গোয়েন্দা কাহিনী পড়তে ভালবাসেন অনেকেই। সাহিত্যের এই বিশেষ শাখাটি দেশে ও বিদেশে পুষ্ট হয়েছে অনেক কাল ধরে, তার রকমফেরও কিছু কম নয়। এই বই সেই সব গোয়েন্দা কাহিনী এবং বিশেষ করে গোয়েন্দাদের বিস্তৃত ভাবে ছুঁয়ে গিয়েছে বললে কমই বলা হবে। অতি পরিচিত শার্লক হোমস, মঁসিয়ে দুপ্যাঁ, এরকুল পোয়ারো, মিস মার্পল, জুল মেইগ্রের পাশাপাশি তুলনায় স্বল্প পরিচিত বিদেশি গোয়েন্দাদের ঠিকুজি-কোষ্ঠী ঘেঁটে প্রায় আর এক গোয়েন্দার মতো তাদের তুলে এনেছেন প্রসেনজিৎ। পাশাপাশি বাংলায় লেখা গোয়েন্দা কাহিনী গোয়েন্দা কিরীটি রায়, জয়ন্ত, ব্যোমকেশ বক্সী, প্রসন্নকুমার বাসু, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার, ফেলুদার অবিরল উপস্থিতি এই লেখায়। স্বপনকুমারের দীপক-রতন থেকে হাল আমলের কোনও ডিটেকটিভ বাদ যাননি। কোন নিয়মে লেখা উচিত গোয়েন্দা গল্প, কোনটাকে বলা হবে সঠিক গোয়েন্দা কাহিনী, কোথায় কোথায় তার বিচ্যুতি ঘটেছে, কোথায় বা তা পরিপূর্ণ, তার অনুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করেছেন লেখক। গোয়েন্দাদের বহু বিচিত্র স্বভাব, তাদের রহস্য সমাধানের পদ্ধতি, এমনকী তাদের ব্যক্তিগত জীবনেও উঁকি মেরেছেন তিনি। তবে এই বইকে নিছক গোয়েন্দা কাহিনী সাজানো তালিকা ভাবলে ভুল হবে। সাহিত্যের গোয়েন্দারা যখন পাঠকের কাছে রক্তমাংসের মানুষ হয়ে ওঠেন তখন তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষিতও। অপরাধ ও অপরাধী তো আমাদের চারপাশ থেকেই তৈরি হয়। এই বিষয়টিও অতি চমৎকার উপস্থিত করেছেন প্রসেনজিৎ। সুকুমার সেনের 'ক্রাইম কাহিনির কালক্রান্তি'-র পর বাংলা ভাষায় এ রকম একটি মনস্ক কাজের যে প্রয়োজন ছিল তা পাঠক আবিষ্কার করবেন।
কেমন হয়, যদি উপলব্ধি করতে পারেন, বিখ্যাত অনেক বাংলা গোয়েন্দা রচনাই আসলে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন গোয়েন্দা-সাহিত্যের 'বঙ্গীকরণ' (ইয়ে মানে, মেরে দেয়া আরকি), তা সে ঘোষিত হোক বা অঘোষিতভাবেই হোক? কেমন হয়, যদি আপনি ধরতে পারেন, একটি পারফেক্ট 'লকড-রুম মিস্ট্রি' আসলে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের বাঁধনে বাঁধা, যার কোনটি ব্যাহত হলে পুরো রহস্যটাই একেবারে ঘেঁটে যায়? কেমন হয়, যদি আপনি অনুধাবন করতে পারেন, ক্রাইম কাহিনীর অনেক 'মাস্ট-হ্যাভ' কে অগ্রাহ্য করেও চমৎকার সব গোয়েন্দা কাহিনী লেখা যায়? কেমন হয়, যদি জানতে পারেন, ফেলুদা-বোম্যকেশ আর শবর ছাড়াও বাংলার অলি-গলি-ঘুঁপচিতে ঘোরাঘুরি করতো আরও বহু গোয়েন্দা, যদিও বিশ্বসাহিত্যের তুলনায় তার সংখ্যা নগন্যই? কেমন হয়, যদি তাবৎ বাঘা বাঘা গোয়েন্দার খোঁজ পেয়ে যান দুই মলাটের মাঝে?, কেমন হয়, যদি গ্রন্থপঞ্জি আর লেখকপঞ্জি-তে পেয়ে যান ভবিষ্য-পাঠ্য অনেকগুলো মনে খোরাক? . . এ বইটা তেমনই।
আগেই একটা কথা স্বীকার করি। বইটা আমি ২০১২-তে প্রথম প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই পড়ে ফেলেছিলাম। রিভিউ দেওয়ার কথা খেয়াল হল আজ, যেহেতু বইটির নবকলেবর (আত্মজা থেকে প্রকাশিত 'রহস্যগল্পের নায়কেরা') পড়ার জন্য হাতে উঠল। এই বইটি অসামান্য। এটি রচিত হওয়ার আগে অবধি বাংলায় একমাত্র সুকুমার সেন রচিত 'ক্রাইম কাহিনির কালক্রান্তি' ছাড়া এমন একটিও বই ছিল না যা রহস্য বা গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাসের পটভূমি, পরিপ্রেক্ষিত ও উপাদানকে সযত্নে বিশ্লেষণ করে। সেই কাজটি করার জন্য লেখক যে-সব অধ্যায়ে বইটিকে ভেঙেছিলেন তাদের পরিচয় দিলে হয়তো বইটির আরও ভালো পরিচয় পেতেন। কিন্তু এই বইটা এখন পাবেন না, কারণ এটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নতুনতর বইটির বিস্তৃততর রিভিউয়ের জন্য... তিষ্ঠ ক্ষণকাল।