‘এই প্রথম মনে হয় গায়ে কাপড় নেই আমার। সেগুলো খুঁজে খুঁজে পরি। হাত চালিয়ে চুল ঠিক করি। তারপর ভোঁতা চোখে দেখি তাকে। প্রেমিক না, নিজেকে হঠাৎ শ্রমিক মনে হয়। পায়ের ওপর পা তুলে সিগারেট ধরায় রিংকি। তারপর বলে, কফি খাবে? আমি না বলতেই সে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। ও আচ্ছা, তোমরা তো কফি খাও না। চা খাও, ঠিক না?’ এক তরুণ সাংবাদিকের মোহ, মুগ্ধতা আর মুক্তির কাহিনি এ উপন্যাস।
আসিফ নজরুল একজন ঔপন্যাসিক, রাজনীতি-বিশ্লেষক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ১৯৯১ সাল থেকে শিক্ষকতা করছেন। আন্তর্জাতিক আইনে পিএইচডি করেন লন্ডন থেকে। এরপর জার্মানি ও ইংল্যান্ডে কিছুদিন কাজ করেছেন পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে। সাংবাদিক হিসেবে একসময় খ্যাতি অর্জন করেন। বর্তমানে কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে বহুল পরিচিত। দীর্ঘ বিরতির পর কয়েক বছর ধরে আবার সৃজনশীল লেখালেখি করছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দশের অধিক।
হাতে সাড়ে তিনশো টাকা আসছিলো, অন্য কোনো খাতে ব্যয় করার আগেই ওয়াসি আহমেদের 'তলকুঠুরির গান' কিনতে দৌঁড় তুলি শহরের প্রসিদ্ধতম বইয়ের দোকানে। সেটা তো কিনলাম, কিন্তু তখন আমার আড়াই ঘণ্টার মতো অবকাশ যাপনের বিলাসিতা করার সুযোগ আছে। তোলে নিছিলাম আসিফ নজরুলের 'ঘোর'। এই অধ্যাপকের লেখা আমার আগেও পড়া ছিল, এবং অন্তত এই বিশ্বাস ছিল যে, পড়লে পস্তাবো না। দুই-আড়াই ঘণ্টার ভালো একটা ইউটিলাইজেশন হবে। প্লটটা সুন্দর। এক তরুণ সাংবাদিকের গল্প। গভীরতাহীন গদ্যে নজরুল সাহেব মূলত দেশের সাংবাদ মাধ্যমের দুরাবস্থা তোলে ধরসেন। কিভাবে সরকারদল গণমাধ্যম গ্রাস করতেসে, কিভাবে বিরোধীদলকে ধুয়া ছাড়া গণমাধ্যমের কোনো কাজ নাই...এইসব খুব সুন্দর ভাবে ফুটায় তুলসেন তিনি। এইরকম একটা লাইন ছিলো, ''এই দেশে উচ্চপর্যায়ের লোকদেরকে নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যরা ফালতু শ্রেণীয় লোক, এমনকি র্যাবের মধ্যমমানের অফিসারদের থেকেও তাদের মূল্য কম। এজন্য আমাদের দেশে র্যাব নিয়ে কথা বলা নিষেধ হলেও উপচার্যদের খুব ধুয়া যায়।"(বই হাতের কাছে না থাকায় নিজের মতো করে লিখলাম)।
এ বইয়ে একজন সাংবাদিকের দৈনন্দিন জীবনের গল্প ছিল দশ আনা। চার আনা ছিল একজন নায়রা এবং তার সাথে গল্পকথকের চরম বাধা বিপত্তিতে ভরা সমাজবহির্ভূত প্রেম। আর দুই আনা ছিল রিংকু নামের মেয়েটি। পড়তে খারাপ লাগে না। হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত হলে আসিফ নজরুলকে অবশ্যই পড়ে দেখবেন। শ্বশুড়ের হালকা প্রভাব তাঁর মধ্যে থাকলেও স্বকীয়তাও যথেষ্ট আছে। আর দারুণ বর্ণনাভঙ্গি তো আর আছেই। অনেক অংশ পড়েই হাহা করে হেসে উঠছি। লাইট রিডিঙের জন্য একদম পার্ফেক্ট একটি বই।
একটি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক সাইফুল বড় রিপোর্টার হতে চাই। ভালো রিপোর্ট করে সে টিআইবির সেরা রিপোর্টারদের একজন হয়। কিন্তু দৈনিক পত্রিকার মালিক টাইগার সাইফুলরে ব্যবহার করে নিজের প্রয়োজনে। এবং এক সময় সাইফুল বের আসে এই চক্রান্ত থেকে। কিন্তু তার জীবনে আসা মডেল রিংকি তাকে ঘিরে রাখে অমোঘ নেশায় । আর সাইফুল ফিরতে চাই তারই কলিগ নায়লার কাছে। এসব প্রসঙ্গই সাইফুলের জীবন করে তোলে ঘোরগ্রস্ত।
“ωє αℓℓ кησω тнαт уєℓℓσω נσυяηαℓιѕм ∂ι∂η'т נυѕт нαρρєη α ωєєк αgσ σя α мσηтн αgσ, тнαт уєℓℓσω נσυяηαℓιѕм нαѕ ρяσвαвℓу вєєη ωιтн υѕ αѕ ℓσηg αѕ נσυяηαℓιѕм нαѕ вєєη ωιтн υѕ.” — 𝔼𝕣𝕣𝕠𝕝 𝕄𝕠𝕣𝕣𝕚𝕤 "সাংবাদিকতা" এক মহান পেশা। সমাজের গহীনে লুকিয়ে থাকা ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যার মুখোশ বের করা এ পেশার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। একজন সাংবাদিক হয় ভয়-ভীতিহীন। তিনি কাজ করে যান নিজের স্বাধীনতায়। কিন্তু আদৌ কি একজন সাংবাদিক নির্বিঘ্নে কিংবা স্বাধীনভাবে রিপোর্ট করতে পারেন? আখ্যান: সাইফুল দৈনিক পত্রিকার একজন তরুণ সাংবাদিক। অনেক উচ্চাশা নিয়ে সাংবাদিকতাকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। কারো মন জয় করতে রিপোর্ট করতে চায়না সে। ক্রাইম কিংবা সমাজের কালো দিকটাকে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু নিজের চাওয়া তো সবসময় পূরণ হয় না। তাকেও রিপোর্ট করতে হয় বাঁধা ধরা কিছু বিষয়ের উপর। সরকারের মন্ত্রী, অফিসের সচিব, র্যাব-পুলিশের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করা যাবে না। একসময় পত্রিকার মালিকের প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে এক রিপোর্ট করে আলোচনায় এসে যায় সাইফুল। পেয়ে যায় টিআইবি পুরষ্কার। এরপর স্বার্থান্বেষী মালিক চায় সাইফুলকে দিয়ে আরও রিপোর্ট করাতে। কিন্তু সাইফুল তো পোষা কুকুর হয়ে রিপোর্ট করা ব্যক্তিদের মতো নয়। এতেই শুরু হয় বিপত্তি। অপমানিত হতে হয় তাকে। চাকরি ছেড়ে দেয় সে। দমে যাবার পাত্র নয় সাইফুল। মালিকের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় সে। নতুন চাকরি নিয়ে আশায় থাকে এবার বুঝি নিজের স্বাধীনতায় রিপোর্ট করতে পারবে। তবে সাংবাদিকতা কি আসলেই স্বাধীন? এতো বিপত্তির মাঝেও তার জীবনে আসে নায়লা নামের এক মেয়ে। যাকে সাইফুল "হিমশীতল" বলে। হিমশীতলকে নিয়ে সে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু স্বপ্ন কি পূরণ হবার মতো? হিমশীতল ছাড়াও তার মোহ কাজ করে বেপরোয়া মডেল রিংকির উপর। কাকে বেছে নেবে সাইফুল? অমোঘ নেশায় আচ্ছন্ন করা রিংকি না-কি স্নিগ্ধ শীতল নায়লা? নায়লা কি সাইফুলকে ভালোবাসে? নায়লার নেশাগ্রস্ত স্বামীর কারণে কি সম্ভব তাদের এই প্রণয়? রিংকির আচ্ছন্ন মোহ, নায়লার নীরব ভালোবাসা, সমাজের উঁচু দরের লোকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্য প্রকাশ করা সবমিলিয়ে একরকম ঘোরগ্রস্ত সময় পার করে সাইফুল। এই ঘোরের শেষ কোথায়? পাঠ প্রতিক্রিয়া: একজন তরুণ সাংবাদিকের গল্প নিয়ে বইটি সাজানো। লেখক গল্পের আকারে দেশের সংবাদ মাধ্যমের দুর্দশা তুলে ধরেছেন। একজন সাংবাদিক চাইলেই নিজের খেয়াল-খুশিমতো রিপোর্ট করতে পারে না। পারে না ক্ষমতাসীন দলের অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরতে। প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে যে কিছু নেই লেখক সেটাই এক তরুণ সাংবাদিকের জীবনের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। সৎ রিপোর্ট করার অধিকার একজন সাংবাদিকের নেই। তাকে হয় বিরোধী দলের কুৎসা প্রচার করতে হবে না হয় সরকারী দলের মহানুভবতা তুলে ধরতে হবে। না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, খেলা অথবা সিনেমার রিপোর্ট নিয়ে থাকতে হবে। দেশের গণমাধ্যম কিংবা সংবাদমাধ্যম যে আসলে কাজের কাজ কিছু করতে পারছে না লেখক তার ছোটো এই বইতে খুব দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সম্মান যে একজন র্যাবের মধ্যমানের অফিসার থেকেও কম সে কথা বলেছেন লেখক। লেখক বাস্তব জীবনে পেশায় একজন সাংবাদিক হওয়ায় গণমাধ্যমের দুরাবস্থার কথা নিজে যা উপলব্ধি করেছেন তারই একটি রূপ বইতে তুলে ধরেছেন। একজন সাংবাদিক যে মূল দ্বায়িত্ব হওয়া উচিত সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা, দেশের সমস্যা তুলে ধরা সেটা না করে তাদের ইচ্ছাবহির্ভূত কাজ করতে হয়। করতে হয় উচ্চপর্যায়ের লোকেদের চাটুকারিতা। এ বইতে সাংবাদিকের কর্মজীবনের জটিলতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনও প্রাধান্য পেয়েছে। বিবাহিত নায়লার প্রতি গভীর প্রেম অনুভব, বেপরোয়া মডেল রিংকির সাথে তার সম্পর্ক, খালার বাসায় তার জীবন, খালুর ব্যবহার তাকে ফেলে দেয় এক ঘোরের মাঝে। বইয়ের শেষে তাই লেখক বলেছন, "এমন ঘোর আসে আমাদের জীবনে। আমার মতো নগন্য মানুষের জীবনেও। আসে, কেটে যায়। আজকের ঘোরটা না কাটুক। আমার গল্পটা এখানেই শেষ হোক।" অল্প কথায় খুব সুন্দর করে গণমাধ্যমের অসহায়ত্ব, ক্ষমতসীন দলের প্রভাব, জীবনের জতিলতা তুলে ধরেছেন। বইটা পড়ার সময় মনে হয়েছে আসলেই তো ঠিক এমনই হয় আশেপাশে। দেখে শুনে সব বুঝলেও বলার মতো স্বাধীনতা নেই। সাহস করে বলে ফেললেও তাকে ভুগতে হয়। সব মিলে ১১১ পৃষ্ঠার বইতে লেখক খুব চমৎকারভাবে কিছু কঠিন সত্য তুলে ধরেছেন। পড়তে একটুও খারাপ লাগেনি। লেখকের বাচনভঙ্গি বেশ ভালো। পড়তে পড়তে কখন বইয়ের শেষে এসে গেছি বুঝতে পারিনি। নিজেও মনে হয় ঘোরে ছিলাম। টানটান উত্তেজনা না থাকলেও অল্পের মধ্যে পড়েই নেয়া যায় "ঘোর" বইটি। লেখক সম্পর্কে মতামত: আসি নজরুল পেশায় একজন সাংবাদিক। উনার কিছু টক শো আমি দেখতাম আগে। আমার কাছে ভালোই লাগে উনার কথা। উনি বই লিখেছেন আমি জেনেছি কয়েকদিন আগে�� তার লেখা "পিএইচডির গল্প" বইটার রিভিউ দেখেছিলাম। তখনই লিস্টে নিয়েছিলাম বইটা পড়ব। এরপর উনার লেখা বেশ কিছু বইয়ের নাম সন্ধান করলাম। তখন "ঘোর" বইটির কথা জেনেছি। তখনই বইটা নিজের সংগ্রহে নিয়ে নেই। এছাড়াও "দোষ" বইটা নেয়ার ইচ্ছা আছে। এবার মেলায় উনার লেখা "কয়েকজন হুমায়ূন আহমেদ" বইটাও লিস্টে আছে। লেখকের গল্প বলার ধরন আমার বেশ ভালো লেগেছে। হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে লেখকের শ্বশুর হয়। লেখায় তার প্রভাব পড়েছে। তবে অবশ্যই সেটা উপভোগ্য লেগেছে। মলাট, প্রচ্ছদ ও বানান: প্রথমা প্রকাশনীর বইয়ের প্রোডাকশন আমার কাছে বেশ ভালো লাগে। এই বইটির ক্ষেত্রেও তাই। সুন্দর বাঁধাই করেছে। প্রচ্ছদও কাহিনির সাথে মানানসই। আর ধ্রুব এষের করা প্রচ্ছদ বরাবরই আমার পছন্দ। বইতে বানান ভুল কিংবা মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়েনি। পছন্দের কিছু উক্তি: ১. আমার রাগী মনের পাশে থাকে লোভী মন। লোভী মনের পাশে সাধু মন। লোভী মন বলে, এত ঝামেলার দরকার কি! ২. কত রকম অদ্ভুত আনন্দ পায় মানুষ অন্যকে মুচড়ে দিয়ে। ৩. আগের দিনে রাজারাজড়া আকাশছোঁয়া সব প্রাসাদ বানাত, এটা দেখলে সাধারণ মানুষের মনে হতো কত ক্ষুদ্র তারা রাজার তুলনায়। ৪. ভিসিদের ক্যাটাগরি এখন চুনোপুঁটি পররায়ের। র্যাবের একটা মাঝারি কর্মকর্তার চেয়েও নিচে। ৫. বড়লোকদের ফোনের অন্যপাশের শব্দ বোঝা যায় না। গরিবদেরটা পুরো বোঝা যায়।
ঘোর। এক তরুণ সাংবাদিকের মোহময়, মায়াময় জীবনের আখ্যান। পোষা কুকুরের মতো সাংবাদিক জীবন কাটাতে সে মোটেই পছন্দ করে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক দুর্দান্ত রিপোর্ট করে সে রাতারাতি হয়ে যায় সাংবাদিক মহলের আগ্রহের বিষয়। কিন্তু যখনই জানতে পারে আদতে সে ব্যবহৃত হচ্ছে লেলিয়ে দেওয়া কুকুরের মতো তখনই তার মনে বিদ্রোহ জেগে ওঠে, প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে সে। এজন্য চরম মূল্যও দিতে হয় তাকে। . এটা এমন এক সাংবাদিকের গল্প যার কিনা সৎ রিপোর্ট করার ইচ্ছা ছাড়া আর কোনো সম্বলই নেই। সাংবাদিকতা যার একমাত্র নেশা। এই সাংবাদিকতার মধ্যেই সেও জড়িয়ে পড়ে মায়া আর দ্বিধার তীব্র এক জালে। রিংকি নামের এক উচ্ছৃঙ্খল বেপরোয়া মডেল তাকে আটকে ফেলে অমোঘ নেশায়। ওদিকে তারই অফিসের সাদামাটা এক মেয়ের প্রেমের টানে সদা উন্মত্ত থাকে সে। . জীবন এই তরুণটিকে দুটো রাস্তা দেখায়- একটি বেপরোয়া আর খামখেয়ালিপনার আরেকটা মায়াময় এক স্নিগ্ধ জীবনের। দুটো রাস্তাই টানে তাকে। একটা সময় অসম্ভব ঘোরের মধ্যে পড়ে যায় তরুণটি। সবকিছু ছেড়েছুড়ে সে বেছে নেয় স্নিগ্ধ জীবনের। . এক তরুণ সাংবাদিকের মোহ, মুগ্ধতা আর মুক্তির কাহিনী এ উপন্যাস।