বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালটাই সম্ভবত সবচেয়ে রহস্যময়। এক বছরে তিন তিনটি সামরিক অভ্যুত্থান, যা মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছিলো। বদলে দিয়েছিলো বাংলাদেশের ভবিষ্যতের বাঁক। খুব গুরুত্বপূর্ণ এই বছরটি নিয়ে জানার আগ্রহ অসংখ্য মানুষের। কিন্তু ৭৫ সালের ঘটনাগুলো নিয়ে তুলনামূলকভাবে লেখালেখি হয়েছে খুবই সামান্য। তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তারা নিজেদের মতো করে লিখেছেন, নিজেদের দেখা বা জড়িত থাকার অভিজ্ঞতাগুলো। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সময়টিকে নিয়ে লেখা হয়নি তেমন কিছুই।
ইতিহাস বিষয়ক লেখকদের অন্যান্য রচিয়তাদের চাইতে বেশি নির্মোহ থাকা বাঞ্ছনীয়। ঘটনা সম্পর্কে জানা বিশদ জানা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। আবার, ঘটনাকে কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখা-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে তা কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। এই ব্যাখা-বিশ্লেষণের সময় লেখকগণ সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষতা দেখাবেন এবং কোনো ঘটনাকে একাধিক অবস্থান থেকে বিচার করতে চাইবেন এমনটাই আশা করা হয়। আশা এবং বাস্তবতার ফারাক অনেক সময় হতাশার জন্ম দেয়। এ বইটি পড়ে তাই মনে হলো।
আমার শিক্ষক শওকত হোসেন মাসুম বইটির কথা উল্লেখ করেছিলেন, তাই পড়া। তরুণ লেখক নজরুল সৈয়দ মোটামুটি পড়াশোনা করে বইটি লিখেছেন। মোটামুটি শব্দটি ব্যবহার করলাম কারণ যে ২৬ টি বই পড়ে এই বইটি লিখেছেন, সেই বইগুলো বাজারে কমবেশি পাওয়া যায়। পত্রিকাগুলো জোগাড় করতে হয়তো কষ্ট করতে হয়েছে। এমন কোনো বইয়ের নাম সহায়ক গ্রন্থের তালিকা পাইনি যা পাঠকের নাগালে নেই। অর্থাৎ এই বইয়ের তথ্যগুলো আলাদাভাবে পাঠক পেতে পারেন। তাহলে পয়সা খরচ করে নজরুল সৈয়দের বইটি কেন কিনবো? মূলত, ঘটনা বর্ণনাকে নয়, বরং ব্যাখা-বিশ্লেষণে জোর দিয়েছেন লেখক। মানে হলো লেখকের ব্যাখা-বিশ্লেষণই এ বইয়ের বড় আকর্ষণ। এখানেই কিছু কথা বলার আছে। ঘটনা, ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অনেকবার 'সম্ভবত, হয়তো, মজার ব্যাপার হলো ' ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ইতিহাসে সম্ভবত, হয়তো বলে কিছু নেই। যা হয়েছে এবং যা হয়নি তার পক্ষে-বিপক্ষে বলতে চাইলে নির্মোহভাবে বলতে হবে। বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কল্পনার আশ্রয় বেশি নেওয়া ভালো কথা নয়। আবারও বলব, নিরপেক্ষতা ইতিহাস লেখকের অন্যতম বড় গুণ। পড়তে জানার সাথে সাথে নিরপেক্ষভাবে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে এবং লিখতে জানাও চাই।
'৭৫ রক্তমাখা বছর। '৭১ সালের পর এমন ঘটনাবহুল সময় বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। জিয়া,মোশতাকসহ ঘাতক ফারুক-রশিদ গংয়ের কলঙ্কিত ভূমিকা কমবেশি সকলেই জানে৷ খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিলসহ যারা নভেম্বরে ক্যু করে জিয়াকে সরিয়ে দিয়েছিল, তাদেরকে সাধারণত দেশপ্রেমিক হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এখানেই নজরুল সৈয়দের স্ট্যান্ড। তিনি আপনাকে একটি নতুন অঙ্গন দেবেন ভাবনার, প্রচলিত মত এবং মিথকে আঘাত করে নির্মাণ করবেন '৭৫ সালের ভালো এবং মন্দ চরিত্রগুলো নিয়ে অন্যরকম একটি ভাবনা।
নিঃসন্দেহে প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে লেখা বিশ্লেষণধর্মী একটি বই। ফ্যাক্ট এবং বিশ্লেষণের হাতুড়ি দিয়ে পঁচাত্তরের সকল কুলীলবের মুখোশ উন্মোচন করতে চেয়েছেন নজরুল সৈয়দ। এই তরুণ লেখকের জন্য শুভকামনা রইল এবং প্রত্যাশা করি, ভবিষ্যতে বিশ্লেষণের সময় তিনি আরও বেশি বহুমাত্রিক চিন্তার এবং নির্মোহ দৃষ্টির পরিচয় দেবেন৷
ঝরঝরে গদ্য বলতে যা বোঝায় এককথায় বইটি তেমন নয়। গদ্য আরও পরিচ্ছন্ন হলে ভালো লাগতো। পড়তে পড়তে একঘেয়ে লাগছিল। আর হ্যাঁ, পরের মুদ্রণে বানানের বিষয়টি নজরে রাখবেন নিশ্চয়ই।
স্বাধীন বালাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ঘটনাবহুল বছরটি হচ্ছে ১৯৭৫। এই বছরে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় দফায় দফায় পরিবর্তন হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের পথ ছেড়ে প্রথমে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার, তারপর ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতিকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে সামরিক সরকার, তারপর একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান, কারাগারে জাতীয় নেতাদের হত্যা, বিপ্লবের নামে নির্বিচারে সৈনিক হত্যা বিশেষত মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা, দেশের ক্ষমতা স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের হাত থেকে স্বাধীনতাবিরোধী চরম প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর হাতে চলে যাওয়া সবই ঘটেছে। মধ্য অগাস্টের নৃশংস রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড যে নরকের দ্বারটি খুলে দিয়েছিল সেটি তার সর্বগ্রাসী রূপ নিয়ে হাজির হয় নভেম্বরে। নভেম্বরের প্রথম দশ দিনে দেশের ওপর দিয়ে যে তাণ্ডব বয়ে যায় সেসম্পর্কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পাঠে আগ্রহী যে কোন পাঠকের জানা থাকা প্রয়োজন। কারণ এখান থেকে বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছে।
‘নভেম্বর ১৯৭৫’ বইটির লেখক নজরুল সৈয়দ ঐতিহাসিক নন। ইতিহাস বিষয়ে তাঁর প্রথাগত শিক্ষা বা গবেষণা নেই। কিন্তু তার পরেও তিনি ইতিহাস বিষয়ে প্রায়ই লেখেন – সেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ও সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাবলী যেগুলো ভবিষ্যতে ইতিহাস পাঠে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে বিবেচিত হবে সেসব নিয়ে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের কথ্য ইতিহাস লিপিবদ্ধকরণে একেবারে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাঁক বদলের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের কাছাকাছি তিনি যেমন যেতে পেরেছেন, তেমন অনেক অশ্রুতপূর্ব ঘটনাও জানতে পেরেছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে এসব বিষয় নিয়ে তাঁর নিজের মতো করে পড়াশোনা ও দলিল সংগ্রহ। ফলে প্রথাগত ঐতিহাসিক না হয়েও নজরুল সৈয়দ ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের ঘটনাবলী নিয়ে বিস্তারিত লেখার জন্য এক প্রকার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এই বইটি লিখতে দৈনিক সংবাদপত্রের বাইরে তিনি যে ২৬ জন লেখকের বইয়ের সাহায্য নিয়েছেন তাঁদের বেশিরভাগ জন হয় সামরিক কর্মকর্তা অথবা পেশাদার রাজনীতিবিদ; কয়েকজন সাংবাদিকও আছেন। অর্থাৎ তথ্যসূত্রের বেশিরভাগ জন ঘটনাবলীর সাথে হয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত অথবা তার সুবিধাভোগী। এতে তাঁদের ভাষ্যগুলো প্রায়ই নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অথবা ব্যক্তিগত কৈফিয়তে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৫-এর অনেক পরে জন্মানো এই লেখক এই ত্রুটিগুলো থেকে মুক্ত বিধায় তাঁর গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
ইতিহাস রচনাতে প্রায়ই লক্ষ করা যায় লেখক একটি অবরোহী পদ্ধতি অবলম্বন করেন। অর্থাৎ তিনি আগেই ইতিহাসের নায়ক, খলনায়ক নির্ধারণ করে অগ্রসর হন এবং সংঘটিত ঘটনাবলীকে তাঁর গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে ব্যাখ্যা করার বা সাজানোর চেষ্টা করেন। ফলে রচনাটি কার্যত প্রকৃত ইতিহাসের পরিবর্তে তাঁর নির্মিত ভাষ্যে পরিণত হয়। পক্ষান্তরে এই বইয়ের ক্ষেত্রে লেখক নজরুল সৈয়দ আরোহী পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। অর্থাৎ, তিনি আগে ভাগে কোন সিদ্ধান্তে না পৌঁছে চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন পক্ষের ভাষ্য থেকে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে। বইয়ের ভূমিকাতে তিনি বলছেন —
“যে ইতিহাসটা আমরা জানি বা প্রকাশ্যে দেখা যায়,তার আড়ালে কোথাও ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো ইতিহাস। এরপর ক্রমাগত উঁকি মেরে যেতে থাকি সেই ইতিহাসের অলিতে গলিতে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়,অসংখ্য প্রশ্ন মিলে তৈরি করে প্রশ্নের পাহাড়। কিছুর উত্তর মেলে,কিছু মেলে না। এ বই আর কিছুই নয়,সেই পরিভ্রমণটাই লিখে রাখা। হয়তো নতুন করে ভাবতে সহায়তা করবে সময়টাকে।“
মধ্য অগাস্টের রক্তাক্ত অধ্যায়ের পটভূমি থেকে নভেম্ব���ের ঘটনাবলীর অনুপুঙ্খ বিবরণ, কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর প্রেক্ষিত থেকে তার বিশ্লেষণ এই বইয়ের প্রধান উপাদান। এর বাইরে বইটিতে এমনসব বিষয়কে সামনে আনা হয়েছে যা বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু ঐতিহাসিক মিথকে ভেঙে সত্যতে পৌঁছানোর পথ দেখিয়েছে। যথা —
এক, বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা (এবং সম্ভবত বেসামরিক কর্মকর্তারাও) অবগত ছিলেন কিন্তু তাঁদের কেউই ষড়যন্ত্র উদঘাটনের বা বঙ্গবন্ধুকে নিরাপদকরণের চেষ্টা করেননি।
দুই, প্রচলিত ধারণা হচ্ছে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারীদের বিরোধী পক্ষ। কিন্তু এখানে দেখানো হয়েছে তিনি খুনীচক্রের সাথে অনেক আগে থেকে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডের পরেও তাদেরকে সক্রিয় সহযোগিতা দিয়ে গেছেন। সুযোগ থাকা সত্যেও তিনি খুনী মোশতাকের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেননি এবং খুনীচক্রকে নিরাপদে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন।
তিন, কর্নেল আবু তাহের বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে কেবল অবগত ছিলেন না, তাঁর দলেরও অনুরূপ পরিকল্পনা ছিল। তিনি মধ্য অগাস্ট থেকে সাতই নভেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছাকাছি থেকেছেন কিন্তু খুনীচক্রের বিপক্ষে অবস্থান নেননি। বরং তিনি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঘনিষ্টভাবে সহযোগিতা করে গেছেন এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার মাধ্যমে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেছেন। তাঁর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেলে তাঁকে ও তাঁর দলকে জেনারেল জিয়া নির্মূল করার চেষ্টা করেছেন।
চার, জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ও বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ হয়েও খুনী মোশতাক সরকার ও খুনীচক্রকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাশে থেকে সহযোগিতা করে গেছেন।
পাঁচ, জেনারেল জিয়ার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও কর্নেল তাহেরের দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সাতই নভেম্বরের ঘটনাবলীকে ‘সিপাহী জনতার বিপ্লব’ বলে দাবি করলেও এটি আদতে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার পরিকল্পনায় ঘটানো একটি সামরিক অভ্যুত্থান ছাড়া কিছুই নয়। এখানে সাধারণ জনগণের কোন অংশগ্রহন তো ছিলই না, বরং বাংলাদেশবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। তাদের সুসংগঠিত ও ব্যাপক অংশগ্রহন প্রমাণ করে এমন ঘটনার ব্যাপারে তারা পূর্বেই অবগত ছিল এবং তাদের প্রস্তুতিও ছিল। জাসদ এই অভ্যুত্থানের ক্রেডিট দাবি করলেও তারা আদতে অন্যদের প্রচেষ্টাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখেছিল মাত্র। এই পর্যায়ে জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা দখলের দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা সফলতার সাথে সমাপ্ত হয়। সেইসাথে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এই ঘটনার মাধ্যমে সফলতার সাথে প্রত্যাবর্তন করে।
এই বইটিতে অসাবধানতাবশত কিছু তথ্যগত ত্রুটি ঘটেছে। যেমন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে একটি সাঁজোয়া ইউনিট তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৭২ সালের ২রা এপ্রিল। উক্ত ইউনিট পরের বছরের ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসে প্রথম সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নেয় যেটিকে ভুলে ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ বলা হয়েছে। সৈয়দ ফারুক রহমান ১৯৭৩ সালের ২৭শে এপ্রিল এই ইউনিটের প্রধান নিযুক্ত হন যেটিকে ১৯৭২ সাল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার বিপ্লবী সৈনিকদের গ্রুপ ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) কর্তৃক গঠিত বা তাদের অঙ্গসংগঠন না হলেও এক জায়গায় কর্নেল আবু তাহেরের বানানো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক নূরুল ইসলাম প্রতিরক্ষা সচিবসহ জেনারেল জিয়াউর রহমানের সাথে ১৯৭৫ সালের কোন্ মাসের ৪/৫ তারিখে সাক্ষাত করেন সেটা উল্লেখ করা হয়নি। সাংবাদিক শাহাদাত চৌধুরীকে ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র সম্পাদক বলে উল্লেখ করা হলেও তিনি তখন পত্রিকাটির সহ-সম্পাদক ছিলেন। মূল সম্পাদক ছিলেন সাংবাদিক নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী। শাহাদাত চৌধুরী আশির দশকে কবি শামসুর রাহমানের পরিবর্তে পত্রিকাটির সম্পাদক হন। এর বাইরে কিছু প্রচলিত কিন্তু অসমর্থিত তথ্য আছে যেগুলো এড়িয়ে যাওয়া যেত।
এই বইয়ের দুটি প্রধান সীমাবদ্ধতা হচ্ছে – এক, সাবেক সেনা প্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ্র ভূমিকা বিস্তারিত আলোচনায় না আনা বা তাঁর ভুমিকাকে লঘুকরণ। অথচ এখানেই বলা হয়েছে তিনি মধ্য অগাস্টের অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত ছিলেন। অভ্যুত্থান চলাকালে তাঁর ক্ষমাহীন নিষ্ক্রিয়তাকেও লঘু করে দেখা হয়েছে। দুই, বিশেষত ঐ সময়ে বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, গণচীন, ভারত ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা কার্যক্রম বেশ সক্রিয় ছিল। এই সব অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ প্রচেষ্টাসমূহের সাথে তাদের কারো কারো গভীর যোগাযোগ ছিল যেগুলো পরবর্তীতে বারে বারে প্রমাণিত হয়েছে। অথচ গোটা বইটিতে এই বিষয়টিকে প্রায় স্পর্শের বাইরে রাখা হয়েছে। কেবল শেষ প্রান্তে ডাচ নাগরিক পিটার কাস্টার্স ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর ভুমিকার ব্যাপারে দুর্বল ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে মাত্র। অথচ বাংলাদেশের ঐ সময়কার ক্ষমতার রাজনীতিতে বহিঃর্বিশ্বের অংশগ্রহনের ভূমিকা ব্যাপক ও গভীর ছিল। এই ত্রুটিটি বইটিকে ১৯৭৫-এর নভেম্বরের ঘটনাবলীর বিস্তারিত পাঠে অসম্পূর্ণতা দিয়েছে। বইটির অনেক জায়গায় অনানুষ্ঠানিক ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করেছেন যা পাঠককে কখনো কখনো লেখকের ভাষায় ‘তব্দা’ খাইয়ে দেবে। এই শ্রেণীর বইয়ে অনানুষ্ঠানিক ভাষা ও শব্দের ব্যবহার না হলে ভালো হয়। যেহেতু বইটি ভবিষ্যতের পাঠক ও বাংলাদেশের নাগরিক নন্ এমন বাংলা ভাষাভাষী পাঠক পড়বেন তাই তাঁদের বোঝার সুবিধার্থে পরিশিষ্টে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি সংযোজন আবশ্যক ছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রদের ছবি ও গুরুত্ববাহী ঘটনাবলীর নিউজ ক্লিপিং সংযোজন বইটিকে আকর্ষণীয় করেছে।
নিঃসন্দেহে মাত্র ১৪০ পৃষ্ঠার একটি বইয়ে নভেম্বর ১৯৭৫ সালের ব্যাপক, বিস্তৃত ও গভীর ঘটনাবলীর সবটুকু তুলে ধরা সম্ভব নয়। কিন্তু যারা এই বিষয়ে ভবিষ্যতে গবেষণায় বা আরও বিস্তারিত পাঠে আগ্রহী হবেন এই বটি তাদেরকে পথের দিশা দেখাতে সমর্থ হবে।
ভাগ্যদোষে অগাস্টের শুরুতে অর্ডার করা তিনটে বই আজকের এই ১৪ অগাস্ট আমার হাতে এসে পৌছালো। যার মধ্যে একটি 'নভেম্বর ১৯৭৫'। বইয়ের কলেবর এবং বিষয়বস্তুর প্রতি আগ্রহের কারণে বিকেলে হাতে পাবার পর থেকে পড়া শুরু করা, মাঝে ক ঘন্টার ছেদ এবং পরবর্তিতে আবার টানা ক'ঘন্টা পড়ে ঘড়ির কাটা ঠিক ১৫ অগাস্টে পা দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ হল। বাইরে থেকে মাইকে ক্রমাগত বাজতে থাকা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, বঙ্গবন্ধু মরে নাই গান আর মাথার ভিতরে তৈরি হওয়া বোধহীনতার শূণ্যতা মিলে তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত অনুভুতি নিয়ে এই লেখা লিখতে বসা। ৭২-৭৫ এর সময়কালের ইতিহাস কেমন যেন কুয়াশায় ঢাকা এক ঘোলাটে ইতিহাস। আমার ক্ষুদ্র ইতিহাস জ্ঞানে আমি যতবারই এ সময় কাল নিয়ে জানবার চেষ্টা করেছি তত বেশিই আরো যেন অন্ধকারে ডুবে গেছি। একটা সময়ে এই বিষণ্ণতা আর অন্ধকার এড়ানোর জন্য এই সময়ের ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়াও বন্ধ করে দিয়েছি বলা যায়। এর মাঝে এ বইটা নিয়ে কিছুটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে তার কারণ এটা শুধু নাটকের প্রধান দৃশ্যের অবতারণা, সেসময়ের চরিত্রগুলো ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে লেখা। ৭৫ এর অগাস্ট থেকে নভেম্বর এই চারমাসের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের পরবর্তি দুই দশকের এমনকি বর্তমান সময়েরও ভাগ্য নির্ধারণ করার খেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। এই বইটা পড়ে ইতিহাসের কুয়াশা কিছুটা কেটে শৈত্যপ্রবাহ বৃদ্ধি পেলেও মানুষ হিসাবে মাথার ভিতরের কুয়াশা আরো ঘোলাটে হয়ে যায়! কার বাড়া ভাত কে কেড়ে খাচ্ছে, কার পাকা ধানে কে মই দিচ্ছে, কার লুঙ্গি ধরে কে কখন টান দিচ্ছে কিছুই বুঝে ওঠার জো নেই! সবচেয়ে আগে এবং সবার শেষে গিয়ে ঘুরে ফিরে যে প্রশ্নটা পাঠক হিসাবে আমার মাথায় খোঁচায় তা হচ্ছে এই অতি অদ্ভুত সময়ের নাটকে কুশিলবদের কার মাথায় কি চলছিল? কে আসলেই কি ভাবছিল? তার চেয়েও বড় কথা পুতুল নাচের নাচুনেদের কথা নাহয় আমরা জানলাম, কিন্তু তাদের নাচিয়েরা তো (পাকিস্তান, আমেরিকা বা অন্য কোন শক্তি) এখনো কমবেশি আমাদের আলোর বাইরে। পুরা বই পড়ে এটা ঘুরে ফিরে মনে হইসে যে পুরা ঘটনায় এক বা একাধিক "থার্ড পার্টি" ছিল যারা সব খবর এ কান থেকে ওকান করেছে এবং মাঝখান থেকে নিজেদের ফায়দা বের করে নিসে। মাঝে দিয়ে কিছু নিরীহ সৈনিক, অফিসার আর আমপাবলিক মরে ভূত হয়ে গেল যারা ইতিহাসের ঐ পরিসংখ্যান নামক তামাশার কিছু সংখ্যা হয়েই বজায় থাকবে। তবে এ বই থেকে বড় প্রাপ্তি হচ্ছে নতুন করে কিছু চরিত্রের নাম জানা, আর কিছু চরিত্রের ভূমিকার সাথে নতুন ভাবে পরিচিত হওয়া।
বই রিভিউঃ নভেম্বর ১৯৭৫ লেখকঃ নজরুল সৈয়দ পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৪০ প্রকাশনা সংস্থাঃ ঐতিহ্য প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২০২০
বইটা কেমন বলার আগে একটা কথা বলি – এই বইটা ইতিহাসের বই হিসেবে ধরা ঠিক হবে না, মোটা দাগে এই বইয়ের উদ্দেশ্য ইতিহাস জানানো নয়। বরঞ্চ এটা এক ধরনের ইতিহাসের বিশ্লেষণধর্মী বই। এ বইতে ইতিহাস বলতে আমরা যেসব ইনফরমেশন বা তথ্যকে বুঝি, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় থেকে ৭৫ এবং পরবর্তী সময়কালিন কিছু সেরকম তথ্য একের পর এক জোড়া দিয়ে সেগুলো বিশ্লেষন করা হয়েছে, এবং- এসব উপাত্ত, ভাষ্য, ঐতিহাসিক চরিত্রের ব্যাক্তিগত মন্তব্য থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষন করে লেখক কিছু ‘এজুকেটেড গেস’ করেছেন। আশা করি আমরা গেস বা অনুমান এবং এজুকেটেড গেস এর পার্থক্য বুঝি। যাহোক। বইটি এক অনন্য বিশ্লেষণধর্মী রচনা, যেখানে লেখক নজরুল সৈয়দ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্ধকার ও জটিল অধ্যায়কে তুলে ধরেছেন নতুন চোখে, নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে। এই বইয়ের তথ্যগুলো যারা ইতিহাসের একনিষ্ঠ পাঠক তাদের জানা, আমি কম পড়েছি তাই বেশ কিছু তথ্য আমার কাছে নতুন ছিল। এই বইয়ের স্পেশালিটি হলো লেখকের ব্যাখা ও বিশ্লেষণ, তিনি জানা ঘটনাগুলোকে সাজিয়ে একটি সামগ্রিক চিত্র উপস্থাপন করেছেন। লেখক বলার চেষ্টা করেছেন—১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল বৃহত্তর এক রাজনৈতিক ও সামরিক ষড়যন্ত্রের অংশ। খালেদ মোশাররফ, কর্নেল তাহের বা জেনারেল জিয়ার মতো অনেকের ভূমিকা অনেক বেশি জটিল এবং কখনো আদর্শের মাপকাঠিতে প্রশ্নবিদ্ধ। লেখকের দেয়া এসব ব্যাখা আমাকে নতুন করে ভাবতে বসিয়েছে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পড়ব বলে কিনে ফেলে রাখা ১৫+ বই গুলো ধরতে উৎসাহ দিচ্ছে। লেখক ইতিহাসের "নায়ক" ও "খলনায়ক" আগে থেকেই নির্ধারণ না করে বরং তাদের কর্মকান্ড বিভিন্ন এনগেল থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। এটা বইটির শক্তি। ভাষা অনেক সময় আলাপের ভঙ্গীতে / কনভারসেশনাল টোনে হয়েছে, যেটি আমার মত ছটফটে পাঠকের মনযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। যাঁরা ‘৭৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নতুনভাবে আগ্রহী হয়েছেন, তাঁদের জন্য বইটি একটি রিসোর্স হতে পারে। ইমপ্রুভমেন্ট পয়েন্ট- বইয়ের পাতায় পাতায় তথ্য পরিবেশন করে তারপর সেটার একটা ব্যাকগ্রান্ড/বিশ্লেষন করা হয়েছে আর তথ্যসূত্র বইয়ের শেষে দেয়া হয়েছে। তথ্যসূত্র প্রতি পৃষ্ঠায় স্টার মার্ক দিয়ে সেটা কোন বইয়ের কত পৃষ্ঠা হতে নেয়া হয়েছে এভাবে দিয়ে দিলে লেখকের সাথে যারা পরিচিত নন তারা তথ্যের অথেনটিসিটি নিয়ে একটু নিশ্চিত হতে পারতেন এবং লেখকের বিশ্লেষন নিয়ে তাদের ভরসা বাড়তো। এতে করে বইটা আরো শক্তিশালী হত। আশা করি পরবর্তী মুদ্রণে তিনি এই কাজটা করবেন। আমি এ বইটা আবারো পড়ব।
লেখক নজরুল সৈয়দ এর "নভেম্বর ১৯৭৫ " বইটা লেখা হয়েছে মূলত বাংলাদের ইতিহাসের এক রহস্যময় সময়ের ঘটনা নিয়ে।
আজকে ঘটে যাওয়া ঘটনা আগামী দিনে গিয়ে তা ইতিহাস হয়ে যায়, এই আজকের ঘটনার সাথে যারা জড়িয়ে থাকেন তারা যদি প্রকৃত সত্য টা বলেন তবে সত্য ও স্বচ্ছ ইতিহাস টা আমরা পেতে পারি। কিন্তু তা অনেক সময় হয়ে ওঠে না তাই আমরাও প্রকৃত সত্য ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকি।
১৯৭৫ সালে মোট তিনটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এই তিনটি ঘটনাই যথেষ্ট পিছনের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জনকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য । নভেম্বরের আগে আগস্টের বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যা, ৩ নভেম্বর জেলে চার নেতার হত্যা, ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিদ্রোহ --ঘটনা গুলো এক একটা বিভীষিকাময় ইতিহাস।
এই ঘটনা গুলো নিয়ে লেখালেখি হয়েছে খুব কম, যাঁরা লিখেছেন তাঁরা তথ্য সংগ্রহ করে নিজেদের মত করেই ঘটনা গুলো লিখেছেন। অনেক সামরিক কর্মকর্তা সেই সময়ে ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা গুলো লিখেছেন। তবে সে অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা গুলো টুকরো টুকরো। সামগ্রিকভাবে সময়টাকে নিয়ে কোন লেখা আছে কিনা আমার জানা নাই।
সেই পুরো সময়টার বিচ্ছিন্ন ঘটনা গুলো নিয়েই লিখেছেন লেখক নজরুল সৈয়দ। সময়ের ক্রমধারায় তিনি সাজিয়েছেন ঘটনা গুলো। সেই সময়ের মূল ঘটনার নেপথ্যে যা ছিলো তা ও তিনি তুলে ধরেছে, বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে এসেছেন নিজেই, আবার নিজেই সে প্রশ্নের উত্তর খুজে দিয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকা ব্যক্তিরা আজ অনেকেই নাই, যাঁরা আছেন তাঁদের থেকেও আর সম্ভব নয় সঠিক তথ্য টা সংগ্রহ করার। লেখক এই সময়ের বা ঘটনার উপর লেখা বিভিন্ন বই ও পত্রিকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে। সহায়তা গ্রন্থ হিসেবে তিনি বেশ কিছু বইয়েরও নাম দিয়ে দিছেন যা ঐ সময়টা নিয়ে জানার আগ্রহ থাকলে বইগুলো লিস্ট হিসেবে রাখা যেতে পারে। অল্প সময়ের মাঝে এতোগুলা ঘটনা যা ঘটলো তা সহজে এক মলাটে লেখক তুলে আনলেন।
বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নৃশংসভাবে মেরে ফেলবার পেছনের ষড়যন্ত্রে যারা ছিলেন, যারা জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছিলেন তাদের আরেকটু বিশদভাবে জানাতে বইটিতে নানা কুশিলবের কুকীর্তি বয়ান করা হয়েছে। ব্লগে লেখকের লেখা পড়েছি তাই স্বভাবতই বইটি নিয়ে দারুন কৌতুহল ছিল।
স্বাধীনতার মাত্র চার বছর পর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর দেশটিতে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির তৈরি হয় তারই পরিণতি ছিল নভেম্বরের সাতটি দিনের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থানের সূচনা। ক্ষমতার লড়াইয়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে অন্তর্দ্বন্দ্ব, অপরিণত জাসদের সক্রিয়তা, স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠির চক্রান্ত ও সুবিধাবাদী বিভিন্ন গ্রুপের ষড়যন্ত্রের ���েলার বলিদান হয়েছে হাজার নেতা-কর্মী-সামরিক অফিসার এবং সৈন্য, নষ্ট হয়েছে রাষ্ট্রের নৈতিক অবকাঠামো। আত্মপ্রকাশ ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির।
১৫ আগস্ট থেকে শুরু করে ৩ নভেম্বর এবং ৭ নভেম্বরের বিপ্লব নামধারী ষড়যন্ত্রে এত বেশি কুশিলবের নাম এসেছে যে প্রতিটি পৃষ্ঠা আসলে দুই বা ততোধিকবার পড়তে হয়েছে। লেখক যথার্থই লিখেছেন “কার বিপ্লব কে যে ছিনতাই করেছে, তার হাত থেকে আবার কখন কোন অজান্তে বেহাত হয়ে যাচ্ছে, তা ট্র্যাক রাখা খুব মুশকিলের ব্যাপার”। এটাও নিশ্চিত করেছেন কুশিলবদের ‘সবাই যার যার মতো করে ষড়যন্ত্রের খেলায় মেতেছিলেন নিজেদের সামান্য লোভের খাতিরে। যার খেসারত আজ পর্যন্ত গোটা বাংলাদেশকে দিতে হচ্ছে”।
কিছু জায়গায় সাল, তারিখে ভুল থাকায় রেটিং কম দিতে হল।
এই বইয়ের রিভিউ লেখা আমার পক্ষে সম্ভব না। রিভিউ তো দূরের কথা, নেহাত পাঠ- প্রতিক্রিয়া লেখাও সম্ভব না।
বাস্তব ইতিহাসের বর্ণনা। কোনো বানানো গল্প বা নাটকীয়তা নাই। কিন্তু বাস্তবটাই দুর্ধর্ষ! মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে গেম অফ থ্রোনসের প্রিকুয়েল 'The Princess and the Queen' -এর মতই রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বযুদ্ধের বয়ান পড়ছি, পার্থক্য শুধু এখানে অতিপ্রাকৃতিক কোনো উড়ুক্কু বিভীষিকা নেই। আছে শুধু আত্মসর্বস্ব ক্ষমতাধরদের লড়াই।
বইটি ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে রচিত। বইতে লিপিবদ্ধ লেখকের বিশ্লেষন এবং তথ্যাদি চিত্তাকর্ষক। বইয়ের শেষে লেখক রেফারেন্স বইয়ের তালিকা দিয়েছেন। তবে প্রতি পৃষ্ঠায় রেফারেন্স উল্লেখ করা হলে বইটি আরও প্রামান্য গ্রন্থ হত। তবে এ তো কোন পিএইচডি থিসিস নয়, বই। বইয়ের শুরুতেই লেখক আক্রমন করেছেন খালেদ মোশাররফকে ঘিরে রাখা প্রচলিত ধারনাকে। জনমনে একটা ধারনা আছে খালেদ মোশাররফ বেঁচে থাকলে ইতিহাসটা অন্যভাবে রচিত হত। ১৫ আগষ্টের হোতাদের সাথে খালেদ মোশাররফের নিবিড় সর্ম্পকের কথা সেভাবে প্রচারিত নয়। যেমন ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয় ফারুক রহমান। তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সিনিয়র অফিসাররা গ্রহন করতে চায়নি। কিন্তু খালেদ মোশাররফের চাপে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গ্রহন করা হয়। সর্ম্পকে খালেদ মোশাররফ, মুক্তিযুদ্ধকালীন সচিব নুরুল কাদির খান উভয়েই ফারুকের মামা ছিলেন। আবার ১৫ আগষ্টে যে ট্যাংঙ্ক বহর বেরিয়ে ছিল তাতে কোন তাজা গোলা ছিল না। এ খবর সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ, উপ সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান এবং সিজিএস খালেদ মোশাররফ জানতেন। ১৫ আগষ্টের পর এ ট্যাঙ্কগুলোতে খালেদ মোশাররফের নিদের্শেই তাজা গোলা গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর থেকে সরবরাহ করা হয়। এ নিদেশ দেবার আগে তিনি সেনাপ্রধান বা উপ সেনাপ্রধানের সাথে আলোচনা করেননি।
লেখক এভাবেই একের পর এক বিভিন্ন বিষয় দিয়ে ব্যাখা করেছেন ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বরের অভুত্থ্যান-পাল্টা অভুত্থ্যানের সময়টাতে। বইতে তিনি গোলাম আযম কর্তৃক লিখিত বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটনাবহুল ৭৫ সাল বই থেকে রেফারেন্স হিসেবে এমন কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন যা পড়ে স্তম্ভিত হতে হয়। লেখকের উপস্থাপিত তথ্যাদি চমকপ্রদ। যেমন সেনাবাহিনীর ভেতরের তৎকালীন গোপন সংগঠন বাংলাদেশ রেভুলেশনারি আর্মি এন্ড সুইসাইড স্কোয়াডের কথা ক’জনই বা জানে?
এই বইতে উদ্ধৃত তথ্যগুলো সবারই জানা, অন্তত বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যাদের ন্যূনতম পড়াশোনা আছে, কিন্তু বইটির বিশেষত্ব মূলত লেখক যেভাবে জানা তথ্যগুলোকে জোড়া লাগিয়ে একটি বয়ান দাঁড়া করিয়েছেন। ১৫ আগস্ট মুজিবের বাড়িতে যারা অস্ত্র নিয়ে হাজির হয়েছিল, তারা ষড়যন্ত্রের একটা ছোট অংশ ছিলো কেবল। খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিল, কর্নেল তাহের প্রভৃতি যেসব ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে পরবর্তীতে নায়কোচিত বয়ান তৈরি হয়েছে, তারাও ক্রীড়নক ছিলো, অনেকাংশে ফারুক-রশিদের চেয়েও বড় খেলোয়াড় ছিলো। ১৫ আগস্টের পর সেনাপ্রধান ও সামরিক প্রশাসক হওয়ার লোভে ক্যু পাল্টা ক্যু করে যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধা কলহরত সারমেয়তে পর্যবসিত হয়েছিলেন, সকলেই তাদের পাপের ফসল বুনেছেন। এসবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর অশোভন উচ্চাভিলাষ, পেশাদারিত্বের অভাব আর মানসিক দারিদ্র্য বারবার প্রস্ফুটিত হয়, যেন যুদ্ধাস্ত্র হাতে কিছু উদগ্র বেবুন। যে দেশের সেনাবাহিনী যুদ্ধবিমান আর যুদ্ধযান ব্যবহার করে এলাকার বখাটে পোলাপানের মতো নিজেরা নিজেরা কামড়াকামড়ি করে, সে দেশ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব চর্চার মতো সাবালক হয়নি।
এই বইটির ব্লগিয় ভাষারীতি পরিহার ও তথ্যসূত্রের যথাযথ উল্লেখ নিশ্চিতকরণে একজন সম্পাদকের দরকার ছিলো, নাহলে পাঁচ তারকা দিতাম।