বই পর্যালোচনা
[পুরাতন রিভিউ]
বই: ইন্দ্রজাল ২- হাজার বছরের আরাধনা
লেখিকা: জিমি তানহাব
প্রকাশনী: ঐতিহ্য
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০২০
ধরন: হিস্ট্রোরিক্যাল ফ্যান্টাসি
সিরিজ: ইন্দ্রজাল #২
মুদ্রিত মূল্য: ২৫০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৪৩
সারসংক্ষেপ:
সময়টা ১৮১২ খ্রিস্টাব্দ। টাইবারের বালিতে শুয়েই আচমকাই ঘুমিয়ে পড়ে এক যুবক। যুবকটির নাম সায়মন। ঘুমের মধ্যেই দেখতে থাকে এক অদ্ভুত স্বপ্ন। যার অর্থ সায়মনের কাছে তখনও অজানা।
বংশপরম্পরায় পেশা হিসেবে বেছে নেয় সে প্রত্নতত্ত্বকে। ফলে বাড়ি থেকে প্রায়ই তাকে দূরে থাকতে হয়। শুনেছে, সানাতারিও অঞ্চলে প্রায় তিন হাজার বছর পুরোনো এক জিউস মন্দিরের নিচে এবং তার আশেপাশে প্রত্নতত্ত্ব নির্দশন রয়েছে। তবে প্যাগান পুরোহিতদের উপস্থিতিতে সেখানে অনুসন্ধান চালানোটা প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু কোনো প্রচেষ্টা ছাড়াই হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয় সায়মন। ঠিক করল, সেখানে একবার হলেও গিয়ে দেখে আসবে। কিন্তু তার বাবা আপত্তি করলেন। পুরোহিতরা কখনোই কোনো বহিরাগতকে অনুসন্ধান চালানোর অনুমতি দেন না। সেখানে যাওয়াটা সময় নষ্ট বৈ কিছু নয়। তারপরও সায়মন হাল ছাড়ল না।
রোম থেকে জাহাজে করে পাড়ি জমালো গ্রিসে। সায়মনের বাবা যেমনটা বলেছিলেন, ঠিক তেমনটাই ঘটল। রাজি হলেন না প্যাগান পুরোহিতগণ। সায়মনও নাছোড়বান্দা। সিধান্ত নিল, রাতের অন্ধকারে পুরোহিতদের অগোচরে চালাবে সে তার অনুসন্ধান।
ঠিক তাই করল। বিনা অনুমতিতে মন্দিরের তলদেশে মশাল জ্বালিয়ে প্রবেশ করল সায়মন। মিলল, ভেতরকার দেয়ালে ল্যাটিন ভাষায় লিখিত প্রায় মুছে যাওয়া এক শ্লোক। ভাঙ্গা ভাঙ্গা কিছু শব্দই শুধু বোঝা যায় সেটির। এর কিছুক্ষণ পরই সে আবিষ্কার করল একটি বিশাল বাক্স বাক্সের ভেতর রয়েছে একটি ব্রোঞ্জ নির্মিত দরজা। দরজাই সাথে শোভা পাচ্ছে দরজাটি খোলার চাবি। তেমন কিছু না ভেবে ভারী বাক্সটা নিয়েই রওনা দিল সায়মন।
বাক্স বন্দি হয়ে পড়ে থাকা প্রাচীন সেই অভিশপ্ত দুয়ারের অভিশাপ সাধারণ সেই যুবক সায়মনের জীবনকে এক মুহুর্তেই এলোমেলো করে ফেলে। বদলে যায় সবকিছু। এক নিমিষেই বদলে যায় সময়। হাজার বছরের পিছুটানে আটকে পড়ে এক গভীর জালে। যার নাম 'ইন্দ্রজাল'।
সায়মন কি শেষমেশ পারবে এই মূর্তিমান অভিশাপ থেকে বেরিয়ে আসতে? নাকি অপেক্ষা করছে আরও ভয়ংকর কিছু? জানতে হলে পড়ুন, লেখিকা জিমি তানহাবের ইন্দ্রজাল সিরিজের প্রথম বই "ইন্দ্রজাল ২: হাজার বছরের আরাধনা"।
পাঠ-প্রতিক্রিয়া:
আমার মনে হয়েছে, এই বইটার তুলনায় এই সিরিজের প্রথম বই বেটার ছিল। আমি আমার পূর্বের রিভিউতে বলেছিলাম, ওই বইটার স্টোরিলাইন আমার কাছে সিম্পল লেগেছে। যেমনই লাগুক না কেন গল্পে একটা নতুনত্ব ছিল অন্তত। এই বইটাতে কতিপয় কিছু ঘটনা বাদে নতুন কিছু দেখতে পাইনি। হতাশ হয়েছি।
এই বইয়ের সারসংক্ষেপ লিখতেও আমায় খুব বেশি কষ্ট করতে হয়নি কারণ এই সিরিজের প্রথম বই, "ইন্দ্রজাল: হাজার বছরের পিছুটান" নিয়ে লেখা আমার রিভিউটির বেশকিছু লাইন আমি কপি-পেস্ট করেছি। বইটাও ঠিক এমনই। বেশকিছু ঘটনা ছিল যা আমরা সিরিজের প্রথম বইতে পড়েছি। সেগুলোই আবার পুনরায় লেখা। এই বইটা পড়তে আমার খুব বেশি সময়ও লাগেনি কারণ এমনিতেই আকারে বইটি ছোট তার উপর ভেতরে আগের বইটার কিছু বর্ণনা থাকায় সেগুলো সহজেই স্কিপ করে গেছি।
স্কিপ করেছি, তার মানে এই নয় নতুন যেই বিষয়গুলো এই বইতে এড হয়েছে সেগুলো পড়িনি! পড়েছি। তবে আমায় এই বিষয়টি খুব নিরাশ করেছে যে, ওই একই বিষয়গুলো না রাখলেও হতো। বা মূল পার্টটা ঠিক রেখে অনেক পরিবর্তন আনা যেতো। যেমন একটি উদাহরণ দিয়ে বলি, "ইন্দ্রজাল" বইতে ইসাবেলকে সায়মন প্রথম দেখতে পায় বাজারের এক ময়দা দোকানের সামনে। "ইন্দ্রজাল ২"তেও সেই একই ঘটনা, একইভাবে তাদের দেখা ইত্যাদি। এটাকে অন্যভাবেও প্রেজেন্ট করা যেতো। যেমন, ইসাবেলদের কুটিরটার ঠিক কাছেই একটা জঙ্গল আছে। ভুলক্রমে সে জঙ্গলে একদিন সায়মন ঢুকে পড়ল আর তখনই ফল কুড়ানো অবস্থায় দেখতে পেল ইসাবলেকে। তার সমস্ত ইন্দ্রিয় তাকে বারংবার জানান দিছে, এই মেয়েটার সাথে তার অনেক পুরোনো সম্পর্ক। হাজার হাজার বছর ধরে এই মায়াবী ও নিষ্পাপ চেহারার সাথে সে পরিচিত। ঠিক এমন সময় ইসাবেলও মাথা তুলে তাকাল সায়মনের দিকে। সেও একটি অদ্ভুত অনূভুতি অনুভব করল, ইত্যাদি। অনেকভাবেই অনেক পরিবর্তন আনা যেত।
আমি জানি, একটি বইয়ের যখন সিক্যুয়েল বের হয় তখন প্রথম বইটার সাথে কিছু না কিছু যোগসাজশ রাখতে হয়। তার মানে এই নয়, যেই ঘটনা বা বর্ণনা আমরা আগেও পড়ে এসেছি আবার সেটাই এড করতে হবে! নতুনভাবেও সেটাকে প্রেজেন্ট করা সম্ভব৷ তাহলে আলাদা স্বাদ গ্রহণ করা সম্ভব।
এটা একটা লুপ সিরিজ এটা একচ্যুয়ালি জেনে তখনই আপনায় পড়তে হবে৷ যেহুতু লুপ, তাই সিরিজের প্রথম বইয়ের কিছু বিষয়াদির পুনরাবৃত্তি ঘটা বেশ স্বাভাবিক। আর লেখিকা নিজেই ক্ল্যারিটি দিয়েছিলেন, এটা লুপ সিরিজ তাই এটা জেনেই আপনায় পড়তে হবে।
তবে এখানে কিছু ব্যাপার আছে যার সঙ্গে লেখিকার উপরিউক্ত বক্তব্যে আমার আপত্তি আছে। প্রথম লুপ মানে, বা��বার ঘটা বিষয়টাকে বোঝায়৷ লেখিকার যুক্তি এক্ষেত্রে অনেক স্ট্রং কিন্তু পাল্টা যুক্তি আমি দিতে পারি৷ বারবার ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে পুনরাবৃত্তি করা টিভি শোজ অথবা মুভিতে যেভাবে প্রেজেন্ট করা হয়, একটি বইতে ঠিক সেভাবে প্রেজেন্ট করা নিয়ে আমার আপত্তি আছে। একটি ঘটনাকে সেম রেখে বর্ণনাভঙ্গিতে যথেষ্ট পরিবর্তন আনা সম্ভব এতে পাঠক/পাঠিকা বিরক্ত কম হবে। সিরিজের প্রথম বইয়ের রেফারেন্স থেকে দ্বিতীয় বইয়ের দৃশ্যপট রচনা হবে স্বাভাবিক কারণ এটা লুপ। কিন্তু একটা কথা হচ্ছে, চোখে দেখা ও পাঠ করা এক জিনিস না। চোখে যেটা দেখি সেটা আই সুথিং হলে সে দৃশ্য একাধিকবার দেখতে বিরক্ত লাগে না। যেমন: আমরা আমাদের প্রিয় কোনো গান একবার দেখা বা শোনার পর আবার দেখা বা শোনার ইচ্ছা পোষণ করি। এমনও হতে পারে, তা আবারও দেখি বা শুনি। কিন্তু পাঠ করার সময় পয়েন্ট টু পয়েন্ট একই বর্ণনা যা আমি আগের বইতে পড়ে এসেছি ঠিক সেটা পড়তে ভালো লাগে না। এটা হিউম্যান সাইকোলজির একটা অংশ। যেমন: একজন ভালো পাঠক কখনো কখনো একজন ভালো শ্রোতা হতে পারে না অথবা একজন শ্রোতা হতে পারে না একজন ভালো পাঠক। এখানকার বিষয়টা তাই।
লুপ, ফাইন। মেনে নিলাম। কিন্তু আগের পাণ্ডুলিপিটাকে জোড়াতালি দিয়ে কপি-পেস্ট করে আরেকটা উপাখ্যান করা যৌক্তিক লাগে না অন্তত আমার কাছে। ঘটনা এক করুন, নো প্রবলেম কিন্তু বর্ণনার স্টাইল আলাদা করলে পড়তে ভালো লাগে। এভাবে পাঠক স্কিপ করে কম। অধিকাংশ পাঠক/পাঠিকা এগুলো স্কিপ করেছে বলেই আমার ধারণা। আর এই স্কিপের ফলে যতোটুক পরিবর্তন দ্বিতীয় বইতে এসেছে সেটাও ঠিকঠাক রিলেট করতে পারেনি পাঠক/পাঠিকা।
লেখিকার লেখার ধরন সম্পর্কে আগেও বলেছি চমৎকার লেখনশৈলী। আমার মনে হয়, এরকম লেখনশৈলী নিয়ে উনি অসাধারণ কিছু উপহার দিতে পারতেন পাঠকদের। যাইহোক, এই সিরিজের পরবর্তী বইটাও আমি পড়ব অবশ্যই। আশা করি, সেটা "ইন্দ্রজাল-২" মতো হবে না।
লেখিকা একটা জায়গায় ভুল করে গেছেন। ইতিহাস নিয়ে আমার আগ্রহ আছে যা আমি প্রায়ই বলে থাকি আর তাই হয়তো ভুলটা চোখে পড়েছে। "ইন্দ্রজাল" বইতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঐতিহাসিক চরিত্র জুলিয়াস সিজারকে সিনেটে হত্যা করা হয়েছিল ১৫ই মার্চ। অথচ "ইন্দ্রজাল ২" উল্লেখ করা হয়েছে, ১৫ই আগস্ট। এই দুটো তারিখের মধ্যে সঠিক হচ্ছে, ১৫ই মার্চ। ইউকিপিডিয়ার লিংক কমেন্টে যুক্ত করে দেওয়া হবে। চাইলে দেখে আসতে পারেন। পরবর্তী এডিশনে আশা করি এটি সংশোধন করা হবে।
বইয়ের প্রডাকশন ভালো হয়েছে। ঐতিহ্যের প্রডাকশন নিয়ে আমার বরাবরের মতো এবারও কোনো অভিযোগ নেই। বাইন্ডিং, পেজ, প্রিন্টিং সবই ভালো হয়েছে। জ্যাকেটের ভেতরকার কভারটাও এবার বেরঙ ছিল না। তবে "ইন্দ্রজাল" বইতে যেই পেজগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল, এই বইতে সেই পেজ ব্যবহার করা হয়নি। কোয়ালিটির দিক থেকে "ইন্দ্রজাল" বইটার পেজগুলো বেশি ভালো তবে "ইন্দ্রজাল ২"এ ব্যবহার করা পেজগুলো বাজে তা না।
বরাবরের মতোই বানান ভুল পাইনি তেমন। বইটির প্রুফ রিডার এবং বইটির সম্পাদককে বিশেষ ধন্যবাদ।
বই পড়ুন এবং প্রিয়জনকে বই পড়তে উৎসাহিত করুন।
©Rezwanul Hasan Robiul