকে একটি ভিন্নমাত্রা দান করেছে, তবে কিছু কিছু ছবি বোঝাটা বেশ কষ্টসাধ্য। বিশেষ করে পোস্টারগুলোর ভেতরে কী টেক্সট লেখা ছিল, তা বুঝতে একটু সমস্যা হয়েছে। বই পড়ায় অবশ্য তা কোনো ব্যাঘাত ঘটায়নি। সিরিজটি অব্যাহত থাকুক। আগামী বইগুলোও পড়ে ফেলব বলে আশা রাখি।