বড়দের জগতে অনেক কিছুই ঘটে। বড়রা হয়তো চিন্তা করে, ছোটরা এসবের কিছুই বোঝে না। কিন্তু বুঝুক বা না বুঝুক, সেসব তাদের ঠিকই স্পর্শ করে। খারাপ ঘটনা হলে কষ্ট তাদেরও পেতে হয়, যন্ত্রণায় তাদেরও ভুগতে হয়। তারাও তখন তাদের মতো করে কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে চায়, বাঁচতে চায় যন্ত্রণার হাত থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি পেরেছিল অশেষ, অরিত্র, তৃণা, দীপিকারা বড়দের জগতের সেইসব ঝড়ঝাপটা থেকে বাঁচতে? এটি সেরকমই এক গল্প—যেখানে চারপাশের নানা অন্যায়-অপরাধের মধ্যেও কিশোর-কিশোরীরা চাইছে ভালো থাকতে। চাইছে অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করতে। এটি তাদেরই গল্প—যারা জ্বালিয়ে রেখেছে সেই উজ্জ্বল আদর্শের আলো, যা একদিন জ্বালিয়েছিলেন প্রতিবাদী শিক্ষক শহিদ ড. শামসুজ্জোহা। যার উত্তরাধিকার মিছিল মাহমুদ।
ইমতিয়ার শামীমের জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। আজকের কাগজে সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু নব্বই দশকের গোড়াতে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ডানাকাটা হিমের ভেতর’ (১৯৯৬)-এর পান্ডুলিপি পড়ে আহমদ ছফা দৈনিক বাংলাবাজারে তাঁর নিয়মিত কলামে লিখেছিলেন, ‘একদম আলাদা, নতুন। আমাদের মতো বুড়োহাবড়া লেখকদের মধ্যে যা কস্মিনকালেও ছিল না।’
ইমতিয়ার শামীম ‘শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে’ গল্পগ্রন্থের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার (২০১৪), সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সকল প্রধান সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।
উপন্যাসটি পড়তে পড়তে মনে পরে গেলো ছোটবেলার জাফর ইকবাল এর লেখা কিশোর উপন্যাস গুলোর কথা।যেখানে থাকতো স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চা গুলোর রাজাকার কে শাস্তি দেয়ার, কিংবা কুখ্যাত কোনো সন্ত্রাসী বা ডাকাত বাহিনী কে কুপোকাত করার কাহিনী। "সুখেদুখে বৃষ্টিনদী" উপন্যাস টিও অনেকটা সেইরকমই কিন্তু তফাত হচ্ছে ছোটবেলায় পড়া উপন্যাস গুলোর শেষ হতো রূপকথার মত সুন্দর আর এই উপন্যাসের শেষ টা হচ্ছে একদম বাস্তবভিত্তিক। আমাদের সমাজে ঠিক যেভাবে ঘটনা এগোয়,এধরণের ঘটনার প্রেক্ষিতে শেষ টা বাস্তবে যেভাবে হয় ঠিক সেভাবেই উপন্যাস টি শেষ হয়েছে। নোংরা রাজনীতি আর ধর্মান্ধতা কীভাবে আমাদের গ্রাস করে ফেলছে সেই চিত্রই আমরা দেখি উপন্যাসটি তে।তারপরেও অরিত্র,অশেষ,তৃণা কীংবা মিছিল মাহমুদের মতন মানুষ দের উপর বিশ্বাস রেখে আমরা এখনো আশায় বুক বাঁধি, সুন্দর এক সমাজের স্বপ্ন দেখি।
আগেও বলেছি ইমতিয়ার শামীমের লেখনী চমৎকার, শব্দচয়ন,বর্ণনারীতি সব এত সুন্দর।চরিত্র আর গ্রামগুলোর নামকরণ মুগ্ধ করার মতন। উপন্যাস টি যেমন কিশোরদের জন্য অবশ্যপাঠ্য ঠিক তেমনি বড়দের জন্যেও সুখপাঠ্য হবে। মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে বর্তমান সময়েও আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করে, কীভাবে আমাদের মনে ন্যায় অন্যায়, মানবিকতা ভাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে তা অনুভব করার জন্যেও হলেও উপন্যাস টি পড়া উচিত।
অনেক বছর পরে কোনো কিশোর উপন্যাস পড়ে মন টা ভরে গেলো।
ইমতিয়ার শামীমের কিশোর উপন্যাস যদিও এর বিষয়বস্তু বেশ ডার্ক এবং ভায়োলেন্ট। ধর্মান্ধ মানুষদের সহিংস রাজনীতির বিরুদ্ধে কিশোর-কিশোরীদের রুখে দাড়াবার গল্প। কাহিনী বিন্যাসে জাফর ইকবালের ছাপ আছে। ইমতিয়ার শামীমের নিজস্ব গদ্যশৈলী এই বইতে অনুপস্থিত যদিও গ্রামগুলোর নাম ভীষণ কাব্যিক এবং সুন্দর।যেমন - বৃষ্টিনদী, যোজনগাঁতী, ইকড়িমিকড়ি! গল্পের এন্ডিং বলে যে সবসময় হ্যাপি এন্ডিং হয়না। ভালো-মন্দের দ্বৈরথ আবহমানকাল ধরে চলে আসছে এবং চলবে। সবমিলিয়ে ভালো লাগার মতোই তবে আমার ক্যান যেন বিশেষ ভালো লাগেনি।
সুখেদুখে বৃষ্টিনদী ইমতিয়ার শামীম আমার প্রিয় লেখকদের একজন। লেখকের লেখনী,শব্দচয়ন, বিষয় সবকিছুই আলাদা করে নজর কাড়ে।তার বর্ণনাতে বাস্তবতার এতো ছোঁয়া থাকে যে মাঝেমধ্যে ভুলে যায় ফিকশন পড়ছি।এই বইও তাই। বাস্তবতার অ-আ-ক-খ এর হাতেখড়ি দেয় এমন বই কম চোখে পড়ে, তাও কিশোর উপন্যাসে বলতে গেলে দেখা যায়-ই না। এই বইয়ে শব্দের সাহায্যে লেখক রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা আর ক্ষমতার দৌরত্ব সবকিছুরই পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এই বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর হলো এর শেষটা। না,they lived happily ever after-এমন মোটেও না। শেষ হয়েও হলো না শেষ,শেষটা এমনই। এতো সুন্দর, বিষন্ন সুন্দর শেষ আর হয়না।
পড়ার পর মনে এসেছিলো অনেকে কিশোর উপন্যাস হিসেবে একটু বেশিই রূঢ় হলো না কী এটা? হয়তো। আর ড্রামাটিক যে নয়,তাও না।কিন্তু তবু চরিত্রগুলোকে যেভাবে দৃঢ়ভাবে তৈরি করেছেন লেখক, পাঠক দু'একটা জিনিস শিখে নেবেই,আর ছোটরা পড়লে রূঢ় বাস্তবতার এক দুটা উদাহরণ বাস্তবে দেখার আগে বইয়েই পড়ে নেবে। লেখক একদিকে সমাজের রঙিন চশমা খোলা রূপ যেমন দেখান,অন্য দিয়ে নতুন আলো দেখাতেও ভুলেননি,তারুণ্যের আলো। এদিক থেকে লেখক সার্থক। বাই দ্য ওয়ে, বৃষ্টিনদী নামটা সুন্দর না?
অনেক দিন পর এত দারুণ একটি কিশোর উপন্যাস পড়লাম। ভাষাশৈলী কিংবা লেখার ধরণে ঠিক ইমতিয়ার শামীম ইমতিয়ার শামীম মনে না হলেও, তাতে করে ভালো লাগা একটুও কমেনি।
যেসব ছোটদের গল্প/উপন্যাস আমি পড়েছি,তার নব্বই পার্সেন্ট বইয়ের প্লট ছিল "ছেলে ভোলানো"। মানে সম্পূর্ণ কাল্পনিক। শিশুদের জন্য এসব উপকারী, তা আমিও জানি। কিন্তু তাদের ও একটু বাস্তব জ্ঞান দেয়া উচিত। সেই বোধটা লেখক " ইমতিয়ার শামীমের" ছিল। তাই তিনি এমন নির্জলা সত্য কে তার কিশোর উপন্যাসের প্লট হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
আমার বেশ ভালো লেগেছে গল্পটা। এই ভালো লাগার পিছনে অন্যতম কারণ উপন্যাসের অসাধারণ প্লট আর ইমতিয়ার সাহেবের মোহময় লেখনী। কিন্তু যে জিনিস খারাপ লেগেছে,তা হল এই বই নিয়ে গুডরিডসে কেউ তেমন একটা ভালো রিভিউ দেয়নি,ভালো রেটিং দেয় নি। অনেককেই দেখলাম দুই তারা দিয়েছেন। এমন একটা বই কে দুই তারা মানায় না( ব্যক্তিগত মতামত)।
শুরুর সময়ে মনেই হয়নি এমন হবে উপন্যাসটি। গল্পটি একটি সুন্দর গ্রামকে ঘিরে,নাম তার বৃষ্টিনদী। পড়ার সময় বারবার খুব আশা করছিলাম যাতে একটা ট্র্যাজিক এন্ডিং না হয়। একটা অংশে গিয়ে বুকের ধুকপুক শব্দ যেন পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি এমন লাগছিলো, এতো উত্তেজিত হয়ে গেছিলাম। একটা উপন্যাস পড়ে এরকম অনুভূতি এই প্রথম। উপন্যাসটি ভালো লাগতে শুরু করে অরিত্রের পরিবারের ভিতর যখন সংবিধান এর উপর ভিত্তি করে দেশ পরিচালনার আলোচনা থেকে। হাসিখুশি ও শান্তিপ্রিয় বৃষ্টিনদী গ্রামের নিরীহ মানুষদের উপর হঠাৎ আক্রমণ করে একদল মানুষ,জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় ছবির মতো সুন্দর গ্রামটিকে কারণ ছিল তারা ভোট দিতে চেয়েছিলো ইচ্ছামতো। তাই ভোটে নির্বাচিত (ভোট বললে ভুল ই হবে,ভোটকেন্দ্র দখল করে জেতা) হবার পর নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধির লোক ই আক্রমণ করে গ্রামটিতে। রেহাই দেয়না এক অসহায় বৃদ্ধাকেও। বেশিরভাগ মানুষ যখন কাজে চলে গেছে তখন ই আক্রমণ করে গ্রামে থাকা গুটিকয়েক মানুষের উপর। এরপর গ্রাম থেকে একটু দূরে বোধিবৃক্ষ উচ্চ বিদ্যালয়ে যায় দুর্বৃত্তরা,বৃষ্টিনদীর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ধরতে চায় তারা।
"খুব আনন্দ লাগছে কোরবানের। না,আনন্দ না- এটা হলো 'এক্সাইটিং লাগা'। নতুন এমপি গতকালকেই বলেছে তাকে,দেখিস,বেশি এক্সাইট হবি না। ঠান্ডা মাথায় কাজ করবি। কিন্তু সবসময় কি মাথা আর ঠান্ডা রাখা যায়? বৃষ্টিনদী গাঁয়ে কয়েকটা লাশ পড়ে গেছে। কয়টা যে,তা গুনেও দেখেনি তারা।"
স্কুলে ঢোকার সময়ের এই অংশটুকু দেখে পরবর্তীতে কি হবে তা নিয়ে বেশ শঙ্কিত হয়ে যাচ্ছিলাম এবং আশা করছিলাম যাতে খারাপ কিছু নাহয়। শেষ পর্যন্ত স্কুলের কোনো শিক্ষার্থীর জীবন যায়নি। কিন্তু উপন্যাসের একদম শেষে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু প্রধান শিক্ষককে চলে যেতে হয় স্কুল ছেড়ে।
উপন্যাস পড়া শেষে যেন আমাদের দেশের বাস্তব প্রেক্ষাপটের সাথে মিল দেখে একদিকে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিলো,তেমনি হচ্ছিলো ঘৃণাও। বারবার মনে হচ্ছিলো কবে বদলাবে এই পরিস্থিতি? আসলেই কি বদলাবে?
This entire review has been hidden because of spoilers.
বইটা মূলত কিনেছি আমার ছাত্রীর জন্য৷ তবে তার হাতে দেয়ার আগে নিজে পড়ার দায়িত্বটা পালন করলাম :'3 বাস্তববাদী লেখার জন্য ইমতিয়ার শামীম পছন্দের লেখকের তালিকায় অনেক উপরে৷ এটা আমার পড়া তার লেখা প্রথম কিশোর উপন্যাস। বইয়ের শুরুতেই একদল লোককে দেখা যায় বৃষ্টিনদী গ্রামে বর্বর হামলা চালাতে৷ আগুন, রামদা, খুন, ধর্ষণ এবং এসবের প্রত্যক্ষদর্শী অরিত্র এবং শ্যামলকে৷ পরবর্তীতে দেখা যায় বোধিবৃক্ষ স্কুলের অসাধারণ প্রধান শিক্ষক মিছিল মাহমুদ এবং তার স্কুলের অসাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের "heroic deeds"। এ পর্বকে অন্যান্য কিশোর উপন্যাসের মতোই ড্রামাটিক মনে হয়েছে আমার৷ বইয়ে আছে সাম্প্রদায়িকতা, রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থার বেশ বাস্তব চিত্র আর আছে একদল মানুষের সেসবকে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা। সবচেয়ে নজর কেড়েছে যা, তা হলো বইয়ের এন্ডিং৷ একটা বাস্তব এন্ডিং। একটা ঝড় চলে গেছে সবার উপর দিয়ে কিন্তু সেই ঝড় ঠিক থামেনি, পরবর্তী ঝড়ের আভাস থেকে গেছে এবং সবাই জানে তাদের প্রস্তুতি নিতে হবে৷ আমার মনে হয় কিশোর বয়স থেকেই লেখার মধ্যে সবাইকে বাস্তবতার সাথে ধীরে ধীরে পরিচয় করিয়ে দেয়াটা একটা কর্তব্য। সব গল্পের শেষ সুখকর হয় না এই ধারণার সাথে মানিয়ে নেয়া জরুরি।