আমি একজন খ্রিষ্টান। কিন্তু এমন সময়ে বাস করছি, যেখানে যিশুর এখনো আগমন ঘটেনি। চারিদিকে প্যাগান ধর্মের জয়জয়কার। ...বার্ধক্যহীন অমরত্ব কী, তা আমি জানি না। বার্ধক্য কখনো আলিঙ্গন করতে পারেনি আমায়। তবে মৃত্যু আলিঙ্গন করেছে অগণিত বার। অগণিত বার প্রিয়তমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার সময় তীরবিদ্ধ হতাম আমি। আর আমার প্রাণহীন দেহটা পড়ে থাকত সেই দুর্গম শীতল পাহাড়ে। পড়ে থাকতে থাকতে একটা সময় কঙ্কালে পরিণত হতো সেটা। হাজার বছর পর নিজের কঙ্কাল নিজেই খুঁজে পেতাম। হায়! জানি না, এভাবে কতশতবার নিজেকে খুঁজে পেয়েছি আমি। কত শতবার আফ্রোদিতির ঐ অভিশপ্ত দুয়ারটা দিয়ে একই সময়ে প্রবেশ করেছি, সে হিসেবেও আমার জানা নেই। কত হাজার বছর ধরে এ নির্জন পর্বতের চূড়ায় হাঁটু গেড়ে বসে স্রষ্টার আরাধনা করে চলেছি, সেটাও আমার অজানা। এসব হিসেব আমি জানতে চাইনি। আমি তো কেবল চেয়েছি ইন্দ্রজাল নামের ভয়ংকর এ লুপ হতে মুক্তি!
বইয়ের নামঃ ইন্দ্রজাল ২, হাজার বছরের আরাধনা....... লেখকঃ Jimee Tanhab
কালভ্রমনের এক চক্রব্যুহতে আটক নায়ক সায়মন কে ঘিরে রহস্যের যে মায়াজাল গত দুবছর ধরে লেখিকা বুনে চলছেন তার নাম ইন্দ্রজাল। ২০১৯ বইমেলার বেষ্টসেলার ইন্দ্রজাল এর সিক্যুয়েন্স ইন্দ্রজাল ২।
বর্তমান সময়ে বাস করা সায়মনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ইন্দ্রজাল, আঠারোশ বছর আগের রোমে জুলিয়াস সিজার আর তার সময়কালে বর্তমান সময়ের সায়মন কিভাবে মানিয়ে চলছিলো তার গল্প ইন্দ্রজাল।
একটা সিক্যুয়েন্স হিসেবে যখন দ্বিতীয় বই পড়া হয় তখন আগের বইয়ের সমস্ত কিছু ঝালিয়ে নিয়ে পড়তে বসতে হয়। তবে লেখিকার কৌশলের সামনে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া আর কিছুই নেই। বদলে দিয়েছেন প্রায় সমস্ত কিছু। সাধারন জিনিসগুলো করে তুলেছেন রহস্যময়।
আর্কিওলোজি,এনথ্রোপলজি,স্প্রিরিচুয়ালিজম,মিস্টিসিজম খুব কঠিন ভাষায় ছোট্ট করে লেখিকাকে একটু সম্মান জানানোর ক্ষুদ্র চেষ্ঠা। ইতিহাসকে পরিবর্তন, পরিমার্জন করা যায় না সম্বৃদ্ধ করা যায় কেবল। বর্তমান সময়ে বসে জুলিয়াস সিজারের রোম জাতীর মাঝে নিজের তৈরী চরিত্রকে বসিয়ে দেয়াটাও যোগ্যতার পরিচয়। কল্পনানির্ভর সময়ের লেখাতে নিজের মনোজগতে সেখানে উপস্থিত হতে না পারলে সে লেখা ফুটিয়ে তোলা যায় না। এর জন্যে দরকার তপস্যা, সাধনা। অতীন্দ্রিয়বাদ বা রহস্যবাদ হলো লেখিকার সবচেয়ে বড় শক্তি। রহস্য তৈরী করাটা আর তাকে শৈল্পিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াটা বেশ রপ্ত করেছেন লেখিকা। সাধারনত রিভিউতে আমি এত কথা লেখি না কিন্তু ছোট্ট এই বর্ননাটুকু ওপরের কঠিন শব্দগুলোর একটু ব্যাখ্যা৷ এর কারন এই লেভেলের বই পড়ার আগে ও পরে এতটুকু ছোট্ট তথ্যের দরকার।
এবার মূল গল্পে আসি
আগের সায়মন আর এখনকার সায়মনে বিস্তর তফাত। আগের সায়মন শুধু তার কালভ্রমনের বিষয়টুকু জানতো। এখনকার সায়মন তার আগের কালভ্রমনের স্মৃতিগুলোও মনে করতে পারে। প্রথম ধাক্কাটা আসে আদ্রিয়ানার মাধ্যমে। এই সময়ে আদ্রিয়ানাই কি সেই সময়ের ইসাবেল? বন্ধু থিওনের সেই আবিষ্কার হুট করেই চমকে দেবে আপনাকে। ইন্দ্রজালে আটক সায়মন অতীতে গিয়ে খুঁজে পায় থিয়নের আবিষ্কারের রহস্য। উন্মোচিত হয় সায়মনের ইন্দ্রজালে আটকে পড়ার রহস্য ও কারন। ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতির সায়মনকে ইন্দ্রজাল হতে মুক্তির প্রচেষ্টা একই সাথে ইন্দ্রজালে বন্দীর চক্রান্ত রহস্যকে নতুন মাত্রা দেয়। আফ্রোদিতি আর ডায়ানার কথোপকথন নতুন রহস্যের জন্ম দেয়৷ ইসাবেলকেও নতুন রূপে উপস্থাপন করা হয়৷ চুপচাপ থাকা মেয়েটা কথার ঝুড়ি ফোটায়। সবচেয়ে আকর্ষনীয় চরিত্র ছিলো মানিউখিন। গতবার প্যাগান সাম্রাজ্যে যে জিনিসটা মিস করেছিলাম সেটা এবার পুষিয়ে গেছে মানিউখিনের হাতে। অতীন্দ্রিয় শক্তির জগতে তার বিচরন আর সায়মনকে তার সেই জগতে নিয়ে যাওয়াটা একটা ঘোরের মতন ছিলো। সব রহস্যের জট খুলে দিয়ে আবার রহস্য তৈরী করলেন লেখিকা। মানিউখিনের কন্যা পরিচয়ে আসা সেই রূপবতী সায়মনকে ইন্দ্রজালের কোন গোলকধাঁধায় ফেলে সেটা দেখার জন্য হয়ত অপেক্ষা করতে হবে। কারন সব শেষ করে নতুন রহস্য শুরু করে শেষে লিখে দিয়েছেন অসমাপ্ত।
👌 উপস্থাপন, বর্ণনাভঙ্গি দুটোই অসাধারণ ছিলো। চরিত্রে গভীরতা খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ইসাবেল আর সায়মনকে নতুন রূপে উপস্থাপন করাটা ভালো লেগেছে।
👌 লক্ষ্য করার মতন একটা জিনিস হলো প্রথম পর্বে সায়মন ভবিষ্যৎ জানতো তবুও মহাকালের ধারা পাল্টে জুলিয়াস সিজারের মৃত্যু আটকাতে পারেনি। আর এখানে সময় তাকে ভুলিয়ে দিয়েছে সিজারের মৃত্যু। ইতিহাসকে আর তার সত্যকে পরিবর্তনের দৃষ্টতা দেখানো হয়নি। যদিও কালভ্রমনের সাথে সাথে সায়মনের কৃত সকল কাজ মিটে যেতো তবুও ইতিহাসকে অক্ষত রাখার এই প্রয়াস প্রশংসাযোগ্য।
👌 ইন্দ্রজাল যে এক চলমান গোলকধাঁধা তার ছাপ লেখিকা রেখে গেছেন, ইন্দ্রজাল শেষ হয়নি। সুন্দর একটা পরিনতি তৈরী করে সেটাকে আবার রহস্য করে দেয়াটা ভালো লেগেছে।
👌 আমার জন্য এই বইতে হাইলাইটস ছিলো মানিউখিন আর আফ্রোদিতি। এত সুন্দর করে চরিত্রদুটো জুড়ে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন এক কথায় অনবদ্য।
⭕ শুরুর দিকটা একটু ঘোলাটে লেগেছে। স্পেশালি প্রিয়তমকে নিবেদন করা সেই প্রেম, আর শুরুটা গুছিয়ে উঠতে সামান্য বেগ পেতে হয়েছে। হয়ত লুপ কেন্দ্রিক লেখা পড়তে অভ্যস্ত নই এজন্যে। তবে সাধারন পাঠক হিসেবে মনে হয়েছে শুরুটা আরেকটা সাধারন করে ছেড়ে আসা ফ্লো টা ধরিয়ে নিয়ে তারপর এই অংশটা আনলে ভালো লাগতো।
বইটার আবেশ এখনও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। রিভিউতে আলোচনা সমালোচনা করার জন্য কিছুই লিখতে পারছি না। ঘোরটা কাটলে আরও বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করবো। তবে এখনকার মতন কথা হলো বইটা হাতে নিয়ে ডুবে যান ১৮০০ বছর আগের রোমান সময়ে। আদ্রিয়ানা, সায়মন, ইসাবেল, আফ্রোদিতি, মানিউখিন এরা পরতে পরতে আপনাকে মুগ্ধ করে দেবে। একটা গোপন কথা বলি শেষের দিকে আফ্রোদিতির একটা বর্ণনা আছে সেটা পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো এটাতো জিমি আপু নিজেই। মানিউখিনের কন্যা সায়মনের কানে মোহনীয় সূরে কী এমন বলেছিলো যার ঘোরে পড়ে সায়মন সব ছেড়ে গ্রীসে চলে আসে অন্তত এটুকু জানার জন্যেই ইন্দ্রজাল ২ আপনাকে পড়তে হবে। আর লেখিকার সম্পর্কে আলাদা করে কিছু বলার নেই। সাময়িক যশ খ্যাতি একদিন হারিয়ে যাবে, কিন্তু তিনি বাংলা সাহিত্যে অমরত্ব পাবার জন্যেই এসেছেন। I can write it down.
কারো যদি মনে হয় তেলতেলা পেইড রিভিউ তাহলে তাদের বলবো হ্যা ভাই পেইড রিভিউ। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে বই কিনে এনেছি। A must read book for readers of all criteria.
ইন্দ্রজালের প্রথম পার্ট পড়ার পর মনে হয়েছিল সামনের স্টোরি+প্লটে বিশাল কিছু আসবে। কিন্তু আমার ধারণার বাহিরের কিছুই আসছে। টাইম লুপের একটা স্টোরি যেহেতু, সেহেতু একই পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তবে, কিছু কিছু অংশে ইন্দ্রজালের কিছু অংশ হুবহু তুলে দেয়া হয়েছে। ডায়লগগুলো বা কথার ধরণ এটার আগেরটার থেকেও বহু বাজে অবস্থা! পড়ার সময় মনে হয়েছিল ঘাড়ে বোঝা চাপিয়েছি। তবুও, শেষ করে হাফ ছেড়ে বেঁচেছি। জীবনে পড়া সবচেয়ে চরম বিরক্তিকর বই। আরো এক পার্ট নাকি বের হবে।😶
লেখিকা চাইলেই স্টোরিটাকে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। এই প্লটে গল্পটা বিশাল একটা ছাপ ফেলতে পারত ফ্যান্টাসি জগতে। সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা আর অনেক ইনফরমেশন দিতে পারতেন। গ্রিক মিথলজি যেহেতু টেনেছেন, সেহেতু বিশাল কিছু করা যেতে প্লটটাকে নিয়ে। কিন্তু তেমন কোনো চেষ্টা লেখিকা করেননি। বই তৈরি করা আজকাল কোনো বড়ো বিষয় না। একটা ভালো কন্টেন্ট তৈরি করা সবচেয়ে বড়ো বিষয়। ভালো কিছু লিখতে হলে পরিশ্রম করতেই হবে। লেখিকার বাকী বইগুলো আশাকরি ভালো হবে। আরো ভালো কন্টেন্ট দেয়ার অনুরোধ থাকবে তার কাছে।
'ইন্দ্রজাল' সিরিজের প্রথম পর্বের পরবর্তী অংশ হিসেবে লেখা হয়েছে 'ইন্দ্রজাল ২: হাজার বছরের আরাধনা' নামক এই বইটা। তাই সিরিজের এই পর্বে সাইমন এবং তার সাথে ঘটে চলা ঘটনাবলীকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে পায় পাঠকেরা। - তবে এই পর্বে কিছু জায়গা বাদ দিলে আগের পর্বকেই অনেকটা কপি পেস্ট করা হয়েছে অনেকগুলো অধ্যায়ে, যা একেবারেই ভালো লাগলো না। সেম ঘটনা দেখালেও আমার মনে হয় লেখনশৈলী এবং সংলাপে কিছু পার্থক্য থাকলে ব্যপারটা আরো ভালো হতো। তাছাড়া এই পর্বে গল্পের কাহিনি কিংবা চরিত্রায়ণও খুব বেশি পরিবর্তন করা হয়নি গত পর্বের থেকে, তার সাথে আদিকালের স্টাইলের লেখনশৈলী তো রয়েছেই। বইয়ের প্রোডাকশন অবশ্য বেশ প্রিমিয়াম, তবে প্রচ্ছদ একেবারে অ্যাভারেজ। - সবমিলিয়ে 'ইন্দ্রজাল ২: হাজার বছরের আরাধনা' বইটা আমার তেমন একটা মনমতো হয়নি। সিরিজের প্রথম বইটা যাদের খুবই ভালো লেগেছে তাদের অবশ্য এটাও ভালো লাগতে পারে।
শেষ যেখানে শুরুটা সেখানে। ইন্দ্রজালের আরও একবার পুনরাবৃত্তি। প্রথম বইয়ের প্রেক্ষাপটের সাথে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে লেখিকা উক্ত বই লেখেছেন। প্রথম বইয়ের বেশকিছু কাহিনি দ্বিতীয় বইতে পাঠক খুঁজে পাবে। তবে এইবারের ঘটনাগুলো ঘটেছে অন্যভাবে। অতীন্দ্রিয়ের মাধ্যমে ঘটনাবলি পরিবর্তনের প্রয়াস ভালো লেগেছে যদিও শেষটা থাক...। গল্পের গাঁথুনি, লেখনশৈলী, বর্ণনাভঙ্গি, চরিত্রায়ন সব যথোপযুক্ত লেগেছে। অনেকের কাছে মনে হবে লেখিকা ইতিহাস আর মিথের কম্বিনেশনে এই প্লট তৈরিতে সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু ইতিহাস আর মিথের কম্বো নিয়ে যখন জীবন্ত কিছু তৈরি করা হয় সেখানে কতটা দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে সহজে বোঝা যায়৷ সবমিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য প্লট। যারা ইতিহাস আর মিথের কম্বো নিয়ে দারুণ কিছুর খোঁজ করছেন তাদের জন্য মাস্টরিড।
সারসংক্ষেপ: সময়টা ১৮১২ খ্রিস্টাব্দ। টাইবারের বালিতে শুয়েই আচমকাই ঘুমিয়ে পড়ে এক যুবক। যুবকটির নাম সায়মন। ঘুমের মধ্যেই দেখতে থাকে এক অদ্ভুত স্বপ্ন। যার অর্থ সায়মনের কাছে তখনও অজানা।
বংশপরম্পরায় পেশা হিসেবে বেছে নেয় সে প্রত্নতত্ত্বকে। ফলে বাড়ি থেকে প্রায়ই তাকে দূরে থাকতে হয়। শুনেছে, সানাতারিও অঞ্চলে প্রায় তিন হাজার বছর পুরোনো এক জিউস মন্দিরের নিচে এবং তার আশেপাশে প্রত্নতত্ত্ব নির্দশন রয়েছে। তবে প্যাগান পুরোহিতদের উপস্থিতিতে সেখানে অনুসন্ধান চালানোটা প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু কোনো প্রচেষ্টা ছাড়াই হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয় সায়মন। ঠিক করল, সেখানে একবার হলেও গিয়ে দেখে আসবে। কিন্তু তার বাবা আপত্তি করলেন। পুরোহিতরা কখনোই কোনো বহিরাগতকে অনুসন্ধান চালানোর অনুমতি দেন না। সেখানে যাওয়াটা সময় নষ্ট বৈ কিছু নয়। তারপরও সায়মন হাল ছাড়ল না।
রোম থেকে জাহাজে করে পাড়ি জমালো গ্রিসে। সায়মনের বাবা যেমনটা বলেছিলেন, ঠিক তেমনটাই ঘটল। রাজি হলেন না প্যাগান পুরোহিতগণ। সায়মনও নাছোড়বান্দা। সিধান্ত নিল, রাতের অন্ধকারে পুরোহিতদের অগোচরে চালাবে সে তার অনুসন্ধান।
ঠিক তাই করল। বিনা অনুমতিতে মন্দিরের তলদেশে মশাল জ্বালিয়ে প্রবেশ করল সায়মন। মিলল, ভেতরকার দেয়ালে ল্যাটিন ভাষায় লিখিত প্রায় মুছে যাওয়া এক শ্লোক। ভাঙ্গা ভাঙ্গা কিছু শব্দই শুধু বোঝা যায় সেটির। এর কিছুক্ষণ পরই সে আবিষ্কার করল একটি বিশাল বাক্স বাক্সের ভেতর রয়েছে একটি ব্রোঞ্জ নির্মিত দরজা। দরজাই সাথে শোভা পাচ্ছে দরজাটি খোলার চাবি। তেমন কিছু না ভেবে ভারী বাক্সটা নিয়েই রওনা দিল সায়মন।
বাক্স বন্দি হয়ে পড়ে থাকা প্রাচীন সেই অভিশপ্ত দুয়ারের অভিশাপ সাধারণ সেই যুবক সায়মনের জীবনকে এক মুহুর্তেই এলোমেলো করে ফেলে। বদলে যায় সবকিছু। এক নিমিষেই বদলে যায় সময়। হাজার বছরের পিছুটানে আটকে পড়ে এক গভীর জালে। যার নাম 'ইন্দ্রজাল'।
সায়মন কি শেষমেশ পারবে এই মূর্তিমান অভিশাপ থেকে বেরিয়ে আসতে? নাকি অপেক্ষা করছে আরও ভয়ংকর কিছু? জানতে হলে পড়ুন, লেখিকা জিমি তানহাবের ইন্দ্রজাল সিরিজের প্রথম বই "ইন্দ্রজাল ২: হাজার বছরের আরাধনা"।
পাঠ-প্রতিক্রিয়া: আমার মনে হয়েছে, এই বইটার তুলনায় এই সিরিজের প্রথম বই বেটার ছিল। আমি আমার পূর্বের রিভিউতে বলেছিলাম, ওই বইটার স্টোরিলাইন আমার কাছে সিম্পল লেগেছে। যেমনই লাগুক না কেন গল্পে একটা নতুনত্ব ছিল অন্তত। এই বইটাতে কতিপয় কিছু ঘটনা বাদে নতুন কিছু দেখতে পাইনি। হতাশ হয়েছি।
এই বইয়ের সারসংক্ষেপ লিখতেও আমায় খুব বেশি কষ্ট করতে হয়নি কারণ এই সিরিজের প্রথম বই, "ইন্দ্রজাল: হাজার বছরের পিছুটান" নিয়ে লেখা আমার রিভিউটির বেশকিছু লাইন আমি কপি-পেস্ট করেছি। বইটাও ঠিক এমনই। বেশকিছু ঘটনা ছিল যা আমরা সিরিজের প্রথম বইতে পড়েছি। সেগুলোই আবার পুনরায় লেখা। এই বইটা পড়তে আমার খুব বেশি সময়ও লাগেনি কারণ এমনিতেই আকারে বইটি ছোট তার উপর ভেতরে আগের বইটার কিছু বর্ণনা থাকায় সেগুলো সহজেই স্কিপ করে গেছি।
স্কিপ করেছি, তার মানে এই নয় নতুন যেই বিষয়গুলো এই বইতে এড হয়েছে সেগুলো পড়িনি! পড়েছি। তবে আমায় এই বিষয়টি খুব নিরাশ করেছে যে, ওই একই বিষয়গুলো না রাখলেও হতো। বা মূল পার্টটা ঠিক রেখে অনেক পরিবর্তন আনা যেতো। যেমন একটি উদাহরণ দিয়ে বলি, "ইন্দ্রজাল" বইতে ইসাবেলকে সায়মন প্রথম দেখতে পায় বাজারের এক ময়দা দোকানের সামনে। "ইন্দ্রজাল ২"তেও সেই একই ঘটনা, একইভাবে তাদের দেখা ইত্যাদি। এটাকে অন্যভাবেও প্রেজেন্ট করা যেতো। যেমন, ইসাবেলদের কুটিরটার ঠিক কাছেই একটা জঙ্গল আছে। ভুলক্রমে সে জঙ্গলে একদিন সায়মন ঢুকে পড়ল আর তখনই ফল কুড়ানো অবস্থায় দেখতে পেল ইসাবলেকে। তার সমস্ত ইন্দ্রিয় তাকে বারংবার জানান দিছে, এই মেয়েটার সাথে তার অনেক পুরোনো সম্পর্ক। হাজার হাজার বছর ধরে এই মায়াবী ও নিষ্পাপ চেহারার সাথে সে পরিচিত। ঠিক এমন সময় ইসাবেলও মাথা তুলে তাকাল সায়মনের দিকে। সেও একটি অদ্ভুত অনূভুতি অনুভব করল, ইত্যাদি। অনেকভাবেই অনেক পরিবর্তন আনা যেত।
আমি জানি, একটি বইয়ের যখন সিক্যুয়েল বের হয় তখন প্রথম বইটার সাথে কিছু না কিছু যোগসাজশ রাখতে হয়। তার মানে এই নয়, যেই ঘটনা বা বর্ণনা আমরা আগেও পড়ে এসেছি আবার সেটাই এড করতে হবে! নতুনভাবেও সেটাকে প্রেজেন্ট করা সম্ভব৷ তাহলে আলাদা স্বাদ গ্রহণ করা সম্ভব।
এটা একটা লুপ সিরিজ এটা একচ্যুয়ালি জেনে তখনই আপনায় পড়তে হবে৷ যেহুতু লুপ, তাই সিরিজের প্রথম বইয়ের কিছু বিষয়াদির পুনরাবৃত্তি ঘটা বেশ স্বাভাবিক। আর লেখিকা নিজেই ক্ল্যারিটি দিয়েছিলেন, এটা লুপ সিরিজ তাই এটা জেনেই আপনায় পড়তে হবে।
তবে এখানে কিছু ব্যাপার আছে যার সঙ্গে লেখিকার উপরিউক্ত বক্তব্যে আমার আপত্তি আছে। প্রথম লুপ মানে, বারবার ঘটা বিষয়টাকে বোঝায়৷ লেখিকার যুক্তি এক্ষেত্রে অনেক স্ট্রং কিন্তু পাল্টা যুক্তি আমি দিতে পারি৷ বারবার ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে পুনরাবৃত্তি করা টিভি শোজ অথবা মুভিতে যেভাবে প্রেজেন্ট করা হয়, একটি বইতে ঠিক সেভাবে প্রেজেন্ট করা নিয়ে আমার আপত্তি আছে। একটি ঘটনাকে সেম রেখে বর্ণনাভঙ্গিতে যথেষ্ট পরিবর্তন আনা সম্ভব এতে পাঠক/পাঠিকা বিরক্ত কম হবে। সিরিজের প্রথম বইয়ের রেফারেন্স থেকে দ্বিতীয় বইয়ের দৃশ্যপট রচনা হবে স্বাভাবিক কারণ এটা লুপ। কিন্তু একটা কথা হচ্ছে, চোখে দেখা ও পাঠ করা এক জিনিস না। চোখে যেটা দেখি সেটা আই সুথিং হলে সে দৃশ্য একাধিকবার দেখতে বিরক্ত লাগে না। যেমন: আমরা আমাদের প্রিয় কোনো গান একবার দেখা বা শোনার পর আবার দেখা বা শোনার ইচ্ছা পোষণ করি। এমনও হতে পারে, তা আবারও দেখি বা শুনি। কিন্তু পাঠ করার সময় পয়েন্ট টু পয়েন্ট একই বর্ণনা যা আমি আগের বইতে পড়ে এসেছি ঠিক সেটা পড়তে ভালো লাগে না। এটা হিউম্যান সাইকোলজির একটা অংশ। যেমন: একজন ভালো পাঠক কখনো কখনো একজন ভালো শ্রোতা হতে পারে না অথবা একজন শ্রোতা হতে পারে না একজন ভালো পাঠক। এখানকার বিষয়টা তাই।
লুপ, ফাইন। মেনে নিলাম। কিন্তু আগের পাণ্ডুলিপিটাকে জোড়াতালি দিয়ে কপি-পেস্ট করে আরেকটা উপাখ্যান করা যৌক্তিক লাগে না অন্তত আমার কাছে। ঘটনা এক করুন, নো প্রবলেম কিন্তু বর্ণনার স্টাইল আলাদা করলে পড়তে ভালো লাগে। এভাবে পাঠক স্কিপ করে কম। অধিকাংশ পাঠক/পাঠিকা এগুলো স্কিপ করেছে বলেই আমার ধারণা। আর এই স্কিপের ফলে যতোটুক পরিবর্তন দ্বিতীয় বইতে এসেছে সেটাও ঠিকঠাক রিলেট করতে পারেনি পাঠক/পাঠিকা।
লেখিকার লেখার ধরন সম্পর্কে আগেও বলেছি চমৎকার লেখনশৈলী। আমার মনে হয়, এরকম লেখনশৈলী নিয়ে উনি অসাধারণ কিছু উপহার দিতে পারতেন পাঠকদের। যাইহোক, এই সিরিজের পরবর্তী বইটাও আমি পড়ব অবশ্যই। আশা করি, সেটা "ইন্দ্রজাল-২" মতো হবে না।
লেখিকা একটা জায়গায় ভুল করে গেছেন। ইতিহাস নিয়ে আমার আগ্রহ আছে যা আমি প্রায়ই বলে থাকি আর তাই হয়তো ভুলটা চোখে পড়েছে। "ইন্দ্রজাল" বইতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঐতিহাসিক চরিত্র জুলিয়াস সিজারকে সিনেটে হত্যা করা হয়েছিল ১৫ই মার্চ। অথচ "ইন্দ্রজাল ২" উল্লেখ করা হয়েছে, ১৫ই আগস্ট। এই দুটো তারিখের মধ্যে সঠিক হচ্ছে, ১৫ই মার্চ। ইউকিপিডিয়ার লিংক কমেন্টে যুক্ত করে দেওয়া হবে। চাইলে দেখে আসতে পারেন। পরবর্তী এডিশনে আশা করি এটি সংশোধন করা হবে।
বইয়ের প্রডাকশন ভালো হয়েছে। ঐতিহ্যের প্রডাকশন নিয়ে আমার বরাবরের মতো এবারও কোনো অভিযোগ নেই। বাইন্ডিং, পেজ, প্রিন্টিং সবই ভালো হয়েছে। জ্যাকেটের ভেতরকার কভারটাও এবার বেরঙ ছিল না। তবে "ইন্দ্রজাল" বইতে যেই পেজগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল, এই বইতে সেই পেজ ব্যবহার করা হয়নি। কোয়ালিটির দিক থেকে "ইন্দ্রজাল" বইটার পেজগুলো বেশি ভালো তবে "ইন্দ্রজাল ২"এ ব্যবহার করা পেজগুলো বাজে তা না।
বরাবরের মতোই বানান ভুল পাইনি তেমন। বইটির প্রুফ রিডার এবং বইটির সম্পাদককে বিশেষ ধন্যবাদ।
ইন্দ্রজাল পড়ার পরের দিন আমি ইন্দ্রজাল ২ পড়া শুরু করি। এখানে যেহেতু কালের আবর্তনে অতীতে ফিরে যাওয়ার কাহিনী এবং প্রত্যেকবার প্রায় একই ঘটনা ঘটতে থাকে তাই ইন্দ্রজাল প্রথমটির অনেক লাইন হুবহু এখানে পাওয়া যাবে। এটা আমার কাছে অনেকটা বিরক্ত লেগেছিল। কিন্তু আমাকে মেনে নিতে হয়েছে ঘটনাটিই এমন। আর লেখকের লেখার ধরণ চমৎকার। যার ফলে সেই বিরক্তিভাবটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
ভেবেছিলাম ১ম পর্ব যেখানে শেষ, সেখান থেকে ২য় পর্ব শুরু হবে। কিন্তু লেখিকা আমাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে ২য় পর্বেও ১ম পর্বের কাহিনী এনে কতক্ষণ জল ঘোলা করলো, ঘোলা জলে অনেক অযৌক্তিক কিছুর মিশ্রণ ছিলো...তারপর আবার প্রায় একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি হতে চলছিলো। তখন আমাদের মহাপুরুষ সায়মন সাহেব ঝড়বৃষ্টির রাতে নিজের আবেগে করে ফেলা পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে মহীয়সী নারী ইসাবেলকে শাদি করলো...তারপর আবার একটা ঘোরে গিয়ে মহাপুরুষ মোহাবিষ্ট হয়ে তার অতীতকেই মুছে দিতে যাচ্ছিলো...তখনই লেখিকা কাহিনীর ইতি টেনে তিনটা ডট চিহ্ন দিয়ে ব্র্যাকেটে জানিয়ে দিলেন "অসমাপ্ত"
মানে বইটার যদি ৩য় পার্ট আসে আর বেস্টসেলার হয় তাও এই বই বা লেখিকার কোনো বই ছুঁয়েও দেখবো, এই কান মললাম আর বইয়ের কাভারে নাকে খত দিলাম।
আগের বইটা এতো বেশী সুন্দর ছিলো... তার কাছে এই বইটার নতুনত্ব ম্লান হয়ে গেছে! অগের বইগুলোর অসাধারণ সংলাপগুলো মিস করছি।।। আশা করছি প্রিয় লেখিকা পরের বইটায় সব পুষিয়ে দেবেন।