আমার মত যারা ফটোগ্রাফির প্রতি তীব্র আকর্ষন অনুভব করেন তাদের জন্য দারুণ একটা সহায়ক হবে প্রীত রেজার এই বইটা। শখে বা প্রয়োজনে, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় আমাদের প্রতিনিয়ত ছবি তুলতে হয়, আর এর বেশির ভাগ ছবি আমরা তুলি আমাদের স্মার্টফোন দিয়ে, স্মার্টফোন দিয়ে কিভাবে আরও সুন্দর এবং প্রফেশনাল ছবি তোলা যায় সেই সকল কলা-কৌশল নিয়ে এই বইয়ে অলোচনা করা হয়েছে।
"একটা ভালো রান্নার পেছনে চুলার যে ভূমিকা, একটা ভালো উপন্যাসের পেছনে কলমের যে ভূমিকা, একটা ভালো গানের পিছনে গিটারের যে ভূমিকা, ঠিক একই ভাবে একটা ভালো ছবির পেছনে ক্যামেরার ভূমিকাও তাই"
বইটার শুরুতেই এই লেখাটা আমার হৃদয় ছুয়ে গেছে আর এই কথাটার মর্ম সম্পূর্ণ বুঝতে পেরেছি বইটা শেষ করার পর। বইটাতে স্মার্ট ফোন ফটোগ্রাফি নিয়ে বেশ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
অ্যাপারচার, ডেপথ অফ ফিল্ড, শাটার স্পিড, গতি নিয়ন্ত্রণ, নয়েজ, ফোকাস, রুলস অব থার্ড, এডিটিং সহ ছোট করে ছবি সহ সর্বমোট ৯৫ টি বিষয়ে এই বইয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও মোবাইল দিয়ে ভালো ফটোগ্রাফি করার জন্য আনুষাঙ্গিক কি কি প্রয়োজন সেই সকল বিষয় এবং এর ব্যবহার নিয়ে রয়েছে বিস্তর আলোচনা।
তবে আরও একটু বিস্তারিত থাকলে বইটা পূর্ণতা পেত। সব মিলিয়ে খারাপ না।
ফটোগ্রাফি নিয়ে আমার আগ্রহ অনেক। হঠাৎ একদিন এক ভাইয়ের কাছে এই বইটির কথা জানি। এরপর কিনব ভাবছিলাম। শেষে হঠাৎ করেই কিনে ফেললাম।
ছবি তোলার ব্যাপারে কিছু কিছু বিষয় আগেই জানা ছিল। বলা যায় বেসিক খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। তবে নতুন কিছু কিছু বিষয় ও ধারণা ছবি তোলার ব্যাপারটাকে একটি অন্য রকম করে দিয়েছে। বলা যায় এখন ছবি তোলার সময় এত কিছু মাথায় না থাকলেও কিছু কিছু বিষয় ধরা পরবে।
আর একটি কথা ভাল লেগেছে অনুশীলন। আসলে আমরা অনুশীলন করতে ভুলে যাই। এটাই করতে হবে চর্চা করে যেতে হবে। নিজেকে নিজে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে। তবেই সফলতা আসবে।
ছবি তোলার ব্যাপারটিও এমনই।
তবে বইটি আর একটু এডভান্সড হলে ভাল হতো। সেই সাথে যদি ভিতরে এত ছবি না দিয়ে বইটি বড় করা না হতো এতে পাঠকদের যারা ফটোগ্রাফি নিয়ে আগ্রহী তাদের জন্য ভালো হবে বলে আশা রাখি।
বইটা মোবাইল ফটোগ্রাফির বেসিক নলেজটাকে শানিত করে। যারা নিয়মিত মোবাইলে ফটোগ্রাফি করেন, তারা হয়ত বেশ কিছু আগের থেকেই জানা থাকতে পারে বলে আবিষ্কার করবেন। এই বইয়ে মোবাইল ফটোগ্রাফির উপর বেশ কয়েকটা প্রশ্নের ভালোই উত্তর দিছে। যেমন, কি, কেন, কি কি ইত্যাদি। তবে 'কিভাবে' এর উত্তর তেমন একটা নাই। ওভারল, ৩.৫ স্টার পাওয়ার মত একটা বই।
তবে, এই বইয়ে অনেক ছবি আছে তার বেসিক কথাগুলার সাপোর্টে। ছবিগুলা সুন্দর। মনেই হয়না যে ফোনে তোলা ছবি। আমার মনে হয় প্রতিটা ছবি উনি কোন সেটিং এ তুলেছেন তা উল্লেখ করে দিলে আরো উপকারি হতো।
বইটা একদম বেসিক ফটোগ্রাফির। যারা একদম নতুন তাদের বেশ আগ্রহ জাগাতে পারে বইটা। অন্তত আমি ক্লাস ৮-৯-১০ এ এরকম বই হাতে পেলে এক্সপেরিমেন্ট করতাম।
আমি কিনেছিলাম কারণ বইটা দেখতে খুব সুন্দর, প্লাস কিছু এডভান্স সাজেশন ও দেখতে পাবো এই আশায়। প্রীত রেজা বেশ ইন্সপায়ার করার চেষ্টা করেছেন, পজিটিভ একটা ভাইব ক্রিয়েট করেছেন, আর চেষ্টা করেছেন বাংলায় বুঝাতে! এই ব্যাপার গুলোর জন্য সাধুবাদ।
তবে নেগেটিভ হলো কিছু কিছু জায়গায় মনে হয়েছে এতটা দুর্বোধ্য ভাষা, যেন গুগল ট্রান্সলেটরের আক্ষরিক অনুবাদ।
ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা করতে চাইলে কি কি দেশি বই পড়তে পারি? সাজেশন?
একটা সময় ছিলো যখন মানুষ ছবি তুলতে ভালো ক্যামেরা কিনতো। এখন আর সে ঝামেলার দরকার হয় না৷ হাতে হাতে ফোন। ফোনে চমৎকার সব ক্যামেরা। হবেও না কেন? সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সবাই এখন ভালো ছবি তুলতে চায়। কিন্তু ভালো ক্যামেরা থাকলেই তো ভালো ছবি তোলা যায় না। আবার অন্যভাবে বলতে পারি, সবার কাছে ক্যামেরা থাকায় দেশে প্রচুর ফটোগ্রাফার তৈরির সম্ভাবনা থাকে৷
কিন্তু প্রোফেশনাল ক্যামেরা আর মোবাইল ক্যামেরা তো এক না। প্রোফেশনাল ফটোগ্রাফির উপরে কোর্স থাকলেও স্মার্টফোন ফটোগ্রাফি নিয়ে আমাদের দেশে হয়তো তেমন কাজ কম হয়। স্মার্টফোন দিয়ে ভালো ছবি তুলতে চাইলে এই বইটি আপনার কাজে লাগবে। বইটি নিয়ে কিছু বলার আগে বইয়ের লেখক সম্পর্কে বলি। যারা ফটোগ্রাফি করেন, তারা এক নামেই চিনেন। তবে যারা চিনেন না, তাদের জন্য বলি। প্রীত রেজা হচ্ছেন সেই মানুষ যিনি বিয়ের ছবি তোলাকে একটা প্রোফেশনাল পরিচয় দিয়েছেন। ওয়েডিং ফটোগ্রাফি যে একটা সম্মানজনক পেশা হতে পারে, সেটা এই দেশে প্রমাণ করেছেন প্রীত রেজা। সেই স্বীকৃতি আদায় করেছেন ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রফেশনাল ফেলো। সাউথ এশিয়ান ইন্সটিটিউট অব ফটোগ্রাফি থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী প্রীতরেজা কাজ করেছেন দৈনিক ইত্তেফাক, দ্য নিউ এইজ, দ্য ডেইলি স্টার এবং দৃক নিউজের জন্য৷ সাকিব আর হাসার, মুশফিকুর রহিম, সৌম্য সরকারদের ওয়েডিংএর ছবি দেখেছেন নিশ্চয়ই! এগুলো প্রীত রেজার নিজের প্রতিষ্ঠান "Wedding Diary" এর কাজ। এছাড়া আছে প্রীত রেজা প্রোডাকশন। এর কাজ আর বলবো না। অলরেডি এটা বইয়ের রিভিউ কম, প্রীত রেজার ব্রাণ্ডিং বেশি হয়ে গেছে। বাকি পরিচয় বইয়ের ফ্লাপ থেকে পড়ে নিবেন অথবা গুগল থেকে জেনে নিবেন।
একটা ভালো ছবি তুলতে আসলে কী লাগে? অনেকেই ছবি দেখে প্রশ্ন করে, 'এটা কোন ফোনে/ক্যামেরায় তোলা?' ব্যাপারটা অযৌক্তিক। লেখকের নিজের বক্তব্যই আমার ভাষায় বলি। কোথাও দাওয়াতে গিয়ে ভালো খাওয়া-দাওয়া করে যদি বলি 'খাবারটা খুব মজা ছিলো। কোন চুলায় রান্না করেছেন?' অথবা প্রিয় লেখকের কাছে গিয়ে যদি প্রশ্ন করি 'আপনার অমুক উপন্যাসটা দারুণ! কোন কলম দিয়ে লিখেছেন?' ব্যাপারগুলো কিন্তু অযৌক্তিক। একটা ভালো লেখায় একটা কলমের যতটুকু অবদান, ভালো রান্নায় ভালো চুলার যতটুকু অবদান, একটা ভালো ছবির পিছনে ক্যামেরার ততটুকু অবদান। এগুলো হলো টুলস। মূল কারিগর তো টুলস না। ফটোগ্রাফি একটা শিল্প। ভালো ফটোগ্রাফার হতে হলে একটা শৈল্পিক মন দরকার। এবার আসি বইয়ের ভিতরে। শৈল্পিক মন তো হলো, কিন্তু ডিভাইস চালাবেন কিভাবে? ভালো ছবি তুলতে হলে আপনাকে বুঝতে হবে আলোর হিসাব। কারন ছবির মুল কারিগর আলো। ফটোগ্রাফি মানে আলো নিয়ে খেলা। আমাদের ফোনের ক্যামেরায অনেক অপশন থাকে যা আমরা কখনো ঘাটাঘাটি করে দেখি না। অনেক টার্ম সবসময় শুনি কিন্তু মানে বুঝি না। পিক্সেল কী, ক্যামেরা রেজুলেশন কী, সেন্সর কিভাব কাজ করে, অ্যাপাচার কী, কিভাবে কাজ করে, ডেপথ অফ ফিল্ড, শাটার স্পিড, ব্রাস্ট মুড, আইএসও, এক্সপোজার ইত্যাদি প্রচুর খুটিনাটি বিষয় খুব সহজে ছবি দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন টপিক বুঝাতে প্রচুর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। মোটামুটি একটা বেসিক কোর্স হয়ে যাবে এই বইতে।
প্রচ্ছদ সাধারনের মধ্যেই চমৎকার। সাধারনত যেটা হয়, সেলিব্রেটিদের বইয়ের প্রচ্ছদে তাঁরা নিজেরাই থাকেন৷ এখানেও তেমনই। তবে কে নিজেকে কতটা স্মার্টলি প্রেজেন্ট করতে পারে এটা হলো বিষয়। আমার তো ভালো লেগেছে। আপনাদের কেমন লাগে কমেন্টে জানাবেন।
কিছু ছোটখাটো বানান ভুল চোখে পড়েছে। বইটা একেবারেই নতুন মানুষদের জন্য। এটা পড়ে স্মার্টফোন দিয়ে ফটোগ্রাফি শুরু করা যাবে। তবে আশা করি লেখক পরবর্তীতে আরো এডভান্স লেবেলের বই আনবেন। এই বিষয়ে প্রচুর লেখালেখি প্রয়োজন।