মাসউদুল হকের জন্ম ১৯৭৪ সালে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পদচারণা করলেও তাঁর আগ্রহের জায়গা মুলত কথাসাহিত্য। তবে কথাসাহিত্যের নির্দিষ্ট কোন গণ্ডিতে নিজেকে আটকে রাখতে চান না। ফলে তাঁর প্রতিটি গল্প বা উপন্যাসের বিষয়বস্তু হয় ভিন্ন। কথাসাহিত্যের প্রতিটি শাখায় কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি লেখালিখি করেন। প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন নতুন সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করানাে এবং সেই চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের চেষ্টাই মাসউদুল হকের সাহিত্য রচনার মূল প্রেরণা। পড়াশােনা করেছেন কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিভিল সার্ভিস কলেজে। একাডেমিক পড়াশােনার বিষয় সমাজকর্ম এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক। তবে আগ্রহের বিষয় দর্শন, ইতিহাস এবং রাজনীতি। প্রথম উপন্যাস ‘দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’র জন্য ২০১২ সালে পেয়েছেন এইচএসবিসি-কালি ও কলম তরুণ কথাসাহিত্যিক পুরস্কার। তাঁর গল্প অবলম্বণে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি ‘ঘ্রাণ’ দেশের বাইরে একাধিক চলচ্চিত্র উৎসবের পাশাপাশি ২০১৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ স্বল্প দৈর্ঘ্য ছবির মর্যাদা পেয়েছে। মাসউদুল হক পেশায় সরকারি চাকুরে।
৭০০ কোটি মানুষের সুখের সংজ্ঞা উনিশ-বিশ হতে পারে কিন্তু এক হয়তো কখনোই না। বলতে পারেন যাহা বায়ান্ন, তাহাই তিপ্পান্ন হলে উনিশ থেকে বিশ আর একের তফাৎ কতখানি? ১ মিনিট তেপ্পান্ন সেকেন্ডে রেস শেষ করে যে ১ মিনিট বায়ান্ন সেকেন্ডে রেস শেষ করা লোকটার কাছে হেরে যায়; তাকে জিজ্ঞেস করুন যাহা বাহান্ন, তাহাই তিপ্পান্ন কি না! ১৯/২০ বা ৫২/৫৩’র এই তফাৎটাই হয়তো সুখের সংজ্ঞা আলাদা করে লোক থেকে লোকে।
নিজের সংজ্ঞায় যখন অন্য কারো জন্য সুখ বা বিশদ অর্থে জীবন নির্ধারণ করতে যাই আমরা; গোলযোগ টা বোধকরি তখন থেকেই শুরু হয়। এই ধরণের একটা গোলযোগের ভাব-সম্প্রসারণ “নর-নারী, নরাধম”।
এসহাক, শায়লাভাবী আর ওসমান গণি উপন্যাসিকার মূল চরিত্র। একটা ঘটনায় এই ৩ চরিত্র কাছকাছি হয়। সে ঘটনার বিস্তারে বেরিয়ে আসে তাদের মনোজগত। তিন মানুষভেদে জগতগুলোর রং ভিন্ন হলেও, অপ্রাপ্তি ৩জনের ভেতরই থাকে; নিজের, নিজের মতো করে প্রত্যেকের জীবনে সুখের অভাব অসুখ থাকে।
যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসহাক, শায়লাভাবী অর গণি মুখোমুখি হয়েছিল, তার সমাপ্তিতে যাবার সময় মানুষগুলোর খুব ভেতরের অদিম সত্ত্বা বেরিয়ে আসে। যে সত্ত্বার মুখোমুখি হতে চায়নি হয়তো শায়লা আর ওসমান গণি। দুপুরে যাকে “বেবি” বলে ডাকা হয়; সন্ধ্যায় সে “হারামজাদী” হয়ে গেলে খারাপই লাগে গণির। গণিকে ঘৃণা করার সব আয়োজন সাজানো থাকলেও আবার তার কাছে ফেরার ইঙ্গিত দেয় শায়লা, “আমি কামিজটা ফেরত আনতে তোমার অফিসে যাব।”
জটিল মনস্তত্ত্বের খুব সরল প্রকাশ “নর-নারী, নরাধম”। এসহাক হয়তো চাইলেই পাশ কাটিয়ে যেতে পারতো ঘটনাটাকে কিন্তু শায়লাভাবীকে হারিয়ে দেবার প্রবৃত্তি তাকে সরতে দেয়না। যেটা হয়তো কোন না কোন ভাবে, নৈতিক হয়নি। অথচ, নৈতিকতার চূড়ান্ত পরিচয় দিয়েছে সে।
শেষ পর্যন্ত রুবানার নির্লিপ্ততা, গণির কক্সবাজারে আসার কারণ আর শায়লাভাবীর উচ্চাশা মনে করিয়ে দেয়; সুখের সংজ্ঞা সবার এক না। নিজের সংজ্ঞা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে গেলে জীবন ব্যাপী সুখের অভাব অসুখের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তেমন কিছু সম্ভাবনার ভাব-সম্প্রসারণ “নর-নারী, নরাধম”।
‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’র আধুনিক সংস্করণ! স্রেফ সময় বিবেচনায় এখানে আধুনিক শব্দটা ব্যবহার করলাম। এমনিতে ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ নিজেই তো এক মহা-সফল আধুনিক উপন্যাস। ‘নর-নারী, নরাধম’ খারাপ নয়; ভালোই। এ সময়ের নর-নারীর মনোজগৎ বিশ্লেষণে লেখক বেশ পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন।