ব্রেইন ট্রান্সপ্লান্ট একটা ইন্টারেস্টিং বিষয়। শিপ অফ থেসিস এর মতন বেসিক প্যারাডক্স এর প্রশ্ন আছে। লেখক সেসবের দিকে যান নাই। উনি একটা রহস্য বানাইছেন শেষ পৃষ্ঠার আগের পৃষ্ঠায়, কিন্তু স্পষ্ট না রহস্যই চাইছেন কিনা! নারায়ণগঞ্জ এর সাতখুন নিয়াও কিন্তু ইন্টারেস্টিং সায়েন্স বা ফিকশন হয়। লেখা একটু কম টানলো।
মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনে কারণে মানুষের জীবনে যে অস্তিত্বের সংকট নেমে আসতে পারে তার দিকে কিছুটা নজর দিয়ে উপন্যাস আলোয় অন্ধ শহর। এই সুযোগে একটা ব্যাপার বলে রাখা উচিত মনে হচ্ছে যে, বইয়ের নামের উপর বড় বড় হরফে সায়েন্স ফিকশন লেখার মানেটা এখন আর আমার মাথায় ধরে না। এভাবে প্রচার করে কি হয় বোঝা মুশকিল। একটা ফিকশনকে ফিকশন হিসাবে না দেখে তাকে আরেকটা সাব ক্যাটাগরিতে ফেলে পাঠ করে কার কি সুবিধা হয় তা চিন্তা করে দেখার সময় হয়ে গেছে বাংলাদেশের লেখক পাঠকদের। এখন এই উপন্যাসের বিষয়ে কিছু কথা বলে ফেলা যাক। মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন আর এর কারণে তৈয়ার হওয়া অস্তিত্বের সংকটের চারপাশে ঘিরে যে কাহিনীর ফেণা সৃষ্টির চেষ্টা আছে এই উপন্যাসে তা বহুলাংশে দুর্বোধ্য, অপরিষ্কার এবং ভীষণ মাত্রায় ক্লান্তিকর। খুব সাধারণ সায়েন্সফিকশনগুলোতেও একধরনের কাহিনী বলার চেষ্টা থাকে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়ার তাড়না থাকে। অনেকক্ষেত্রেই আমাদের ভুল হয় এই ভেবে যে, সায়েন্স ফিকশন মানেই যেন নবীর উম্মত। প্রফেট এসে প্রফেসি করে গেলেন। ভবিষ্যৎ এমন হবে। এর চেয়ে ক্লান্তিকর আর কি হতে পারে? কাহিনীর ফেরে এই উপন্যাসের নায়ক ১৫০ বছর পরের ২১৭১ সালের ঢাকায় এসে নাজিল হন। কাহিনীর ধাঁচের কারণেই এখন আর তখনের তুলনার একটা সুযোগ আগে থেকেই ছিল। কিন্তু ক্রমাগতভাবে এখন এটা নেই, এখন এভাবে এটা হয় এই ক্লান্তিকর পৌনঃপুনিক বর্ণনা দিয়ে কার কি লাভ হলো "কে জানে!"। চরিত্র একটা ঘটনার মধ্য দিয়ে যাবে, পাঠক চরিত্রের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সমকালীন পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাবে। এই পথে না গিয়ে, উপন্যাসে ক্লান্তিহীনভাবে শুধু বর্ণনার পুনরাবৃত্তি। তাছাড়া বৈজ্ঞানিক এবং প্রাযুক্তিক পরিভাষা (টার্মিনোলজি) ব্যবহারের দুর্বলতা এবং পরিষ্কারভাবে অজ্ঞতা যেকোনো সচতন ২০২১ সালের ঢাকাবাসি পাঠকের চোখে পড়তে বাধ্য। একটা পাণ্ডুলিপি যে দুই-একজন সম্পাদক বা বিশেষজ্ঞের হাত ঘুরে তারপর প্রেসে যায় না, না গেলে পর কেমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তার আরেকটি প্রমাণ এই আলোয় অন্ধকার শহর। মুদ্রণ বা বাঁধাই কোন কিছুতেই ভিন্নতা না এনে শুধু কি ১০৪ পাতার একটা বইয়ের দাম ৪৫০ টাকা রাখলেই পেশাদারিত্ব চলে আসবে? আন্তর্জাতিকমানের দামটা না হয় শোধ করা গেলো, লেখককে সম্মান-সম্মানী দিতে কার সমস্যা? তবে পাঠককে সমমানটা দেবে কে? এক ঝাঁক মুদ্রণ প্রমাদ দিয়ে পাঠককে সম্মান দেয়া? ভুল ভাল ইংরাজি পড়তে বাধ্য করা? ক্রমাগত ইংরাজি শব্দের ব্যবহার দেখে সন্দেহ হয় যে লেখাটা যে ফিউচারিস্টিক হতে যাচ্ছে এবং ফিউচারিস্টিক হতে গেলে ইংরাজির দরকার সেই পূর্বানুমান থেকে বাছ-বিচারহীনভাবে ইংরাজি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে কিনা? তাছাড়া ভুল ইংরাজি বাক্যের উপস্থিতি ভীষণ পীড়াদায়ক। তবে এটা ঠিক যে ২১৭১ সালে আদৌ বাংলাভাষা থাকবে কি না কে জানে। বিদেশীভাষা প্রীতি, বিদেশী ভাষার কাছে আমাদের এখনি যে গণ নতি স্বীকার তার দিকে তাকালেই বোঝা যায় বাংলা এখনি বাংলাদেশে একটা দ্বিতীয় শ্রেণীর ভাষা। ১৫০ বছর পর হয়তো ইংরাজি, হিন্দি বা আরবির পর বাংলাদেশিদের কাছে বাংলা ভাষার জায়গা হবে। বাংলাভাষার মধ্যে এসব ভাষার উপস্থিতিও বাড়তে-কমতে পারে। এমনকি বাংলা বাক্য গঠন রীতিও ইংরাজি বা হিন্দির মতন হয়ে যেতে পারে। যাহোক, উপন্যাসের কোথাও সচেতন ভাষাচিন্তা ছিলনা। তাই ইংরাজির ব্যবহারকে ভিন্ন চোখেই পড়তে হবে। আর ভীষণ কটু শোনালে বলতে হচ্ছে যে, একজন বোকালোকের অসচেতন ভুল তাও মেনে নেয়া যায়, কিন্তু একটু একজন বোকা লোক যদি চালাকির ভান করেন তবে মেনে নেয়া যায় না। একমাত্র অন্ধকার একটা শহরে এমন কাণ্ড ঘটানো সম্ভব।
২১৭১ সালের মানুষের নাম নিয়ে কল্পনার অবকাশ আছে। এক্ষেত্রে ছাড় পাওয়া যায় প্রচুর। কিন্তু ২০২০ সালে একজন ৪৭ বছর বয়স্ক বাংলাদেশির নাম কি করে রিমেক হতে পারে তা চিন্তার বিষয়। বাংলাদেশের আর সব সায়েন্স ফিকশনে ভবিষ্যতের পৃথিবী, ঢাকা-বাংলাদেশ হচ্ছে পশ্চিমা আধুনিক একটা জগত। যেখানে সমগ্র পৃথিবীটাই একটা ইয়োরোপীয় কলোনি, ইয়োরোপীয় জ্ঞান কাণ্ডের জয়জয়কার। এই উপন্যাসে যদিও লেখক স্থানিকতার অভিজ্ঞতা এনেছেন। এনেছেন শুধু দুইটা বাক্য ব্যবহার করে। দুইবার আজানের কথা উল্লেখ করে আর একবার একটা ফোন কলের শুরুতে সালামের উল্লেখ দিয়ে। এই হচ্ছে স্থানিকতার ব্যবহার। ২১৭১ সালের সামাজিক-রাজনিতীক প্রেক্ষাপটে যে সীমাহীন একটা সম্ভাবনা ছিল, ঢাকাবাসী পাঠককে মজিয়ে ফলার যে দারুণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল তার কোন দিকেই আগ্রহ দেখান হয় নাই।
আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে এবং ধারণা ছাড়া ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস দেয়ার প্রেরণা নিয়ে পাঠক অত্যাচার করার খায়েস থাকলে খুব বিপদ। এমন বিড়ম্বনা থেকে একজন ভাল সম্পাদক উদ্ধার করতে পারতেন। এখানে সম্পাদক মানে শুধু বানান বা পরিভাষা ঠিক কারবারি না বরং এমন একজন পেশাদারি লোক যে কিনা লেখককে প্রয়োজন হলে গল্পের কলকব্জা এমনকি গল্প বলার ধরণ পর্যন্ত নতুন করে লিখতে বা ভাবতে বাধ্য করাতে পারবেন। এই প্রযুক্তিটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভীষণ প্রয়োজন। না হলে, ক্রেডিট কার্ডের মতন একটা সাধারণ প্রযুক্তি বা ক্রিপ্টো কারেন্সি যা কিনা সমকালীন প্রযুক্তি তাকে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি হিসেবে উল্লেখ করার মতো বিপর্যয় ঘটতে পারে। আরেকটা খেয়াল করার মতন বিষয় আছে। ১৫০ বছরের পরে বারিধারার একটা বাড়ির নিচে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স সমৃদ্ধ রোবট গেট খুলে দেয় আবার গবেষণাগারের দরজা নিঃশ্বাসের উপাদান বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিচয় নির্ধারণ করে তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা খোলার যে দৃশ্য দেখা যায় তাতে ঢাকাই মানুষের বিকারগ্রস্থ রুচির একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার পরেও কেউ যদি বাড়ির গেঁটে ইনটেলিজেন্ট রোবট রাখে দারওয়ান হিসাবে তবে তার রুচি নিয়ে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে। এমন রুচির বিকারতো ভিন্ন রূপে এখনো আছে। ভবিষ্যতেও এমনভাবে থাকতে পারে হয়তো!
সব শেষে বলা দরকার যে, সায়েন্স ফিকশন বলে যে জনপ্রিয় ধারা বাজারে চালু আছে, তাতে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেয়ার চেয়েও ভবিষ্যতের উছিলায় বর্তমানকেই মোকাবেলা করার একটা পাঁয়তারা থাকে। ভবিষ্যৎ তো একটা উছিলা, সেই উছিলায় আমরা মানুষের জীবনের শত-বিচিত্র সংগ্রাম, বিপন্নতার সামনে এসে দাঁড়াই। এমনটা থাকতেই হবে এমন কথা বলছি না। অন্তত কাহিনী বলার ক্ষমতা থাকলে ভাল, চরিত্র নির্মাণ এবং উপন্যাস তৈয়ার করার মুনশিয়ানা থাকলে ভাল।
সালটা ছিল ২০১৭ ,থাই এয়ারে চড়ে মেলবোর্ন থেকে ব্যাংককে ফিরছি। দীর্ঘ ৯-১০ ঘন্টার জার্নি। প্লেনের মাঝে এত লম্বা সময় ধরে কি করা যায় তা নিয়ে ভাবছিলাম।ঠিক তখন আমার চোখের সামনের দিকে দেখি নিউজ পেপার। তাতে লেখা হেড ট্রান্সপ্ল্যান্ট নিয়ে ইতালিয়ান ডা. ক্যানেভারোর খোলামেলা কিছু কথা। মানুষ গিনিপিগ হিসাবে রাশিয়ান বংশদ্ভুত কম্পিউটার সাইনটিস্ট বেল কেনই বা ডা. ক্যানেভারোর এক্সপেরিমেন্টে সাড়া দিল? যাহোক আজ আবার কথাটা মনে পড়লো শুভ্রর "আলোয় অন্ধ শহর" নামের সায়েন্স ফিকশন বইটি পড়তে গিয়ে।দেড়শ বছর পরের ঢাকা! চিপ, কোড আর ডিভাইসের ছড়াছড়ি অনুমেয়। রিমেক নামের এক ছেলে নিজেকে আবিষ্কার করে ২১৭০ এ। সে জানতে চায় কে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে তাও আবার অন্যের শরীরে। কে করেছে এই জটিল কাজ তা জানতে পারলে সে কিছুটা স্বস্তি পেতো। কাজটা আর কিছু না। কাজটা হলো ব্রেইন ট্রান্সপ্ল্যান্ট। এটা করতে গিয়ে শুভ্র অনেক চরিত্র সামনে নিয়ে এসেছে।গল্পের প্রয়োজনে বায়ো নামের মডিফাইড হিউম্যানকে সবার সামনে হাজির করিয়ে দিয়ে অনেক অজানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মনস্তাত্বিক পর্যালোচনা আর বিশ্লেষনের মাধ্যমে গল্পের গতিপথ খুঁজে পাবার জন্য শুভ্র আলোর মাঝে অন্ধকারকে বেছে নিয়েছে।
শুভ্র ভাইয়ের গদ্য বরাবরই ভালো লাগে। কোনো রাগঢাক নাই। সহজে গভীরে যান। আবার বেরিয়েও আসেন। বেশ গতিশীল তার গল্প বলার ভঙ্গি। একুশে মেলায় ইনার সাইন্স ফিকশন বের হয়েছে। এবারের একুশে মেলায়ও সাইন্স ফিকশনসহ একাধিক বই বের হয়েছে। সাইন্স ফিকশন সাধারণত গল্পকাররা খুব কমই লিখেন। জাফর ইকবাল আরো আরোদের জন্য যেন সেসব তোলা থাকতে হবে। তবে সালাহ উদ্দিন শুভ্র সেসবে ছাড়তে নারাজ। সব মাধ্যমে তার যশ ছড়িয়ে পড়ুক। শ্রভ্রদার জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা
রিভিউ লিখেছেন প্রকৌশলী সুজিত দেবনাথ- . সালটা ছিল ২০১৭ ,থাই এয়ারে চড়ে মেলবোর্ন থেকে ব্যাংককে ফিরছি। দীর্ঘ ৯-১০ ঘন্টার জার্নি। প্লেনের মাঝে এত লম্বা সময় ধরে কি করা যায় তা নিয়ে ভাবছিলাম।ঠিক তখন আমার চোখের সামনের দিকে দেখি নিউজ পেপার। তাতে লেখা হেড ট্রান্সপ্ল্যান্ট নিয়ে ইতালিয়ান ডা. ক্যানেভারোর খোলামেলা কিছু কথা। মানুষ গিনিপিগ হিসাবে রাশিয়ান বংশদ্ভুত কম্পিউটার সাইনটিস্ট বেল কেনইবা ডা. ক্যানেভারোর এক্সপেরিমেন্টে সাড়া দিল? যাহোক আজ আবার কথাটা মনে পড়লো শুভ্রর "আলোয় অন্ধ শহর" নামের সায়েন্স ফিকশন বইটি পড়তে গিয়ে।দেড়শ বছর পরের ঢাকা! চিপ, কোড আর ডিভাইসের ছড়াছড়ি অনুমেয়। রিমেক নামের এক ছেলে নিজেকে আবিষ্কার করে ২১৭০ এ। সে জানতে চায় কে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে তাও আবার অন্যের শরীরে। কে করেছে এই জটিল কাজ তা জানতে পারলে সে কিছুটা স্বস্তি পেতো। কাজটা আর কিছু না। কাজটা হল ব্রেইন ট্রান্সপ্ল্যান্ট। এটা করতে গিয়ে শুভ্র অনেক চরিত্র সামনে নিয়ে এসেছে।গল্পের প্রয়োজনে বায়ো নামের মডিফাইড হিউম্যানকে সবার সামনে হাজির করিয়ে দিয়ে অনেক অজানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মনস্তাত্বিক পর্যালোচনা আর বিশ্লেষনের মাধ্যমে গল্পের গতিপথ খুঁজে পাবার জন্য শুভ্র আলোর মাঝে অন্ধকারকে বেছে নিয়েছে। https://www.rokomari.com/book/195664/...