শীতের শেষের সাথে সাথে জমজমাট এই প্রায় সাড়ে চারশত পৃষ্ঠার হরর বইটাও শেষ হলো অবশেষে! মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর স্যারের লেখার কথা অজস্রবার শুনেছি আমি পরিচিত পছন্দের মানুষদের কাছে। শেষমেশ পরিচয় হলো আমার ভদ্রলোকের অ-তে অসাধারণ লেভেলের লেখনীর সাথে।
লেখক এতোটাই জানাশোনা মানুষ, ইতিহাস যে তাঁর বা হাতের খেল সেটা প্রত্যেকটা গল্পেই পাওয়া গেছে প্রমাণ। আমি গল্পে ভয়ে স্থানুর মতো হবো, নাকি লেখা পড়ে... খেই হারিয়ে ফেলছিলাম।
তন্ত্র-মন্ত্র, কাল্ট, গুপ্তসংঘ, দেব-দেবী, পুরাণ, ধর্ম সব কিছুর সাথে অবিকৃত ইতিহাসের মিশেল ঘটিয়ে অতিপ্রাকৃত রচনা আসলেই বাংলায় দেখা যায়না।
এখানে ফেরাউন আমলের মিশরীয় দেবতা অ্যাপোফিস, অ্যানুবিস, ভারতীয় অসংখ্য দেবদেবী, প্রাচীন মেসোপোটেমিয়ান অপদেবতা, সুমেরীয় সভ্যতার দেবী লিলিথ, দেবতা আহুরা, মনসা দেবী, জুডাস কয়েন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের নানা সময়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন পরিচিত চরিত্রের মিশেলে রচিত হয়েছে এক একটি বড়গল্প/উপন্যাসিকা। বংশালের বনলতা, হাকিনী, অমল কান্তির চাকরি এইসব নামগুলো অনেকদিন মনে থাকবে আপনার কথা দিচ্ছি।
মোঘল আমল, সেই সুপ্রাচীন বাংলা থেকে শুরু করে ইংরেজ আমল, সত্তর দশক, একাত্তর, আশি নব্বইয়ের সময়...কি নেই! এমনকি ইতিহাসের ব্যপ্তি ছাড়িয়ে গেছে দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বপরিমন্ডলেও!!
লেখকের সবচেয়ে বড় গুণ তার লেখার ধরণ। সাধারণত রহস্য, ভৌতিক, থ্রিলার এইসব বইতে কেউ অতটা সাহিত্যিক ধাঁচের লেখনি, ভারি শব্দ, উন্নত ভাষা আশা করেন না। কিন্তু তৈমূর স্যার এক্ষেত্রে একদমই মুদ্রার উলটো পীঠ। লেখনীর জাদু এতটাই অসাধারণ, ভাষাশৈলী পড়ে মনেই হয়না একটা ভৌতিক ধাঁচের বই পড়ছি। দারুণ রসকসের সহিত প্রবাদের ব্যাবহার, ইংরেজি বাংলা সংস্কৃত থেকে শুরু করে আরও সব উক্তির ব্যবহার, শব্দভান্ডারের সঠিক ব্যবহারের সহিত গল্পের মান ধরে রাখা, খুব কম দেখেছি আমি এই জনরায়। খুব কম।
নতুন লেখকদের একটু খেয়াল করা উচিত আমার মনেহয় এইধরনের উদাহরণগুলো। তাতে লেখার মানটার দিকেও খেয়াল থাকে।
তবে, আমি চাঁদের গায়ের সামান্য একখানি কলঙ্ক পেয়েছি আমার মতে। সেটা হলো প্রায় প্রতিটা লেখাই একটা ব্যাসিক প্যাটার্নে লেখা। কোনো না কোনো এক চরিত্র থাকেই যার কাজ ইতিহাস তুলে ধরা। সে ইতিহাসের প্রত্যেকটি সুচারু বাঁকও তুলে আনবে সামনে বিনাদ্বিধায়। যেটা টানা এতগুলো গল্প/উপন্যাসিকার ক্ষেত্রে বেশ টায়ারিং, মাঝে মাঝে ইতিহাসের প্রবল স্রোতে কোথায় গিয়ে যে ঠেকি, বুঝে উঠিনা আসল গল্প কি ছিল। সেক্ষেত্রে প্রতি একটি কিংবা দুটি গল্প পর পর একটু গ্যাপ দেয়া ভালো আমার মতে। সেকারণে আমারও কিছুটা সময় নিয়ে শেষ করা। আর দুই একটা গল্প আমারও হয়তো মনপূতঃ হয়নি, তবে সেটা সংখ্যা অনুসারে অত্যন্ত কম। ভালো লাগার পরিমান এতো বেশি, যে ঠাঁয় পায়নি সেসব।
যাহোক, এই বইটি বের হয়েছিলো আদী প্রকাশনী হতে। এতে মোট ১৩টি লেখা আছে সংকলন আকারে। বইটি প্রকাশনী আর ছাপাচ্ছেনা। তবে নতুন আকারে দুই ভাগে ভাগ করে 'নিগূঢ়-১ ও ২' নামে বইগুলো প্রকাশ করছে বিবলিওফাইল প্রকাশনী। কলকাতায় অবশ্য একই নামে বুকওফার্ম প্রকাশ করছে বইটি।
ভৌতিক, রহস্য আর ইতিহাসের মিশেলে লেখা যদি আপনার পছন্দ হয় এই বইটি আমি অবশ্যই আপনাকে রেকোমেন্ড করবো। পাশাপাশি আরও বেশি পরিচিতি পাওয়া উচিত এই প্রতিভাবান লেখক ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর স্যারের।
৪.২★