পাঠ-পর্যালোচনাঃ মনোয়ারুল ইসলাম এর বকুল ফুল
মনোয়ারুল ইসলাম এর বকুল ফুল লেখক মনোয়ারুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত বই 'ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাষা অভিধান'। বইটি পড়া হয়নি, তবে নিশ্চতভাবে এটি ছিলো খুবই কঠিন এবং সাহসিকতার কাজ। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু পাঠক বন্ধুদের আড্ডায় উঠে এসেছিলো মনোয়ারুল ইসলামের এই বইটি। ঠিক তখনি আমি লেখক সম্পর্কে জানতে পারি। যা লেখক সম্পর্ক এক উচ্চবর্গীয় ইম্প্রেশন তৈরি করেছিলো।
বকুল ফুল ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় নালন্দা থেকে প্রকাশিত বকুলফুল বইটি ২০২১ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় লেখকের অটোগ্রাফসহ সংগ্রহ করি। সম্প্রতি "বকুল ফুল" উপন্যাসটির ভারতীয় সংস্করণ এনেছে Bookecart Publishing India। যার প্রচ্ছদ করেছিলেন কৃষ্ণেন্দু মন্ডল। বাংলাদেশের মত ভারতীয় পাঠকদেরও বইটি বকুল ফুলের গন্ধ, স্মিতার রূপ এবং রুক্সিনীর কূটচালে মুগ্ধ করেছে। বলে রাখা আবশ্যক, এটি মনোয়ারুল ইসলাম এর প্রথম উপন্যাস। কিন্তু বইটি পড়ে আমার মত সকালে কাছে একবারের জন্যও তা মনে হবার সুযোগ নেই। বরং বারবার মনে হয়েছে- এত পরে কেন বইটি পড়লাম! আরও অনেক আগেই পড়া উচিত ছিলো। নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি কেউ যদি না জেনে পড়ে তবে কোন ভাবেই বলা সম্ভব নয়- এটি লেখকের প্রথম উপন্যাস। প্রতিটি লাইন, প্রতিটি প্রেক্ষাপটের বিশ্লেষণ, সামঞ্জস্যপূর্ন ঘটনা প্রবাহ থেকে মনে হয় যেন লেখক এর পূর্বে অসংখ্য গল্প উপন্যাস লিখে হাত পাকিয়েছেন।
কিছু উপন্যাস বা লেখা থাকে যা পড়তে বসলে মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে উঠে আসা যায় না। উপন্যাসের চরিত্র, ভাষাশৈলী, গল্প বলার ঢঙ, গল্পের ঘটনা প্রবাহের উত্তেজনা আমাদের সামনে এগোতে বাধ্য করে। আমি, আপনি বা অন্য কোন পাঠক এমন লেখা ছেড়ে উঠে আসতে পারেন না। এমন সাহস নেই, এমনই একটি উপন্যাস ‘বকুল ফুল’।
বইটির দুর্দান্ত এক প্রচ্ছদ করেছে প্রচ্ছদ-শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগর। বরাবরের মতই মোস্তাফিজ কারিগরের করা বকুল ফুলের প্রচ্ছদ ছিলো ভাবাবিষ্ট ও মনকাড়া । বইটির প্রচ্ছদ, প্রিন্টিং, বাঁধাই, সব মিলে অসাধারন কাজ করেছে লেখক, প্রকাশক, প্রচ্ছদ শিল্পী, প্রিন্টিং-প্রেস এবং বাঁধাইখানা। হার্ডকভারের "বকুল ফুল" হাতে নিলেই যা স্পষ্টাকারে ফুটে উঠে।
লেখক তার বহু কষ্টের 'বকুল ফুল' উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছেন তার আদরের ভাগ্নি 'সাবীহা'কে। অসাধারন উৎসর্গপত্রটি পড়ে অনুমান করা যায়- লেখক তার ভাগ্নি সাবিহাকে কতটা ভালোবাসেন। স্বভাবতই লেখকরা প্রথম বই গুলো মা বা বাবাকে উৎসর্গ করে থাকেন। সেখানে তিনি তার ভাগ্নি সাবিহাকে মায়ের মর্যাদা দিয়ে উৎসর্গ করেছেন। হৃদয়ের কতটা জায়গা জুড়ে একজন মানুষ থাকলে তাকে এতো মর্যাদায় উৎসর্গ করা যায় সেটি উৎসর্গপত্রে চিত্রায়িত হয়েছে।
আমার আরেকজন ভীষণ পছন্দের লেখক হুমায়ুন আজাদের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন এই উপন্যাসটির লেখক মনোয়ারুল ইসলাম।
ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।
-হুমায়ুন আজাদ।
যাই হোক, ফিরে যাই উপন্যাসে, গল্প কথক শুরুতেই দশ বছর আগের এক ঘটনাপ্রবাহের গল্প বলতে শুরু করেন। খুব বৃষ্টির রাত, ঘুটঘুটে অন্ধকার চারপাশ। চারদিকে একটাই শব্দ- বৃষ্টির। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ শোনা যায় না। বৃষ্টির আভাস দেখেও কথক প্রতিদিনের মত ঘর ছেড়ে গভীর রাতে রাস্তায় নেমে এসেছেন তবে খুব সতর্কতার সাথে, যাতে বাবা বুঝতে না পারে। যদিও তাদের খুব বেশি একটা ভ্রূক্ষেপ নেই সেদিকে। হুট করেই পাশ থেকে একজন এসে কথকের মাথায় ছাতা ধরে বসলেন।ভয়ে থ’হয়ে যায় কথক, গল্প কথক। বৃষ্টিতে ভিজে জেসমিন ফুলের গন্ধ ভারী হয়ে বাতাসে মিলে যাচ্ছে চারদিক। আগন্তুক মেয়েটি কথকের পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটছে। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির জোর বাড়তেই বৃষ্টি আর আগন্তুক এক তরুণীর পায়ে থাকা নুপুরের আওয়াজ মিলে অনবদ্য সেই সৃষ্টি- ঝুম শব্দ! কিন্ত এই পরিবেশে কথক অত্যন্ত বিচলিত। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মাঝেও কপালে ঘামবিন্দু জমাট বেঁধেছে। সে আগন্তুক রূপকথার সেই মেয়েটিকে আবিষ্কার করতে ব্যর্থ চেষ্টা ব্যর্থ করলো। নিগূঢ় অন্ধকারে মেয়েটিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। গাঢ় অন্ধকার। একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে তার শরীর থেকে। গন্ধটা কিসের? কর্পূর নাকি বকুল ফুলের! বুঝতে পারে না কথক! বাবার চাকরির সুবাদে কথক বেড়ে উঠেন কৃষ্ণনগর। কৃষ্ণনগরের জমিদার বাড়ির কাছেই তাদের বাড়ি। এই জমিদার বাড়ির জমিদারের নাম ছিল 'কৃষ্ণচন্দ্র'। তার নামেই অঞ্চলটির নাম হয়েছে কৃষ্ণনগর। কথক আগে কখনোই জমিদার বাড়ি দেখেনি। বইপত্রে যা দু'একবার পড়াশুনা হয়েছিল, ঐ অব্দি, এর বেশি দূর নয়। খুব কাছাকাছি থাকা জমিদার বাড়ি দেখা কৌতূহল সে সংবরণ করতে পারলো না। কৌতূহলের তাড়নায় সেই বুক ভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে একদিন ছুটে গেলো, একপ্রকার থমকে দাড়াঁলো জমিদার মহলের সামনে। দেখার সময়ে তার নাকে ফুলের গন্ধ আসতে লাগত। এত সুন্দর গন্ধ তাকে বকুল ফুলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো বারবার, কিন্তু চারপাশে কোনো বকুল ফুল গাছ তো নেই! তাহলে? বৃদ্ধ নারকেল গাছ আর তরুণ জাম গাছ ছাড়া আর কিই-বা আছে! অথচ ঘ্রাণের তীব্রতা এতো গাঢ় ছিলো যে, মনে হয় যেনো পাশেই বকুল ফুলের গাছটি দাঁড়িয়ে। জমিদার মহলের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে দেখছিল সে। শ্বেতপাথরের খোদাঁই করা নাম- স্মিতা মহল, ১২১৭ বঙ্গাব্দ। হঠাৎ তার কানে ভেসে এল এক পরিচিত কণ্ঠ। রহিম চাচার কণ্ঠ। সে কণ্ঠে একটা গাম্ভীর্য ছিলো, এটা কোনো ঘুরবার মতো জায়গা নয়। এখনি ফিরে যাও। আর বলেন- ফিরবার সময় যেনো পেছনে না তাকায়। কিন্তু কথকের কৌতূহলী মন!ফিরবার সময় ফিরে তাকালো সে। একি! স্মিতা মহলের ছাদে সে কাকে দেখছে? সেই মিশমিশ কালো অন্ধকার রাতের আলোকিত মেয়েটি-ই তো! দ্বিতীয় বারের মত মেয়েটিকে দেখেছে সে। বিষয়টা রহিম চাচা বুঝতে পেরে হকচকিয়ে যায় । ভয়ার্ত চোখে, বিরক্তিমাখা কণ্ঠে কথককে কতগুলো ভারী কথা শুনিয়ে ফিরিয়ে দিল। কথক কিছু আচ করতে না পেরে চলে এলেন। ঘটনার কিছুদিন পর কৃষ্ণনগর ছেড়ে চলে যায় কথক ও তার পরিবার। কারণ কথকের বাবার বদলি হয়েছে। উনার নাকি গ্রাম ভালো লাগে না। তাছাড়া সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারেও তিনি চিন্তিত ছিলেন। এদিকে মনের উপর বিশাল পাথর জমেছে কথকের। আর কৃষ্ণনগরের জমিদার বাড়ি দেখা হবে না তার। স্মিতামহলের ছাঁদে দাঁড়িয়ে হাতছানি দিয়ে যে মেয়েটি ডেকেছিল, সে কে? কি তার পরিচয়? সে কী করে? কখনোই আর জানা হবে না। নিকষ অন্ধকারে মেইল ট্রেনে কথকের পাশে কোন এক যুবতী আছে। সে শুয়ে নাকি বসে আছে তা বুঝবার অবকাশ নেই। শুনশান নীরবতায় কথক কেবল নিজের নিশ্বাস উপলব্ধি করতে পারছে। আর নাকে ভেসে আসছে বকুল ফুলের গন্ধ। মেয়েটি কথকের সাথে কথোপকথনে জড়াতে চায়। কথক চায় না। জানায়, সে অপরিচিত কারো সাথেই কথা বলতে ইচ্ছুক নয়। প্রত্যুত্তরে মেয়েটি মৃদুস্বরে বলল, 'এখানে অপরিচিত কে মশাই!' মশাই শব্দটি খুব ভালো ভাবেই কথকের কানে গিয়ে ভিড়লো। তাকে একজন ছাড়া কেউ কখনো 'মশাই' বলেনি। সেই কতো আগে কৃষ্ণনগরের সেই সুন্দরী মেয়েটিই তাকে 'মশাই' বলেছে! তাহলে কি এই সেই মেয়ে! ভেবেই কথক বিচলিত হয়। প্রচণ্ড ভয় আছড়ে পড়ে মস্তিষ্কে। তারপর ভয়ের মিছিল ছড়িয়ে পড়ে সাড়া শরীরে। বাতাসের সাথে যুদ্ধ করে সাদা একটা আলো নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে। কিছু মুহূর্ত পর মানুষের অবয়বের উপস্থিতি। বিড়ির আগুন স্পষ্ট। ভাবান্তরের দীর্ঘটান যেনো প্রতি টানে। লোকটা রিক্সাচালক। রিক্সা নিয়েই এসেছে। কিন্তু এই রাতে রিক্সা নিয়ে যাবার জায়গা কই! ভাবলো কথক। রিক্সাওয়ালা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, 'রাইতের বাসে আইছেন মনে হয়! কই যাইবেন?' 'কৃষ্ণনগর'...
আমি গতকাল (২২ এপ্রিল ২০২১) বিকালে বইটি পড়তে শুরু করি। রাতের মধ্যেই পড়ে শেষ করি। না শেষ করে কিছুতেই যেনো উঠতে পারলাম না। পড়ার সময় ছাত্রজীবনের ছোট বড় বেশ কিছু অদ্ভুত ঘটনা মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে যাচ্ছিলো। মাঝে মাঝে কেমন যেন গা শিরশির করে উঠছিলো। লেখক উপন্যাসটিকে সর্বোচ্চ মাত্রা দিয়েছেন। এই লেখার জন্য লেখকের প্রাপ্য সম্মান লেখক পেয়েছেন কিনা জানা নেই। তবে এমন অসাধারন সৃষ্টির জন্য এই সমাজ এবং যথাযথ পক্ষ থেকে আরো অনেক প্রাপ্য অবশিষ্ট রয়েছে। প্রথম উপন্যাসে সে তার সেরাটা দিয়েই অসান্য করে তুলেছেন৷ বকুল ফুল এর মাধ্যমে লেখক নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছে। আমি মনে করি, একটি রোমান্টিক উপন্যাস পড়ে যখন পাঠক প্রেমানুভব করবে, রহস্যোপন্যাস পড়ে রোমাঞ্চিত হবে, অতিপ্রাকৃত উপন্যাস পড়ে ভয়ানুভব করবে, সেখানেই লেখকের সার্থকতা। সেই অর্থে লেখক শতভাগ সার্থক। শুভকামনা সতত।
রিভিউ লেখকঃ কাউসার আহাম্মেদ আশিক।