বদরুদ্দীন উমর তার আত্মজীবনীর খণ্ডে ১৯৫০ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত সময়কে লিপিবদ্ধ করেছেন। ২শ' ৮৭ পৃষ্ঠার এই বইতে জাতীয় রাজনীতির অনেক ঘটনার পাশাপাশি ব্যক্তি জীবনের দুঃখ-সুখের স্মৃতি অমলিন হয়ে আছে।
বদরুদ্দীন উমরের পিতা আবুল হাশিম বর্ধমান ছেড়ে আসতে চাননি। কিন্তু সাম্প্রদায়িক হামলার কারণে বাধ্য হয়ে সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন ১৯৫০ সালে। তখন বদরুদ্দীন উমর এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন। রিফিউজি পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকায় এসে পরীক্ষা দিলেন। নিজের পারিবারিক জীবন ছাড়াও পঞ্চাশের দশকের ঢাকার একটি চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায়। তাতে নিখুঁত ডিটেইল ঢাকা নিয়ে আগ্রহী পাঠকের জন্য বোনাস।
প্রচলিত অর্থে মেধাবী বলতে যা বোঝায় তা কস্মিনকালেও ছিলেন না বদরুদ্দীন উমর। এইচএসসিতে সেকেন্ড ডিভিশন পেয়ে পাশ করেন। ফলাফল ভালো ছিল না। তাই ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার হওয়া দূরে থাকুক সায়েন্সের কোনো বিষয়ে পড়বার উচ্চাশা কিংবা আগ্রহ কোনোটাই তার হয়নি। তখনও ভর্তি পরীক্ষা চল ছিল না। মোটামুটি পাশ করলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া যেতো। দর্শন বিভাগে ভর্তি হলেন।
১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ এই পাঁচবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন উমর। এ সময়টা জাতীয় রাজনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। ভাষা আন্দোলন এবং '৫৪ সালের নির্বাচনের মতো ঐতিহাসিক ঘটনা তখনই ঘটে।
'৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পুরো সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে কাটে বদরুদ্দীন উমরের। কোনো সংগঠনের কর্মী হিসেবে নয়। বরং একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর দৃষ্টিতে সেই উত্তাল সময়ের বিস্তারিত ঘটনা পড়বার সুযোগ পাঠক পাবেন। তাতে কিছু অবাক হওয়ার মতো তথ্য পাবেন যা আপনাকে হয়তোবা ভাষা আন্দোলন নিয়ে গতানুগতিক চিন্তার বাইরে ভাবতে সাহায্য করবে।
পিতা আবুল হাশিম ১৯৪৫ সালের পরই দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছিলেন। ঢাকায় যখন আসেন তখন তিনি একেবারেই দেখতে পাননা। পরিবারে অভাব ছিল। কিন্তু সেই দারিদ্রতার কথা প্রত্যক্ষভাবে নেই, পরোক্ষভাবে প্রবল।
যারা একসময় আবুল হাশিমের রাজনৈতিক শিষ্য কিংবা সহকর্মী ছিল, তারা অনেকেই অন্ধ আবুল হাশিমকে বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। এমনকি যুক্তফ্রন্ট থেকে মনোনয়ন পর্যন্ত জোটেনি আবুল হাশিমের। খেলাফত রাব্বানী নামে একটি দল খাড়া করবার চেষ্টা করেছিলেন। ব্যর্থ হন। '৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জনপ্রিয়তার তোড়ে ভেসে যান। পান মাত্র ৩শ' ৪৫ ভোট!
যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং ফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কিছু ঘটনা আছে। যা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত দলীয় কোন্দল নিয়ে।
পাশ করে যোগ দেন সদ্যপ্রতিষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। দর্শন বিভাগে। পুরো বই জুড়েই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ঘটন-অঘটনের স্মৃতি আছে। আছে খ্যাতিমান অধ্যাপকদের ঘিরে অম্ল-মধুর কথকথা।
ষাটের দশকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। পুরো আত্মকথার বড় একটি অংশ দখল করেছে লেখকের অক্সফোর্ডে অধ্যায়নের অমলিন স্মৃতি। এই বইয়ের চৌম্বকীয় অংশগুলোর মধ্যে নিঃসন্দেহে অক্সফোর্ড পড়ার অভিজ্ঞতা থাকবে। যারা এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ছেন, তারা ষাটের দশকের অক্সফোর্ডের পড়াশোনা ধরন এবং কালচার নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের বর্ণনা পড়ে আফসোসের পারদ বাড়াতে পারেন। একইসাথে বুঝতে পারবেন বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আসলে কী বোঝায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমন হওয়া উচিত।
আইয়ুবের আমলে দেশে ফিরলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নিলেন। জড়িয়ে পড়লেন শিক্ষক নির্বাচন প্রভৃতি বিষয়ের সাথে। এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির কলুষিত অধ্যায়ের সামনে পড়েন বদরুদ্দীন উমর। ছোট-বড় অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতাই হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করতে গিয়ে।
ষাট সালের পর জাতীয় রাজনীতিকে কেন যেন এড়িয়ে চলতে চেয়েছেন লেখক। নিজের ব্যক্তিজীবন, চাকরি জীবনই মুখ্য হয়ে উঠেছিল। তাতে আমি খানিকটা হতাশ।
শেখ মুজিবকে নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের স্ট্যান্ড 'ব্যক্তিগত' পর্যায় থেকে করা। তাই তাঁর ভূমিকাকে অন্যভাবে দেখাবার প্রবণতা লক্ষণীয়।
লেখালেখির কারণে সরকারের বিরাগভাজন হলেন। মতাদর্শের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কট্টরপন্থী শিক্ষকের শত্রু বানালেন। চললো ব্যক্তিগত হেনস্তা। মোনায়েম খাঁ রাজশাহীর ভিসিকে ঢাকায় ডেকে বললেন উমরকে বরখাস্ত করতে। ভিসি স্রেফ লেখালেখির জন্য একজন শিক্ষককে বরখাস্ত করতে অস্বীকৃতি জানালে ক্ষুব্ধ হন মোনায়েম খাঁ। উমর আর সহ্য করতে পারছিলেন না। শেষে নিজেই ইস্তফা দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে। ভিসি তার পদত্যাগপত্র হাতে পেয়ে বলেছিলেন,
" দেখুন আপনার মতো একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরী থেকে ইস্তফা দিলে ভদ্রতার খাতিরেও আপনাকে তা প্রত্যাহার করতে বলা উচিৎ। কিন্তু দেশের এমনি অবস্থা যে সেই ভদ্রতাটুকু আমি আপনার সাথে করতে পারছি না। "
প্রভিডেন্ট ফান্ডের কিছু টাকা ছাড়া কোনো সঞ্চয় নেই। কী করবেন তা ঠিক নেই। বদরুদ্দীন উমর যেন যাত্রা করলেন অজানার পথে।
তার অন্ধ পিতা আবুল হাশিম জ্যেষ্ঠপুত্রের এই কান্ডে খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। তার পিতার অনুভূতি পড়তে গিয়ে নিজেরই মন খারাপ লাগছিল। তিনি পুত্রকে বললেন,
" আমার কোন সম্পত্তি নেই, সঞ্চয় নেই, চোখে দেখি না। আমি ভেবেছিলাম, শেষ জীবনে তোমার কাছেই থাকবো। কিন্তু তুমি তো সে পথ বন্ধ করে দিলে। "
২০০৭ সালে লিখেছেন এই আত্মজীবনী। আমার মনে হয়েছে চাকরি ছেড়ে দেওয়া নিয়ে তিনি এক ধরনের অনুশোচনায় ভোগেন।
অধ্যাপক অাবদুর রাজ্জাক, মুনীর চৌধুরী, হাবিবুর রহমানের মতো ব্যক্তিত্ব বারবার এসেছে বদরুদ্দীন উমরের আত্মকথায়।
বদরুদ্দীন উমর বড় তাত্ত্বিক হতে পারেন। কিন্তু তার লেখার হাত ভালো না। অন্তত নিজের আত্মকথায় তার সদ্ব্যবহার করতে পারেননি। একঘেয়ে তার বলার ভঙ্গি। একটানা মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। আবার আত্মসমালোচনার জায়গাটি নেই বললেই চলে। অভাব আত্মবিশ্লেষণের।
তবু বলব পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সামাজিক ইতিহাসের পাশাপাশি একজন কাল এবং যুগ সচেতন ব্যক্তির ছায়া পাওয়া যায় বদরুদ্দীন উমরের আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খন্ডে।